জিয়াস কর্তৃক প্রতারণা

নেস্টর তখন মদ্যপানে ব্যস্ত ছিলেন। তবু যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান চিৎকার কানে আসছিল তার। তিনি তখন অ্যাসক্লোপিয়াসপুত্র মাকাওনকে বললেন, এ সবের অর্থ কী মাকাওন? আমাদের রণতরীগুলোর পাশে যুদ্ধের চিৎকার ক্রমশই বেড়ে যাচ্ছে। এখন তুমি বস, কিছু মদ পান করো। হেকামেদী তোমার স্নানের জল গরম করছে, তোমার দেহগাত্র হতে সব রক্ত ধুয়ে সে পরিষ্কার করে দেবে। আমি শীঘ্রই কোন পর্যবেক্ষণাগারে গিয়ে প্রকৃত ঘটনা কি তা নিরীক্ষণ করব।
এই কথা বলতে বলতেই তাঁর পুত্র থ্রেসিমেদিসের ব্রোঞ্জনির্মিত উজ্জ্বল বর্শাটি তাঁর তাঁবুর ভিতর থেকে তুলে নিলেন। তিনি বাইরে গিয়ে দেখলেন ট্রয়সৈন্যরা গ্রীক প্রাচীর লজ্জন করায় গ্রীকসেনারা ভয়ে যেদিকে পারছে ছুটে পালাচ্ছে। জোয়ার আসার সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্র স্ফীতকায় হয়ে উঠলে যেমন কোন তরঙ্গ থাকে না তার বুকে, কোন বেগবান বাতাসের অপেক্ষায় স্তব্ধ হয়ে থাকে যেমন তার নিস্তরঙ্গ বুক, তেমনি বৃদ্ধ নেস্টরও স্তব্ধ হয়ে ভাবতে লাগলেন, তিনি গ্রীকসেনাদের মাঝে গিয়ে যুদ্ধ করবেন না রাজা অ্যাগামমননের সন্ধানে বের হবেন। অবশেষে তিনি আত্রেউসপুত্রের কাছে যাওয়াই স্থির করলেন। ওদিকে তখন উভয় পক্ষের সৈন্যরাই একে অন্যকে আক্রমণ করে বর্শা ও তরবারির দ্বারা ক্রমাগত আঘাত করে যাচিছল আর তার ফলে বর্মের উপর অস্ত্রের নিরন্তর ঘর্ষণজনিত এক শব্দ রণক্ষেত্রের চারদিকেই ছড়িয়ে পড়ছিল।
ডায়োমেডিস, ওডিসিয়াস ও অ্যাগামেনমন তখন তাদের উপকূলবর্তী জাহাজ থেকে বেরিয়ে আসছিলেন সবেমাত্র। পথেই দেখা হয়ে গেল নেস্টরের সঙ্গে। তারা সকলেই কিছু কিছু আহত হয়েছিল। তাদের আগে অনেকেই জাহাজ থেকে বেরিয়ে প্রাচীর সীমানা পার হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে চলে গেছে। উপকূলভাগ প্রশস্ত হলেও রণতরীগুলো স্থাপন করা সম্ভব হয় নি। সামনে পিছনে করে বিভিন্ন সারিতে একসারিতে স্থাপন করা হয়েছিল সেগুলোকে। আহত রাজন্যগণ জাহাজ থেকে বার হয়ে আপন আপন বর্শার উপর ভর দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছিলেন। তাঁরা নেস্টরকে সহসা তাঁদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে ভীত হয়ে উঠলেন। রাজা অ্যাগামেমনন বললেন, হে নেলেউসপুত্র নেস্টর, কেন আপনি যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে এখানে এসেছেন? তবে কি হেক্টর একদিন যা বলেছিল তাই সত্যে পরিণত হয়েছে? সে একদিন গর্ব করে বলেছিল, আমাদের জাহাজগুলোকে পুড়িয়ে আমাদের সকলকে হত্যা না করে সে ফিরে যাবে না ইলিয়াম নগরীতে। এখন দেখছি তার কথা সব সত্য হয়ে উঠেছে। অথচ আমাদের মধ্যে অ্যাকেলিসের মত গ্রীকবীর আমার প্রতি ক্রোধের বশবর্তী হয়ে আজও যুদ্ধ হতে বিরত আছেন।
নেস্টর উত্তর করলেন, তুমি যা বলছ ঠিক তাই হতে চলেছে এখন এবং বজ্ৰাধিপতি স্বয়ং জিয়াসও তা রোধ করতে পারলেন না। যে প্রাচীরটিকে দুর্ভেদ্য ভেবে আমাদের ও আমাদের জাহাজগুলোর নিরাপত্তার জন্য নির্ভর করেছিলেন তার উপর, সে প্রাচীর এখন ভূমিসাৎ হয়ে গেছে। ট্রয়সৈন্যরা মরিয়া হয়ে এক ভয়ঙ্কর দৃঢ়তার সঙ্গে যুদ্ধ করছে। আমাদের পাশে এসে। অথচ আপনি যুদ্ধক্ষেত্রের যেদিকেই তাকাবেন সেদিকেই দেখবেন বিহ্বল ও হতবুদ্ধি গ্রীকরা শুধু বোকার মত প্রাণবলি দিচ্ছে। ট্রয়সেনাদের বিজয়োল্লাস আকাশকে স্পর্শ করছে। এখন একবার ভেবে দেখুন আমাদের কি করা উচিত। আমি কিন্তু আপনাদের এখন যুদ্ধে যেতে বলতে পারি না, কারণ মানুষ কখনো আহত অবস্থায় যুদ্ধ করতে পারে না।
