নদীতীরের যুদ্ধ

যুদ্ধরত অবস্থায় এগিয়ে যেতে যেতে জিয়াসপুত্র জ্যানথাস নদীর মোহনার কাছে এসে উপনীত হলেন অ্যাকেলিস। এইভাবে এসে শত্রুসৈন্যদলকে দুইভাবে বিভক্ত করে দিলেন। তাদের একটি দলকে ট্রয়নগরী অভিমুখে বিতাড়িত করে নিয়ে যেতে লাগলেন। গতকাল যেখানে বিজয়গৌরবে গৌরবান্বিত হেক্টরের নেতৃত্বে একদল ট্রয়সেনাদের হাতে নির্জীত হয়ে সন্ত্রস্ত অবস্থায় পালাচ্ছিল গ্রীকসেনাদল এবং দেবী হেরা তাদের একরাশ ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন করে তাদের পলায়নে সহায়তা করেন, আর সেইখানে গ্রীকসেনাদের হাতে নির্জীত হতে লাগল ট্রয়সেনাগণ। ট্রয়সৈন্যগণ আর একটি দল নদীর ধরে এসে আর পথ খুঁজে পেল না। কোনদিকে পথ না পেয়ে নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা। তাদের ভীতিবিহ্বল চিৎকারে নদীবক্ষে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল। তৃণক্ষেত্র অগ্নিসংযুক্ত হলে যেমন নিকটবর্তী কোন নদীবক্ষে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে যায় পঙ্গপালের দল, তেমনি অ্যাকেলিসের দ্বারা আক্রান্ত ট্রয়সেনাদল ও অশ্বের দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে উঠল জ্যানথাস নদীর জল।
অ্যাকেলিস তখন তাঁর প্রকাণ্ড বর্শাটি নদীতীরস্থ একটি ঝোঁপের ধারে রেখে শুধু তরবারি হাতে নদীর জলে নেমে গেলেন। সেই তরবারি হাতে নদীর মাঝে চারিদিকে তাড়া করে নিয়ে যেতে লাগলেন তিনি শত্রুসেনাদের। তাঁর সুতীক্ষ্ণ তরবারির অব্যর্থ আঘাতে মুমূর্ষ ট্রয়সেনারা আর্তনাদ করতে লাগল। তাদের অমিত রক্তধারায় লাল হয়ে উঠল জ্যানথাস নদীর জল। মৎস্যভক্ষণকারী কোন বিশাল জন্তুর হাত থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য মাছগুলো যেমন যেদিকে সেদিকে ছুটে পালাতে থাকে তেমনি অ্যাকেলিসের আক্রমণ হতে আত্মরক্ষার জন্য নদীতীরের দিকে পালাতে লাগল ট্রয়সৈন্যরা। অসংখ্য শত্রুসৈন্যকে একের পর এক করে হত্যা করে ক্লান্ত হয়ে পড়ল যখন অ্যাকেলিসের বাহু দুটি। তখন তিনি প্যাট্রোক্লাসের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ উদ্দেশ্যে বারোজন ট্রয়যুবককে জীবন্ত ধরে নিয়ে তাদের হাতগুলো বেঁধে তাদের গ্রীকজাহাজে পাঠিয়ে দিলেন।
তারপর আরও শত্রুরক্তক্ষয়ের জন্য নদীবক্ষে আবার ঝাঁপ দিলেন। এমন সময় অ্যাকেলিস দেখলেন অন্যতম প্রিয়ামপুত্র লাইকাওন জল থেকে উঠে পালাবার চেষ্টা করছে। এই লাইকাওন যখন একবার অ্যাকেলিসের পিতার শস্যক্ষেত্রে কোন এক রাত্রিতে একটি ডুমুরগাছ কাটছিল তার রথনির্মাণের জন্য তখন অ্যাকেলিস তাকে ধরে ফেললেন। পরে তাকে বন্দি অবস্থায় লেমন দ্বীপে জেসনের কাছে বিক্রি করেন। কিন্তু প্রিয়াম পরিবারের অন্যতম বন্ধু ইমব্রস নিবাসী এইডন তখন প্রচুর টাকার বিনিময়ে লাইকাওনকে মুক্ত করে অ্যারিসবেতে পাঠিয়ে দেন। অ্যারিসবে থেকে লাইকাওন পালিয়ে আসে তার পিতার কাছে। লেমন দ্বীপ থেকে ফিরে আসার পর এগার দিন সুখে শান্তিকে যাপন করে লাইকাওন; কিন্তু বারো দিনের দিন আবার সে পড়ে যায় অ্যাকেলিসের হাতে। অ্যাকেলিস দেখলেন লাইকাওন নিরস্ত্র। কারণ সে তার ঢাল, শিরস্ত্রাণ ও বর্শা সব নদীতীরে রেখে ঝাঁপ দেয় জলযুদ্ধে। এবার নিবিড় রণক্লান্তিতে বিবশ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়ে উঠে যাচ্ছিল সে নদীবক্ষ হতে।
তখন অ্যাকেলিস বিস্মিত হয়ে আপন মনে বলতে লাগলেন, কী আশ্চর্যজনক ঘটনাই তা প্রত্যক্ষ করছি। লেমস দ্বীপে যাকে একদিন বিক্রি করা হয় সে যদি আজ সেখানে থেকে সমুদ্রের অনন্ত জলরাশির বাধা অবলীলাক্রমে অতিক্রম করতে পারে তাহলে যেসব ট্রয়সৈন্যকে আমি হত্যা করেছি তারাও উঠে আসবে মৃত্যুপুরী থেকে। এবারে কিন্তু তাকে আমার বর্শার আস্বাদন করতেই হবে। এবার আমি দেখব মৃত্যুপুরী তাকে ধরে রেখে দিতে পারে কিনা।
