অ্যাগামেমননের স্বপ্ন ॥ অর্ণবপোতগুচ্ছ

অন্যান্য দেবতারা সারারাত গভীরভাবে ঘুমোলেও সর্বক্ষণ জেগে রইলেন জিয়াস। ভাবতে লাগলেন, যথাসম্ভব গ্রীকদের ধ্বংস করে কিভাবে অ্যাকেলিসের অপমানের প্রতিশোধ নেওয়া যায়। অবশেষে তিনি স্থির করলেন, এক মিথ্যা স্বপ্নের দ্বারা বিভ্রান্ত করবেন রাজা অ্যাগামেমননকে। এই উদ্দেশ্যে তিনি এক অনুচরকে ডেকে বললেন, হে মিথ্যা মায়াবিনী স্বপ্ন, এই মুহূর্তে গ্রীকশিবিরে গিয়ে অ্যাগামেমননকে এই কথাগুলো বল। তাকে বল, এই মুহূর্তে যে যেন অস্ত্রসজ্জিত করে তোলে গ্রীকদের। এই মুহূর্তে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে ট্রয় জয় করবে সে। দেবতাদের মধ্যে আর কোন মতভেদ নেই। ট্রয়বাসীদের সামনে এখন সর্বনাশ উপস্থিত।
রাত্রির অন্ধকার ভেদ করে মায়াবিনী স্বপ্ন চলে গেল গ্রীকশিবিরে। জিয়াসের আদেশমত খুঁজে বার করল সুষপ্তিমগ্ন অ্যাগামেমননকে। নেলেউসপুত্র নেস্টরের বেশে অ্যাগামেমননের সামনে মাথার কাছে গিয়ে বলল, হে আত্রেউসপুত্র, তোমার মাথায় যখন এই দুশ্চিন্তা, এতগুলো লোকের নিরাপত্তার ভার, তখন কেন তুমি এখন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছ সারারাত? আমার কথা শোন। আমি আসছি দেবরাজ জিয়াসের কাছ থেকে। তিনি তোমার কথা চিন্তা করেন, তিনি তোমার প্রতি দয়াপরবশ হয়ে বলেছেন, এখনি তোমরা যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে ট্রয় জয় করবে। স্বর্গের দেবতাদের মধ্যে আর কোন মতভেদ নেই। হেরা তাদের সকলকে একমত করেছেন। জিয়াসের ইচ্ছায় তোমার হাতে পরাভূত হবে ট্রয়বাসীরা। এই কথা মনে রেখে কাজ করবে।
মায়াবিনী স্বপ্ন সেখান থেকে চলে যেতেই অ্যাগামেমননের মনে জাগল ট্রয় জয়ের বাসনা। জিয়াসের প্রকৃত অভিপ্রায়ের কথা ঘৃণাক্ষরেও জানতে পারলেন না তিনি। তাই রাজা প্রিয়ামের কত সাধের ট্রয়নগরী অধিকারের এক অগ্রপ্রসারী অভিলাষে উল্লসিত হয়ে উঠল তার মন।
উঠে দাঁড়ালেন অ্যাগামেমনন। তখনও তার দুকানে অনুরণিত হয়ে উঠছিল সেই দৈববাণীর কথা। তিনি নিজে আগে অস্ত্রসজ্জায় সজ্জিত হয়ে উঠলেন। গায়ে বর্ম, পায়ে চটি আর কোমরে ঝুলিয়ে নিলেন পিতৃদত্ত অক্ষয় তরবারি।
মন্দমন্থর চরণক্ষেপে স্বর্ণালোকরেণু বিচ্ছুরিত করে অলিম্পাস পর্বতের পথে এগিয়ে চললেন ঊষাদেবী। প্রথম দিবালোকের অর্ঘ্যদান করে পাদ-বন্দনা করলেন জিয়াসের। এদিকে ঘোষকের মাধ্যমে সকলকে একত্রিত করে পাইলসরাজ নেস্টরের জাহাজে বয়োপ্ৰবীণ গ্রীকবীরদের এক সভা আহ্বান করলেন অ্যাগামেমনন। সকলে সমবেত হলে অ্যাগামেমনন বললেন, বন্ধুগণ, গতকাল নিশীথকালে আমি এক স্বর্গপ্রেরিত স্বপ্নদর্শনে আশান্বিত হয়েছি। মায়াবিনী স্বপ্নমূর্তি আমার ট্রয় জয়ের এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা দান করেই অদৃশ্য হয়ে যায় আর সঙ্গে সঙ্গে নিদ্রাগত অবস্থায় উঠে পড়ি আমি। সুতরাং স্বপ্নমূর্তির নির্দেশানুসারে অস্ত্রসজ্জায় সজ্জিত করে তোল আমাদের সকলকে।
একথা বলে গ্রীক নৃপবর উপবেশন করলেন পাইলসরাজ নেস্টর উঠে দাঁড়ালেন। গ্রীকদের সম্বোধন করে বললেন, একথা যদি অন্য কেউ বলত তাহলে ততখানি গুরুত্ব দিতাম না আমরা। কিন্তু আমাদের মধ্যে যিনি সর্বপ্রধান এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি তিনিই প্রচার করছেন এই স্বপ্নদর্শন বৃত্তান্ত।
রাজা অ্যাগামেমননের মুখ থেকে এই স্বপ্নবৃত্তান্ত স্বকর্ণে শোনার জন্য কুসুমাভিমানী মধুলুব্ধ ভৃঙ্গারের মত গ্রীকসৈন্যগণ ভিড় করতে লাগল। অন্ধকার অবারিত প্রান্তরের শূন্যতায় উড়ে চলা আলো ছড়িয়ে পড়া জোনাকির মত এই স্বপ্নবারতা ছড়িয়ে যেতে লাগল জিয়াসের দূতগণ। এইসব দূতগণ ও গ্রীকসৈন্যদের পদভারে কম্পিত হয়ে উঠতে লাগল পৃথিবীর মাটি।
অবশেষে সমবেত গ্রীকসৈন্যদের সম্মুখে কিছু ভাষণ দেবার জন্য হিফাস্টাস রাজদণ্ড হাতে এসে দাঁড়ালেন রাজা অ্যাগামেমনন। রাজদণ্ডের উপর হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, আমার বীর বন্ধুগণ, দুঃখের বিষয় এই যে, আজ স্বর্গের দেবতারা আমার সঙ্গে বিরূপতা করছেন। প্রথমে আমায় এই মর্মে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন দেবরাজ জিয়াস যে, স্বদেশের প্রত্যাবর্তনের আগে আমরা যাতে দুর্ভেদ্য ট্রয়নগরী আক্রমণ করতে পারি তারজন্য তিনি সাহায্য করবেন আমাদের। কিন্তু বস্তুত তিনি ছলনা করেছেন আমাদের সঙ্গে। তিনি এখন চাইছেন আমি আমার দলের বহু লোককে মৃত্যুর কবলে ঠেলে দিয়ে এক ভয়াবহ পরাজয়ের দুর্বিষহ গ্লানি নিয়ে এই মুহূর্তে দেশে ফিরে যাই। সবচেয়ে দুঃখের কথা এই যে আমরা এত সাহসী, রণনিপুণ ও সংখ্যায় এত বহুল হয়েও পরাজয় স্বীকার করতে হবে ট্রয়বাসীদের কাছে। আসলে ট্রয়বাসীরা সংখ্যা খুবই নগন্য, কিন্তু বিভিন্ন স্থান থেকে তাদের মিত্রশক্তির লোকদের এনে ট্রয়দুর্গে ভরে রেখেছে বলেই ট্রয় বা ইলিয়ামনগরী জয় করতে পারছি না আমরা। অথচ এ কাজের জন্য আমরা এসেছি দীর্ঘ নয় বছর। আমরা যেসব অর্ণবপোত ও জলযানে করে এখানে এসেছিলাম তা সব নষ্ট হয়ে যেতে বসেছে। দেশে আমাদের স্ত্রীপুত্রকন্যারা কাঁদছে আমাদের জন্য। যে উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এসেছিলাম আমরা তা যখন সিদ্ধ হলো না তখন ফিরে চল দেশে। ট্রয় জয় আমরা করব না।
