শিল্পের এক মোহমায়া উচ্চকিত সাবজেক্ট হলো কবিতা। যাপিত যাপনের নামই কবিতা। কবিতা কোনো দ্বীনতা মানে না। কবিতা এসে উড়ন্ত গাঙচিলের ডাক শোনায়। যে ডাকের পাখায় চড়ে শব্দরা মালা গাঁথে ভবিষ্যতের। কবিতা এক ঐশ্বরিক ভোগের লীলা বহন করা কীর্তনশালার নাম। কবিতা পূজো দেয় মানবতাবাদের। কবিতা মালা গাঁথে বিদেহীআত্মার। যে আত্মার খোরাকে ভর করে হেসে ওঠে বিশ্বচরাচর, সুন্দরের শোকেস এবং নৈমত্বিক পুস্পালয়। কবিতা মানে না কোনো দেশ। কবিতা মানে না কোনো জাত। কবিতা মানে না কোনো বর্ণের রং বা বর্ণবাদ। কবিতারা শাড়ির কুঁচির মতো গিট বাঁধতে বাঁধতে আঁচলের সৌন্দর্য প্রকাশ করে। এটাই কবিতার সার্থকতা।

গত শতাব্দীর পাঠচুকিয়ে মাঠ চষে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম সিকি যিনি স্থান দখল করে বাংলা কবিতায় এনে দিয়েছে এক ঐকিক স্বত্বা। কবিতার এই স্বত্বার ভেলায় বসে যিনি এক মহাকাব্যের জন্মদিলেন তিনি হলেন প্রয়াত হওয়া এক জাদরেল কবি আল মাহমুদ। অনেক বিশেষণে বিশেষায়িত করা যাবে কবি আল মাহমুদকে। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে তারই পছন্দ তিনি একজন কবি। কবি আল মাহমুদ তার ছদ্মনামের যথার্থতা বহন করা এক মানুষ। কবিতাকে আপন করে শিল্পে বারান্দায় গেয়ে গেছেন আপাদমস্তক কবিতার শাশ্বত চিরন্ততা। কবি হতে এসে জীবনের শেষকোষাগারে শুয়ে শুয়ে মহাকবি হয়েই রোপন করে গেলেন এক মহাকাব্য। যে কাব্যে কবিকে সেই সোনালি কাবিনের মত খুঁজে ফিরে পাওয়া যায়। মহাকাব্যের শিরোনামটি আজীবন বাংলা সাহিত্যে ঢেউ তুলে যাবে। যেমন ঢেউ তুলেছিল তার সোনালি কাবিনের লাইন- নদীর ঢেউ এর মত বল কন্যা কবুল কবুল”। ‘এ গল্পের শেষ নেই শুরুও ছিল না’ এ লাইনটি বার বার পাঠ করতে করতে কেমন জানি এক নতুন মোহে আবিষ্ট হতে চলেছিলাম। কী আছে এ মহাকাব্যে! অথবা কী নেই এ মহাকাব্যে!

ভাবনার অতলতলে পাঠ চুকতে গিয়ে চোখগুলো একেবারেই ছানাবড়া। কবি এক সৃষ্টির লীলার চরাচরে প্রবেশ করে পাঠকদের নিয়ে খেলছেন নতুন খেলা। যে খেলার সারথি সব মানুষ আর মানুষ। এক জীবনের বদৌলতে কবি কত জীবনের কথাই না বললেন এক ইভ আর আদম দিয়ে। যে ইভের কাছে শয়তানের কারিশমাটিক শিল্পের অপব্যবহার আর মানুষের ভূবনচরে পদার্পন। শুধু কী তাই! না। তা যেন এ বিশ্বের এক মহাপরিবারের কথাই বললেন। যে পরিবারের সূত্রপাত এক ডাল থেকে। যে ডালে এসে বসেছিল ইবলিসের হিয়া।

একজন মানুষ অথবা একজন কবি যখন তার স্বীয় স্বত্বার কাছে যাপনের সবটুকু ছেড়ে দিয়ে বিশ্বাসের অঙ্গুলি তুলেন শাহাদাতের সাক্ষ্যরুপে তখন সে স্বত্বায় জাগরণের ইচ্ছে পূরণে ঢেলে দেন করুণার মহাখাতা। এঁকে দেন ছায়ার করতল ঢেউ। কবি আল মাহমুদ বিশ্বাসের সব উজাড় তুলে ধরেন তার মহাকাব্যের প্রথম অধ্যায়ের শুরুতে।
প্রথমে সিজদায় যাই আল্লাহর সম্মুখে

