জর্জ বার্নার্ড শ ইসলাম নিয়ে বিখ্যাত একটা উক্তি করেছেন। “জগতের উৎকৃষ্টতম ধর্ম হলো ইসলাম আর মুসলিমরা হলো এর নিকৃষ্ট অনুসারী। ” আপাত দৃষ্টিতে উক্তিটি অসার মনে হলেও এর যথার্থতা রয়েছে। প্রথমত ইসলাম শুধু একটি ধর্মই নয় এটা একটা পুর্নাঙ্গ জীবন-বিধান। ইসলাম জগতের বুকে স্থায়ী হয়েছে এর সৌন্দর্য প্রকৃতি দিয়ে।ইসলামে আনুষ্ঠানিকতার মূল্য নাই বললেই চলে।প্রথমত এটা স্পষ্ট হওয়া জরুরী হলো ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হযরত মুহম্মদ (স) নন।তিনি ইসলামের শেষ এবং শ্রেষ্ঠ নবি ও রসূল।তাঁর তাশরিফ আনার মধ্যদিয়ে ইসলামের পুর্নাঙ্গতা আসে।ইসলামে মানব রচিত কোনো বিধিবিধান নয়।ইসলামের সব কিছুই ব্যবহারিক।

ইসলাম একটি মযহাব, একটা পথ।সহজ-সরল, সঠিক পথ।বক্রতার কোনো সুযোগ নেই।পথটা মানুষ দ্বারা নির্মিতও নয়।এবং অপ্রকাশিতও নয়।কোনো গোপনীয়তা নেই, সবই প্রকাশ্য।ইসলামের যা কিছু পালনীয় সবই হযরত মুহম্মদ (স) এর মাধ্যমে এসেছে এবং তিনি তাঁর উত্তম অনুসারী। ইসলামের প্রত্যেকটি বিধানের যথার্থ বাস্তবায়ন দেখা যায় নবি জীবনে। ইসলামের সবকিছু মোটামুটি ১১০ হিজরি পর্যন্ত সহীহ্ শুদ্ধভাবে চলছিল। নবি আদর্শের চ্যুতি তখনও দৃশ্যমান হয়ে উঠে নি।সাহাবা যুগ শেষ হয়ে যায় আর ইসলামের বিস্তৃতি ক্রমবর্ধমান হচ্ছিল।নানা সমস্যা আর সমাধান নিয়ে শাসক গোষ্ঠীর মধ্যে স্থানীয় প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে চিন্তাচেতনার প্রভাব পরিলক্ষিত হতে থাকে।আর সেখান থেকেই ব্যক্তিগত আমল আর নতুন মতবাদের আর্বিভাব।লোকেরা ভালো জেনে, নেকের আশায় নানা আমল শুরু করে।

নবি মুহম্মদ (স) কোরআন লিখিত আকারে রেখে যেতে পারেননি।লিখিত বলতে পুর্নাঙ্গ একসাথে যা বর্তমান অবস্থায় আছে।সাহাবারা মুখস্থ রাখতেন, কেউ চামড়ায়, গাছের পাতায় লিখে নিতেন। তবে সেগুলো সজ্জিত ছিলো না।যা ছিলো এনিয়ে বিরোধ ছিলো না। নবির মৃত্যুর পর আবু বকর (রা) যখন খেলাফত পেলেন তখন মুসলমানদের মধ্যে কেউ কেউ দ্বিমুখিতা দেখাতে কসুর করলোনা। তারা নবির মৃত্যুকে তাদের উত্থানের পথ হিসেবে দেখতে লাগলো। কেউ কেউ যাকাত প্রদানে অস্বীকৃতি জানালো, কেউ মিথ্যা নবি দাবি করে বসলো। আবু বকর (রা) এসব নয় উৎপাত শক্ত হাতে ও দক্ষতার সাথে মোকাবেলা করলেন। কিন্তু সমস্যা হলো যুদ্ধে মুসলিম হাফিজ সাহাবিদের মৃত্যু।ভন্ড নবি মুসাইলিমা কাজ্জাবের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে ৭০ জন হাফেজে কোরআন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন।এতে উমর (রা) কোরআন বিলুপ্তির আশংকায় কোরআন সংকলনের তাগিদ অনুভব করেন।

নবি জীবিত অবস্থায় হাদিস লেখার উপর বিধিনিষেধ ছিলো। আশংকা ছিলো কোরআনের সাথে সংমিশ্রণ। তবে হাদিস সংগ্রহ বন্ধ থাকেনি।নবি মৃত্যুর ১০০-১১০ হিজরির মধ্যে মোটামুটি সাহাবি যুগ শেষ। সর্বশেষ সাহাবি আবু তোফায়েল ১১০ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন।তারপর শুরু হয় তাবেঈ যুগ, তারপর তাবেঈন যুগ।নবির সময়ে নামায,যাকাত,হজ্জ কেমন ছিলো সেগুলো তখনও দৃশ্যমান ছিলো। নবি কিভাবে সলাত আদায় করতেন, কিভাবে যাকাতের মাশারিফ নির্ণিত হতো, মদিনা রাষ্ট্র কিভাবে সাম্য আর ন্যায় ও ইনসাফপূর্ণ শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছিল সেগুলো চোখের সামনে জ্বাজ্জল্যমান ছিলো।

