পারিস ও মেনেলাসের দ্বৈতযুদ্ধ দুর্গপ্রাকার হতে হেলেন ও প্রিয়ামের গ্রীকসৈন্য অবলোকন

সৈন্যগণ বিভিন্ন নেতার অধীনে বিভিন্ন দলে বিভক্ত ও শ্ৰেণীবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর পর ট্রয়বাসীরা বন্য মোরগের ও সারসের মত এগিয়ে যেতে লাগল দুর্বার বেগে। ওসিয়াস সাগরের উপর দিয়ে শীতার্ত বর্ষণক্লান্ত বন্য পাখির দল উড়ে গিয়ে ক্ষুদ্রকায় পিগমিদের কাছে মড়ক আর মহামারীর বার্তা বহন করে নিয়ে যায় তেমনি ভয়ঙ্করভাবে এগিয়ে যেতে থাকে ট্রয়সৈন্যগণ। গ্রীকসৈন্যগণও নিঃশব্দ উল্লাসে সুসংবদ্ধভাবে প্রস্তুত হয়ে উঠল যুদ্ধের জন্য।
দক্ষিণাবায়ুর দ্বারা সৃষ্ট ঘন কুয়াশাজাল যেমন সমগ্র পর্বতদেশকে আচ্ছন্ন করে থাকে তেমনি বেগবান সৈন্যদের পদভারে লাঞ্ছিত মৃত্তিকাঁদেশ হতে উত্থিত ধূলিরাশিও সমগ্র রণক্ষেত্রকে পরিব্যাপ্ত করে তুলল।
সৈন্যসমাবেশের কাজ সম্পন্ন হয়ে গেলে ট্রয়সৈন্যদের পুরোভাগে এসে দাঁড়ালেন আলেকজান্দ্রাস। তাঁর স্কন্ধে ছিল সিংহচর্ম হস্তে ছিল ধনুর্বাণ ও তরবারি। ব্রোঞ্জের ফলকে বিশিষ্ট দুটি বর্শা উৎক্ষিপ্ত করে তিনি গ্রীকদের উদ্দেশ্যে একক যুদ্ধের আহ্বান জানালেন। বীর আলেকজান্দ্রাসকে দর্পভরে এগিয়ে আসতে দেখলেন মেনেলাস। কোন পশুর মৃতদেহ অথবা কোন শৃঙ্গধারি মৃগদর্শনে তাকে তৎক্ষণাৎ ভক্ষণ করার জন্য যেমন উল্লসিত হয়ে ওঠে কোন ক্ষুধিত সিংহ ঠিক তেমনি এক পাশবিক উল্লাসে উজ্জ্বল হয়ে উঠল মেনেলাসের মুখমণ্ডল।তিনি এবার তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী হেলেনের অপহরণের উপযুক্ত প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন একথা ভেবে এক প্রচণ্ড আনন্দোল্লাসে মত্ত হয়ে উঠলেন। বর্মপরিহিত অবস্থায় রথ হতে অবতরণ করলেন মুহূর্তে।
এদিকে মেলেনাসকে তাঁর দিকে দর্পভরে অগ্রসর হতে দেখে ভয়ে ভিড়ের মধ্যে আত্মগোপন করলেন আলেকজান্দ্রাস। পার্বত্য পথে যেতে যেতে সহসা যেমন সাপ দেখে কোন লোক ভয়ে মলিন হয়ে কাঁপতে কাঁপতে পিছিয়ে যায়, তেমনি আত্রেউসপুত্রকে দেখে আলেকজান্দ্রাসও ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ট্রয়সৈনদের ভিড়ের মধ্যে প্রবেশ করলেন।
তখন হেক্টর আলেকজান্দ্রাসকে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে তিরস্কার করতে লাগলেন, হে নিষ্ঠুরহৃদয় প্যারিস তুমি সুদর্শন হলেও নারীলোলুপ এবং মিথ্যাবাদী। তুমি যদি আমাদের বংশে জন্মগ্রহণ না করে অথবা অবিবাহিত অবস্থায় মারা যেতে তাহলে ভাল হত। অপমানিত হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুবরণ করা অনেক ভাল। গ্রীকরা যখন দেখবে সুদর্শন অথচ সাহস ও সংকল্পহীন এক ট্রয় রাজকুমার তাদের যুদ্ধে আহ্বান জানিয়ে ভয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে তখন কি তারা উপহাস করবে না আমাদের? সুদূরবর্তী এক দেশ হতে এক বীর জাতির মধ্যে থেকে এক সুন্দরী নারীকে নিয়ে এসে তুমি কি তোমার পিতা ও তোমার দেশের উপর এক বিরাট দুঃখের বোঝা এবং তোমার নিজের জীবনের উপর হীন লজ্জার বোঝা চাপিয়ে দাও নি? তুমি যার স্ত্রীকে অপহরণ করেছ সে কি ধরনের মানুষ তা জানার জন্য আজ তার সম্মুখীন হবার ক্ষমতাও তোমার নেই? তুমি যখন মেনেলাসের দ্বারা সম্মুখযুদ্ধে ভূপাতিত হবে তখন কোথায় থাকবে তোমার প্রিয় বীণাযন্ত্র এবং কামদেবী অ্যাফ্রোদিতের দান আর প্রেমমদির ছলনাময় দৃষ্টি? আসলে ট্রয় জাতি মনের দিক থেকে দুর্বল, তা না হলে যে অন্যায় তুমি তাদের উপর করেছ তার জন্য তাদের দ্বারা নিক্ষিপ্ত প্রস্তরে সারা দেহ ক্ষতবিক্ষত হয় উঠল তোমার।
