বাংলার জাফর আর দক্ষিনের সাদিক, মানুষের লজ্জা, ধর্মের লজ্জা, দেশের লজ্জা! না মানার, না ভরসার, না চাওয়ার, একটা জাতের ধ্বংস হয়েছে তাদের কৃতকর্মে। প্রত্যেকটা জাতিবন্ধন আলগা করে দিয়েছে তাদের কূটকলা, নষ্ট করেছে রাজছত্র ও বিশ্বাস আপন দুষ্কর্মে। জান না কি এ ভারতভূমি দেশবাসীর স্পর্শময় মনের স্নেহধন! সর্বদেশে আলো ছড়িয়ে দিয়েছে যার প্রভা, সে আজ ধুলো আর রক্তের মধ্যে পড়ে গড়াগড়ি দিচ্ছে? কে বুনেছিল গোলামীর বীজ এই মাটিতে? সে এই দুরাত্মার হাতে গড়া অপকৃতি।
জাবিদনামা-ইকবাল।
উপরোধৃত কবিতাটি নেয়া হয়েছে ইকবালের বিখ্যাত জাবিদনামা কাব্য থেকে। কবি মনে করতেন নিজ দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা নিকৃষ্টতম অপরাধ। কবি তার জাবিদনামা কাব্যের ভেতর দিয়ে মুরশিদ রুমীর অধিনায়কত্বে যে বিশ্বব্রক্ষান্ড সফরের কাহিনী বিবৃত করেছেন, সেখানে শনি গ্রহে স্থিত দোজখের অধ:স্তন অন্ধকার ও দুর্যোগপূর্ণ অঞ্চলের এক বর্ণনা আছে, যেখানে বিশ্বাসহন্তাদের জন্য স্থান সংরক্ষিত। ইকবালের আত্মা সে স্থানে আবির্ভুত হয়ে বাংলার মীর জাফর আর দক্ষিণের সাদিক-আমাদের সাম্প্রতিকতম ইতিহাসের এই দুই বিশ্বাসহন্তা পাপিষ্ঠকে এভাবে অভিযুক্ত করেছেন। ইকবাল সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে কবিতা লেখেননি। লিখলে অবশ্যই তিনি তাকে মীর জাফরের বিপরীতে দেশপ্রেমিকের স্থান দিতেন কোনো সন্দেহ নেই, যেমন তিনি দাক্ষিণাত্যের টিপু সুলতানকে দিয়েছিলেন।
ইকবালের বিচারের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদীরা একমত হয়নি। আশার কথা, দেশপ্রেমিক মানুষ তার সঙ্গে সহমত হয়েছে। দেশপ্রেমিক মানুষ মাত্রই সাম্রাজ্যবাদের প্রতিপক্ষ। কারণ তারা সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র ও কূটিলতার বিরুদ্ধে। যেমন সিরাজউদ্দৌলা দেশপ্রেমিকের মতো ইংরেজদের ভারত জয়ের অভিযানে বাধা হয়ে দাঁড়ান। আর এই অপরাধেই তাকে ইংরেজের প্রচারাভিযানের বলি হতে হয়। সুবে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার নবাবি কেড়ে নেয়ার পর ইংরেজরা তাদের দুষ্কর্মের বৈধতা দেয়ার জন্য ওঠে-পড়ে লাগে। তাই তারা সিরাজের সব রকম ভাবমূর্তি তছনছ করতে সব শক্তি প্রয়োগ করে। এটাই সাম্রাজ্যবাদীদের খাসলত। তারা যে দেশেই উপনিবেশ গড়েছে সেখানকার পূর্বতন শাসকদের বিরুদ্ধে এই নিষ্ঠুর প্রপাগান্ডা-যুদ্ধ তারা চালিয়েছে। আজকের সাদ্দাম হোসেন, বিন লাদেন, শেখ ইয়াসিনের বিরুদ্ধেও একই কাজ করেছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।
