ভাষা আন্দোলন অংশ নিয়ে যে যুবক কবিতা লিখে ফেরারি হয়েছিল বাহান্নে, আজীবন সে মাতৃভাষার পরিতুষ্টি করে সমৃদ্ধ করেগেছেন ভাষার দাবীকে, তিনি আর কেউ নন, তিনি বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি আল-মাহমুদ (জন্ম : ১১ জুলাই, ১৯৩৬-মৃত্যু: ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯)। বাংলা সাহিত্যের
একজন খ্যাতিমান কবি ও কথাশিল্পী । কবিতার বাইরে বাংলা ছোটগল্পের ধারায় উপস্থাপনের কলাকৌশলে আল মাহমুদ একজন প্রথিতযশা কথাকার হিসেবেও চিহ্নিত।
‘আল মাহমুদের ছোটগল্প বিষয়ভাবনা’ গ্রন্থটি ড. ইয়াহ্ইয়া মান্নান ও তাজুল ইসলামের যৌথ গবেষণা। এতে সমসাময়িক পরিপ্রেক্ষিত, বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্পের ধারা, আল মাহমুদের জীবন ও জীবনদৃষ্টি এবং তার ছোটগল্পের উপজীব্যসমূহ আলোচিত হয়েছে। গবেষকদ্বয় আল মাহমুদের ছোটগল্পের বিচিত্র বিষয়কে পাঠকের রসাস্বদনের উপযোগী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তবে কে কোন অংশটি করেছেন, তা পষ্টভাবে চিহ্নিত নেই। কৌতুহলী পাঠকের কাছে এটা জিজ্ঞাস্যও বটে। সূচিপত্রে গ্রন্থিত হয়েছে – ভূমিকা, প্রথম অধ্যায় : পরিপ্রেক্ষিত, দ্বিতীয় অধ্যায় : বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্পের ধারা। তৃতীয় অধ্যায় : আল মাহমুদের জীবন ও জীবনদৃষ্টি। চতুর্থ অধ্যায় : আল মাহমুদের ছোটগল্প : বিষয়ভাবনা। উপসংহার এবং সবশেষে গ্রন্থপঞ্জি।

বাংলা সাহিত্যের পঞ্চাশের দশকের এ অমর কবি ও কথাশিল্পীর প্রকাশিত হয়েছে প্রায় ৯টি গল্পগ্রন্থ।
১. পানকৌড়ির রক্ত (১৯৭৫)
২. সৌরভের কাছে পরাজিত (১৯৮২)
৩. গন্ধবণিক (১৯৮৮)
৪. ময়ূরীর মুখ (১৯৯৪)
৫. নদীর সতীন (২০০৪)
৬. সময়ের সাক্ষী (২০০৫)
৭. আল মাহমুদের গালগল্প (২০০৬)
৮. ছোট-বড় (২০০৬)।
৯. চারপাতার প্রেম (২০০৯)
যা একসাথে গল্প সমগ্র ১, ঢাকা অনন্যা, ১৯৯৭এ এবং গল্প সমগ্র ২, ঢাকা অনন্যা, ২০১১ সালে প্রকাশিত হয়। আল মাহমুদের সাহিত্য জীবন শুরু হয়েছিল মূলত ছোটগল্প লিখে। ১৯৫৪ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক সত্যযুগ’ পত্রিকায় তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। তারপর দীর্ঘদিন তিনি গল্প লেখায় বিরতি দেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী কালে ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’ পত্রিকা সম্পদনার সময় তিনি বেশ কিছু ছোটগল্প লিখেন। গল্পগুলো প্রকাশিত হলে সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন তিনি শুধু একজন শক্তিমান কবিই নন- একজন অভিজ্ঞ ও সরস গদ্যকারও বটে।
