গ্রীকপ্রাচীরের উপর আক্রমণ

মিনোতিয়াসপুত্র যখন ইউরিপাইলাসের ক্ষতস্থানের সেবা করছিল তখন ট্রয় ও গ্রীকসৈন্যগণ মরিয়া হয়ে যুদ্ধ করছিল পরস্পরের মধ্যে। গ্রীকদের প্রাচীর ও পরিখা অতিক্রম করতে পারল না ট্রয়সৈন্যদল। তাদের রণতরীগুলোকে রক্ষা করার মানসে এই প্রাচীর একদিন গ্রীকরা নির্মাণ করে এবং সেই প্রাচীরের চারিদিকে তাদের নিরাপত্তার খাতিরে নির্মাণ করে এক গভীর পরিখা। কিন্তু এর জন্য গ্রীকরা কোন পূজানৈবেদ্য উৎসর্গ করে নি দেবতাদের উদ্দেশ্যে। তাছাড়া দেবতাদের বিনা অনুমতিতেই এ প্রাচীর এবং পরিখা নির্মাণ করেছিল তারা। এই জন্যই এ প্রাচীর বেশিদিন স্থায়ী হয় নি।
যতদিন ট্রয়বীর হেক্টর ছিলেন আর অ্যাকেলিস তাঁর সেই অদম্য ক্রোধ পোষণ করে ছিলেন তাঁর অন্তরে, যতদিন রাজা প্রিয়ামের সাধের ট্রয়নগরী ছিল অপরাজেয় ও অনধিকৃত, ততদিন গ্রীক প্রাচীর ছিল অক্ষত। কিন্তু যখন বড় বড় ট্রয়বীরদের পতন ঘটে, বহু গ্রীকবীরও নিহত হয়, যথন ট্রয়যুদ্ধের দ্বাদশ বৎসরে ট্রয়নগরী হয় বিধ্বস্ত আর গ্রীকগণ তাদের রণতরী সাজিয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে, তখন পসেডন ও অ্যাপোলো এই প্রাচীর ধ্বংস করার জন্য এক চক্রান্ত করেন। তখন তাঁরা রিসাস, হেপটোপোয়াস, ফেরীয়াস, রাসিয়াস, গ্রেনিয়াস, অ্যাসোপাস, স্কামান্দার ও সাইময়–এই নদীগুলোর গতিপথ গ্রীকনির্মিত সেই প্রাচীরের দিকে ঘুরিয়ে দেন। এই সব নদীগুলোতে যুদ্ধ চলাকালে বহু বীরের অস্ত্র ও ঢাল নিমজ্জিত হয় আর এই সব তীরে বহু দেবোপম বীর ধরাশায়ী হয়ে ধূলিচুম্বন করতে বাধ্য হয়। অ্যাপোলোর নির্দেশে এই সব নদীগুলো নয়দিন ধরে ক্রমাগত এই প্রাচীরের দিকে প্রবাহিত হয়ে প্রাচীরটিকে আঘাত করতে থাকে এবং এই প্রাচীরটিকে ভেঙে সমুদ্রের জলে মিশিয়ে দেবার জন্য ক্রমাগত নয়দিন ধরে জল বর্ষণ করতে থাকে। পসেডন নিজে এই ধ্বংসকার্য তদারক করতে করতে গ্রীকরা প্রভূত শ্রমসহকারে যে সব পাথর দিয়ে এ প্রাচীরের ভিত্তি নির্মাণ করে সেগুলো সব সমুদ্রের জলে ভাসিয়ে দেয়। তারপর যখন হেলেসপন্ট সাগরের বিশাল জলরাশি এসে সেই প্রাচীরের সমস্ত ধ্বংসাবশেষ গ্রাস করে নিঃশেষে, তখন তার উপর অমিত বালুকারাশি স্থূপাকারে বিছিয়ে দেয় পসেডন। এই ধ্বংসকার্য সাধিত হলে নদীগুলোর গতিপথ পুনরায় যথারীতি ঘুরিয়ে দেন।
কিন্তু পসেডন ও অ্যালোলো কর্তৃক এই ধ্বংসকার্য বহুদিন পরে সাধিত হয়। বর্তমানে দুই পক্ষে চলতে লাগল তুমুল যুদ্ধ। জিয়াসের দ্বারা অভিশাপগ্রস্ত হয়ে অপ্রতিভ হয়ে পড়তে লাগল গ্রীকগণ। হেক্টরের ভয়ে ভীত হয়ে উঠল তারা, আর হেক্টরও আগের মতই ঘুর্ণিঝড়ের প্রচণ্ডতা সহকারে যুদ্ধ করতে লাগলেন। কোন সিংহ বা বন্য শূকরকে একদল মানুষ অথবা কুকুর আক্রমণ করলে সে যেমন অদম্য সাহসের সঙ্গে ঘুরে দাঁড়িয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়, তেমনি হেক্টরও একা গ্রীকসৈন্যদের সমস্ত আক্রমণ প্রতিহত করেছিলেন এবং তার অধীনস্থ ট্রয়সৈন্যদের পরিখা অতিক্রম করার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন।
কিন্তু অশ্বারোহী ট্রয়সৈন্যদের অশ্বগুলো পরিখা অতিক্রম করতে সাহস পাচ্ছিল না। সে পরিখার বিস্তৃতি দেখে ভীত হয়ে হেষাধ্বনি করতে লাগল তারা। তারা পরিখায় ঝাঁপ দিতে চাচ্ছিল না অথবা তা অতিক্রম করতেও পারছিল না, কারণ সেই পরিখার তীরে গ্রীকরা বহু কাটা গাছ বসিয়ে রেখেছিল যাতে সহসা শত্রুরা আক্রমণ করতে না পারে। কোন রথ তার মধ্যে প্রবেশ করতে না পারে। একমাত্র পদাতিক সৈন্যরাই সে পরিখা অতিক্রম করার চেষ্টা করতে পারে।