সিরাজ মাত্র ১৫ মাস বাংলার নবাব ছিলেন। এর আগে তার নানা আলিবর্দী খা ১৫ বছর নবাবি করেছেন। নানা আলীবর্দী খাঁ ইন্তেকালের ৪ বছর আগে সিরাজকে তার ওয়ারিশ হিসেবে ঘোষণা দেন। এই ঘোষণায় সিরাজের উত্তরাধিকারের ন্যায্যতা প্রতিপন্ন হলেও তার দুশমনের সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটে। আর তার চরিত্র হননের পাকাপোক্ত একটি ব্যবস্থা হয়। সিরাজ ক্ষমতায় বসার সঙ্গে সঙ্গে তাকে যুদ্ধে নামতে হয়। নামতে হয়ে অভ্যুত্থানদমনের সংগ্রামে। সিরাজকে তিন ফ্রন্টে লাড়ই করতে হয়।
প্রথম দলে ছিল তার রক্ত সম্পর্কের আত্মীয় ও নানা আলবর্দী খাঁর প্রশ্রয়প্রাপ্ত অমাত্য, যারা সিরাজের সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জাড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয় দলে ছিল বাংলার সেকালে উঠতি হিন্দু পুঁজিপতি ও বণিকশ্রেণী, যারা ‘যবনরাজ’ খতম করার মহার্ঘ্য সুযোগ গ্রহণ করে। শেষতম দলে ছিল বিদেশী ইংরেজ, যারা ভরত জয়ের অভীষ্ট লক্ষ্যে সচেতনভাবে অগ্রসর হয়েছিল। এ তিনটি দলই সিরাজের পতন চেয়েছিল এবাং তাদের বিভিন্ন রকম স্বার্থ সিরাজের পতনে এক সঙ্গে কাজ করেছিল। কোনো সন্দেহ নেই, পুরো ষড়যন্ত্রের পিছনে ইংরেজরাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে এবং খুবই পরিকল্পিতভাবে তারা এ কাজ সম্পন্ন করে, বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ দরবারের একটি প্রভাশালী গোষ্ঠী ও প্রভাবশলী হিন্দু বণিকদের তারা নিজেদের পক্ষে নিয়ে নেয়।
যেহতু পুরো ব্যাপারটিই পরিকল্পিত, তাই সিরাজের পতনের সঙ্গে সঙ্গেই তার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়। সিরাজ সম্পর্কে যত কুৎসা, যত রটনা তার পেছনে ইংরেজেরই হাত। পতনের পর পরই এরা নবাব প্রাসাদের কতক উচ্ছিষ্টভোজী, সিরাজবিরোধী, ইংরেজ অনুরাগী ও পরবর্তীকালে ইংরেজ আশ্রিতদের দিয়ে ইতিহাস লেখায়। সিয়ারুল মুতাআখ্খারিন, রিয়াজুস সালাতিন, মোজফফর নামা ও তারিখে বাঙ্গালাহ। এখানে সিরাজের আচ্ছামতো চরিত্র হনন করা হয়। বহু বছর পর বাঙালি ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় এই ইংরেজ অনুরাগীদের ইতিহাস বিচারের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। বিশেষ করে তাকে নিয়ে ইংরে কর্মচারী হলওয়েল প্রচারিত অন্ধকূপ হত্যার কাহিনীটি যে একান্তই বানোয়াট, সে কথা মৈত্রেয় মহোদয় বলতে ভোলেননি। ইংরেজ ঐতিহাসিকরা তাদের লেখা বানোয়াট ইতিহাস গ্রন্থে দাবি করেছেন, বাংলার মানুষ সিরাজের বিরুদ্ধে ছিল, কারণ তার চরিত্র খারাপ ছিল। সুতরাং ইংরেজরা বাধ্য হয়ে সিরাজবিরোধিতায় যোগ দেয়। তারা অবশ্য এসব প্রশের উত্তর দেননি। বিদেশাগত ব্যবসায়ী হিসেবে এদেশে এসে তারা কেন বড় বড় সমারিক দুর্গ নির্মাণ করেছিল, বাদশাহর বিনা শুল্কে ব্যবসা করার দত্তককে তারা কেন অপব্যবহার করেছিল এবং নবাবের বিশ্বাসঘাতক কর্মচারীদের জেনে-শুনে তারা তাদের দুর্গে শুধু আশ্রয় দেয়নি, নবাবের দাবি মতো তাদের প্রত্যার্পণ করতেও অস্বীকার করে। কোনো স্বাধীন নবাব কি বিদেশাগতদের এরকম বেয়াদবি সহ্য করতে পারে? ইংরেজ ঐতিহাসিকদের কথা শুনলে