অ্যাগামেমননের এ কথায় বিশেষভাবে বিচলিত হয়ে উঠল গ্রীকসৈন্যরা। দেশে ফেরার আকস্মিক আনন্দে উল্লসিত হয়ে উঠল তারা। উত্তাল সমুদ্রতরঙ্গ ও পশ্চিমা বায়ুতাড়িত শস্যকণার মতই দুর্বার হয়ে উঠে সে উল্লাস। উল্লসিত গ্রীকদের চরণোৎক্ষিপ্ত ধূলিজালে আচ্ছন্ন হয়ে যায় আকাশ; ম্লান হয়ে যায় প্রদীপ্ত সূর্যালোক। তাদের উল্লাসসিক্ত কণ্ঠের ধ্বনিতে অনুরণিত হতে থাকে চারদিকের বাতাস। কিন্তু তখনো পর্যন্ত গ্রীকসৈন্যরা ঘুণাক্ষরে কল্পনাও করতে পারে নি, একথা অ্যাগামেমননের মনের কথা নয়, আসলে তিনি ছলনাময় এইসব কথার কৃত্রিম ফুল ফুটিয়ে চাতুর্য খেলছেন তাদের সঙ্গে।
হয়ত এইভাবেই স্বদেশে ফিরে যেত উল্লসিত গ্রীকগণ, কিন্তু স্বর্গের দেবতারা চাইলেন না তারা এইভাবে চলে যাক। হেরা এথেনকে বললেন, হায় জিয়াসকন্যা, একি শুনছি, যে হেলেনের জন্য এত গ্রীক প্রাণ দিল সেই হেলেনকে অবাধে ট্রয়নগরীতে সগর্বে রেখে দেবে রাজা প্রিয়াম আর গ্রীকরা যে সমুদ্রপথে এসেছে সেই সমদ্রপথেই হতোদ্যম হয়ে ফিরে যাবে? তা কখনই হতে দিও না। তুমি এখনি চলে যাও, প্রতিটি গ্রীকসৈন্যের কাছে গিয়ে প্ররোচিত করগে তারা যাতে তাদের এই আরদ্ধ কাজ অসম্পন্ন রেখে দেশে ফিরে না যায়।
অলিম্পাসের সর্বোচ্চ শিখরদেশ হতে তৎক্ষণাৎ নেমে গেলেন এথেন। তিনি সুক্ষ্ম শরীরে অদৃশ্য অবস্থায় চলে গেলেন গ্রীকদের জাহাজে। প্রথমেই তিনি দেখলেন দেবরাজ জিয়াসের পরামর্শদাতা মর্তমানব গ্রীকবীর ওডিসিউস দাঁড়িয়ে রয়েছেন বিষণ্ণমুখে। কারণ, এভাবে মুখে পরাজয়ের গ্লানি মেখে দেশে ফিরে যেতে চাইছিল মন তাঁর।
এথেন প্রথমে তাকেই সম্বোধন করে অদৃশ্য অবস্থায় বললেন, হে লার্তেসপুত্র, তুমি কি এইভাবে ফিরে যেতে চাও তোমার দেশে? যে হেলেনের জন্য এত গ্রীকবীর প্রাণ দিয়েছে সেই হেলেনকে করায়ত্ত রেখে দেবার গৌরবে ভূষিত ও অক্ষত অবস্থায় ট্রয়রাজ প্রিয়ামকে রেখে ফিরে যেতে চাও তুমি? যাও, গ্রীকরা যাতে এ ভুল না করে তার জন্য তাদের সতর্ক করে দাওগে।
ওডিসিউস বেশ বুঝতে পারলেন যে এ দৈববাণী কার। তিনি তাঁর অঙ্গের বহিরাবরণ তার একান্তভৃত্য ইউরিবেটস এর কাছে খুলে ফেলে রেখে দ্রুত চলে গেলেন রাজা অ্যাগামেমননের কাছে। তাঁর কাছ থেকে পরিচয়সূচক পাঞ্জা নিয়ে চলে গেলেন গ্রীকসৈন্যদের জাহাজে। সেখানে গিয়ে কোন রাজা বা সর্দার যাকেই দেখতে পান তাকেই বলেন, আমাদের এই হীন পলায়ন, এই নিঃশব্দ নির্লজ্জ পশ্চাদপসরণ কাপুরুষোচিত, বীরের জাতি গ্রীকদের পক্ষে একান্তভাবে নিন্দনীয়। এ কাজ না করে আপন আপন স্থানে দাঁড়িয়ে থাক তোমরা। তোমরা তোমাদের সেনাদেরও স্বস্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে বল; তারা যেন পালিয়ে না যায়। তোমরা রাজা অ্যাগামেমননের মনের কথা জান না। তিনি আমাদের পরীক্ষা করছিলেন একথা বলে। বরং যদি তোমাদের প্রত্যাগমনোদ্যোগী দেনে তাহলে অবশ্যই অসন্তুষ্ট ও ক্রুদ্ধ হয়ে তোমাদের শাস্তি দেবেন তার জন্য।
কিন্তু যখন প্রত্যাবর্তনোৎসুখ কোন সাধারণ গ্রীকসৈন্যকে উল্লসিত অবস্থায় দেখছিলেন ওডিসিউস, তখনি তাকে তার হস্তপ্ত পাঞ্জা দিয়ে আঘাত করে তার চৈতন্যোদয়ের চেষ্টা করছিলেন। তিনি তাকে বললেন, কাপুরুষ কোথাকার, তুমি পালিয়ে যাচ্ছ! তুমি কখনই যথার্থ সৈনিক নও। এটা মনে রেখো যে তোমরা সবাই রাজা নও, জিয়াসপ্রদত্ত রাজদণ্ড যিনি বহন করছেন তিনিই প্রকৃত রাজা, তাঁর ইচ্ছানুসারেই চলতে হবে তোমাদের।
এইভাবে ওডিসির কথায় নিজেদের ভুল বুঝতে পারল গ্রীকসৈন্যদল। সহসা বিক্ষুব্ধ সমুদ্রবক্ষ হতে গর্জনশীল তরঙ্গমালা যেমন কূলের দিকে ধাবিত হয়ে যাতপ্রতিঘাতের এক আশ্চর্য লীলায় মত্ত হয়ে ওঠে, তেমনি অশান্ত চঞ্চল গ্রীকসৈন্যগণ তাদের তাঁবু ও জাহাজ হতে দ্রুত ছুটে গিয়ে এক আলোচনা সভায় সমবেত হলো। পরস্পরের মধ্যে রত হলো বাদ প্রতিবাদে।
সকলেই প্রায় আপন আপন আসনে উপবেশন করল শান্ত হয়ে। একমাত্র বাঁচাল থার্সাইটস বকে যেতে লাগল আপন মনে। এক পা খোঁড়া, পিঠে কুঁজ, মাথায় টাক, কুৎসিতদেহী কেশবিরল থার্সাইটস এর কাজই হলো সব সময় পরের নিন্দা করে বেড়ানো। এজন্য তাকে কেউ দেখতে পারতেন না, বিশেষ করে অ্যাকেলিস ও ওডিসিয়াস একেবারেই তাকে দেখতে পারতেন না।
অডিসির কথা মোটের উপর অন্যান্য গ্রীকরা মেনে নিলেও থার্সাইটস মানতে পারল না। সে তখন অ্যাগামেমননের উদ্দেশ্যে একের পর এক তীক্ষ্ণ বাক্যবাণ বর্ষণ করে যেতে লাগল। থার্সাইটস বলতে লাগল, কি চাও তুমি অ্যাগামেমনন? তোমার যুদ্ধশিবির কামিনী আর কাঞ্চনে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তুমি কি কোন ট্রয়বাসীর বন্দী পুত্রের মুক্তির জন্য আরও অনেক কিছু উপঢৌকন চাও? তুমি আবার কি কোন ট্রয়যুবতাঁকে শয্যাসঙ্গিনী হিসেবে পেতে চাও? আর এই কাপুরুষের দল, তোমরা পুরুষ নস যত সব দুর্বলমনা মেয়েমানুষের দল। অ্যাগামেমননকে একা ফেলে রেখে চল আমরা দেশে ফিরে যাই। একা এখানে ওর বন্দিনীদের নিয়ে ফুর্তি করুক। অ্যাকেলিস তোমার থেকে অনেক ভাল। অথচ তুমি তাকে অপমান করেছ। অ্যাকেলিস অবশ্য কোন প্রতিশোধ নেয় নি। নিলে তুমি বুঝতে, আর তুমি তাকে কখনও সাহস করতে না এভাবে অপমান করতে।