অ্যাগামেমনন তখন উত্তর করলেন, ট্রয়সেনারা যদি আমাদের জাহাজগুলোর সম্মুখভাবে এসে যুদ্ধ করতে থাকে, যে প্রাচীর ও পরিখাকে দুর্ভেদ্য ভেবে আমরা আমাদের নিরাপত্তার জন্য এত বেশি করে নির্ভর করেছিলাম, সে প্রাচীর সে পরিখা যদি আমাদের রক্ষা করতে না পারে তাহলে বুঝব জিয়াস চান এক বিরাট অগৌরবের গ্লানি। নিয়ে আমরা এখান থেকে ধ্বংস হয়ে যাই সকলে। তিনি চান আমাদের জন্মভূমি আর্গস থেকে দূরে প্রাণত্যাগ করি আমরা অসহায়ভাবে। আমি জানি জিয়াস কখন আমাদের রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। এও বুঝতে পারছি তিনি ট্রয়বাসীদের দেবতাদের সমান সম্মানে ভূষিত করতে চান আর আমাদের হাত-পা বেঁধে পশুর মত মারতে চান। এখন আমি যা বলি তাই শুনুন। রাত্রির অন্ধকার নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে যখন যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হবে তখন আমাদের জাহাজগুলোকে টেনে জলে ভাসিয়ে দিন। রাত্রির অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে আমাদের পালাতে হবে। ধরা পড়ে পশুর মত নিহত হওয়ার থেকে পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচানো অনেক ভাল।
ওডিসিয়াস এবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন অ্যাগামেমননের দিকে। তারপর বললেন, কি বলছ তুমি আত্রেউসপুত্র? তুমি সত্যই হতভাগ্য। আমাদের মত যেসব যোদ্ধাদের জীবনকে যৌবন থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত সংগ্রামশীল করে তুলেছেন জিয়াস সেই সব বীর যোদ্ধাদের অধিপতি না হয়ে কোন এক হীন সেনাদলের অধিপতি হওয়া উচিত ছিল তোমার। যে ট্রয়নগরী জয় করার জন্য আমরা এত দুঃখকষ্ট ভোগ করেছি। সেই ট্রয়নগরী তুমি ফেলে রেখে চলে যেতে চাও? খুব হয়েছে চুপ করো, আর কোন কথা বলো না যাতে অন্য কোন গ্রীকসেনা বা গ্রীকরাজন্য তোমার মত একথা কখনো না বলে। তুমি যেকথা একটু আগে বললে সে কথাকে আমি আন্তরিকভাবে ঘৃণা করি। যখন জোর যুদ্ধ চলছে তখন জাহাজ ভাসিয়ে দিতে বলে তুমি কি আমাদের বিজয় ট্রয়বাসীদের হাতে ঠেলে দিতে চাও? কারণ জাহাজগুলোকে জলে ভাসিয়ে দিতে দেখলেই গ্রীকসেনারা আর যুদ্ধ করবে না আর ট্রয়সেনাদের আক্রমণ করার চেষ্টা করবে না বা তাদের পানে তাকাবে না। সুতরাং হে আমাদের অধিনায়ক, তোমার এই পরামর্শ আমাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
অ্যাগামেমনন উত্তর করলেন, ওডিসিয়াস, তোমার বাক্যবাণ আমার মর্মদেশ বিদ্ধ করেছে। আমি জাহাজ ভাসাবার আদেশ দেব না কোন যুবা বা বুদ্ধের নিকট আমি অন্য কোন পরামর্শ পেতে চাই যা আমি গ্রহণ করতে পারি।
তখন ডায়োমেডিস বললেন, লোকের অভাব নেই, কাছেই আছে। আমি আপনার থেকে বয়সে ছোট, তা হত্তেও যদি আমার কথা আপনি শোনেন তাহলে আমি তা বলতে পারি। যিনি থবস নগরীতে সমাহিত হয়ে আছেন, সেই টাইডেউসের আমি পুত্র। প্রোথিয়াসের তিন পুত্র ছিল। তার মধ্যে অ্যাগ্রিয়াস ও মেনাসম পুরণ ও পার্বত্য প্রদেশে ক্যালিডনে বাস করতেন। তার তৃতীয় পুত্র বীর নাইট ঈনেউস ছিলেন আমার পিতার পিতা এবং তিনি ছিলেন প্রোথিয়াসের তিন পুত্রের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বীর ও সাহসী। ঈনেউস অন্য কোথাও না গিয়ে স্বদেশেরই জীবনযাপন করেন। কিন্তু তার পুত্র আমার পিতা দৈব বিধানে আর্গসে এসে বসবাস করেন। তিনি আদ্ৰেস্তাস বংশের এক কন্যাকে বিবাহ করেন। আমার পিতা যে শুধু এক ধনম্পদশালিনী রাজ্যের রাজা ছিলেন তাই নয়, তিনি বর্শাযুদ্ধেও গ্রীকদের মধ্যে ছিলেন সর্বাপেক্ষা পারদর্শী। আমি যেসব কথা বলছি তা সত্যি কি না আপনি নিশ্চয় তা শুনে থাকবেন। সুতরাং আমার মতে আমরা আহত হওয়া সত্ত্বেও আমাদের এখুনি যুদ্ধে যাওয়া উচিত। শত্রুদের বর্শার ঘায়ে আরো আঘাত পাব এই ভয়ে যুদ্ধে বিরত হয়ে এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে যুদ্ধে পরাজুখ হয়ে যারা আনন্দে কাল কাটাচ্ছে তাদের অনুপ্রাণিত করতে পারি।
