সাহিত্য শব্দটি উদ্ভুত হয়েছে সহিত ধাতুর সাথে অ প্রত্যয় যোগ করে। সহিত অর্থ সঙ্গে। যদি প্রশ্ন উত্থাপিত হয় কিসের সহিত? তবে এর উত্তর হবে জীবনের সহিত। সাহিত্য মানব জীবনের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। সেজন্যেই বলা হয় দর্শন দর্শনকে নিয়ে, বিজ্ঞান বিজ্ঞানকে নিয়ে, ইতিহাস ইতিহাসকে নিয়ে কিন্তু সাহিত্য এদের সকলকে নিয়ে। ভাষা ও সাহিত্যের আশ্রয় ব্যতিত জীবনের কোন কিছুই বিশ্লেষিত হতে পারে না। মহান শ্রষ্টার পক্ষ থেকে এ পৃথিবীতে পদার্পণের দিন থেকেই মানুষ সঙ্গে করে তাঁর মুখের ভাষাটিও নিয়ে এসেছিলো। আল্লাহ পাক-এর মহান অনুগ্রহ যে তিনি মানুষকে নির্বাক করে পৃধিবীতে প্রেরণ করেননি। আরো একটি বস্তু তিনি মানুষকে প্রদান করেছেন তা হলো সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানব জীবনকে পরিচালনার জন্যে তাঁর পক্ষ থেকে প্রত্যাদেশ বাণী। যে বাণী মহান শ্রষ্টা কর্তৃক নির্ধারিত পরম নৈতিকতার মানদন্ডের উপর প্রতিষ্ঠিত। যুগে যুগে নবী রাসুলগণকে প্রেরণ করে শ্রষ্টা তার নীতিমালাসমূহকে সংশোজন বিয়োজন পরিমার্জন করে এক পরিপূর্ণ নীতমালায় রূপ দিয়েছেন। যাকে বলা হয় পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। মানব জীবন স্বার্থক হতে পারে একমাত্র আল্লাহর নির্দেশিত নৈতিকতার মানদন্ডে মানবজীবনকে পরিচালিত করলে। এ কথা অনস্বীকার্য যে সৃষ্টি বস্তু বা নব্য উদ্ভাবিত বা আবিষ্কৃত কোন বস্তুকে এর সৃষ্টিকর্তা বা আবিষ্কারকের প্রদত্ব নিয়ম নীতিমালা অনুসার্ইে চালাতে হয়। এর অন্যথা করলে সে বস্তুটি অনিয়মের কারণে বিপর্যস্থ হতে বাধ্য। কাজেই নৈতিকতার প্রশ্নটি যদি উত্থাপিত হয় তাহলে মহান শ্রষ্টা প্রদত্ব নীতি নৈতিকতার উর্ধে আর কিছুই নেই। দেশ ভাষা জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ এ মহান নীতি নৈতিকতার উপর তাদের জীবন ও সমাজকে পরিচালিত করলেই পৃথিবী হতে পারে শান্তিপূর্ণ এবং মানব জীবন হতে পারে মহিমান্বিত।
পৃথিবীতে আমরা বিভিন্ন আদর্শ ও নীতি নৈতিকথার কথা শুনে থাকি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন বর্ণের বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে বিভিন্ন নীতি ও আদর্শ দেখা যায়। পৃথিবীতে বিভিন্ন দার্শনিকগণও বিভিন্ন সময় মানবমন্ডলীকে মতাদর্শ বা নীতিমালা প্রদান করেছেন। সেগুলোকে আমরা মানব রচিত বা মানব প্রবর্তিত মতাদর্শ বলে থাকি। সেসব মতাদর্শের কোন কোনটি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে শ্রষ্টার নীতিমালার বিরুদ্ধেও অবস্থান করে। বুঝে হোক বা না বুঝে হোক পৃথিবীর কিছু কিছু মানুষ সেসব মতাদর্শকে গ্রহণ করে। ঐসব মতাদর্শের প্রবক্তারা শ্রষ্টা প্রদত্ব মতাদর্শের উপর সঠিক উপলব্ধীর অভাবেই হোক অথবা স্থান কাল পাত্র ভেদে কোন প্রকার স্বরূপ-বিরুপ ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়ার কারণেই হোক, কিংবা নিজের পান্ডিত্বকে প্রকাশ করার কারণেই হোক, কিংবা সরাসরি শ্রষ্টার প্রতি ব্র“ক্ষেপ করা ধৃষ্টতা প্রদান করার জন্যেই হোক (কেননা তারা শ্রষ্টার অস্থিত্বকে অস্বীকার করে কারণ শ্রষ্টার অস্থিত্ব স্বীকার করলে শ্রষ্টার বিধিবিধানকেও স্বীকার করতে হবে এবং তা মানতে হবে ফলে পৃথিবীতে স্বাধীনভাবে অন্যায় অপকর্ম করা যাবেনা।), যে মতাদর্শ তারা প্রদান করেছেন, কিংবা এমনও দেখা গেছে যে শ্রষ্টার নীতিমালার পক্ষে তাঁর প্রতি কোন আহবান পৌছেনি কিন্তু তাঁর ভেতর একটা মহামানবীয় গুণ ছিলো এবং তিনি ছিলেন একজন মানবহিতৈষী সেকারণেই একটা দর্শন তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যেমন-কনফুসিয়াসের মতাদর্শ। আবার কারো কারো জীবনে এমন ঘটেছে যে পৃথিবীতে যে শ্রষ্টা প্রদত্ব এমন একটি অবিকৃত ও অসাধারণ মতাদর্শ আছে সেকথা জানতেও পারেনি তাই একটি মানবরচিত আদর্শকে পূঁজি করে তাঁর জীবনকে পরিচালিত করেছেন কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সত্যপথযাত্রী হতে চেষ্টা করেছেন কিন্তু সে সুযোগ আর তিনি পাননি। যেমন-বিখ্যাত রুশ লেখক লিও টলস্টয় সারাজীবন সমাজতন্ত্রের দীক্ষা নিয়ে তাঁর লেখক জীবনকে পরিচালিত করেছেন এবং রচনা করেছেন বিশ্ব বিখ্যাত উপন্যাস ‘ওয়ার এন্ড পীস’। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি ইসলাম নিয়ে পড়াশুনা করছিলেন এবং সত্য ক্রমেই ধরা দিচ্ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে রেলে কাটা পড়ে তিনি নিহত হন। মৃত্যুকালে তাঁর পকেটে পাওয়া যায় ‘সেয়িংস অব প্রফেট মুহাম্মদ (সা)’ নামে একখানা ছোট হাদিস গ্রন্থ।