এইভাবে অ্যাকেলিস যখন শান্ত মনে চিন্তা করছিলেন তখন লাইকাওন তার কাছে এসে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরল। তাকে হত্যা করার মানসে যে বর্শাটি উৎক্ষিপ্ত করেছিলেন অ্যাকেলিস এক হাতে সেই বর্শাটি ধরে ও অন্য হাতে অ্যাকেলিসের একটি পা ধরে জীবনভিক্ষা করছিল অতৃপ্ত জীবনপিপাসায় আর্ত লাইকাওন। সে অনুনয় বিনয় করে বলল, অ্যাকেলিস, আমাকে বিক্রয় করে তুমি একদিন একশোটি বলদ লাভ করো। তার তিনগুণ অর্থ দান করে তার বিনিময়ে মুক্তি পাই আমি। অশেষ দুঃখ কষ্ট ভোগ করে মাত্র বারো দিন আগে এখানে আসি আমি। কিন্তু আমার প্রতি ঘৃণাবশত জিয়াস আবার আমাকে তোমার হাতে সঁপে দিলেন। আমার মাতা অ্যাটলাসকন্যা লাওমীর গর্ভে স্বল্পায়ুরূপেই জন্মগ্রহণ করি আমি। সাতনিউসিস নদীর ধারে খাড়াই পাহাড়ের উপর অবস্থিত পোদাদাস রাজ্যে রাজা বৃদ্ধ অ্যাটলাসের কন্যাকে বিবাহ করেন রাজা প্রিয়াম। সেই বিবাহের ফলে দুটি পুত্রসন্তান প্রসব করেন আমার মাতা। তার মধ্যে পরিডোয়াসকে আগেই হত্যা করেছ তুমি। আর আমি জানি আমাকে যখন দেবতারা আবার তোমার হাতে অর্পণ করেছেন তখন আমিও পরিত্রাণ পাব না তোমার হাত থেকে। তবু বলছি, আমাকে মুক্তি দাও, কারণ যে হেক্টর তোমার বীর সহকর্মীকে হত্যা করেছে আমি তার সহোদর ভাই নই।
প্রিয়ামপুত্র লাইকাওনের এই কাতর আবেদনের উত্তরে কঠোরভাবে অ্যাকেলিস বললেন, ওহে নির্বোধ,আমার কাছে মুক্তির বিনিময়ে উপঢৌকনের কথা বলো না। যতক্ষণ প্যাট্রোক্লাস নিহত হয় নি আমি যুদ্ধ হতে বিরত থেকে ট্রয়বাসীদের অনেক সুযোগ দিয়েছি, বহু বন্দিকে জীবিত অবস্থায় বিক্রি করেছি। কিন্তু এর যারা আমার হাতের কাছে এসে পড়বে তারা কেউ বাঁচতে পারবে না। প্রিয়ামপুত্রদের সঙ্গে ট্রয়বাসীদেরও মরতে হবে। সুতরাং বন্ধু, তোমাকেও মরতে হবে। কিন্তু কেন তুমি এত কাতর হচ্ছ মরতে? প্যাট্রোক্লাস তোমার থেকে অনেক যোগ্য ব্যক্তি ছিল, সে মরেছে, আর এই যে আমাকে দেখছ কত বড় বীর আর কেমন সুন্দর সুদর্শন-আমি এক মহান পিতার সন্তান এবং একজন দেবী আমার মাতা। কিন্তু অন্যান্য মানুষের মত মৃত্যুর করাল ছায়া আমার উপরেও পতিত হয়েছে। এমন একদিন আসবে যেদিন সকাল সন্ধ্যা অথবা বেলা দ্বিপ্রহর কালে এই যুদ্ধক্ষেত্রে কোন না কোন শত্রুসৈন্যদের নিক্ষিপ্ত বর্শা অথবা তীরের আঘাতে জীবনাবসান ঘটবে আমার।
অ্যাকেলিসের একথায় হতাশায় ম্রিয়মান হয়ে উঠল লাইকাওন। অ্যাকেলিসের বর্শাটি ছেড়ে দিয়ে মাটিতে বসে পড়ল আর অ্যাকেলিস তখন তাঁর তরবারিটি আমূল বসিয়ে দিলেন তার দেহে। তারপর তার পা ধরে তার মৃহদেহটি টেনে নদীর জলে ফেলে দিয়ে বললেন, যাও, স্কামান্দার নদীর জল তোমাকে টেনে নিয়ে যাবে সমুদ্রের বুকে, সেখানে অসংখ্য মাছ জলের তলায় তোমার দেহটিকে ঠুকরে ঠুকরে খাবে। এইভাবে যতদিন পর্যন্ত আমি ইলিয়াম দুর্গ জয় করতে পারি ততদিন তোমার মতই বহু ট্রয়বাসীকে নিহত হতে হবে আমার হাতে। যে সব নদীর উদ্দেশ্যে বলদ,অশ্ব প্রভৃতি বহু জীবন্ত পশু উৎসর্গ করে তাদের জলে ফেলে দিয়েছ সেই সব নদীর রজতশুভ্র প্রশস্ত বক্ষ রক্ষা করতে পারবে না তোমাদের। তোমাদের মধ্যে এমন একজনও কেউ নেই যে আমার যুদ্ধবিরতিকালে নিহত প্যাট্রোক্লাস ও অসংখ্য গ্রীকসেনার মৃত্যু সমগ্র ঋণ পরিশোধ করতে পারে।
অ্যাকেলিস যখন এই সব কথা বলছিলেন তখন এক প্রচণ্ড ক্রোধের উচ্ছ্বাসে ফুলে ফুলে উঠছিল স্কামান্দার নদীর জল। অ্যাকেলিসকে প্রতিহত করে ট্রয়বাসীদের হাত থেকে উদ্ধার করতে চাইছিল স্কামান্দার। এদিকে অ্যাকেলিস বর্শা হাতে পেলিগন পুত্র অ্যাসটারোপীয়াসকে হত্যা করতে উদ্যত হলেন। পেলিগণ ছিলেন সর্বাপেক্ষা সুন্দর নদী এস্কিয়াসের পুত্র। জ্যানথান নদীর জলে অ্যাকেলিস বহু ট্রয়যুবককে হত্যা করার জন্য তাঁর উপর ক্রুদ্ধ হয়ে জ্যানথাস সাহস সঞ্চার করতে লাগলেন অ্যাসটারোপীয়াসের মনে। অ্যাকেলিস কাছে এসে অ্যাসটারোপীয়াসকে বললেন, কোন সাহসে তুমি আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছ? ধিক তোমার পিতামাতাকে!