ডায়োমেডিসের কথা শুনে রণক্ষেত্রের অভিমুখে রওনা হলেন তাঁরা। রাজা অ্যাগামেমনন চললেন সকলের আগে।
ইতিমধ্যে পসেডনও চুপ করে বসে ছিলেন না। তিনি এক বৃদ্ধের ছদ্মবেশে রাজা অ্যাগামেমনের সামনে এসে দাঁড়িয়ে তার ডান হাতটি টেনে নিয়ে বললেন, আত্রেউসপুত্র। আমার মনে হয় গ্রীকসেনাদের এভাবে বিধ্বস্ত ও নিহত দেখেও কোন অনুশোচনা জাগছে না অ্যাকেলিসের মনে। তার মত লোকের এক শোচনীয় পরিণতি লাভ করা উচিত। জিয়াস তোমার প্রতি একেবারে ক্রুদ্ধ হন নি। তুমি দেখবে ট্রয়বাসীদের পদভাবে সমগ্র রণক্ষেত্র ধূলিজালে সমাচ্ছন্ন হলেও একসময় তারা তোমাদের জাহাজের কাছ থেকে পালিয়ে গিয়ে তাদের নগরের মধ্যে আশ্রয় নেবে।
এই কথা বলে পসেডন তার বুকের ভিতর থেকে এমন এক ধ্বনি বার করলেন যা দশ হাজার যুদ্ধরত রণোন্মত্ত সৈনিকের সমবেত ধ্বনির সমতুল। সে ধ্বনি শুনে মনে নতুন করে সাহস পেল গ্রীকরা। তারা নতুন করে শত্রুদের আক্রমণ করে অক্লান্তভাবে যুদ্ধ করে যাওয়ার এক অগ্নিপ্রেরণা লাভ করল।
অলিম্পাস পর্বতের একটি শিখর থেকে হেরা যখন দেখলেন তাঁর ভ্রাতা পসেডন যুদ্ধক্ষেত্রে গ্রীকদের মাঝে ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছেন ব্যস্তভাবে তখন তিনি সন্তুষ্ট হলেন। বহুপ্রস্রবণবিশিষ্ট আইডা পর্বতের সর্বোচ্চ শিখরদেশে জিয়াসকে বসে থাকতে দেখে তাঁর প্রতি এক ঘৃণা অনুভব করলেন হেরা। তিনি ভাবলেন, এই যুদ্ধের ব্যাপার থেকে জিয়াসের মনটাকে ভুলিয়ে রাখতে হবে। অবশেষে তিনি ঠিক করলেন উত্তম পোশাকে সজ্জিত হয়ে তিনি জিয়াসের সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন আর তাহলে তাঁর রূপে মুগ্ধ হয়ে তাঁর সঙ্গে সঙ্গম প্রার্থনা করবেন তিনি। এইভাবে তাঁরা রতিক্রিয়ায় রত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সর্ববিস্মরীগন্ধা এক মধুর নিদ্রা এসে তাঁর চোখের সব আলো মুছে দিয়ে আচ্ছন্ন করে ফেলবে তাঁর ইন্দ্রিয়চেতনাকে।
তাঁর নিজস্ব কক্ষে চলে গেলেন দেবী হেরা। এই ঘরখানি দেবশিল্পী তাঁর পুত্র হিফাস্টাস তার জন্য নির্মাণ করে দিয়েছেন। এমন এক রহস্যময় গুপ্ত তালা চাবির দ্বারা এ কক্ষের দরজাগুলো বন্ধ থাকে যা কেউ খুলতে পারে না। সেই কক্ষের ভিতরে প্রবেশ করে দরজাটি বন্ধ করে দিলেন হেরা। তারপর পবিত্র নির্মল জল দিয়ে দেহগাত্র হতে সব ময়লা তুলে নিয়ে তাতে সুগন্ধি অলিভ তেল মর্দন করতে লাগলেন। তেলের সৌরভে আমোদিত হয়ে উঠল স্বর্গ ও মর্তের বাতাস। এইভাবে রঙ্গরাগ করে তাঁর সুন্দর অলৌকিক হাত দিয়ে কেশবিন্যাস করতে লাগলেন। এথেন তাঁর সুচীশিল্প প্রতিভার দ্বারা অসংখ্য কারুকার্যে খচিত করে যে বস্ত্রখানি তার জন্য বয়ন করেছিলেন, সেই বস্ত্র পরিধান করে কনককাঞ্চীদামে আবদ্ধ করলেন তাঁর স্তনযুগলসমৃদ্ধ বক্ষদেশ। কটিদেশে ধারণ করলেন শত মুক্তাসমন্বিত এক স্বর্ণমেখলা। তারপর কর্ণে স্বর্ণকুণ্ডল পরিধান করে একটি সূক্ষ্ম রেশমি বস্ত্রের অবগুণ্ঠনজাল স্থাপন করলেন মাথার উপর। স্বর্ণ পাদুকায় পাদুটি শোভিত করে ও সর্বতোভাবে সজ্জিত হয়ে তাঁর পাশে অ্যাফ্রোদিতেকে ডেকে বললেন, বৎসে, তুমি কি আমার একটি কথাও শুনবে না? আমি গ্রীকদের পক্ষে আর তুমি ট্রয়পক্ষ অবলম্বন করার জন্য আর সব কথা প্রত্যাখ্যান করবে?