যা হোক। পৃথিবীর এইসব মানব রচিত মতাদর্শগুলোকেও যদি পর্যালোচনা করি তাহলে দেখা যাবে যে একেবারে অনিচ্ছা স্বত্বেও সেই সব নীতিমালার কোন কোন অনুচ্ছেদে শ্রষ্টা প্রদত্ব নীতিমালার আলো অনুপ্রবেশ করেছে। বস্তুবাদীরা তাদের তাদের প্রণিত মতবাদের কোন কোন অনুচ্ছেদে সম্পূর্ণ মনের অজান্তে এমন কিছু কথা হয়তো বলে রেখেছে যা শ্রষ্টার নীতিমালার ছায়া অবলম্বনেই রচিত বলে মনে হয়। এ কথা বলছি একারণে যে শ্রষ্টার নীতিমালা হচ্ছে এমন এক মহান আলোকউৎস যে আলোক উৎসকে অস্বীকার করতে চাইলেও অস্বীকার করতে পারেনা কেউ। যে কোন হ্রন্ধ্র দিয়েই সে আলোক রশ্নি অনুপ্রবেশ করে অন্ধাকারকে বিদূরিত করতে স্বচেষ্ট হয়। এ আলোকউৎসকে উপেক্ষা করার উপায় নেই কারো।
পৃথিবীর লেখক সাহিত্যিকগণ কোন না কোন মতাদর্শকে চেতনায় ধারণ কর্ইে তাঁর লেখক জীবনকে অগ্রসর করে থাকেন। একজন লেখক প্রথম নিজেকে সমৃদ্ধ করেন তাঁর সমাজ বাস্তবতাকে আতœস্থ করে এর পর প্রদান করেন তাঁর চিন্তা চেতনা। পেশ করেন তার সৃষ্টিশীলতাকে। প্রত্যেক লেখকের ভেতর্ইে একটি জীবন দর্শণ কাজ করে। দর্শনকে এড়ানোর সুযোগ তাঁর নেই। হয় তিনি নিজেই রূপান্তরিত হন একজন পরিপূর্ণ দার্শনিকে (কেননা একজন দার্শনিকতো একজন লেখকই বটে।) অথবা কোন দর্শন দ্বারা তিনি তাড়িত হন। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাঁর রচনায় সেসব এসেই যায়। এ সত্যকে অস্বীকার করে কারো পক্ষে লেখক হওয়া সম্ভব নয়। একজন লেখককে প্রভাবিত করে তাঁর দেশ, তাঁর সমাজ, তাঁর ধর্ম, তাঁর আচার-বিচার, বোধ-বিশ্বাস। এসবকে অস্বীকার করে তিনি কখনো পরিপূর্ণ লেখক হতে পারবেন না। কেননা সাহিত্য হচ্ছে মানব মনের গভীরতম অভিব্যাক্তি। চেতনায় উদ্ভাসিত অনুভূতির রূপায়ন। যে সাহিত্যে নিজস্ব সমাজ বাস্তবতার সঠিক মূল্যায়ন থাকেনা সে সাহিত্য স্বার্থক সাহিত্য নয়।
হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত আমাদের এই আবহমান বাংলাদেশ। এখানে যেমন বিভিন্ন ধর্ম বর্নের মানুষ বসবাস করে তেমনি এদেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ এক সুচিন্তিত জীবনদৃষ্টিভঙ্গিকে গ্রহণ করেছে যার নাম ইসলাম। এই দর্শণ আমাদের সাহিত্যকেও নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। এবং সেটাই স্বাভাবিক। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন ‘হিন্দুর সাহিত্য অনুপ্রেরণা পাচ্ছে বেদান্ত ও গিতা, হিন্দু ইতিহাস ও হিন্দু মনিষীদের জীবন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। আমাদের সাহিত্য অনুপ্রেরণা পাবে কোরআন ও হাদীস, মুসলিম ইতিহাস ও মুসলিম মনিষীদের জীবন থেকে। হিন্দুর সাহিত্য রস আস্বাদন করে হিন্দু সমাজ থেকে। আমাদের সাহিত্য রস আস্বাদন করবে মুসলিম সমাজ থেকে।’
ধর্ম ও দর্শনকে অস্বীকার করে কোন সাহিত্য হতে পারে না এর প্রমান পৃথিবীতে অনেক রয়েছে। পৃথিবীতে যে কয়টি শ্রেষ্ট মহাকাব্য বা সাহিত্য গ্রন্থ রচিত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো হোমারের ‘ইলিয়ড ও ওডিসি’, ভার্জিলের ‘ইনিড’ বাল্মিকির ‘রামায়ন’, ফেরদৌসীর ‘শাহনামা’, মধুসুদনের ‘মেধনাদ বধ’। প্রত্যেকটি মহাকাব্যেই রয়েছে ধর্মের মর্মকথা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘রাজা রামমোহন রায় প্রবর্তিত ব্রক্ষ্ম ধর্ম দ্বারা তার সাহিত্যকর্মকে আলোকিত করেছিলেন। ধর্মকে অস্বীরকার করেননি ঘাস ফুল নদীর কবি জীবনানান্দ দাশ। কেননা হিন্দুদের একটি বিশ্বাস হচ্ছে পূণজর্ম্মবাদ যদিও এর বিরুদ্ধে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। সে যাই হোক সেটা হিন্দুদের একটি বিশ্বাস। সে বিশ্বাস দ্বারা কবি জীবনান্দদাশ তাড়িত হয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘আবার আসিব ফিরে/ধান শিড়িটির তীরে হয়তোবা মানুষ নয় শংখচীল শালিকের বেশে/এই কার্তিকের নবান্নের দেশে।’