অ্যাসটারোপীয়াস তার উত্তরে বলল, কেন তুমি আমার বংশ পরিচয় জিজ্ঞাসা করছ? উর্বর দেশ পীওনিয়া আমার নিবাস। মর্ত্যভূমির উপর প্রবাহিত সকল নদীর মধ্যে সুন্দর অ্যাক্সিয়াস শেলিগন নামে যে বীর পুত্রের জন্ম দান করেন সেই পেলিগনই আমার পিতা।
অ্যাকেলিস তাঁর প্রতি বর্শা নিক্ষেপ করতেই অ্যাসটারোপীয়াস তার দুই হাতে ধৃত দুটি বর্শা একসঙ্গে নিক্ষেপ করল। একটি বর্শা অ্যাকেলিসের ঢালে লেগে দেবদত্ত স্বর্ণস্তরে প্রতিহত হলো। আর একটি বর্শা অ্যাকেলিসের দক্ষিণ বাহুগর্ভের চর্মতৃক ছিন্ন করে পাশ দিয়ে চলে গেল। অ্যাকেলিস তখন আবার বর্শা নিক্ষেপ করতেই সে বর্শাটি নদীতীরের মাটিতে গেঁথে গেল। এবার তরবারি কোষমুক্ত করে তাই দিয়ে আক্রমণ করলেন অ্যাকেলিস। অ্যাসটারোপীয়াস যখন ঝুঁকে পড়ে নদীতীরের মাটি হতে অ্যাকেলিসের বর্শাটি তোলার চেষ্টা করছিল, তখন অ্যাকেলিস তাঁর তরবারিটি তার উদরদেশে আমূল বসিয়ে দিলেন। তার বর্মটি খুলে নিয়ে অ্যাকেলিস সদম্ভে বললেন, তুমি নদীর পুত্র হলেও আমি হচ্ছি ক্রোনাসপুত্রের বংশধর, কারণ পিতামহ ঈয়াকাস ছিলেন জিয়াসের পুত্র। তোমার মাঝেই রয়েছে এক বিশাল নদী। কিন্তু যে জিয়াসের সঙ্গে একিনোয়াসের মত রাজা ওসিয়ানসের মত শক্তিধর নদী যুদ্ধ করার সাহস পায় না সেই জিয়াসের বংশধরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে আসা উচিত নয় তোমাদের। জিয়াসের দ্বারা বিচ্ছুরিত বজ্রকে ভয় পায় না এমন কেউ নেই।
নদীর চরে পড়ে থাকা অ্যাসটারোপীয়াসের মৃতদেহটিরে উপর দিয়ে নদীতরঙ্গগুলো যখন প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছিল তখন অসংখ্য মাছ সে দেহটিকে ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছিল। এবার তাদের নেতার মৃত্যুতে ছত্রভঙ্গ ও হতোদ্যম পীওনিয়াবাসীদের আক্রমণ করলেন অ্যাকেলিস। এই আক্রমণকালে তিনি থার্সিলোকাস, মাইডন, অ্যানথাই, পাইলাস, মেনেমাস, থেসিয়াস ও ওফেলেটেসকে হত্যা করলেন। তিনি হয়ত এইভাবে আরও অনেককেই হত্যা করতেন যদি না জ্যানথাস নদী জলের গম্ভীর হতে উঠে এসে মানবমূর্তি ধারণ করে অ্যাকেলিসকে সম্বোধন করে বলতেন, হে অ্যাকেলিস, তুমি শুধু শক্তিতে নয়, নিষ্ঠুরতাতেও অদ্বিতীয়। দেবতাদের কৃপায় তুমি যদি ট্রয়বাসীদের নিঃশেষে ধ্বংস করাতে চাও তাহলে অন্তত আমার বক্ষস্থল হতে উঠে স্থলভাগে গিয়ে তোমার এই ভয়াবহ ধ্বংসকাৰ্য্য সাধন করো। তুমি আমার জলে এত লোক হত্যা করেছ যে অসংখ্য মৃতদেহের স্থূপে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে আমার গতি, যার ফলে আমি সমুদ্রে যাবার কোন পথ খুঁজে পাচ্ছি না। আমার নির্মল জল হয়ে উঠেছে। ভয়াবহভাবে দূষিত। সুতরাং হে বীর সেনাপতি, আমার জলে হত্যাকার্য চালিয়ে গিয়ে আমাকে আর কষ্ট দিও না।
অ্যাকেলিস উত্তর করলেন, তাই হোক জিয়াসসন্ততি স্কামান্দার, তবে জেনে রেখো, আমি সমস্ত ট্রয়বাসীকে তাদের অবরুদ্ধ করে না রাখা পর্যন্ত যুদ্ধ থামাব না। আমি হেক্টরের সম্মুখীন হয়ে জানতে চাই কে কাকে পরাজিত করবে?