কিন্তু ওডিসি আর কোন কথা বলতে দিলেন না থার্সাইটসকে। তিনি তীক্ষ্ণ ভাষায় তাকে ভৎর্সনা করে বললেন, থামাও তোমার বাঁচালতা। আর একটা কথাও বলবে না। রাজাদের বিরুদ্ধে নিন্দাবাদ করে কোন লাভ নেই। আমরা এখন জানি না ঘটনার গতি কোন দিকে যাচ্ছে, জানি না আমরা সাফল্যের সঙ্গে বিজয়গৌরবে দেশে ফিরতে পারব কি না। কোন সাহসে তুমি অ্যাগামেমননের নিন্দা করছ, সে যুদ্ধে কিছু বেশি পারিতোষিক পেয়ে এই জন্যে? আমি তোমাকে বলে দিচ্ছি যদি তোমাকে আর কখনো এইভাবে বাজে কথা বলতে দেখি তাহলে তোমাকে উলঙ্গ করে চাবুক মারব, তাতে যদি আমার নিজের মাথা দিতে হয় তো দেব।
এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে অ্যাগামেমননের কাছ থেকে নেওয়া হস্তধৃত স্বর্ণপাঞ্জা দিয়ে থার্সাইটস এর পিঠে এমনভাবে আঘাত করলেন ওডিসি যে, থার্সাইটস মাটিতে পড়ে গেল, তার পিঠে দাগ পড়ে গেল। অন্যান্য গ্রীকসৈন্যরা হাসাহাসি করে বলতে লাগল, ওডিসি একটা ভাল কাজ করেছে। সে থার্সাইটস এর বাঁচালতা থামিয়েছে।
এইভাবে সকলকে দেশে না ফেরার জন্য প্ররোচিত করে বেড়াতে লাগলেন ওডিসি। এথেনও একজন সাধারণ দূতের বেশে সকলকে ওডিসির কথা শোনার জন্য উপদেশ দিতে লাগল। অবশেষে রাজা অ্যাগামেমননের কাছে গিয়ে ওডিসি বলতে লাগলেন, হে রাজা অ্যাগামেমনন, আজ গ্রীকসৈন্যরা জগৎবাসীর কাছে তোমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রয়াস পাচ্ছে। তারা আর্গস থেকে এখানে আসার জন্য রওনা হবার সময় তোমাকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সে প্রতিশ্রুতির কথা তারা ভুলে গেছে। তারা তোমায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ট্রয়নগরী সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত না হওয়া পর্যন্ত তারা ফিরবে না। অবশ্য তাদের এই চঞ্চলতা ও গৃহাভিমুখিতার জন্য দোষ দিতে পারি না। কারণ তারা দীর্ঘ নয় বৎসর দেশ ছেড়ে এই বিদেশে বাস করছে। তথাপি হে আমার স্বদেশবাসী, আমি তোমাদের আর কিছুদিনের জন্য ধৈর্য ধারণ করার জন্য অনুরোধ করছি। ক্যালকাসের ভবিষ্যদ্বাণী ফলেছে কি না তা দেখতে বলছি।
যারা যুদ্ধে নিহত হয় নি, আহত ও জীবিত আছে, তাদের হয়ত একটা কথা মনে আছে। এই ট্রয়নগরীতে _ আমাদের জাহাজগুলো একবার সমুদ্রমধ্যে অলিস দ্বীপে আটকে যায়। আমরা তখন সেই দ্বীপের মাঝে একটা ঝাউগাছের তলায় একটা ঝর্ণার ধারে পূজাবেদীর সামনে দাঁড়িয়েছিলাম দেবতাদের পূজা দেবার জন্য। সহসা জিয়াস প্রদত্ত একটি সাপ বেদীর তলার মাটি থেকে বেরিয়ে এল বিদ্যুৎবেগে। তার পিঠে ছিল লাল লাল দাগ। সাপটি বেরিয়ে এসে সোজা চলে গেল গাছটার উপরে। গাছটার সুউচ্চ শাখাস্থ বাসায় আটটি পাখির ছানা আর তার মা ছিল। সাপটি একে একে সেই ছানাগুলোকে খেয়ে অবশেষে তাদের মাকেও খেল। ক্যালকাস এই ঘটনাটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে বলেছেন এর অর্থ এই যে আমরা পরপর নয় বছর বহু ট্রয়বাসীকে হত্যা করে সর্বশেষ দশম বৎসরে ট্রয়রাজকেও সবংশে নিধন করে জয়লাভ করব।
এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে সকলে আনন্দে উল্লসিত হয়ে চিৎকার করতে লাগল। তখন বীর নাইট নেস্টর এসে গ্রীকসৈন্যদের সম্বোধন করে বলতে লাগলেন, লজ্জা করে
তোমাদের? তোমরা এখানে দাঁড়িয়ে ছেলেমানুষের মত গল্প করছ যুদ্ধ ছেড়ে? কোথায় আমাদের শপথ আর প্রতিশ্রুতি? সুরাহুতির মত আমরা কি প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করেছি সেই সব পবিত্র শপথ? যুদ্ধের কাজ ফেলে যারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু কথা বলে কালক্ষেপ করে, যারা জিয়াসের কথা সত্য না মিথ্যা তা যাচাই না করেই দেশে ফেরার পরিকল্পনা করতে থাকে, তাদের তুমি উপযুক্ত শিক্ষা দাও আত্রেউস পুত্র। তাদের তুমি যুদ্ধে নিয়ে যাও। ট্রয় জয়ের সংকল্পে অটল ও অটুট থাক তুমি। ওরা পশুর মত নিহত হোক সে যুদ্ধে। মনে করে দেখ ক্রোনাসপুত্র জিয়াস আমাদের কি সাফল্যের প্রতিশ্রুতি দেন নি, তিনি কি আমাদের যাত্রাপথের দক্ষিণ দিকে চকিত বিদ্যুতালোক দেখিয়ে সঙ্কেত দান করেন নি সে সাফল্যের? তবে কেন ব্যাপক মৃত্যু আর বিভীষিকার দ্বারা সম্পূর্ণরূপে ট্রয়নগরী ধ্বংস না করে, প্রতিটি ট্রয়বাসীকে হত্যা না করে, প্রতিটি ট্রয়বাসীর স্ত্রীকে শয্যাসঙ্গিনী না করে হেলেনের অপহরণের প্রতিশোধ না দিয়ে দেশে ফিরে যাবার কথা ভাবছ? এর পরেও কেউ যদি যেতে চায় তাহলে তাকে একা যেতে দাও, জাহান্নামে যাক সে। হে রাজন, আমাদের পরামর্শ শ্রবণ করুন, আপনার সেনাবাহিনীকে কয়েকটি দল বা শ্রেণীতে বিভক্ত করুন। প্রতিটি দল বা শ্রেণীতে থাকবে একজন করে নেতা। তখন আপনি বেশ বুঝতে পারবেন, কোন দল বা ব্যক্তি সাহায্য করছে আপনাকে আর কেইবা করছে বিরুদ্ধাচরণ। তখন বুঝবেন স্বর্গের চক্রান্ত বা মর্ত্যমানবের কাপুরুষতা–কোনটা দায়ী আপনার ব্যর্থতার জন্য। ট্রয়নগরী জয়ের পথে আসল বাধা কোথায়।