কাজেই যে সাহিত্য সমাজের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের বিশ্বাস ও চেতনার প্রতিনিধিত্ব করেনা সে সাহিত্য স্বার্থক জাতীয় সাহিত্য নয় এবং তা অনেকাংশেই স্ববিরোধী। অথচ আজ আমাদের দেশে এই স্ববিরোধী সাহিত্যই বেশী রচিত হচ্ছে। সংখ্যগরিষ্ট মানুষের ধর্ম বিশ্বাসকে কটাক্ষ করে রচিত সাহিত্যকে সবচেয়ে আধুনিক ও তথাকথিত প্রগতিশীল সাহিত্য বলে ঘোষণা দেয়া হচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ট মানষের চেতনা বিরোধী সাহিত্যের পৃষ্টপোষকতা করা হচ্ছে ও বাহাবা দেয়া হচ্ছে দেশের ভেতরের পরজীবি সাহিত্য সাংস্কৃতিক গোষ্টীগুলোর পক্ষ থেকে এমনকি বাহাবা আসছে দেশের বাইরে থেকেও। সারা দেশময় ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে অশ্লিল ও চরিত্র বিদ্ধংসী সাহিত্যের আবর্জনা। মাদক দ্রব্যের মতো তা গ্রাস করছে আমাদের যুব সমাজের মন-মস্তিস্ক। তাদেরদেরকে চরিত্রহীন, ঐতিহ্যহীন, কর্মবিমূখ করে আমাদের জাতির ভবিষ্যৎকে স্থবির করে দিয়ে একটি মেধাশুন্য, ঐতিহ্য শুন্য, মেরুদন্ডহীন, দুর্বল জাতিতে রুপান্তরিত করার স্বদেশী বিদেশী চক্রান্ত অনেক আগেই আরম্ভ হয়েছিলো যেনো ঐতিহ্যহীন নড়বড়ে অবস্থায় সেই জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৈামত্বকে গ্রাস করা যায়। সাংস্কৃতিকভাবে এ চক্রান্তটা দীর্ঘদিন পরিচালিত হয়েছে। কেননা সাংস্কৃতিক পরাধীনতাই রাজনৈতিক পরাধীনতার নামান্তর। এমনই এক ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে হাজার বছরের সংগ্রামী ঐতিহ্যের চেতনা বক্ষে নিয়ে ‘শিল্পের জন্যে শিল্প নয়, মানবতার জন্যে শিল্প’ ‘শান্তিময় পৃথিবীর জন্যে সুন্দর সাহিত্য’ ‘সত্য সুন্দর ন্যায়ের জন্যে সাহিত্য’ এইসব বিপ্লবী বাণীকে সামনে নিয়ে সকল সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঝলসে ওঠেছিলো একদল কলামসেনার কলম। অশুভ আওয়াজের উল্টো দিক থেকে শুরু করেছিলেন বিপরীত উচ্চারণ। প্রচলিত গড্ডলিকা প্রবাহের বিপরীতে সৌন্দর্যবোধের সুবাসিত ধারা। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের শুরু থেকেই সকল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একদল কবি সাহিত্যিক কলম সৈনিক তাদের মশিযুদ্ধ চালিয়ে এসেছেন। শাহ মুহম্মদ সগির, শাহ মুহাম্মদ গরীবুল্লাহ, আলাউল থেকে শুরু করে ইসমাইল হোসেন সিরাজী, কাজি নজরুল ইসলাম, জসীম উদ্দিন, গোলাম মোস্তফা, কায়কোবাদ, ফররুখ আহমাদ, প্রমুখ ৫০ দশকের পূর্ববর্তী কবিরা এবং এর পর রয়েছেন সৈয়দ আলী আহসান, সৈয়দ আলী আশরাফ, দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ,
কবি সাহিত্যিক সাংবাদিক কলম সৈনিকরা হলেন আবুল আসাদ, ওবায়দুল হক সরকার, ডা জহুরুল হক, ইতিহাস গবেষক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান, মাসুদ মজুমদার, আতা সরকার, অধ্যাপক সিরাজুল হক, মতিউর রহমান মল্লিক, আবদুল হাই শিকদার, আসাদ বিন হাফিজ, মোশারফ হোসেন খান, হাসান আলীম, ফরিদ আহমদ রেজা, ইকবাল করীব মোহন, ঈশা শাহেদী, ইতিহাস গবেষক আশরাফুল ইসলাম, তার্দেই একজন।
ইকবাল কবীর মোহন একাধারে ছড়াকার, কবি, শিশু সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, কলামিষ্ট, সম্পদক এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ভাষ্যকার। বিভিন্ন ধরণের বই লিখেছেন তিনি। ছোট বড় মিলিয়ে চুয়াল্লিশটি বই লিখেছেন তিনি। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘চাঁদ হাসে মিটিমিটি (ছড়া), এতো নিখুত নীল (ছড়া), আলোর লুটোপুটি (ছড়া). বাছাই ছড়া (ছড়া). মুসলিম নির্যাতন দেশে দেশে (প্রতিবেদন), কমিউনিষ্ট শাসনে মুসলিম নির্যাতন (প্রতিবেদন), রক্তাক্ত আফগনিস্তান (ইতিহাস), কাশ্মির জ্বলছে (প্রতিবেদন), আন্তর্জাতিক সংকট ও আজকের রাজনীতি (রাজনীতি বিষয়ক), আন্তর্জাতিক সমস্যা ও সমকালিন রাজনীতি (রাজনীতি বিষয়ক), আগ্রাসনের মুখে মুসলিম বিশ্ব (পর্যালোচনা), বোসনিয়ার আর্তনাদ (প্রতিবেদন), রক্ত ঝরা আলজেরিয়া (প্রতিবেদন), বিংশ শতাব্দীর ইসলামী পুনর্জাগরণ ও পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্র (সম্পাদনা), একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ ও মুসলিম উম্মাহ (সম্পাদনা), বিশ্বময় ইসলামী জাগড়ণ (সম্পাদনা), ইসলাম আমার বিশ্বাস (অনুবাদ), সাধারণ জ্ঞান ঃ বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী, বিসিএস ঃ সাধারণ জ্ঞান, সোনালী দিনের স্মৃতি-এক, সোনালী দিনের স্মৃতি-২, সোনালী দিনের স্মৃতি-৩, বাংলাদেশে এনজিও আগ্রাসন, ব্যাংক ব্যাংকার ব্যাংকিং, আধুনিক ব্যাংকিং, ছোটদের মহানবী (সা) (জীবনী), গল্পে হযরত আবুবকর (রা) (জীবনী), গল্পে হযরত ওমর (রা) (জীবনী), গল্পে হযরত উসমান (রা) (জীবনী), গল্পে হযরত আলী (রা) (জীবনী), সাহাবীদের গল্প শোনো (জীবনী), গল্প পড়ো জীবন গড়ো, সত্যের হলো জয়, সেনাপতি হলেন সৈনিক, সোনালী দিনের কাহিনী শোন, সেরা মানুষের জীবনকথা, আলোর পাখিরা, এক বেদুইনের গল্প, ন্যায় বিচারের কাহিনী শোনো, এসো জীবন গড়ি ইঙ্গ মার্কিন বর্বরতা ঃ রক্তে রাঙা ইরাক (সম্পাদনা), আক্রান্ত ফিলিস্তিন রক্তাক্ত লেবানন (সম্পাদনা), মুসলিম মনিষা, বিশ্বময় ইসলামী জাগড়ণ, কে আমির কে ফকির প্রভৃতি। বিভিন্ন দৈনিক, মাসিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে ও হচ্ছে তার ছড়া, কিশোর কবিতা, কিশোর গল্প, প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও কলাম সমূহ।