তখন পলিমেডাস হেক্টরকে সম্বোধন করে বললেন, হে বীর হেক্টর ও মিত্রশক্তির অন্যান্য অধিনায়কগণ, এই পরিখা অতিক্রম করার চেষ্টা উন্মত্ততা ছাড়া আর কিছুই নয়, কারণ পরিখার এ পার কাঁটাগাছে পূর্ণ আর ওদিকে পরিখার ধার ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বিশাল প্রাচীর। সুতরাং আমাদের অশ্বরা চেষ্টা করেও কিছুই করতে পারবে না। তাছাড়া জায়গাটা সংকীর্ণ। সে চেষ্টা করলে আমরাই ক্ষতিগ্রস্ত হব। একমাত্র যদি জিয়াস গ্রীকদের ধ্বংস কামনা করেন তাহলেই আমরা তাদের বিনাশ স্বচক্ষে দেখতে পাব। কিন্তু তারা যদি সমবেত হয়ে আমাদের প্রতিরোধ করে তাহলে আমরা এমনভাবে বিনষ্ট হব যে যে-কথা বর্ণনা করার জন্য একজনও জীবিত থাকবে না আমাদের মধ্যে। তাহলে আর কেউই ফিরে আসবে না আমাদের। সুতরাং এখন আমার কথা শোন। আমাদের সারথি ও সহকর্মীরা আমাদের অশ্বগুলো এখানে ধরে থাকুক আর আমরা হেক্টরের নেতৃত্বে দলবদ্ধ হয়ে বর্ম পরিধান করে পরিখা অতিক্রম করার চেষ্টা করব। যদি তাদের ধ্বংসের দিন সত্যিই আগত হয় তাহলে তারা আমাদের আক্রমণ প্রতিহত করতে পারবে না।
পলিডেমাসের এ কথায় প্রীত হলেন হেক্টর। এ কথায় হেক্টর রথ হতে বর্ম পরিহিত অবস্থায় অবতরণ করলেন। হেক্টরকে অবতরণ করতে দেখে অন্যান্য ট্রয়বীরগণও অবতরণ করলেন রথ থেকে। প্রত্যেকে তাদের অশ্বগুলো পরিখার ধারে সারথিদের কাছে রেখে চলে গেল। তারপর ট্রয়বীরেরা পাঁচটি দলে বিভক্ত হয়ে আপন আপন দলনেতার অধীনে সঙ্ঘবদ্ধ হলো। যারা হেক্টর ও পলিডেমাসের অধীনে গেলেন তারাই সর্বশ্রেষ্ঠ বীর এবং প্রাচীর ভেঙ্গে গ্রীকদের রণতরীগুলো আক্রমণ করার জন্য দৃঢ়সংকল্প ছিলেন তাঁরা। মেব্রিন ছিলেন অন্য এক দলপতি। অন্যান্য দলপতিদের মধ্যে ছিলেন প্যারিস, এলেকেথয় ও এজিনর। এ ছাড়া প্রিয়ামের দুই পুত্র হেলেনাসম ও ডেলফোবাসও ছিলেন সেই সব দলে। এ ছাড়া বীর অ্যাসিয়াসও ছিলেন এই অভিযানে। এই অ্যাসিয়াসেরই কৃষ্ণকায় উন্নত জাতের অশ্বগুলো অ্যারিসবে থেকে আনা হয়। আর একটি দলের মধ্যে অ্যাঙ্কিসেসপুত্র ঈনিসও ছিলেন। অ্যান্টিনরের দুই পুত্র আর্নিলোকাস ও অ্যাকোমাসও ছিলেন অন্য এক দলে। এঁরা সকলেই ছিলেন রণবিদ্যায় অভিজ্ঞ। সার্পেৰ্ডন ছিলেন মিত্রশক্তির দলপতি। তিনি তাঁর সহকারী হিসেবে সঙ্গে নেন গ্লাকাস ও অ্যাসটারোপয়াসকে, যাদের তিনি তাঁর নিজের পরেই সর্বশ্রেষ্ঠ বীর বলে মনে করতেন। এঁরা সকলেই বৃষচর্মাচ্ছাদিত ঢালগুলো ধারণ করে গ্রীকদের আক্রমণ করলেন, কারণ এঁদের দৃঢ় বিশ্বাস এঁরা অতিশীঘ্রই প্রাচীর ভেঙ্গে গ্রীক রণতরীগুলোকে আক্রমণ করবেন।
অন্যান্য ট্রয়সৈন্যরা সকলেই পলিডেমাসের পরামর্শ মেনে নিল এবং সেইমত কাজ করল। কিন্তু হার্তাকাসপুত্র একা অ্যাসিয়াস তার রথ ও সারথিকে বিদায় না দিয়ে এগিয়ে চলল গ্রীকজাহাজ অভিমুখে। আর এইভাবে নিজের সর্বনাশা পরিণামকে নিজেই ডেকে আনল সে। তার সেই রথ রথাশ্বসহ সে তার বিজয়ানন্দে আত্মহারা হয়ে ফিরতে পারল না বাতাবিক্ষুব্ধ ট্রয়নগরীতে। কারণ তার আগেই মৃত্যু এসে আচ্ছন্ন করে ফেলল তাকে। দিউকালিয়নপুত্র আইডোমেনেউসের একটি বর্শা এসে