‘রিঅ্যাকশনারি’ বলতে লোকে প্রতিক্রিয়াশীল বোঝে। কিন্তু কিসের প্রতি প্রতিক্রিয়াশীল? সংজ্ঞাটি স্পষ্ট করতে চাই। প্রগতি বলে একটি চলিষ্ণু, আবহমান ধারণা আছে, যার শ্রেষ্ঠ সংজ্ঞা দিয়েছেন Jacob Bronowski১, Progress is the exploration of our own errors. এক কালে সবাই বিশ্বাস করতো পৃথিবী সমতল, এক কালে লোকে বিশ্বাস করতো মহাকাশ-মহাশূন্য এক দৈবী এলাকা, এক কালে মেয়েদের ডাইনী বলে পোড়ানো হতো, দাসপ্রথা ছিলো, সাম্য এবং মানবিক অধিকার নিয়ে সংগ্রাম এখনো আবহমান, রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক-জিওপলিটিকাল অসামঞ্জস্য ও অবিধানের প্রতি সংগ্রাম এখনো চলমান এবং ভবিষ্যতে চলবে যতোদিন মানুষ টিকে থাকবে। ব্যক্তির এবং সমাজের ত্রুটির সমাধানের চেষ্টা প্রতি মুহূর্তে সক্রিয়। যুগের পর যুগ ব্যক্তি এবং সামগ্রিক মানব সমাজ ভুল সংশোধনের মধ্যে দিয়েই শ্রেয়তর সমাজ, জীবন ও চেতনায় ক্রমাগত এগিয়ে চলেছে। সক্রেটিস এবং তাঁর পূর্বজদের থেকে শুরু করে, রুমী, ইরাসমাস, গ্যালিলিও, নিউটন, মার্কস এবং একালে প্রকৃতি বিষয়ে বিজ্ঞানীরা, মানব-সমাজ বিষয়ে নেওম চমস্কি-র মতো সজ্ঞানীরা যথেষ্ট সক্রিয়। কবিরাও সর্বকালে প্রগতির মনীষীদের সহচর। Bronowski যা বলেছেন, তার প্রায় সমান্তরাল উচ্চারণ করেছেন আমাদের কবি জীবনানন্দ কবিতার আধুনিকতা প্রসঙ্গে- “নতুন সময়ের জন্যে নতুন, ও নতুনভাবে নির্ণীত পুরোনো মূল্য, নতুন চেতনা ও নতুনভাবে আবিষ্কৃত পুরোনো চেতনার যে একান্ত দরকার শিল্পে ও জীবনে”২ ; “আমরা যাকে সত্য বলে বুঝে নিয়েছি সেইটেই প্রামাণিক জিনিস কিনা, না আমাদের মানুষী বিচার ও অনুভূতির ভুল এ নিয়ে দার্শনিকরা শেষ দিন পর্যন্ত আলোচনা করবেন… এইসব প্রচলিত সত্য নব যুগের মতন লৌকিক বুদ্ধি ও মনীষীদের অভিচেতন মূল্যানুসন্ধানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যে নবীন তনুলোক নিয়ে বিচরণ করে সেই তন্বীদের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে মিলিত না হতে পারলে আধুনিক কালে সৎ কবিতা সৃষ্টি করা সম্ভব হয় না”৩। প্রগতির এই ধারণার বিরোধী চিন্তাকেই আমি ‘রিঅ্যাকশনারি’ বা প্রতিক্রিয়াশীল বলছি।

