পূর্বাকাশ রাঙা হল। নবীনা কোরআন তেলওয়াত শেষ করল। কখন যে জানালার ফাঁক দিয়ে কাঁচামিঠে রোদ অবাধ ভাবে ঘরে ঢুকে ছড়িয়ে পড়েছে । টেরই পায়নি। দেখতে বড়ই অদ্ভুত লাগছে। কুসুম কুসুম আবীরে বেশ পূর্ণতা। তার রক্ত রঙে লুকোচুরি খেলা দেখতে মনে পড়ল একটা অশুভ স্বপ্নের কথা।
গত কয়েক দিন হতে এ স্বপ্নটা তাকে কুঁড়ে খাচ্ছে। রাতের অর্ধেক ঘুম ছিন্ন করে তাড়িয়ে দিচ্ছে। কখনো মনের পাটাতনে দুর্ভাবনার সাথে যুদ্ধ চলছে। খুজে পায়না সুত্রের পরিচয়। মাকে ও খুলে বলবে কিনা, বুঝতে পারে না।

নবীনার ভাবনা ছুটে ভবিষ্যতের পানে। জিনাতকে নিয়ে তার কেমন কাটবে?

নবীনা বিয়ে অপেক্ষমান অনূঢ়া। ইতিমধ্যে বিয়ের সব পথ পরিস্কার। নিজের সাজানো কাননেই পুষ্পাহরণ। দিনখন প্রস্তূত। এমন সময় বারবার দুঃস্বপ্নটা ফনা তুলে দংশন করে। জীবনের রঙিন স্বপ্নগুলো বিব্রত-আশাহত করে ঝুলে দেয় ললাটে। দাগ কাটে মনের প্রাঞ্জল সুখে। সেই সুখের ব্যানারে পুঞ্জিভূত হয় রঙ বিরঙের হতাশা।

নবীনার লেখাপড়া শেষ। মায়ের সংসারে রক্ষিতা। গুনী তনয়া। দুঃসময়ের স্বারথি। ভাইয়ের প্রেরণা। এমন মায়া মমতার বন্ধন ছিঁড়ে একজন পুরুষের হাত ধরা যে নারীত্বের আকাঙ্ক্ষা। এ সত্য টুকু মানতে হ্নদয়ে কষ্টের দানা বাঁধে। বিচ্ছেদেরর ব্যথায় বারবার বিব্রত হয় জীবনের রঙতুলি।
শীতের কুয়াশা স্নাত সকাল। গরম কফিতে ফুঁ না দিলে নাকি মায়ের সকালটাই বৃথা মনে হয়। তাই মায়ের নেশাটার প্রতি সমীহ জাগে। নবীনা অসমাপ্ত ভাবনা ও কোরআনটাকে যত্নে গুছিয়ে রেখে পা বাড়াল রান্না ঘরের দিকে।

শামীমা বাশার। বিধবা গৃহকর্ত্রী। জীবন সায়াহ্নে ক্লান্তহীন সৈনিক। সন্তান বাৎসল্যতায় ঋজু। ফজরের নামাজ শেষে পাগলীমার মাজারের পাশে স্বামীর কবর জিয়ারত করছে। কত দিন জিয়ারত হয় নি। আজ মেয়ের জীবন সিদ্ধান্তের সীমান্তে। বাশার থাকলে কতই না সুখি হত সে। ওর পছন্দের বর। ছেলের একটা জীবিকার সুব্যবস্থা হলে ওরও হাতে তুলে দিবে নারীর পাণি। তা সময়ের অপেক্ষা। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া দরুদ ও মুনাজাত করতে করতে মনটাতে একপাল হাওয়া লাগল শামীমার। ভেসে আসল অতীত।