অ্যাফ্রোদিতে উত্তর করলেন, হে দেবসম্রাজ্ঞী, বল কি চাও তুমি, তা যদি একান্তই কথা সম্ভবপর হয় তাহলে এই মুহূর্তে আমি তা করব।
দেবী হেরা তখন তাঁকে এক মিথ্যা কথা বললেন। তিনি বললেন, তুমি আমাকে এমন এক মোহপ্রসারিণী সৌন্দর্যে ভূষিত করে দাও দেখার সঙ্গে সঙ্গে যেকোন দেবতা বা মানবসন্তান আমার পদতলে পতিত হয়। আমি বিশ্বের শেষ প্রান্তে সমস্ত দেবতাদের আদিপুরুষ ওসিয়ানাস ও দেবমাতা থেটিসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছি। একবার জিয়াস যখন তার পিতা ক্রোনাসের সঙ্গে আমাকে রীয়ার অন্ধকার পাতালগর্ভে বন্দী করে রেখেছিলেন তখন ওসিয়ানাস আমাকে সেখান থেকে মুক্ত করে তাদের বাসভবনে গিয়ে গিয়ে অনেকদিন ঘরে লালন পালন করেন। তাঁদের দুজনের মধ্যে এখন কলহ চলছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে এক শয্যায় শয়ন করছেন না পরস্পরের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে। যদি আমি সেখানে গিয়ে তাঁদের সব বিবাদ মিটিয়ে আবার পরস্পরের আলিঙ্গনে আবদ্ধ করতে পারি দুজনকে তাহলে তারা আমাকে চিরকাল স্নেহ ও প্রীতির চোখে দেখবেন।
একথা শুনে হাস্যপ্রিয়া অ্যাফ্রোদিতে বললেন, হে দেবী, তুমি হচ্ছ জিয়াসদেবতা তার অঙ্কশায়িনী। আমি তোমার আদেশ প্রত্যাখ্যান করতে পারি না কখনই।
এই কথা বলে তাঁর বক্ষস্থল হতে আশ্চর্যভাবে খচিত তাঁর কনককাঞ্চীটি খুলে তা হেরাকে দিলেন। সে কাঞ্চীদামে নিহিত ছিল প্রেম, কামনা, বাসনা ও তোষামোদ, যা মুহূর্তে বিজ্ঞের বিচারবুদ্ধিও হরণ করে নেয়। তিনি তা হেরাকে দিয়ে বললেন, আমার এই কাঞ্চীদামের মধ্যে সব মোহ নিহিত আছে। তোমার বক্ষে এটি ধারণ করো। যদি তুমি এটি ধারণ করো আমি জোর করে বলতে পারি, তাহলে তোমার কোনো মনোবাসনাই অপূর্ণ রয়ে যাবে না।
হেরা তখন কাঞ্চীদামটি বক্ষে পরিধান করলেন হাসিমুখে। অ্যাফ্রোদিতে চলে গেলেন জিয়াসের বাসভবনে। আর হেরা অলিম্পাস পর্বতশিখর হতে নিম্নভিমুখে অবতরণ করতে লাগলেন। পীরিয়া ও এমাথিয়া পার হয়ে গ্রেস দেশের তুষারাচ্ছন্ন পর্বতমালার মাথার উপর দিয়ে একবারের জন্য কোথাও না দাঁড়িয়ে এগিয়ে চললেন বাতাসের মত দ্রুতগতিতে। তারপর তিনি অ্যামসে এসে সমুদ্র পেলেন। সমুদ্রের তরঙ্গমালার উপর দিয়ে অবলীলাক্রমে তিনি চলে গেলেন থোয়াসদের বাসভূমি লেমস দ্বীপে। সেখানে গিয়ে মৃত্যু ভ্রাতা নিদ্রার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার হাত ধরে বললেন, হে নিদ্রা, তুমি দেবতা ও মানব, সকলের উপরেই সমানভাবে তোমার মায়াজাল বিস্তার করো। তুমি যদি আমার একটা কাজ করে দাও তাহলে আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকব তোমার প্রতি। আমি যখন জিয়াসকে নিবিড়ভাবে আলিঙ্গন করব তখন তুমি তার সদাসতর্ক চক্ষুদুটি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন করে দেবে। আমার খঞ্জ পদবিশিষ্ট পুত্র হিফাস্টাস তোমার জন্য একটি সোনার চেয়ার আর ভোজের টেবিলে খাবার সময় পা রাখার জন্য একটি টুল তৈরি করে দেবে। সেই সোনার চেয়ার কখনো ভাঙ্গবে না জানবে।
নিদ্রা উত্তর করল, হে দেবরাজ্ঞী, আমি বিনা দ্বিধায় অন্যান্য যে কোন দেবতার চোখকে ঘুমে আচ্ছন্ন করে তুলতে পারব। এমন কি দেবতাদের আদি পিতা ওসিয়াসাসকেও ন্দ্রিাভিভূত করে তুলতে পারব। কিন্তু জিয়াস যদি আমাকে নিজে হতে
ডাকেন তাহলে তাঁর কাছে যেতে পারব না। সে সাহস আমার নেই। তুমি যা বললে এই কাজ করিতে গিয়ে একদিন সমুচিত শিক্ষা পাই আমি। সেদিন জিয়াসের অন্যতম পুত্র হেরাকলস ইলিয়ামনগরী ধ্বংস করে সেখান থেকে ফিরছিলেন। তুমি তখন তার সমুদ্রপথে হঠাৎ ঝড় তুলে সুদূর কস নগরীতে নিয়ে যাও। হেরাকলস-এর বিরুদ্ধে তোমার চক্রান্তের কথা জানতে পেরে ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে উঠে প্রচণ্ডভাবে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেন জিয়াস। তিনি তখন স্বর্গ থেকে অন্যান্য