মনে হয়, নবাব ছিলেন জবর-দখলকারী; আর তারাই হচ্ছে এখানকার ন্যায়ত শাসক। তাই সিরাজের ইংরেজদের বিরোধিতা করা ছিল ভুল। এই ব্যাপারে সেকালের ঐতিহাসিক রবার্ট ওরমে, হেনরি ডডওয়েল, এসসি হিল থেকে আজকালকার সাম্রাজ্যবাদী লেখক পিটার মার্শাল, ক্রিস বেইল, রজতকান্ত রায়, কীর্তি নারায়ণ চৌধুরী-সবার মুখেই একই রা। এরাই ইংরেজের সাফাই গাওয়ার স্বার্থে যতখানি প্রয়োজন সিরাজ চরিত্র হনন করেছেন। এসব উপনিবেশবাদের সমর্থক ঐতিহাসিকদের যুক্তি দেখুন : ইংরেজরা কোনো পরিকল্পনা করে বাংলা জয় করেনি। তার চত্মত্র দোষে দেশবাসী ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে ক্ষমতা ইংরেজের হাতে তুলে দেয়।
সাম্রাজ্যবাদীদের চরিত্র আজ সবার কাছে পরিষ্কার। এদের দু’একটা নমুনা হচ্ছে আজকের ইরাক বা আফগানিস্তান। এদের হাতে কোন্ দুঃখে দেশবাসী দেশের দায়ভার তুলে দেবে? যেখানে সিরাজ মোটেই অপশাসক ছিলেন না। বরং দেশের স্বাধীনতা নিয়ে ষড়যন্ত্রকারী ইংরেজ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে লড়াই করার তিনি সাহস করেছিলেন। এই ঐতিহাসিকদের প্রচারের ধরনগুলো আর একটু লক্ষ্য করা যাক।
সিরাজউদ্দৌলা মদ খায়। নারী ধরে হত্যা করে। সিরাজ জগৎ শেঠ, মহতা চাঁদকে খতনা করিয়ে দেবে-এমন হুমকি দিয়েছে, রানী ভবানীর বিধবা মেয়ে তারা সুন্দরীর রূপে মজে গিয়ে তাকে ধরে আনার জন্য লোক পাঠিয়েছে।
রবার্ট ওরমে ও ডডওয়েলের বর্ণনা আরো মারাত্মক। ওরমে লিখেছেন : মাত্রাতিরিক্ত মদে আর পরনারী চর্চায় তার আনন্দ। মদ খেয়ে তিনি এমনই মাতাল হতেন যে, যেটুকু বুদ্ধিশুদ্ধিও যা প্রকৃতি তাকে দিয়েছিল তাও লোপ পেত।
(History of the military transactions of the British Nation in Hindustan, Vol 2, London, 1803)
কেমব্রিজের ইতিহাসবিদ ডডওয়েল লিখেছেন : সিরাজউদ্দৌলা একটি হৃদয়হীন দানব, সে তার কৌতূহল মেটানোর জন্য গর্ভবর্তী ভদ্রমহিলার পেট চিরে ভেতরে কি আছে দেখত এবং মানুষভরা নৌকা ডুবিয়ে গঙ্গায় ডুবু মানুষের আহাজারি দেখতে পছন্দ করত।

(Henry Dodwell, Duplex and clive, London, 1920)
ইংরেজ অনুরাগী রাজীব লোচন মুখোপাধ্যায় লিখেছেন : দেশের হিন্দু জমিদাররা সংঘবদ্ধ হয়ে দরবারের হিন্দু অমাত্যদের সহায়তায় যবন রাজত্বের অবসান ঘটাতে উদযোগী হয়েছিলেন। (রাজীব লোচন মুখোপাধ্যায়, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রাস্য চরিত্রং;)। সুতরাং সিরাজের দুশমনের অভাব হয়নি। এসব দেখেই ঐতিহাসিক মোহর আলী যথার্থ উক্তি করেছেন : মীরজাফর যদি এই চক্রান্তে যোগ নাও দিত, তবু ষড়যন্ত্রকারীরা অন্য কাউকে খুঁজে নিত।
(M.Mohar Ali, History of the Muslims of Bengal, Vol 1A, Ryadh 1985)
