আসলাম প্রধান একজন কবি ও সময় সচেতন ছড়াকার। সাহিত্যের আঙিনায় তার পরিচিতি বেশ প্রসারিত । গল্প, কবিতা, ছড়া ও গান লিখায় কবি অতি পারদর্শী। সময়কে ধারণ করে লিখতে জানেন তিনি। কবিকে নিয়ে আজকের এই ছোট্ট আয়োজন।

কবি আসলাম প্রধান ১৯৬৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর নানাবাড়ি বগুড়াতেই।

গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলাধীন বোনারপাড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত কালপানি নামক গ্রামে তাঁর পৈত্রিক নিবাস। তাঁর পিতা মরহুম আব্দুল গনি প্রধান বোনারপাড়া কাজী আজহার আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের স্বনামধন্য শিক্ষক ছিলেন। মা মরহুমা নাজমা বেগম ছিলেন গৃহিনী।

কবি কালপানি প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়েছেন। পরে বোনারপাড়া প্রাইমারি স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাশ করেন। এরপর বোনারপাড়া কাজী আজহার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সনদ অর্জন করেন। অত:পর গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে বিএসএস পাস করেন ।

কবি আসলাম প্রধানের শিক্ষাজীবন বৈচিত্র্যপূর্ণ ! তিনি কখনও ছিলেন ছাত্র, কখনও কৃষক, কখনও রাখাল, কখনওবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। সংগ্রাম করেই শিক্ষাজীবন শেষ করেন তিনি।

উপার্জনশীল বাবার মৃত্যুর পর সাত ভাই বোনের মধ্যে তিনি হয়ে পড়েন একমাত্র উপার্জনশীল । অন্যদিকে মা আমৃত্যু দুরারোগ্য রোগে শয্যাশায়ী থাকায় পরিবারের সকল সংকট মোকাবেলা করতে হয়েছে তাঁকেই ! তাই, লেখাপড়ায় আর বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেননি তিনি।

কৈশোর থেকেই লেখালেখিতে তাঁর হাতেখড়ি । ছোটবেলা থেকেই শখেরবশে লিখতেন ছড়া কবিতা। লিখতেন নিয়মিত। ব্যক্তিগত জীবনে নানাবিধ প্রতিকুলতার মধ্যেও থেমে থাকেনি তার সাহিত্য চর্চা। দেশের শীর্ষ দৈনিক, মাসিক, পাক্ষিক, সাপ্তাহিক ছাড়াও নানা পত্র-পত্রিকায় এবং বিটিভিতেও নিয়মিত সাহিত্য চর্চা করে চলেছেন কবি। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আছেন। আসলাম প্রধান বাংলা একাডেমীর একজন সদস্য।

ছড়া, কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ ছাড়াও তিনি অনেক গানও লিখেছেন! তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভূক্ত গীতিকার। “অট্টালিকার পাশে তোর বস্তিঘর” শিরোনামে তার একটি গানের অডিও অ্যালবামও বের হয়েছে।

সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য কবি “সূফী মোতাহার সাহিত্য পুরস্কার ২০১২-১৩” লাভ করেন। এছাড়াও বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠন কর্তৃক আরও অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। কবির প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা তেরটি। বাংলাদেশের বন্যা, বর্তমান সমাজ, ছন্দপ্রলাপ, আমি নির্দোষ নই, পদ্যবিলাপ, উল্টোপাল্টা বক্তব্য, আজেবাজে গল্প, গানের কথা, খামখেয়ালী, হাওয়াই মিঠাই, হরেকরকম কাণ্ড, ছড়ার ভেতর গল্প, ঠোকর প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।

কবি আসলাম প্রধান ১৯৯৩ সালে গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার জগদীশপুর গ্রামে বিয়ে করেন! স্ত্রী আম্বিয়া বেগম এবং আবিদ উল আহাদ নামের এক পুত্র সন্তানকে নিয়ে তার ছোট্ট সুখী পরিবার। বর্তমানে তিনি ঢাকা ওয়াসাতে কর্মরত আছেন।

ভ্রমণপিপাসু কবি দেশের প্রতিটি জেলায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশও সফর করেছেন তিনি। এছাড়াও কবি ২০১৪ সালে পবিত্র হজ পালন করেন।