কাব্য রচনার ভাষা সৃজিলেন বুকে।


এইখানে লিখ তবে রসুলের নাম
রসুলের নামে বলি সালাম সালাম।
আল্লাহ রসৃল তিনি জগতের দিশা
আঙুলের ইশারায় কাঁপে দিবা নিশা।

একজন কবি জগতের সব মোহ ত্যাগ করে তার বিশ্বাসের কাবায় সবটুকু উজাড় করে দিয়ে তারপর মহাকাব্য রচিলেন। যে মহাকাব্যে আল মাহমুদ এক বিস্ময়কর শিরোনাম দিয়ে নতুন একে ইতিহাসের দিকে বাঁক ঘুরালেন। ‘এ গল্পের শেষ নেই শুরুও ছিল না’ অনেকটা তান্ত্রিকতার কাছে যেন আমাদের বসিয়ে দিলেন। যে তান্ত্রিকতা বিশ্বাসের। যে বিশ্বাসের কাছে নুয়ে গেলে সব অর্জন হাতের কাছে ধরা দেয়। কবি আল মাহমুদ তার মহাকাব্যে এক চিরাচরিত ইতিহাসকে এমনভাবে টানলেন যেখানে পাঠক রুচির কাছে অথবা উপস্থাপনক্রিয়ার কাছে করজোড়ে বসে যাবেন এক ঐতিহাসিক দহনক্রিয়ায়। যে দহনে বিশ্বকাঁপে থরথরে। কবির মহাকাব্য রচনার গতিশীলতাই জানিয়ে দিচ্ছে কতেক কথা- কবির ভাষায়-
দুয়ার ভাঙিয়া আসে জোয়ারের ধ্বনি
সাগরে ভাসাই মহাকাব্য তরণী।
কাঁপছে আমার নাও ঢেউয়ের আঘাতে
প্রবল দুলুনি উঠে দাঁত লাগে দাঁতে।

আধো আধো ভাষ্যে কথাবলা সুরতে কবিকে ডাকে মহাকাব্যের ভাষা। একজন শিশুর মতো কবি বলে যাচ্ছেন মহাকাব্যের চরণাঞ্জলি। যে বাক্যের পিঠে চড়ে কবি আল মাহমুদ দাঁড়িয়ে রইলেন এক মহাকবি হয়ে। কবিতার আল মাহমুদ যেমন দৃঢ়তার সহিত দাঁড়ানো আছেন তেমনি মহাকাব্যের কবি আল মাহমুদ নিজের পরিচয় তুলে ধরেছেন। পাঠকরলেই চেনা বামনের ফৈতার মতো কবিকে খুঁজে নেয়া সম্ভব।

কবি আল মাহমুদ মহাকাব্যটিকে আটটি ভাগে ভাগ করে কিসের যেন এক ইঙ্গিত দিয়েছেন। জান্নাতের দরজাও কিন্তু আটটি। কবি আল মাহমুদ তার মহাকাব্যের ভাষায় আটটি পরতে পরতে যেন সেই স্তুতির মিম্বরের দিকে তার পাঠককে নিতে চেয়েছেন। প্রথম অধ্যায়ের শেষ লাইনগুলোতে যদি চোখ বুলাই তাই যেন ইঙ্গিত করছে। কবির ভাষায়-
সালাতে দাঁড়িয়ে যাবো রুকু সিজদায়
ইচ্চে করে মিশে যাই পথের ধুলায়।
মাটি থেকে সৃষ্টি আমি মিশব মাটিতে
মাটির উপরে মাথা শীতল পাটিতে।

কবির এ উপমায় আবারও পাঠক খুঁজে পায় নতুন আল মাহমুদকে। যে আল মাহমুদ তার সৃষ্ট জীবনের কথা বলতে বলতে চলে গেলেন আপনভূবনতলায়। যে ভূবনপল্লীতে এক আদম হাওয়া ভুলের খেসারত আর ইবলিসের শঠতাই যেন কবি বার বার পাঠককূলকে স্মরণ করিয়ে রচিলেন এ মহাকাব্যে। আল মাহমুদের ভাষায়-
গল্পের শুরুতে এক মাটির মানুষ
আদম তাঁহার নাম সবল পুরুষ।
আল্লার জিকিরে তাঁর কাঁপে তনুমন
কাঁপছে প্রকৃতি,কাঁপে জনসাধারণ।
প্রচন্ড কম্পন ওঠে মাটির অতলে
পৃথিবীর নাভি ভাসে সাগরের জলে।