দেবতাদের রেগে ফেলে দিতে থাকেন। আমাকেও তিনি সেই সুউচ্চ স্বর্গলোক থেকে অগাধ সমুদ্রগর্ভে নিক্ষেপ করতেন আর আমার নামও চিরদিনের জন্য ডুবে যেত বিস্মৃতির অতল গর্ভে যদি না নিশাদেবী আমায় রক্ষা করতেন। জিয়াস যখন আমাকে বিশেষভাবে খুঁজছিলেন তখন আমি ভীত হয়ে নিশাদেবীর নীল বস্ত্রাঞ্চলে গিয়ে আশ্রয় নিই। আমার উপর দারুণ ক্রুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও আমার আর সন্ধান করেন নি, কারণ তিনি বুঝেছিলেন নিশাদেবী আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন। নিশাদেবীর আমোঘ বিধান সমস্ত দেবতারা ও মানবকে সমানভাবে মেনে চলতে হয় বলে তিনি নিশাদেবীর অসন্তোষভাজন হতে চান নি। সে কাজ আজ আমাকে করতে বলো না।
দেবী হেরা বললেন, নিদ্রা, কেন তুমি এই ধরনের কথা চিন্তা করছ? তুমি কি ভাব জিয়াস তাঁর নিজ পুত্রের জন্য একদিন যতখানি উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন আজ ট্রয়বাসীদের জন্যও ঠিক ততখানি উদ্বিগ্ন হবেন? শোন, তুমি যে সুন্দরী তরুণী পেসিথীয়াকে বিবাহ করতে চাও আমি তারই সঙ্গে তোমার বিবাহ দেব ।
নিদ্রা তখন সন্তুষ্ট হলো। সে তখন বলল, তাহলে হে দেবী, স্টাইক্স নদীর পবিত্র জল ছুঁয়ে উদার পৃথিবীর উপর একটি হাত আর উজ্জ্বল সমুদ্রের উপর আর একটি হাত রেখে শপথ করো, সমস্ত গুণগুলোর কনিষ্ঠা, পেসিথয়ীর সঙ্গে আমার বিবাহ দান করবে।
ঠিক সেইভাবে শপথ করলেন দেবী হেরা। তারপর সমুদ্রতলবর্তী টিটানে দেবতাদের আহ্বান করে তাদের সাক্ষী মানলেন। অতঃপর তারা দুজনেই এক ঘন কুয়াশার দ্বারা নিজেদের আচ্ছন্ন করে লেমস ও ইম্বস দ্বীপকে পিছনে ফেলে আইডার পথে এগিয়ে চললেন। লেকটাম দেশে এসে তারা সমুদ্রপথ ত্যাগ করে স্থলপথ ধরলেন। কিন্তু মাটিতে পদার্পণ না করে তাঁরা গাছের উপর দিয়ে যেতে লাগলেন আর তাঁদের পদভাবে অরণ্যের বৃক্ষগুলো কম্পিত হতে লাগল মুহুর্মুহ। এইখানে এসে নিদ্রা থামল। সে একটি লম্বা পাইনগাছে আরোহণ করল। সমস্ত আইডা পর্বতের মধ্যে সেই পাইনগাছটি ছিল সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘতায় আকাশচুম্বী। সেই পাইনগাছের শাখা প্রশাখার অন্তরালে নিজেকে লুকিয়ে রেখে মধুকণ্ঠী এক পাখির রূপ ধারণ করল নিদ্রা। সে পাখিকে দেবতারা বলতেন চ্যানমিস আর মানুষে বলত সিমিসি।
এরপর হেরা চলে গেলেন আইডা পবর্তের সর্বোচ্চ চূড়া গার্গারাসে যেখানে বসেছিলেন দেবরাজ জিয়াস। জিয়াস এমন সময় তাঁকে দেখলেন। তাঁর উপর জিয়াসের দৃষ্টি পতিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এমন এক উত্তপ্ত কামনায় চঞ্চল হয়ে উঠলেন জিয়াস যে কামনা তিনি হেয়ার সঙ্গে তাঁর পিতামাতার অগোচরে প্রথম মিলনের দিন অনুভব করেন। হেরার কাছে গিয়ে জিয়াস বললেন, কি চাও এখানে তুমি প্রিয়তমা, যার জন্য বিনা রথযোগেই এখানে চলে এসেছ?
হেরা তখন একটি মিথ্যা কথা বললেন জিয়াসকে। বললেন, আমি যাচ্ছি দেবরাজের আদি পিতা ওসিয়ানাসের আর দেবমাতা থেটিসের কাছে। তারা আমায় একদিন প্রতিপালন করেছিলেন। তারা এখন দুজনেই বিষাদগ্রস্ত। বহুদিন তারা দুজনে এক বিছানায় শয়ন করেন নি। এতদূর রেগে গেছেন তারা পরস্পরের প্রতি। আমি আজ সেখানে যাব তাঁদের সেই কলহের মীমাংসার জন্য। যে মায়াময় অশ্ব আমাকে জল স্থলের উপর দিয়ে নিয়ে যাবে বহন করে সে অশ্ব আছে আইডা পর্বতের নিম্নভাগে। তাছাড়া আমি তোমার সঙ্গে আলোচনা করতে এসেছি। তোমাকে না জানিয়ে যদি ওসিয়ানাসের বাসভবনে যাই তাহলে তুমি হয়ত পরে ক্রুদ্ধ হতে পার আমার প্রতি। এই ভয়ে আমি এসেছি তোমার কাছে।
