ট্রয়বাসীদের পুনরায় বিজয়গৌরব

এইভাবে ছুটে পালাবার কালে অনেক ট্রয়বাসী প্রাণ হারাল গ্রীকদের হাতে। আর যারা পরিখা পার হয়ে প্রাণ নিয়ে কোনরকমে পালাতে পারল তারা তাদের রথের কাছে গিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। ভয়ে মলিন হয়ে পড়েছিল তারা সকলে। ওদিকে আইডা পর্বতের উপরে যে কুসুমশয্যায় হেরার পাশে শুয়েছিলেন জিয়াস, হঠাৎ সেখানে ঘুম থেকে জেগে উঠে বসলেন। উঠে দাঁড়িয়ে যুদ্ধরত গ্রীক ও ট্রয়সৈন্যদের পানে তাকিয়ে দেখলেন। দেখলেন, পসেডনের সক্রিয় সহায়তায় ভীত সন্ত্রস্ত ট্রয়সৈন্যদের ক্রমাগত তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে গ্রীকসৈন্যরা। দেখলেন, হেক্টর তাঁর সহকর্মীদের দ্বারা পরিবৃত্ত হয়ে মাটির উপর শুয়ে হাঁপাচ্ছেন। যিনি তাঁকে আঘাত করেন যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি কম শক্তিশালী নন।
পরম পিতা জিয়াস করুণা অনুভব করলেন ট্রয়বাসীদের প্রতি। প্রচণ্ড ক্রোধে ফেটে পড়ে তিনি দেবী হেরাকে বললেন, হেরা, আমি বুঝতে পারছি তোমার সুচতুর চক্রান্তের ফলেই হেক্টর আজ যুদ্ধে অসমর্থ আর তার সৈন্যরা ভীত সন্ত্রস্ত ও ছিন্নভিন্ন। আমার একবার মনে হচ্ছে তোমাকে ঠেলে ফেলে দিই, তার ফলে প্রথমেই তুমি তোমার কৃতকর্মের ফল পাবে। তোমার কি মনে নেই একবার তুমি কেমন শূন্যে ঝুলেছিলে? আমি তোমার পায়ে দুটো বেড়ি লাগিয়ে হাত দুটো সোনার শিকল দিয়ে এমনভাবে বেঁধে দিয়েছিলাম যাতে কেউ ছিঁড়তে না পারে সে বাঁধন। ফলে তুমি মেঘের নিচে শূন্য আকাশে ঝুলতে থাকলে। অলিম্পাসের সব দেবতারাই রেগে গিয়েছিল আমার উপরে। কিন্তু তারা কেউ তোমায় মুক্ত করার জন্য যেতে পারে নি তোমার কাছে। কারণ যে কেউ এ চেষ্টা করলেই আমি তাকে ধরে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে এত জোরে ফেলে দিয়েছি যে সে মূৰ্ছিত হয়ে পড়ে গেছে পৃথিবীর মাটিতে। কিন্তু এতকিছু করেও হেরাকলস-এর কথা ভেবে শান্ত হয় নি আমার অশান্ত মন। কারণ তুমি ও বোরিয়াসন দুজনে মিলে তাকে সমুদ্রে ঝড় তুলে পথ ভুল করিয়ে নিয়ে যাও সুদূর কস দ্বীপে। অথবা প্রচুর কষ্ট করে পরে তাকে আমি আর্গসে ফিরিয়ে আনি। আমি তোমাকে এই জন্যই একথা মনে করিয়ে দিচ্ছি যে তুমি আর এ ধরনের ছলনা বা প্রতারণার কাজ করবে না। আর বুঝতে পারবে আমার সঙ্গে ছলনা করে যে সব প্রেমালিঙ্গনের দ্বারা প্রীত করতে এসেছিলে তার থেকে কোন ফলই পাবে না।
জিয়াসের কথা শুনে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে হেরা বললেন, উপরে স্বর্গ আর নিচে মর্ত্যভূমি সাক্ষী থাক, আমি পবিত্র টাইফস নদীর জল ছুঁয়ে অলৌকিক মস্তক ও আমাদের দাম্পত্য শয্যার নামে পশথ করে বলছি পসেডন আমার কথায় হেক্টর ও ট্রয়বাসীদের এ ক্ষতি করে নি অথবা গ্রীকদের সাহায্য করে নি। সে যাকিছু করেছে। নিজের খেয়াল খুশি মতই করেছে, আসল কথা সে দূর স্বর্গ হতে গ্রীকরণতরীগুলোর মাঝে গ্রীকরা নিগৃহীত হয়েছে তা দেখে সে দুঃখিত হয়েই এ কাজ করে। সে যদি আমার পরামর্শ চাইত এ বিষয়ে তাহলে আমি আপনার কথামত কাজ করতে বলতাম তাকে।
মৃদু হেসে উত্তর করলেন দেবরাজ জিয়াস, শোন হেরা, যদি তুমি স্বর্গের দেবসভায় সব সময় আমাকে সমর্থন করতে তাহলে পসেডন তার ইচ্ছা না থাকলেও আমার বা তোমার মত ও পথের বাইরে যেতে পারত না। তুমি যা বললে তা যদি সত্যি সত্যিই তোমার মনের কথা হয় তাহলে এখনি তুমি চলে যাও দেবতাদের মাঝে। আমি যা বলি তা আইরিস ও অ্যালোলোকে গিয়ে বল। আইরিস গ্রীকদের মাঝে গিয়ে পসেডনকে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করতে বলবে আমার নাম করে আর অ্যাপোলোকে বলবে সে যেন হেক্টরের মাঝে নতুনভাবে শক্তি সঞ্চার করে তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠায়। হেক্টর যেন তার বর্তমানের আঘাতের কথা ভুলে গিয়ে গ্রীকদের বিতাড়িত করতে করতে তাদের জাহাজের মধ্যে নিয়ে যায় ।গ্রীকরা যখন অনন্যোপায় হয়ে পেলেউসপুত্র অ্যাকেলিসের জাহাজে গিয়ে তাকে শরণ নেবে। অ্যাকেলিস তখন তার সহকর্মী প্যাট্রোক্লাসকে পাঠাবে যুদ্ধে এবং হেক্টর তখন অন্যান্য বহু শত্রুসৈন্যকে নিহত করার পর প্যাট্রোক্লাসকে হত্যা করবে। এই নিহতদের মধ্যে আমার অন্যতম পুত্র সার্পেডনও থাকবে। অ্যাকেলিস তখন প্যাট্রোক্লাসের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবার জন্য হেক্টরকে বধ করবে আর তারপর থেকেই আমি যুদ্ধের গতি ঘুরিয়ে দেব যার ফলে গ্রীকরা ক্রমাগত ট্রয়বাসীদের বিতাড়িত করতে করতে তাদের নগর জয় করবে এবং এথেনের নির্দেশমত কাজ করবে। কিন্তু যেদিন থেটিস আমার জানু স্পর্শ করে আমার কাছে আবেদন করে আর তার সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে পেলেউসপুত্রের বাসনার পূরণের যে প্রতিশ্রুতি দান করি আমার ঘাড় নেড়ে সে প্রতিশ্রুতি কার্যকরী না হওয়া পর্যন্ত আমি আমার এই ক্রোধ প্রশমিত করব না অথবা কোন দেবতাকেও গ্রীকদের সাহায্য করতে দেব না।
জিয়াসের কথামত আইডা পর্বতের শিখরদেশ হতে সোজা অলিম্পাসে চলে গেলেন হেরা। কল্পনার পাখা মেলে যাওয়া দ্রুতগতি চিন্তার মত পাখা মেলে অলিম্পাসের পথে উড়ে যেতে লাগলেন হেরা। গিয়ে দেখলেন, সেখানে জিয়াসের বাসভবনে আগে থেকেই সমবেত হলেন দেবতারা। তাঁকে দেখতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেবতারা তাঁর কাছে এসে তাঁদের হস্তধৃত পানপাত্রগুলো বাড়িয়ে দিয়ে অভ্যর্থনা জানালেন তাঁকে। তিনি আর কারো কাছে থেকে না নিয়ে শুধু সুন্দরী থেমিসের পানপাত্রটি গ্রহণ করলেন। থেমিস তাঁর কাছে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন তুমি এখানে এসেছ হেরা? তোমাকে দেখে চিন্তান্বিত মনে হচ্ছে, তোমার স্বামী ক্রোনাপুত্র কি তোমাকে ভয় দেখিয়েছেন?