অতর্কিতে আঘাত করল তাকে আর সঙ্গে সঙ্গে পড়ে গেল সে। এসিয়াস গিয়েছিল গ্রীকরণতরীগুলোর বাম দিকের পথ দিয়ে, যে পথে গ্রীকরা যুদ্ধক্ষেত্র হতে রথ নিয়ে ফিরে যেত তাদের শিবিরে। সে পথ দিয়ে গ্রীকরা যুদ্ধ হতে ফিরবে বলে দ্বারপাল প্রহরী উন্মুক্ত রেখেছিল আর সেই দ্বার উন্মুক্ত দেখে সেই পথে কিছু অনুচরসহ রথ চালনা করে প্রবেশ করে অ্যাসিয়াস। সেই পথে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়েই রথ চালনা করে অ্যাসিয়াস আর তার অনুচরবর্গও উৎসাহজনক ধ্বনি দিতে দিতে তার অনুসরণ করে। কারণ তারা এবিষয়ে নিশ্চিত ছিল যে গ্রীকরা আর বেশিক্ষণ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে না আর তারা শীঘ্রই গ্রীকরণতরীগুলোকে অধিকার করে ফেলবে। কিন্তু তারা ঘৃণাক্ষরেও ভাবতে পারে নি। সেই পথে দুজন গ্রীক সেনাপতি দাঁড়িয়ে ভীম রণরঙ্গ মূর্তিতে প্রতীক্ষা করছে তাদের। পর্বতোপরী দুটি বিরাট ওকগাছ যেমন কঠিন প্রস্তরমধ্যে তার সুদূর প্রসারী শিকড়গুলোকে সঞ্চারিত করে ঝড় ও বৃষ্টির সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য বছরের পর বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকে অটল দৃঢ়তায়, তেমনি সেই দুই গ্রীকবীর অ্যাসিয়াসের অভিযানকে প্রতিরোধ করার জন্য দাঁড়িয়েছিল এক অবিচলিত প্রত্যয়ে সমৃদ্ধ হয়ে। একদল ট্রয়সৈন্য তখন অ্যাসিয়াস, তার পুত্র অ্যাডমাস, ল্যামেনাস, ওরেসেস, থুন, ওমেস প্রমুখ দলপতিদের নেতৃত্বে রণোন্মত্ত অবস্থায় চিৎকার করতে করতে গ্রীকপ্রাচীর আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে সেই পথে ক্রমাগত এগিয়ে যেতে লাগল। পলিপিটেস ও লিওনটিয়াস নামে সেই দুই গ্রীকবীর আপাতত কিছুক্ষণ ভিতরে থেকেই গ্রীকসৈন্যদের উৎসাহিত করতে লাগল ট্রয়সৈন্যদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য। কিন্তু যখন তারা দেখল একদল ট্রয়সৈন্য তাদের প্রাচীর আক্রমণ করার জন্য এগিয়ে আসছে সেই পথে আর ভীতিবিহ্বল গ্রীকসৈন্যরা সাহায্যের জন্য কাতরভাবে আর্তনাদ করছে তখন তারা বেগে সেই দ্বারপথের সম্মুখে এসে বীরবিক্রমে প্রতিহত করল ট্রয়সৈন্যদের। উন্মত্ত বন্যশূকরের মত ট্রয়সৈনরা তখন গ্রীকশিবির ও গ্রীকসৈন্যদের লক্ষ্য করে অবিরাম প্রস্তর নিক্ষেপ করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিল। তীক্ষ্ণ তুষারঝড়ে তাড়িত তুষার কণার মতই দুই পক্ষের সৈন্যদের দ্বারা নিক্ষিপ্ত অস্ত্ররাজি ও প্রস্তরখণ্ডে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল সেই ক্ষেত্রটি। প্রস্তরখণ্ড, ঢাল ও শিরস্ত্রাণে প্রতিহত হয়ে নিরন্তর এক শব্দের সৃষ্টি করেছিল বর্শাগুলো। হার্তাকাসপুত্র অ্যাসিয়াস তখন তার দুই জানুতে হাত চাপড়ে জিয়াসের উদ্দেশ্যে বলল, হে পরম পিতা জিয়াস, সত্যি বলতে কি, তুমি আমাদের মিথ্যা আশ্বাস দাও। আমি এবিষয়ে নিশ্চিত ছিলাম যে গ্রীকরা আমাদের কোনমতেই প্রতিহত করতে পারবে না। কিন্তু ক্ষীণকটি মধুমক্ষিকারা যেমন তাদের সন্তানদের নিরাপত্তার জন্য অরক্ষিত চাকগুলোকে ত্যাগ করে কোথাও যায় না তেমনি এই দুই গ্রীকবীর তাদের আপাত রক্ষিত শিবিরের দ্বারপথ ছেড়ে কোথাও যাবে না। এই দ্বার রক্ষার জন্য তারা আক্রমণকারী শত্রুদের সব হত্যা করবে অথবা তারা নিজেরা প্রাণাবলি দেবে।