জিয়াস বললেন, হেরা, তুমি অন্য কোন সময়ে ওডসিয়ানাসের বাড়ি যাবে। বর্তমানে এস, আমরা দুজনে এক নিবিড় প্রেমালিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে নিদ্রাসুখ উপভোগ করি। এই মুহূর্তে তোমর প্রতি আমি যে পরিমাণ প্রেমাবেগ অনুভব করছি জীবনে এর আগে কখনো কোন দেবী বা মানবীর প্রতি অনুভব করিনি। যখন আমি ইক্সিয়নের স্ত্রীকে ভালবাসি এবং তার গর্ভে পিরিবোয়ার জন্ম দিই অথবা ডেনাকে ভালবাসি এবং তার ফলে যশস্বী বীর পার্সিয়াসের জন্ম হয় তখনও তাদের প্রতি এ ধরনের প্রেমাবেগ অনুভব করি নি। তারপর ফোনিক্সকন্যাকে ভালবাসার ফলে আমার মাইনাস ও রাজাম্যাথাস নামে দুই পুত্রের জন্ম হয় আর সেমিনির গর্ভে হয় বীর ডাইওনিসাসের। তারপর রাণী সিমেনার ও লিটোকেও ভালবাসি–কিন্তু তাদের প্রতি আমি কোনদিন এতখানি মুগ্ধ হই নি।
এই উত্তরে হেরা এবারও একটি মিথ্যা কথা বললেন, তুমি কি বলছ ক্রোনাসপুত্র? যে আইডা পর্বতের শিখরদেশের সবকিছুকে দেখা যায় সেখানে তুমি আর বাহুপাশে আবদ্ধ হয়ে নিদ্রা যেতে চাও। যদি কোন দেবতা আমাদের সেইভাবে দেখে অন্য দেবতাদের বলে দেয়?তখন আমাদের নিন্দা করবে সকলে এবং তোমার বাহুপাশ হতে মুক্ত হয়ে তোমার বাসভবনে যেতে পারব না লজ্জায়। একান্তই যদি এ বাসনা জেগে থাকে তোমার মধ্যে তাহলে আমাদের পুত্র হিফাস্টাস নির্মিত সেই ঘরে চল। সেই ঘরে গিয়ে আমরা শয্যায় শুয়ে থাকব দুজনে।
জিয়াস উত্তর করলেন, দেবতা বা মানুষ আমাদের দেখে ফেলবে বলে ভয় করো না হেরা। এমন এক স্বর্ণমেঘের দ্বারা আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখব যাতে সূর্য তার উজ্জ্বলতা সত্ত্বেও ভেদ করতে পারবে না সে মেঘের আবরণ।
এই কথা বলে তার স্ত্রীকে নিবিড়ভাবে আলিঙ্গন করলেন জিয়াস।
ধারিত্রী তাঁদের জন্য রচনা করল এক শিশিরসিক্ত কুসুমশয্যা। কচি নব দুর্বাদল ও পদ্মের পাপড়িতে মেদুর যে শয্যাটি ছিল মাটি থেকে অনেক উঁচুতে। সেই শয্যাতে তাঁরা শয়ন করার সঙ্গে সঙ্গে এক ঘন স্বর্ণমেষ আচ্ছন্ন করে ফেলন তাদের।
এইভাবে পরম পিতা জিয়াস সেই সেই আইডা পর্বতোপরি এক কুসুমশয্যায় স্ত্রীকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করে অভিভুত হয়ে পড়লেন এক নিবিড় নিদ্রা ও রতি-সুখসারে। ওদিকে নিদ্রা তখন গ্রীকরণতরীগুলোতে গিয়ে পসেডনকে একথা বলে চলে গেল। ভূবেষ্টনকারী দেবতা পসেডনকে দেখে নিদ্রা বলল, পসেডন, তুমি এখন গ্রীকদের ইচ্ছামত সাহায্য করতে পার, তাদের জয়ের গৌরব দান করতে পার। কিন্তু তা শুধু ক্ষণকালের জন্য অর্থাৎ যতক্ষণ জিয়াস নিদ্রিত থাকবেন ততক্ষণ মাত্র। আমি তাকে এক মধুর সুষুপ্তি দান করেছি আর হেরা তাঁকে ভুলিয়ে তাঁর কাছে শুতে তাঁকে বাধ্য করেছে।
সেখান থেকে ফিরে ইতস্তত ঘুরে বেড়াতে লাগল নিদ্রা রণপ্রান্তরের মধ্যে। সে দেখল গ্রীকদের সাহায্য করার জন্য আগে থেকে ব্যর্থ হয়ে পড়েছে পসেডন। পসেডন তখন গ্রীকদের প্রথম সারির যোদ্ধাদের কাছে গিয়ে বলতে লাগলেন, হে গ্ৰীকগণ, বল তোমরা, আমরা কি প্রিয়ামপুত্রকে আমাদের রণতরী দখল করার গৌরবে ভূষিত করে দেব? অ্যাকেলিসকে এখনো যুদ্ধ হতে বিরত হয়ে তাঁর জাহাজের প্রায়ান্ধকার প্রকোষ্ঠে বসে থাকতে দেখে হেক্টরে এ কথা বলে আস্ফালন করছে। সুতরাং এখন আমার কথামত কাজ করো। তোমরা প্রত্যেকে সবচেয়ে বড় একটি করে ঢাল নাও, মাথায় শিরস্ত্রাণ পরো, হাতে সবচেয়ে লম্বা একটি করে বর্শা ধারণ করো। আমি তোমাদের নেতৃত্ব দান করব। তাহলে দেখবে হেক্টর আমাদের সামনে দাঁড়াতে পারবে না। কোন বীর যোদ্ধার যদি কোন ছোট ঢাল থাকে সে ঢাল সে অপেক্ষাকৃত কোন হীনবল যোদ্ধাকে দিয়ে দিক এবং নিজে একটি বড় ঢাল গ্রহণ করুক।
সকলেই পসেডনের কথামত কাজ করল। টাইডেউসপুত্র ডায়োমেডিস, ওডিসিয়াস ও অ্যাগামেমনন আহত হলেও সকলে রণসাজে সজ্জিত হতে লাগলেন। তারপর সব বীরেরা বর্ম বিনিময় করলে আপন আপন শক্তি ও যোগ্যতা অনুসারে। তারপর শুরু হলো তাদের আক্রমণাত্মক অভিযান, পসেডন রইলন তাঁদের সর্বাগ্রে। পসেডন বজ্রকঠিন নিজের হাতে ধারণ করলেন এক ভয়ঙ্কর তরবারি যার তীক্ষ্ণ মুখ বিদ্যুতের মত ঝকমক করছিল। তাকে দেখে সকলেই ভয়ে সরে যাচ্ছিল। কেউ তার পথের সামনে পড়ে গেলে আর রক্ষা থাকত না।
