গুড নাইট কলকাতা-পঁচিশ

বলার আছে? করার কিছু?
খড়্গের মত, মানভূমের ভারি, বেখাপ্পা অস্ত্রের মত।
চিহ্ন। তিলক মালার দিন,
দরজা জানলা রোদে ভাসছে, টিয়া ছেড়ে দিয়েছে ভোরবেলা।
জ্বর জ্বর বাতাস, বাসের বাচ্চা খালাসি বনগ্রাম বনগ্রাম চেঁচালে, লোক ফলমূল কিনে উঠে পড়ে।
চাপা, না বলা বাসযাত্রা

কত বড়। কত ভাঁজ ভেতরে
মস্তিষ্ক অথবা সাবেকি
তোষকের মত তুলোবীজে ভরে যায় সামান্য ঘরগুলো, ওড়ে এঘর ওঘর
ছায়া পড়ে তুলোগাছের।
বলো। আছে কিছু?
……………………………………………

পয়লা বৈশাখ

কাপড় দিয়ে বাসন কিনতো মা। কত বাসন। কিছু বাসনে নাম খোদাই করাতো। সুমিতা নামে থালা, সোনাই নামে গেলাস। বাসনওয়ালি বাঈরা বেশীরভাগই রাজস্থানের। অথবা বেদুইন। ওদের চোখের ভাষা,
আমার মা দিদার মত না। বাসন জমে জমে পাহাড়। মা’র আলমারির ওপর নিষিদ্ধের আকর্ষণ ছিলো আমার, আলমারিতে কী রাখে
মা! কেমন একটা গন্ধ, চোখ বন্ধ হয়ে আসতো আমার। এত কাপড় জামা বেঁচে থাকতে
লাগে! কিন্তু মা তো সেই
উরা-ধুরা পরেই জীবনটা কাটিয়ে গেল।

আলমারি ভর্তি কাপড় কি তবে বেদুইন মেয়েগুলোর
জন্য ! বৈশাখের রোদ খুব
আজ, পরিত্যক্ত চায়ের কাপে তুলসীচারা। হাওয়ায় উড়ছে তুলসীবীজ। ক্ষমাহীন বসন্তের
পর, কবিদল গাইছেন সকাল থেকে, এসো বৈশাখ। কিন্তু আসছে কই। মরা মাছের মত,
এ শহর উল্টে ভাসছে বাতিল নৌকার পাশে, বৈশাখ, বাসনকোসনের স্তুপের
পাশে, আমারও পাশে,
বসে আছে, ঘরে ঘরে শাঁখ বাজছে। মা নেই, দূরে, অনেক দূরে মা’র প্রিয় বেদুইন মেয়েরা, তাদের ছায়া কাঁধে আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে। পয়লা বৈশাখের আকাশে।।

গুড নাইট কলকাতা একুশ
সবাই বুঝবে এমন কবিতা লিখতে পারে অনেকে। তাদের ঈর্ষা করি? কিছু লোক, দুগ্ধপোষ্য কুকুরছানা বেচে খায়। আরও কিছু, তারা এই বাচ্চাগুলোকে পোষে। কেউ
কুকুর ছাগল পোষে। কেউ রাগ পোষে।
ঠান্ডা রাগ।

কুকুর প্রার্থনা করে, সাংকেতিক ভাষায়। রাগ ঘেউ ঘেউ করে, সারাদিন। সিগনালে দাঁড়ানো গাড়িগুলোতে, নিষ্ফলা, পোষা
রাগ, ঘেউ ঘেউ করে।
সুন্দর হৃদয়ের নারী-হিজড়েটি, হিজাব ফিজাবের ধার ধারে না, এসব দেখে চুপচাপ।
বাবা মার আবছা হাতগুলো, মনে করে,
টানা টানা চোখ ভিজে ওঠে।।
……………………………………………

গুড নাইট কলকাতা-কুড়ি

রোদে ঝলসে যাচ্ছে বাসস্ট্যান্ড। মহিলা ও মহিলাজনিত পুরুষে ছয়লাপ। এখনও সঙ্গের ঘোর কাটেনি। স্নানও হয়নি, ফলে শরীরে করুণার গন্ধ রমরম
করছে। করুণা পরশু থেকে একটা কথাও বলেনি। মুখে নাকে করুণার ভারী, স্মৃতিময় ঋতু লেগেছে সেদিন। হাঁসফাঁস, চিঠির
অন্ধকার-করুণা চিৎকার করছে, মুখটা দাও, দাও শিগ্গির। আমি ততবারই বলছি শশশ্, পাশের ঘরে নিদ্রিত প্রেত।

কলোনির কিশোর, কমপিউটারে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলছে,
শুধু টাকা নেই বলে যারা, ওর বাবা মাকে গালাগাল করে, তাদেরকে কিশোর যত, গুলি
করে, রক্ত ছিটিয়ে মারে।
করুণার ঘ্রাণ শরীরে নিয়ে, রাস্তার পর রাস্তা হাঁটি আজ। শোক, মৃগনাভীর ক্যানভাসে টকটকে লাল ছিটিয়ে গেছে। সুস্থ পৃথীবির বাসস্ট্যান্ড,
ঝলসে যাচ্ছে রোদে। ড্রাইভার খালাসি কেউ নেই,
মনা পাগলি, আমার দিকে অকথ্য শব্দ ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারছে।।
……………………………………………

