পুরোনো হলদেটে রংছাটা ঐ যে দালানটা। যার প্রায় একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা। খোঁপ খোঁপ সব গ্রীলের গরাদের ফাঁক দিয়ে দৃষ্টি ফেললেই অতবড় সুবিশাল বিস্তীর্ণ আকাশটাকেও কেমন টুকরো টুকরো ছবি বলে মনে হয়।ঠিক কতবছর আগে যে এই বসতালয়ের বসনে রঙের পোচ লেগেছিল তা বলা দায়।আশেপাশের কিছু মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা চকচকে এ্যাপার্চমেন্ট।দেখতে একদম মর্ডানাইজ তরুণদের মতই। বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা স্মার্ট ছোকড়াদের মত সেইসব নব্য দালানেরা নিজেদেরকে যেন শো অফ করে যাচ্ছে দিনরাত অবিরত। কি সুন্দর নিপাট পরিপাটি তাদের সাজ।চারাধারে স্কয়ার কাটিং এর গার্ডেন তাতে শোভা পাচ্ছে নানা রকমের ফুল আর পাতাবাহারের সমাহার।কিছু কিছু ফুলদের তো রীতিমত চেনাই দায়!লম্বা লম্বা পাতার আড়ে মুখ লুকোনো কলাবতীদের পাশে কি এক ছোট ছোট নীলচে ফুলে ছেয়ে থাকা এক গাছ! কি ফুল রে এটা বাবা! বাপের জন্মেও তো এটা কখনও দেখেনি বিশু। হতচ্ছাড়া পথশিশুদের মতই উপেক্ষিত সেই সেঁকেলে বিল্ডিং এর চতুর্থ তলা থেকে রোজ ঐ লালসাদা এ্যাপার্টমেন্টের দিকে একবার! না না! একবার নয় বেশ কয়েকবার দৃষ্টি ফেলে ও। টিমটিমে হলদে আলোর বিপরীতে থাকা সেসব ফ্ল্যাটগুলোতে ততক্ষণে জ্বলে ওঠে ফটফটে আলো। নিজেকে কেমন যেন সেঁকেলো মনে হতে থাকে বড়। মাইরি! এই বদ্ধ খুপড়ি ঘরে থেকে মনটাও কেমন কেমন করে ওঠে মাঝে মাঝে।

রোজ বিকেলে তাই ছাদে উঠলে পড়ে একটু শান্তি। ঘোপ ঘোপ গ্রীলের ফাঁকে আটকে থাকা সেসব আকাশের টুকরো গুলি কেমন ম্যাজিকের মত একটার সাথে একটা জোড়া লেগে বিশাল এক নীল ক্যানভাসে পরিণত হয়। যেন একনিমিষেই পাজেল সলভ করে নেওয়া। রোদ ঢলে পড়া লাজুক বিকেলে এই রংছাটা বিল্ডিং এর চিরচেনা মন্থর শ্রী টা বদলে কেমন উৎসবের আমেজ তৈরী হয়ে যায়। দোতালার ছট্টু, একতলার তারিক আর ঐ তিনতলার বিহারী ছেলে ওয়াসিম। সবার হাতে তখন নানা রং আর বর্ণের ঘুড়ি। আহা! বিকেলটার আমেজটাই যে আলাদা!

হতচ্ছাড়া এই ভবনের ছাদে উঠে এই সব সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ গুলিকে ছেড়ে দিতেই উড়তে থাকে সাঁই সাঁই করে। বিশুর ঘুড়ি গুলি হয় বেশ লড়াকু গোছের। কি সুন্দর করে বাতাসের বিপরীতে তার ঘুড়ি মুহুর্তেই ভেসে উড়তে শুরু করে দেয়। নির্মল বাতাস ঘুড়িকে ভাসিয়ে নিয়ে চলে তার নিজের ছন্দে। তবে কেন যেন বেশিক্ষণ আকাশ দাঁপাতে পারে না বিশু। ইশ! কেন যে প্রতিবার এমন হয়! গায়ে কটকটে রং এর পান্জাবী চাপিয়ে নেওয়া ওয়াসিম এই ব্যাপারে বড়ই ওস্তাদ। চোখে মুখে দারুণ এক আত্মবিশ্বাস। খেলে বেড়ায় ওর। ছোকরার ভাবটা এমন যতই ওড় না কেন আকাশটা আমারই। আজও তার ব্যতিক্রম হল না। পান্জাবীর কলার উল্টে ওয়াসিম বিশুকে বলে যায়

: আব্বে… ও… বিশু… উড়ালে আপনা পাতাঙ্গ!