আল মাহমুদ ধর্মের প্রতি বোধ নিয়ে ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’৪ গ্রন্থ থেকে তার পরের বই সমূহে বেশ কিছু কবিতা লিখেছেন। এর বাইরেও যুদ্ধ প্রবণতা, অন্য ধর্মী এবং নারী প্রগতির বিরুদ্ধে কবিতা তৈরী করেছেন। ধর্মবোধ নিয়ে ইতিহাসে কবিতা লেখা হয়েছে– বাংলায় কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ লিখেছিলেন। অন্য ভাষাতেও হয়েছে। ক্লাসিক কবিরা লিখেছেন – ফারসিতে মৌলানা রুমী, হাফিজ, ফরিদউদ্দীন আত্তার; ইতালীয়ানোতে দান্তে; ইংরেজিতে জন ডান; স্পানীশে সেন্ট জন। এমনকি আধুনিক কবি, পেরুর সেসার ভায়্যেহো কিছু কবিতা মার্কসীয় এবং খ্রিস্টীয় বোধ মিশিয়ে লিখেছেন বিশ শতকের তিরিশের দশকে। কিন্তু এঁরা মূলত মানুষকে ভালোবাসার কবিতা লিখেছিলেন এবং সামাজিক-বৈজ্ঞানিক বিবর্তনের, প্রগতির বিরুদ্ধে লেখেন নি। এখানে আলোচনার বিষয় আল মাহমুদ-এর এই সব কিছু কবিতা যা তিনি সোনালি কাবিন-এর পরে লিখেছেন।

মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো, ১৯৭৬ থেকেই তাঁর মানসিক-সামাজিক-রাজনৈতিক চিন্তার সমূহ পরিবর্তন ঘটে। তাঁর এ বিবর্তনের শুরুর থেকে উদ্ধৃতি :
পৃথিবীর সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থটি বুকের ওপর রেখে
আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হয় এ ছিলো সত্যিকার ঘুম
কিংবা দুপুরে খাওয়ার পর ভাতের দুলুনি। আর ঠিক তখুনি

সেই মায়াবী পর্দা দুলে উঠলো …

আমার মনে হলো, কানে তালা লাগানো প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে
কারাগার ভেঙে পড়ছে। আমি চীৎকার করে
বিছানায় লাফিয়ে উঠলাম। আমার বুকের ওপর থেকে
উজ্জ্বল গ্রন্থটি গড়িয়ে পড়লো বালিশে।
চারিদিকে বিশাল বিম, ইট, সুরকীতে আমার কামরা
আচ্ছন্ন হয়ে গেলো। যেন দৈবক্রমে আমি রক্ষা পেয়েছি।
এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আমার খাটটাকে মনে হলো
নূহের নৌকা।
[মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো (মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো)]
এই কবিতাটিকে আরেকটু বিস্তার করে দ্যাখা দরকার। পৃথিবীর সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থটি বুকের ওপর রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন কবি। যেই সেই মায়াবী পর্দা দুলে উঠলো, প্রচণ্ড বিস্ফোরণে কারাগার ভেঙ্গে পড়লো। আল্লার আদেশ বিনা তিনি বাইরে বেরুতে পারেন না। ধর্মগ্রন্থটির একটি আয়াত লক্ষ্য করে, আদেশপ্রাপ্ত, তিনি বাইরে এসে দেখলেন শহরের সব বিনষ্ট, ধ্বংসপ্রাপ্ত। তিনি শহরের কেন্দ্রে এসে দেখলেন লোহার কামান পুরোই বারুদে ঠাসা। কবি ধর্মগ্রন্থে চুম্বন করে, পকেটের থেকে শেষ দেশালাই বার করে কামানের সলতে জ্বালিয়ে সরে এলেন। বারুদ আর গন্ধকের মহা ওঙ্কার ধ্বনিতে নগর বিদীর্ণ হলো। তিনি ধ্বংসের ওপর রাখা আল্লার আদেশ তুলে নিয়ে কোথাও পালাবার জন্য উদ্যত হলেন। এই হলো কবিতার গল্প। আল মাহমুদের এই কাহিনীর উদ্দেশ্য এবং সারার্থ বুঝতে পারি। এই রকম চেতনা নিয়েই সম্ভবত আল-কায়েদা বিভিন্ন রকম সংহার প্রকল্প চালিয়েছিলো।