হেরা উত্তর করলেন সে কথা আমায় জিজ্ঞাসা করো না থেমিস। তুমি জান আমার স্বামী কতখানি অহঙ্কারী এবং নিষ্ঠুর প্রকৃতির? এখন দেবতাদের ভোজসভায় সমবেত হতে বল সেখানে তারা জিয়াসের কুমতলবের কথা শুনে সকলেই ক্রুদ্ধ হবেন।
এই কথা বলে বসে পড়লেন হেরা। জিয়াসের বাসভবনে সমবেত দেবতারা চিন্তান্বিত হয়ে পড়লেন। তাঁর ওষ্ঠাধারে কিছু হাসি লেগে থাকলেও তাঁর ভ্রুকুটিতে ছিল ক্রোধ। তিনি ক্রোধের সঙ্গেই বললেন, আমরা নির্বোধ বলেই জিয়াসের প্রতি ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠছি। কারণ তাঁর কাছে গিয়ে জোর করে অথবা অনুরোধ উপরোধের দ্বারা তাঁকে প্রতিনিবৃত্ত করার কোন ক্ষমতা আমাদের নেই। তিনি একা উদাসীনভাবে বসে আছেন, তিনি কাউকে গ্রাহ্য করেন না। কারণ তিনি জানেন যে কোন দেবতার থেকে। অধিকতর শক্তিমান। সুতরাং যাকে যা দুঃখ তিনি দেন তা নীরবে সহ্য করার জন্য প্রস্তুত থাক। এই ধরনের দুঃখের আস্বাদ অ্যারেস আগেই পেয়েছে, কারণ তার পুত্র যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ ত্যাগ করেছে। সমস্ত মানুষের মধ্যে তার এই পুত্রসন্তানকে ভালবাসত অ্যারেস।
একথা শুনে তার উরু দুটি ডান হাতের তালু দিয়ে চাপড়ে ক্রোধের সঙ্গে বললেন, অ্যারেস, যদি আমি আমার পুত্রের প্রতিশোধ নেবার জন্য গ্রীকদের জাহাজে গিয়ে হত্যার তাণ্ডব শুরু করি তাহলে তোমরা দেবতারা আমাদের যেন দোষ দিও না। তাতে যদি আমাকে জিয়াসপ্রেরিত বিদ্যুতের প্রহারে জর্জরিত হয়ে মৃতদেহগুলোর মাঝে ধুলিপরে রক্তাপুত দেহে শুয়ে থাকতে হয় তাও ভাল।
এই বলে তাঁর রথে অশ্ব সংযোজিত করার জন্য আদেশ দিলেন অ্যারেস। তারপর নিজে বর্ম পরিধান করলেন। অ্যারেস যদি এইভাবে যুদ্ধে গিয়ে যোগদান করতেন তাহলে দেবতাদের বিরুদ্ধে এক অনমনীয় শত্রুতায় মেতে উঠতেন ক্রুদ্ধ জিয়াস। কিন্তু এথেন দেবতাদের নিরাপত্তা সম্পর্কে আশঙ্কিত হয়ে তাঁর আসন ছেড়ে উঠে এলেন। তিনি এসে অ্যারেসের মস্তক হতে শিরস্ত্রাণ, স্কন্ধ হতে ঢাল এবং হাত হতে বর্শাটি কেড়ে নিলেন। সেগুলো অন্যত্র সরিয়ে রেখে বললেন, তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? তোমার কান আছে শুনে যাও। তুমি কি বিচারবুদ্ধি ও বোধশক্তি সব হারিয়েছ? জিয়াসের কাছ থেকে হেরা এসে যা বলেছে তা কি তুমি শোন নি? তুমি কি প্রচুর দুঃখ কষ্ট ভোগ করে দেহে মনে আঘাত নিয়ে অলিম্পাসে ফিরে আসার জন্যই যুদ্ধে যেতে চাও এবং তার দ্বারা অন্যান্য দেবতাদেরও অপরিসীম ক্ষতি সাধন করতে চাও? জিয়াস তাহলে যুদ্ধের গতি প্রকৃতি গ্রীক ও ট্রয়বাসীদের উপর ছেড়ে দিয়ে আমাদের শাস্তি দেবার জন্য আইডা থেকে চলে আসবেন অলিম্পাস। কে দোষী কে নির্দোষ তা বিচার না করেই তিনি আমাদের প্রত্যেককেই একে একে ধরে নিয়ে যাবেন। সুতরাং তোমার পুত্রের মৃত্যুজনিত ক্রোধ মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দূরে ঠেলে দাও। মনে রেখো, তার থেকে ভাল লোক অনেক যুদ্ধে মরেছে ও মরবে। আর কোন ব্যক্তি কখনো তার পরিবারের সব লোকের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারে না।
এই সব কথা বলে এথেন অ্যারেসকে তার আসনে বসালেন। ইতিমধ্যে হেরা অ্যাপোলো ও দেবদূত আইরিসকে ডাকলেন। তিনি তাদের বললেন, জিয়াস তোমাদের এখনি আইডা পর্বতে যেতে বলেছেন। তিনি তোমাদের যা আদেশ করবেন তাই করতে হবে তোমাদের।
এবার হেরা তাঁর নিজের আসনে গিয়ে বসলেন। আইরিস ও অ্যাপোলো দ্রুত চলে গেলেন আইডা পর্বতের পথে। বন্য জীবজন্তুর জন্মস্থল বহু প্রস্রবণসমন্বিত আইডা পর্বতে গিয়ে তারা দেখলেন, সে পর্বতের সার্গারাস নামে সর্বোচ্চ চূড়ার উপর বসে আছেন জিয়াস এবং এক সুবাসিত স্বর্ণমেঘ ঘিরে আছে তার মণিমুক্তখচিত মস্তকটিতে। তারা তাঁর সামনে গিয়ে উপস্থিত হতেই তাদের দেখে খুশি হলেন তিনি, কারণ তাঁরা তাঁর স্ত্রীর মুখে তাঁর আদেশের কথা শুনেই তৎক্ষণাৎ চলে এসেছেন।
জিয়াস প্রথমে আইরিসকে বললেন, দ্রুতগতি আইরিস, তুমি এই মুহূর্তে পসেডনের কাছে গিয়ে আমি যা বলছি তাকে তা বলবে। বলবে সে যেন যুদ্ধ ত্যাগ করে দেবরাজের কাছে চলে আসে অথবা সমুদ্রের তলদেশে চলে যায়। যদি সে আমার আদেশ অমান্য করে তাহলে তাকে ভেবে দেখতে বলবে ভাল করে, আমার বিরুদ্ধে দাঁড়াবার মত শক্তি তার আছে কিনা। আমি তার থেকে বয়সে ও শক্তিতে অনেক বড়, তথাপি সে আমার সমকক্ষ হিসেবে নিজেকে জ্ঞান করার স্পর্ধা করছে। অথচ অন্যান্য সব দেবতারা আমার সামনে ভয়ে কাঁপতে থাকে।
