মোহাম্মদ আলী জামালযাদে, ইরানের আধুনিক ছোট গল্পের জনক এবং বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বিশিষ্ট লেখক।যার সাহিত্যকর্ম বিশ্ব স্বীকৃত এবং ইরানের কর্মঠ লেখক হিসেবে যিনি সর্বাধিক পরিগণিত। এই গুণী লেখক ১৮৯২ সনে ইসফানের এক আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তেহরানে পড়াশোনার হাতেখড়ি হলেও উচ্চশিক্ষার পরিসমাপ্তি ঘটে ফ্রান্সের “দিযুনে” বিশ্ববিদ্যালয়ে।

মাত্র জীবনের ১৩টি বসন্ত তিনি ইরানে অতিবাহিত করেন আর বেশিভাগ সময় ছিলেন প্রবাসে। পরবাসে থেকে যিনি স্বদেশের প্রতি মায়া অনুভব করেছেন করুণভাবে, যা তাঁর লেখনি মধ্যে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বটে,একইসাথে মননেও। তাঁর মনজুড়ে ছিল ইরান ও ইরানের মানুষ এবং লালিত সংস্কৃতি। স্বদেশের প্রতি তাঁর ভালোবাস ছিল দেখার মত এবং যার সমগ্র জীবন জুড়ে ছিল ইরান। প্রতিদিন ফার্সি বই পড়া ছিল তাঁর অন্যতম কাজ এবং ফার্সিতে কথা বলাই ছিল যার আনন্দ। স্বদেশীদের প্রতি ছিল তাঁর অগাধ ভালোবাসা এবং যাদের নিকট নিয়মিত পত্র লিখতেন তিনি। তাঁর এই ধারায় লিখিত পত্রসংখ্যা ৩৬৪টি। যথারীতি তাদের সহযোগীতা ও সাহায্য করা ছিল তাঁর নিয়মিত দায়িত্ব। ভালবাসতেন, শৈশবের স্মরণীয় দিনগুলোকে স্মৃতিচারণ করতে।

১৯৩০ থেকে ১৯৩০ অবধি তিনি বার্লিনে বসবাস করেন এবং ঐ সময়ে “কভে” সাময়িকে নিয়মিত লেখালেখির সূচনা হয়। এই সাময়িকে তাঁর প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা ছিল তিনশ’র অধিক। তাঁর ২৩০টির অধিক সাহিত্যকর্ম বর্তমান,জামালযাদে গল্প লেখাকে নিজের পেশাগত দায়িত্ব বলে জানতেন এবং যথাসাধ্য তা চালিয়ে যেতেন।তিনি গল্পকার হিসেবে পরিচিত হলেও, রাজনৈতিক, সামাজিক, অনুবাদ, স্মৃতিকথা, সমালোচনা গবেষণামূলক ও গ্রন্থ পরিচিত প্রভৃতি বিষয়ে লিখতেন। তিনি আইনের ছাত্র হয়ে, সে বিষয়ে এক চরণও লিখেনি।তিনি যখন কোন বই পড়ে শেষ করেন, তাঁর উপর একটি রিভিউ লিখতেন এবং তা লেখকের নিকট পাঠিয়ে দেওয়া ছিল তাঁর কর্তব্যকর্ম। এ ধারায় তাঁর ৮০টি প্রবন্ধ রয়েছে।

তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে, “গাঞ্জে শা’য়েগা’ন (রত্নভান্ডার)”, পান্দনা’ মেয়ে সাদী ইয়া (সৌভাগ্যের ফুলবাগিচা), ইয়াকি বূদ ইয়াকি নাবূদ (একদা এক সময়), দরোল্ মাজানীন্ (পাগলা গারদ), ও দা’স্তানে বাশার (মানুষের গল্প) অন্যতম। ইউনেস্কো ১৯৫৯ সালে “Choix Des Nouvelles” শিরোনামে তাঁর গল্প সংকলন প্রকাশ করেন। এছাড়া, ইয়াকি বূদ ইয়াকি নাবূদ- “একদা এক সময়” নামে অনুবাদ করেছেন আবদুস সবুর খান (সহকারী অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাবি)। বিভিন্ন ভাষায় তাঁর বই অনূদিত হচ্ছে, যার জন্য সময়ের সাথে সাথে তাঁর সাহিত্যকর্মের পরিচিতি বেড়ে চলেছে বিশ্বদরবারে। এক কথাই,জামালযাদের জীবনি ছাড়া ফারসি সাহিত্য লেখা অসম্ভব কারণ তিনি ছিলেন আধুনিক ফারসি সাহিত্যের অনন্য গল্পকার ও লেখক। বর্তমান সময়ে তাঁর সাহিত্যকর্মের উপর ব্যাপক গবেষণা হচ্ছে এর অংশ হিসেবে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের তুর্কী শিক্ষার্থী নাহাদ অলাপ জামালযাদের গল্পের উপর একটি পিএইচডি অভিসন্দর্ভও করেছেন। তাঁর কর্মজীবনের সূচনা হয় “কভে” সাময়িকে লেখালেখির মধ্য দিয়ে। পরে কাজ করেছেন বার্লিনে ইরান দূতাবাসে। সর্বশেষ জাতি সংঘের অধীনস্থ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মধ্য দিয়ে কর্মজীবনের সমাপ্তি ঘটে। মৃত্যুর পর এই মহান লেখককে “লোমান” হ্রদের তীরে সমাহিত করা হয়।

তথ্যসূত্র: ইয়াকি বূদ ইয়াকি নাবূদ (একদা এক সময়): আলী জামালযাদে, অনুবাদ-আবদুস সবুর খান।