কবি সাম্প্রতিক “বুড়োতোষ ছড়া” শিরোনামে সময়োপযোগী গণমুখী ছড়া লিখছেন। নিজেকে তিনি বুড়োতোষ ছড়ার জনক বলে দাবি করেন। কবির কয়েকটি বুড়োতোষ ছড়া নিয়ে আমার এই ছোট্ট আয়োজন।

কবি আসলাম প্রধান সময় সচেতন একজন ছড়াসাহিত্যিক। শিশুদের ঘুম পাড়ানো থেকে শুরু করে বর্গীদের তাড়ানো পর্যন্ত ছড়ার ভুমিকা বেশ জোড়ালো। লিখিয়েদের প্রায় সকলেই ছড়া দিয়ে শুরু করেছেন তাঁর সাহিত্য সাধনা। কবি আসলাম প্রধানও তার বাইরে নন। সময়কে ধারণ করে ছড়া লিখতে পারেন তিনি। সাম্প্রতিক বুড়োতোষ ছড়া শিরোনামে তিনি লিখছেন বেশ! বাস্তবতাকে সামনে রেখে উপমা আর উপস্থাপনায় বেশ পারদর্শী কবি। কবির কয়েকটি বুড়োতোষ ছড়া নিয়ে সামান্য আলোচনা করতে প্রয়াস পাব আশাকরি।

টাকা মানুষের অমূল্য সম্পদ। টাকা ছাড়া কিছুই হয়না জগতে। টাকাই যেন সব কিছু। তাই টাকা মানুষের খুব বেশি প্রয়োজন। যে কোন বিপদ- মুসিবতের মোকাবেলা করতে টাকার দরকার হয়। টাকা না থাকলে যেন একজন পুরুষের কোমরখানা বাঁকা হয়ে যায়। টাকার অভাবে সে হয় অচল, অথর্ব। জীবন চলার সব ক্ষেত্রেই টাকা হয়ে ওঠে মান ইজ্জতের হাতিয়ার। লেখালেখি, প্রেম ভালোবাসা, সেবা, চিকিৎসা, শ্রাদ্ধ কিংবা চল্লিশা যাই বলিনা কেন সবার আগে চাই টাকা। খোঁচা দিয়ে কবি তাঁর বুড়োতোষ ছড়ায় টাকার প্রয়োজনীয়তা ফুটিয়ে তুলেছেন “ট্যাকার ঠ্যাকা” কবিতায়। কবির ভাষায়-
সব্বাই চেনে ট্যাকা
ট্যাকার বড্ড ঠ্যাকা-
এই ঠ্যাকাতে পড়েই কারো
কোমরখানা ব্যাঁকা !
চলতে ফিরতে শরীর কাঁপে
উৎকন্ঠা, মানসিক চাপে
অল্পবয়সে বৃদ্ধ হয় সে
খায় সে ভ্যাবাচ্যাকা !
মূলকারণটা ট্যাকা রে ভাই,
মূলকারণ’টা ট্যাকা !

ডাক্তারখানা অষুধ-পথ্য
সবখানেতে ট্যাকাই সত্য!
কোন কামেতে লাগে বলো
গদ্য-পদ্য ল্যাখা !
যার কাছে যাও, সেই তো জিগায়
আনছো কত ট্যাকা !

‘তোমাকে খুব ভালোবাসি’
প্রেমের বাক্য শুনে হাসি!
পয়সা নাই, তো ভাগ্যে জুটবে
রাজলক্ষ্মীরও ছ্যাঁকা !
তাইতো বলি, শ্রীকান্ত দা,
অমূল্যধন ট্যাকা !

মরার পরে অন্যপারে
থাকবা তুমি একা
শ্রাদ্ধ কিংবা চল্লিশাতে
লাগবে কিন্তু ট্যাকা!
মৃতআত্নার শান্তি দিতে
তোমার মৃত্যুবার্ষিকীতে
আত্নীয় বা বন্ধুবান্ধব
মিলবে নাকো দ্যাখা,
আপনজনদের হাতে যদি
না রেখে যাও ট্যাকা !