ভালবেসে সে বাশার কে বিয়ে করেছিল কলেজ জীবনে। মা-বাবা মেনে নেয়নি বাশারকে। শামীমা ও হার মানেনি। কোনদিন মাথা নোয়ায়নি পিতৃালয়ের দ্বারে। বাশারের হাত ধরে ঐযে বাবার গৃহ ত্যাগ। সেদিকে আর ফিরে তাকায় নি। ভাগ্যের ভাঙ্গা তরীতে পা রেখে স্রোতে ভেসে চলে জীবনের টানে।। বাশারকে প্রতিষ্ঠিত করতে অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছিল তাকে। নেত্র পল্লবের সঞ্চিত সলিলে এক সময় প্রশমিত হয় মনের ক্ষত।
একদিন মহান আল্লাহ সহায় হয়। বাশার সরকারি স্কুলে চাকরী পায়। ঘুড়ে যায় জীবনের মোড়। স্বস্তি পায় শামীমা। জীবনের বিকল গাড়ি ছুটতে থাকে স্বচ্ছ পথে। চাঁদনী রাতের উচ্ছাস দুপুরে চাঁদ ভেঙ্গে কোলে আসে নবীনা। বছর ঘুরে শিপন। তাদের নিয়ে দু’জন মিলে জীবন্ত স্বপ্ন আঁকে।
এভাবে গড়াতে থাকে সময়ের চাকা। একদিন ঝড় এসে দুয়ারে হানা দেয়। ছিঁড়ে যায় ভালবাসার গ্রন্থি। নিভে যায় ঘরের জ্বলন্ত পিদীম। আচমকা হ্নদক্রিয়া বন্ধ হয়ে বাশার ছেড়ে দেয় শামীমার হাত। অভিমানে চলে যায় একাকী। সবকিছু শামীমার মাথার বেনীতে গুছে দেয় বাশার। ছোট-ছোট সন্তান, ঘর-বাড়ি ও অসমাপ্ত জীবনের সুখ-শান্তি। শামীমা আঁচলে চোখ মুছে তুলে নেয় স্বামীর বিকল সংসারের ঘানি।
অসমাপ্ত সুখের তরী ভাসতে ভাসতে পৌছে গেল তীরে। কিন্তু বাশার নেই। যাত্রি শুধু শামীমা একাকী। কথা গুলো ভাবতে কপোল বেয়ে খসে পড়ল এক ফোটা নয়ন নীর। মলিন মুখটাকে আঁচলে মুছে নিল শামিমা। মুনাজাত শেষ করে বাড়ির পানে মুখ ফিরাল। ওদিকে আবার কফি জুরিয়ে বরফ হচ্ছে নাতো ?

বিকেল বেলা। হঠাৎ একপশলা বৃষ্টি নেমে গেল। আকাশটা বেশ পরিষ্কার। দিগন্তে স্বচ্ছ বহুরৈখিক আবীরের লীলা খেলা।
শিপন গুটি পায়ে বাড়ির পশ্চিম পাশে সরোররে ধারে বেড়িয়ে এল। একটানা বাসের জার্ণিতে মনের পাতায় বিষন্নতার কালি পড়েছে। নিশ্চয় মুক্ত বাতাসের হিমেল পরশ পেলে মনটা প্রশান্তিতে ভরে উঠবে।
শিপন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্র। নান্দনিক প্রতিভার অধিকারী। বরাবরই পরীক্ষার ফলাফল সৃজনশীল। তা দ্যাখে মায়ের সুপ্ত মনে রঙিন স্বপ্নেে হাওয়া লাগে। দোল খায় মধ্যাকর্ষণ শক্তির মাঝে।
শিপন রাজনীতির করে। মন মগজে আল্লাহ ও রাসুলের আদর্শ মজ্জাগত। পিচ্ছিল পথের মুসাফির। কোরআনের রাজ কায়েমে আপোষহীন সৈনিক। সত্যের সন্ধানে সর্পিল পথের একক দুর্গ । জীবনের বাঁকে বাঁকে লাঞ্জনা গঞ্জনা কুড়িয়ে সহিষ্ণুতার ইতিহাস রচনায় অভ্যস্ত। এ জীবনই তার স্বাচ্ছন্দময়, সুখবোধ মনে হয়।
শিপন সরোবরের তীরে দাঁড়াল। সামনে হংসরাজের দল, পাখির কুজন, ঘেড়ে রহস্যময় মাছের খেলা, বাতাসে জলের মৃদু ঢেউ সব খানে খুজে পায় মায়ের ছোঁয়া। মা দু’ ভাই বোনের ফিন্যান্স সহায়তা দিয়ে সংসারটাকে সাজিয়েছে সমৃদ্ধ শিল্পসত্তার আদলে। ভাবতে বড়ই স্বাদ লাগে। বাবার স্মৃতি মনে নেই। মায়ের মধ্যে খুজে পায় বাবার অতীত। প্রশান্তির তন্ময় হেসে কুটিকুটি হয় মনের কুঠিরে।