এই কথা বলা শেষ করে আবার ট্রয়সেনাদের উপর আক্রমণ শুরু করলেন অ্যাকেলিস। স্কামার তখন অ্যাপোলোকে বললেন, হে জিয়াসতনয়, তুমি নিশ্চয়ই জিয়াসের নির্দেশ মেনে চলছ না, কারণ তিনি সন্ধ্যাকাল সমাগত না হওয়া পর্যন্ত ট্রয়বাসীদের সাহায্য করতে বলেছিলেন তোমাকে।
ইতিমধ্যে তীর হতে মধ্যনদীতে আবার ঝাঁপিয়ে পড়লেন অ্যাকেলিস। তখন স্কামার নদীও এক বিরাট ঢেউ তুলে আক্রমণ করলেন অ্যাকেলিসকে। প্রথমে সেই ঢেউটি অ্যাকেলিসের চারিপাশি এমনভাবে উত্তাল হয়ে উঠল যার ফলে নদীর জলে পা রেখে দাঁড়াতে পারছিলেন না অ্যাকেলিস। তাঁর ঢালটিকেও ধরে রাখতে পারছিলেন না। তীরসংলগ্ন একটি এলমগাছকে অবলম্বন হিসেবে হাত বাড়িয়ে ধরলেন অ্যাকেলিস। কিন্তু সেই বিশাল ঢেউটি গাছটিকে উপড়িয়ে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। অ্যাকেলিস তখন নদী থেকে উঠে ভয়ে পালাতে লাগলেন।
কিন্তু তথাপি সেই কৃষ্ণকায় নদীতরঙ্গটি পশ্চাদ্ধাবন করতে লাগল অ্যাকেলিসের। তার কবল থেকে ট্রয়বাসীদের সত্যসত্যই উদ্ধার করতে চেয়েছিলেন তিনি। ঈগলের মত দ্রুতবেগে অ্যাকেলিস সেখান থেকে সরে গেলেও নদীতরঙ্গটি ক্রমাগত প্রধাবিত হতে লাগল তার পশ্চাতে। দ্রুতগামী অ্যাকেলিস কিছুতেই পেরে উঠলেন না দুর্বারগতি সে তরঙ্গমালার সঙ্গে।
তখন স্বর্গের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করে বললেন অ্যাকেলিস, হে পরম পিতা জিয়াস, পরে যা হয় হবে, কিন্তু এখন কি কোন দেবতা এই নদীর আক্রমণ হতে রক্ষা করতে পারবে না আমায়? এখন দেখছি আমার মাতা ছলনা ও প্রতারণা করেছেন আমার সঙ্গে। সব দোষ তার। আমার মাতা বলেছিলেন ট্রয়নগরীর প্রাচীরপার্শ্বে অ্যাপোলোর তীরে বা সর্বশ্রেষ্ঠ ট্রয়বীরের হাতে বীরের মতই মরব আমি। কিন্তু এখন দেখছি শূকরপালক এক রাখালবালকের মত সামান্য এক নদীর হাতে বন্দি হয়ে মৃত্যুবরণ করতে হবে আমায়।
অ্যাকেলিসের প্রার্থনা শেষ হতেই পসেডন ও এথেন মানুষের মূর্তিতে এসে উপস্থিত হলেন তাঁর কাছে। পসেডনই প্রথম বলেছেন, ভীত হয়ো না পেলেউসপুত্র, জিয়াসের অনুমতি নিয়ে আমরা দুজন দেবতা তোমার সাহায্যার্থে এখানে এসে উপস্থিত হয়েছি। এই নদীর হাতে তোমার মৃত্যু নেই। শীঘ্রই প্রশমিত হবে এর জলোচ্ছাস। আমরা তোমাকে এই পরামর্শ দান করছি, ইলিয়াম নগরীর মধ্যে ট্রয়বাসীদের অবরুদ্ধ না করা পর্যন্ত ক্ষান্ত হবে না তুমি। তারপর হেক্টরকে হত্যা করে জাহাজে ফিরে যাবে। আমার ইচ্ছায় তাকে তুমি অবশ্যই পরাজিত করবে।
দেবতারা চলে গেলে তাঁর আকাঙ্ক্ষিত ধ্বংসকার্যসাধনোদ্দেশ্যে এগিয়ে যেতে লাগলেন অ্যাকেলিস। কূলপ্লাবী স্কামান্দারের জলোজ্জাস তখনো পরিব্যাপ্ত করে ছিল নদীতীরের বিশাল প্রান্তরটিকে। নিহত সৈনিকদের বহু মৃতদেহ ও বর্ম ভেসে যাচ্ছিল সে জলে। এথেন প্রদত্ত এক অলৌকিক শীক্তবলে সেই বিস্তীর্ণ জলরাশি ভেঙ্গে এগিয়ে যেতে লাগলেন অ্যাকেলিস।