তাঁর ছোটগল্পে বাংলাদেশের সমাজ, নিসর্গ ও জনজীবনই ভিত্তিভূমি হিসেবে ঠাই পেয়েছে। বাংলা ছোটগল্পের ক্রমবিকাশের ধারায় তার ছোটগল্প সাফল্যমণ্ডিত ও শিল্পরীতির দিক থেকে স্বতন্ত্র। আল মাহমুদ প্রকৃতি ও নারীকে স্থান দিয়েছেন তার সাহিত্যে সবার উপরে। ছোটগল্পে জীবনের বৈচিত্র্য ও বিস্তৃতি নানাভাবে সাধিত হয়। অনেকেই জীবনের নানা তাৎপর্যবাহী বিচার বিশ্লেষণে তৎপরতায় জীবনকে দেখেছেন। কিন্তু আল মাহমুদ সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী। তিনি কথাশিল্পের প্রচলিত ধারাবাহিক প্যাটার্ন থেকে বের হয়ে প্রকৃতি ও নর-নারীর দৈহিক প্রেমচেতনাকে শিল্পরূপ দিয়েছেন বিশেষ অন্তরাত্মায়। প্রকৃতি, নদী-নালা, খাল-বিল, দিগন্ত বিস্তারিত বিস্তারের মধ্যেই তিনি তাঁর শিল্পজগৎকে খুঁজে নিলেন। এজন্য তাঁর ছোটগল্পে সমাজ ও জীবনের রূপায়ণ অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে বিকশিত হয়েছে। নর-নারীর যৌন জীবনের কারুময় বর্ণনা আল মাহমুদের গল্পে বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। নর-নারীর প্রেম তার চোখে প্রধানত জৈবিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। তাঁর গল্পের নায়করা প্রচণ্ড যৌনাবেগে তাড়িত, নায়িকার শরীরেই তাদের সমস্ত স্বস্তি ও প্রশান্তি।
তার গল্পে নারীকে নির্মাণ করা হয় পুরুষের অপর পিঠ হিসেবে। তার গল্প সম্বন্ধে সবচেয়ে বড় কথাটি হলো তিনি মানুষের মনোজগৎকে ধরতে পেরেছেন নিখুঁতভাবে। নর-নারীর মনোজগতের আবেদন তিনি বারবার গল্পে তুলে ধরেছেন। বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরে এতগুলো শিল্পসফল লিবিডো চরিত্র একমাত্র আল মাহমুদের বর্ণনাতেই ধরা দেয়। সত্তরের দশকে প্রকাশিত ‘পানকৌড়ির রক্ত’ (১৯৭৫), আশির দশকে প্রকাশিত ‘সৌরভের কাছে পরাজিত’ (১৯৮৩),’গন্ধবণিক’ (১৯৮৬) প্রভৃতি গ্রন্থে নর-নারীর জটিল যৌন জীবনের বিচিত্র আলোড়ন তার মনস্তাত্ত্বিক সংকট তথা মনোবিকলনের নানা অনুষঙ্গ আল মাহমুদের গল্পে শিল্পরূপ লাভ করেছে।

মুক্তিযুদ্ধের বিশাল পরিপ্রেক্ষিতকে বাস্তবতার আলোকে তিনি ‘বকুল ঝরার ভারের’ গল্পে ধারণ করেছেন। বর্ণনা করেছেন পাক-হানাদার বাহিনির অত্যাচার, নির্যাতন ও লুণ্ঠনের ইতিহাস এবং বাঙালির প্রতিরাধে প্রচেষ্টার প্রাণান্ত কৌশল।
তার গল্প পড়লে একবারও মনে হয় না তিনি কোরনা অসম্ভব বা কাল্পনিক কাহিনিকে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন। তার প্রত্যেকটি গল্পের বিষয়, চরিত্র, কাহিনি ও পরিবেশ আবহমান বাংলার চিরায়ত প্রতিচ্ছবি। মানুষ ও প্রকৃতির প্রতি পরম ভালবাসায় আপ্লুত আল মাহমুদ সবার অগোচরে বাংলা ছোটগল্পে নিয়ে এসেছেন পালাবদলের ঢেউ।
আল মাহমুদের ছোটগল্প : বিষয়ভাবনায় এ বিষয়গুলো চিহ্নিত হয়েছে। তিনি এ পর্যন্ত যে সব গল্প লিখেছেন তার অধিকাংশই শিল্পসফল। তাছাড়া এ সময় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তার ‘পানকৌড়ির রক্ত’, কালোনৌকা, জলবেশ্যা’ প্রভৃতি ছোটগল্পগুলি যখন প্রকাশিত হয়। বিশেষ করে ১৯৭৫ সালে তাঁর প্রথম ছোটগল্পের সংকলন পানকৌড়ির রক্ত প্রকাশিত হলে তিনি বিপুল পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেন। আল মাহমুদ ছোটগল্প লিখেছেন ধীরে সুস্থে। খ্যাতি ও প্রশংসার জন্য তিনি গল্প লেখেননি। তিনি এ পর্যন্ত যে কয়টি গল্প লিখেছেন সবই সুপরিকল্পিত ও সুচিন্তিত – সেদিক থেকে তিনি কবিতা না লিখেও শুধু গদ্যসাহিত্য নিয়েই