অপ্রত্যাশিত ভাবে ডোমারে জিনাতের সাথে সাক্ষাৎ হল শিপনের। জিনাত বাটার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। শিপন বিচিত্রা বিপনীর দিকে যাচ্ছে।
-“শিপন।” একটা ডাক পড়ল শিপনের কানে।
শিপন পাশ ফিরাল। মিষ্টি হাসি মিশ্রিত একটা অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জিনাত। হাত বাড়িয়ে দিল শিপন।
-“মেঘ না চাইতে বৃষ্টি, জিনাত ভাই।”
-“মনের টান বলতে পার, শিপন।” মুচকি হাসি নিয়ে মুসহাফা সারল উভয়ে।
-“কেমন আছেন আপনি।”
-“আলহামদুলিল্লাহ্। রাজশাহী হতে কবে এসেছ?”
-“গত পরশু। চলেন কোথাও গিয়ে বসা যাক।”
-“হোটেলে ? “
-“না, ফাঁকা কোথাও গিয়ে বসি।”
-“চল,তাহলে কলেজ মাঠে। কোলাহল মুক্ত অবারিত সবুজ মাঠ।”
-“জীবনটাই তো ঐ ক্যাম্পাসের খোলা মাঠে কাটালেন। দেখছি, আদৌ তাকে ভুলতে পারেন নি ?”
-“ভুলব ? এই শহরের লাখো মানুষের স্বপ্ন যেখানে কবরস্থ হয়েছে। যার পবিত্রতা আজ মুখ থূবরে মাটিতে গেড়ে বসেছে, তাকে ? “

শিপন কথা বাড়াল না। তারা দুজনে কলেজ মাঠে পৌছল। দেখা হল রাসেদের সাথে। তিনজনে মুখো মুখি বসে জমিয়ে গল্প করল।
গল্পের খরকুটো স্রোতের অনুকুলে যে ভাবে ভাসতে লাগল। তা —–
-“শিপন ,বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা কি?” জানতে চাইল রাশেদ।
-“দেশের যা অবস্থা, তাই।” শিপনের উত্তর।
-“দেশে তো আজ হিন্দুত্ববাদের আগ্রাসন চলছে শিপন। ঘন কুয়াশার মত পথ ঘাট ঢেকে ফেলেছে ইসলাম নিধনের চক্রান্ত। তাগুত সরকারের নিশানা জামাত-শিবির নয়। নিশানা হচ্ছে ইসলাম। আলেম ওলামা, দায়ী মোবাল্লেগ. হকের জরাল কন্ঠস্বরকে স্তব্ধকরে চলছে রামরাজ কায়েমের এজেন্ডা বাস্তবায়নের মিশন। রাশেদ একটানা বলে চলল।”
-“তবে প্রশাসন কি নিরপেক্ষ আছে রাশেদ? গো-পুজারী দের একনিষ্ঠ দাস হিসাবে গোলামী কুঁড়াচ্ছে। গূম-খুনের অভয়ারন্যে পরিনত করেছে দেশের ভুখন্ড। দেশকে হিন্দুত্ববাদের সর্গ রাজ্যে পরিনত করতে ধাঁড়াল করাত চালাচ্ছে ডানপন্থীদের পীঠে ।”
-“জাতির হাত বাঁধা, বিবেক ঘুমন্ত, শক্তি কে অসহায় ভাবছ, শিপন।”
-“রাষ্ট্রশক্তি যখন কব্জাগত। পক্ষপাতিত্ব, দালালিবাজি করছে। তখন আর করার কি আছে, রাসেদ ?”
রাসেদ ও শিপনের মধ্যে এভাবে কথা চলছিল। জিনাত খুব মন দিয়ে কথা গুলো শুনছিল।হঠাৎ সে মুখ খুলে বলল-
-“তোমার মনে আছে শিপন। বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফের ঐ হদীস টির কথা।”
-“কোন হাদীসের কথা বলছেন, জিনাত ভাই ?”
হযরত জাহাশ (রা) রাসুল (স) কে জিজ্ঞেস করলেন—“-يارسول الله اصهلك وفينا الصالحون قال نعم اذا كثرالحبث “