অ্যাসিয়াসের কথায় কিছুমাত্র বিচলিত হলেন না দেবরাজ জিয়াস, কারণ তিনি চেয়েছিলেন একমাত্র ট্রয়বীর হেক্টরকেই বিজয়গৌরবে ভূষিত করতে। ইতিমধ্যে শিবিরের অন্যান্য দ্বারপথগুলোতেও প্রবেশের জন্য চাপ দিচ্ছিল ট্রয়সৈন্যরা। যেহেতু আমি অন্তর্যামী বা সর্বজ্ঞ দেবতা, আমি সব কথা যথাযথভাবে ব্যক্ত করতে পারব। কারণ তখন গ্রীকনির্মিত সেই প্রস্তর প্রাচীরের বহির্ভাগে যুগপৎ বিভিন্ন স্থানে চলছিল ভয়ঙ্কর যুদ্ধ। সেই প্রাচীরটি তখন এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিবৎ প্রতীয়মান হচ্ছিল। গ্রীকরা তখন এ যুদ্ধের জন্য ঠিকমত প্রস্তুত না থাকলেও তাদের রণতরীগুলো রক্ষা করার জন্য প্রাণপণ যুদ্ধ করছিল। গ্রীক পক্ষাবলম্বনকারী দেবতারাও তা দেখে বিষণ্ণচিত্ত হয়ে উঠলেন। কিন্তু গ্রীকবীর একা ন্যাপিয়া সর্বশক্তি প্রয়োগ করে যুদ্ধ করে যেতে লাগলেন।
পিরিথোয়াসপুত্র পলিপিটেস বর্শা দ্বারা আঘাত করল ট্রয়বীর দামাসাসকে। আকপোলবিস্তৃত শিরস্ত্রাণের ধাতব আচ্ছাদন ভেদ করে সে বর্শাফলক দামাসাসের গণ্ডভিত্তি ও মস্তকের সমস্ত অস্থি বিচূর্ণিত করে দিল। মৃত্যুমুখে পতিত হলো দামাসাস। অতঃপর পলিপিটেস ট্রয়দলপতি পাইলন ও ওর্মেলাসকেও হত্যা করল। ওদিকে লিওনটিয়াস তার বর্শাদ্বারা হিপ্পোমেকাসের কটিবন্ধনী ভেদ করে হত্যা করল তাকে। তারপর সে নিকট যুদ্ধে তরবারির দ্বারা অ্যান্টিফেটকে হত্যা করল। পরে সে যেমন, ল্যামোনাস ও ওরেস্টেসকেও হত্যা করল একে একে।
গ্রীকবীরেরা যখন ট্রয়সেনাপতিদের দেহ থেকে বর্ম ও অস্ত্ররাজি খুলে নিচ্ছিল তখন পরিখার ধারে নীরবে দাঁড়িয়ে তা দেখছিলেন পলিমেডাস ও হেক্টর। তারা তখন কি করবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তাঁর যখন পরিখাঁটি অতিক্রম করার চেষ্টা করছিলেন তখন তারা একটি দৈব প্রেরিত লক্ষণ দেখতে পান। তারা দেখলেন একটি ঈগল পাখি একটি রক্তলাল বর্ণের সাপ ঠোঁটে করে আকাশপথে উড়ে যাচ্ছে। ঈগলটি উড়ে যাচ্ছিল ঠিক গ্রীকশিবিরের বাম দিকের উপর দিয়ে। সাপটি তখনও ঈগলের কবল থেকে মুক্তি পাবার জন্য আঁকপাক করছিল আর নিজের দেহটাকে মুচড়ে ঈগলকে আঘাত করার চেষ্টা করছিল। অবশেষে সাপটি অতি কষ্টে ঈগলের ঘাড়ে আর বুকে ছোবল মারল আর সঙ্গে সঙ্গে সাপটাকে ছেড়ে দিয়ে যন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতে উড়ে গেল ঈগলটা। সাপটা এদিকে শূন্যে ভাসতে ভাসতে পড়ে গেল ট্রয়সৈন্যদের মাঝখানে। সাপটা তখনও এঁকেবেঁকে পালাবার চেষ্টা করছিল। সাপটা ছিল দেবরাজ জিয়াসপ্রেরিত এক লক্ষণ আর তা দেখে ভীত হয়ে উঠল ট্রয়সৈন্যগণ। পলিডেমাস তখন হেক্টরের কাছে গিয়ে বলল, হেক্টর, যুদ্ধ সম্পর্কিত যে কোন মন্ত্রণাসভায় তুমি শুধু আমাকে তিরস্কার করো। বিজ্ঞের মত আমি সঠিক কথা বললেও তুমি আমাকে সমর্থন করো না। তোমার ভাব দেখে মন হয়, মন্ত্রণাসভায় বা যুদ্ধক্ষেত্রে কেউ তোমার কথার প্রতিবাদ করুক এটা তুমি চাও না। তুমি চাও সকলেই তোমার যে কোন কথা ও কাজকে সমর্থন করুক। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি যা ভাল বুঝি তা বলব। আমার মতে এখন আমাদের এগিয়ে গ্রীকরণতরীগুলোর সামনে গিয়ে যুদ্ধ করা উচিত নয়, কারণ আমি জানি কি ঘটবে। ওষ্ঠদৃত ভয়ঙ্কর এক লোহিত সর্পসহ উড্ডীয়মান ঐ ঈগলটি যদি সত্যি সত্যিই ট্রয়বাসীদের প্রতি দেবপ্রেরিত এক সুলক্ষণ হয় তাহলে আমার ধারণা ঠিক হবেই। ঈগলটি সাপটিকে মাঝপথেই ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়, সে তাকে আর শাবকদের ক্ষুধার খাদ্য হিসেবে মেরে নিয়ে যেতে পারে নি তার বাসায়, আমাদের ক্ষেত্রেও তাই হবে। প্রবল চেষ্টার ফলে আমরা যদি গ্রীকদের প্রাচীরদ্বার ভেঙ্গে শিবিরে প্রবেশ করি এবং ওরা যদি আমাদের প্রতিরোধ করতে সমর্থ নাও হয় তাহলেও আমরা অক্ষতভাবে ফিরে আসতে পারব না। আমাদের মধ্যে আজ যারা আছে তাদের অনেককেই গ্রীকদের হাতে সাক্ষাৎ মৃত্যুর কবলে ফেলে আসতে হবে। গ্রীকরা তাদের রণতরী রক্ষার খাতিরে আমাদের অনেককে হত্যা করবেই। দৈব লক্ষণসংক্রান্ত ব্যাপারে যাদের অভিজ্ঞতা আছে এমন অনেক ভবিষ্যদ্বক্তাই এবিষয়ে আমি যা বললাম তাই বলবে।
হেক্টর ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে পলিডেমাসের দিকে তাকিয়ে বললেন, পলিডেমাস, আমি তোমার এই ব্যাখ্যা মানতে পারলাম না। তুমি এর থেকে ভাল ব্যাখ্যা করলে ভাল করতে। এবিষয়ে তোমার মনোভাব সৎ ও সাধু হলেও এ ব্যাখ্যা তোমার একান্তভাবে যুক্তিবিবর্জিত। আর আমাকে জিয়াসের নির্দেশ মেনে চলতে বলো না, তার প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি মেনে চলতে বলো না।
পলিডেমাস ঘাড় নেড়ে তাঁর পূর্বকথিত কথাকেই নতুন করে সমর্থন করল।
তখন হেক্টর বললেন, সামান্য একটা উড়ন্ত পাখির গতিবিধির দ্বারা তুমি আমাকে নিয়ন্ত্রিত করার চেষ্টা করছ? সে রাতের অন্ধকারে না দিনের আলোতে, বাঁ দিকে না ডান দিকে উড়ে চলেছে তা দেখার আমার প্রয়োজন নেই। মানবকুল ও দেবকুলের রাজ একমাত্র জিয়াসের উপর আস্থা রেখে কাজ করে চল। অন্য সব লক্ষণের কথা বাদ দাও। আমরা জানি শুধু একটা লক্ষণের কথা, আর সে লক্ষণ হলো এই যে, আমরা আমাদের দেশের জন্য যুদ্ধ করে যাব। কেন তুমি ভয় পাচ্ছ? যদিও আমরা সকলেই গ্রীকরণতরীগুলোর জন্য প্রাণ দেবার জন সতত প্রস্তুত তথাপি একমাত্র তুমিই দেখছি যুদ্ধে পরাজুখ এবং মৃত্যুভয়ে ভীত। তুমি সংকল্পে অটল বা সাহসে দৃঢ় হও। কিন্তু তুমি নিজে যুদ্ধ না করে অথবা অপরকে যুদ্ধ হতে বিরত হবার কথা বল তাহলে আমারই বর্শার আঘাতে নিহত হবে তুমি।
এই বলে গ্রীকপ্রাচীরদ্বার অতিক্রম করার জন্য এগিয়ে গেলেন হেক্টর আর তাঁর সঙ্গে সঙ্গে বায়ুবিদীর্ণকারী এক বিরাট রণধ্বনি তুলে একদল ট্রয়সৈন্য অনুসরণ করতে লাগল তাঁকে। এমন সময় বজ্ৰাধিপতি জিয়াস আইডা পর্বতের সুউচ্চ শিখর হতে এক প্রবল ঝঞ্ঝা প্রেরণ করে ধূলিজালে সমাচ্ছন্ন করে ফেললেন গ্রীকরণতরীগুলোকে; বিকল করে দিলেন গ্রীকসৈন্যদের সাহসের সব তীব্রতাকে। যে হেক্টর আর ট্রয়সৈন্যরা তার দ্বারা প্রেরিত দৈবলক্ষণ আর তার উপর আস্থা রেখে গ্রীকপ্রাচীর ভেঙ্গে সচেষ্ট ও দৃঢ়সংকল্প হয়ে উঠেছে, তিনি তাদেরই জয়মাল্যে ভূষিত করতে চাইলেন। প্রাচীরটিকে ভূমিসাৎ করার জন্য সর্বপ্রযত্নে চেষ্টা করতে লাগল ট্রয়সৈন্যরা। প্রথমে তারা প্রাচীরের সম্মুখস্থ স্তম্ভগুলোকে ভেঙ্গে ফেলল, তারপর প্রাচীর মধ্যস্থিত গর্তগুলোকে বড় করার চেষ্টা করতে লাগল। তথাপি গ্রীকসৈন্যরা আত্মসমর্পণ করল না অথবা যুদ্ধে পরাজুখ হলো না, বরং তারা নতুন উদ্যমে প্রাচীরের উপর হতে অস্ত্রনিক্ষেপ করতে লাগল শত্রুসৈন্যদের উপর।