আমাদের এই দেশে হরেক রকমের মানুষ আছে। আছে মতোভেদের পাহাড়সম দেয়াল। ক্ষমতার অপব্যবহার আছে সবার হৃদয় মনে। বিশেষ করে রাজনৈতিক অঙ্গনে এর প্রভাব আরো বেশি। ক্ষমতার জোরে একজন পাতিনেতাও হয়ে ওঠে বিশাল একজন। ক্ষমতার অপব্যবহার খাটিয়ে গড়ে তোলেন পাহাড়সম দালান কোঠা, রাজবাড়ি। দৃষ্টিনন্দন সে বাড়ি এক সময় বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেয় পুলিশ বিহিনী। পলিটিক্যাল সাপোর্ট আর কাজে আসেনা তার। ক্ষমতাই সেদিন হয়ে দাঁড়ায় সমস্যার সকল কারণ। ক্ষমতার পালাপদলে পাতিনেতা হয়ে যায় কানাই। মাথা ঘুরতে থাকে। শুরু হয় ধানাইপানাই। দেখে আশেপাশে কোন চ্যালাচামুন্ডা কেউ নাই। সে একা। পুলিশবিহিনী বুলডোজার নিয়ে হাজির বাড়ির সামনে। সময়ের পালাবদলে ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় সাধের দালান কোঠা। আসলাম প্রধানের বুড়োতোষ ছড়া “উচ্ছেদ অভিযান” এ তার বাস্তব জানান পাওয়া যায়। কবির ভাষায়-
পলিটিক্যাল সাপোর্ট আমার
আছে ষোলোআনাই
ভূমি দখল করতে গেলে
কোনো সমস্যা নাই !

অন্য লোকের জমিতে যে’
সাইনবোর্ড’টা টানাই
আস্তে আস্তে- স্বধীনভাবে
দালান-বাড়ি বানাই !

এই বাড়িটা আমার বাড়ি-
দেশবাসীকে জানাই
মনের সুখে কয়েক বছর
বাজিয়ে যাই শানাই !

তারপরে এক দুঃসময়ে
হয়ে গেলাম কানা-ই
মাথাও ভালো কাজ করে না,
করে ধানাইপানাই !

বুলডোজারটা ‘হঠাৎ’ এলে
মুখে আমার রা-নাই
থানা-পুলিশ দেখে- কাছে
চ্যালাচামুণ্ডা নাই !

ঘন্টাখানেক পরেই দেখি
সুখের ঠিকানা নাই-
ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে দেয়
পুরো বাড়িখানাই !

আমরা জানি কবিরা নাকি সময়কে ধারন করেন। লেখেন সময়ের অবস্থানকে উপলব্ধি করে। জানান দেন সচেতন হতে। বর্তমান সময়ের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং তার আলোকে বিচার ব্যবস্থার একটা যোগসাজস খুঁজে পেয়েছেন কবি। ক্ষমতাধরেরা অসহায়দের সাথে কেমন আচরণ করছেন, এ নিয়ে পত্র পত্রিকা কি ধরনের নিউজ করছে, রাজাসনে বসে ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা কেমন উম্মা প্রকাশ করে আনন্দের ঢেকুর তুলছেন তা নিয়েও বুড়োতোষ ছড়া লিখেছেন কবি। টিকটিকি আর সিংহমামার প্রতিদন্ধী ঘটনাকে বেশ ব্যঙ্গময়তার সাথে উপস্থাপন করেছেন তিনি। টিকটিকির বিচার নামের বুড়োতোষ ছড়াটি তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কবির ভাষায়-
যা শুনেছ, ঘটনা সব ঠিকই-
সিংহমামা মেরেছে টিকটিকি!
লালকালিতে করেছে হেডলাইন,
খবরপাড়ার যত্ত সাময়িকী !

রাজাসনে বীরত্বে সে সেরা,
বলছে এটা অবুঝ বালকেরা!
খেতাব দেয়া উচিত কিনা, ভেবে-
কেতাব খুলে বসেছে ভাগ্নেরা !

মাকড়সা ভয়ে দিশেহারা
ঘাড়ে এসে কখন পড়ে পারা!
বিপদ থেকে কী-যে আরাম পেল-
হতচ্ছাড়া, হিংসুটে মশারা!