অর্থ-“ইয়া রাসুলআল্লাহ আমাদের মধ্যে সৎ ব্যক্তিরা, আলেম-ওয়ালামাগন বিদ্যমান থাকার পড়েও ধ্বংসশীলতা কি আমাদের পরাস্ত করবে।
উত্তর হল—হ্যাঁ, যখন মন্দ কাজের সয়লাব ছড়িয়ে পড়বে।” [বুখারী ৩৩৪৬, মুসলিম ২৮৮০]

-“এই মন্দ কাজ গুলো আসলে কি কি ?” জিনাতের ভাই। রাসেদের প্রশ্ন।
-“গুনে দেখেছ কখন?”
-“নাতো?” শিপন ও রাসেদ এক সাথে বলল।
-“পৌত্তলিক পুজারী নাস্তিক বাদীদের বন্ধু রুপে গ্রহন করছি। বিশ্বাষ-সম্মান করছি তাদের প্রতিশ্রুতি। অপর দিকে, যারা সত্য কথা রলছে।
তাদের কাঁধে অবজ্ঞা, অবহেলা, অপমান তিরস্কার লাঞ্চনা-গঞ্জনার পাহাড় তুলে দিচ্ছি।”
-“শুধু তাই নয় জিনাত ভাই, দিন দিন ধর্ম, ইজ্জত, সম্মান, সার্বভৌমত্ব নিয়ে করছি জুয়া চুরি।” বলল শিপন।
-“হ্যা,বাদ পড়েনি যুগের কসাই, শতাব্দির ফেরাউনদের হাতকে শক্তিশালী করার চেষ্টা। তাদের প্রলোভন কে আর্শিবাদ জ্ঞানে ভক্তি দিচ্ছি। মনে প্রানে শ্রদ্ধা করছি।”বলল রসেদ।
-“নারী ধর্ষনের প্রতিযোগিতায় মেতে তো উঠেছে। সেটা কি কমেছে কখনো, রাশেদ? ” দ্যাখেছ, দেশটাতে নারীদের সম্ভ্রম নিয়ে পতিতালয় খুলে বসেছে এক শ্রেণির ক্ষমতাধররা। একজন হিন্দু কলামিষ্ট মিনা ফারাহ সহ অনেকে এনিয়ে হতবাক।”
-“আমরা দাঁড়াব কোথায়? বিবেক বর্জিত জ্ঞানে, শিরিক বাদের আবর্জনায় নোংরা বানাচ্ছি জাতির জায়নামাজ। সেটা কি বিবেচ্য নয়?” জিনাত ভাই।
-“আমাদের মত পার্থক্যের সুযোগে ভিন্ন রঙে শক্তিশালী হচ্ছে সেকুলারিজম বলয়।
কিতাবুল্লাহ, সুন্নাতে রাসুল (সা) এর উপর সমাজ বিনির্মানে অনেকের অনিহা। ঠাট্রা বিদ্রুপ। এই সব মন্দ কাজে ডুবে গেছে দেশ, সমাজ, জাতি ইত্যাদি।” জিনাতের বক্তব্য।

কথা চলছিল তিনজনের মধ্যে। নীড়ে ফেরা পাখিদের দল মাথার উপর দিয়ে উরতে লাগল।
শিপনের সম্বিত এল।
-“আজ থাক জিনাত ভাই। সন্ধ্যা হল। আমাদের বোধ হয় উঠা দরকার।”
-“হ্যাঁ, জিনাত ভাই, রাসেদ ও বলল।
-“তাহলে চল উঠি।”
বেলা লাল হয়ে পাটে বসল। একটু পরে ইথারে ভেসে এল মাগরিবের আজান। তিন জনে নামাজের জন্য তাড়া নিয়ে মসজিদের দিকে ছুটল।