ঠোঁটের কোণে ঝুলে রয়েছে সেই প্রত্যয়ী হাসিটুকু।বিশুও হেসে উত্তর করে।

: জরুর…

উড়ল ঘুড়ি। নানা রঙের ঘুড়ি।বাই বাই করে বদলে নেয় তাদের গতি। একবার এদিক একবার ওদিক। কখনও টাল সামলাতে না পেড়ে নিচে গোৎ খেয়ে পড়বার উপক্রম হয়। এই এই গেল রে, গেল রে বিশু প্রমোদ গুণে।নাহ! শেষ রক্ষা হয় আবারও। মাথা চাড়া দিয়ে আবারও ভাসিয়ে নেয় নিজেকে। কি দারুণ! তাদের কেতাই যে রীতিমত আলাদা। আকাশ যুদ্ধ জয়ের সমরাস্ত্র যেন এরা। এক একটা রং যেন এক একটা আলাদা গল্প। ছট্টু চিৎকার করে বলে

: বিশু দা দারুণ কাটছ আজ…

বিশুর চোখে অস্থিরতা। মুখে হাসি।ওয়াসিম ঘুড়ির সুতোয় লাগাম নিতে নিতে বলে

: বহুত আচ্ছে…

শালা নিজেকে বুঝি ঘুড়ির বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ভাবছে। মনে মনে ওয়াসিমকে একহাত দেখে নেয় বিশু। এই রে ঘুড়ি উড়ছে তো উড়ছেই! উঁচুতে আরও উঁচুতে মেঘদলকে ফুঁড়ে দেবে না কি? রবিদা ও যেন উপভোগ করছে এই দৃশ্য! আচমকা নজরে পড়ে পাশের ফ্ল্যাটের বেলকুনিতে। ছিমছাম কৃত্রিম উঠোনে একটি বেতের দোলনা ঝুলছে। তাতে বসে রয়েছে একটি তরুণী। সাদা কামিজ গায়ে জড়ানো ঐ অপ্সরীকে মনে হচ্ছে একটুকরো মেঘ বুঝি বা ব্যালকুনির ফোঁকড় গলে ঢুকে পড়েছে। তরুণীর চোখ আকাশ পানে। যেখানে চৌকা আকারের সব কাগজের টুকরো ভেসে বেড়াচ্ছে ।বিশুর হাতের গতি যেন মন্থর হয়ে এল। দৃষ্টি হলো বিমোহিত। বিশু হারাচ্ছে শ্বেত শুভ্রতার মাঝে, আচমকা ছট্টুর কথা কানে ভেসে আসে

: বিশু দা সামলে…

চমক কাটে বিশুর।হাতের সুতোয় লাগাম টেনে নিতে যায় কিন্তু দেরী হয়ে যায় বড়! সমোস্বরে হতাশ চিৎকার কানে ভেসে আসে

: এই যাহ! ভোকাট্টা…

আকাশ সৈনিক হুড়মুড়িয়ে নিচে নেমে আসছে।নিচে একদল টোকাইদের মাঝে হুল্লোড় জেগেছে। কাটা ঘুড়ি টাল খেতে খেতে নিচে গিয়ে পড়লে পড়ে ঐ সব অর্ধনগ্ন শিশুদের মাঝে জাগে চান্চল্য। কে কার আগে মালিকানা বসাবে তাতে।যাচ্চলে.. বিশু হাত মুষ্ঠি করে কিল পাকায় আরেক হাতের তালুতে।চোরা নজর দেয় বারান্দার দিকে।আহারে দু বিপরীত বৈশিষ্ঠ্যধারী অবয়বের মাঝে সমীরণ আর সূর্যালোকের ধোঁয়াশা সীমারেখা।মাথার ওপরের অন্তরীক্ষটাই কেবল আগলে রেখেছে ওদের।মেঘ সুন্দরীর মুখে মেঘ জমেছে।ঘুড়িটা কেটে যাওয়াতে।আনত দৃষ্টি তখন ঘুরে গেছে ভূপাতিত ঐ লাল চৌকা সেনার প্রতি।বিল্ডিং এর কোণার জামরুল গাছের বাহুডোরে আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে সে।বেশ অল্প কতক্ষণে কেমন হাত বদল ও হয়ে গেল।বিশুর ঠোঁটের কোণাতে আবারও হাসি।ওয়াসিমের কন্ঠ ভেসে আসে, চিবিয়ে চিবিয়ে বলছে

: বেট্টার লাক ফর দ্য নেক্সট টাইম… জী!

আসমানে ফরফর করে বীরদর্পে একদম উঁচুতে ডানা মেলেছে ওয়াসিমের কাঁলো মানিক। এরপর যেন ঘুড়ি ওড়ানোর নেশা আরও দুর্বার ভাবে পেয়ে বসল বিশুকে। সারাদিন কাটত বিকেলের আশায়। বিকেল এলেই ইচ্ছেঘুড়ি উড়াল দেয় আকাশে। ঘুড়ির তালে এগুতে থাকে মেঘকুমারীর সাথে অদৃশ্য আলাপন।ঘুড়ির বাঁক পরিবর্তনের সাথে সাথে বাদল সুন্দরীর ঐ ছবি আঁকা মুখেও ঘটে চলে নানা রঙের আবর্তন। কখনও তাতে উচ্ছ্বাস, কখনও চিন্তামনির ছাপ তো কখনো মন খারাপের ঘনঘটা জমত ঐ চাঁদ মুখে। দিন কেটে যাচ্ছে বিশুর বেশ!মনপবনের নাও এ কল্প সুন্দরীর সাথে ভেসে বেড়াচ্ছে যখন তখন। কি এক প্রবল আকর্ষণে জড়িয়ে পড়ছে ক্রমশই সে। তবে নিজের মনের কথা মেঘ সুন্দরীর কাছে পৌঁছাবে কি করে? এ যে আকাশ কুসুম কল্পনা।সে হোক না কল্পনা! ভাবনার রাজ্যে ঘুরে বেড়াতে মন্দ কি! এখানে তো কারও কোন রকম ফপর দালালী চলবে না। এই রাজ্যের মালিক শুধুমাত্র বিশু নিজেই। আর কেউ না। খেয়ালী বিশু চোখ বুঁজে ফের নাওয়ে সওয়ার হয়।