মেঘ হতে ঝরেপড়া তুষারকণার মত বোরিয়াস প্রেরিত ঝঞ্ঝাবায়ুর মত দ্রুত বেগে উড়ে চললেন আইরিস। অবশেষে তিনি উপস্থিত হলেন ভূকম্পনদেবতা পসেডনের নিকটে। তারপর তাঁকে বললেন, যিনি একটি আলিঙ্গনে সমগ্র পৃথিবীকে বেষ্টন করে থাকেন সেই কৃষ্ণকেশবিশিষ্ট দেবতা পসেডন আমার কথা শুনুন, আমি দেবরাজ জিয়াসের নিকট হতে এক বাণী এনেছি আপনার জন্য। তিনি আদেশ দিয়েছেন আপনি যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে হয় দেবতাদের সঙ্গে মিলিত হবেন অলিম্পাসে অথবা সমুদ্রের তলদেশে চলে যাবেন। যদি আপনি তার কথায় কর্ণপাত না করেন এবং তাঁর আদেশ অমান্য করেন তাহলে তিনি নিজে এখানে নেমে এসে আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করবেন। তিনি আপনাকে বহু দূরে তাড়িয়ে দেবেন, কারণ তিনি আপনার থেকে বয়সে ও শক্তিতে বড়। আপনি তাকে ভয় না করে তাঁর সমকক্ষ হবার স্পর্ধা রাখেন, অথচ অনান্য দেবতারা তাঁর সামনে ভয়ে কাঁপতে থাকে।
আইরিসের মুখে জিয়াসের আদেশবাক্য শুনে পসেডন ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, জিয়াস শক্তিমান হতে পারেন কিন্তু তিনি যদি আমার ক্ষতিসাধন করার ভয় দেখিয়ে থাকেন তাহলে তিনি যা প্রকৃতপক্ষে করতে পারেন তার থেকে অনেক বেশি আস্ফালন করেছেন। সম্মানের দিক হতে আমিও তার সমান। আমাদের মাতা রীয়ার গর্ভে ক্রোনাসের ঔরসে আমরা তিন ভাই জন্মগ্রহণ করি–জিয়াস, আমি আর মৃত্যুর দেবতা হেডস। স্বর্গ ও মর্ত্যলোককে সমান তিনি ভাগে ভাগ করে আমাদের তিনজনকে সমানভাবে তিন অংশ দান করা হয়েছিল। আমরা তখন আমাদের ভাগ্য পরীক্ষা করি আপন আপন অংশ প্রাপ্তি সম্বন্ধে। আমার ভাগ্যে নির্ণীত হয়, সমুদ্রই হবে আমার আবাসস্থল। আমি হব ভূবেষ্টনকারী সপ্ত সমুদ্রের অধিপতি। হেডস-এর ভাগ্যে পড়ে অন্ধকার পাতালপুরী। আর জিয়াস তার ভাগ্যগুণে পান আকাশ, আলো আর বাতাস। কিন্তু অলিম্পাস ও এই পৃথিবীর সাধারণের যৌথ সম্পত্তি হিসেবে রয়ে যায়–সুতরাং আমি জিয়াসের কথা মানব না। তাঁর যতই শক্তি থাক তিনি যেন নিজের অংশ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেন, তিনি যেন আমাকে ছোট ভেবে আমার উপর হস্তক্ষেপ করতে না আসেন। তিনি যেন তার এই সব বড় বড় আস্ফালনের কথা তার পুত্রকন্যাদের শোনান। তারা তাঁর কথা ভয়ে মান্য করে চলবে।
আইরিস তখন উত্তর করলেন, হে পসেডন, আমি কি সত্যিই আপনার এই স্পর্ধিত ও দুর্বিনীত বাণী জিয়াসের কাছে বহন করে নিয়ে যাব না কি আপনার কথাটা একটু ভেবে দেখবেন পুনরায়? জ্ঞানবান ব্যক্তির যুক্তি অনুসারে কাজ করেন আর আপনি জানেন ইউরিনায়েস সব সময় বয়োপ্রবীণদের পক্ষ অবলম্বন করে চলেন।
পসেডন উত্তর করলেন, হে দেবী আইরিস, তুমি যথার্থই বলেছ। কোন দূত যদি এই ধরনের বিচক্ষণতা দেখাতে পারে তাহলে সত্যিই সেটা মঙ্গলজনক হয় সবার পক্ষে। তবু জেনে রেখো, যখন ভাবি তাঁর মত আমি সমপরিমাণ সাম্রাজ্য ও সম্মানের অধিকারী হলেও জিয়াস আমাকে এইভাবে তীব্র ভর্ৎসনার দ্বারা আমাকে অপমানিত করেছেন তখন দুঃখ হয় ও বেদনায় ক্ষতবিক্ষত হয় আমার চিত্ত। যাই হোক, আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও বর্তমানে আমি অবশ্য তাঁর কথা মানব। তবে তোমাকে বলে দিচ্ছি, যদি হেরা, এথেন, হিপাস্টাস ও আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জিয়াস ইলিয়াম নগরীকে অক্ষত রেখে দেন এবং গ্রীকরা সে নগরী ধ্বংস না করেই চলে যেতে বাধ্য হয় তাহলে তাঁকে বুঝিয়ে দেব তিনি আমাদের সকলের অপরিসীম ক্রোধের কারণ হবেন।
যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে সমুদ্রের তলদেশে চলে গেলেন পসেডন। তাঁকে তাদের মাঝে না পেয়ে বিপন্ন মনে করল গ্রীকরা। ওদিকে জিয়াস অ্যাপোলোকে ডেকে বললেন, এবার হেক্টরের কাছে যাও ফীবাস, কারণ এখন ভূবেষ্টনকারী দেবতা পসেডন আমার ক্রোধ ও অসন্তোষ পরিহার করার জন্য সমুদ্রগর্ভে চলে গেছে। সে যদি এভাবে চলে না যেত তাহলে অন্যান্য দেবতারা আমাদের দুজনের অনেক রণহুঙ্কার শুনতে পেত। সে তার ক্রোধ দমন করে চলে যাওয়াতে ভালই হয়েছে, কারণ তাকে দমন করতে আমাকে সত্যিই বেশ বেগ পেতে হত। এবার তুমি আমার দণ্ডটা ধরে নাড়া দাও প্রচণ্ডভাবে। তাহলে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়বে গ্রীকবীরেরা। তারপর হেক্টরকে নিজের হাতে সেবাযত্ন করে বীরত্ব প্রদর্শনের উপযুক্ত করে তুলবে তাকে। তার বীরত্ব দেখে গ্রীকরা যেন তাদের জাহাজে ও হেরেসপন্ট উপসাগরে পালিয়ে যায়। এরপর আমি ভেবে দেখব কিভাবে এই বিড়ম্বনা হতে অব্যাহতি দেওয়া যায় গ্রীকদের।
পিতার কথামত রওনা হলেন অ্যাপোলো। যেকোন পাখির থেকে দ্রুতগতিতে উড়ে চললেন তিনি আইডা পর্বত হতে রণপ্রান্তরাভিমুখে। তিনি সেখানে গিয়ে দেখলেন, হেক্টরের চেতনা ফিরেছে। তিনি উঠে বসে আছেন। হেক্টরের কাছে যারা ছিল তাদের চিনতে পারলেন অ্যাপোলো। তিনি দেখলেন, জিয়াসের শুভেচ্ছা অনুসারে হেক্টরের যে শ্বাস কষ্ট হচ্ছিল এবং যে ঘর্ম নিঃসৃত হচ্ছিল তাঁর দেহ থেকে তা আর এখন নেই। তার পাশে দাঁড়িয়ে অ্যাপোলো বললেন, হে প্রিয়ামপুত্র হেক্টর, তোমাকে এমন দুর্বল দেখাচ্ছে কেন? কেন যুদ্ধক্ষেত্র হতে এতদূরে অবস্থান করছ? কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে কি তোমার?