জিনাত পাটি অফিসে ঢুকল। পাটি করে, পাটিই ওর জীবন। অনেক দিন পাটিতে বসা হয়নি। ভিতরে পা দিতেই ভুতের চিৎকারের মত কানে পড়ল সীমান্ত ট্রেনের সিটি। চিলাহাটির উদ্যেশে ডোমার ছাড়ল। দুরে রেলগেটে ভীর চোখে পড়ল। অফিসে এখনো দলের কেউ আসেনি। ফাঁকা রুমে চেয়ারটা টেনে বসতেই মোবাইলে ভেসে উঠল শিহরন। হাতে তুলে নিতে চপল মনটা নড়ে উঠল। নবীনার ফোন।
রিসিভ করতেই কানে পড়ল-
-“আসসালামু আলাইকুম।”
-“ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহ।”
-“কেমন আছ, জিনাত?”
-“ভাল থাকার চেষ্টা চলছে। কই ভাল থাকতে পারছি, নবীনা ? “
-“মনে চিতা জ্বলছে বুঝি?”
-“শুধু মনে বলছ কেন? দৃষ্টি জুরে যা দেখছি, শুনছি, ভাবছি সবে তো চিতার মতন মনে হচ্ছে।”
-” কালো মেঘের আভাষ পাচ্ছ নাকি?
-“দেশের আকাশে অরাজকতা, অস্থিতিশীলতার ঝাপটা। প্রতিটি মুমিনের প্রানে উপ্তপ্ত শ্বশল। বলতে পার, কে স্বস্তির হাতছানি পেয়েছে। আর কার দিগন্ত কালো মেঘহীন রয়েছে?”
-” তুমি কিসের কথা বলছ, জিনাত? “
-“কেন, দ্যাখনি অসাপ্রদায়িকতার বিষাক্ত নিঃশ্বাষ পড়ছে জাতির ঘাড়ে। পরচর্চা চলছে আলেম ওয়ালামাদের নামে। চলছে পুলিশের বিবেক বিলাস আল্লাদ। জাতির বিরুদ্ধে তাদের জিহ্বা লাঘাম ছেঁড়া । ধর্মচর্চা গৃহবন্দি। রাজনীতি জিম্মি। গনতন্ত্র নির্বাসন। স্বাধীনতা একক পক্ষের মুষ্টিহত।”
-“সবে বুঝলাম, কিন্তু স্বাধীনতা একহস্তে মুষ্টিহত। এ বিষয়টা বুঝলাম নাতো ?”
-“লক্ষ্য করেছ, নবীনা। আজ স্বাধীনতার গায়ে কত কর্দমার দলা।”
-“মানে।”
-“মানেটা সহজ। স্বাধীনতাকে একপক্ষ ভোগ করতে মরিয়া। যার পরিনতি ভোটহীন ক্ষমতা। অর্বাচীনদের অপরাধ ঘটিত সমাজের দায়ভার
ইসলাম পন্থীদের কাঁধে চাপানোর প্রবনতা। যেমন- মুর্তি ভাঙ্গা, বাসে অগ্নি সংযোগ করা, সংখ্যা লঘুদের বসতবাড়িতে হামলা করা।ইত্যাদি, ইত্যাদি।
-“হয়েছে, হয়েছে। এটাকে যদি তোমরা স্বাধীনতার অপধৃষ্টতা বল। তাহলে রাজনীতির রাস্তা কোনটা। ঘরে বসে আঙ্গুল চুষাটা ?”
-“শুধু অপধৃষ্টতা বলছ কেন ? স্বাধীনতা নিয়ে চরম খেয়ালিপনা চলছে। বলতে পার, যে পতাকা ত্রিশ লক্ষ বীরদের রক্তশ্নাত ভুমির উপরে পোত্তলিকতার সংস্কৃতি দেখে পত্ পত্ করে। সেই পতাকার জন্য জীবন উৎসর্গকারী দেরকে “শহীদ” বলি কি করে ? “