ওদিকে হেক্টরও ট্রয়সেনাদের সজ্জিত করে তুললেন রণসাজে। অতঃপর হেস্টর পসেডনের মধ্যে বাধল তুমুল যুদ্ধ। ট্রয়পক্ষে ছিলেন হেক্টর আর পসেডন ছিলেন গ্রীকপক্ষে। দুজন নেতার পিছনে ছিল একটি করে বিরাট সৈন্যদল। উচ্ছ্বসিত সমুদ্র তরঙ্গ, ক্রমপ্রসারণশীল লেলিহানশিখা দাবানল, অরণ্যবৃক্ষছিন্নকারী মত্ত প্রভঞ্জনের গর্জন অপেক্ষাও সম্মিলিত গ্রীক ও ট্রয়সেনাদের চিৎকার ছিল আরও ভয়ঙ্কর ও কর্ণবিদারক।
হেক্টর প্রথমে অ্যাজাক্সকে লক্ষ্য করে বর্শা ছুঁড়লেন। তাঁর দিকে মুখ করে এগিয়ে আসছিলেন অ্যাজাক্স। অ্যাজাক্সের বুকের উপর সেখানে তাঁর তরবারিটি ধরা ছিল সেখানে বর্শাটি লাগায় তাঁর বুকটাকে আঘাত করতে পারল না হেক্টরের বর্শা। তাঁর বর্শাটি তার লক্ষ্যবিদ্ধ করতে না পারায় রেগে গিয়ে তাঁর দলভুক্ত লোকদের ভিড়ের মধ্যে চলে গেলেন হেক্টর। এদিকে হেক্টর যখন ফিরে চলে যাচ্ছিলেন তখন তেলামনপুত্র অ্যাজাক্স একটি বড় পাথরখণ্ড দিয়ে আঘাত করলেন তাঁকে। গ্রীকজাহাজগুলোকে ঠেকা দেওয়ার জন্য অনেক পাথর জড়ো করা হয়েছিল উপকূলে। সেখান থেকে একটি নিয়ে হেক্টরের দিকে ছুঁড়ে দিতেই সেটি হেকটরের ঢালের উপর দিয়ে তার ঘাড়ের কাছে লাগল আর সঙ্গে সঙ্গে লাটিমের মত চারিদিকে ঘুরতে লাগলেন হেক্টর। জিয়াসের দ্বারা বিচ্ছুরিত বর্জ বা বিদ্যুতের আঘাতে কোন বিরাট ওকগাছ যেমন শিকড়সুদ্ধ উৎপাটিত হয়ে চিৎপাত হয়ে পড়ে যায়, তেমনি হেক্টরও ধুলোর উপর পড়ে গেলেন। তাঁর হাত থেকে বর্শা পড়ে গেল। তাঁর ঢাল ও শিরস্ত্রাণটি পড়ে গেল মাটিতে।
আহত ও ভূপাতিত হেক্টরের দেহটিকে টেনে নিয়ে যাবার জন্য গ্রীকসৈন্যরা যখন উল্লাস করতে করতে ছুটে আসতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে ট্রয়সেনাদের লক্ষ্য করে তীরও নিক্ষেপ করতে লাগল। কিন্তু আহত হেক্টরের উপর নতুন করে কোন আঘাত হানার আগেই পলিডেমাস, অ্যানিয়াস, অ্যাজিনর, লাইসয়া, বীর সার্পেৰ্ডন ও গ্লুকাস প্রমুখ ট্রয়সেনানায়ক এসে ঢাল দিয়ে ঢেকে দিলেন তার দেহটিকে। অতঃপর আহত হেক্টরকে যুদ্ধক্ষেত্র হতে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে একটি অপেক্ষমান রথের উপর চাপিয়ে দেওয়া হলো, রথ গিয়ে জ্যানথাস নদীর ধারে থামল। যন্ত্রণার তীব্রতায় চেতনা হারিয়ে ফেলেছিলেন হেক্টর। হেক্টরকে রথ হতে নামিয়ে নদীর ধারে মাটির উপর শুইয়ে জিয়াসপুত্র জ্যানথাস নদীর পবিত্র জল তাঁর উপর ঢালতেই চোখ মেলে তাকিয়ে নিশ্বাস নিতে লাগলেন। একবার উঠে নতজানু হয়ে বসে কিছু রক্তবমি করলেন হেক্টর। তারপর আবার পড়ে গেলেন। চোখের পাতা আবার মুদ্রিত হয়ে গেল তার। আঘাতজনিত ব্যথার তীব্রতায় তখনো অভিভূত হয়ে ছিলেন হেক্টর। চোখে তখনো অন্ধকার দেখছিলেন।
গ্রীকসেনারা যখন দেখল হেক্টরকে যুদ্ধক্ষেত্র হতে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তখন তারা প্রচণ্ডভাবে আক্রমণ করলে ট্রয়সেনাদের। অয়লিয়াসপুত্র দ্রুতগামী অ্যাজাক্স একটি বর্শা দিয়ে এনপসপুত্র স্যানিয়াসকে আঘাত করলেন। একবার স্যানিওই নদীর ধারে যখন যৌবনে মেষ চরাচ্ছিলেন তখন সেই নদী হতে হঠাৎ উঠে আসা এক সুন্দরী জলপরীর সঙ্গে তাঁর সঙ্গম হয় আর তার ফলে জন্ম হয় স্যানিয়াসের। অয়লিয়াসপুত্রের অব্যর্থ বর্শার আঘাতেই সেই স্যানিয়াস মৃত্যুমুখে পতিত হলো আর তার দেহটিকে নিয়ে দুই পক্ষে বাধল তুমুল যুদ্ধ।
এই মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবার জন্য পলিমেডাস ছুটে এসে অ্যারেইলাইকাসের পুত্র প্রোথেইনারের ডান কাঁধে তার বর্শাটি গেঁথে দিলেন। তীক্ষ্ণ ফলকটি কাঁধের মধ্যে ঢুকে গেলে মাটিতে পড়ে গেল পোথোইনর। আর সঙ্গে সঙ্গে তখন আস্ফালন করে বলতে লাগলেন পলিমেডাস, তাহলে এবারও ব্যর্থ হয় আমার বর্শা। একজন গ্রীক সে বর্শা ধারণ করেছে তার দেগে আর সেই বর্শাদণ্ডকে অবলম্বন করেই সে গিয়ে হাজির হবে মৃত্যুপুরীতে।