ক্ষীণ কণ্ঠে উত্তর করলেন হেক্টর, আপনি কি কোন দেবতা যিনি আপনাকে একথা জিজ্ঞাসা করছেন? আপনি কি জানেন না যে আমি যখন গ্রীক জাহাজে গিয়ে তাদের সহকর্মীদের হত্যা করছিলাম তখন অ্যাজাক্স আমার বুকে একটা বড় পাথর দিয়ে আঘাত করে? আমার মনে হচ্ছিল আজই আমি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে মৃত্যুপুরীতে গিয়ে হাজির হব।
অ্যাপোলো উত্তর করলেন, সাহস অবলম্বন করো, ক্রোনাসপুত্র আইডা পর্বত হতে তোমার জন্য এক সাহায্যকারী পাঠিয়ে দিয়েছেন। সুবর্ণনির্মিত তরবারিধারী যে ফীবাস অ্যাপোলো এতদিন তোমাকে ও তোমার নগরীকে রক্ষা করে আসছেন আজ তিনি তোমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। বিপুল সংখ্যক সৈন্য নিয়ে গ্রীক জাহাজের অভিমুখে এগিয়ে চল। আমি তোমার রথের আগে আগে গিয়ে তোমার পথ পরিষ্কার করে দেব। গ্রীকরা দেখবে তাহলে ভয়ে পালাতে শুরু করবে।
এই কথা বলতে বলতে হেক্টরের দেহের মধ্যে শক্তি সঞ্চার করলেন অ্যাপোলা। দীর্ঘ বিশ্রাম ও প্রভূত ভোজনের পর কোন অশ্ব যেমন আস্তাবলের বন্ধন ছিঁড়ে নতুন শক্তি বলীয়ান হয়ে স্কন্ধদেশের দুপাশে কেশর ছড়িয়ে গর্বোন্নত মস্তকে চারণক্ষেত্রাভিমুখে ছুটে চলে অবাধে, হেক্টরও তেমনি রথ প্রস্তুত করে ছুটে চললেন রণক্ষেত্রের অভিমুখে। অরণ্যের গভীরে আশ্রয়লব্ধ কোন মৃগ না বন্য ছাগলের সন্ধান করতে করতে শিকারী কুকুরসহ গ্রাম্য কৃষকরা যেমন সহসা পথিমধ্যে সিংহ দেখে বিতাড়নকার্য হতে বিরত হয়ে ভয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে তেমনি সহসা তাদের সামনে হেক্টরকে দেখে যুদ্ধরত গ্রীকরা দাঁড়িয়ে পড়ল হতোদ্যম হয়ে।
তখন গ্রীকবীরদের মধ্য হতে আন্দ্ৰীমনপুত্র থোয়াস প্রথমে কথা বললেন। থোয়াস শুধু ভাল অস্ত্রক্ষেপণকারী যোদ্ধা ছিলেন না, তিনি সুতার্কিক ও বাগ্মীও ছিলেন। তিনি নিষ্ঠা ও শুভেচ্ছাসহকারে বললেন, সত্যি, আমাদের সামনে কি দেখছি আমরা? হেক্টর কি পুনরুজজ্জীবিত হন নি? সকলেই জানত অ্যাজাক্সের আঘাতে তিনি নিহত হয়েছেন কিন্তু নিশ্চয় কোন দেবতা উদ্ধার করেছেন তাঁকে সেই নিশ্চিত মৃত্যুর কবল থেকে। তিনি অনেক গ্রীকসেনানীকে নিহত করেছেন এবং আরও করবেন। দেবরাজ জিয়াসের আশীর্বাদে তিনি ধন্য না হলেও যুদ্ধক্ষেত্রে এতখানি প্রাধান্য কখনই লাভ করতে পারতেন না। এখন আমার কথা শোন, আমি যা বলছি করো। আমাদের বেশিরভাগ সৈন্য এখন জাহাজে চলে যাক আর সৈন্যদের মধ্যে যাঁরা নিজেদের শ্রেষ্ঠ বীর হিসেবে দাবি করে তারা অটলভাবে দাঁড়িয়ে থেকে হেক্টরের কাছে এসে বর্শার দ্বারা তাকে প্রতিহত করার চেষ্টা করবে। গ্রীকবীরদের ব্যুহের মাঝে প্রবেশ করার আগে হেক্টর তাহলে ভাববে।
থোয়াসের কথামতই কাজ হলো। যারা ছিলেন অ্যাজাক্স, মাইডোমেনেউস, টিউসার, মেরিওন ও মেজিসের মত বীর তাঁরা রয়ে গেলেন হেক্টর ও ট্রয়বাসীদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য। কিন্তু বেশিরভাগ সৈন্যদল জাহাজে ফিরে গেল।
হেক্টরের নেতৃত্বে বিরাট একদল ট্রয়সৈন্য এগিয়ে যেতে লাগল গ্রীকদের দিকে। ফীবাস-অ্যাপোলো এক ঘন মেঘে নিজেকে আচ্ছন্ন করে হেক্টরের অগ্রভাবে যেতে লাগলেন। অ্যাপোলোর দেহটি মেঘের দ্বারা আবৃত থাকলেও তাঁর হাতে ছিল হিফাস্টাস-নির্মিত একটি দণ্ড যা সাধারণত মানবমনে ভীতির সঞ্চার করে থাকে। এইভাবে ট্রয়বাসীদের নেতৃত্ব দান করে এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগলেন অ্যাপোলো।
গ্রীকবীরেরাও অটলভাবে দাঁড়িয়ে রইল তাদের জায়গায়। উভয় পক্ষই ফেটে পড়ল এক কর্ণবিদারক রণহুঙ্কারে। উভয়পক্ষ হতেই তীরবৃষ্টি হতে লাগল। কত বীরের দেহ লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। যতক্ষণ অ্যাপোলো তাঁর দণ্ডটি শান্তভাবে হাতে ধরে রেখেছিলেন ততক্ষণ যুদ্ধের গতি প্রকৃতি উভয়পক্ষেই ছিল সমান। উভয়পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি ছিল সমান। কিন্তু অ্যাপোলো যখন তার দণ্ডটি প্রচণ্ডভাবে সঞ্চালন করতে লাগলেন গ্রীকদের সামনে এবং এক বিরাট রণহুঙ্কার তুলে চিৎকার করে উঠলেন, তখন গ্রীকরা তাদের পূর্বশক্তি হারিয়ে ফেলল। সহসা নিশীথ রাতে দুটি ভয়ঙ্কর বন্য জন্তু ঘুম থেকে উঠে রাখালহীন কোন পশুর পালের মধ্যে এসে পড়লে সে পশুরা যেমন অসহায় হয়ে পড়ে তেমনি অ্যাপোলো ও হেক্টরের সামনে অসহায়বোধ করতে লাগলো গ্রীকরা।
গ্রীকরা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে এবং যাকেই সামনে পেলে তাকেই হত্যা করলেন হেক্টর। তিনি প্রথমে হত্যা করলেন স্টিবিয়াস ও আসেসনসকে। প্রথমোক্ত ব্যক্তি ছিলেন বোতিয়ার দলপতি আর দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিলেন মোনসথেলাসের বন্ধু। ঈনিশ মেডন ও লেসাসকে হত্যা করলেন। মেডন ছিলেন অয়রিয়াসের অবৈধপুত্র ও অ্যাজাক্সের ভ্রাতা, কিন্তু তিনি তাঁর বিমাতার এক আত্মীয়কে হত্যা করে নিজের দেশ ত্যাগ করে ফাইলেসে বসবাস করতেন। লেসাস ছিলেন এথেন্সের এক জননেতা। তিনি ছিলেন স্কেলাসের পুত্র। পলিডেমাস মেসিটিয়াস আর পোলাইটেস অ্যাকিয়াসকে হত্যা করলেন। এজিনর হত্যা করলেন ক্লোনিয়াসকে। ধীওকাস যখন পালিয়ে যাচ্ছিল সবার আগে তখন বর্শাটি তার স্কন্ধদেশ বিদ্ধ করল।
ট্রয়বীরেরা যখন নিহত গ্রীকসেনাদের মৃতদেহ হতে বর্ম খুলে নিচ্ছিলেন, তখন গ্রীকসৈন্যরা ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় ছুটে পালাতে পালাতে তাদের প্রাচীর সীমানার মধ্যে প্রবেশ করল। হেক্টর তখন ট্রয়সেনাদের সম্বোধন করে বললেন, বর্ম খোলার কাজ চলতে থাক। এখন চল আমরা গ্রীক জাহাজে যাই। গ্রীক জাহাজে না গিয়ে কোন ট্রয়সৈন্য যদি পিছিয়ে আসে তাহলে আমি তাকে হত্যা করব। তার আত্মীয়দের কাছ থেকে কোন শ্রদ্ধা বা ভালবাসাই সে পাবে না, তার মৃতদেহটা শৃগাল কুকুরে ছিঁড়ে খাবে।
