১৯৭৮ সাল থেকেই জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কোর পৃষ্ঠপোষকতায় বিশ্বের পেশাগত সাংবাদিকদের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থার বেশ কয়েকটি বৈঠক হয়েছে। বিশ্বের চার লক্ষাধিক সাংবাদিক এইসব সংস্থার অন্তর্ভুক্ত।
শান্তি, আন্তর্জাতিক সমঝোতা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, বর্ণ ও বর্ণবৈষম্যবাদ ও যুদ্ধ সংক্রান্ত উত্তেজনার বিরোধিতায় গণমাধ্যমসমূহের অবদান শীর্ষক ইউনেস্কোর মৌলিক নীতিমালার প্রতি সাংবাদিকদের মেক্সিকো বৈঠকে (১৯৮০) সমর্থন জ্ঞাপন করা হয়। ১৯৮৩ সালের জুনমাসে প্রাগে ও নভেম্বর মাসে প্যারিসে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সংস্থাসমূহের চতুর্থ বৈঠকে ইউনেস্কো ঘোষণার স্থায়ী মূল্যবোধকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। ইউনেস্কো ঘোষণার একটি প্রধান দিক ছিলো- ‘মতামত দান, মত প্রকাশ ও তথ্যের স্বাধীনতার অনুশীলন হচ্ছে মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আর তা শান্তি ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ওপর অর্পিত ক্রমবর্ধমান সামাজিক দায়িত্বের পরিপ্রেক্ষিতে, সমসাময়িক বিশ্বে তথ্য ও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকেও স্বীকৃতি দেয়।
আর এর ভিত্তিতেই সাংবাদিকদের পেশাগত নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। প্রণীত এইসব নীতি-সাংবাদিকতার যে কোনো ক্ষেত্রের জন্যই অনুপ্রেরণা ও প্রয়োগের উৎস হয়ে থাকবে।
ওই নীতিসমূহ হচ্ছে:

এক. জনগণের সঠিক তথ্য জানার অধিকার
অবিকৃত ও বিস্তারিত তথ্য লাভের মাধ্যমে সত্য ঘটনার বস্তুনিষ্ঠ চিত্র অবগত হওয়া এবং বিভিন্ন সংস্কৃতি ও যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে নিজেদের স্বাধীনভাবে প্রকাশ করার ব্যাপারে জনগণ ও ব্যক্তিবিশেষের অধিকার রয়েছে।

দুই. বস্তুনিষ্ঠতার প্রতি সাংবাদিকের আত্মোৎসর্গ
সাংবাদিকের মুখ্য কাজ হচ্ছে ঘটনার বস্তুনিষ্ঠতার প্রতি আন্তরিক থেকে সত্যিকার ও প্রকৃত তথ্য লাভে জনগণের অধিকারকে নিশ্চিত করা। সাংবাদিক তাঁর পেশাগত দক্ষতা ও সৃজনশীল ক্ষমতা প্রয়োগ করে কোনো প্রকার বিকৃতি না ঘটিয়েই বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রেখে ঘটনার প্রসঙ্গানুযায়ীই প্রাপ্ত তথ্যসমূহের রিপোর্ট পেশ করেন। তিনি ঘটনার সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ চিত্র তুলে ধরেন।

তিন. সাংবাদিকের সামাজিক দায়িত্ব
সাংবাদিকতায় তথ্যকে কোনো পণ্যদ্রব্য হিসেবে নয় বরং সামাজিক কল্যাণকর বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়। সাংবাদিক তাঁর সামাজিক দায়িত্বের কারণে নৈতিকতাবোধের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই কাজ করবেন। প্রেরিত তথ্যের জন্য সাংবাদিকের সামাজিক দায়-দায়িত্ব রয়েছে। যোগাযোগ মাধ্যমসমূহের নিয়ন্ত্রণকারীরা ছাড়াও তিনি সাধারণ জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে নৈতিকভাবে বাধ্য।

চার. সাংবাদিকতার পেশাগত সততা
সাংবাদিকতা তাঁর পেশা হলেও সমাজসেবা তাঁর মুখ্য দায়িত্ব। তিনি তাঁর নিজস্ব বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কাজ করবেন না কিংবা তথ্যের উৎস প্রকাশ থেকে বিরত থাকার তাঁর অধিকার রয়েছে। যে সংবাদমাধ্যমে তিনি কর্মরত সেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেয়ার অধিকার তাঁর রয়েছে। পেশাগত সততার স্বার্থে তিনি ঘুষ গ্রহণ, অন্যায়কে প্রশ্রয়দান কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধা ও আনুকুল্য পাবার বিনিময়ে কোনো জনস্বার্থবিরোধী ভূমিকা গ্রহণ করবেন না।