গুড নাইট কলকাতা-চৌদ্দ

দইভাত খেতে গিয়ে গৌর লক্ষ্য করে যে ওর প্রিয় পোষা ঘাসফড়িংটি দামী কাচের বয়ামের একধারে কাৎ হয়ে যেন বসে আছে। চোখুটো স্থির। গৌর তাড়াতাড়ি উঠে, ফ্রিজ খুলে লাউ এর তরকারিটা বের করে চুপ করে বসে থাকে। বসে বসে কখন অন্ধকার নেমে গেছে , ক্রিস্টাল্ হাউজিং এর হাওয়া ভর্তি বারান্দাগুলোতে, গৌর ওর ধ্যানস্থ ঘাসফড়িং নিয়ে বসে। বাইরে কফিশপে কলতান, দুজন তরুণীর উচ্চকিত হাসি হাতুড়ির মত লাগছে মাথায়। একবার গৌর ভাবলো যে কী করা উচিৎ, আজকাল ক্রোধ ওর ঘাড়ের পেছনে দাঁত বসিয়ে ওকে টেনে নিয়ে যায়, দুই তরুণী, ওভাবেই, উচ্চকিত হাসছে, ফোন ঘষে ঘষে কিসব কিনছে-বাটি, বালতি, ফাইবারের কোষাকুষি, কাচের
ঘন্টা, কী নেই!
গৌর আলো জ্বালায়নি ঘরে। ওঠেই নি তো। একটা ভয়ানক সুসজ্জিত ঘরে, একটি মাঝারি সুদর্শন মানুষ, লাউয়ের তরকারির সামনে বসে আছে চুপচাপ, পাশে মূল্যবান কাচের বয়ামে, অভিজাত চেহারার এক গঙ্গাফড়িং, স্থির, সম্ভবত মৃত, একটা জ্বরজ্বর বাতাস বইছে
বাইরে, গৌরের ওই বাতাসটা কেমন চেনা লাগে, যেন সাবেক একটি কলোনি পাড়ার একপাশে ঘরোয়া গানের স্কুল, মুরগিছানার মত সুমিত্রাদি, গান গাইবার সময়ে কিন্তু চিতাবাঘের মত সুললিত ওর গলায়, বাচ্চা উপচে পড়তো ওঁর গানের ক্লাসে, সংসারোসঙ্গীত শুনে শুনে মলিন বাচ্চারা সুমিত্রাদির গান শুনে পরিষ্কার কন্ঠে গাইতো, কফি কর্ণারে আরো দুটি উচ্ছল তরুণী জুটেছে, সর্দিজ্বর হওয়া শুঁওপোকার মত ওরা কেঁপে কেঁপে হাসছে, আরো হাসছে। বুফে না বাফে, উচ্চারণটা নিয়ে বচসা চলছে। গৌর দোলনা চেয়ারে, সেভাবেই, বসে। লাউয়ার একতারা, গঙ্গাফড়িং ও লামার দেশে ফাঁপা হাসির রোল উঠছে কেঁপে কেঁপে। অস্থির শুণ্যের ভেতর, সান্ধ্য আজান জেগে ওঠে। গৌর কি আপনার চেনা ? লাউয়ের তরকারি, পাঁচফোড়ন, চেনা? ছোট একটা ঘুর্ণিবাতাস, ওঠে কিছুক্ষণ, থেমে যায়।।
……………………………………………

গুড নাইট কলকাতা-আঠারো

ঠান্ডা বাতাসের ভেতর প্লেনের শব্দ, যেন আমার মাথায় যে
ছাদ, সেখানেই নামবে। কুড়ি পঁচিশ মিনিট পরপর, বাসনের শব্দের ফাঁকে। অনেক্ষণ, প্লেননা নামলে কেমন হাঁসফাঁস লাগে, ঘড়ি দেখি, জলখাই, নার্ভাস হবো না, নিজেকে সাহস দিই -চুপচাপ কেমন ভেজা, নাকি ভাঁজ হয়ে গেছে রাস্তা, গলির মোড়। ভোলার দোকানে কুকুরদের উত্যক্ত করে সারাদিন, এমন দুজন বসে আছে। দরজা বন্ধ, তালা দুলছে। ভারি, পেতলের তালা, বিকেলের পেটের ভেতর। ঘটিগরম বিক্রী করা লোকটি চলে যাচ্ছে, পেতলের ঘন্টা বাজাতে বাজাতে। রাস্তাগুলো খুব থেমে গেছে, আজ খুববেশী প্লেন নামেনি। জ্বর এসেছে বিকেলবেলা, নাপিতপাড়া যাবার কথা ছিলো, যেতে কি পারবো… শহর ভরে উঠছে বেওয়ারিশ প্লেনের শব্দে . . .
……………………………………………