একথা বলতে বলতে তাঁর রথারে গায়ে চাবুক দ্বারা প্রহার করলেন হেক্টর। তিনি ট্রয়সেনাদের উদ্দেশ্যে এক বিরাট ধ্বনি দিতেই ট্রয়সেনারাও তার প্রত্যুত্তর দিল। ফীবাস অ্যাপোলো এগিয়ে গিয়ে গ্রীকপ্রাচীরসংলগ্ন পরিখার উপর একটি প্রশস্ত সেতু নির্মাণ করলেন। সেই সেতুর উপর দিয়ে বন্যার স্রোতের মত এগিয়ে যেতে লাগল ট্রয়সৈন্যরা এবং অ্যাপোলো তাদের আগে আগে চললেন। সমুদ্রের বেলাভূমিতে নিজের হাতেগড়া বালির ঘরগুলোকে শিশুরা খেলার পর নিজেরাই যেমন ভেঙ্গে দেয়, তেমনি অবলীলাক্রমে গ্রীকদের প্রাচীরটি ভেঙ্গে দিলেন অ্যাপোলো। এইভাবে হে অ্যাপোলো, তুমি গ্রীকদের উপর চাপিয়ে দিলে শ্রম আর দুঃখের বোঝা, শঙ্কা আর বিহ্বলতায় ভরিয়ে তুললে তাদের অন্তর।
গ্রীকসেনারা পরস্পরকে ডাকতে ডাকতে এবং দেবতাদের উদ্দেশ্যে প্রার্থনার ভঙ্গিতে হাত তুলে এগিয়ে যেতে লাগল জাহাজের দিকে। গ্রীকশক্তির স্তম্ভস্বরূপ নেস্টর নক্ষত্রখচিত আকাশের পানে হাত তুলে অন্য সকলের সঙ্গে কাতরভাবে প্রার্থনা করতে লাগলেন, তিনি বললেন, হে পরম পিতা জিয়াস মনে রেখো, শস্যসমৃদ্ধ আর্গসনিবাসী আমরা তোমাকে বহু পশুর চর্বিমিশ্রিত উরুদেশ অগ্নিদগ্ধ করে উৎসর্গ করে যখন আমরা নিরাপদে গৃহে প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রার্থনা করি তোমার কাছে, তখন তুমি আমাদের সমর্থনে ঘাড় নেড়ে সমর্থন জানাও। সেকথা স্মরণ রেখে ট্রয়বাসীদের কিছুতেই জয়লাভ করতে দিও না।
বৃন্ধ নেস্টরের প্রার্থনার উত্তরে বজ্রগর্জনে চিৎকার করে উঠলেন জিয়াস। জিয়াসের গর্জন শুনে ট্রয়বাসীরা আরও ভয়ঙ্করভাবে আক্রমল করল গ্রীকদের। ঝঞ্ঝাহত কোন অর্ণবপোতকে যেমন কোন উত্তাল সমুদ্রতরঙ্গ এসে ভেঙ্গে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়, তেমনি গ্রীকপ্রাচীরটিকে ভেঙ্গে চুরমার করে এগিয়ে যেতে লাগল ট্রয়সৈন্যরা। সেই বিচূর্ণিত প্রাচীরের উপর দিয়ে রথ চালনা করতে লাগল যখন তারা, তখন গ্রীকসেনারা জাহাজের উপর থেকে আর ট্রয়সেনারা রথের উপর থেকে যুদ্ধ করতে লাগল।
যতক্ষণ যুদ্ধ গ্রীকপ্রাচীরের বাইরে ছিল সীমাবদ্ধ অর্থাৎ ট্রয়সেনারা গ্রীকপ্রাচীরের ভিতরে ঢুকতে পারে নি বা তাদের জাহাজের কাছে যেতে পারে নি ততক্ষণ প্যাট্রোক্লাস ইউরিপাইলাসের তাঁবুতে বসে তার ক্ষতস্থানে প্রলেপ লাগিয়ে দিয়ে তার সেবা করছিল এবং বিভিন্ন আলাপ আলোচনার দ্বারা তাকে প্রীত করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু প্যাট্রোক্লাস যখন দেখল গ্রীকপ্রাচীরের যে জায়গাটি ভেঙ্গে গেছে সেই ভগ্ন প্রাচীরের উপর দিয়ে দলে দলে ট্রয়সেনারা এসে ভিতরে ঢুকে পড়ছে আর ভয়ে চিৎকার করছে সন্ত্রস্ত গ্রীকসেনারা, তখন সে বলল, ইউরিপাইলাস, আমাকে তোমার প্রয়োজন হলেও আমি আর থাকতে পারছি না। যুদ্ধ এখন ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। আমি এখন অ্যাকেলিসের কাছে গিয়ে তাঁকে প্ররোচিত করার চেষ্টা করব। তিনি যদি বন্ধুর পরামর্শ শোনেন ত ভাল।
এই কথা বলেই চলে গেল প্যাট্রোক্লাস। গ্রীকরাও দৃঢ়ভাবে প্রতিহত করার চেষ্টা করতে লাগল ট্রয়সেনাদের। ট্রয়সেনারা সংখ্যায় অল্প হলেও তাদের বিতাড়িত করতে পারল না গ্রীকরা। আবার ট্রয়সেনারাও গ্রীকদের প্রতিরোধাত্মক রূহ্য ভেদ করে তাদের শিবির বা জাহাজের মধ্যে যেতে পারল না। কোন সুদক্ষ সূত্রধর যেমন একটি সূক্ষ্ম রেখা টেনে একটি কাঠতে সমান দুই অংশে বিভক্ত করে, তেমনি জয়পরাজয়ের এক সূক্ষ্ম রেখা উভয় পক্ষের মাঝখানে এমনভাবে টানা ছিল যে কোন পক্ষই সে রেখা অতিক্রম করতে পারছিল না। কোন পক্ষই অন্য পক্ষকে পরাস্ত করতে পারছিল না।
হেক্টর সরাসরি অ্যাজাক্সকে আক্রমণ করলেন। তাঁরা দুজনেই প্রচণ্ডভাবে যুদ্ধ করতে লাগলেন। হেক্টর যেমন অ্যাজাক্সকে তাঁর জাহাজ থেকে নামিয়ে সে জাহাজে অগ্নিসংযোগ করতে পারছিলেন না, তেমনি অ্যাজাক্সও হেক্টরকে তার জাহাজ থেকে বিতাড়িত করতে পারছিলেন না।
ক্লাইটিয়াসপুত্র ক্যাতিনর যখন অগ্নিসংযোগ করার জন্য আগুন নিয়ে তাঁর জাহাজে উঠার চেষ্টা করছিল তখন অ্যাজাক্স তার বর্শার দ্বারা তার বক্ষস্থল বিদ্ধ করেন। সে তৎক্ষণাৎ মাটিতে পড়ে গেল আর তার হাত থেকে জ্বলন্ত মশালটি পড়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। হেক্টর তাঁর জ্ঞাতিভাইকে গ্রীকজাহাজের সামনে মৃত্যুবরণ করতে দেখে সকলকে সম্বোধন করে করলেন, হে ট্রয়, লাইসিয়া ও দার্দানিয়াবাসী তোমরা কোথাও যেও না, তোমরা ক্লাইটিয়াসপুত্রকে সরিয়ে নিয়ে যাও, তা না হলে গ্রীকরা তার বর্ম খুলে নেবে।
হেক্টর তখন অ্যাজাক্সকে লক্ষ্য করে একটি বর্শা নিক্ষেপ করলেন। কিন্তু তা অ্যাজাক্সের গায়ে লাগল না। সে বর্শাটি লাগল অ্যাজাক্সের এক সহকর্মী লাইকোফ্রেনের মাথায়। লাইকোনে এসেছিল সাইথেরা হতে এবং সে বরাবার অ্যাজাক্সের কাছে থাকত। তার মাথায় হেক্টরনিক্ষিপ্ত বর্শাটি লাগার সঙ্গে সঙ্গে জাহাজের উপর থেকে মাটিতে চিৎ হয়ে পড়ে গেল লাইকোফ্রেন আর সঙ্গে সঙ্গে তার প্রাণ বিয়োগ হল। অ্যাজাক্স তখন রেগে গিয়ে তাঁর ভাই টিউসারকে বললেন, হে আমার বিশ্বস্ত সহকর্মী টিউসার, যিনি সাইথেরা থেকে এসে আমাদের হিতাকাঙ্খীরূপে এতদিন ছিলেন আমাদের কাছে, যাকে আমরা পিতার মত শ্রদ্ধা করতাম তিনি আজ নিহত। হেক্টর তাঁকে এইমাত্র হত্যা করেছে। সুতরাং তীর ধনুক নিয়ে এস। অ্যাপোলোপ্রদত্ত সেই তীরের দ্বারা শত্রুকে হত্যা কর।
একথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে টিউসার তাঁর পৃষ্ঠদেশে তূণ আর হাতে ধনুর্বাণ নিয়ে ছুটে চললেন শনিধনের উদ্দেশ্যে। ট্রয়সেনাদের লক্ষ্য করে তিনি ক্রমাগত তীর বর্ষণ করে যেতে লাগলেন। প্রথমে তিনি পলিডেমাসের সহকর্মী ও পিসেনরের পুত্র সেইটাসকে বিদ্ধ করলেন তাঁর তীর দিয়ে। সেইটাস তখন লাগাম হাতে রথ চালনা করছিল। সে হেক্টরকে তাঁর অনেক সেবা দান করেছিল। কিন্তু সহসা একটি বিষাক্ত তীর এসে তার ঘাড়ের পিছনে লাগতেই সে রথ হতে পড়ে গেল। তখন অশ্বগুলো এদিকে ওদিকে লক্ষ্যহীনভাবে ছোটাছুটি করতে লাগল। পলিডেমাস তা দেখে প্রথে তিনি অশ্বগুলোকে সংযত করলেন। তারপর অ্যাসটাইনরের হাতে সে রথের ভার দান করলেন। তারপর তিনি ট্রয়সেনারের প্রথম সারিতে গিয়ে তাঁর স্থানে দাঁড়ালেন।
টিউসার হেক্টরকে লক্ষ্য করে আর একটি তীর নিক্ষেপ করলেন। তিনি তখনই যদি হেক্টরকে বিদ্ধ করতে পারতেন তাঁর নিক্ষিপ্ত শর দ্বারা এবং হত্যা করতে পারতেন তাহলে গ্রীকদল জাহাজে গিয়ে যুদ্ধ করার বাসনা হেক্টরের চিরদিনের মত শেষ হয়ে যেত। কিন্তু হেক্টরের নিরাপত্তার দিকে সব সময় লক্ষ্য রাখছিলেন জিয়াস। তাই তিনি হেক্টরবধের বিজয়গৌরব হতে টিউসারকে বঞ্চিত করলেন। টিউসার যখন তাঁর ধনুকে তীর সংযোজন করছিলেন তখন জিয়াসের চক্রান্তে ধনুকের ছিলাটি গেল ছিঁড়ে আর তীরটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে মাঝপথেই পড়ে গেল। তার হাত থেকে ধনুকটি পড়ে গেলে টিউসার তখন তাঁর ভাইকে বললেন, হায়, দেবতারা আমাদের সকল চেষ্টা ব্যর্থ করে দিচ্ছে। তারা আমার ধনুকের ছিলাটি ছিঁড়ে দিয়ে আমার ধনুকটি হাত থেকে ফেলে দিলেন। অথচ আজ সকালেও এই ধনুক হতে শর নিক্ষেপ করেছি আমি।
তেলামনপুত্র অ্যাজাক্স তখন উত্তর করলেন, গ্রীকদের অপমানিত করার জন্য জিয়াস আমাদের তীরধনুক বিকল করে দিয়েছেন। তথাপি বর্শা ধারণ করো তোমার হাতে। স্কন্ধের উপর স্থাপন করো তোমার ঢাল। ট্রয়সেনাদের বিরুদ্ধে তুমি নিজে যুদ্ধ করে যাও আর অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করো এ যুদ্ধে। সাময়িকভাবে তারা জয়ী হতে পারে এ যুদ্ধে; কিন্তু আমরা যদি সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাই, তাহলে তার আমাদের জাহাজ কখনই দখল করতে পারবে না।
টিউসার তখন তাঁর শিবিরে গিয়ে তাঁর ধনুকটি রেখে মাথার শিরস্ত্রাণ পরে ঢালটি কাঁধের উপর চাপিয়ে নিলেন। তারপর হাতে বর্শা নিয়ে তাঁর ভাই অ্যাজাক্সের পাশে এসে দাঁড়ালেন।
হেক্টর যখন দেখলেন টিউসারের ধনুকটি অকেজো হয়ে পড়েছে তখন তিনি চিৎকার করে তার অধীনস্থ সেনাদলকে সম্বোধন করে বললেন, হে ট্রয়, লাইসিয়া ও দার্দানিয়াবাসিগণ, বীরত্বসহকারে ঐসব জাহাজে গিয়ে যুদ্ধ করবে চল। আমি বেশ দেখতে পাচ্ছি, জিয়াসের মধ্যস্থতায় আমাদের শত্রুপক্ষের এক সেনানায়কের অস্ত্র বিকল হয়ে গেছে, এখন বেশই বুঝতে পারা যায়, জিয়াস কাদের সাহায্য করছেন এবং করবেন এবং কাদেরই বা পতন ঘটাতে চাইছেন। এখন বেশ বোঝা যাচ্ছে তিনি আমাদের সঙ্গে এবং গ্রীকদের বিরোধিতা করছেন। সুতরাং দলে দলে ওদের জাহাজের চারিদিকে গিয়ে ভিড় করো। সেখানে যুদ্ধ করো। যদি তোমাদের কেউ বর্শা বা তরবারির দ্বারা আহত হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হও, তাহলে জানবে সে মৃত্যু সম্মানজনক। দেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য যুদ্ধ করে প্রাণ দান করা সত্যিই সৌভাগ্যের কথা। তোমাদের কারো মৃত্যু ঘটলে জানবে তার স্ত্রীপুত্র নিরাপদে থাকবে। এদের থেকে গ্রীকরা যদি তাদের রণতরীসহ বিতাড়িত হয় তাহলে আমাদের প্রতিটি দেশবাসীর ধনসম্পত্তি অক্ষত ও অপহৃত রয়ে যাবে।
এই বলে ট্রয়সেনাদের মধ্যে সাহস ও উদ্যম সঞ্চার করলেন হেক্টর। ওদিকে অ্যাজাক্স তাঁর সহকর্মীদের ভর্ৎসনার সুরে বলতে লাগলেন, লজ্জার কথা, যদি আমরা শত্রুদের জাহাজ থেকে বিতাড়িত করতে না পারি তাহলে আমাদের জয়ের কোন আশা নেই। তোমরা কি ভাবছ, হেক্টর যদি আমাদের রণতরীগুলো অধিকার করেন তাহলে স্থলপথে নিরাপদে বাড়ি ফিরবে তোমরা? তোমরা কি শুনতে পাচ্ছ না কিভাবে তাঁর সৈন্যদের উত্তেজিত করছেন তিনি আমাদের জাহাজে আগুন লাগাবার জন্য? তিনি তাঁদের বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন তারা নাচতে আসে নি, এসেছে যুদ্ধ করতে।
আমাদের সামনে এখন একমাত্র পথ হলো আমাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রাণপণে যুদ্ধ করে একবার শেষ চেষ্টা করে দেখা। আমাদের থেকে নিকৃষ্ট স্তরের একজন লোক আমাদের ঘিরে থাকবে আমাদের জাহাজের চারদিকে তা কখনই হতে পারে না। অ্যাজাক্স যখন এই কথা বলে উত্তেজিত করছিলেন গ্রীকদের, হেক্টর তখন পেতিমেদিসপুত্র স্কেদিয়াসকে হত্যা করলেন। ওদিকে অ্যাজাক্সও পদাতিক সৈন্যদের সেনাপতি অ্যান্টিনরপুত্র লাওডামাসকে হত্যা করলেন। এপিয়াবাসীদের প্রথম পাইলেউসপুত্র ওটাসকে হত্যা করলেন পলিডেমাস। তা দেখে মেদিস আক্রমণ করলেন পলিডেমাসকে কিন্তু অ্যাপোলোর মধ্যস্থতায় পলিডেমাস সরে যেতে মেদিসের বর্শা তাঁর গায়ে লাগল না। সে বর্শা লাগল ক্রোয়েসত্রাসের বুকে এবং ক্রোয়েসত্রাস পড়ে যেতেই তাঁর দেহগাত্র হতে বর্মটি খুলে নিলেন মেসি। ঠিক সেই মুহূর্তে বীর সৈনিক ল্যাম্পাসপুত্র ডোলোপ ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপর। লাওমীডনপুত্র ল্যাম্পাস ছিলেন তাঁর বীরত্বের জন্য বিশেষভাবে খ্যাত এবং তাঁর পুত্র ডোলোপও ছিল বিভিন্ন প্রকার সমরকৌশলে সিদ্ধ। এরপর ডোলোপ তাঁর বর্শা দিয়ে ফাউলেউসপুত্রের হস্তপ্ত ঢালের মাঝখানে আঘাত করলেন। কিন্তু সে ঢালের ধাতব আচ্ছাধনটি ভেদ করতে পারল না ডোলোপ দ্বারা নিক্ষিপ্ত বর্শার ফলক। এই দুর্ভেদ্য ঢালটি ফাউলেউস এনেছিলেন সেলেইস নদীতীরবর্তী এফাইয়া থেকে। রাজা ইউফেটিস এটি তাঁকে দান করেন যুদ্ধে আত্মরক্ষার জন্য। আজ সেই ঢালটিই রক্ষা করল ফাইলেউসপুত্রের প্রাণ। এরপর মেদিস তাঁর বর্শার দ্বারা ডোলোপের ব্রোঞ্জনির্মিত শিরস্ত্রাণের অশ্বপুচ্ছমণ্ডিত চূড়ার উপর আঘাত করে শিরস্ত্রাণটি তার মাথা থেকে মাটিতে ফেলে দিলেন। ডোলোপ তখন পুরোদমে অপ্রতিহতগতিতে যুদ্ধ করতে থাকায় মেদিসের সাহায্য এগিয়ে এলেন মেনেলাস। ডোলোপর পাশে কখন তিনি এসে দাঁড়ালেন ভোলোপ তা দেখতেই পেলেন না। মেনেলাস পিছন থেকে তার বর্শা দিয়ে ভোলোপের ঘাড়ে এমনভাবে আঘাত করলেন যাতে ফলকটি ঘাড় ভেদ করে তার বুকে ফুঁড়ে বেরিয়ে এল। ডোলোপ পড়ে যেতে মেদিস ও মেনেলাস দুজনে তার বর্ম খুলে নেবার চেষ্টা করতেই হেক্টর তার ভাইদের ডাক দিলেন। তিনি বিশেষ করে হিকেটাওনপুত্র মেনালিপ্পাসকে ভর্ৎসনা করতে লাগলেন। মেলানিপ্লাস ছিলেন বীর সাহসী যোদ্ধা।