দুজন অ্যাজাক্স বীর প্রাচীরসংলগ্ন যুদ্ধক্ষেত্রের এক অংশে ইতস্তত বেগে ধাবিত হয়ে সমস্ত গ্রীকসৈন্যদের উত্তেজিত করে যেতে লাগলেন। যখনি তারা দেখলেন কোন গ্রীকসৈন্য যুদ্ধে পরাজুখ বা হতোদ্যম হয়ে রয়েছে তখনই তীক্ষ্ণ ভাষায় তাকে ভর্ৎসনা করে বলতে লাগলেন, হে গ্রীকসৈন্যগণ, ভাল মন্দ, ছোট বড় নির্বিশেষে আমরা সকলকেই বলছি, তোমরা হয়ত বুঝতে পেরেছ আজকের এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধে উভয়পক্ষই সমপরিমাণ শক্তিতে প্রবল। কিন্তু দেখবে, তোমাদের মধ্যে কেউ যেন যুদ্ধ করতে করতে জাহাজে ফিরে না যায়, দেখবে সবাই যেন শত্রুদের বিতাড়িত করার জন্য সামনের দিকে এগিয়ে যায়। যাতে আমরা দেবরাজ জিয়াসের কৃপায় শত্রুদের বিতাড়িত করে তাদের নগরাভ্যন্তরে আশ্রয় নিতে বাধ্য করতে পারি তার জন্য যুদ্ধ করে যেতে হবে আমাদের প্রাণপণ শক্তিতে।
এইভাবে গ্রীকসেনাদের উত্তেজিত করে বেড়াতে লাগলেন অ্যাজাক্স বীরদ্বয়। অবিরাম তুষারপাথে পর্বতশিখর ও সমুদ্রকূরবর্তী ভূখণ্ড সমাচ্ছন্ন হলেও সমুদ্রের বেগবান তরঙ্গমালাকে যেমন কিছুমাত্র স্পর্শ ও প্রতিহত করতে পারে না সে তুষার, তেমনি ক্রমাগত ইষ্টক ও প্রস্তরবর্ষণে গ্রীক প্রাচীরগাত্রটি ক্ষতবিক্ষত হলেও অপ্রতিহত বেগে ও অক্ষুণ্ণ উদ্যমে যুদ্ধ করে যেতে লাগল গ্রীক ও ট্রয়সৈন্যগণ।
কিন্তু বীর হেক্টর ও তাঁর অনুসারীরা ট্রয়সৈন্যরা কোনমতেই গ্রীকপ্রাচীর ভঙ্গ করতে পারত না যদি না দেবরাজ জিয়াস সহসা তাঁর অন্যতম পুত্র সার্পেনকে গবাদি পশুপালের মধ্যে সিংহের মত সেই রণক্ষেত্রে পাঠাতেন। তাঁর দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা নির্মিত বিশাল রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হলেন সার্পেডন, তখন তাঁকে দেখে মনে হলো যেন কোন সিংহ সুদীর্ঘ সঞ্চিত ক্ষুধার যন্ত্রণায় মরিয়া হয়ে উদ্ধত ও অপ্রতিহত হয়ে উঠেছে এক অমিত স্পর্ধায়। কোন মেষকে পাল থেকে শিকার হিসেবে করায়ত্ত না করা পর্যন্ত সে সিংহ যেমন মেষপালকের তাড়নায় কিছুমাত্র ভীত হয় না বা পালিয়ে যায় না, তেমনি সার্পেড়নও যেন গ্রীক প্রাচীরটিকে আঘাতে আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ না করে যাবেন না।
তিনি একবার হিপ্পোলোকাসপুত্র গ্লকাসকে সম্বোধন করে বললেন, শোন গ্লকাস, লাইসিয়াবাসীরা আমাদের সব থেকে ভক্তি করে, ভক্তিভরে আমাদের কাছে প্রভুর পূজা উপাচার দেয়, তাদের উৎসর্গীকৃত মদের অঞ্জলিতে সতত পূর্ণ থাকে আমাদের পানপাত্র। জ্যানথাস নদীর তীরে এক বিশাল পুষ্পেদ্যান-বাটিকাসহ এক বিস্তৃত গমের ক্ষেত্র দান করেছে তারা আমাদের। আর এই জন্যই আজ তাদের জন্য যুদ্ধের খোরাক বহন করতে এসেছি আমি। আমি তাদের সাহায্য করতে এসেছি যাতে লোকে বলাবলি করতে পারে লাইসিয়ার রাজন্যবর্গ যুদ্ধে পারঙ্গম; তারা শুধু ভোজনবিলাসী নয়, তারা সমরোদ্যমীও। আরও শোন বন্ধু, যদি তোমরা এই যুদ্ধ পরিহার করে দূরে গিয়ে মৃত্যু ও বার্ধকেও পরিহার করতে পার তাহলে আমি তোমাদের যুদ্ধে এগিয়ে যেতে বলতাম
আর নিজেও এ যুদ্ধে অবতীর্ণ হতাম না। কিন্তু তা হবার নয়, সর্বগ্রাসী মৃত্যুর অমোঘ মায়াজালকে কোন মানুষই পরিহার করতে পারে না। সুতরাং এগিয়ে চল। প্রাণপণ শক্তিতে যুদ্ধ করে চূড়ান্ত জয় লাভ করো। না হয় শত্রুদের করে বিজয়মাল্য তুলে দাও।