বখতিয়ারের ঘোড়া গ্রন্থের নাম কবিতাটিও জেহাদের আহ্বান। “মনে হয় রক্তই সমাধান, বারুদই অন্তিম তৃপ্তি”। অন্য আরেকটি কবিতায় লিখেছেন, “সত্য ও মিথ্যার লড়াইয়ে আমরা হকের তালিকায় লিপিবদ্ধ”। এই ধরণের উচ্চারণ, সব সময় শুভ-অশুভর ছুতো ধরে যুদ্ধের চীৎকার। জয় নিশ্চিত কেননা ঈশ্বর তাদের পক্ষে।
এই জাতীয় আরো কিছু দীর্ঘ গদ্য কবিতা আছে মাহমুদের এই পর্যায়ে– চক্রবর্তী রাজার অট্টহাসি, অনন্তের গান, অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না– যেগুলো সবই বড় বেশী আত্মজৈবনিক, ইশতেহারপ্রবণ। প্রগতির পশ্চাদ্মুখী কিছু কবিতার নমুনা-
১. জেহাদ বাসনার পদ্য
মাঝে মাঝে হৃদয় যুদ্ধের জন্য হাহাকার করে ওঠে
মনে হয় রক্তই সমাধান, বারুদই অন্তিম তৃপ্তি।
আমি তখন স্বপ্নের মধ্যে জেহাদ, জেহাদ বলে জেগে উঠি।


আজ আবার হৃদয়ে কেবল দামামা
মনে হয় রক্তেই ফয়সালা।
বারুদই বিচারক ; আর
স্বপ্নের ভেতর জেহাদ, জেহাদ বলে জেগে উঠি।
[বখতিয়ারের ঘোড়া, (বখতিয়ারের ঘোড়া)]

২. অন্য ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধচারণের পদ্য
অনিষ্টকর অন্ধকারে যখন পৃথিবী আচ্ছন্ন হয়ে যায়। চারিদিকে ডাইনীদের
ফুৎকারের মত হাওয়ার ফিসফাস,
আর পাখিরা গুপ্ত সাপের আতঙ্কে
আশ্রয় ছেড়ে অন্ধকারে ঝাঁপ দেয়, ঠিক তখুনি, ইহুদিরা হেসে ওঠে।
[ইহুদিরা, (অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না)]

৩. সঙ্গীতের বিরুদ্ধে পদ্য
আমারও বাসনা জাগে সঙ্গীতের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে।
পশুর পর্দার ছাওয়া খঞ্জনিটাকে ফুটো করে দিয়ে
ধবল ডানার মতো কবিতার শব্দ সিড়ি বেয়ে
উঠে যাই আকাশের মেঘের গম্বুজে।
বাদ্যহীন বাক্যবন্ধে নিবেদিত হোক আজ আমার প্রার্থনা।
না আমি ভালোবাসি না গান।


আমি চাই যন্ত্রের আমূল উচ্ছেদ। বেহালার ছড়
মানুষের উদ্গত উচ্চারণে কতটুকু প্রলেপ বোলাবে?


আমার আত্মাকে আমি রুজু করি সেইমতো
পিয়ানোর প্যাঁদানো ছাড়াই।
[যে ভালোবাসে না গান, (বখতিয়ারের ঘোড়া)]

৪. নারী প্রগতির বিরুদ্ধে পদ্য
নারী?
না এখন কোনো বিষয় নয় নারী।


তোমাকে শাড়ি পরিয়ে দিতে চাই আমরা।
তুমি কি অন্তত একটা শতাব্দীও বিশ্রাম নিতে পারো না?
পারো না কি বোরখার ফুটো দিয়ে
বাণিজ্য বাতাসের আনাগোনা দেখতে?
[ সম্মতির সঙ্কেত, (আরব্য রজনীর রাজহাঁস)]
আজ বাতাসের
ঝাপটা থেকে তোমার উড়ন্ত চুলের গোছাকে
ফিরিয়ে আনো মুঠোর মধ্যে। বেণীতে বাঁধো
অবাধ্য অলকদাম।
কেন জিনেরা তোমার কেশ নিয়ে খেলা করবে?