কিন্তু আগে তিনি তাঁর দেশে পার্কোটে মেষ পালন করতেন। গ্রীকরণতরীগুলো যখন একযোগে ইলিয়াম নগর আক্রমণ করে তখন তিনি রাজা প্রিয়ামের সাহায্যার্থে ইলিয়াম নগরীতে আগমন করে এবং সেই থেকে এই নগরীতে প্রিয়ামের কাছাকাছি বসবাস করতে থাকেন। প্রিয়াম তাঁকে তাঁর অন্যতম পুত্রজ্ঞানে স্নেহ করতেন। হেস্টর এবার মেনালিপ্লাসকে সম্বোধন করে বললেন, তুমি কি তোমার মৃত্যু দেখতে পাচ্ছ না? দেখতে পাচ্ছ না ওর ডোলোপের গা থেকে বর্ম খুলে নিচ্ছে? এখন এস আমার সঙ্গে। এখন আর দূর থেকে গ্রীকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলে চলবে না, এখন তাদের অনেক নিকটে গিয়ে যুদ্ধ করে হত্যা করতে হবে তাদের। তা না হলে ওরা ইলিয়াম নগরী অধিকার করে অধিবাসীদের হত্যা করবে।
এই কথা বলতে বলতে এগিয়ে গেলেন হেক্টর আর মেনালিপ্পাস তাঁকে অনুসরণ করতে লাগলেন। ইতিমধ্যে তেলামনপুত্র অ্যাজাক্সও গ্রীকদের উত্তেজিত করতে লাগলেন। তিনি বললেন, একমাত্র পরাজয়ের গ্লানিকে ভয় করে সাহসের সঙ্গে মানুষের মত যুদ্ধ করে যাও। যুদ্ধ করে এক অক্ষয় শ্রদ্ধা ও সম্মান অর্জন করো। মনে রেখো ভীরুতা ও পলায়নের মধ্যে কোন গৌরব নেই।
এইভাবে অ্যাজাক্স নীতি উপদেশের দ্বারা উত্তেজিত করতে লাগলেন। তাঁর সে উপদেশ অন্তরে গেঁথে নিয়ে গ্রীকরা তাদের জাহাজগুলোর সামনে সমবেত হয়ে এক কৃত্রিম প্রাচীর সৃষ্টি করল। এদিকে জিয়াস তখনো ট্রয়সেনাদের অনুপ্রাণিত করছিলেন মেনেলাস তখন অ্যান্টিলোকাসকে বললেন, অ্যান্টিলোকাস, তুমি বয়সে তরুণ যুবক, তুমি দ্রুতগামী এবং সাহসী। তুমি কি কোন ট্রয়সেনার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে হত্যা করতে পারছ না?
অ্যান্টিলোকাসকে এইভাবে উত্তেজিত করে অন্যত্র চলে গেলেন মেনেলাস। আর অ্যান্টিলোকাস তখন দ্রুতবেগে ছুটে গিয়ে চারিদিকে তাকিয়ে একটি বর্শা নিক্ষেপ করেন। সে বর্শা ব্যর্থ হলো না। মেনালিপ্লাস যখন সামনের দিকে এগিয়ে আসছিলেন তখন সে বর্শাটি তার বক্ষস্থল ভেদ করল। ভূতলে পড়ে গেলেন মেনালিপ্পাস। কোন শিকারীর দ্বারা নিহত মৃগশিশুর উপর যেমন শিকারী কুকুর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তেমনি অ্যান্টিলোকাসও মেনালিপ্পাসের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁকে সম্পূর্ণভাবে হত্যা করলেন কিন্তু হেক্টর তা দেখতে পেয়ে ভিড় ঠেলে ছুটে গেলেন এবং তাকে দেখে সদ্য হত্যাকারী কোন বন্যজন্তুর মত প্রাণভাবে পালাতে লাগল অ্যান্টিলোকাস। হেক্টরের সম্মুখীন হবার সাহস পেল না। এইভাবে নেস্টরপুত্র পালিয়ে গেল ভয়ে আর হেক্টর ও তাঁর অধীনস্ত ট্রয়সেনরা অস্ত্রবৃষ্টি করতে লাগলেন তাকে লক্ষ্য করে। অ্যান্টিলোকাস একবার পিছন দিকে তাকিয়ে দেখল না, দ্রুতবেগে ছুটে বেরিয়ে গেল তার সহকর্মীদের কাছে।
গ্রীকদের জাহাজগুলোর দিকে ক্রমাগত সিংহবিক্রমে এগিয়ে যাচ্ছিল ট্রয়সৈন্যরা, কারণ দেবরাজ জিয়াস তখনো গ্রীকদের সাহস খর্ব করে ক্রমাগত উত্তেজিত করে যাচ্ছিলেন তাদের। কারণ জিয়াস চাইছিলেন থেটিসের প্রার্থনা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তিনি হেক্টরকে দান করে যাবেন জয়ের গৌরব আর গ্রীকজাহাজে অগ্নিসংযোগের ক্ষমতা। তাই কোন এক জ্বলন্ত গ্রীকজাহাজে আগুন দেখার জন্য প্রতীক্ষা করছিলেন জিয়াস। সে দৃশ্য দেখার পর হতে তিনি এমন অবস্থার সৃষ্টি করবেন যাতে ট্রয়সেন্যরা গ্রীকজাহাজগুলো হতে বিতাড়িত হবে আর গ্রীকসৈন্যরা ক্রমাগত জয়লাভ করতে থাকবে। এই কারণেই তিনি হেক্টরকে গ্রীকজাহাজ আক্রমণে উৎসাহিত করছিলেন। রণদেবতা সাক্ষাৎ অ্যারোসের মতই ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন হেক্টর। জ্বলন্ত দাবানলের মতই প্রচণ্ড ও সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছিল তাঁর ক্রোধ। তার মুখে ফেলা ভাঙ্গছিল। কুটিল
কুটির নিম্নদেশে বিঘূর্ণিত চক্ষুতারকাদুটি আগুনের মত জ্বলজ্বল করছিল। যুদ্ধরত অবস্থায় দ্রুত মস্তক সঞ্চালনহেতু শিরস্ত্রাণটি মাথায় কাঁপছিল। জিয়াস সর্বক্ষণ স্বর্গলোক হতে তাঁর উপর কৃপাদৃষ্টি বর্ষণ করছিলেন বলেই বহু শত্রসৈন্যের মাঝে একাকী হয়েও সব সময় লাভ করে যাচ্ছিলেন তিনি জয়ের গৌরব। তথাপি হেক্টরের ভাগ্যে ছিল অকালমৃত্যু এবং দেবী প্যালাস এথেন পেলেউসপুত্রের হাতে তার মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করছিলেন। হেক্টর যেখানেই দেখছিলেন গ্রীকরা ঘন হয়ে এক জায়গায় এক প্রতিরক্ষার ব্যুহ রচনা করেছে এবং রীতিমতভাবে অস্ত্রসজ্জায় সজ্জিত হয়ে আছে। সেইখানেই তিনি তাদের আক্রমণ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু শত চেষ্টাতেও গ্রীকসেনাদের ছত্রভঙ্গ করতে পারছিলেন না হেক্টর। সমুদ্রের ধূসর বুক থেকে সোজা উঠে যাওয়া কোন খাড়াই পাহাড় যেমন মস্ত ঝড় বা সমুদ্রতরঙ্গের ক্রোধান্ধ আঘাতকে প্রতিহত করে তেমনি অটল অবিচলভাবে দাঁড়িয়ে ছিল গ্রীকরা। জ্বলন্ত এক তপ্ত আগুনের মত বিভিন্ন দিক থেকে গ্রীকদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছিলেন হেক্টর। বারবার প্রচণ্ড সমুদ্রতরঙ্গের দ্বারা নির্মমভাবে প্রহৃত ও জর্জরিত হয়ে কোন ভগ্নক্লান্ত অর্ণবপোত যেমন হাঁপাতে থাকে, হেক্টরের আক্রমণের দ্বারা বিপন্ন বিব্রত গ্রীকদের অবস্থা হয়েছিল ঠিক তাই। কোন পালকহীন পশুপালের মধ্যে সহসা কোন সিংহ ঝাঁপিয়ে পড়লে যেমন সেই পালের অন্তর্ভুক্ত সমস্ত পশুই আতঙ্কগ্রস্ত হয়, তেমনি হেক্টরের আক্রমণে শঙ্কাবিহ্বল হয়ে পড়ল গ্রীকরা।