শিশু কিশোররা হচ্ছে দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ। আগামী বাংলাদেশ গড়ার কারিগর। তাদেরকে সুনাগরিক ও সুমানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে আদর্শিক শিক্ষার বিকল্প নেই। আমরা যাদের আদর্শিক উত্তরসূরী, সেই সব মহান মানুষেরা অর্থাৎ খলিফা এবং সাহাবী (রা) গণ ছিলেন উত্তম চরিত্রের অধিকারী। হাদিসে এসেছে সাহাবীরা (রা) হচ্ছেন নক্ষত্রতূল্য। মহান চরিত্রের অধিকারী সাহাবী (রা)-এর জীবনাচরণের মধ্যে রয়েছে মুসলমানদের জন্যে শিক্ষা। ইসলামের ইতিহাসের এসব মহান চরিত্রগুলোকে বাংলাভাষী পাঠক বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের সামনে সহজ সরল ও মজাদার ভাষায় তুলে ধরেছেন তিনি। সাহাবী (রা) ও খলিফাগণকে নিয়ে বাংলাভাষায় আরো অনেক লেখক লিখেছেন। তাদের ভাষা স্বত্রন্ত্র। ইকবাল কবীর মোহন সাহেবের বর্ণনাভঙ্গিতে রয়েছে বিশিষ্টতা। মহামানবদের জীবনের মহান দিকগুলোকে তিনি অত্যন্ত আকর্ষনীয় ভাষায় পাঠকের হৃদয়ে স্পর্শ প্রদানের চেষ্টা করেছেন। এখানেই তার স্বাতন্ত্র। কেননা তিনি তার নিজস্ব স্টাইলে একটি স্বতন্ত্র শিশুতোষ ভাষা ব্যাবহার করেছেন।

তাঁর রচিত ছোটদের মহনাবী সা. বইটি যেন বিন্দুর মাঝে সিন্দুকে ধারণ করেছে। ‘‘প্রতিটি মুসলিম লেখক যারা অন্তত ধর্মের প্রতি সামান্যতমও শ্রদ্ধশীল তাদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, জীবনের কোন না কোন পর্যায়ে গিয়ে মহানবী সা.কে নিয়ে কিছুনা কিছু লিখেন।’’ -এ কথাটি বলেছেন আবহমান বাংলার ঐতিহ্যের শিল্পরূপকার কবি আল মাহমুদ। আসলেও তাই বিশ্বাসী মুসলমান লেখক মাত্রই তাদের মধ্যে শতকরা নিরানব্বই জন মহানবী সা.কে নিয়ে কিছু না কিছু লিখেছেন। ভবিষ্যতেও লিখবেন এবং বর্তমানেও লিখছেন। যারা কবি তারা কবিতা বা ছড়া লিখেছেন। জীবনীকারগণ জীবনী লিখছেন। প্রাবন্ধিকগণ মহানবী সা. ও তাঁর জীবনের নানা দিক নিয়ে, তাঁর মহান আদর্শ আল্লাহপাক কর্তৃক নাযিলকৃত ইসলাম নিয়ে লিখছেন। এবং এ লেখা চলতে থাকবে অনন্তকাল। বাংলাভাষায় সেই পুঁথি সাহিত্যের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত যত বই পুস্তক লেখা হয়েছে মহানবী সা. প্রসঙ্গে এবং এই পর্যন্ত সারা বাংলাদেশে ও বাংলাদেশের বাইরে বাংলাভাষায় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নবী সা. বিষয়ে যত লেখা প্রকাশিত হয়েছে হোক সে লেখার লেখক শক্তিমান এবং হোক সে লেখার লেখক সাধারণ একজন লেখক মাত্র, সমূদয় লেখাকে একত্রিত করে জাতীয় সীরাত কোষ গঠন করা যেতো। জাতীয় পর্যায়ে একটু উদ্যেগী হলেই বাংলাপিডিয়া, শিশু বিশ্বকোষ বা ইসলামী বিশ্বকোষ এর মতো জাতীয় সিরাত কোষ গঠন করলে একটি অসাধারণ কাজ হতো যে কাজটি মুসলিম বিশ্বের কোন দেশেই এ পর্যন্ত করা হয়নি আমার জানা মতে। এ অসাধারণ কাজটি যদি আমরা বাংলাভাষাভাষিরা করতে পারতাম আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও একটি উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়ে পড়তো বলেই আমার বিশ্বাস। মহানবী সা.-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্যে একটু স্বদিচ্ছা জাগ্রত হলেই তাঁর প্রতি যুগান্তকারী শ্রদ্ধা ও ভালবাসা প্রদর্শণ করা যেতো এ উপায়ে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে যেখানে বড় বড় ইমারত নির্মিত হয় দেশে এমনকি জাতীয় জীবনে বহু অর্থ অপচয়ের ঘটনাও আমরা শুনে থাকি-সেক্ষেত্রে মহানবী (সা)-এর জীবন ও জীবনাচরণ নিয়ে বিশাল রচনা সম্ভারের সংকলণ প্রকাশ করাকি খুব কঠিন ব্যাপার? সে বিষয়ে আজো জাতীয় কোন উদ্দ্যেগ গ্রহন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি জাতির কর্ণধারগণ।
ইকবাল কবীর মোহন-এর ‘ছোটদের মহানবী (সা)’ শীর্ষক সিরাত গ্রন্থটি পড়তে পড়তেই উপরোল্লেখিত ধারণা উদ্ভূত হলো। যা হোক উক্ত গ্রন্থটি বাংলাভাষায় সিরাত রচনা সম্ভারকে খানিকটা হলেও সমৃদ্ধ করলো।