কী চমৎকার এক উপমার কাছে বসিয়ে ছাড়লেন আমাদের! তরুণ আল মাহমুদ আর প্রবীণ আল মাহমুদের কোথাও ব্যবচ্ছেদ করা যাচ্ছে না। একজন কবি তার সৃষ্টি রহস্যের আদি পিতা মাতাকে কাঁধে নিয়ে যেনো এক নতুন বজরা ভাসালেন বাংলা মহাকাব্যে। দ্বিতীয় অধ্যায়ের শেষটুকুতে যদি পাঠচুষি তা যেনো আরেক কথাই বলছে- কবির ভাষায়-
কি মহিমা লেগে আছে মৃত্তিকার গায়
মাটির মানুষ হলে বোঝা বড় দায়।
আপাতত বন্ধ করি মাটির কীর্তন
মাটির প্রতিভা আমি,জীবন মরণ।
মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে মাটি হয়ে থাকি
সোনার পাথরে গড়া সুবর্ণ এ বাটি।

আহ! কী চমৎকার উপমার কাছে কবি বসে গেলেন। আসলেই কবি আল মাহমুদ একজন- সোনার পাথরে গড়া সুবর্ণ এ বাটি। আসলেই বাংলাসাহিত্যে তিনি একজন বটবৃক্ষ, একজন সোনার বাটি।
কবি আল মাহমুদ জীবনের ধারাপাত এঁকেছেন পারিবারিক এক শৈল্পিকতার হাত ধরে। মীর বাড়ির সোনার ছায়ায় বেড়ে ওঠা আল মাহমুদ পথ হারা পথিক হয়ে কিছুটা সময় যাপন করেছিলেন বাংলাকাব্যে। যে পথের কাব্যেও তিনি ছিলেন ইশ্বর। প্রতাপের ডানায় চড়ে উর্ধ্বে উঠতে যাওয়া সিঁড়িতে নিজের পরিচয় ফিরে পেয়েছেন। তাই বার বার তিনি আপন সৃষ্টি আদম বংশের কথাই স্মরণ করিয়ে নিজের দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন।
তৃতীয় অধ্যায়ের শুরুচিত্র ঠিক এভাবে-
আমার মহান প্রভূ আল্লা দয়াময়
ফেরেশতা সবারে ডেকে দিলেন অভয়।
তোমরা সবাই দেখো এই তো মানুষ
আমার সৃষ্টির সেরা প্রথম পুরুষ।

কবি আল মাহমুদ এক ইশ্বরের নাম। যে ইশ্বর নিজের কৃততায় খুঁজতে চেয়েছেন আদি পৈতৃক ভিটেবাড়ির দৃশ্য। যে দৃশ্যচিত্রে ভেসে বেড়াচ্ছে ইতিহাসের এক নান্দনিক নৃত্য। যে নৃত্যের তালে তালে নিজের স্বকীয়তা প্রকাশে নেননি কোনো শঠতা বা মিথ্যার আশ্রয়। কবির ভাষায়-
আদমের চলাচলে আদব কায়দায়
প্রভুর সন্তোষ যেন সর্বত্র সহায়।
কী দারুণ প্রীতিরোধ স্নেহ মমতায়
অবারিত হয়ে আছে সকাল সন্ধ্যায়।
শয়তান দিশেহারা আদমের জয়ে
আগুনের শিখা যেন লাফায় সভয়ে।
কেবলি সে খোঁজে কোথা আদমের খুঁত
যেমন পেতনী নাচে শেওড়ার ভূত।

কবি তার পৈতৃকনিবাসের বিশ্বাসের সারথি হতে গিয়ে এক ইতিহাসের ডালে চড়ে বলে গেলেন নিজের কথা, আদিপিতামাতার কথা, চিরশত্রুর কথা, বিশ্বাসের কথা। বিশ্বচরাচরে যে কোনো সাহিত্য নারীহীনে সাহিত্য রচনার দুসাহস হয়ত অনেকে করেনি। করবেনই বা কেন! নারীতো জাগতিক জীবনের অংশও বটে। কবি আল মাহমুদ তাঁর এ মহাকাব্যে নারীকে সম্মানের আসনে বসাতে কোনো কসুর করেননি। কবির ভাষায়-
নারী তো নারীই শুধু আর কিছু নয়
তবুও জগৎব্যাপী নারীর বিজয়।
কারা যে রটনা করে কারা বলে প্রিয়া
কারা যে নারীর ঠোঁটে চুম্বন আঁকিয়া।
দিয়া বলে প্রিয়তমা সুন্দরীতমা গো
জগৎ উদ্ধারে তুমি জাগো নারী জাগো।