সিরাজের চরিত্র হনন তাই ইংরেজের খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। সিরাজের নানা আলীবর্দী খাঁ ছিলেন প্রশাসক হিসেবে যথেষ্ট শক্ত ও বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন। তিনি তার জীবদ্দশায় সিরাজকে মাত্র ১৬ বছর বয়সে বর্গী দমনে মারাঠাদের বিরুদ্ধে সেনাপতি হিসেবে বালাশোর পাঠান। আগের বছর সিরাজের পিতা জয়েনুদ্দীন ঘাতেকের হাতে মারা গেলে আলিবর্দী তাকে ডেপুটি গভর্ণর করেন। সিরাজ যদি এতই অকাল কুষ্মান্ড হন তবে নানা আলীবর্দীর মতো বাস্তববুদ্ধি সম্পন্ন শাসক তাকে কেন এসব যোগ্যতর পদে দায়িত্ব দিয়ে বসান! আলীবর্দী তার অন্য নাতি শওকত জংকেও তো এই পদে বসাননি। শওকত জং যে বিশ্বাসযোগ্য নন, তার প্রমাণ তো আমরা দেখেছি ইংরেজদের সঙ্গে সহযোগিতার মধ্য দিয়ে। কোনো সন্দেহ নেই, সিরাজ সাহসী, যোগ্য ও অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ শাসক ছিলেন। তার অনমনীয়তা ও স্বাধীনচেতা বৈশিষ্ট্যের কারণেই তখনকার পরিবর্তনশীল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ইংরেজ ও স্থানীয় হিন্দু প্রভাবশালীরা একজোট হয়ে তার পতন ঘটায়। তার আত্মীয়রা ক্ষুদ্রস্বার্থে হয়ে দাঁড়ায় বিভীষণ।
তখনকার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে ইংরেজদের সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ স্পষ্ট হয়ে উঠে। পুরো ভারতের উপকূলজুড়ে তাদের নৌবাহিনীর আনাগোনা। বিভিন্ন স্থানে দূর্গ নির্মাণ। সৈন্য ও অস্ত্র মজুত স্রেফ বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে ছিল না। তাদের এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ভাস্কো ডা গামার ভারতের সমুদ্র পথ আবিষ্কারের ভেতর দিয়ে। ইতিহাস থেকে দেখছি পলাশীর মাঠে মুখোমুখি হওয়ার দুই মাস আগে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গাধিপতিরা সিদ্ধান্ত নেয়, সিরাজকে উৎখাত করতে হবে। এটা ছিল রীতিমতো লিখিত প্রস্তাব। এ সময়ই তারা সিরাজের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগনামা প্রস্ত্তত করে।
তাদের কথা হল, সিরাজ অসৎ। এজন্য তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে। তিনি ইংরেজ ব্যবসায়ীদের উৎপীড়ন করেছেন, ফরাসীদের সঙ্গে আঁতাত করেছেন এবং আলীনগরের সন্ধি ভঙ্গ করেছেন। দেশর ভেতরে বসে বিদেশাগতরা সার্বভৌম নবাব উৎখাতের ষড়যন্ত্র করবে আর এর বিরুদ্ধে নবাব কিছু বলবেন না, এটা কি করে সম্ভব? আসলে ইংরেজরা তখনকার মতো একটা পুতুল নবাব চেয়েছিল এবং তারা শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছিল। তিনিই মীর জাফর, যাকে দেশপ্রেমিক ইকবাল তিরস্কার করেছেন। ইংরেজরা এদেশের নওয়াবদের উদারতার সুযোগে যা করতে পেরেছিল, আজকের সাম্রাজ্যবাদীদের দেশে বসে কেউ যদি সমতুল্য কোনো কিছু করে, তবে তার তকদিরে কি লেখা হবে, তা আক্কেলমন্দকে বুঝিয়ে বলতে হবে না।