ইসলামি পরিভাষা তখনও পরিবর্তন হয়নি।বিষয়ে বৈচিত্র্য আসেনি।নির্ভরশীল গ্রন্থ ছিলো কোরআন। আর সমস্যা হলো হাদিসের আশ্রয়ে যেত।এতে করে ইসলামি রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো সমস্যা সৃষ্টি হয়নি।যুগ বিস্তারের সাথে সাথে ইসলামি রাষ্ট্রের পরিধিও বাড়তে থাকে দ্রুত।এতে করে না উদ্ভুত সমস্যা দেখা দেয়।সেসব সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে স্থানীয় লোকজনের বিশ্বাস এবং রীতিনীতি, সংসস্কৃতি প্রাধান্য পায়।এতে করে একই সমস্যার নানামুখী সমাধান এসে যায়।এখান থেকেই ইসলামি ফেকাহ শাস্থের উদ্ভব। মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, মুসান্নাফে আবু শায়বা,না’ফে মাওলা,ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক,ইমাম শাফেই,ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল,ইমাম বোখারী, ইমাম তিরমিজি নিজনিজ দক্ষতা প্রয়োগ করে ইসলামের অনেক সমস্যার সমাধান প্রদান করেন।

মুসলিমরা দুনিয়া শাসন করেছে কোরআন দিয়ে, ধর্ম চর্চা করেছে কোরআন দিয়ে।কোরআন পঠিত বস্তু নয়।এটা বিধান এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। ইসলামি হুকুমমত কোরআনের হুকুম দ্বারা পরিচালিত হতো। আর ইসলামি শরিয়াও কোরআন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু সে ব্যবস্থা দ্রুতই বদলাতে থাকে।খেলাফত ব্যবস্থা উঠে যায়।ইসলামি শাসন ব্যবস্থায় মানবসৃষ্ট আইন চলে আসে।ধর্ম আর অনুসারী আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায়।অনুসারী দেখে তখন আর ধর্মকে চেনা যায় না। ইসলামি শরিয়াতে আধুনিকতার নামে ব্যক্তিবাদী আর বস্তুবাদী চেতনা প্রবেশ করে।

নবি যে বাণী নিয়ে আসেন সে বাণী চিরন্তন পথ।নবির সুন্নাহ।নবি মুহম্মদ নতুন কোনো মতবাদ বা ধর্ম নিয়ে আসেননি। তিনি ইব্রাহিম নবির ধর্মের উপর ছিলেন।এবং পিতার ধর্মের উত্তম প্রচারক।নবি যে কাজ করেছেন সেটা নবির পথ,সুন্নাহ।অনুসরণ করার জন্য নবির জীবনাদর্শ উত্তম প্রভাবক।কিন্তু পথ ক্রমেই সংকোচিত হয়ে আসে।লোকেরা ইসলামে জাগতিক বিষয়ের অনুপস্থিতি দেখে হতাশ হয়ে পড়ে।দুনিয়ার বিষয়গুলো হঠকারী আর স্বেচ্ছাচারে পূর্ণ। মানুষ নিজের মন আর মস্তিষ্কের দাসত্ব করতে ভালোবাসে।কিন্তু ইসলামে এসবের কোনোই স্থান নেই।কতক মানুষ এগুলোর সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন ইজম আবিষ্কার করে।চমকদার এসব মতবাদ মানুষের মাঝে সাময়িক সাড়া ফেলে।লোকজন গান্ধীবাদ, কনফুসিয়াজম,লেনিনবাদ, স্টালিনবাদ,কমিউনিজমবাদ,ধনতন্ত্র, গণতন্ত্র, বৌদ্ধইজম প্রভৃতি দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকে। আর এ কারণে কেউ কেউ অতিউৎসাহী হয়ে ইসলামে সাম্যবাদী আর সমাজতান্ত্রিক মনোভাব আবিষ্কার করে।

খেলাফত ব্যবস্থা উঠে যাওয়াতে ইসলামি সংস্কৃতি, তমুদ্দুন এবং এর আবেদনে গোঁড়ামি আর স্বেচ্ছাচারী মনোভাব ঢুকে পড়ে।সমাজতন্ত্রের মতো দ্রুত মাদ্রাসা গড়ে উঠে।ইসলামি শিক্ষা নামে আলাদা শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরির কাজ শুরু হয়ে যায়।মূলত ইসলামি শিক্ষা মূল শিক্ষা থেকে আলাদা কিছু নয়।এবং এর আবেদন বিশ্বজনীন এ বোধ লুপ্ত হতে থাকে।মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা জাগতিক বিষয়কে পাশ কাটিয়ে অগ্রসর হতে থাকে।এতে করে তারা সমাজের মূল স্রোত থেকে পিছিয়ে পড়ে।বিভিন্ন দল উপদলের সৃষ্টি হয়।সলাত,যাকাত,ঈমান, আকিদায় এদের মধ্যে অমিল আর রেসারেসি ভাবের উদয় হয়।নবির সলাতে বিভক্তি চলে আসে।বিভিন্নভাবে বোঝানোর চেষ্টা করা হয় কোরআন সৃষ্ট বস্তু।এর মধ্যে যে জিহাদ আর রাষ্ট্রনীতির বিষয়গুলো আছে সেগুলো অনেকের মনপীড়ার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

ইসলামকে বুঝতে হলে এর অনুসারী নয় এর ধর্মগ্রন্থের দিকে ফিরতে হবে।অনুসারী দেখে ধর্ম পালন বিভ্রান্তির সৃষ্টি করবে। বর্তমানে ইসলামে জমাত নেই।বিভিন্ন আর বিচ্ছিন্নভাবে ইসলামি শিক্ষা প্রচলিত। বিভিন্ন মতবাদ যেগুলো ওহাদাতুল ওযুদ (ভ্রান্ত আকিদা) ইসলামে ঢুকে গেছে।আর এতে করে আশয়ারী,মুতাজিলা,রাফেজা, খারিজি,মোহাম্মদী,হানাফি,শিয়া,কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের উদ্ভব। ইকামাতে সলাত ক্রমেই লুপ্ত।