-“জিনাত, তোমাদের শিল্প-চেতনায় তোমরা দ্যাখ সোনালী ভোরের নবীন সুর্য। জাতির ভাগ্যকাশে সে কি কখনো আলো ছড়াবে ?
-“আমরা আশাবাদী। বাকিটা আল্লাহর মর্জি।”
-“দেখেছ, জাতির বিবেকে যে অসংখ্য উঁইপোকা মাটির ডিবি তুলেছে। তা কিভাবে লুকাবে?”
-“সেটাই তো আসল কথা। জাতির নিলর্জতা দেখে বিস্ময় হয় নবীনা। যে মানচিত্রের জন্য দু’লক্ষ নারী সম্ভ্রম হাড়াল। সেই মানচিত্রের উপর মুর্তি দাম্ভিকতা ভরে দাঁড়ায়। বল, এই মা-বোনদের কে ‘ বীরঙ্গনা ‘ বলি কোন লজ্জায় ?”
-“জিনাত,আমি তোমার এতসব রাজনীতি, দল, সমাজ,দেশ বুঝি না। আমি বুঝি একান্ত তোমায়।”
-“আমার প্রতি তোমার এত বিশ্বাষহীনতা কেন নবীনা ?”
-“বিশ্বাষহীনতা নয় জিনাত, মনের অন্তঃদ্বন্দ্ব। তোমাকে হাড়ানোর ভয়। বাকিটা অন্তরাল ও বলতে পার?”
-“চোখের অন্তরাল কে মনের পাল্লায় ওজন করে মনে কষ্ট বাড়িওনা ? “
-“মনটা তো আর পাথর নয়। গত পনের দিনে একবারও ফোন করনি। জানতে চাওনি কেমন আছি।”
-“জাতির এ দুর্দিনে তোমায় নিয়ে মত্ত থাকার সময় কই? বিয়ে করে বাসর রাত কাঁটাব, হানি মুনে যাব, এ দুঃস্বপ্ন যে আমার দু’চোখ হতে ছুটি নিয়েছে, নবীনা?”
-“আমার চেয়ে তোমার কাছে দেশ, জাতি, সংগ্রাম বড় জিনাত?”
-“তোমাকে ছোট করলাম কবে। দেশ আমার বুকে, তুমি নিশ্বাসে। তোমার অমর্যদা তো করি নি।”
-“বেশ। তোমার নিঃশ্বাষের ছোঁয়ায় অবগাহন দিতে অপেক্ষা করব। ঠিক বাসর রাতে, মেহেদী রাঙা হাতে।”
-“হাঃ হাঃ।”
-“হাসছ যে।”
-“হাসী পাচ্ছে তাই । আমার এক হাতে মুত্যুর শরাব পেয়ালা অন্যহাতে প্রিয়ার বেণী করা দীঘল চূল। কি করব বুঝতে পারছিনা। তাই হাসছি।”
-“জিনাত, তোমাকে ক্লান্ত মনে হচ্ছে, যেন?”
-“পুলিশ আমার পিছু নিয়েছে। বন্দী পরোয়ানা জারি করেছে। এদিকে বিয়ের দিনখন ও ঘনিয়ে এসেছে। ক্লান্তি আমার পা জড়িয়ে অবস করছে। বলো, কোনদিকে ছুটি।”
-“কোন কেজটায় পরোয়ানা?”
-“দাগীদের আবার কেসের সংখ্যা-ধরন আছে নাকি?
-“সে যাক, তুমি গোল্লায় যাও। আন্টিকে ডাক্তার দেখার কথা ছিল। দেখিয়েছ? ওনার কোমরের ব্যথাটা এখন কেমন?
-“মাশাআল্লাহ, তুমিতো আমার পরিবারের খোজ খবর সহ রাখতে শুরু করেছ?”
-“আরে ধ্যাৎ, তুমি বেহুলা হয়ে ছুটতেই থাক। যত পার ছুটো । ফোন রাখছি।”
-“রেগে গেলে”
-“না। হেয়ালীপনা আমার সহ্য হয় না।”
-“রাখ, আল্লাহ হাফেজ।