আলেকজান্দ্রাস তখন উত্তর করলেন, হেক্টর, তোমার ভর্ৎসনা ন্যায়সঙ্গত। কোন জাহাজ নির্মাণকারীর দ্বারা ব্যবহৃত কুঠারের মতই অব্যর্থ তোমার বাক্যবাণ। কুঠারের মুখের মতই তীক্ষ্ণ তোমার সাহস। তথাপি দেবী অ্যাফ্রোদিতে আমাকে যে বস্তু দান করেছেন তার জন্য উপহাস করো না আমায় দেবতাপ্রদত্ত কোন দান যেন ঘৃণার চোখে দেখে মর্তের কোন মানুষ, কারণ দেবতারা মানুষকে যাকিছু দান করেন তা মানুষের ইচ্ছানুসারে দেন না কখনো, দেন আপন স্বতস্ফূর্ত ইচ্ছার দ্বারা প্রণোদিত হয়ে। মেনেলাসের সঙ্গে আমার সম্মুখযুদ্ধ যদি একান্তই চাও তাহলে ট্রয়বাসী ও গ্রীকদের আপন আপন আসনে উপবিষ্ট হতে বল। আমরা যখন দুজনের হেলেনের জন্য সম্মুখযুদ্ধে প্রবৃত্ত হব তখন যেন তারা তা দেখে নীরবে বসে থাকে। আমাদের দুজনের মধ্যে যে জয়ী হবে সে-ই হেলেন ও তার যথাসর্বস্ব লাভ করবে এবং তা নিয়ে বাড়ি ফিরে যাবে। কিন্তু তার আগে এক পবিত্র শান্তির শপথে আবদ্ধ হতে হবে। আমাদের দুজনের জয় পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গেই সব সমস্যার যেন শান্তিপূর্ণ সমাধান হয়। তখন ট্রয়বাসীরা যেন ট্রয়দুর্গের মধ্যে ফিরে আসে তার গ্রীকসৈন্যরা সদলবলে তাদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে।
হস্তধৃত বর্শার দ্বারা হেক্টর সকলকে শান্ত হতে আদেশ দিলে স্তব্ধ হয়ে উপবেশন করল ট্রয়সৈন্যরা। কিন্তু গ্রীকসৈনরা প্রস্তরখণ্ড ও তীর নিক্ষেপ করতে লাগল ট্রয়বীরদের লক্ষ্য করে। তখন রাজা অ্যাগামেমনন গ্রীকদের শান্ত হতে আদেশ করে বললেন, শান্ত হও হে গ্রীকসন্তানগণ, হেক্টর কিছু বলতে চান। তাকে বলতে দাও।
গ্রীকরা শান্ত হলে হেক্টর বললেন, শোন আমার মুখ থেকে আলেকজান্দ্রাস কথিত সেই কথা যার থেকে ট্রয় ও গ্রীসের মধ্যে সকল বিরোধের উদ্ভব। তাঁর কথা হলো এই যে, তিনি যখন মেনেলাসের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হবেন তখন যেন ট্রয় ও গ্রীকসৈন্যরা অস্ত্রত্যাগ করে নীরবে উপবেশন করে তা দর্শন করে। দুজনের মধ্যে যিনি জয়লাভ করবেন তিনিই হেলেন ও তার যথাসর্বস্ব লাভ করবেন এবং গ্রীকসৈন্যরা তখন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করবে এবং ট্রয়সৈন্যরা শান্তিপূর্ণভাবে ট্রয়দুর্গে অবস্থান করবে।
সকলে শান্ত হলে মেনেলাস উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, এবার আমার কথা শোন, কারণ এ ব্যাপারে আমার দুঃখ সবচেয়ে বেশি। আমার মনে হয় এ যুদ্ধের অবসান অত্যাসন্ন। তোমরা জান, আলেকজান্দ্রাস আমার উপর যে অন্যায় করেছে তার জন্য তোমরা বহু দুঃখ ভোগ করেছ। দুজনের মধ্যে যে মরুক, কিন্তু সেই মৃত্যুর মধ্য দিয়েই যেন স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় উভয় পক্ষের মধ্যে। পৃথিবী ও সূর্যের জন্য একটি কালো ভেড়া আর সাদা ভেড়ী আন। আমি তাহলে জিয়াসের জন্য আনব অন্য একটি ভেড়া। তাছাড়া প্রিয়ামকে ডেকে আন, তিনি নিজে শপথ করুন, কারণ তাঁর পুত্রদের কথায় বিশ্বাস স্থাপন করা যায় না। জিয়াসের কাছে যে শপথবাক্য উচ্চারণ করা হলো তা কখনো লঙ্ঘন করা উচিত নয়। যুবকদের মন বাতাসের মত লঘুচপল। কিন্তু একজন বৃদ্ধ লোক ভূত ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা করে উভয় পক্ষের জন্য যা কিছু শুভ তার ব্যবস্থা করেন।