ইকবাল কবীর মোহন একজন স্বনামধন্য লেখক ও বহুগ্রন্থ প্রণেতা। দেশে-বিদেশে রয়েছে তাঁর পাঠক। তাঁর অপ্রকাশিত ও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত লেখার সংখ্যাও ব্যাপক। নানা বিষয়ে তিনি লিখে থাকেন। ছড়া-কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, রাজনৈতিক ভাষ্য, মুসলিম বিশ্ব পরিস্থিতি সংক্রান্ত এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ক প্রবন্ধ-নিবন্ধ, ধর্মীয় গবেষণা ইত্যাদি বিষয়ে পত্রিকায় তাঁর লেখা অহরহ দেখা যায়। তিনি ছোটদের জন্যেও লিখেন। ছোটদের জন্যে রয়েছে তাঁর কয়েকটি জীবনী গ্রন্থ। ছোটদের মহানবী (সা) তম্মধ্যে একটি।
বইটির বৈশিষ্ট হলো তিনি সংক্ষিপ্তভাবে মহানবী (সা)-এর জীবনের মূল অধ্যায়গুলো আলোকপাত করেছেন। শিশু-কিশোরদের উপযোগী করে সরল স্বাভাবিক ভাষায় তিনি লিখেছেন। মহানবী (সা)-এর জন্ম, এতিম হিসেব তাঁর বেড়ে ওঠা, বিশ্বস্থতা ও সততার জন্যে আল-আমিন উপাধী লাভ, তাঁর কিশোর কাল ও যুবক বয়স, তাঁর বিয়ে, নবুয়ত লাভ, ইসলাম প্রচার, যুলম-নিপীড়ণের শিকার হওয়ার ঘটনা, মক্কা ছেড়ে মদীনায় হিযরত, মদীনায় সুন্দর সমাজ গঠন, কাফেরদের মদীনা আক্রমণ ও বদরের যুদ্ধ, ওহুদ যুদ্ধ, হুদায়বিয়ার সন্ধি, মক্কা বিজয় এবং চূড়ান্তভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর তাঁর ওফাত বা বিদায়ের ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে ও সুবিন্যস্ত ভাবে ছোটদের উপযোগী করে বর্ণনা করেছেন। এরপর মহানবী (সা)-এর ব্যাক্তি জীবনের কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা, তাঁর ব্যাক্তিগত গুণের কথা নিয়ে তিনি কয়েকটি অতিরিক্ত অধ্যায় সাজিয়েছেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ কিছু সাহাবী (রা)-এর কথাও বিশেষভাবে বর্ণনা করেছেন। মহানবী (সা)-এর সু-বৃহৎ জীবনীর সার সংক্ষেপকে একাত্তোর পৃষ্ঠার একটি বইয়ে প্রকাশ করে যেনো বিন্দুর মধ্যে সিন্ধু কে ধারণ করেছেন। শিশু-কিশোরদের কাছে মহানবী (সা)-এর জীবনী নিয়ে চিন্তাভাবনার দরোজা উম্মোচিত করে দিয়েছেন। মহানবী (সা)-এর উপর এই প্রাথমিক বইটি পড়ার মাধ্যমে ছোটদেরকে আগামী দিনে মহানবী (সা)-এর বৃহৎ জীবনী অধ্যায়নের মাধ্যমে নবীজী (সা)-এর দেখানো রাস্তায় পথ চলে জীবনকে সুশোভিত করার প্রেরণা দিয়েছেন।
শিল্পী হামিদুল ইসলামের প্রচ্ছদ চমৎকার, প্রচ্ছদের ছবিটি সহ গোটা প্রচ্ছদের সজ্জা চমৎকার। অলংকরণগুলোও ঘটনার সাথে তাৎপর্য পূর্ণ করে আঁকা হয়েছে। রঙিন হরফে প্রকাশিত হয়েছে বইটি যা শিশু-কিশোরদের চিত্তকে হরণ করে। এবং দ্রুতপঠনে আগ্রহ সৃষ্টি করবে।
গল্পে হযরত আবু বকর (রা) বইটি ছোটদের জন্য ইকবাল করীর মোহন লিখিত ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবুবকর (রা) সংক্ষিপ্ত জীবনী। হযরত আবুবকর (রা) জীবনের প্রধান ও মৌলিক ঘটনাগুলো এতে সহজ সরল ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। আমরা জানি হযরত আবুবকর (রা) ছিলেন মহানবী (সা)-এর একজন প্রিয় সহচর। চরম বিপদের দিনে যখন চারিদিকে ইসলামের শত্র“রা খোলা তলোয়ার হাতে খুজে বেড়াচ্ছে মহানবী (সা) হত্যার জন্যে যখন আল্লাহর তরফ থেকে হিজরতের আদেশ পেলেন মহানবী (সা) তখন নির্জন গুহায় মহানবী (সা)-এর সঙ্গে হযরত আবুবকর (রা)ও ছিলেন। এ বইটিতে আবুবকর (রা)-এ জন্ম ও বংশ পরিচয়, তাঁর ইসলাম গ্রহন, সিদ্দিক উপাধী লাভ, খেলাফতের দায়িত্ব লাভ, তাঁর ন্যায় বিচার, মানবতা, মহানুভবতা, দানশীলতা, আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয় ইত্যাদি মহামানবীয় ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।

ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা)। হযরত উমর (রা) ছিলেন দূর্দান্ত সাহসি এবং ন্যায়বিচারে কঠোর। অপরাধের শাস্তি দিতে গিয়ে নিজের পূত্রের প্রতিও কোন করুণা করেননি তিনি। কেননা আইন সবার জন্যেই সমান। ইকবাল কবীর মোহন সাহেব তাঁর গল্পে হযরত ওমর (রা) গ্রন্থে হযরত ওমরের ন্যায়বিচার, মহানুভবতা, উদারতা, জনগণের প্রতি তাঁর দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতনা ইত্যাদি নানা গুণের বিবরণ দিয়েছেন। যে ওমর (রা) বলতেন ফোরাত কূলে একটি কুকুরও যদি অনাহারে থাকে তবে আমি ওমরকে এজন্যে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে যেহেতু আমি মুসলিম জাহানের খলিফা।
