পুরুষত্ব কাকে বলে? পুরুষত্বের সংজ্ঞা কী? সত্যিকারের পুরুষদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে সমাজ আমাদের কি শিখিয়েছে? আসুন আমরা আগে তা জেনে নিই। যেসব পুরুষদের যৌন ক্ষমতা আছে, তাদের পুরুষত্ব আছে। যাদের যৌন ক্ষমতা নেই অর্থাৎ ধ্বজভঙ্গ বা আকারে ছোট তাদের বলা হয় পুরুষত্বহীন! কিন্তু যৌনতাই কি আসলে পুরুষত্ব?

সেক্স তো পশুরাও করে। রাস্তার কুকুরও পারে সেক্স করতে, তাহলে পশু বা কুকুরকেও কি পুরুষত্ব সম্পন্ন বলা যাবে? পুরুষত্ব দেখাতে গিয়ে যেখানে খুশি, যার সাথে খুশি কুকামে লিপ্ত হওয়াকে কী পুরুষত্ব বলবো? শিশু বাচ্চাকে জোর করে ধর্ষণ করা কিংবা রাস্তাঘাটে অসহায় কোন মেয়েকে পেয়ে ধর্ষণ করে হত্যা করাই কি পুরুষত্ব? ধিক এই পুরুষত্বকে। এগুলো পুরুষত্ব না, এগুলো স্রেফ পশুত্ব। পশুত্ব আর পুরুষত্ব কখোনো এক জিনিস না।

আমাদের সমাজে অসংখ্য অসুস্থ পুরুষ আছে, যারা যৌন অসুস্থতায় ভোগে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই রোগটাকে বলা হয় sexual disorder. ভয়ানক ব্যাপার হচ্ছে এই রোগের পুরুষ যারা, তারা নিজেরা ও জানে না তার রোগ সম্মন্ধে। সঠিক sexual order সম্পন্ন পুরুষ খুব অল্পই আছে।

কোন মেয়ে গোসল করছে অথবা ড্রেস পাল্টাচ্ছে। অনেকেই আছে তা লুকিয়ে দেখে। এতে করে সে যে অনুভূতি পায় সেটাকে বিকৃত যৌন আচরণ বা সেক্সুয়াল পারভার্শন বলে। মেডিকেলের ভাষায় এটি একটি ভয়েরিজম। এরকম অনেক রকমের সেক্সুয়াল পারভার্শন আছে। অনেকে আছে ভিড়ের মধ্যে মেয়ে দেখলেই শরীর ঘেঁষে চলার চেষ্টা করে। সুযোগ পেলে কনুই দিয়ে অথবা বিভিন্ন ছুতোয় বুক বা স্পর্শকাতর স্থানে স্পর্শ করে। এটাকে বলা হয় ফ্রটিউরিজম।

অন্যের সামনে উলঙ্গ হলে বা নিজের যৌনাঙ্গ দেখালে ভাল লাগে এমন অনেকেই আছে। বিশেষ করে মেয়েদের চলাচলের আশেপাশে ইচ্ছে করে কিছু লোক প্রসাব করার ছুতোয় তার যৌনাঙ্গ দেখানোর চেষ্টা করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায়
এটাকে বলে এক্সিবিশনিজম। অন্য কারো প্রশাব করা দেখেও সেক্সুয়াল ফিলিংস পায় কেউ কেউ। এটিকে বলা হয় ইউরোল্যাগনিয়া। অথবা মা বাচ্চাকে দুধ খাওয়াচ্ছে, এরকম পবিত্র দৃশ্য দেখেও কারো কারো সেক্সুয়াল ফিলিংস জেগে ওঠে। এটিকে বলা হয় গ্যালাকটোফিলিয়া।

গরু, ছাগল অথবা কুকুরের সাথে সেক্স করে আনন্দ পায় এমন লোকের দেখাও পাওয়া যায়। পশুর সাথে এরকম সেক্স করাকে বিস্টিয়ালিটি বলা হয়। বিকৃত যৌনকামী কেউ কেউ মৃত নগ্ন শরীর দেখেও সেক্সুয়াল অনুভূতি পায়, যেটাকে বলে নেক্রোফিলিয়া। এগুলো সবই সেক্সুয়াল পারভার্শন। সবচেয়ে মারাত্মক ও ভয়ংকর পারভার্শন হল পেডোফিলিয়া। শিশুদের প্রতি যৌন আকাঙ্ক্ষা তৈরি হওয়াকে বলা হয় পেডোফিলিয়া।

শুধুমাত্র শারীরিক ধর্ষণেই ধর্ষণ হয় না। ধর্মীয় পরিভাষায় উল্লেখিত সব অবস্থাকেই ধর্ষণ বলে। আপনি আমি আমরা হয়তো শারীরিকভাবে কোন মেয়েকে ধর্ষণ করছি না, কিন্তু ভেবে দেখুন তো, অন্য কোন মাধ্যমে আমরাও ধর্ষকের কাতারে সামিল হচ্ছি কী না?