একথা শুনে ট্রয় ও গ্রীকসৈন্যরা সকলেই আনন্দিত হলো, কারণ তারা সকলেই চাইছিল যুদ্ধবিরতি আর বিশ্রাম। তারা তাদের রথগুলো রণক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নিয়ে গেল দূরে, তাদের রথ হতে অবতরণ করে বর্শা ত্যাগ করে ইতস্তত ঘুরে বেড়াতে লাগল। হেক্টর ট্রয়নগরে দুজন দূত পাঠালেন দুটি ভেড়া আনার জন্য। তিনি প্রিয়ামকেও ডেকে আনতে বললেন। তখন ট্যানথাইসিয়ামকে তাঁদের জাহাজ থেকে তৃতীয় ভেড়াটি আনার জন্য পাঠালেন অ্যাগামেমনন এবং ট্যানথাইসিয়ামও সেই মত কাজ করলেন।
ইতিমধ্যে আইরিস গেলেন হেলেনের কাছে। তিনি গেলেন অ্যান্টিনরের পুত্রবধুর রূপ ধরে। প্রিয়ামের কন্যাদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী লাওডাইসকে বিয়ে করেছিলেন অ্যান্টিনরপুত্র হেলিকাওন। আইরিস গিয়ে দেখলেন হেলেন তার ঘরে বসে নীলচে রঙের একখণ্ড সূক্ষ্ম বস্ত্রের উপর ট্রয়যুদ্ধের ঘটনাবলি সূচীশিল্পের এক অপরূপ প্রকাশকলায় চিত্রিত করে তুলছিল। আইরিস হেলেনের কাছে গিয়ে বললেন, এস বৎসে, এসে দেখ গ্রীক ও ট্রয়বাসীদের কাণ্ড। যুদ্ধোন্মদ দুটি জাতি এতদিন রণক্ষেত্রে যুদ্ধ করে আসছিল প্রাণপণ শক্তিতে। কিন্তু এখন সহসা তারা অস্ত্র ত্যাগ করে তাদের বাণের উপর হেলান দিয়ে বর্শাগুলো মাটিতে গেঁথে নীরবে বসে আছে। এখন আলেকজান্দ্রাস আর মেনেলাস তোমার জন্য সম্মুখযুদ্ধে প্রবৃত্ত হচ্ছে। তাদের মধ্যে যে জয়ী হবে তুমি হবে তারই স্ত্রী।
আইরিসের কথা শুনে তার প্রথম স্বামী, স্বদেশ ও পিতামাতাকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল হেলেনের মন। মাথার উপর শ্বেতবস্ত্রের এক আচ্ছাদন দিয়ে ঘর হতে বেরিয়ে তোরণদ্বারের দিকে এগিয়ে চলল হেলেন। তার সঙ্গে গেল ঈফ্রা ও ক্লাইমেন নামে দুজন পরিচারিকা।
প্রিয়াস, পানথয়, থাইমেটস লাম্পাস, ক্লাইটাস ও হিকেটাওন-এর সঙ্গে দুজন বৃদ্ধ ভবিষ্যদ্বক্তা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা হলেন ইউকানগাঁও আর অ্যান্টিনর। এঁরা সকলেই এত বৃদ্ধ যে আর যুদ্ধ করতে পারতেন না; কিন্তু তাঁরা ছিলেন শ্রেষ্ঠ বাগ্মী, সর্বোচ্চ বৃক্ষশাখায় উপবিষ্ট কোন জ্ঞানবান পক্ষীর মত তারা সর্বোচ্চ দুর্গ প্রাসাদশীর্ষে উপবিষ্ট হয়ে ট্রয়যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি অবলোকন করতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে মন্তব্য করতেন। সেই প্রাসাদশীর্ষাভিমুখে হেলেনকে অগ্রসর হতে দেখে তাঁরা বললেন, হেলেনের মত সূক্ষ্ম ঐশ্বরিক ও অনিন্দ্য সৌন্দর্যবিশিষ্ট নারীর জন্য গ্রীক ও ট্রয়বাসীরা যে এত দীর্ঘ দিন ধরে দুঃখ ও বিড়ম্বনা ভোগ করবে তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। গ্রীকরা হেলেনকে নিয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করুক, তা না হলে আমাদের ও আমাদের সন্তান-সন্ততিদের আরো অনেক দুঃখ ভোগ করতে হবে।
কিন্তু হেলেনকে কাছে ডাকলেন প্রিয়াম। বললেন, হে বৎসে, আমার পার্শ্বে উপবেশন করো, তাহলে তুমি তোমার প্রথম স্বামী, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের প্রত্যক্ষ করতে পারবে। আমি এজন্য তোমার উপর কোন দোষারোপ করছি না, কারণ এ বিষয়ে দেবতারাই দোষাহ। দেবতারাই ট্রয়জাতি ও গ্রীকদের মধ্যে এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধ সংঘটিত করেছেন। আচ্ছা বলত, অদূরবর্তী ঐ বিশালাকার বীরপুরুষটি কে, দেহটি যার যেমন সুন্দর তেমনি বলিষ্ঠ? আমি ওর থেকে আরও দীর্ঘকায় ব্যক্তি অবশ্য জীবনে দেখেছি। কিন্তু এমন সুন্দর ও রাজকীয় চেহারার বীরভ পুরুষ কখনো দেখি নি। উনি নিশ্চয় কোন রাজা।