লেখক বইয়ের শেষাংশে কিছু তথ্য কণিকা পেশ করেছেন। তাতে দেখা যায় যে আধুনিক রাষ্টের অনেক নিয়ম কানুন সর্বপ্র্রথম হযরত ওমর (রা) প্রনয়ণ করে দেখিয়েছেন। যেমন- ভূমি জরিপ, অবসর প্রাপ্ত চাকুরীজীবিদের জন্যে পেনশনের ব্যবস্থা, গোয়েন্দা বিভাগ-এর প্রচলন, আদমশুমারী প্রচলন প্রভৃতি।

ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমান (রা)। তাঁর গোটা জীবন ইসলামের আলোকমালায় সুসজ্জ্বিত। মহানবী (সা)-এর সাহাবী এবং খলিফাগণ ছিলেন নক্ষত্রতুল্য। তারা আল্লাহর আইন ও মহানবী (সা)-এর জীবনাদর্শ গ্রহণ করে সোনার মানুষে পরিণত হয়েছিলেন। বইটিতে হযরত ওসমান (রা)-এর জন্ম, তিনি কিভাব ইসলাম গ্রহণ করলেন, কিভাবে খলিফা হলেন, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় তিনি কি ভূমিকা নিয়েছিলেন, তাঁর খোদাভীতি কেমন ছিলো, রাসুল (সা)-এর প্রতি তাঁর কিরূপ আনুগত্য ও ভালবাসা ছিলো, তিনি কিভাবে গণি উপাধী প্রাপ্ত হলেন ইত্যাদি বর্ণিত আছে। হযরত ওসমান (রা) একজন দানবীর খলিফা ছিলেন। মুসলমানদের পানির কষ্ট দূর করার জন্যে এক ইহুদীর নিকট থেকে এক সুমিষ্ট পানির কুপ-এর মালিকানা খরিদ করে জনগণের জন্যে ওয়াকফ করে দেন। একবার শহরে খাদ্যের অভাব দেখা দিলে বণিকদের নিকট থেকে উটের কাফেলা বোঝাই খাদ্য দ্রব্য ক্রয় করে দরিদ্র জনসাধারণের মধ্যে বিলি-বন্টন করে দেন। তাঁর দানশীলতার আরো দুইটি ঘটনা এখানে উল্লেখ রয়েছে।
হযরত ওসমান (রা)-এর জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা নিয়ে রচিত উক্ত গ্রন্থটি পাঠে সুন্দর ও পবিত্র জীবন গঠনের প্রশিক্ষণ পেতে পারে দেশ ও জাতির আগামী কারিগরেরা।
ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা)। তাঁর গোটা জীবন ইসলামের আলোকমালায় সুসজ্জ্বিত। মহানবী (সা) বলেছেন ‘আমি জ্ঞানের নগরী আর আলী হচ্ছে এর প্রবেশদ্বার। হযরত আলী (রা)-এর জীবনের নানা উল্লেখযোগ্য ঘটনার বাছাইকৃত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘটনা এ বইয়ে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। হযরত আলী (রা) খুব সাহসী সাহাবী ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন বীর যোদ্ধা। তাঁকে শেরে খোদা বলা হতো। তিনি ছিলেন মহানবী (সা)-এর চাচাতো ভাই। যার জীবন ছিলো নম্রতায় ও ভদ্রতায় পরিপূর্ণ। মস্ত বড় বীর ও বিশাল মুসলিম সম্রাজ্যের খলিফা হওয়া সত্ত্বেও তিনি দীনহীনের মতো জীবন যাপন করতেন। ইসলামের মহান খলিফাদের চরিত্র-মাহাত্ম্য, তাঁদের আচার আচরণ আজকের দুনিয়ায় রূপকথার মতো শোনালেও তা ছিলো বাস্তব সত্য। খলিফা ও সাহাবীগণের এসব মহান চরিত্রে লক্ষ্য কর্ইে দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং বিশ্বের আনাচে কানাচে ইসলামের আলো পৌছে গেছে। কেননা তারা আল্লাহর আইন ও মহানবী (সা)-এর জীবনাদর্শ গ্রহণ করে সোনার মানুষে পরিণত হয়েছিলেন।
হযরত আলী (রা)-এর জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা নিয়ে রচিত উক্ত গ্রন্থটি পাঠে সুন্দর ও পবিত্র জীবন গঠনের প্রশিক্ষণ পেতে পারে দেশ ও জাতির আগামী কারিগরেরা।

ন্যয়বিচারের কাহিনী শোন বইটিতে মহানবী (সা) ও তাঁর খলিফাবৃন্দ এবং মুসলিম শাষকগণের ন্যায় বিচারের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। মোট তেইশটি ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ এখানে দেয়া হয়েছে। ইসলাম ও মুসলমানদের ইতিহাসে এমন হাজারো ঘটনা রয়েছে। আলোচ্য তেইশটি ঘটনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং অর্থবহ। এসব ঘটনায় দেখা গেছে খলিফাকেও সাধারণ প্রজার মতো কাজীর দরবারে হাজিরা দিতে হয়েছে। বিচারের রায় তাঁদের প্রতিকূলে গেলেও নিদ্বিধায় তাঁরা তা মেনে নিয়েছেন। ক্ষমতার দম্ভে আইন কানুনকে উপেক্ষা তাঁরা করেননি। আইনের চোখে দেশের সকল নাগরিক ছিলো সমান। দল-গোত্র, জাতি-ধর্ম, বংশ-বর্ণের উর্ধে স্থান দিতেন তারা আইনকে। কারণ তাঁরা ছিলেন ন্যয়পরায়ণ ও খোদাভিরু শাষক। আল্লাহর আইনের চোখে রাজা প্রজা কোন ভেদাভেদ ছিলোনা বলেই সে যুগকে বলা হতো স্বর্ণ যুগ বা সত্যযুগ। আমরা বর্তমান সমাজেও অনেক শাষককে আদালতে বন্দী অবস্থায় হাজিরা দিতে দেখি কিন্ত তাঁরা ক্ষমতায় থাকাকালিন সময়ে নয় ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর। ক্ষমতায় থাকাকালিন তাদের বিরুদ্ধে আইনানুক ব্যবস্থা নেয় সাধ্য কার?
