আল্লাহ্রাহে রঙিন হওয়ার একটা মোক্ষম সময় পবিত্র রমজান মাস। আর এই রমজানে রয়েছে সর্বশ্রেষ্ঠ কল্যাণময় রাত লাইলাতুল কদর। এ কদর রাত্রির সন্ধানের মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে মানবিক ও আত্মিক যাবতীয় কল্যাণ। মানুষকে পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়েছে খলিফা হিসেবে। আর তাকে পবিত্র জান্নাতের মাধ্যমে কিনে নেওয়া হয়েছে। সুতরাং এই মানুষ খলিফা হিসেবে আল্লাহ্র সব থেকে প্রিয়। সে কারণে মানুষের প্রথম ও একমাত্র উদ্দেশ্য হতে পারে সেই মহান স্রষ্টার রঙে রঙিন হওয়ার।
ঝকমারী দুনিয়াদারীর কারণে বান্দাহ্র কলবে ময়লা-জঞ্জালের সমাবেশ ঘটে। এটাকে দূর করতেই প্রতিবছর আসে রমজান। এই রমজানের শেষ দশকটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। এই দশকে লাইলাতুল কদর হাসিলের মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে সমূহ কল্যাণ। আর এ কারণে মু’মীনগণ মসজিদে ইতিকাফ করেন।
ইতিকাফ ও তার বিধান সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা :
ইতিকাফ শব্দের আভিধানিক অর্থ : কোনো জিনিসকে বাধ্যতামূলকভাবে ধরে রাখা। কোনো জিনিসের উপর নিজেকে শক্তভাবে আটকে রাখা। আর শরীয়তের পরিভাষায় ইতিকাফ বলা হয়— মসজিদে কোনো বিশেষ ব্যক্তির বিশেষ ধরনের অবস্থান-অবস্থিতি গ্রহণ।
আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখেছেন, ইতিকাফ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘শুধু অবস্থান করা’। যে লোক মসজিদে অবস্থান গ্রহণ করেছে তাকে বলা হয়— আকিফ বা অবস্থানকারী। আর শরীয়তের পরিভাষায় এর অর্থ হল— আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে মসজিদে থাকা ও অবস্থান গ্রহণ করা। (উমদাতুল কারী)
কুরআন মজিদের দুইটি আয়াতে এই ইতিকাফ শব্দটি উল্লিখিত হয়েছে— ‘আর যতক্ষণ তোমরা ইতিকাফ অবস্থায় মসজিদে অবস্থান করো, ততক্ষণ পর্যন্ত স্ত্রীদের সাথে মিশো না। (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৭)।
এর আগে আরও বলা হচ্ছে, ‘তোমরা দুইজনে আমার ঘরকে তওয়াফকারী ও অবস্থানকারীদের জন্য পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করে রাখ।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১২৫)
ইতিকাফ শব্দের মূল ভাবধারা :
তাজুল উরুস গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবিন্দুতে মন-মগজ দৃঢ়ভাবে নিবদ্ধ রেখে অবস্থান করা এমনভাবে যে সেই দিক হতে অন্য কোনো দিকে দৃষ্টি আদৌ ফিরবে না।
ইতিকাফ হল সকল কাজ থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর ইবাদতের জন্য মসজিদে অবস্থান করা। এটা হল সুন্নত।
আয়েশা রাদীআল্লাহু আনহা বলেন :
‘রাসূলুলুল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান মাসের শেষ দশকে মসজিদে ইতিকাফ করতেন। যতদিন না আল্লাহ তাকে মৃত্যু দান করেছেন ততদিন তিনি এ আমল অব্যাহত রেখেছেন। তার ইন্তিকালের পর তার স্ত্রীগণ ইতিকাফ করেছেন।’ [বুখারী : ২০২৫]
ইতিকাফ শুরুর ক্ষণ :
হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত- তিনি বলেছেন, রাসূলে করিম সা. যখন ইতিকাফের ইচ্ছা করতেন, তখন ফজরের নামাজ পড়তেন ও পরে তাঁর ইতিকাফ স্থানে প্রবেশ করতেন।- তিরমিজি।
এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, উল্লিখিত হাদীস থেকে বাহ্যত জানা যায় নবী করীম সা. ফজরের নামাজ পড়ে ইতিকাফ শুরু করতেন। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার হল, তিনি তো পূর্ণ দশ দিনের জন্য ইতিকাফ করতেন। আর সেই জন্য রমজান মাসের একুশ তারিখ ফজর পড়ে নয়— তার পূর্বের রাত্রি সূচনায়-বিশ তারিখ মাগরিবের সময় হতে ইতিকাফ স্থানে উপস্থিত হওয়া আবশ্যক। অন্যথায় চান্দ্রমাসের হিসাবে দশ দিন পূর্ণ হতে পারে না। এই কারণে মুহাদ্দীসদের মধ্যে দুইটি মতের উদ্ভব হয়েছে। কয়েকজনের মত হচ্ছে, বিশ তারিখ মাগরিবের সময়ই ইতিকাফ কেন্দ্রে অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। তারা এই হাদীসের ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যে, আসলে তিনি আগের দিন মাগরিবের সময় থেকেই ইতিকাফ শুরু করেছেন। পরবর্তী ফজরের নামাজ পড়ে তিনি ইতিকাফ কেন্দ্রে তার জন্য নির্দিষ্ট হুজরায় প্রবেশ করেছেন মাত্র।
এ পর্যায়ে আরও একটি প্রশ্ন উঠেছে। তা হলে ইতিকাফ দশদিন না দশ রাত? হজরত আয়েশা রা. বর্ণিত এক হাদীসের ভাষা হলো, নবী করিম সা. রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। আর আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলে করিম সা. প্রত্যেক রমজান মাসের দশ দিন ইতিকাফ করতেন।
প্রথমোক্ত হাদীস থেকে দশরাত প্রমাণিত হয়। আর শেষোক্ত হাদীস হতে প্রমাণিত হয় দশদিন। এই কারণে মুহাদ্দীসগণ বিশ তারিখ দিনগত রাত শুরু-মাগরিবের সময়-থেকেই ইতিকাফ ধরেছেন। এতে উভয় হাদীস অনুযায়ী আমল হওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
ইতিকাফ সংক্রান্ত হাদীসসমূহ থেকে জানা যায়, ইতিকাফের জন্য মসজিদ জরুরী শর্ত— ইতিকাফ মসজিদেই করতে হবে। (উমদাতুল ক্বারী)
ইতিকাফের প্রকরণ :
সুন্নাত ইতিকাফ : রমজানের শেষ দশকের ইতিকাফ। অর্থাৎ ২০ রমজানের সূর্য ডোবার আগ মুহূর্ত থেকে শাওয়াল মাসের চাঁদ ওঠা পর্যন্ত মসজিদে ইতিকাফ করা। এ ধরনের ইতিকাফকে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা কিফায়া বলা হয়।