হেলেন বলল, মহাশয়, উনি আমার প্রথম স্বামীর ভ্রাতা। আমার স্বামী আজও আমার চোখে প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় রয়ে গেছেন। আমার স্বামীগৃহ, প্রিয় কন্যা ও আত্মীয় পরিজনদের ত্যাগ করে আপনার পুত্রের সঙ্গে এত দূরে চলে না এসে যদি আমি মৃত্যুবরণ করতাম তাহলে তা অতীব শুভ হত আমার পক্ষে। কিন্তু তা হলো না কারণ আমার ভাগ্যে আছে দুঃখভোগ আর অশ্রুপাত। আর আপনি যে বীরপুরুষের কথা আমায় জিজ্ঞাসা করলেন তিনি হলেন আত্রেউসপুত্র অ্যাগামেমনন এবং আমার স্বামীর ভ্রাতা।
তখন বৃদ্ধ অ্যান্টিনর বললেন, সত্যিই আত্রেউসপুত্র কত সুখী এবং ভাগ্যবান উনি সত্যিই নিয়তির বরপুত্র। গ্রীকরা সত্যিই সংখ্যায় নগণ্য। আমি যখন ফার্জিয়াতে ছিলাম তখন আঙ্গাবিয়াস নদীর ধারে আমাজনদের সঙ্গে গ্রীকদের একবার যুদ্ধ হয়। আমি ছিলাম আমাজনদের পক্ষে। কিন্তু আমাজনদের থেকে গ্রীকরা ছিল সংখ্যায় বহুল পরিমাণে বেশি।
বৃদ্ধ অ্যান্টিনর তখন ওডিসিয়াসকে দেখে বললেন, বল আমায় ওই যে আর একজন বীরপুরুষ দাঁড়িয়ে রয়েছেন যিনি অ্যাগামেমননের থেকে খর্বাকৃতি অথচ প্রশস্ততর বক্ষ ও স্কন্ধবিশিষ্ট, উনি কে? তাঁর বর্শা এখন ভূতলে পতিত এবং প্রচুর পশমবিশিষ্ট ভেড়ারা যেমন করে ভীরু ভেড়াদের মধ্যে আধিপত্য করে বেড়ায় তেমনি করে স্বীয় বিক্রমে ঘরে বেড়াচ্ছেন গ্রীকসৈন্যদের মাঝে।
হেলেন উত্তর করল, উনি হচ্ছেন লার্তেসের কুশলীপুত্র ওডিসিয়াস। ঊষর পার্বত্য প্রদেশ ইথকায় জন্ম হয় ওঁর। উনি সর্বপ্রকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সূক্ষ্ম চাতুর্যে সিদ্ধ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ কৃতিত্বের অধিকারী।
অ্যান্টিনর তখন বললেন, আপনি সত্যই বলেছেন। একবার মেনেলাসের সঙ্গে ওডিসিয়াস এসেছিলেন আপনারই সম্পর্কে দৌত্য করতে। আমারই বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন তাঁরা এবং সেইহেতু তাঁদের অবয়ব এবং আলাপ আলোচনা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান অর্জন করেছি। ট্রয়বাসীদের মধ্যে যখন তারা দাঁড়িয়েছিলেন তখন প্রশস্ত স্কন্ধবিশিষ্ট মেনেলাসকে অধিকতর দীর্ঘকায় মনে হলেও দুজনে পাশাপাশি উপবেশন করলে এক রাজকীয় ব্যক্তিত্বে সমুজ্জ্বল দেখাচ্ছিল ওডিসিয়াসকেই। দুজনের মধ্যে মেনেলাস হলেন বয়োঃকনিষ্ঠ। উভয়ে তারা আপন বক্তব্য ব্যক্ত করলেন। মেনেলাস স্বল্প অথচ স্পষ্ট ভাষায় তাঁর বক্তব্য বিষয় পরিব্যক্ত করলেন। অপর দিকে মাটির দিকে ওডিসিয়াস দৃষ্টি নিবন্ধ করে নীরবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন প্রথমে। হস্তধৃত রাজদণ্ডটি কঠোরভাবে ধারণ করে বাগ্মিতানভিজ্ঞ ব্যক্তির মত ভাব দেখালেন। কিন্তু একবার যখন তিনি কণ্ঠস্বর উত্তোলিত করে বলতে শুরু করলেন তখন শীতের বাতাসে ভাসমান অতিবহুল অতিসুলভ তুষারের মত অসংখ্য কথার স্রোত গভীর বক্ষদেশ হতে কণ্ঠনালী বেয়ে উৎসারিত হতে লাগল। তখন কেউ তাঁর বাককুশলতার নাগাল নিতে পারল না। কেউ তাকে বুঝতে পারল না।
অ্যাজাক্সকে দেখে রাজা প্রিয়াম জিজ্ঞাসা করলেন, ঐ যে এক বীর যোদ্ধা দেখছ যার উন্নত মস্তক ও প্রশস্ত স্কন্ধ অন্যান্য গ্রীকসৈন্যদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে উনি কে?