অ্যাগামেমনন তখন বললেন, নেস্টর, তুমি যে সমস্ত গ্রীকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পরামর্শদাতা সেকথা আমার প্রমাণিত করলে জিয়াস, এথেন অ্যাপোলো প্রমুখ স্বর্গের দেবদেবীর মধ্যে তোমার মত যদি পরামর্শদাতা পেতাম তাহলে অনেক আগে বিধ্বস্ত হত, আমাদের করায়ত্ত হত রাজা প্রিয়ামের ঐ ট্রয়নগরী। কিন্তু দেখ, অযথা কত বিবাদ ও বিসম্বাদ এনে দিয়েছেন জিয়াস আমাদের মধ্যে। যে বন্দিনীর ব্যাপারে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়েছি আমি আর অ্যাকেলিস সে ব্যাপারে প্রথমে আমারই উপর করা হয় চরম অবিচার। সমস্ত বিবাদ বিসম্বাদের অবসান ঘটিয়ে আবার যদি ঐক্যবদ্ধ হতে পারি আমরা তাহলে দেখবে ট্রয়বাসীরা একদিনের জন্যও ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না তাদের অনিবার্য ধ্বংসকে। সুতরাং আর বিলম্ব করো না। তোমরা প্রাতরাশ সেরেই ঢাল তরোয়াল বর্শা নিয়ে প্রস্তুত হয়ে যাও যুদ্ধের জন্য। অশ্বদের আহারের ব্যবস্থা করো, রথ প্রস্তুত করো। যাতে মুহূর্তের জন্য বিশ্রাম না করে সারাদিন ধরে রাত্রি না আসা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারি তার ব্যবস্থা করো। তোমাদের যে সব হাত অস্ত্র ধারণ করে থাকবে তা সিক্ত হয়ে উঠবে তোমাদের মস্তক নিঃসৃত ঘৰ্মে, তোমাদের রথবাহী অশ্বগণ হাঁপাতে থাকবে তোমাদের রথের সামনে। কিন্তু তা সত্ত্বেও যদি দেখি তোমাদের মধ্যে একজনও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করছে তাহলে অবশ্যই পরিণত হতে হবে কুকুর ও শকুনিদের শোচনীয় শিকারে।
অ্যাগামেমননের এই সব তেজোদ্দীপক ও বীরত্বব্যঞ্জক কথায় উল্লাস করতে লাগল গ্রীকগণ। দক্ষিণের মত্ত প্রভঞ্জনের আঘাতে উত্তাল হয়ে সমুদ্রতরঙ্গ যেমন তাদের উপকূলবর্তী বেলাভূমিকে অতিক্রম করার চেষ্টা করে, তেমনি তাদের জাহাজের আশেপাশে ছোটাছুটি করতে লাগল তারা। সঙ্গে সঙ্গে আগুন জ্বালিয়ে রন্ধনকার্য সেরে নিল। যাতে তারা সফল হতে পরে সেদিনের যুদ্ধে সেজন্য বিভিন্ন উৎসর্গের দ্বারা প্রীত করতে লাগল তাদের আরাধ্য দেবদেবীদের। রাজা অ্যাগামেমনন নিজে পাঁচ বছরের একটি হৃষ্টপুষ্ট বাছুরকে জিয়াসের উদ্দেশ্য বলি দিয়ে তার মাংস ভক্ষণের জন্য কয়েকজন রাজা ও রাজকুমারকে নিমন্ত্রণ করলেন। নিমন্ত্রিতদের মধ্যে ছিলেন নেস্টর, রাজা আইডোমেনেউস, অ্যাজাক্স ভ্রাতাগণ, টাইডেউস ও ওডিসিয়াস। মেনেলাস নিজে থেকেই এলেন। বলির চারিপাশে ঘিরে দাঁড়ালেন তাঁরা। যবের দানা হাতে ধরে দেবরাজ জিয়াসের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করতে লাগলেন রাজা অ্যাগামেমনন। তিনি জিয়াসের উদ্দেশ্যে বলতে লাগলেন, মত্ত প্রভঞ্জন আর আকাশের মেঘমালা যাঁর অনুগত বাহন, যিনি স্বর্গরাজ্যের সিংহাসনে সতত আরূঢ়, যিনি সারা দুলোক ভূলোকের মধ্যে সর্বোচ্চ গৌরব ও গরিমার অধিকারী, সেই জিয়াস প্রীত হয়ে আমাকে আশীর্বাদ করুন। রাজা প্রিয়ামের রাজপ্রাসাদের চূড়া ভূমিসাৎ না হওয়া পর্যন্ত ট্রয়নগরীর তোরণদ্বার ভস্মীভূত না হওয়া পর্যন্ত সূর্য যেন অস্ত না যায়, রাত্রি যেন পৃথিবীতে নেমে না আসে। আরও আশীর্বাদ করুন, আমার এই তরবারি যেন হেক্টরের বক্ষ ভেদ করে, আর তার সহকর্মীরা যেন ভূলুণ্ঠিত হয়ে মুমূর্ষ অবস্থায় ধূলিচুম্বন করতে বাধ্য হয়।
এইভাবে অনেক প্রার্থনা করলেন অ্যাগামেমনন। কিন্তু সে প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন জিয়াস। তবু ওরা দেবতাদের নামে উৎসর্গীকৃত বলির পশুগুলোকে কেটে প্রথমে তার উপর চর্বি মাখিয়ে আগুনে আহুতি দিল। পরে বাকি মাংসগুলো আগুনে ঝলসিয়ে পুড়িয়ে সকলে মিলে খেতে লাগল। মাংসের সঙ্গে সঙ্গে মদপান করলো।
পানাহার শেষ হলে বীর নেস্টর আবার বলতে লাগল, হে রাজন অ্যাগামেমনন, এখানে আর সময় নষ্ট না করে এখনি আমাদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়া উচিত। সৈন্যদের সমবেত করার জন্য ঘোষকদের আদেশ দিন।
রাজার আদেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমবেত হলো সৈন্যরা। ঘরে ফেরার সব বাসনা সহসা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে যুদ্ধের উত্তেজনায় মাতাল হয়ে উঠল তারা। পর্বতশিখরস্থ কোন অরণ্যদেশে প্রজ্জ্বলিত দাবাগ্নির আলো যেমন বহু দূরে থেকে দেখা যায় তেমনি সমবেত গ্রীকসৈন্যদের অস্ত্ররাজির উজ্জ্বলতা পরিদৃষ্ট হতে লাগল বহু দূর হতে। সেই সব গ্রীক সৈন্যদের দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোন বিশাল জলাশয়ে ইতস্তত সঞ্চরমান অসংখ্য বনহংস আনন্দের কলরব করছে প্রথম বসন্তের আগমনে। তাদের মধ্যে এক অতুলনীয় বীরত্বের ব্যঞ্জনায় মণ্ডিত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন গ্রীকবীর অ্যাগামেমনন।
অলিম্পাস পর্বতশিখরবর্তী স্বর্গলোকের অধিবাসিনী হে কাব্যকলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী মিউজ, যেহেতু তুমি মানবী নও দেবী, তুমি সুক্ষ্মশরীর সস্তৃতা, সর্বত্রবিরাজিনী, সর্বজ্ঞা, যেহেতু জাগতিক ও মহাজাগতিক যেকোন বস্তু বা ঘটনাই তোমার জ্ঞানগম্য–সেই বিরাট যুদ্ধের সকল তথ্য বিবৃত করো। যেহেতু আমরা মানুষ, দূরস্থিত অপরিদৃশ্য যে কোন বস্তু বা ঘটনার জ্ঞান একান্তভাবে পরোক্ষ ও অন্যজনবর্ণিত। বল দেবী, হে জিয়াসনন্দিনী, গ্রীকদের পক্ষে কারা সৈন্য পরিচালনা করে? সেই সব সেনানায়কদের নাম কি?