দেবতাদের নির্দেশবাক্য মানল না স্কামান্দার। কিছুমাত্র প্রশমিত করল না কুদ্ধ জলোচ্ছাসকে। বরং সে আরও উত্তাল হয়ে উঠতে লাগল অ্যাকেলিসের পথে। উপরন্তু তার ভ্রাতা সাইময় নদীকে ডেকে বলল স্কামান্দার, হে আমার প্রিয়তম ভাই, এস আমরা দুজনে প্রতিহত করি এই দুর্ধর্ষ লোকটিকে, তা না হলে রাজা প্রিয়ামের নগরটিকে ধ্বংস করে ফেলবে। নিজেকে দেবতাজ্ঞানে উতুঙ্গ স্পর্ধায় প্রমত্ত হয়ে উঠেছে ও এক অপ্রতিরোধ্য ধ্বংসলীলায়, তার গতিরোধ করার জন্য অসংখ্য গর্জনশীল তরঙ্গমালা বিস্তার করে এগিয়ে এস আমার সাহায্যে। কাষ্ঠ ও প্রস্তরখণ্ড ভাসিয়ে এনে বাধা সৃষ্টি করো ওর পথে। আমাদের সম্মিলিত জলরাশির তলদেশে কর্দমাক্ত অবস্থায় সমাহিত হয়ে এক বিরাট ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে ওর অমিত শক্তি ও দেহসৌন্দর্যের অহঙ্কার, ওর বর্ম ও অস্ত্ররাজির উদ্ধত উজ্জ্বলতা। বালুকা ও পলিমাটির স্তূপ দ্বারা আমি ওকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলব যে গ্রীকরা ওকে খুঁজেই পাবে না। ওর মৃতদেহকে চিতানলে দাহ করা বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করার কোন প্রয়োজন হবে না।
জ্যানথাসের একথা শেষ না হতেই তার ফেনায়িত ও রক্তাক্ত তরঙ্গমালা উত্তাল হয়ে উঠল আবার অ্যাকেলিসের চারিদিকে। সে তরঙ্গমালা হয়ত সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করে ফেলত অ্যাকেলিসকে, ভাসিয়ে নিয়ে যেত তাকে, যদি না হেরা তাঁর পুত্র হিফাস্টাসকে ডেকে বলতেন, হে আমার খঞ্জ পুত্র, তোমার একদা শত্রু জ্যানথাসের বিরুদ্ধে সংহত করো তোমার সমস্ত শক্তি। তুমি এক বিরাট অগ্নিকুণ্ড প্রজ্জ্বলিত করো, আমি পশ্চিমা ও দক্ষিণা বায়ুকে একত্রিত করে এক ভয়াবহ সামুদ্রিক প্রভঞ্জনে পরিণত করে সেই অগ্নিকুণ্ডের লেলিহান শিখাগুলো চারিদিকে বিস্তার করে ট্রয়সেনাদের মৃতদেহগুলো পুড়িয়ে দেব আর তুমি জ্যানথাস নদীর তীরে গিয়ে গাছগুলোকে সব দগ্ধ করে তাকে এমনভাবে অগ্নিদ্বারা পরিবৃত করে রাখবে যাতে সে কোনদিকে যেতে না পারে। তার কোন কথায় ভুলবে না, আমি তোমাকে না বলা পর্যন্ত তুমি তাকে মুক্ত করবে না।
হিফাস্টাস তখন নদীতীরস্থ সেই জলপ্লাবিত প্রান্তরে এমন এক বিশাল অগ্নিকুণ্ড প্রজ্জ্বলিত করলেন যার ভয়াবহ তাপে সমস্ত জলরাশি শুকিয়ে গেল। ভাসমান মৃতদেহগুলো সব দগ্ধ ও ভস্মীভূত হয়ে গেল। উত্তরের শুষ্ক বাতাসে যেমন শরৎকালীন বৃষ্টির জল নিঃশেষে শুকিয়ে যায় তেমনি হিফাস্টাস তখন এই জ্বলন্ত অগ্নির লেলিহান জিহ্বাগুলোকে নদীর দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে প্রথমে নদীতীরসংলগ্ন সমস্ত বৃক্ষগুলোকে পুড়িয়ে দিলেন। তারপর তার তাপে দগ্ধ করতে লাগলেন স্কামান্দারকে। স্কামান্দার তখন হিফাস্টাসকে কাতর কণ্ঠে বললেন, হে হিফাস্টাস, আমি তো কোন ছার কোন দেবতাই তোমাকে পরাজিত করতে পারে না। তোমাকে ক্রুদ্ধ ও লেলিহান শিখাকে প্রতিহত করার সামর্থ্য আমার নেই। সুতরাং আমাকে মুক্তি দাও। অ্যাকেলিস ট্রয়বাসীদের তাদের নগর থেতে বিতাড়িত করুন। মর্তমানবের যতসব হীন কলহবিবাদে জড়িত হয়ে কী লাভ আমার?