হেলেন বলল, উনি হচ্ছেন গ্রীকদের মুকুটমণি বিশালাকায় অ্যাজাক্স, ওঁর একদিকে রয়েছে ক্রীটবাসীরা আর তাদের মধ্যে রয়েছেন বীর আইডোমেনেউস, যাকে দেখতে ঠিক দেবতার মত। আমার স্বামী মেনেলাসের দ্বারা নিমন্ত্রিত হয়ে উনি প্রায়ই ক্রীট হতে অতিথিরূপে আসতেন আমাদের প্রাসাদ অন্তঃপুরে। আমি আরও অনেক গ্রীকবাসীকে দেখতে পাচ্ছি এবং তাদের কথা আমি বলতে পারতাম। কিন্তু দুজন বীরকে আমি দেখতে পাচ্ছি না তাদের মধ্যে একজন হলো বিখ্যাত অশ্বারোহী ক্যাস্টর আর একজন হলো প্রসিদ্ধ মল্লবীর পোলাক্স। তারা দুজনেই আমার সহোদর ভাই। হয় তারা ল্যাসিডিমন ত্যাগ করে এখানে আসে নি অথবা তারা আমার জন্য লজ্জায় যুদ্ধে অবতীর্ণ বা আত্মপ্রকাশ করে নি।
কিন্তু হেলেন জানত না তারা দুজনই সমাহিত হয়ে আছে তাদের দেশের মাটিতে। ইতিমধ্যে প্রহরীরা পবিত্র শপথানুষ্ঠানের জন্য দুটি ভেগা আর এক ভেরী মদ নিয়ে এল। আইবিয়াস নিয়ে এল বহু মূল্যবান স্বর্ণপাত্র। রাজা প্রিয়াম সকাশে গিয়ে আইবিয়াস বলল, হে লাওমিডনপুত্র, গ্রীক ও ট্রয়জাতির রাজন্যবর্গ সর্বসমক্ষে শপথ গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করছেন আপনাকে। এক পবিত্র শপথের শর্তপাশে আবদ্ধ হতে হবে আপনাকে। আলেকজান্দ্রাস ও মেনেলাস অবতীর্ণ হবে এক সম্মুখযুদ্ধে এবং যে যুদ্ধে জয়ী হবে সে-ই লাভ করবে হেলেন আর তার যথাসর্বস্ব। এক পবিত্র শান্তি চুক্তিতে শপথ করতে হবে আমাদের। সেই যুদ্ধের ফলাফল যেন আমরা অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নেই এবং যুদ্ধ হতে উভয় পক্ষই যেন বিরত হয় আর গ্রীকরা শান্তিপূর্ণভাবে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে।
একথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে এক অজানা ভয়ে বুকটা কেঁপে উঠল রাজা প্রিয়ামের। রথ প্রস্তুত করার জন্য আদেশ দিলেন তাঁর অনুচরবর্গকে। রাজা প্রিয়াম রথে আরোহণ করলে অ্যান্টিনর তাঁর পাশে উপবেশন করলেন। রথ দ্রুতগতিতে গিয়ে উপনীত হল সুবিশাল রণপ্রান্তরে। তখন রথ ত্যাগ করে উভয় পক্ষের মধ্যস্থলে গিয়ে উপস্থিত হলেন প্রিয়াম।
তখন অ্যাগামেমনন ও ওডিসিয়াস দুজনেই উঠে দাঁড়ালেন তাঁদের অভ্যর্থনা জানাবার জন্য। অনুচরবর্গ নিয়ে এল মদের পাত্র ও শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের আনুষঙ্গিক দ্রব্যাদি। তারপর অ্যাগামেমনন কোষ হতে তরবারি বের করে একটি ভেড়ার মাথা থেকে কিছু পশম কেটে গ্রীক ও ট্রয়রাজকুমারদের হাতে দিলেন। অনুচরবর্গরা উভয় পক্ষের দলপতিদের হাতে মন্ত্রপূত জল দিলেন। অ্যাগামেমনন তখন দুহাত তুলে জিয়াসের উদ্দেশ্যে প্রার্থনার ভঙ্গিতে বললেন, হে পরমপিতা দেবরাজ জিয়াস, তিনি পরম শক্তিমান ও আইডা পর্বতশিখর হতে ত্রিভুবন শাসন করেন। হে সবিতৃদেব, যিনি জল স্থল ও অন্তরীক্ষের সবকিছু প্রত্যক্ষ ও শ্রবণ করেন, আপনারা আমাদের এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করুন। হে পাতালের দেবতা, যিনি শপথভঙ্গকারীকে শান্তি প্রদান করেন তিনিও আমাদের শপথ প্রত্যক্ষ করুন। যদি আলেকজান্দ্রাস মেনেলাসকে হত্যা করতে সমর্থ হয় তাহলে সে-ই হেলেন ও তার যথাসর্বস্ব লাভ করবে এবং আমরা সমস্ত দাবি ত্যাগ করে দেশে ফিরে যাব। আর যদি মেনেলাস আলেকজান্দ্রাসকে হত্যা করতে সমর্থ হয় তাহলে ট্রয়বাসীরা হেলেনকে আমাদের হাতে প্রত্যপর্ণ করবে। তার সঙ্গে শাস্তিস্বরূপ এমন কিছু উপঢৌকন আমাদের দান করবে যা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে ভবিষ্যৎ বংশধরদের কাছে। আর যদি রাজা প্রিয়াম ও তাঁর পুত্ররা সে উপঢৌকন না দেন তাহলে আমরা ট্রয়-অবরোধ প্রত্যাহার না করে এখানে অবস্থান করেই যুদ্ধ চালিয়ে যাব।