কেটে যায় কিছু মাস।নিজের কল্পনা আর একটু আকটু চোখের চাহনিতে কথার সুতো মালায় বুঝি বা হৃদয়ের ছন্দ গাঁথতে আরাম্ভ করছিল তো তক্ষুণি ছন্দপতন! হলদেটে ফ্যাকাশে বাড়িও জানান দিল তার অন্তিম পরিণিতির। একটা কাগুজে নোটিশ। তাতে গোটা কিছু অক্ষরে সাজানো বাক্য বিশুর নতুন পৃথিবীটা অঙ্কুরিত হবার আগেই যেন উজাড় করে দিল। বিল্ডিংটা ভেঙে এখানেও তোলা হবে অত্যাধুনিক দালান। বাড়ির মালিক প্রোমোটারদের সাথে আলাপ সেরেছেন। আগামী তিনমাসের মাঝে বাড়ি ছাড়বার অনুরোধ রাখা হয়েছে সবার মাঝে।

বিশুর রঙিন ভূবন যেন হঠাৎ ই সাদা কালো ক্যানভাসে পরিণত হল। আর মাত্র তিনমাস।তবে! ইচ্ছেঘুড়ির কি অপমৃত্যু ঘটল? বিশু নিজের মনে ছক কাটে।বলবে কি করে মনের কথা মেঘ সুন্দরীকে? মনের লুডুর বোর্ডে গুটি ফেলতে থাকে অবিরত। দিন যায়। কেবল বলা হয়ে ওঠে না অব্যক্ত কথাগুলি। এরমাঝে বিশু দের নতুন ডেরার সন্ধান করে নেন তার বাবা। আর তিনদিন পর বিশুরা চলবে তাদের নতুন ঠিকানায়। হাতের আঙ্গুল দিয়ে অযথাই গণনা গুণে বিশু। মনে মনে বলে, আর মোটে তিনদিন!

বিশু রোজকার মত আজও উঠে নাটাই ঘুড়ি নিয়ে।কিন্তু একি! ব্যালকুনি যে শূণ্য! তবে কি আজ দেখা হবে না? ভগ্ন হৃদয় যেন হুহু করে ওঠে।দ্বিতীয় দিনও তাই! প্রকট শূণ্যতা বিপরীতের ক্ষুদ্র উঠোণে। শেষ দিনে দুরু দুরু বুকে বিশু আবারও তাকায়।নাহ! কেউ নেই কোথাও। শূণ্য দোলনাটা বিমর্ষ ভাবে দোল খাচ্ছে। বিশুর ঘুড়ি ততক্ষণে উড়াল দিয়েছে অসীমে। প্রবল প্রতাপে আজ সে আকাশ জয়ে উন্মুখ। ঘুড়ি উড়ছে যাচ্ছে দূরে আরো দূরে। আচমকা শ্বেত সুন্দরীর দেখা। সুন্দরীর মুখে আজ হাসি। ঘুড়ির ওঠানামার সাথে সাথে তার উচ্ছ্বাসও ওঠা নামা করছে। আজ বিশুর ঘুড়িকে হার না মানার নেশা পেয়ে বসেছে যেন। সমর ক্ষেত্র জয় করে অবশেষে সে পত পত করে নিজের বিজয় নিশানা প্রদর্শন করছে এখন। উচ্ছ্বাসে মেঘ সুন্দরী হাতে তালি দেয়। ক্ষ্যাপাটে ওয়াসিম আজ বলে ফেলে

: বহুত আচ্ছে… আন্থ মে দেখাহি দিয়া…

বিশু হাসে।ওর চোখ ঘুরে যায় মেঘবালিকার দিকে। ভাবে, থাক না! নাই বা হলো মনের কথা বলা। সব কথা যে যায় না বলা। আর যাই হোক, যেতে যেতে ইচ্ছেঘুড়ি মেঘসুন্দরীর মুখে হাসি তো ফোটাল! বিশুর চোখ সুন্দরীর দিকে, হাতে ইচ্ছে ঘুড়ির লাগাম। সুন্দরীর মুখে তখনও উচ্ছ্বাস। আবারও ভাবে বিশু। ইশ! ইচ্ছেঘুড়ি যদি সুন্দরীর মনের আকাশটাও ছুঁয়ে নিতে পারত!