দেড় বছর, তিন বছর, পাঁচ বছর এরকম অসংখ্য বাচ্চা মেয়েকে ধর্ষণ করার খবর আমরা জানি। যা ছাপা হয়েছে খবরের কাগজে। পাশাপাশি ছেলে শিশুদের উপরও চলে ঘৃণ্য যৌনতার মতো পাশবিক নির্যাতন। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমরা যা জানি তার থেকে অনেক গুণ বেশি ধর্ষণ হর হামেশাই হচ্ছে আমাদের চারপাশে। গাজীপুরে ধর্ষণ করা হয়েছে সাত বছরের মেয়েকে। বিচার না পেয়ে লজ্জায় ঘৃনায় বাবা তার ছোট্ট মেয়েটিকে নিয়ে অভিমানে ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করেছে। এই ঘটনা আমাদের জানা। তবে আমাদের অজানা এমন আত্মহত্যার সংখ্যাও কম নয়।

প্রাপ্ত বয়স্ক নারী পুরুষ সবার যৌন আকাঙ্ক্ষা আছে। অন্যান্য স্বাভাবিক শারীরিক বৈশিষ্ট্যের মত এটিও একটা বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ আমাদের যৌন আকাঙ্ক্ষা দিয়ে তা মেটানোর ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন। পুরুষের জন্য নারী, নারীর জন্য পুরুষ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এমন জোড়ায় জোড়ায় বানিয়েছেন। আমরা কেউ একা নই। যৌনতার পুরুষত্ব শুধু একজন নারীর জন্যই। আর প্রকৃত পুরুষত্ব সকল নারীর জন্য। হ্যাঁ, পৃথিবীর সকল নারীকে সম্মান দেখানোই হল প্রকৃত পুরুষত্ব, হোক সে নারী একজন শিশু, তরুণী কিংবা বৃদ্ধা কোন মহিলা। একটু খেয়াল করে তাকালে প্রতিটা পুরুষ সব নারীর মুখেই দেখতে পাবে তার মা, বোন, কন্যার মতো পবিত্র এক অবয়ব। সত্যিকার পুরুষ একজন মেয়েকে একাকি পেয়েও সুযোগ না নিয়ে নিরাপদে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসে।

একজন নারী যদি পুরুষের কাছে নিজেকে সম্পুর্ন নিরাপদ বোধ করতে না পারে, তবে সে কিসের পুরুষ? একজন সত্যিকার পুরুষ সব সময় নারীদের সম্মানের চোখে দেখবে। একজন সত্যিকার পুরুষ কখনো কোন নারীকে আঘাত করে না, কোন কিছুতে বাধ্য করে না। যদি সে কাউকে চায়ও, তবে সে নিজ যোগ্যতা দিয়ে তাকে অর্জন করে নেয়। এটাই তো পুরুষত্ব।

প্রকৃত পুরুষ প্রতিটা নারীর সাথে তেমন আচরণ করে, যেমন আচরণ সে তার মা-বাবার কাছ থেকে পায়। সত্যিকার পুরুষের সকল যৌনতা শুধুমাত্র একজন নারীর জন্যই সংরক্ষিত রাখে। এবং এতেই প্রকৃত আনন্দ ও তৃপ্তি। এগুলোই সত্যিকার পুরুষত্ব।

একটা দেশের সরকার বা প্রশাসন হয়তো চাইলে অনেক কিছুই করতে পারে। আবার অনেক বাধ্য বাধকতার মধ্যে দিয়েও যেতে হয় তাকে। কিন্তু আমরা নিজেরা যদি চাই তবে তার থেকেও অনেক বেশি কিছু করতে পারি, প্রয়োজন শুধু সৎ ইচ্ছা।

আমাদের পুরুষত্ব যৌনতার নয়, পুরুষত্ব আচরণে। আসুন না, আমরা সত্যিকারের পুরুষ হয়ে উঠি। আমাদের বোন, মা, কন্যা তথা সকল নারীদের জন্য একটা সত্যিকারের নির্ভরযোগ্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলি। আসুন, আমরা ধর্ষক না হয়ে পুরুষ হই। সত্যিকারের পুরুষ।