একথা বলতে বলতে একটি বড় ছোরা নিয়ে বলির জন্য আনীত ভেড়ার গলাগুলো কাটতে লাগলেন অ্যাগামেমনন। তখন ভূতলে পতিত হয়ে শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় হাঁপাতে লাগল মৃতপ্রায় ভেড়াগুলো। তারপর স্বর্ণপাত্র হতে মাটিতে মদ ঢেলে দেবতাদের উদ্দেশ্য প্রার্থনা করতে লাগল উভয় পক্ষের লোকেরা। বলতে লাগল, হে অমর দেবতাবৃন্দ, তোমরা দেখো, যে প্রথম শপথ ভঙ্গ করবে সে যেন এই ভূপাতিত মদের মত মাটিতে গড়াগড়ি যায়।
যতক্ষণ পর্যন্ত না জিয়াস তাদের প্রার্থনা মঞ্জুর করেন ততক্ষণ তারা প্রার্থনা করে যেতে লাগল। কিন্তু ট্রয়রাজ প্রিয়াম বললেন, হে গ্রীক ও ট্রয়বাসীগণ ঝাবিক্ষুব্ধ ট্রয়নগরীতে ফিরে যাচ্ছি আমি, কারণ আমি আমার পুত্রের সঙ্গে মেনেলাসের সম্মুখযুদ্ধ স্বচক্ষে দেখতে পারব না। এদের মধ্যে কার পতন ঘটবে তা একমাত্র সর্বজ্ঞ দেবতারাই জানেন।
এই কথা বলার পর দুটি মেষ তাঁর রথের উপর চাপিয়ে নিজে উঠে রথ চালনা করতে লাগলেন। অ্যান্টিনরের সঙ্গে ইলিয়াম নগরে গিয়ে উপস্থিত হলেন রাজা প্রিয়াম।
মেনেলাস ও আলেকজান্দ্রাসের দ্বৈত লড়াই হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট স্থানটি ভাল করে মেপে দেখলেন হেক্টর ও ওডিসিয়াস। তারপর একটি ব্রোঞ্জনির্মিত শিরস্ত্রাণ উপরে উৎক্ষিপ্ত করে কে আগে আঘাত করবে তা স্থির করলেন। তখন উভয় পক্ষের লোকেরাই প্রার্থনা করতে লাগল। জিয়াসের উদ্দেশ্যে।আইডানিবাসী হে পরমপিতা সর্বশক্তি জিয়াস, তুমি দেখ যে দুবৃত্ত আমাদের সকলকে এই ভয়ংকর সর্বধ্বংসী যুদ্ধে প্রবৃত্ত করেছে তার যেন নরকবাস হয় আর আমরা যেন শপথের শর্তানুসারে দেশে প্রত্যাবর্তন করি।
মাথা ঘুরিয়ে দেখলেন মহান হেক্টর, প্যারিসই প্রথম আঘাত করার অধিকার পেয়েছে। অন্য সকলে আপন আপন আসন গ্রহণ করলেন। সুন্দরী হেলেনের দ্বিতীয় স্বামী আলেকজান্দ্রাস বর্ম পরিধান করে প্রস্তুত হলেন। প্রথমে তিনি রৌপ্যনির্মিত এক
পদাচ্ছাদন দ্বারা জানু পর্যন্ত পাগুলোকে সুরক্ষিত করলেন। তারপর তিনি রৌপ্যখচিত বোঞ্জনির্মিত ঢাল ও তলোয়ার স্কন্ধে ঝুলিয়ে নিলেন। ঈষদান্দোলিত অশ্বপুচ্ছসমন্বিত এক শিরস্ত্রাণ পরিধান করলেন সুন্দর মস্তকে। হস্তে ধারণ করলেন একটি দ্বিমুখী বর্শা। এইভাবে মেনেলাসও অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে উঠলেন একই সঙ্গে।
এইভাবে দুই বীর যোদ্ধা অস্ত্রসজ্জিত হয়ে উঠলে তাঁদের দেখে ভীত হয়ে উঠল উভয় পক্ষের লোকেরা। হস্তধৃত বর্শা নিক্ষেপ করে প্রথম লক্ষ্য স্থির করলেন আলেকজান্দ্রাস। কিন্তু তাঁর সে বর্শা মেনেলাসের ঢালের উপর লেগে প্রতিহত হয়ে ফিরে এল। সে ঢালের কঠিন দেহকে বিদ্ধ করতে পারল না। এরপর মেনেলাস প্রস্তুত হয়ে জিয়াসের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করে বললেন, হে পরমপিতা জিয়াস! আমি যেন আমার অন্যায়কারীর উপর এমন প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারি যে প্রতিশোধের কথা স্মরণ করে ভবিষ্যতের মানুষ শিউরে উঠবে ভয়ে। বিরত থাকবে এই ধরনের পাপ কাজ থেকে। কারো বাড়িতে কেউ আতিথ্য গ্রহণ করে কেউ যেন গৃহকর্তার এমন সর্বনাশ না করে।