গ্নকাস সম্মত হলো সার্পেডনের কথায়। দুজনে এগিয়ে চললেন বীরদর্পে। ভীম মূর্তিতে তাদের গ্রীক প্রাচীরাভিমুখে অগ্রসর হতে দেখে ভীত হয়ে উঠল পেতিরসপুত্র মেনেসথিয়াস। সাক্ষাৎ ধ্বংসের তাণ্ডবলীলা যেন মূর্ত হয়ে উঠেছে দুজনের হাতে। সাহায্যে প্রত্যাশার চারিদিকে তাকিয়ে মেনেসথিয়াস দেখল দুই অ্যাজাক্স বীর আর টিউসার ইতস্তত ঘোরাফেরা করছে। তাদের আহ্বান করে উচ্চৈঃস্বরে ডাকতে লাগল মেনেসথিয়াস, কিন্তু সার্পেৰ্ডন ও গ্লকাস প্রাচীরদ্বারে ডাল ও অস্ত্রদ্বারা আঘাত করে এমন এক তুমুল গর্জনের সৃষ্টি করল মেনেসথিয়াসের ডাক শুনতে পেল না তার সহকর্মীরা। আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছিল সে গর্জনের ঘোর রবে। গ্রীকরা তখন সব প্রাচীরদ্বারগুলো বন্ধ করে দিয়েছিল বলেই সেই রুদ্ধদ্বার পথগুলো ভাঙার চেষ্টা করছিল ট্রয়সৈন্যরা। মেনেসথিয়াস তখন অনন্যোপায় হয়ে থুতেকে দূত হিসেবে পাঠাল অ্যাজাক্সের কাছে। সে বলল, যাও থুতে, অ্যাজাক্সকে ডাক যদি তাঁরা দুজনেই আসেন ত আরও ভাল হয়। তাঁদের সঙ্গে প্রসিদ্ধ তীরন্দাজ টিউসারও যেন আসেন। বলগে, লাইসিয়ার দুই অধিনায়ক অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে আসছেন আমাদের আক্রমণ করার জন্য।
দূত ছুটে গেলেন অ্যাজাক্স সমীপে। গিয়ে বলল, হে গ্রীক রাজন্যবর্গ, পেতিয়াসপুত্র আপনাদের যেতে বলেছেন, যদি পারেন দুজনে গেলেই ভাল হয়। কারণ লাইসিয়ার অধিনায়কগণের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন তিনি। আর কেউ না হোক অন্তত তেলামনপুত্র অ্যাজাক্স ও বীর তীরন্দাজ টিউসার যেন যান।
তেলামনপুত্র অ্যাজাক্স তখন সেই সংবাদ শুনে অয়লিয়াসকে বললেন, আচ্ছা তুমি আর বীর লাইকোমেদিস কি দুজনে গ্রীকসেনাদের যুদ্ধে উৎসাহ দেবার জন্য এখানে থাকবে? আমি অবশ্য. পেতিয়াসপুত্রকে তার প্রার্থিত সাহায্য দান করার সঙ্গে সঙ্গেই এখানে ফিরে আসব অবিলম্বে।
এই কথা বলে টিউসারকে সঙ্গে নিয়ে তেলামনপুত্র অ্যাজাক্স চলে গেলেন। প্যাদিয়ন টিউসারের বিশাল ধনুকটি বহন করে নিয়ে চলল তাঁদের সঙ্গে। তাঁরা গিয়ে দেখলেন, লাইসীয় সৈন্যরা সার্পেৰ্ডন ও গ্লকাসের নেতৃত্বে মেনেসথিয়ানসকে ভীষণভাবে আক্রমণ করেছেন আর মেনেসথিয়াস এক প্রাচীরের উপর থেকে একা যুদ্ধ করে চলেছে। প্রাচীরের উপর থেকে লাইসীয় সেনাদলকে দেখে মনে হলো বায়ুতাড়িত একরাশ ঘনকৃষ্ণ মেঘ ছুটে আসছে তাঁদের দিকে। তাদের রণনিনাদে ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে চারিদিকে।
প্রাচীরের উপর প্রস্তর নিক্ষেপ করে তেলামনপুত্র অ্যাজাক্স প্রথমে সার্পেডনের এক সহকর্মী অ্যাপিকলসকে নিহত করলেন। পর্যাপ্ত যৌবনসমৃদ্ধ কোন যুবকের পক্ষে যে প্রস্তর উত্তোলন করা সম্ভব নয়, অ্যাজাক্স একা তা তুলে অ্যাপিকলস-এর উপর এমনভাবে নিক্ষেপ করলেন যাতে শিরস্ত্রাণপরিহিত তার মস্তক চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল এবং প্রাচীরের উপর উঠতে গিয়ে নিষ্প্রাণ অবস্থায় মাটিতে পড়ে গেল। এরপর টিউসারের এক অব্যর্থ তীর গ্লকাসের শিরস্ত্রাণহীন মস্তকে গুরুতরভাবে আঘাত করায় সে গোপনে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে চলে গেল। পাছে তাকে আহত দেখে কোন গ্রীকসেনা বিদ্রূপ করে সেই ভয়ে গোপনে গাঢাকা দিয়ে সরে পড়ল গ্লকাস। গ্লকাসকে আহত ও পলায়নরত দেখে মর্মাহত হলেন সার্পেড়ন। তিনি একই তখন তাঁর বর্শার দ্বারা আলোমাওনকে আঘাত করলেন এবং প্রাচীরগাত্র ভেদ করার জন্য বারবার আঘাত হানতে লাগলেন। অবশেষে লোক চলাচলের উপযোগী এক ছিদ্র হলো প্রাচীরগাত্রে।