কিছুটা কৃচ্ছতার আড়ালে আজ কবিরা নারীকে বানিয়ে ছাড়ছে ভোগের পণ্য, কখনো বিজ্ঞাপনের পণ্য,কখনো কর্পোরেট পণ্যও বটে। অথচ আল মাহমুদ নারীকে জাগরণের সূতিকারে বসিয়ে দিয়েছেন সম্মান।
কবি আল মাহমুদের এ মহাকাব্যটি সাহিত্যের সব রস কসে সমৃদ্ধ। উপমা, উৎপ্রেক্ষা, গতিশীল ছন্দের দ্যৌতনা, অন্তরার ব্যঞ্জনা থেকে শুরু করে সব রসদে এ মহাকাব্যের সুঠাম শরীর। কবি আল মাহমুদ মহাকাব্যের শিরোনামে চড়ে এক সত্যের জন্ম দিলেন। রবীন্দ্রনাথের ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’ এর মত কবি আল মাহমুদে ‘যে গল্পের শেষ নেই শুরও ছিল না’ ঠিক মহাকাব্যটিকে সেভাবেই কবি শেষ করলেন। আসলেই ব্যক্তির ধারণক্ষমতার রেসটুকুই যেন শিল্পের সুষমায় রুপ পেল। কবি স্মৃতির বাতায়নে ভাটাপড়া দ্যুতির মাঠে এক নান্দনিক শিল্পের চারা রোপন করে বাংলা সাহিত্যকে আবার নেড়ে দিয়ে চিরন্থানে চলে গেলেন রাজারবেশে। এমনই সৌভাগ্যের ছায়াতলে কবি বার বার মাটি থেকে সৃষ্টির কথাই বলেন। মনে হয় কবি- ‘মিনহা খালাকনাকুম, ওয়া ফিহা নুয়ীদুকুম, ওয়ামিনহা নুখরিজকুম তা’রাতান উখরা’র কাছে নিজেকে সমর্পন করলেন। বার বার মাটির দোহায় টেনে মানুষের বড়ত্বকে দাঁড় করাতে চেয়েছেন। ইবলিশের আগুনের বড়াইটাকে মাটির কাছে পুঁতে দিতে আদমের বংশধরকে ছুঁড়ে দিলেন এক প্রশ্নবোধক চিহ্নে। যে প্রশ্নবোধক যতিচিহ্নই পাঠককুলকে ভাবাবে নিশ্চিত। কবির শেষ চার চরণের কাছে আমার যে বিস্ময় জেগেছে তা যেন সব পাঠকের আঁতে লাগে। তাই দিয়ে শেষ করছি মহাকাব্যের শেস স্তুতি। থিতু না হয়ে এসো গতিশীল হই কবির এই যতিচিহ্নে। কবির ভাষায়-
এ তো শুধু বালু নয় শুধু এরি নাম মাটি
মাটি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি তবু এতো খাঁটি
হাত দিয়ে তুলে আনে যারা বালুকণা
তারা কি দেখতে পায় কাকে বলে সোনা?

এক বিস্ময়ের যবনিকাপাত মনে হলেও নতুন বিস্ময়ের কাছে যেন বাংলাসাহিত্যকে নিয়ে গেলেন কবি আল মাহমুদ। কবির বিশ্বাসের কাছে থিতু হয়ে সর্বোচ্চ মাকামের চূড়ায় যেনো কবির আসন গেঁড়ে থাকে তারই নন্দনকানন পেয়েছি এই মহাকাব্যে। কবির সারা জীবনের অর্জন থলি যেন এ মহাকাব্য বয়ে বেড়াচ্ছে। কবিতার বিদেহী আত্মার সাথে কবির আত্মার আসনে উড়িয়ে দিলেম বিশ্বাসে গেঁথে থাকা মাগফেরাতের অঞ্জলি, শান্তিসুখের শ্বেত পাখিটার প্রবাহমান ছায়া। যে ছায়ার কামনায় কবি আঁকড়ে ধরেছিলেন বিশ্বাসের পুরো রুজ্জু।