এই কথা বলতে বলতে আলেকজান্দ্রাসকে লক্ষ্য করে বর্শা নিক্ষেপ করলেন মেনেলাস। সে বর্শা প্যারিসের ঢালটিকে বিদ্ধ করতে পারলেও প্যারিস অন্যত্র কৌশলে সরে গিয়ে কোনরকমে নিজের প্রাণরক্ষা করলেন। তখন তরবারি দ্বারা মেনেলাস আঘাত করলেন প্যারিসের মস্তকে। কিন্তু কঠিন শিরস্ত্রাণের উপর সে তরবারি সজোরে প্রতিহত হয়ে তিন-চার টুকরা হয়ে গেল। তখন দুঃখে ভারাক্রান্ত চিত্তে সকরুণ কণ্ঠে বলতে লাগলেন মেনেলাস, হে পরমপিতা জিয়াস, তুমি সকল দেবতাদের মধ্যে নিষ্করুণ, তোমারই নির্দয়তার জন্য পূর্ণ হলো না আমার মনস্কামনা। আমার সুদীর্ঘসঞ্চিত প্রতিশোধবাসনা পরিতৃপ্তি সম্পর্কে আমি ছিলাম নিশ্চিন্ত। কিন্তু খণ্ড বিখণ্ড হয়ে গেল আমার তরবারি। ব্যর্থ হয়ে ফিরে এল আমার বর্শা, হত্যা করতে পারলাম না আমি আমার অন্যায়কারীকে।
একথা বলার পর একমুহূর্তে আলেকজান্দ্রাসের কাছে গিয়ে তাঁর শিরস্ত্রাণ শীষশোভিত অশ্বপুচ্ছ ধারণ করে তাকে টানতে লাগলেন মেনেলাস। তাকে হয়তো টেনে নিয়ে যেতে পারতেন মেনেলাস যদি না জিয়াসকন্যা অ্যাফ্রোদিতে সহসা তা লক্ষ্য করে সেই অশ্বপুচ্ছগুলো ছিঁড়ে না দিতেন। সহসা মেনেলাসের হস্তধৃত অশ্বপুচ্ছগুলো ছিঁড়ে যাওয়ায় শুধু শূন্য শিরস্ত্রাণটি খসে পড়ল প্যারিসের মস্তক হতে। তখন মেনেলাস পুনরায় আলেকজান্দ্রাসের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বর্শার দ্বারা বিদ্ধ করতে চাইলেন তাঁকে। কিন্তু এবারেও তাঁকে রক্ষা করলেন দেবী এ্যাফ্রোদিতে। প্যারিসের চারিদিকে মেঘসদৃশ্য একরাশ ঘন কুহেলিজাল বিস্তার করে এমনভাবে দুর্নিরীক্ষা করে তুললেন তাঁকে যে কেউ তাঁকে যে কেউ তাকে দেখতে পেল না। এইভাবে সকলের অলক্ষ্যে অগোচরে প্যারিসকে তার শয়নকক্ষে বহন করে নিয়ে গেলেন দেবী।
তারপর অ্যাফ্রোদিতে হেলেনকে ডাকতে গেলেন তার কক্ষে। কিন্তু দেখলেন হেলেন সেখানে নেই। হেলেন তখন ট্রয়রমণীগণ পরিবৃত হয়ে প্রাসাদশীর্ষ হতে প্যারিস ও মেনেলাসের দ্বৈত দ্বন্দ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করছিল। হেলেন যখন ল্যাসিডিমনে থাকতো তখন তার পোশাক তৈরি করতেন এক বৃদ্ধা রমণী। হেলেন তাকে ভালবাসত।
সেই বৃদ্ধার ছদ্মবেশে হেলেনের কাছে গেলেন অ্যাফ্রোদিতে। তারপর বললেন এদিকে এস, আলেকজান্দ্রাস তোমাকে তার ঘরে ডাকছে। জাকজমকপূর্ণ পোশাকে সজ্জিত ও শোভিত আলেকজান্দ্রাসকে এক অনিন্দ সৌন্দর্যে উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল।
কামদেবীর একথায় ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল হেলেন। দেবীর অনাবৃত গ্রীবা ও বক্ষস্থলের ঐশ্বর্য ও তাঁর অক্ষিযুগলের উজ্জ্বলতা দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলেও ক্রুদ্ধভাবে বলল, আপনি কি আমায় নতুন করে কোন ভ্রান্তির কবলে ঠেলে দিতে চান? আপনি কি আমায় আবার আপনার অভিপ্রেত কোন পুরুষের হস্তে সমর্পণ করতে চান? মেনেলাস এইমাত্র প্যারিসকে পরাজিত করেছে সম্মুখযুদ্ধে। সে আমার এই ঘৃণ্য দেহটি ফিরিয়ে নিয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করবে। আপনি আমাকে ঠিক প্রতারিত করতে চান। আপনার দেবত্ব বিসর্জন দিয়ে আপনি নিজে আলেকজান্দ্রাসের ঘরে যান, তার সঙ্গিনী হয়ে ভাষায় পরিণত হন। আর অলিম্পাসে দেবলোকে ফিরে যাবেন না। আমার পক্ষ থেকে বলতে পারি আমি আর প্যারিসের অঙ্কশায়িনী হব না। আমার হৃদয় এখনও দুঃখ ও অনুতাপে পরিপূর্ণ।