তবে তোমারই প্রসাদে তাদের নাম বিবৃত করছি শোন। সেই সব সেনানায়কদের মধ্যে ছিলেন পেনিলিয়ন, আর্মেসিলাস, প্রোথিনর ও ক্লোনিয়াস। এরা সবাই বোতিয়ান সৈন্যদের অধিকারক। সমগ্র গ্রীকসৈন্যরা তিন দলে ছিল বিভক্ত–এই তিন দলের নাম লো বোতিয়ান, ফোসিয়ান আর নোক্রিয়ান। ফোসিয়ান দলের অধিনায়ক ছিলেন স্কিজিয়স ও এপিস্ট্রোকাস। আর অয়লিয়াসপুত অ্যাজাক্স ছিলেন নোক্রিয়ান দলের অধিনায়ক। বেতিয়ান দল এনেছিল পঞ্চাশটি যুদ্ধজাহাজ। ফোসিয়ানদলে ছিল তিরিশ আর নোক্রিয়ান দল এনেছিল চল্লিশটি যুদ্ধজাহাজ।
এর উপর ইউবিয়ার ভয়ঙ্কর শক্তিশালী আবান্তে উপজাতিরাও যোগদান করেছিল এ যুদ্ধে। সঙ্গে এনেছিল পঞ্চাশটি যুদ্ধজাহাজ।
এথেন্সবাসীরাও যুদ্ধে কম পারঙ্গম নয়। জিয়াসকন্যা দেবী এথেনের আশীর্বাদধন্যা তারা। কারণ দেবী এথেনের স্নেহপালিত ইরেখযুসের বংশধর তারা । দেবী তাঁর মন্দিরে এই ইরেখথিয়ুসের বিগ্রহমূর্তি প্রতিষ্ঠা করার ব্যবস্থা করেন নিজে। বর্তমানে প্রবল পরাক্রমশালী অধৃষ্য বীর মেনেসথিয়াসের নেতৃত্বে যুদ্ধ করছে এথেন্সবাসীরা। রথচালনা ও পদাতিক সৈন্য পরিচালনার ক্ষেত্রে একমাত্র প্রবীণ যুদ্ধবিশারদ নেস্টর ছাড়া অন্য কেউ দ্বিতীয় সমকক্ষ নেই মেনেসথিয়ুসের। এই এথেন্সবাসীদের সঙ্গেও আছে পঞ্চাশটি যুদ্ধজাহাজ।
অ্যাজাক্সও সালামিস থেকে এনেছিল বারোখানা যুদ্ধজাহাজ। সেগুলো এথেন্সবাসীদের যুদ্ধ জাহাজের সঙ্গে মিলেমিশে একযোগে কাজ করে।
আর্গসবাসীরা যুদ্ধ করছে তাদের প্রধান ডাওমিডস-এর নেতৃত্বে। তারা সঙ্গে এনেছে আশিটি যুদ্ধজাহাজ। মাইসিনা, কোরিস্থ, ক্লিওমা, লাইসিয়ন প্রভৃতি নগরের অধিবাসীরা একশো যুদ্ধজাহাজ রাজা অ্যাগামেমননের হাতে দান করে। সমগ্র গ্রীসের অন্তর্ভুক্ত সমস্ত দেশ ও অঞ্চলের অধিপতিদের মধ্যে রাজা অ্যাগামেমননই ছিলেন বীরত্বে ও সফল গুণগরিমায় শ্রেষ্ঠ। ব্রোঞ্জনির্মিত বর্মপরিহিত অবস্থায় অ্যাগামেমনন যখন যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝে অবতীর্ণ হতেন তখন এক দেবোপম গৌরবে সমুজ্জ্বল দেখাত তাঁর সমগ্র মূর্তিটিকে। তিনি ছিলেন সর্বশেষ্ঠ নৃপতি ও ভূপতি–তার অধীনস্থ সৈন্যসংখ্যা যেমন ছিল অগণ্য তেমনি সমরোপকরণও ছিল প্রচুর।
যারা কারিস, স্পার্টা প্রভৃতি পাহাড়ে ঘেরা নিম্ন উপত্যকা ল্যাসিডিমনে, কপোত কূজিত অরণ্য প্রদেশ মিসেতে বাস করে অথবা যারা সমুদ্রপরিবৃত হেলাস ও এ্যামাইক্লী দ্বীপের অধিবাসী তারা অ্যাগামেমননের ভ্রাতা মেনেলাসের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। তারা এনেছিল ষাটটি জাহাজ। এই মেনেলাসই তাঁর স্ত্রী হেলেনের অপহরণের কলঙ্ক খলন ও প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য নিজে যুদ্ধে প্ররোচিত করতে থাকেন তারা অধীনস্থ জনগণ ও বিভিন্ন দেশের রাজন্যবর্গকে।
পাইলস, এরেন ও থাইরাসের অধিবাসীরাও এসেছিল। এই সব দেশে ছিল আলফিয়াস, টেলিয়াস, হেলস, ডোরিয়াম প্রভৃতি বড় বড় নদী। এই ডোরিয়াম নদীর তীরে এক বিশাল প্রান্তরে একবার গৃহে প্রত্যাবর্তনরত আত্মম্ভরী চারণকবি থামাইরিসের কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যায় চিরকালের তরে। কারণ থামাইরিস চেয়েছিল সঙ্গীতকলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী জিয়াসকন্যা এথেনকেও ছাড়িয়ে যাবে। এই সব দেশের লোকদের নেতৃত্ব করেছেন গ্রীক বীর নেস্টর।
বিরাট সুউচ্চ সিলেন পর্বতের পাদদেশে আর্কেডিয়ার বিশাল অরণ্য অঞ্চলে ফেনেউস, ও অর্কোমেনেউস প্রভৃতি নামে যে সব জাতি বাস করে, যাদের পশুপালনই একমাত্র জীবিকা এবং সমুদ্র সম্বন্ধে কোন ধারণা নেই তারাও কিছু জাহাজ এনে দিয়েছিল রাজা অ্যাগামেমননকে।
বাপ্রাসিয়াম ও এলিস নামক সমুদ্রের উপকূলভাগে ওলেন ও অ্যালোসিয়াস পাহাড়ের ধারে এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলের যারা অধিবাসী তাদের ছিল চারজন নেতা আর প্রত্যেকটি নেতার অধীনে ছিল দশটি করে অর্ণবপোত। এই সব নৌবাহিনীর প্রধান ছিলেন দুজন–অ্যাম্ফিমেকাস ও থ্যানপিয়াস। এই সব সমুদ্রকূলবর্তী অধিবাসীরাও সর্বতোভাবে সাহায করে রাজা অ্যাগামেমননকে।
এলিস সাগরের তীরে একিয়োন দ্বীপে যে ভালিসিয়াম জাতি বাস করে তাদের নেতা হলো দেবরাজ জিয়াসের প্রিয় কবি ফাউলিউসের পুত্র মেজিস। মেজিস তাঁর পিতার সঙ্গে বিবাদ করে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য চলে যান একিয়ান দ্বীপে। মেজিস ট্রয়যুদ্ধের জন্য তাঁর সঙ্গে এনেছিলেন চল্লিশটি যুদ্ধজাহাজ।