জ্যানথাস যখন একথা বলছিল তখন হিফাস্টাস প্রজ্জ্বলিত অগ্নিতাপে দগ্ধ হচ্ছিল সে। চুল্লীতাপে কোন পাত্রস্থ ফুটন্ত জলরাশি যেমন বাষ্পীভূত হয়ে যায় ধীরেধীরে তেমনি শুকিয়ে উড়ে যাচ্ছিল জ্যানথাস নদীর সমস্ত জল। আর কোন প্রবাহ ছিল না তার শীর্ণ শুষ্ক বুকে। তখন অগ্নিদগ্ধ স্কামান্দর অনন্যেপায় হয়ে দেবরাজ্ঞী হেরার কাছে প্রার্থনা জানিয়ে বলল,যে সব দেবতা ট্রয়বাসীদের সাহায্য করছে তাদের মত আমার কাজ তেমন দোষের নয় তবে কেন তোমার পুত্র আমাকে এমনভাবে দগ্ধ করছে? তুমি তোমার পুত্রকে ক্ষান্ত হতে বল। আমি শপথ করছি এরপর আর কখনো ট্রয়বাসীদের ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য কোন চেষ্টাই করব না। এমন কি গ্রীকরা যখন ট্রয়নগরীতে অগ্নিসংযোগ করবে তখনো বা ধ্বংস না করার জন্য কোন সাহায্য তাদের করব না।
এই শপথবাক্য শুনে হেরা হিফাস্টাসকে বললেন, এবার তোমার সমস্ত তেজ সংবরণ কর। মর্তমানবের খাতিরে কোন দেবতাকে অকারণে কষ্ট দেওয়া উচিত নয়।
মাতার আদেশে হিফাস্টাস সমস্ত অগ্নি নির্বাপিত করে দিলেন। আর জ্যানথাসও তখন বিপনুক্ত হয়ে তার চিরশীতল জলতলশয্যায় গিয়ে শায়িত হলো। জ্যানথাস চলে যেতে অ্যাকেলিসের সঙ্গে তার দ্বন্দ্বের অবসান হলো। হেরা তবু তখনো রেগে ছিলেন। এদিকে দ্বিমত উপস্থিত হলো দেবতাদের মধ্যে। নিজেদের মধ্যে বিবাদে প্রবৃত্ত হলেন। তাঁরা সকলে। এ বিবাদ শুরু হলো রণদেবতা অ্যারেসের দ্বারা। তরবারি হাতে এথেনকে আক্রমণ করে অ্যারেস বললেন, তুমি একবার টাইডেউসপুত্র ডায়োমিডিসকে উত্তেজিত করো আমার বিরুদ্ধে। তার বর্শা নিজের হাতে নিয়ে আমার দেহে আঘাত করো। এবার তার প্রতিফল ভোগ করতে হবে তোমার। দেবতাদের এই সব তর্জন গর্জনে মুহুর্মুহুঃ প্রকম্পিত হয়ে উঠতে লাগল সমগ্র পৃথিবী। ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠতে লাগল প্রশস্ত উদার আকাশ। এই কলহের কথা শুনে অলিম্পাস পর্বতের স্বর্ণশিখরে বসে এক ভয়ঙ্কর অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন দেবরাজ জিয়াস।
অ্যারেস প্রথমে বর্শা নিক্ষেপ করলেন এথেনকে লক্ষ্য করে। এথেন সরে গিয়ে এক বিরাট প্রস্তরখণ্ড তুলে নিয়ে তা নিক্ষেপ করলেন অ্যারেসের উপর। সে পাথর অ্যারেসের ঘাড়ে লাগায় তিনি পড়ে গেলেন আর সঙ্গে সঙ্গে ধূলিধূসর হয়ে উঠল তাঁর দীর্ঘ কেশরাশি। তা দেখে হেসে এথেন বললেন, মূঢ়, তুমি কি জান না, তোমার থেকে কত শক্তিশালী আমি? এবার তোমার মাতার অভিশাপ নেমে আসবে তোমার উপর। কারণ তুমি গ্রীকপক্ষ ত্যাগ করে ট্রয়পক্ষকে সাহায্য করছ।
এথেন ক্ষণিকের জন্য তাকে অন্যত্র সরিয়ে নিতেই অ্যাফ্রোদিতে এসে অ্যারেসকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন। তা দেখে হেরা এথেনকে বললেন, দেখছ, অ্যাফ্রোদিতে এসে অ্যারেসকে সরিয়ে নিয়ে গেল যুদ্ধক্ষেত্র হতে। তুমি তার পশ্চাদ অনুসরণ করো।
অ্যাফ্রোদিতের পশ্চাদ্ধাবন করে তাকে ধরে ফেলে তার বুকের উপর হাত দিয়ে এমনভাবে আঘাত করলেন এথেন যাতে তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। তখন এথেনকে বললেন, যারা অ্যাফ্রোদিতের মত ট্রয়বাসীদের সাহায্য করেছিল তাদের সবার যদি এই অবস্থা হত তাহলে অনেক আগেই ইলিয়াম নগরী বিধ্বস্ত জয়ে ট্রয়যুদ্ধের অবসান ঘটত।
একথা শুনে হাসতে লাগলেন হেরা। ইতিমধ্যে পসেডন অ্যাপোলোকে বললেন, ফীবাস, কেন আমরা দূরে দূরে রয়েছি যুদ্ধের কাছ থেকে অন্য দেবতারা যখন যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে নিজেদের মধ্যে তখন আমরা যদি বিনা যুদ্ধে অলিম্পাসের স্বর্গপ্রাসাদে প্রত্যাবর্তন করি তাহলে সেটা অপমানজনক হবে আমাদের পক্ষে। আমাদের দুজনের মধ্যে তুমি ছোট বলে তোমাকে আঘাত করা আমার উচিত হবে না। একবার তোমাকে ও আমাকে জিয়াসের নির্দেশে একটি বছর লওমীডনের কাছে ফরমাস খাটতে হয়। আমি ইলিয়াম নগরীর চারদিকে এক প্রশস্ত সুন্দর ও দুর্ভেদ্য প্রাচীর নির্মাণ করি আর তুমি তার মেষ চরাতে। কিন্তু বছরের কাজ শেষ হয়ে গেলে বেতন না দিয়ে আমাদের কুবাক্য বলে তাড়িয়ে দেয় লাওমীডন। উপরন্তু সে আমাদের এই বলে ভয় দেখায় যে, সে আমাদের বেঁধে রাখবে এবং কোন দূর দেশে বিক্রি করে দেবে। তখন আমরা রেগে বেতন না নিয়েই চলে যাই। আজ তুমি সেই দুবৃত্ত লাওমীডনের দেশের লোকদের অনুগ্রহ করছ। গর্বিত ট্রয়বাসীদের ধ্বংস সাধনের জন্য আমাদের এই প্রচেষ্টায় কোন সাহায্য করছ না।
অ্যাপোলো উত্তর করলেন, হে ভূকম্পন দেবতা, আমি যদি সামান্য মরণশীল মানুষদের জন্য যুদ্ধ করি তোমার সঙ্গে তাহলে আমাকে তুমি কখনই শ্রদ্ধা করবে না। মানুষ হচ্ছে বসন্ত সমাগমে প্রচুর পরিমাণে উদগত বৃক্ষপত্রের ন্যায়, দুদিনের জন্য ভূমিগর্ভের সব রসটুকু পান করে নিষ্প্রাণ হয়ে মাটিতে ঝরে পড়ে। সুতরাং চল আমরা যুদ্ধক্ষেত্র হতে চলে যাই। ওরা যা করে করুক।
অ্যাপোলো চলে গেলেন। তিনি তাঁর পিতার ভ্রাতার গায়ে হাত দেবেন না। কিন্তু তার বোন তীরন্দাজ দেবী আর্তেমিস ক্রুদ্ধ হয়ে বলেন, নির্বোধ, কেন তুমি তোমার ধনুর্বাণ নিষ্ক্রিয় করে রেখেছ? তুমি না একবার অহঙ্কার করে বলেছিলে তুমি পসেডনের সঙ্গে যুদ্ধ করবে?