আঞ্চলিক ভাষায় কবিতা লিখেও বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন কবি আসলাম প্রধান। নিজের এলাকার ভাব ভাষায় কবিতা লিখে জাতিকে জানিয়ে দিয়েছেন গ্রামের ভাষার কদরের কথা। নিজের মায়ের আঞ্চলিক ভাষার সম্মান জানিয়েছেন কবি। নিজের ভাষায়ও যে কিছু লিখেন তিনি তা জানান দিয়েছেন “হামার দ্যাশের আও” নামের গাইবান্ধার আঞ্চলিক ভাষায় লেখা বুড়োতোষ ছড়ায়। কবি তাঁর গ্রামে আসার দাওয়াত দিয়েছেন আমাদের সবাইকে। সময় করে কবির গ্রামের বাড়ি ঘুরে আসব আমরাও। কবির ভাষায়-
হামার দ্যাশের আও
যদিল শুনবার চাও
বোনারপাড়া ইস্টিশনের
পুবের মুরাত যাও,
মোর বাড়ি কোল ওটে-
কওতো একন হামাক এনা
তোমার বাড়ি কোঠে ?

ছুট্টিএনা চাকরি নিয়া
ঢাকাতি মুই থাকোম
ছড়াছুড়ার মোদে কেছো
দ্যাশের ছবি আঁকোম !

দেশকে ভালোবাসা ঈমানের দাবি। এই সবুজ শ্যামল বাংলাদেশের আনাচে কানাচে লুকিয়ে অনেক প্রতিভাধর গুনিজন। আসলাম প্রধান তাদের একজন। তিনি দেশকে ভালোবাসেন হৃদয় দিয়ে। নিজের এলাকাকে নিয়ে গর্ববোধ করেন একান্ত আপনার করে। কালপানি তাঁর গ্রামের নাম। যেখানে বেড়ে উঢেছেন কবি। গ্রামের সুনিনিড় ছায়াতলে যার অবগাহন তাকে কী ভোলা যায় কখনও! না ভুলতে নেই। কবি ভুলেনও না কখনও। কবির গ্রামের তেলিয়ান বিল, নিরিবিলি আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, সবুজের লতাপাতায় ঘেরা মায়াময় যে গ্রামের মাটিতে কবি বড় হয়েছেন তা নিপুনতার সাথে ছড়ায় এঁকেছেন তিনি। গ্রামের কারো সাথে কারো দ্বন্ধ নেই, নেই কাটাকাটি মারামারি। নেই বর্ণবিভেদ আছে ধনী গরিবের মাঝে পারস্পারিক সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশ। জুমার দিনে গ্রামের সবাই মসজিদে যান নামাজ আদায় করতে কবরবাসীর রুহের মাগফিরাত কামনা করেন সবাই মিলে। এখন তার অনেক প্রিয়জনই বেঁচে নাই। তাদের স্বরণ করেন কবি। তাঁর গ্রামে আছে সাহিত্যচর্চা, আছেন জ্ঞানী গুনি বিদ্বানের বসবাস। যে গ্রামের জমিনে হাল চাষ করেছেন তিনি, রাখালী করেছেন গরুরপাল নিয়ে এখন আর সেখানে থাকেন না কবি। শৈশব আর কৈশরের এসব কবিকে খুব করে ভাবায়। কবির ভাবনায় সেই কালপানি গ্রামের চিত্র এখন বিশ্ববাসীর দরবারে উন্মোচিত। কবির বুড়োতোষ ছড়া “কালপানি গ্রাম” এ বেশ করে ফুটে উঠেছে সে দিকটা। কবির ভাষায়-
কালপানি গ্রামে তুমি যাইও
বামনদহের হ্রদে নাইও
অতিথি পাখির দল
খুশিতে কী চঞ্চল-
তেলিয়ান বিলে যেয়ে চাইও
সময় সুযোগ পেলে যাইও ।

গ্রাম তুমি হেঁটে হেঁটে দেখবে
দুপাশে রঙিন, চোখে ঠেকবে
নিরিবিলি মেঠো পথ
আঁকাবাঁকা ছোটো নদ
দেখে খুশিতেই ছড়া লেখবে
লতাপাতা ঘেঁটে ঘেঁটে দেখবে ।

ওই গ্রামে কেটেছিল শৈশব
ভুলি নাই স্মৃতি আজো ওই সব
নদী-বিলে বনজুড়ে
বেড়াতো এ মন উড়ে-
ফেলে আসা দিনরাত কই সব ?
দুরন্ত কৈশোর-শৈশব ?