দেবরাজ জিয়াসের মতই বিজ্ঞ ও স্থিতপ্রজ্ঞ বীর ওডিসিয়াস ছিলেন ইথাকা দ্বীপ ও নেরিতুম অরণ্য অঞ্চলের অধিবাসী সিফ্যানেপিয়ানদের নেতা। এছাড়াও ক্রোসিয়ানিয়া, দুর্গম পার্বত্য এলাকা ঈজিনিগ, সামস, জ্যামিনথাম প্রভৃতি কতকগুলো রাজ্যের অধিপতি ছিলেন ওডিসিয়াস। তিনি এনেছিলেন বারোটি জাহাজ, প্রিউরণ, ওলিনাস পাইলিন, চ্যাসমিস প্রভৃতি সমুদ্রমধ্যবর্তী দ্বীপ এবং ক্যালিডন নামে পার্বত্য অঞ্চলের অধিবাসী ইতোনীয়া জাতির রাজা ছিলেন এলিমনপুত্র থোরাস। এই সব রাজ্যের মহান ঈনিউসের মৃত্যুর পর তাঁর কোন উত্তরাধিকারী না থাকায় থোয়াসকেই তাদের রাজারূপে বরণ করে নেয় ইতোনিয়ারা।
আনাসাস, গরতিস, লিকটাস, মাইনেতাস, লাইকামটাস প্রভৃতি পার্বত্য অঞ্চলে যে ক্রীটজাতি বাস করত তাদের রাজা ছিলেন প্রসিদ্ধ তীরন্দাজ আইডোমেনেউস। এই ক্রীটজাতির আইডোমেনেউস এনেছিল আশীটি জাহাজ।
হেরাকলসপুত্র নিপোলিমাস ছিলেন যুগপৎ অসাধারণ মানসিক ও দৈহিক শক্তিতে বলীয়ান। তিনি ছিলেন রোডস দ্বীপের রাজা এবং সঙ্গে এনেছিলেন নয়টি জাহাজ। এই রোডস রাজ্য ছিল লিভাস, লালিমাস ও কামাইরাস এই তিনটি পার্বত্য নগরীতে বিভক্ত। নিপোলিমাস যখন ছোট ছিলেন হেরাকলসরা থাকতেন সেলেইস নদীর তীরে ইফাইয়া অঞ্চলে। সেখান থেকে রোডসএ এসে বসবাস করতে থাকেন। কিন্তু জ্ঞাতি ভাইদের দ্বারা ক্রমাগত আক্রান্ত হওয়ার জন্য নির্বিঘ্নে রাজ্য সুখ উপভোগ করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না কোনমতে। তাই নিপোলিমাস বড় হয়ে তাঁর পিতার পিতৃব্য লাইসিমেনিয়াসকে হত্যা করে বহু রণতরী ও সৈন্য সংগ্রহ করে দূরে সমদ্রে পাড়ি দেন। বহু ঝড়ঝঞ্ঝা সহ্য করে পরে রোডস দ্বীপে ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেবরাজ জিয়াসের কৃপায় অতুল সৌভাগ্যের অধিকারী হন।
সাইম রাজ্যের রাজা নিরেউস এনেছিলেন মাত্র তিনটি রণতরী। ট্রয়যুদ্ধে যোগদানকারী সমস্ত গ্রীকরাজাদের মধ্যে রাজা চারোয়াস ছিলেন সবচেয়ে সুদর্শন অথচ সবচেয়ে শক্তিহীন। তাঁর সৈন্যবল নিতান্ত নগণ্য এবং সঙ্গে রণতরীও ছিল না। দেহসৌন্দর্যে একমাত্র অ্যাকেলিস ছাড়া কেউ তাঁর সমকক্ষ ছিল না। ইরিপাইলাস আর ক্যালিওনিয়া এই দুটি দ্বীপের মধ্যে ছিল তিনটি রাজ্য। তাদের নাম ছিল নিসাইরাস, ক্রেপাথাস আর কেসাস। এই তিনটি রাজ্যের রাজা ছিলেন থেসানামের কেইদিপাস আর অ্যান্টিফাস নামে দুই পুত্র। পেলেউসপুত্র ইকিলিস ছিলেন গ্রীসের মধ্যভাগে অবস্থিত পেলাসগিয়া, আর্গস, অ্যালস, অ্যালোপ ও ট্রেটিস–এই পাঁচটি রাজ্যের রাজা। এ ছাড়াও সুপ্রসিদ্ধ থিয়া ও হেলা রাজ্যও ছিল তাঁরই অধিকারে। এই হেলাস রাজ্য সুন্দরী নারীদের জন্য অর্জন করেছিল এক অসামান্য প্রসিদ্ধি। সারা গ্রীকদেশের মধ্যে এত সুন্দরী নারী আর কোথাও দেখা যেত না। এই হেলাস রাজ্যের অন্তর্গত সুন্দরী নারীদের বলা হত মার্মিডন, হেলেনিস আর একিয়ান। এই সব রাজ্য থেকে অ্যাকেলিস সংগ্রহ করে এনেছিলে পঞ্চাশটি জাহাজ। কিন্তু অ্যাকেলিস তাঁর বন্দিনী ব্রিসেইস-এর বিচ্ছেদে মর্মাহত হওয়ায় এখন তিনি যুদ্ধ পরিত্যাগ করে নির্জন চিন্তার অপরিমেয় বিষাদে নিমগ্ন হয়ে কালক্ষেপ করছেন তার জাহাজে। লাইমেনাসের রাজা মাইতেসকে পরাস্ত করে নিজের জীবন বিপন্ন করে সুন্দরী ব্রিসেইসকে বন্দী করে নিয়ে আসেন অ্যাকেলিস। সেই ব্রিসেইসের দুঃখে আজও কাতর তিনি।
কুসুমিত প্রান্তর, বিশাল তৃণভূমি ও মেষচারণ ক্ষেত্রসমন্বিত ফাইলেসম পাইরাসাম, দিমেতার, হটন ও সমুদ্রতীরবর্তী অ্যানটেন এর রাজা ছিলেন বীরযোদ্ধা প্রোতেসিলস। ট্রয়যুদ্ধে বিশেষ উৎসাহের সঙ্গে যোগদান করার সঙ্গে সঙ্গে জনৈক দার্দানীয় বীরের দ্বারা নিহত হন প্রোতেসিলস। তাঁর মৃত্যুতে তার বিধবা রাণীর সঙ্গে নিদারুণ শোকে মর্মাহত হয়ে পড়েছিল রাজ্যের অধিবাসীরা। পরে অবশ্য প্রোতেসিলসের কনিষ্ঠ ভ্রাতা পোদারসেস রাজ্যভার গ্রহণ করেন এবং চল্লিশটি রণতরী দিয়ে গ্রীকদের সাহায্য করেন ট্রয়যুদ্ধে।
পলিয়াসের সর্বাপেক্ষা সুন্দরী কন্যা অ্যালসেসটিসের গর্ভে ও অ্যাডেমনটিসের ঔরসে জাত অ্যামেলাস ছিলেন বোরিয়ান হ্রদের তীরে অবস্থিত ফেরাক্ল্যাফাইরা আর আইওলাস নগরীর রাজা। তিনি এনেছিলেন এগারটি জাহাজ।
মিথোন, থার্মাসিয়া, মেনিবিয়া আর উষর পার্বত্য অঞ্চলে ওলিজনে যেসব উপজাতি বাস করত তাদের রাজা ছিলেন সুদক্ষ তীরন্দাজ ফিলোকটেটস। এই ফিলোকটেটস সাতটি জাহাজ দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু ট্রয়যুদ্ধে যোগদান করার জন্য ফিলোকটেটস যখন তাঁর যুদ্ধজাহাজ আর সৈন্যসামন্ত নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন দুর্ভাগ্যক্রমে তাঁকে লেমস দ্বীপে এক নিষ্ঠুর জলজ সর্প দংশন করে। তিনি দুঃসহ যন্ত্রণায় এমনই কাতর ও উত্থানশক্তিরহিত হয়ে পড়েন যে তাঁর দলের লোকেরা সেখানেই তাঁকে একাকী ফেলে রেখে চলে আসতে বাধ্য হয়। আর তার প্রজারা তখন মেডন নামে এক নতুন নেতাকে নির্বাচন করে নেয়। এই মেডন অর্লিয়াসের অবৈধ পুত্র। ওরা এনেছিল তিরিশটি জাহাজ। ত্রিওকা, পার্বত্য অঞ্চল ইথোম আর ইচালিয়ার অধিবাসী তাদের শাসনকর্তা ছিলেন চিকিৎসাশাস্ত্রবিশারদ এসক্লিপিয়ামের দুই পুত্র পোদালিরিয়াস আর মেকাওন। ইউমনপত্র ইউরিপাইলাস ছিলেন ওর্মনিয়াম, হাইপেরিয়া ঝর্ণা আর অ্যান্টারিয়ামের অধিবাসীদের রাজা। তিনি এনেছিলেন চল্লিশটি জাহাজ।
পিরিথেয়াসপুত্র বীর যোদ্ধা পোলিপিটেস ছিলেন আর্গিস্যা, গার্টোন, ওর্থি, এলোন আর শুভ্রধবল নগরী ওলোসনের রাজা। পোলিপিটেস ছিলেন হিপ্পাডোমিয়ার গর্ভে জাত দেবরাজ জিয়াসের পুত্র। তাঁর জন্ম হয় সেইদন যেদিন পিরিহোয়া দুর্ধর্ষ পার্বত্য উপজাতিদের উপর প্রতিশোধ নিয়ে সেন্ট পেলিয়ন পাহাড় থেকে আর্থিসেস অঞ্চলে তাড়িয়ে দেন। পোলিপিটেস এনেছিলেন চল্লিশটি জাহাজ।
সুদূর সাইফাস থেকে রাজা গুনেউস এনেছিলেন বাইশটি জাহাজ। তার সঙ্গে এসেছিল বীর এনিয়েনস আর পেরাবি। তাঁরা ছিলেন শীতপ্রধান জোদোদা আর সুন্দর তিতারিসিয়াস নদীর দ্বারা বিধৌত সমগ্র অঞ্চলের অধিবাসী। তিতারিসিয়াম ছিল স্টাইক্স নদীর শাখা এবং তার সব জল গিয়ে পড়ে পেলেউস নদীর রজতশুভ্র জলে।
তেন্দ্রেদনপুত্র দ্রুতগামী প্ৰােহয় ছিলেন ম্যাগনেতজাতির নেতা। এই ম্যাগনেতজাতি ছিল মাউন্ট পেলিয়ন পর্বতের পাদদেশে পেলেউস নদীবিধৌত এক বিশাল অঞ্চলের অধিবাসী। পোথয় ছিলেন তাদের শাসনকর্তা। তারা এনেছিল চল্লিশটি জাহাজ।
পূর্ববর্ণিত এই সব ব্যক্তিগণ ছিল গ্রীকপক্ষে যোগদানকারী রাজা মহারাজাদের দল। হে কাব্যকলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী, বল দ্বারা আত্রেউসপুত্রদের অনুসরণ করেছি ট্রয়যুদ্ধে তাদের মধ্যে কে ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ এবং যুদ্ধনিযুক্ত অশ্বদের মধ্যে কোন অশ্ব ছিল সর্বাপেক্ষা বলিষ্ঠ ও বেগবান।
ফেরেসের অশ্ব দুটি ছিল সর্বাপেক্ষা সুন্দর। এই সব অশ্বগুলো চালিত হত এমেনাসের দ্বারা এবং তারা ছিল পাখির মত দ্রুতগামী। অশ্ব দুটি ছিল একই বয়সের, তাদের উচ্চতা ছিল এক এবং তাদের গাত্রবর্ণ ছিল একই ধরনের। এই দুটি অশ্ব ছিল ঘোটকী। অ্যাপোলো এই দুটি ঘোটকীর জন্মদান করেন পেরিয়া নামক জায়গাতে। এই দুটি ঘোটকীই দেবাশ্ব অ্যারেসের মত রণক্ষেত্রে ছিল দুর্দমনীয়। অ্যাকেলিসের পর তেলামনপুত্র অ্যাজাক্সই হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ বীর। অ্যাকেলিসের কয়েকটি দ্রুতগামী অশ্ব ছিল। কিন্তু অ্যাগামেমননের সঙ্গে বিবাদবশত যে ক্রোধ তাঁর মধ্যে সঞ্জাত হয়েছিল তা কখনো প্রশমিত না হওয়ার জন্য তিনি তখনো যুদ্ধ হতে বিরত ছিলেন। আর একিলেসের এই যুদ্ধবিমুখতা দেখে তাঁর সৈন্যসামন্ত সমুদ্রতীরে ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কেউ কেউ বর্শা তীর নিয়ে লক্ষ্যভেদ শিক্ষা করছিল। তাদের অশ্বগুলো বাঁধা ছিল রথের পাশে। রথী ও সারথিরা উপযুক্ত নেতার অভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছিল উদ্দেশ্যহীনভাবে।
বজ্রদেবতা প্রেরিত টাইফাস ঝড়ের প্রহারে যেমন জর্জরিত হয় পৃথিবী ঠিক তেমনি গ্রীকসৈন্যদের পদভারে পীড়িত হয়ে আর্তনাদ করতে লাগল মেদিনী।
ট্রয়বাসীদের এক দুঃসংবাদ দান করার জন্য বাতাসের মত দ্রুতগামী আইরিসকে পাঠালেন দেবরাজ জিয়াস। রাজা প্রিয়ামের তোরণদ্বারে ট্রয়নগরীর সমস্ত যুবা ও বৃদ্ধরা সমবেত হল প্রিয়ামের পুত্র পোলাইটেসের কণ্ঠে কথা বলতে লাগল আইরিস। প্রিয়ামপুত্র পোলাইটেস সমাধিস্তম্ভের উপর প্রহরারত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতেন। অবিকল পোলাইটেসের কণ্ঠে বলতে লাগলেন আইরিস, হে বৃদ্ধ রাজন, আপনি এই যুদ্ধের কালে অলসভাবে শান্তির কথা বলছেন। জীবনে অনেক যুদ্ধে আমি যোগদান করেছি; কিন্তু আপনাদের শত্রুপক্ষীয় এই অগ্রসরমান গ্রীকসৈন্যদের মত দুর্ধর্ষ সৈন্য কখনো দেখি নি। এই ট্রয়নগরী আক্রমণ করার জন্য তারা বৃক্ষপত্র অথবা বেলাভূমিস্থিত বালুকারাশির মত সমবেত হয়েছে এই সম্মুখস্থ প্রান্তরভূমিতে। হে বীরপুঙ্গর হেক্টর, আমি অন্যান্য সকলের মধ্যে তোমাকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন মিত্রশক্তি হিসেবে বিভিন্ন ভাষাভাষি অঞ্চলের বহু সৈন্য এসেছে। তুমি তাদের প্রধানদের বল, তারা যেন আপন আপন সেনাদলকে শ্ৰেণীবদ্ধ ও সুসজ্জিত করে তাদের যুদ্ধে নিযুক্ত করেন।