অ্যাজাক্স ও টিউসার তখন একযোগে আক্রমণ করলেন সার্পেডনকে। যে বিশাল ঢালটি অন্তরালবর্তী করে রেখেছিল সার্পেডনের দেহটিকে সেই ঢালকে লক্ষ্য করে এক তীর নিক্ষেপ করলেন টিউসার। কিন্তু দেবলোক হতে অলক্ষ্যে তাঁর পুত্রকে ধ্বংসের হাত হতে রক্ষা করলেন জিয়াস। ইতিমধ্যে অ্যাজাক্স তাঁকে বর্শা দিয়ে আক্রমণ করলেন। সে বর্শা সার্পেডনের ঢালটিকে সম্পূর্ণরূপে ভেদ করতে না পারলেও তার আঘাতে বেশকিছুটা সরে যেতে বাধ্য হলেন সার্পেৰ্ডন। বরং তিনি লাইসীয়সেনাদের উদ্দেশ্যে বলতে লাগলেন, কেন তোমরা আমাকে একা ফেলে চলে যাচ্ছ? আমার যত শক্তি থাক আমি কখনো একা প্রাচীর ভেঙ্গে গ্রীকরণতরীতে উপনীত হতে পারব না। তোমরা আমার কাছে এসে যুদ্ধ করো। আমরা সংখ্যায় তত বেশি হই ততই ভাল।
সার্পেডনের এই ভর্ৎসনাবাক্যে যৎপরোনাস্তি লজ্জিত হয়ে লাইসীয়সৈন্যগণ ছুটে এল তাঁর চারি পার্শ্বে। গ্রীকসেনাগণও প্রাচীরের ওদিকে সঙ্বদ্ধভাবে প্রস্তুত হয়ে উঠল। উভয় পক্ষে আবার শুরু হলো তুমুল যুদ্ধ। লাইসীয় সেনাগণ যেমন প্রাচীর ভেঙ্গে পথ করে ঢুকতে পারল না গ্রীক শিবিরের মধ্যে গ্রীকগণও তেমনি প্রাচীরগাত্র হতে লাইসীয়দের বিতাড়িত করতে পারল না। কোন এক ক্ষেতের স্বত্বাধিকার নিয়ে বিবাদরত দুই সশস্ত্র চাষী যেমন সেই ক্ষেত্রের সীমানা ছেড়ে যায় না, তেমনি সেই প্রাচীরগাত্রের দুই দিকে যুদ্ধরত দুই দল মানুষ সমানে যুদ্ধ করে যেতে লাগল প্রাণপণ শক্তিতে। প্রাচীর ছেড়ে সরে গেল না কোন দল। উভয় পক্ষেই বহু লোক হতাহত হলো। কত গ্রীক ও ট্রয়সৈন্যের রক্তে রঞ্জিত হয়ে উঠল সেই প্রাচীরগাত্র। তবু হার মানল না বা রণে ভঙ্গ দিল না গ্রীকসেনাগণ। জয় পরাজয়ের দাঁড়িপাল্লায় সমান হয়ে উঠল দুই দিক। দেবরাজ জিয়াস অবশ্য প্রিয়ামপুত্র হেক্টরকেই অধিকতর বিজয়গৌরবে গৌরবান্বিত করতে চেয়েছিলেন। জিয়াসের সেই শুভেচ্ছায় সমৃদ্ধ হয়ে হেক্টরই প্রথম এক উল্লম্ফনে প্রাচীর অতিক্রম করে ট্রয়সেনাদের আহ্বান করে বললেন, তোমরা প্রাচীর অতিক্রম করো, গ্রীক জাহাজগুলোতে অগ্নিসংযোগ করো।
হেক্টরের এই উত্তেজনাপূর্ণ বাক্যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রাচীর অতিক্রম করার জন্য বর্শা হাতে তার উপর উঠে পড়ল ট্রয়সেনাগণ। যে প্রস্তর দুই তিনজন শক্তিমান পুরুষে উত্তোলন করতে পারে না সেই বিশাল প্রস্তরটিকে অনায়াসে উত্তোলন করে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে প্রাচীরদ্বারে তাই দিয়ে আঘাত করলেন হেক্টর। তার প্রবল ভারে প্রাচীরদ্বারের লৌহখিল ভগ্ন হয়ে পড়ায় প্রাচীরদ্বার উন্মুক্ত হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সেই সহসা উন্মুক্ত দ্বারপথে মুখখানাকে ভয়ঙ্করভাবে কালো আর চোখ দুটিকে অস্বাভাবিকভাবে উজ্জ্বল করে ভিতরে প্রবেশ করলেন হেক্টর। তার ব্রোঞ্জনির্মিত বর্ম আর হস্তধৃত দুটি বর্শাফলকের ধাতব উজ্জ্বলতা ভীতি সঞ্চার করতে লাগল গ্রীকদের মনে। হেক্টর ট্রয়সৈন্যদের সদলবলে প্রাচীর অতিক্রম করার জন্য আবার আহ্বান জানালেন। তা দেখে সন্ত্রস্ত হয়ে পালিয়ে গেল গ্রীকসৈন্যদয়। গোলযোগ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিল তাদের মধ্যে।