গ্রামে কোনো বর্ণবিভেদ নেই
মতামত প্রকাশে নিষেধ নেই
পরদেশি যে-ই আসে
কাছে সকলেই আসে
কারো প্রতি সম্মানে ছেদ নেই
ধনী-গরীবের ভেদাভেদ নেই!

খেলাধুলা শিল্প সাহিত্যে
অনেকেই প্রতিযোগী, জিততে-
জ্ঞানী-গুণী-বিদ্বান
আছে হিতাহিত জ্ঞান
মূর্খতা নেই কারো চিত্তে
গ্রামভরা শিল্প সাহিত্যে!

ওখানেই নিজে জমি চেষেছি
চাষি হয়ে গ্রাম ভালবেসেছি
ছিলাম রাখাল ছেলে
কখনো বিলের জেলে
নানা সুখে কত হাসি হেসেছি
সবুজে মধুর ভালবেসেছি!

দাদা-দাদি বাবা-মা’র কবরে
রোজ কেউ যায় খোঁজ খবরে
জুমাবার মসজিদে
তাদেরে সওয়াব দিতে
ফাতেহা দরুদ পড়ে সবরে
কেউ দোয়া করে সব কবরে।

বন্ধুরা যে যে ছিল, আর নেই
যে’ও আছে, যোগাযোগ তার নেই
কেবা জানে কই থাকে
ঝড় এলে বৈশাখে
চাল-চুলা যার হারাবার নেই –
বন্ধুরা যে যে ছিল, আর নেই ।

থাকি আজ বহুদূর শহরে
কত নাম সঙ্গীর বহরে
প্রতিদিন নানাজন
ভালো জানাশোনা হোন
থাকবে কে সাথে শেষ প্রহরে!
গ্রাম ছেড়ে আছি দূর শহরে।

কবি গ্রামের মানুষ। তাঁর গ্রামে বাস করেন দরিদ্র লোকেরাও। সময় তখন রমজান মাস। গরিব হলেও তারা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলেন। রোজা পালন করেন। বাড়ির কেউ রোজা ছাড়েন না। এমন দিনে বেরোজারার মেহমান এসেছেন বাড়িতে। চেংটুর বাপে সকালবেলা টেংরাকান্দি গেছেন কোন কাজে। আসছেন মেহমান কী করবেন বাড়ির মহিলা কর্তী! গরিব মানুষ তারা। তাই মনের মাঝে আফসোস ঠিক তেমনি কষ্টও আছে। বাড়িতে নাই চাউল, নাই তরিতরকারী। পরিবেশটে কেমন যে গুমোট গুমোট ভাব। এমনই বিষাদময় পরিবারের আর্তনাদের চিত্র এঁকেছেন কবি তাঁর বুড়োতোষ ছড়া “য়োজামাসের শাগাই” কবিতার পংক্তিমালায়। গাইবান্ধার আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত কবির অভিব্যক্তি এমনই-
য়োজা মাসোত বে-য়োজদাইরা
শাগাই আচ্চে ঘরোত
চেংটুর বাপে ব্যাংকা গেইছে
টেংরাকান্দি চরোত !

কোন্ সোমে যে আসপে অমো,
এলাও বেলা পাটোত
শাগাইকোনাক এইংক্যা থুইয়া
হাউট্যা যাবে হাটোত !

তাল-তকারি খরচপাতি,
পাল্ল্যাতো নাই চাউল-
চোক্যার পাড়োত বইসা দ্যাখোম
সোগলি আউলঝাউল !

গ্রামের মানুষজনদের প্রিয় সম্পদ গরু। এই গরুদের আচরণ নিয়ে লিখেছেন কবি। গরুদের স্বভাব নিয়ে লিখলেও বেশ রসিকতার সাথে কিছুটা ইঙ্গিত দিয়েছেন অন্য দিকে। সচেতন হতে বলেছেন আমাদের। গরুর রাখাল যেমন গরুদের সমস্যা বুঝে চিকিৎসা দেন ঠিক আমাদেরও এমন চিকিৎসা প্রয়োজন। কবি উপমার সাথে তাঁর বুড়োতোষ ছড়া “গরুরচনা” তে আমাদেরকে সেটাই জানান দিয়েছেন। কবির ভাষায়-
গরু খুবি শান্তপ্রাণী
তৃণ-ভুসি খায়
জমি চাষে, গাড়ি টানে
দুধ ও সার বিলায়
মিলেমিশে এক গোয়ালে
একত্রে ঘুমায় !