গুড নাইট কলকাতা-ষোলো

ফোন করতে গিয়েও সরিয়ে নেওয়া হাতের পাশে বসে আছি। হাত কারো নয়, পেশীর কম্পমান পাড়ার পাশে, সাজা পাগলের দলে ভিড়ে, আরও সাজা? হরিসভায় মিটিন্ হয়, আলুখেতে ব্রহ্মবিচার, এসবই ইতিহাসের নাছোড় এক রসে ভাঙ্গা মেলা, বেলুন বন্দুক উঠছে একই লরি, কিছু কমিক্স পাবো? কাকে বললাম।
জাতীয় সড়ক বত্রিশ। শীতার্ত আলো, এখনও ধরে আছো দরজার ওপরে মাধবীলতা, রাত করে দইভাত খেতে, একা, বাকিরা উঠে যাবার পরেও, চিনামাটির গায়ে তোমার
নখের, নিচু শব্দ, ঘনিয়ে আসে, সহজপাঠের সাদাকালো সন্ধে
তুমি কি বাড়িতে ফায়ারপ্লেস লাগালে? লেখো দুটো,
চিনামাটির,
আর দুটো ফুলকাকুর জন্য
……………………………………………

জাগ্রত ঘুমের দেশে

এন্তেকাল ও কালবৃক্ষের নীচে একটা মানুষাকৃতি জটলা।
কালো কালো পাতা বৃক্ষে। পড়ে না, বাতাসে ঘুরতে ঘুরতে-বৃক্ক, হৃদি ও ডিম্বাশয়… তোমার নয়, অন্য কারও, দলিল কাগজ এত আসবাব, কেউ না।

উর্দু নাকি উর্দ্ধ, বুঝতে কি পারছো, কোনটা তোমার চেনা।
অশ্রুর কারবারে নেমেছো, খন্ডযুদ্ধ
পুঁজি, প্রেমকে মানুষ ভেবেছো, মানুষই অজানা।।
……………………………………………

গুড নাইট কলকাতা-এগারো

মাছ মুরগির ঠান্ডা রক্ত, যৌনরোগের হতাশ জীবাণু, খিস্তি কচ্চিৎ মাতৃস্নেহ-টাকার গায়ে, চাবির গায়ে
মানুষের দাগ লেগে আছে। টাকার জরায়ূ নেই। শরীরের
কিছু নেই। জরায়ূ থাকলে, টাকাই আমার মা বাবা, হোতো,
চাবি হোতো-ওরা কোনোদিন মরতো না, এটাই ভাবি। ওদের কেউ মরতে দিতো না।

মা বাপ যদি টাকা হোতো,
ওল্ড্ হোম থাকতো
না। ছাতিমগাছের শুকনো পাতা, ঠাস করে গায়ে পড়লে, সন্তোষী মা ব্রত করা মেয়েরা চমকে ওঠে। চৌকিতে শোয়ানো, শান্তদেহ, মনে আসে। কাগজে ছাপা সংখ্যাগুলো, বিস্ময়সত্বেও চেপে চেপে ধরে। সবাই।

টাকার বিশুদ্ধ গায়ে, মানুষের নির্বাক নোংরা লেগে আছে।।
……………………………………………

গুড নাইট কলকাতা-সাতাশ

যতবার, জানলার ফাঁক দিয়ে নেভানো কাঠি ছুঁড়ে পার করতে চাই, তার বেশীবার ছিটকে এসে নিচে, মাকড়সার জালে আটকে যায়। মাকড়সা রোজ দেখে, জালে রুদ্ধ কাঠির সঙ্গে থাকা শিখে নেয়, শেখে মানুষের মত মৃত কাঠ সঞ্চয়-যতবার, ভাবি সোজা হেঁটে যাবো, জানলার ফাঁকটা সরে যায়,
অসময়ে মেঘ জমে, চামড়ার বেল্ট নেতিয়ে পড়ে চিচিঙ্গাখেতের ভেতরে বাড়ি, বাথরুমের ঝুলগুলো ঝাড়া হয় না,

ঝালরের মত ময়নাকাঠির দল, যেন ফার্ণিচার কেনা হোলো
নতুন, ইন্টিরিয়র ডেকরের পালিশে ভাসছে পাতিলা এক-জানলার পাশে উবু হয়ে, এতগুলো ড্রাম ভরতে আর খালি হতে দেখার পর,

আকাশে ধোঁয়ার লাইন দেখে থমকে গেছে পাহাড়ি পাখি। ভগাকেত্তনের আসরে আলাপ তোমাদের সঙ্গে। চৌষট্টি যোগিন ঘাটের লম্বা ছায়া সামনে। পাঁচিলের ধার ঘেঁষে রাস্তা, দেখে এসো, অনেকদিন জল
হয় না মেঘে, বিষ উগ্র, জ্বরজ্বর, চৈত্রের হাওয়া চক্কর খায়,

আজ অনেকদিন একটাও পোড়াকাঠি জানলার ফাঁক দিয়ে গলাতে পারিনি।।