অ্যাপোলো কোন উত্তর দিলেন না। কিন্তু দেবরাজ্ঞী হেরা ক্রুদ্ধ হয়ে ভসনা করতে লাগলেন আর্তেমিসকে। তিনি বললেন, কোন সাহসে তুমি আমার বিরুদ্ধে দাঁড়াও। তোমার যতই ধনুর্বাণ থাক, আমার সঙ্গে কখনই পেরে উঠবে না। তোমার থেকে যারা শক্তিশালী তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে না এসে বনের পশুদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ানো উচিত তোমার। তুমি আমার সঙ্গে যদি লড়াই করতে চাও তো এস।
এই বলে একটি হাত দিয়ে হেরা আর্তেমিসের একটি হাতের কব্জি ধরলেন আর একটি হাত দিয়ে তাঁর ধনুর্বাণটি কেড়ে নিয়ে তাকে আঘাত করলেন। সে আঘাতে মুচড়ে উঠল আর্তেমিসের দেহটা। তাঁর ধনুর্বাণ মাটিতে পড়ে গেল, আর কোন বাজপাখির তাড়নায় পলায়নরত এক বনকপোতের মত কাঁদতে কাঁদতে পালিয়ে গেলেন আর্তেমিস। তাঁর সাধের ধনুর্বাণ সেখানেই পড়ে রইল।
অ্যাপোলো এবার লীটোর কাছে গিয়ে বললেন, লীটো, আমি আর কখনো জীয়াসের পত্নীর সঙ্গে যুদ্ধ করব না।
আর্তেমিস তখন অলিম্পাসের পথে চলে গেলেন। লীটো তাঁর ধনুর্বাণটি কুড়িয়ে নিয়ে আর্তেমিসের সন্ধান করতে লাগলেন। আর্তেমিস সোজা দেবরাজ জিয়াসের কাছে যেতেই তিনি তাকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন, কোন দেবতা তোমাকে এমন নিষ্ঠুরভাবে আঘাত করেছে? আর্তেমিস বললেন, তোমার পত্নী হেরা আমাকে আঘাত করেছে পিতা। দেবতাদের সঙ্গে আমার কোন বিবাদই হলেই তিনি আমাকে এইভাবে আঘাত করেন।
অন্যান্য দেবতারা যখন ক্রুদ্ধ হয়ে অলিম্পাসে ফিরে গেলেন, একা ফীবাস অ্যাপোলো তখন চলে গেলেন ইলিয়াম নগরীতে। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই যাতে গ্রীকদের হাতে বিধ্বস্ত না হয় এজন্য উদ্বেগ অনুভব করছিলেন তিনি। এদিকে অ্যাকেলিস তখনো ক্রমাগত ট্রয়সৈন্য ও রথাশ্ব বধ করে চলেছিলেন।
বৃদ্ধ রাজা প্রিয়াম ট্রয়ের দুর্গপ্রাকারের এক স্থানে দাঁড়িয়ে দেখলেন, এক অপরাজেয় পৌরুষ ও বিপুল বিক্রমের সঙ্গে অ্যাকেলিস একাই সমস্ত ট্রয়সৈন্যদের তাড়িয়ে নিয়ে চলেছেন। ট্রয়সৈন্যরা ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় ছুটে পালিয়ে আসছে। তাদের সাহায্য করার কোথাও কেউ নেই। এই দৃশ্য দেখার সঙ্গে সঙ্গে রাজা প্রিয়াম এক আদেশ জারি করে সমস্ত নগরদ্বার সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত করে দিতে বললেন। তিনি বললেন, সব দরজা খুলে দাও, অ্যাকেলিসের তাড়নায় বিপন্ন ও বিব্রত ট্রয়সেনারা নগরমধ্যে এসে আশ্রয় গ্রহণ করুক। সমস্ত সৈন্যরা ভিতরে এলে দরজাগুলো আবার বন্ধ করে দেবো। তা না হলে ঐ ভয়ঙ্কর লোকটা নগরমধ্যে ঢুকে পড়বে।
রাজা প্রিয়ামের আদেশে নগরদ্বারগুলো উন্মুক্ত হবার সঙ্গে সঙ্গে ট্রয়সৈন্যরা সকলে প্রবেশ করার জন্য ঠেলাঠেলি শুরু করে দিল। এমন সময় অ্যাপোলো নগর হতে বেরিয়ে এলেন তাদের রক্ষার জন্য। তিনি দেখলেন, পিপাসার্ত ও ধূলিমলিন ট্রয়সেনারা সকলে একসঙ্গে নগরমধ্যে প্রবেশ করার জন্য ছুটে আসছে দ্বারপথে আর জয়গৌরবপিপাসু অ্যাকেলিস ভয়ঙ্কর মূর্তিতে তাদের তাড়ানা করে নিয়ে চলেছে।