ন্যায় বিচারের কাহিনী শোনো বইটি আমাদের হৃদয়ে সে প্রশ্নই বারবার জাগিয়ে তোলে আমরা কি পারবো সেই সোনালী যুগ আবার ফিরিয়ে আনতে? কোন একজন শিল্পপতির বিরুদ্ধে রাজধানীর কোন এক রিক্সাচালকও যদি নির্যাতনের মামলা ঠুকে দেয় কিংবা কোন একজন মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ সরকাবী বা বেসরকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবিচারের মামলা দায়ের করে তাদের অধিনস্থ কোন কর্মচারী, তবে দলপ্রীতি, গোত্রপ্রীতির উর্দ্ধে উঠে আমরা কি পারবো সেই শিল্পপতি, মন্ত্রী বা সরকারের বড় কর্মকর্তাকে সমন দিয়ে আদালতে হাজির করতে? নায় বিচারের কাহিনী শোনো বইটি আমাদের বিবেকের দরজায় কষাঘাত করে সেসব প্রশ্নই বারবার উত্থাপন করে।
বারোটি শিক্ষামুলক ঘটনা নিয়ে এক বেদুইনের গল্প বইটি রচিত। বানানো গল্প নয়, সত্যি ঘটনা। মহাবনী (সা) ও তাঁর খলিফা এবং সাহাবী (রা)-এর জীবন থেকে নেয়া এ ঘটনাগুলো। একটি ঘটনা রয়েছে হযরত দাউদ (আ) ও হযরত সুলাইমান (আ)-এর ন্যায় বিচার সংক্রান্ত। দরবেশ বাদশা ইব্রাহিম আদহাম (রহ)-এর জীবনের ঘটনাটিও আমাদের জন্যে শিক্ষণীয়। মহানবী (সা)-এর মহান সাহাবী (রা)-এর মতো গভীর একাগ্রতা নিয়েকি আমরা নামাজ আদায় করতে পারি? অথচ নামাজে কী একাগ্রতাইনা ছিলো হযরত আলী (রা)-এর। একবার এক যুদ্ধে হযরত আলী (রা)-এর পায়ে একটি তীর বিদ্ধ হলো । কিছুতেই খোলা যাচ্ছিলোনা সে তীর। নবীজি (সা) পরামর্শ দিলেন নামাজের সময় তীর খোলার চেষ্টা করার জন্যে। হযরত আলী (রা) যখন নামাজে দাড়ালেন তখন আল্লাহর ধ্যানে এতোটাই নিমগ্ন হয়েছিলেন যে তাঁর পা থেকে তীরটি খুলে ফেলা হলো তিনি টেরই পেলেন না। বইটিতে রয়েছে সত্য ঘোষণায় হযরত আবুজর গিফারী (রা)-এর সাহসিকতার কথা।

শিশু সাহিত্যিক ইকবাল কবীর মোহন সাহেবের ‘আলোর পাখিরা’ শিশুতোষ গ্রন্থটি ইসলামের ইতিহাসের মহান চারজন খলিফা হযরত আবুবকর (রা), হযরত উমর (রা), হযরত উসমান (রা) হযরত আলী (রা)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনলেখ্য নিয়ে রচিত। ইসলামের ইতিহাসের উক্ত চারজন খলিফা মহানবী (সা)-এর মহান চারজন সাহাবী। তাঁদের জীবনের মহান চরিত্র মুসলমানদের জন্যে অনুসরনীয় আদর্শ। খলিফা গণ বিশাল মুসলিম সম্রাজ্যের শাষক হয়েও জীবন যাপন করতেন সাধারণ মানুষের বেশভুষায়। অথচ আজকের দুনিয়ায় ছোট একটা দেশের শাষক এমন কি সাধারণ একজন মন্ত্রী মিনিষ্টার, ছোট কোন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারাও জীবন কাটায় বিলাসিতার স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে। আর প্রতিষ্ঠানের মালিক পরিচালকদের কথা উল্লেখ এক্ষেত্রে নাইবা করলাম। হযরত আবুববর (রা) তাঁর জীবনে অর্জিত সকল সম্পদ ইসলাম ও মানবতার সেবায় বিলিয়ে দিয়ে গেছেন। তার মৃত্যুর পর তার তার ঘরে অবশিষ্ট আর কিছুই ছিলোনা যা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে প্রদান করা যায়। অথচ আমাদের নেতারা পাজেরো হাকান। তাদের বাড়ি গাড়ি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সবই গড়ে ওঠে। অনুসারী বা অধিনস্তদের প্রতি তাঁরা সঠিক সূ-বিচার করেন না এবং সুসম বিলি-বন্টন করেন না বলেই তাদের ভান্ডারে জমে ওঠে পুঁজির পাহাড়।
খলিফা ও সাহাবীদের জীবন হচ্ছে এক মহান আলোকোজ্জ্বল জীবন। তাঁদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করলে আমরাও হবো আলোকোজ্জ্বল মানুষ। লেখকের উক্ত গ্রন্থটির নাম ‘আলোর পাখিরা’ নামকরণটি স্বার্থক হয়েছে।
সোনালী দিনের কাহিনী শোন গ্রন্থটিতে রয়েছে ইসলামের ইতিহাসের ছোট ছোট একুশটি উল্লেখযোগ্য শিক্ষামূলক ঘটনা। অঙীকার রক্ষা করা, মৃত্যুর মুখেও ধৈয্যেও পরীক্ষা, হাবশী বেলালের ঈমানের জোর, মৃত্যুর মুখেও অপূর্ব ভ্রাতৃত্ব, প্রতিশোধ নয় উদারতা, একতাই বড় শক্তি, দায়িত্ব পালনে অবাক অনুভূতি, আল্লাহর উপর ভরসা, মহান খলিফার বিরল উদারতা, মানুষে মানুষে নেই ভেদাভেদ, ঈমানের টানে মাতৃভূমি ত্যাগ, সবা জন্য ন্যায়বিচার, সত্যেও জয় মিথ্যার পরাজয়, দীনের পরশে ধন্য জীবন, সত্য মিথ্যার লড়াই, চাকরের প্রতি উদারত, ইনসাফে ভরা পূণ্য জীবন, খোদার দীনকে ভালবেসে, একজন অবাক সেনাপতি, ঘাতকের হলো পরাজয়, এক মুমিনের জবাবদিহীতা-প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র ঘটনা ও স্বতন্ত্র উদাহরণ। এসব মহান ঘটনাগুলো মহৎ জীবন গঠনে আমাদেরকে উৎসাহিত করে।