তথাপি হেক্টর তাদের বেশি সৈন্য বধ করতে পারলেন না। তিনি শুধু সাইসেনের কোপ্রেউসপুত্র পেরিফ্রেটিসকে হত্যা করলেন। শক্তি, বুদ্ধিবৃত্তি ও উপলব্ধিতে তিনি ছিলেন প্রথম শ্রেণীর বীর। পেরিফেটিস তাঁর ঢালসহ একবার মাটিতে পড়ে যেতেই হেক্টর ছুটে এসে তার বর্শাফলকটি আমূল বসিয়ে দিলেন। অন্যান্য গ্রীকসেনারা তার অতি নিকটে থাকা সত্ত্বেও কেউ কিছুই করতে পারল না, কারণ তারা সকলেই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল হেক্টরের ভয়ে।
উপকূলবর্তী গ্রীকরণতরীগুলোর প্রথম সারি হতে বিতাড়িত হয়েছিল গ্রীকরা। তারা গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল তাদের শিবিরমধ্যে। লজ্জায় ভয়ে তারা আর সেখান থেকে পালায় নি। তারা ক্রমাগত চিৎকার করে যাচ্ছিল আতঙ্কে। নেস্টর তাদের তখনো উত্তেজিত করার চেষ্টা করছিলেন। তিনি বলছিলেন, শুধু তোমাদের নিজেদের কথা নয়, তোমাদের পিতামাত্রা ও স্ত্রীপুত্রদের কথা ভেবে প্রাণপণে যুদ্ধ করে যাও। অন্তত তাদের খাতিরে দৃঢ়তার সঙ্গে যুদ্ধ করে চল। আমরা অনুরোধ রক্ষা করো, ভয়ে পালিও না।
নেস্টর যখন গ্রীকদের মনে এইভাবে সাহস সঞ্চার করছিলেন দেবী এথেন তখন গ্রীকদের চোখের উপর থেকে অন্ধকার অপসৃত করে দিলেন, যার ফলে তারা হেক্টরকে দেখতে পাচ্ছিল। দেখতে পাচ্ছিল কোথায় কিভাবে যুদ্ধ হচ্ছে।
অন্যান্য গ্রীকসেনাদের মত অ্যাজাক্স কিন্তু শিবিরমধ্যে গিয়ে আশ্রয় নেন নি। তিনি এক বিরাট লম্বা বর্শা নিয়ে একটি জাহাজের ডেক হতে অন্যান্য জাহাজের ডেকগুলোতে স্বচ্ছন্দে পদচারণা করে বেড়াচ্ছিলেন। তিনি নিরন্তর চিৎকার করে গ্রীকসেনাদের জাহাজ রক্ষার জন্য উৎসাহিত করছিলেন। ট্রয়সেনাদের ভিতরে না থেকে হেক্টর বাইরে এসে একাই গ্রীকজাহাজে গিয়ে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করছিলেন। দলবদ্ধ হয়ে উড়ে যেতে যেতে সহসা নিজেকে দলচ্যুত করে নদীতীরবর্তী কোন পক্ষীশাবকের জন্য একা ছুটে আসে যেমন কোন ঈগল পাখি, তেমনি হেক্টরও একটি গ্রীকজাহাজে যাবার চেষ্টা করছিলেন। তিনি তাঁর সেনাদলকে তাঁর অনুসরণ করার আদেশ দিচ্ছিলেন শুধু। জিয়াসও তাঁকে এ কাজে অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছিলেন সকলের অলক্ষ্যে অগোচরে।
গ্রীকজাহাজগুলোর মধ্যে এবার যুদ্ধ ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করল। গ্রীকরা ভাবতে লাগল এবার তাদের ধ্বংস অনিবার্য। এ ধ্বংসের কবল থেকে অব্যাহতি পাওয়ার কোন আশাই আর নেই তাদের। অন্যদিকে গ্রীকজাহাজগুলোতে অগ্নিদগ্ধ করে তাদের বীরদের হত্যা করার আশায় ক্রমশ উত্তাল হয়ে উঠতে লাগল ট্রয়সেনাদের অন্তর।
এই ছিল তখন উভয় পক্ষের মনের অবস্থা। অবশেষে হেক্টর গিয়ে প্রোতেসিলসের জাহাজটিকে ধরে ফেললেন। তাঁর আঘাতে নিহত প্রোতেসিলসের আর দেশে ফিরে যাওয়া হলো না। ট্রয়সেনারা গ্রীকজাহাজের প্রথম সারিতে আসায় খুবই নিকট থেকে যুদ্ধ হতে লাগল দুই পক্ষে; দুই পক্ষের সৈন্যরাই খুব কাছে থেকে বর্শা, তরবারি ও কুঠার নিয়ে পরস্পরকে আক্রমণ করলেন। কত বীরের রক্তে রঞ্জিত হয়ে উঠল ধরণীর মাটি।
হেক্টর একটি জাহাজের দাঁড় নিজের হাতে ধরে তার অধীনস্থ সৈন্যদের চিৎকার করে বলতে লাগলেন, আগুন আন। সমস্বয়ে রণহুঙ্কার তোল সকলে মিলে। আজ জিয়াস আমাদের এমন এক সুদিন দিয়েছেন সেদিন আমরা আমাদের সকল সহকর্মীর মৃত্যুর প্রতিশোধ নেব। সেদিন যে গ্রীকরণতরীগুলো আমাদের জীবনে নিয়ে এসেছে অনন্ত দুঃখ আর বিপর্যয়ের অভিশাপ সে রণতরীগুলোকে আমরা অধিকার করব। আমি অনেক আগেই এই রণতরীগুলোকে সরাসরি আক্রমণ করতে চেয়েছিলাম কাছে থেকে, কিন্তু আমাদের মন্ত্রণাদাতারা আমাকে তা করতে দেন নি আর আমাদের সেনাদলকে আমার অনুসরণ করতে দেন নি। জিয়াস যদি তখন এখনকার মত আমার বিচার বুদ্ধিকে ঠিকমত চালনা করতে পারতেন এবং উৎসাহিত করতেন তাহলে অনেক আগেই পূর্ণ হত আমাদের মনোবাসনা।
হেক্টরের কথায় ট্রয়সেনারা আরো ভয়ঙ্করভাবে যুদ্ধ করতে লাগল। তাদের সামনে অ্যাজাক্সও আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না গ্রীকজাহাজে পাটাতনে। চারিদিক হতে শরবৃষ্টির মাঝে আর স্থির থাকতে পারলেন না তিনি। তিনি জাহাজের পাটাতন থেকে নাবিকদের বসার জায়গায় গিয়ে বর্শাটি ধরে দাঁড়ালেন। তিনি যখন দেখলেন, কোন ট্রয়সেনা তার হাতের জ্বলন্ত মশাল দিয়ে গ্রীক জাহাজে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করছে। তখনি তিনি তাঁর দীর্ঘ বর্শার দ্বারা আক্রমণ করলেন তাঁকে। তিনি তারস্বরে চিৎকার করে করে বলতে লাগলেন, বন্ধুগণ, তোমরা রণদেবতা অ্যারেসের সেবক, তোমরা প্রকৃত মানুষের মত, বীরের মত যুদ্ধ কর। আমরা কি কোন সাহায্যকারীর প্রত্যাশায় কালক্ষেপ করতে পারি? অথবা আমরা কি ভাবি আমাদের দ্বারা নির্মিত এই প্রাচীরের থেকে বলিষ্ঠতম কোন প্রাচীর আমাদের রক্ষা করবে? এমন কোন সুরক্ষিত নগর নেই যা আমাদের বলিষ্ঠতম কোন সেনাদল দিয়ে রক্ষা করতে পারবে আমাদের। আজ আমরা আমাদের জন্মভূমি থেকে বহুদূরে সশস্ত্র ট্রয়সৈন্যদের সম্মুখীন এবং আমাদের পিছনে আছে অন্তহীন সমুদ্র। সুতরাং আমাদের মুক্তি নির্ভর করছে আমাদের নিজেদের হাতের উপর, আমাদের কঠোরতার সংগ্রামশীলতার উপর।
এই কথা বলতে বলতে তাঁর হস্তধৃত দীর্ঘ বর্শাটি আরো প্রচণ্ডভাবে চালনা করতে লাগলেন অ্যাজাক্স। হেক্টরের আদেশে কোন ট্রয়সৈন্য জাহাজে অগ্নিসংযোগ করতে এলেই অ্যাজাক্স তার বর্শা দিয়ে তাকে বিতাড়িত করে দিলেন। এইভাবে বারোজন শত্রুসৈন্যকে হত্যা করলেন অ্যাজাক্স তার জাহাজের সামনে।