এইভাবে অ্যাকেলিসের নেতৃত্বে গ্রীকসেনারা হয়ত ট্রয়নগরীর মধ্যে প্রবেশ করে ফেলত। কিন্তু অ্যাপোলো তখন অ্যাটিনরের বীর পুত্র অ্যাজিনরের মধ্যে সাহস ও শক্তি সঞ্চার করলেন। একটি ওকগাছের পাশে থেকে অ্যাপোলো এক কৃত্রিম অন্ধকার দ্বারা আচ্ছান্ন ও অদৃশ্য করে তুললেন অ্যাজিনরকে। অ্যাজিনর তখন অ্যাকেলিসকে দেখে ভীত হয়ে ভাবতে লাগল, আমি যদি অন্যান্য ট্রয়সেনাদের মত তার সামনে দিয়ে পালিয়ে যাই তাহলে অ্যাকেলিস আমাকে অবশ্যই কাপুরুষ ভেবে ধরে ফেলে হত্যা করবে। অ্যাকেলিন যখন এইভাবে আমাদের সৈন্যদের তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমি তখন কেমন করে নির্জন আইডা পর্বতে পালিয়ে গিয়ে তার বনমধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করি? সারাদিন লুকিয়ে থাকার পর সন্ধ্যার আবার ফিরে আসতে পারি ইলিয়াম নগরীতে । কিন্তু এই হীন কথা কেন আমি ভাবছি? নগর হতে পলায়নকালে নিশ্চয় সে আমাকে দেখে ফেলবে এবং সে আমাকে ধরে ফেলবে। সে অনেক বেশি শক্তিশালী আমার থেকে। তার থেকে আমি যদি তার কাছে গিয়ে তার সম্মুখীন হই? তারও দেহগাত্র বিদ্ধ হবে ব্রোঞ্জনির্মিত বর্শাফলকের দ্বারা। সকল মানুষের মধ্যেই সেই একই জীবন বিরাজ করছে। জিয়াস তাকে যতই জয়ের গৌরবে ভূষিত করুন না কেন, সেও একজন মরণশীল মানুষ।
আপন মনে এই কথা বলে অ্যাকেলিসের জন্য প্রতীক্ষা করতে লাগল অ্যাজিনর। কোন বাঘিনী যেমন কোন শিকারিকে আক্রমণ করার জন্য বন হতে বেরিয়ে আসে শিকারি কুকুরদের চিৎকার অগ্রাহ্য করে, অ্যাজিনরও তেমনি দাঁড়িয়ে রইল অ্যাকেলিসের প্রতীক্ষায়। সে অ্যাকেলিসকে উদ্দেশ্য করে বলল হে মহান অ্যাকেলিস, তুমি হয়ত ভেবেছ, তুমি আজই ইলিয়াম নগরী বিধ্বস্ত করবে। কিন্তু তুমি নির্বোধ, জেনে রেখো, এ নগরী ধ্বংসের আগে বহু কষ্ট ভোগ করতে হবে তোমাদের। এই নগরমধ্যে আমার মত বহু বীর তাদের নগররক্ষার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। সুতরাং যত বড়ই বীর হও না কেন তুমি তোমাকে এখানে মরতেই হবে।
এই বলে বর্শা নিক্ষেপ করল অ্যাজিনর অ্যাকেলিসকে লক্ষ করে। সে বর্শা অ্যাকেলিসের পায়ের জানুর তলায় লাগল। কিন্তু দৈবানুগ্রহে তাঁর গাত্রত্বককে বিদ্ধ করতে পারল না সে বর্শাফলক। এরপর অ্যাকেলিস আক্রমণ করলেন অ্যাজিনরকে। কিন্তু অ্যাপোলো তখন অ্যাজিনরকে কুয়াশাদ্বারা আচ্ছন্ন করে সরিয়ে দিলেন অক্ষত অবস্থায়। তারপর তিনি অ্যাকেলিসকে নগরদ্বার হতে কৌশলে সরিয়ে নেবার জন্য নিজে অ্যাজিনরের রূপ ধারণ করে অ্যাকেলিসের সামনে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। নগরদ্বার হতে রণপ্রান্তরের পথে ছুটে গিয়ে অ্যাকেলিসকে বিভ্রান্ত করতে লাগলেন। বারবার। প্রান্তর হতে একবার নদীর তীরের পথে ছুটে গেলেন। কিন্তু অ্যাকেলিস যখনি ভাবতে লাগলেন তিনি ধরে ফেলেছেন অ্যাজিনরকে তখনি অ্যাজিনররূপ অ্যাপোলো অন্যদিকে পালাতে লাগলেন। ইত্যবসরে ট্রয়সেনারা সকলে নগর মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করল। তাদের মধ্যে কারা পালাতে সমর্থ হয়েছে আর কারাই বা মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে সেকথা জানার জন্য নগরদ্বারের বাইরে অপেক্ষা করল না তারা।