আস্ফালন শুনে ক্রোধে অন্ধ ও উন্মত্ত হয়ে উঠল গ্রীকসেনারা। বিশেষ করে সবচেয়ে বেশি ক্রুদ্ধ হলেন তেলামন পুত্র অ্যাজাক্স, কারণ তাঁর পাশেই প্রোথোইনারের মৃত্যু ঘটে। তাই তিনি তৎক্ষণাৎ পলিডেমাসকে লক্ষ্য করে তার বর্শা নিক্ষেপ করলেন। কিন্তু পলিডেমাস একটু সরে গিয়ে নিজেকে বাঁচালেন আর সে বর্শা গিয়ে লাগল অ্যান্টিলোকাসের ঘাড়ে। মেরুদণ্ডটি যেখানে ঘাড়ের কাছে শেষ হয়েছে সেইখানে বর্শাটি গেঁথে যেতেই পড়ে গেল অ্যান্টিলোকাস। আর এই শোচনীয় শেষ পরিণতি ছিল বিধিনির্দিষ্ট। হেলামনপুত্র অ্যাজাক্স তখন চিৎকার করে পলিডেমাসকে বললেন, এবার বলত পলিডেমাস, আমাদের প্রোথোইনরের মত তোমাদের এই লোকটি হত্যার যোগ্য কিনা। লোকটিকে দেখে ধনী মনে হয়। মনে হয় সে নাইট অ্যান্টিনরের ভ্রাতা কিম্বা পুত্র, কারণ অ্যান্টিনরের সঙ্গে তার চেহারার সাদৃশ্য রয়েছে।
আসলে কিন্তু অ্যাজাক্স আন্টিলোকাসের পরিচয় জানতেন। তবু তিনি বিদ্রূপ করছিলেন। এই বিদ্রূপবাক্য শুনে মর্মাহত হলো ট্রয়সেনারা। অ্যান্টিলোকাসের ভ্রাতা অ্যাকামাস এগিয়ে এসে যখন দেখল তার ভ্রাতার মৃতদেহটি গ্রীকবীর প্রোমাকাস টেনে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে তখন তাঁর বর্শা দিয়ে আঘাত করে হত্যা করল পোমাকাসকে। তারপর গর্বের সঙ্গে জোর গলায় বলতে লাগল, সে অহঙ্কারী গ্রীক তীরন্দাজবৃন্দ, মনে ভেবো না একা আমরাই সব দুঃখকষ্ট, মৃত্যুশোক ভোগ করব। এই দেখ, আমার বর্শার দ্বারা পরাভূত খোমাকাস কেমন চিরনিদ্রায় অভিভূত হয়ে পড়েছে। আমার ভ্রাতা যে রক্তপাত করেছে তার ঋণ পরিশোধ করতে বেশি বিলম্ব হয়নি তোমাদের। যে ব্যক্তির হত্যার প্রতিশোধ নেবার জন্য উপযুক্ত আত্মীয় পরিজন থাকে সে ব্যক্তি সত্যিই ভাগ্যবান।
এই আস্ফালনে ভীষণভাবে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল গ্রীকরা। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রেগে গেল পেলেনিয়স। পেলেনিয়স সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণ করল অ্যাকামাসকে। কিন্তু অ্যাকামাস সেখানে ছিল না। সে তখন ধনী মেষপালক ফোর্বাসপুত্র ইলিওনেউসকে হত্যা করার জন্য ব্যস্ত ছিল। হার্মিসের দয়ায় প্রচুর ধনসম্পদের অধিকারী হন ফোর্বাস। ইলিওনেউস ছিল তার একমাত্র পুত্র। পেলিনিয়সের বর্শাফলকটি ইলিওনেউসের একটি চোখকে এমনভাবে বিদ্ধ করল যে তা চোখের তারকাটি উপড়ে নিয়ে ঘাড় ভেদ করে বেরিয়ে এল। ইলিওনেউস তখন মুখ থুবড়ে দুহাত বাড়িয়ে মাটিতে পড়ে যেতেই একটি তরবারি দিয়ে তার মাথাটি কেটে ফেলল পেলেনিয়াস। ইলিওনেউসের কাটা মুণ্ডটি হাতে করে নিয়ে ট্রয়বাসীদের দেখিয়ে গর্বের সঙ্গে বলতে লাগল পেলেনিয়াস, শোন ট্রয়বাসীরা, এর পিতা মাতাকে তাদের পুত্রের জন্য শোকে আর্তনাদ করতে বলগে। কারণ আমরা যখন দেশে ফিরে যাব তখন অ্যালিনিয়রপুত্র মোকাসের স্ত্রীও তার স্বামীকে ফিরে পাবার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়ে শোকে বিলাপ করবে।
পেলেনিয়সের একথা শুনে ভীতগ্রস্ত হয়ে পড়ল ট্রয়সেনরা। তারা সবাই তখন আপন আপন পালাবার পথ খুঁজতে লাগল ব্যস্তভাবে।
হে অলিম্পাসবাসিনী কাব্যকলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী, বল আমায় ভূকম্পন দেবতা যুদ্ধের গতিবেগ অন্যদিকে ফিরিয়ে দেবার পর থেকে গ্রীকদের পক্ষে নিহত সেনাদের কে বা কারা প্রথমে সরিয়ে নিয়ে যায় যুদ্ধক্ষেত্র হতে। তাদের দলভুক্ত মৃতদেহগুলো নিয়ে যাবার জন্য প্রথমে তেলামনপুত্র অ্যাজাক্স আহত করেন লাইসিয়াপতি গার্নিয়াসপুত্র হার্নিয়াসকে। অ্যান্টিলোকাস নিহত করেন ফ্যালসেস ও মার্মেসিতে আর মেরিওন হত্যা করে মরিস ও হিপ্লোশনকে। আত্রেউসপুত্র এক আঘাতে হাইপিরেনের পেটের নাড়ীভুড়ি ছিঁড়ে বেরিয়ে এল এবং ঘটনাস্থলেই তৎক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করল সে। সবচেয়ে বেশি লোক হত্যা করলেন অয়লিয়াসপুত্র অ্যাজাক্স, কারণ তিনি ছিলেন সবার চেয়ে দ্রুতগতি এবং তার ফলে জিয়াসকর্তৃক সৃষ্ট সন্ত্রাসে অভিগ্রস্ত পলায়নরত শত্রুসৈন্যদের সে সহজেই ধরে ফেলতে পারত।