কোনো গরু মাঝে মধ্যে
দুষ্ট হয়ে যায়
দড়ি ছিঁড়ে বেড়াভেঙে
অন্যত্র পালায়
যারে তারে গুঁতো মারে
আচমকা জ্বালায় !

যে গরুটা দুষ্ট- তেড়া
পাগলামি মাথায়
মূলকারণটা একটু একটু
রাখালে টের পায়
সমস্যা সারাতে হয় যে
ভালো চিকিৎসায়!

মুসলমানদের সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদ। এই ঈদের দিনে আনন্দের সীমা থাকে না আমাদের। আমাদের কবিরও। কিন্তু তিনি চাকরিজীবী। থাকেন ঢাকায় ছুটি পাননি বাড়ি যাবার। গিন্নী নাই বাসায় একা কবি। কী অবস্থা তাঁর এখন! ঘর ঝাড়ু দেয়া, কাপড় কাচা, থালাবাসন মাজা, রসুন, পিঁয়াজ আর মরিচ কেটে রান্না করা যে কত কষ্টের তা কেবল কবিই জানেন। কবি এখন বুঝেছেন গিন্নীর কদর কত? কবি গিন্নীকে আজকের ঈদের দিনে খুব করে মিস করছেন। একান্ত আপনার করে পাশে খুঁজছেন প্রাণের প্রেয়সীকে। কবির সাম্প্রতিক আবিস্কৃত বুড়োতোষ ছড়ার “ঈদের ছুটি” লেখায় তার প্রমাণ পাই। কবির ভাষায়-
ঈদের ছুটি- ঈদের ছুটি
আনন্দে খাই লুটোপুটি!
সবাই গেছে গ্রামের বাড়ি-
ঢাকার বাসায় একা একা
করছি ভীষণ ছুটোছুটি!

ঘর ঝাড়ু দেই, কাপড় কাচি,
এঘর-ওঘর নাচানাচি ।
পাতিল থালাবাসন মাজা
কী যন্ত্রণা- আরেক সাজা!
চুলোর পারে- রান্নাঘরে
গেলেই দুচোখ কান্না করে!
আদা রসুন মরিচ পিঁয়াজ
ঝাল কী রকম, বুঝতেছি আজ-
কেমন মজা পেষাপিষি!
রইল কোথায় খুন্তি চামুচ
লবন হলুদ গরমমশলা-
জিরার ডিব্বা, তেলের শিশি ?
খুঁজে আনি হাতের কাছে-
যা যা আছে ।
এক চুলোতে চালের হাঁড়ি
অন্যটাতে ডাল ও কারি ,
আলু পটল কাটাকাটি
উল্টোপাল্টা খাঁটাখাঁটি!
ফাঁকেফাঁকে খবর রাখি-
ডাল’টা কেমন সিদ্ধ হলো-
লবন চাখি !
একটু বিরাম কই ?
কী ঝামেলার কাজ রে বাবা
ভেবে অবাক হই !
ঈদের ছুটি ঈদের ছুটি,
ছুটির দিনে কাজের ভীড়ে
হাঁপাই উঠি- হাঁপাই উঠি !

সমাজের নানাবিধ চিত্র নিয়ে লিখে চলছেন আমাদের প্রিয় ছড়াকার কবি আসলাম প্রধান। কবির কলম চলুক আরো বেগবান গতিতে। কবির কলমের শাণিত ধারায় জেগে উঠুক গ্রাম থেকে গ্রামান্তর। পাড়া থেকে শহর মাড়িয়ে বিশ্বের প্রতিটি দোরগোড়ায়। আজকের এই জন্মদিনে কবির জন্য রইলো অনেক অনেক শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার ডালি। ফুলেল শুভেচ্ছায় কবি হয়ে উঠুন তেজিদিপ্ত। কবির জন্য দীর্ঘ নেক হায়াত কামনা করছি।