তোমার আব্রু ঠিক করে নাও। এইতো ছতর ঢাকার সময়।
কোথায় হারিয়ে এসেছো তোমার বুকের
সেফটিপিন?
আজ ইবলিশকে তোমার ইজ্জত শুঁকতে দিও না।


ঢাকো তোমার মুখ। কারণ
নগরের নকীবেরা এখন দাজ্জালের আগমনশিঙায়
ফুঁক দিচ্ছে।
ঢাকো তোমার বুক। কারণ
সত্য ও মিথ্যার লড়াইয়ে আমরা
হকের তালিকায় লিপিবদ্ধ।
[নীল মসজিদের ইমাম, (বখতিয়ারের ঘোড়া)]
ভাবতে অবাক লাগে, মাহমুদ-এর জন্য সংগীতও নাপসন্দ এবং নারীদের তিনি বোরখায় মুড়ে রাখতে চান। জেহাদ, ক্রুসেদ, ধর্মযুদ্ধ, জাতি-বিরোধিতা, নারী প্রগতি-বিরোধিতা- এগুলো কি বিশ-একুশ শতকের কবিতার বিষয় হলো? এগুলোই কি কোনো কবির কাছে প্রত্যাশিত? উল্লিখিত কবিতাগুলো এবং উদ্ধৃতি মা্নুষের প্রগতির– তার ঐতিহাসিকভাবে আত্মবিশোধনের ক্রমিক প্রচেষ্টার প্রকট-বিরোধী।
১৯৭৬ এর পর তাঁর লেখা গদ্য কবিতাতে বিষয় ও শিল্প উভয় মাত্রাতেই খুব কম কল্পনা-প্রতিভা পাই। অভিজ্ঞতার উদারতাম সারবত্তার চেয়ে এক ধরণের ম্যানিফেস্টোর প্রবণতা। বরং এ পর্যায়েও তাঁর সনেটগুলো পড়ার মতো, যেমন কবি ও কালো বিড়ালিনী-১,২,৩/(মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো)] এবং ৪টি সনেট/(বখতিয়ারের ঘোড়া)।

বিশ্বাসের বড়ো পরিবর্তন হলে পাঠকের ক্ষেত্রে একটা সমস্যা হয়। তখন বিশ্বাস-১ এর কবিতা এবং বিশ্বাস-২-এর মধ্যে বিরোধ বাঁধে। কোন্ বিশ্বাসের কবি আসল? সেই প্রশ্নের সহজ সমাধান সব সময় হয় না এবং বিশেষ করে কবিতার গুণ যদি আদি বিশ্বাসের সাহিত্যেই বেশি থেকে থাকে। না, বিশ্বাস পরিবর্তনও মূল সমস্যা নয়। বিশ্বাস যে কেউ পাল্টাতেই পারে; তবে সেই পরিবর্তন যদি বৃহত্তর ইতিহাস-ঐতিহ্য-প্রগতির ক্রমানুসরমান তালের সঙ্গে মিলে এগোয়। উদাহরণ দিয়ে বলি: কেউ যদি পুরোনো ধারণা বাদ দিয়ে হঠাৎ ফ্যাসিস্ট, বা খুনের প্রশংসায়, বা নারী নির্যাতনবাদী সাহিত্য রচনা করতে শুরু করেন, আমরা কি সেগুলো সৎ কবিতা বলবো? ধর্মালোকিত হয়ে কবিতা অবশ্যই লেখা যেতে পারে। তবে তাঁর জন্য বোধহয় জালালউদ্দীন রুমি, ফরিদউদ্দীন আত্তার-হাফিজ এদের ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী ভালোবাসা এবং সমগ্র মানবজাতির একাত্মীকরণের কবিতার সাধনাই শ্রেয় কেননা তার মধ্যে সারবত্তার অনুসন্ধান আছে, কল্পনা প্রতিভার অন্তরদীপ্তিও সম্ভব।

গ্রন্থপঞ্জী
১ Jacob Bronowski, The Origins of Knowledge and Imagination, Yale University Press, 1978
২, ৩ জীবনানন্দ দাশ, কবিতার কথা, সিগনেট প্রেস, ১৩৭৯