বাংলা সাহিত্যে বেঁচে থাকতেন। একজন কবিও যে বড় কথাশিল্পী, ঔপন্যাসিক ও গদ্যরচয়িতা হতে পারেন তার স্ব প্রমাণ আল মাহমুদ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১), কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬), জীবনানন্দ দাশ।(১৮৯৯-১৯৫৪), জসীম উদ্দীন (১৯০৪-১৯৭৬) প্রমুখ বড় কবিদের মতো তিনিও অনবদ্যভাবে গদ্যসাহিত্য রচনা করেছেন। এবং গদ্যসাহিত্যের মধ্যে এক ধরনের নতুন গদ্যধারা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন।
মানব জীবনে যৌনতা, প্রেম-ভালবাসা, কামনা-বাসনা একটি অপরিহার্য দিক। এটিকে অস্বীকার করে কথাসাহিত্য রচনা করা লেখকদের জন্য বেশ কঠিন কাজ। আল মাহমুদ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে, দৃঢ়তার সাথে মানব জীবনের সেই যৌনতাকে তুলে ধরেছেন- ‘পানকৌড়ির রক্ত’, ‘নিশি বিড়ালীর আর্তস্বর’, ‘গন্ধবণিক’, কালোনৌকা’, ‘জলবেশ্যার মতো প্রভৃতি গল্পে। বিশেষ করে পানকৌড়ির রক্ত’ গল্পে লেখক যেভাবে যৌনতাকে কাব্যিক বর্ণনার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন তা পাঠককে মুগ্ধ করে- ‘আমি বন্দুক তুলে তাক ঠিক করলাম । আমার ডান চোখের মণিতে বন্দুকের মাছি আর পাখিটার প্রসাধনরত কালো শরীর এক বিন্দুতে এসে মিশতেই আমি শরীরটাকে, বিশেষত আমার কোমর আর হাতকে স্থির রাখতে চেষ্টা করলাম ।’
এই বক্তব্য শুধু একজন শিকারীর বক্তব্যই ফুটে ওঠেনি বরং এক প্রকার মনোজাগতিক কামনা-বাসনা ফুটে উঠেছে। ‘সৌরভের কাছে পরাজিত’ গঙ্গে মানুষের বিশ্বাসময় অধ্যাত্মবাদ ফুটে উঠেছে। ‘একটি চুম্বনের জন্য প্রার্থনা’ গল্পে স্রষ্টাপ্রেম ও হজরে আসওয়াদ চুম্বনের জন্য শিল্প আকৃতি স্বর্ণালি হয়ে ঝরে পড়েছে। সামাজিক অবক্ষয়, অসঙ্গতি, শাসন-শাষোণ, নিপীড়ন, যৌনতা যেমন তার গল্পে রয়েছে তেমনি রয়েছে প্রেম ও অধ্যাত্মবাদ। তবে পানকৌড়ির রাত, সৌরভের কাছে পরাজিত, গন্ধবণিক, ময়ূরীর মুখ, নদীর সতীন প্রভৃতি গল্পগ্রন্থে।
আল মাহমুদের ছোটগল্প : বিষয়ভাবনা’য় এ সব আলোচনা প্রাসঙ্গিক ভাবে চলে এসেছে। গবেষণা প্রবন্ধের বারোয়ারী ধারায় বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্পের ধারা ও আল মাহমুদের জীবন ও জীবনদৃষ্টি এতো দীর্ঘ পরিসরে আলোচনা সাধারণ পাঠকের জন্য কিছুটা ক্লান্তিকর। তবে সাহিত্যের নিবিড় পাঠে অভস্ত্যতা যাদের আছে তাদের জন্য তথ্যবহু আলোচনা হিসেবে চিহ্নিত হবে। মননশীল এ আল মাহমুদ চর্চা চরম ভালোবাসারই প্রকাশ বটে সাহিত্য শিল্পচর্চা বৈশ্বিক যুগে। ধন্যবাদ গবেষক দ্বয়কে।

পরিলেখ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বইটির মূল্য: ২৭০ টাকা মাত্র। বইটি পাওয়া যাচ্ছে একুশে বইমেলায় পরিলেখ প্রকাশনী ৭১৩ নাম্বার স্টলে। এছাড়াও ঘরে বসে পেতে হলে যোগাযোগ করুন ০১৭২২৮৭৬৭২২ নাম্বারে।