হেক্টর বুঝতে পারলেন এ কণ্ঠ কার। তিনি সভা ভঙ্গ করে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রসজ্জায় সজ্জিত হয়ে উঠল সকলে। সমস্ত নগরদ্বার হলো উন্মুক্ত। দলে দলে সমবেত হতে লাগল অসংখ্য অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈন্যের দল।
ট্রয়নগরী সম্মুখে এক বিশাল প্রান্তরের মাঝে পর্বতোপম যে এক সুউচ্চ প্রস্তর আছে নরলোকে তা বাতিয়া নামে অভিহিত হলেও দেবতারা তাকে একদা প্রসিদ্ধ নৃত্যশিল্পী মাইরিনের সমাধিস্তম্ভ বলে মনে করেন।
এই প্রস্তরখণ্ডের সন্নিকটেই ট্রয়বাসী ও তাদের মিত্রশক্তির সম্মিলিত বিশাল বাহিনী শ্রেণীভুক্ত হয়ে ধাবিত হতে থাকে বিভিন্ন দিকে।
উজ্জ্বল শিরস্ত্রাণপরিহিত যুদ্ধে অপধৃষ্য প্রিয়ামপুত্র বীর হেক্টর ছিলেন ট্রয়জাতির সর্বাধিনায়ক এবং দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর সৈনিকগণ ছিল তাঁর অধীনে।
প্রসিদ্ধ দার্দানীয় সৈন্যদের চালনা করে বীর ঈনিস। এই বীর ঈনিসের জন্ম হয় দেবী এ্যাফ্রোদিতের গর্ভে ও অ্যাঙ্কিসেসের ঔরসে। কামদেবী অ্যাফ্রোদিতে দেবী হলেও একবার সহসা মদচঞ্চল হয়ে আইডা পর্বতের নির্জন ঢালদেশে সুরতক্রিয়ায় মত্ত হয়ে ওঠেন অ্যাঙ্কিসেসের সঙ্গে। বীর ঈনিসকে সৈন্যপরিচালনার কাজে সহায়তা করতে থাকেন যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী অ্যান্টিনরের দুই পুত্র আর্কিলোকাস ও অ্যাকামাস।
আইডা পর্বতের নিম্নদেশে জেলিয়া অঞ্চলে যারা বাস করত, যারা খেত নির্মলসলিলা ঈসিপাস নদীর জল এবং যাদের শিরায় প্রবাহিত হয় ট্রয়জারিত রক্ত তাদের অধিনায়ক ছিলেন লাইকাওনপুত্র পান্ডারাস। এই লাইকাওনকে কদিন অ্যাপোলো স্বয়ং ধনুর্বিদ্যা শিক্ষা দান করেন।
তেরীয়া পর্বতসংলগ্ন পার্বত্য অঞ্চলে আন্দ্রেস্তিয়া ও অ্যাপিয়াসাসের অধিবাসীরা পরিচালিত হয় আদ্ৰেস্তান ও অ্যাম্ফিয়াসের দ্বারা। তারা ছিলেন পার্কোতের রাজা মেরোপের পুত্র। মেপে ছিলেন ভবিষ্যৎদ্রষ্টা। ট্রয়যুদ্ধে যোগদান করতে পুত্রদের নিষেধ করলেন মেরোপ। কিন্তু তাঁর পুত্রেরা কর্ণপাত করেন নি, কারণ ছলনাময়ী নিয়তি তাঁদের দুর্বারবেগে নিয়ে যায় ধ্বংসের পথে।
পার্কোত, প্র্যাকটিয়াস, সেস্টস অ্যাকাইডস ও অ্যাসিরের অধিবাসীরা যুদ্ধ করে বীর সেনানায়ক হার্টাকাসপুত্র অ্যাফিয়াসের অধীনে।
হিপ্লোময় আর তার ভাই পাইলিয়াস নেতৃত্ব দান করেন উর্বর ভূখণ্ড লরসার অধিবাসী পেলাসপিয়ার পার্বত্য উপজাতিদের। দূর হেলেসপন্ট উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে যে থেসিয়ান জাতি এসেছিল তাদের সেনাপতিত্ব করেন বীর যোদ্ধা অ্যাকামাস ও পীরোয়াস।
বর্শাযুদ্ধে অপরাজেয় সিওনিয়াস জাতির অধিনায়ক ছিলেন টোজেনিয়াসপুত্র ইউফেমাস।
স্বচ্ছ সাবলীল স্রোতোবিশিষ্ট সুপ্রশস্ত বিশাল অ্যাক্সিয়াস নদীর তীরবর্তী সুদূর অ্যামাইডন থেকে পিওনয়ান নামে যে তীরন্দাজ জাতি এসেছিল তাদের নেতা ছিলেন পাইরেকমিস।
এনে থেকে যে পেফ্লাগনিয়ান জাতি এসেছিল তাদের সর্বাধিনায়ক ছিলেন কঠোরহৃদয় অসমসাহসী পাইলেমেনেস। এনেতের বিশাল পশুচারণক্ষেত্রে বহু উন্মুক্ত খচ্চর ইতস্তত ঘুরে বেড়ায়। এই পাইলেমেনেস ছিলেন সাইটোরিয়াস ও পার্থেনিয়াস নদীর তীরবর্তী বহু নগর ও সেসামাসের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের শাসনকর্তা।
রৌপ্যখনিসমৃদ্ধ সুদূর অ্যালিবের অধিবাসী হ্যাঁনিজোনি জাতির সেনানায়ক ছিলেন ওডিসিয়াস অপিসট্রোফাস।
ক্রোমিস তার ভবিষ্যদ্বক্তা এন্নোবাস ছিলেন মাইসিয়ান জাতির সামরিক অধিকর্তা। কিন্তু নিজে ভবিষ্যদ্বক্তা হয়েও নিজেকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে পারেন নি এন্নোবাস। গ্রীকবীর ঈকাসের পুত্রের হাতে তিনি নিহত ও নদীগর্ভে নিক্ষিপ্ত হন।
এসকানিয়ার অধিবাসী ফার্জিয়ানদের নেতৃত্ব করেন ফোরেস আর মহান এসকানিয়াস।
গীজিয়া হ্রদের তীরে যার জন্ম হয় সেই ট্যাপেমেনেসের পুত্র মেসথেনস ও আন্টিফাস ছিলেন মেকনিয়ানদের সেনাপতি। এই মেকনিয়ানরা ছিল মোনাস পাহাড়ের অধিবাসী।
অদ্ভুত ভাষাভাষি জাতি ক্যারিয়ানদের নেতা ছিলেন নেসলস। নেসলস মাইনেতাস থাইরেস পর্বতসংলগ্ন বিশাল অরণ্যভূমি, মিকাস নদীর তীরবর্তী অঞ্চল ও মাইতেনের পাৰ্তব্যভূমির অধিপতি নোমিয়নের দুই পুত্র নেসলস ও অ্যাম্ফিমেকাস ছিলেন উপরোক্ত পর্বত নদীসংলগ্ন সমগ্র ভূখণ্ডের অধিপতি। নোমিয়নের হাতে ছিল প্রচুর স্বর্ণ। স্বর্ণাভিমানী নোমিয়ন নিজের জীবন থেকে বড় করে দেখতেন তাঁর স্বর্ণপুঞ্জকে। এই স্বর্ণ রক্ষার জন্য তাঁর প্রাণবিয়োগ হয় ঈকাসের হাতে আর তখন অ্যাকেলিস তাঁর সেই সঞ্চিত সমস্ত স্বর্ণ নিয়ে চলে যান।
জ্যানথিয়াস নদীর উজান বেয়ে ট্রয়যুদ্ধে যোগদানের জন্য সুদূর লাইসিয়ার অধিবাসীদের নিয়ে এসেছিলেন সার্পেডন আর গুকাস।