বাড়িতে বিয়ের অলীমা খানার আয়োজন চলছে। আঙ্গিনায় আত্নীয়-স্বজনের সমারোহ। রাশেদ, শিপন, রবিন, সকলে স্ব স্ব দায়িত্বে ব্যস্ত। পুরো বাড়ি জুড়ে হৈচৈ। খাওয়া দাওয়া শেষে যে যার পথে মঞ্জিলে ফিরছে। শামীমা বাশার উপহার সামগ্রীর তদারকি নিচ্ছে। হঠাৎ কে যেন কানে পাড়ল গতরাতে দেবীগঞ্জে এক মন্দিরের পুরোহিতকে দুর্বৃত্তরা জবাই করে হত্যা করেছে।
টিভিতে ফলাও করে প্রচার চলছে। অনলাইন, ফেসবুক, প্রেস সহ সকল মিডিয়ায় তোলপাড় হচ্ছে। শহরে থম থম অবস্থা। গোয়েন্দা পুলিশ, ডিবি, এসপি, ডিসি, চারিদিকে চষে ফিরচ্ছে।

নবিনা কে ওর বন্ধু বান্ধবীরা ঘরে ঘিরে ধরেছে। নানা রসিকতা করছে। এক সময় দাদু ঘরে ঢুকে সবাইকে পেটে খিল ধড়িয়ে হাসিয়ে গেল। বলল,” প্রিয়বান্ধবী, এই ছিল তোর মনে। আমার সাথে প্রেমের অভিনয় করে, বেঁচে নিলে জিনাতকে।”
একগাল হাসল সবাই। হাস্য রসে কেটে গেল বিকালটা।
রাত এগারটার দিকে জিনাতের কার-মাইক্রোর বিরাট বহর বিয়ে বাড়িতে ঢুকল। নবীনার বান্ধবীদের সাথে মিষ্টি খাওয়া ও ফিতাকাটা নিয়ে তর্ক বাঁধল। শামীমা বাইরে এসে মিমাংসা ও করল।
দেখতে দেখতে বিয়ের সকল কার্যাদি সম্পন্ন হল। বর-কনে একই টেবিলে খেতে বসল। খাওয়া শেষে বিদায়ের পালা। একে একে সবাই মাইক্রোতে গিয়ে উঠল। নবীনা মায়ের গলা জরিয়ে কাঁদল। তারপর ছোট ভাই শিপনের গলা ধরল। কাঁদল জন্মের কাঁদা। মন ভরে কাঁদল। ওকে জড়িয়ে খুব করে কাঁদতে মন চাইল। ছাড়তেও হল একসময়। কান্না থামিয়ে বলল, “কাল কিন্ত একবার দেখে আসবি আমায়।”

শিপনও কাঁদল। ওর নরম মনটা ডুকরে উঠল বিচ্ছেদ বেদনায় । সবকিছু সময়ের স্রোতে হাড়িয়ে গেল। বিদায় হল নবীনা জিনাতের। শুন্য হল বাড়ি । শামীমা বিদ্যুৎ বাতি নিভিয়ে বালিশে মাথা রাখল। অন্ধকার রাত চারিদিক নিরব নিস্তব্ধ একাকার। ঘড়িতে সময় একটা। নবীনা নেই। কিন্তু নবীনার বিরহে বিষন্নতায় হাহাকার গোটা বাড়িটা।

আজ তিনদিন। নবীনা বাসর ঘরে। অপূর্ব রুপে সাজানো হয়েছিল তার বিছানাটা। ঠিক দুটো হাতের মত মেহেদি রঙে। মেঝের উপর একজন অপরিচিত মহিলা ঘুমে বিভোর। তা ছাড়া ঘরে কেউ নেই। নিঃসঙ্গ নির্বাক তাকিয়ে আছে। জানালাটা খোলা। বাইরে অন্ধকার। মায়ের দাফন ক্রিয়া শেষ হয়েছে। যেতে পারেনি। এমন হতভাগা সন্তান বোধ হয় এ ভুবনে সে একাই। মায়ের মৃত্যু মুখটাও দেখতে পারল না। পাশে বসে এক হরফ কোরআন ও পড়েনি । জিনাতের নিঃশ্বাষের উষ্ণ অনুভব ও ভাগ্যে জুটল না।