এদেশে ইংরেজের আগমন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। তারা মুসিলম শাসনকে উৎখাত করতে চেয়েছিল। এটা ছিল তাদের আন্তর্জাতিক ক্রুসেডের অংশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল যবনরাজ উৎখাতকারীরা।
সিরাজের কয়েক শতাব্দী আগে এখানকার ‘যবনরাজ’ উৎখাতের আর একটা চেষ্টা হয়েছিল। সুলতানী বাংলায় রাজা গণেশের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায় নূর কুতুবুল আলম বলে এক বিখ্যাত আলেম ও বুদ্ধিজীবির দূরদর্শী হস্তক্ষেপের ফলে। সিরাজের দুর্ভাগ্য তিনি এই ধরনের কোনো বুদ্ধিজীবির সহায়তা পাননি। সিরাজকে নিয়ে ইংরেজদের খিস্তি-খেউড়, প্রচার যুদ্ধের কারণ এখন স্পষ্ট হলো, সেই প্রচারযুদ্ধ যে কত ভয়ংকর, তাও আমরা দেখেছি। এই প্রচারে আমাদের একমাত্র নোবেল জয়ী কবিও কুপোকাৎ হয়ে গেছেন। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় যখন তার বই সিরাজউদ্দৌলা মারফত তার চরিত্রনাশের প্রতিবাদ জানান, তখন কবিও তার ইংরেজবান্ধবের বিরুদ্ধে অভিযোগে বিচলিত হন। রবীন্দ্রনাথ অভিযোগ করেন, ‘মৈত্রেয় মহাশয় যদি সিরাজ চরিত্রের কোনো দোষ গোপন করিতে চেষ্টা করেন নাই, তথাপি কিঞ্চিত উদ্যম সহকারে তাহার পক্ষ অবলম্বন করিয়াছেন!’ কবির মতে, ‘ইহাতে সত্যের শান্তি নষ্ট হইয়াছে এবং পক্ষপাতের অমূলক আশংকা পাঠকের মনে মধ্যে মধ্যে ঈষৎ উদ্বেগের সঞ্চার করিয়াছে। (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ইতিহাস)। কবির ‘সত্যের শান্তি’ কথাটা বড়ই ধোঁয়াশাপূর্ণ। তাহলে কি কবি চেয়েছিলেন-মৈত্রেয় মহোদয় সিরাজ উন্নত চরিত্র মহৎ ব্যক্তি ছিলেন না-এই জাতীয় কিছু লিখবেন না? তাহলে তার বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ হয়তো উঠত না।
কবির ঈষৎ উদ্বেগের কারণ আমরা বুঝি। কারণ যারা এদেশে যবনদের শাসন উৎখাত করেছিল, তাদের সঙ্গে কবি পরিবারের সখ্য এবং এদেশে ইংরেজদের শাসন সংহত করতে তার পরিবারের সহযোগিতাও ইতিহাসে লেখা হয়েছে। তাই কবি দেশপ্রেমিক সিরাজের পক্ষে সর্বান্ত:করণে দাঁড়াতে পারেননি। শুধু কবি নন, উনিশ শতকের কলকাতাকেন্দ্রিক বাবু বুদ্ধিজীবিতার সিলসিলাই গড়ে উঠেছে ইংরেজ তোষণ ও যবনবিরোধিতার ভেতর দিয়ে। বঙ্কিমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র সেন, ঈশ্বরগুপ্ত-সবার চেহারাই এক রকম। তাই এদের বিচারে সিরাজ শুধু শুধু সত্যের শান্তি নষ্টকারী হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন।
সিরাজের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদ ও তার সহযোগীদের প্রচার-প্রচারণাই প্রমাণ করে তিনি সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ‘সত্যের শান্তি’ যাতে ব্যাহত না হয়, তার জন্য জীবন দিয়েও গেছেন। ইংরেজের প্রচারণাই প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট তিনি অন্তত সাম্রাজ্যবাদের দালাল ছিলেন না। দেশের মানুষে কাছে দেয়া ওয়াদা তিনি ভঙ্গ করেননি।