অ্যাফ্রোদিতে তখন ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, অপরিণামদর্শিনী ঔদ্ধত্যপিয়াসিনী নারী, অসংযত বাক্যদ্বারা অহেতুক উত্তেজিত করো না আমায়। যদি তুমি আমার কথা না শোনো তাহলে আমি তোমাকে নির্মম নিয়তির হাতে ছেড়ে দেব। তাহলে আমি গ্রীক ও ট্রয়জাতির মধ্যে এমন ঘৃণা ও বিদ্বেষের সঞ্চার করব যার ফলে তোমার জীবনে নেমে আসবে এক মর্মান্তিক পরিণতি।
কামদেবীর এই ক্রোধত্তপ্ত কথায় ভীত হয়ে উঠল হেলেন। আর কোন বাক্যব্যয় না করে নীরবে নিঃশব্দে এমনভাবে দেবীর অনুসরণ করতে লাগল সে যাতে অন্য কোন রমণী দেখতে পেল না তাকে।
তারা দুজনে আলেকজান্দ্রাসের কক্ষে গিয়ে উপস্থিত হলে পরিচারিকা ব্যস্ত হয়ে উঠল হেলেনের জন্য। কামদেবী তাঁর আসন গ্রহণ করলে হেলেন তীক্ষ্ণ ভাষায় তিরস্কার করতে লাগলেন তার দ্বিতীয় স্বামী প্যারিসকে। হেলেন বললেন, যিনি আমার একদিন স্বামী ছিলেন সেই বীর পুরুষের হাতে পরাজিত হয়ে তুমি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে এসেছ! অথচ আগে তুমি আস্ফালন করে বলতে মেনেলাসের থেকে তুমি সর্বতোভাবে শ্রেষ্ঠ। তাহলে যাও তার কাছে, যুদ্ধে আহ্বান জানাওগে তাঁকে। কিন্তু সে হবে তোমার চরম নির্বুদ্ধিতার কাজ, কারণ তাহলে তার অব্যর্থ বর্শার আঘাতে অবশ্যই পতন ঘটবে তোমার।
প্যারিস এর উত্তরে বললেন, হে আমার প্রিয়তমা স্ত্রী, আমাকে এভাবে ভসনা করো না অকারণে। এবার মেনেলাস দেবী এথেনের সহায়তায় আমাকে পরাস্ত করলেও এরপরে আমি জয়ী হবই, কারণ এমন দেবদেবীর আমারও অভাব নেই যারা আমায় সাহায্য করবেন। এখন এস সুন্দরী, সুরতশয্যায় ঘনসন্নিবিষ্ট হয়ে শায়িত হই দুজনে। আজকের মত আর কোনদিন তোমায় দেখে এতখানি মোহমুগ্ধ হয়ে উঠি নি আমি। যেদিন আমি ল্যাসিডিমন হতে তোমায় হরণ করে নিয়ে আসার পথে ক্রেনা নামক স্থানে নিসর্গসুন্দর নির্জনতার গভীরে ডুব দিয়ে তোমার থেকে প্রথম রতিসুখ উপভোগ করি সেদিনও এতখানি কামচঞ্চল হয়ে ওঠেনি আমার চিত্ত।
এই কথা বলে হেলেনের হস্ত ধারণ করে তাঁর রতিপর্যঙ্কে নিয়ে গেলেন প্যারিস। হেলেনও বিনা প্রতিবাদে অনুসরণ করল তাঁকে।
এইভাবে সেই শয়নপর্যঙ্কে শায়িত হয়ে অবাধে রতিপ্রমত্ত হয়ে উঠল দুজনে।
এদিকে আত্রেউসপুত্র মেনেলাস রণক্ষেত্রে সর্বত্র খুঁজে বেড়াতে লাগলেন পলাতক আলেকজান্দ্রাসকে। কিন্তু কোন পক্ষের কোন লোকই দেখতে পায় নি তাকে। তাছাড়া পেলেও সেই সর্বজনঘৃণ্য আলেকজান্দ্রাসকে মেনেলাসের পবিত্র কোপবহ্নি হতে রক্ষা করার জন্য লুকিয়ে রাখত না।
তখন উঠে দাঁড়িয়ে ট্রয়বাসীদের সম্বোধন করে বলতে লাগলেন রাজা অ্যাগামেমনন, শোন দার্দনীয়া ও ট্রয়বাসীগণ, দ্বৈতযুদ্ধে মেনেলাস জয়ী হয়েছে, অতএব সেই শপথের শর্তানুসারে হেলেনকে প্রত্যপর্ণ করো আমাদের হাতে। তার সঙ্গে আমাদের জাতীয় সম্মানের পক্ষে উপযুক্ত ও ভবিষ্যৎ বংশধরদের পক্ষে স্মরণযোগ্য উপঢৌকন দান করো। আত্রেউসপুত্রের এই কথার হর্ষধ্বনি করে উঠল গ্রীকগণ।