বিয়ের রাতে গাড়ি হতে নামতে না নামতে জিনাত কে পুলিশ ধরে নিয়ে গেল। ওর হাত ধরে বাসর ঘরে ঢুকার সৌভাগ্য হয়নি। নবীনা হাত ধরার আগে পুলিশ হাতকড়া পরিয়েছে জিনাতের হাতে। শিপন ও রাশেদের খোজ মেলেনি। ওরা রাতেই বিছানা হতে নিখোঁজ। শুনা গেল রাসেদ পুলিশের হাত খসে পালিয়েছে। সত্য কি মিথ্যা হদিস মেলেনি। দেবীগঞ্জের পুরোহিত হত্যা মামলায় বাসর রাতে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে শপর্দ করা হয়েছে জিনাতকে। কেউ কেউ বলছে শিপনকে পুলিশ মেরে দিয়ে ক্রোচ ফায়ারের কথা বলছে।

এক যুগ ধরে জ্বলছিল চোরাবালি রাজনীতির আড়ালে এমন দমন নীতির লেলিহান শিখা। এ আগুনে শুধু একক কোন ব্যক্তির কপাল পুড়েনি, পুড়েছিল পুরো জাতির। কোন বালিকার বাসর রাতের স্বপ্নই শুধু ভাঙ্গেনি। ভেঙ্গে ক্ষত বিক্ষত হয়েছে পুরো মাটির। সেদিনের কলেজ মাঠের গল্প আলোচনা যে সন্দেহের আগুনে প্রেট্টোল ঢেলে দিয়ে জীবন ঘাতি হবে। সর্বনাশ ডেকে আনবে। তা কবে কে কল্পনা করেছে?

নবীনার দাঁড়াবার শক্তি নেই। মন ভেঙ্গে চৌচির দেহ ভেঙ্গে শক্তিহীন । কোন মতে ফজরের নামাজটা আদায় করতে না করতে। রক্ত লাল উষ্ণ আবীরে সুর্য পুর্ব গগনে উদিত হল। দেখতে দেখতে একফালি রোদ উপহাস করতে ঘরে ঢুকল। রোদ আর রক্ত একই। স্বপ্নের সাথে মিলে গেছে বাস্তবতা। কিছুদিন আগে যে স্বপ্ন সে দেখেছিল তা ছিল। -“পরীক্ষায় হলে তার কলম রক্তের মত অতিরিক্ত কালি ছুড়ছে। লিখতে না পারায় বসে সে কাঁদছিল। কান্নায় চোখ হতে রক্ত অশ্রু ঝড়ছিল।”
সেই স্বপ্নটা তার জীবনটাকে নিয়ে এভাবেই রঙ্গখেলার প্রহসনে মেতে উঠল। চোখে পাতায় ভেসে উঠল কবি নবারুন ভট্টাচার্যের সেই বিখ্যাত কবিতা।
এ মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না।
এ জল্লাদের উল্লাস মঞ্চ আমার দেশ না।
এ বিস্তীর্ণ শ্বশ্বান আমার দেশ না।
এ রক্ত শ্নাত কশাইখানা আমার দেশ না।

নবীনা উঠে দাড়াল। একটা দীর্ঘ শ্বাষ ছাড়ল।বিসর্জন সুখ! নিসঙ্গতা সুখ!! ত্যাগই প্রকৃত সুখ। দাফনের কাফনে গল্প লেখার ইতিহাস তো বিশ্বাসি মুমিনেরর। আর এই সুখের ইতিহাস হবে জাতির এগিয়ে চলার সুখপাঠ ও পাঠশালা। এটাই মনের বড় সান্তনা।