পাঁচ. সংবাদমাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণের প্রতি মর্যাদাবান
সাংবাদিকের যে অধিকার, সাধারণ জনগণেরও সেই অধিকার রয়েছে। এ পেশার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী জনগণের তথ্য জানার অধিকার, যোগাযোগ মাধ্যমসমূহে জনগণের অংশগ্রহণ, ত্রুটি সংশোধন বা প্রতিকার এবং উত্তরদানের অধিকারকে সাংবাদিক মর্যাদা দেবেন।

ছয়. ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানুষের মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা
সাংবাদিকের পেশাগত মানদণ্ডের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হচ্ছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানুষের মর্যাদার সম্পর্কে কোনো ব্যক্তির অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন। শ্রদ্ধা প্রদর্শনের এই ব্যাপারটি ব্যক্তির অধিকারসমূহের সংরক্ষণ এবং অপরের সুনাম সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইনের ধারাসমূহের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। এ সংক্রান্ত আইনের অধীনে লিখিত কুৎসা, মিথ্যা অপবাদ, মৌখিক কুৎসা ও মানহানি নিষিদ্ধ।

সাত. জনস্বার্থের প্রতি শ্রদ্ধা:
সাংবাদিক ব্যক্তিস্বার্থে নয়, জনস্বার্থে কাজ করে। আর তাই সাংবাদিকের পেশাগত মানদ- তাঁর পরিপার্শ্বস্থ সমাজ এবং এ সমাজের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ তথা জনগণের নৈতিকতার প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা প্রদর্শনের দিকনির্দেশনা দেয়।

আট. সর্বজনীন মূল্যবোধ ও বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা
একজন প্রকৃত ও ন্যায়নীতিনিষ্ঠ সাংবাদিক প্রতিটি ধর্মীয় গোষ্ঠি বা সম্প্রদায় ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, মূল্যবোধ ও মর্যাদা এবং প্রতিটি জাতির নিজস্ব রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থাকে অবাধে বেছে নেয়ার ও সেগুলোর বিকাশ সাধনের অধিকারকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে থাকেন। তিনি মানবতাবাদের সর্বজনীন মূল্যবোধ, শান্তি, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সমাজ প্রগতি ও জাতীয় মুক্তির সমর্থক।

নয়. মানবজাতির জন্য সম্ভাব্য হুমকিস্বরূপ যুদ্ধ ও অন্যান্ন গুরুতর মন্দাবস্থা দূরীকরণের অঙ্গীকার
মানবতাবাদী সর্বজনীন মূল্যবোধে নৈতিকভাবে সমর্পিত হওয়ায় একজন সাংবাদিক সর্বগ্রাসী যুদ্ধবিগ্রহ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা বিশেষত পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার প্রতি সমর্থনদান বা প্ররোচনা থেকে বিরত থাকেন। সহিংসতা, বর্ণ ও বর্ণবৈষম্যবাদ, অত্যাচারী সরকারের নিপীড়ন, উপনিবেশবাদ ও নয়া উপনিবেশবাদ, দারিদ্র ও অপুষ্টিসহ বিভিন্ন মন্দাবস্থা এবং স্থবিরতা ও কুফলকে সমর্থনদান থেকে তিনি বিরত থাকেন।

দশ: নয়া আন্তর্জাতিক তথ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে উৎসাহদান
নতুন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং বিশেষ করে নতুন আন্তর্জাতিক তথ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপারে বিশ্বে বর্তমানে আন্দোলন হচ্ছে, একজন সাংবাদিক সেই আন্দোলনের কাঠামোর মধ্যে ক্রিয়াশীল। এ নতুন তথ্যব্যবস্থা নয়া আন্তর্জাতিক অর্থ-ব্যবস্থারই একটি অংশ এবং তার লক্ষ্য হচ্ছে বিভিন্ন জাতির মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও তাদের সাংস্কৃতিক পরিচিতির প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ভিত্তিতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক তথ্য ক্ষেত্রে উপনিবেশবাদের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্রায়ন সাধন।