এসো জীবন গড়ি বইয়ে আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনের কিছু করণীয় বা কর্তব্য সমন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। এসব কর্তব্য পালনে ও ব্যাক্তিগত কিছু সদাচার-এর অনুশীলনে আমাদের জীবনে আসবে পরিপূর্ণতা। আখলাখ বা সৎচরিত্র গঠনের উপর ইসলাম বিশেষভাবে তাগিদ দিয়েছে। কেননা মানুষ এবং পশুর মধ্যে পার্থক্য হলো বিবেকের ও আচার আচরণের। স্বভাব-চরিত্রে অনিয়ম ঘটলে মানুষই আচড়নে পশু হয়ে যায়। কিন্তু মানুষ হচ্ছে আশরাফুল মাখলুকাত। তাকে সৃষ্টির সেরা হিসেবে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে পশুর স্বভাব ছেড়ে সুমানুষ হতে হবে। আলোচ্য বইটিতে যে সব অধ্যায়ের উপর জোর দেয়া হয়েছে তাহলো আখলাখ, সালাম করা, আল্লাহকে ভয় করা, আল্লাহর উপর ভরসা করা, সত্য কথা বলা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, পিতামাতার প্রতি কর্তব্য, বড়দেও সম্মান ও ছোটদের স্নেহ করা, প্রতিবেশীর প্রতি কর্তব্য, আতœীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক, চাকর-বাকরদের প্রতি কর্তব্য, অসুস্থ মানুষের সেবা, অভাবীকে সাহায্য করা, শ্রমিকের প্রতি দায়িত্ব’ ইত্যাদি গুন আয়ত্ব করার মাধ্যমেই একজন মানুষ প্রকৃত ভালো মানুষ হিসেব পরিচিতি লাভ করতে পারে। এসব শিক্ষা ইসলামের মহান শিক্ষা। এরকম আরো মহান শিক্ষা রয়েছে সেগুলোকে ব্যক্তিগত জীবনে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আদর্শ মানব হিসেবে গড়ে ওঠতে উৎসাহিত করে শিশু কিশোরদেরকে।
তাঁর ‘বাছাই ছড়া’ নামক ছড়ার বইটি তাঁর লিখিত বিভিন্ন ছড়ার বই থেকে বেছে বেছে সুন্দর ছড়াগুলো নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। উনআশিটি ছড়া রয়েছে তাঁর বইটিতে। বইটি শুরু হয়েছে একটি দেশের ছড়া দিয়ে। ছড়ার নাম ‘একটি সোনার দেশ’। ‘‘লড়াই করে পেয়েছিলাম স্বাধীনতার দান/বুকটি ভরে গেয়েছিলাম মুক্ত হবার গান// অনেক মায়ের অশ্র“ ঢেলে জীবন করে শেষ/যুদ্ধ কর্ েএনেছিলাম একটি সোনার দেশ’’। সর্বশেষ ছড়াটির নাম ‘আলোর লুটোপুটি’। ‘দূর আঁকাশে আলোর পাহাড় ঝরছে আলোর বান/নীল ছুয়েছে পুর্ণিমা চাঁদ রূপ করেছে দান/জোছনা রাতের তাঁরায় তাঁরায় আলোর লুটোপুটি/রাত পোহাতে উঠে দেখি চাঁদ নিয়েছে ছুটি’’
আমাদের জাতীয় করি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে লিখেছেন-‘জীবনটা যার ছন্নছাড়া/বাধনহারা কবি/দুখু নামে সেই ছেলেকে তোমরা জানো সব-ই/ কবির গানে উঠতো জেগে হাজার লাখো লোক/স্বাধীনতার আশায় তাদের ভরতো হৃদয় বুক//সেই নজরুল প্রাণের কবি দেশের সেরা ধন/কবির গানও লেখায় আজও জাগে সবার মন’
যুদ্ধবাজ আমেরিকা ও ইজ্রাইলের বিরুদ্ধে লিখেছেন ‘দিকে দিকে গোলাগুলি বারূদের গন্ধ/যুদ্ধের নেশায় আজ খুনিরা সব অন্ধ/হায়েনার কাছে হলো মানবতা বন্ধি// শান্তির সন্ধানে নেই কোন সন্ধি’’
ছড়াগুলোর বিষয়বস্তুর সাথে মিল রেখে নানা রঙ্গের ছবি আঁকা হয়েছে ভেতরে। শিশু-কিশোররা ছবি ভালোবাসে। বইটি প্রচ্ছদ খুবই আকর্ষণীয়।
ইকবাল কবীর মোহনের জন্ম ১৯৬০ সালে। কুমিল্লা জেলার কোতয়ালী থানার বানাসুয়া গ্রামে। কৃতিত্বের সাথে শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড-যোগদান করেন ১৯৮৫ সালে। বর্তমানে সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেব বেশ সফলতার সাথে পরিচালিত হচ্ছে তাঁর পেশাগত জীবন। প্রতিথযশা লেখক হিসেবে কুড়িয়েছেন ব্যাপক সম্মান। তাঁর অগনিত পাঠকের কাছে তিনি নন্দিত ও সমাদৃত। ইত্তেফাক, ইনকিলাব, সংগ্রাম, নয়াদিগন্ত, যুগান্তর, আমার দেশ, রোববার, পূর্ণিমা, প্রতিচিত্র, চিত্রবাংলা, বিক্রম, কিশোর কন্ঠ, কিশোর নিউজলেটার, দ্বীন দুনিয়া, শিশু কিশোর দ্বীন দুনিয়া সহ দেশের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তিনি লিখে থাকেন। তিনি ব্যাক্তিগত ও অফিসিয়াল কাজে সৌদীআরব, ভারত, থাইল্যান্ড, চীন, মালয়েশিয়া ও হংকং সফর করেছেন। পেশাগত জীবনে একজন ব্যাংকার। সৃষ্টি সাহিত্য সংসদ নামে রাজধানী ঢাকার একটি সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের তিনি সংগঠক ও পরিচালক।