একদিনের যুদ্ধ ॥ ট্রয়সৈন্যর জয়

পীতাম্বরী ঊষাদেবী তার স্বর্ণকিরণমালা মর্ত্যভূমিতে ছড়িয়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গে অলিম্পাসশিখরে দেবতাদের এক সভা আহ্বান করলেন জিয়াস। তিনি তাঁদের সম্বোধন করে বললেন, হে দেবদেবীগণ, আমাকে আমার মনের কথা ব্যক্ত করতে দাও। আমার কথা শোন। যাতে আমি এই অবাঞ্ছিত ঘটনার অবসান ঘটাতে পারি তার জন্য তোমরা সকলে নির্বিবাদে আমার কথা মেনে চলবে, তোমাদের একজনও কেউ আমার কথার অবাধ্য হবে না। যদি তোমাদের কেউ এ আদেশ অমান্য করে ট্রয় বা গ্রীক জাতির কোন লোককে গোপনে সাহায্য করে তাহলে তাকে এমন নির্মমভাবে প্রহার করা হবে যাতে সে আবার অলিম্পাসে ফিরে আসে। অথবা তাকে আমি সুদূর নরকের গভীরতম অন্ধকারে লৌহ ও ব্রোঞ্জনির্মিত ধাতব কারাগারে সজোরে নিক্ষেপ করব যাতে সে বুঝতে পারে কত শক্তি আমি ধারণ করি। আমার শক্তি তোমরা পরীক্ষা করে দেখতে পার। তোমরা একটি লোহার শিকল স্বর্গ হতে সুদূর মর্ত্যভূমি পর্যন্ত ঝুলিয়ে রাখ। সেই স্বর্গে বসে থেকে সেই শিকলের একটি প্রান্ত যদি আমি ধরে থাকি তাহলে মর্তে গিয়ে সেই শিকলের আর একটি প্রান্তভাগ তোমরা সমস্ত দেবতারা মিলিত হয়ে টেনেও আমাকে মর্তে নামাতে পারবে না। কিন্তু আমি যদি তোমাদের টানতে শুরু করি তাহলে গোটা মর্ত্যভূমি সমেত তোমাদের সকলকে টেনে তুলতে পারি স্বর্গলোকে তারপর সেই শিকলটি অলিম্পাসের কোন সুউচ্চ শিখরে বেঁধে রাখব আর তোমরা মধ্য আকাশের সীমাহীন শূন্যতায় অসহায়ভাবে ঝুলতে থাকবে। তখন বুঝবে মর্ত্যের সব মানুষ ও স্বর্গের সকল দেবতা হতে কত বড় শক্তিশালী আমি।
এমন প্রভুত্বসহকারে কথাগুলো বললেন জিয়াস যে সকল দেবতারা ভীত হয়ে বসে রইল নীরবে। কারো কথা কথা বলার সাহস হলো না। একমাত্র এথেন বললেন হে রাজার রাজা দেবপিতা ক্রোনাসপুত্র জিয়াস, তোমার শক্তির অবিসংবাদী অপ্রতিরোধ্যতা সম্বন্ধে আমাদের সকলেরই সম্যক জ্ঞান আছে। তথাপি গ্রীকদের জন্য আমাদের দুঃখ হয়। তারা অযথা ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে এবং এক শোচনীয় পরিণতির দিবে এগিয়ে যাচ্ছে। যদিও তোমাদের আদেশানুসারে যুদ্ধে তাদের আমরা কোনরূপ সক্রিয় সহযোগিতা দান করব না তথাপি আমরা অন্তত কিছু সাহায্যসূচক সঙ্কেত দান করতে পারি যাতে তারা সকলে সবংশে ধ্বংস না হয়।
মৃদ্ হাসি হেসে জিয়াস উত্তর করলেন, ধৈর্য ধরো বৎসে! আমি যা বলেছি তাতে পুরোপুরি গুরুত্ব দান করো না। আমি তোমার উপর সম্পূর্ণরূপে নির্দয় হব না।
এই কথা বলে তাঁর স্বর্ণরথে অশ্ব সংযোজিত করলেন জিয়াস। সে অশ্বে ক্ষুরগুলো ছিল ব্রোঞ্জের এবং কেশরগুলো সুবর্ণনির্মিত। হাতে একটি স্বর্ণচাবুক ধারণ করে সেই সর্বাপেক্ষা দ্রুতগামী অশ্বগুলোকে তাড়না করতেই তারা মর্ত্য ও নক্ষত্রখচিত শূন্য আকাশ মণ্ডলের মধ্যপথে বেগে উড়ে যেতে লাগল। অবশেষে বহুপ্রস্রবণসমন্বিত বন্য জন্তুসকল আইডা পর্বতের এক সর্বোচ্চ শিখরদেশে উপস্থিত হলো। সেই শিখরদেশে ফুল্লকুসুমিত সতত সুবাসিত এক কুঞ্জবনমাঝে একটি সুশীতল বেদী আছে। তার পার্শ্বস্থ স্থানে রথ থামিয়ে রথ হতে অশ্বগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে ঘন মেঘাবরণ সৃষ্টি করে তার মধ্যে লুকিয়ে রাখলেন জিয়াস এবং নিজে সেই বেদীর উপর উপবেশন করে ট্রয়নগরী ও গ্রীক অর্ণবপোতগুলোর পানে তাকিয়ে অবলোকন করতে লাগলেন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রাতরাশ শেষ করে বর্ম পরিধান করল গ্রীকগণ। ওদিকে সারা নগরমধ্যে ট্রয়বাসীরাও অস্ত্র সজ্জায় সজ্জিত হয়ে উঠতে লাগল। যদিও ট্রয়বাসীরা সংখ্যায় ছিল অপেক্ষাকৃত কম তথাপি তাদের নারী ও শিশুদের রক্ষার জন্য প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধে আগ্রহ ও উদ্যম ছিল তাদের অনেক বেশি। তখন সমস্ত নগরদ্বার ছিল উন্মুক্ত এবং সেই সব মুক্ত দ্বারপথে অসংখ্য অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈনিকের দল প্রবেশ করেছিল দলে দলে।
উভয় পক্ষ এক জায়গায় সমবেত হলে শুরু হলো আবার যুদ্ধ। ঢালের সঙ্গে ঢাল, বর্শার সঙ্গে বর্শার হতে লাগল সংঘর্ষ। সে সংঘর্ষের শব্দের সঙ্গে মিলিত হলো তুমুল জয়ধ্বনি এবং হতাহতদের মৃত্যুযন্ত্রণার হৃদয়বিদায়ক চিৎকার। অসংখ্য মানুষের রক্তে লাল হয়ে উঠল পৃথিবীর মাটি।
প্রত্যূষের পর হতে সারা প্রথম প্রহর জুড়ে চলল সেই তুমুল যুদ্ধ। চলল একের পর এক নরহত্যা আর শোনা গেল অস্ত্রের ঝঙ্কার। দিবা দ্বিতীয় প্রহর হতেই একটি মানদণ্ডে উভয় পক্ষের জয় পরাজয় নির্ণয় করার জন্য প্রস্তুত হলেন জিয়াস। তিনি সেই মানদণ্ডের দুদিকের দুটি পাল্লায় গ্রীক ও ট্রয়বাসীদের জন্য নির্দিষ্ট দুটি মৃত্যুর ভাগ্যকে দণ্ডটির মাঝখানে চাপিয়ে সেটিকে তুললেন। দেখলেন গ্রীকদের দিকেই পাল্লাটি ভারী হয়ে ঝুঁকে পড়েছে আর ট্রয়বাসীদের দিকেই পাল্লাটি উপরে উঠে যাচ্ছে। তখন বজ্রনির্ঘোষে গর্জন করে উঠলেন দেবরাজ জিয়াস সেই আইডা পর্বতের শিখরদেশ হতে আর ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল এমনভাবে যা দেখে ভীত হয়ে উঠল গ্রীকরা। ভয়ে। মলিন হয়ে ছুটে বেড়াতে লাগল তারা।
আইডোমেনেউস, অ্যাগামেমনন বা অ্যাজাক্স বীররা কেউ দাঁড়ালেন না সেখানে। একমাত্র নেস্টর একা দাঁড়িয়ে রইলেন। কিন্তু তিনি সেখানে স্বেচ্ছায় ছিলেন না। তাঁর একটি অশ্বের ঘাড়ে আলেকজান্দ্রাসের শরের আঘাত লাগে বলেই তিনি বাধ্য হয়েছিলেন সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে। নেস্টর তখন তার তরবারি দিয়ে অশ্বের লাগাম ও বন্ধনীগুলো কেটে দিচ্ছিলেন। কিন্তু তা দেখে ট্রয়বীর হেক্টর ছুটে আসতে লাগলেন তাঁদের দিকে। নেস্টরকে হয়ত অলক্ষণের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করতে হত সেখানে যদি না ডায়োমেডিস ওডিসিয়াসকে ডেকে সাহায্য করতে বলতেন তাঁকে। ওডিসিয়াসকে সম্বোধন করে ডায়োমেডিস বললেন, হে লার্তেসপুত্র ওডিসিয়াস, কাপুরুষের মত পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে কোথায় পালাচ্ছ? মনে রেখ, এখনো কোন শত্রু সৈন্য নিক্ষিপ্ত বর্শার দ্বারা বিদ্ধ হয় নি তোমার স্কন্ধদেশ। সুতরাং দাঁড়াও, বীরের ঐ প্রচণ্ড আক্রমণ হতে রক্ষা করার কাজে সাহায্য করো আমাকে।
ওডিসিয়াস কিন্তু সে কথায় কর্ণপাত না করে গ্রীক জাহাজে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। তখন টাইডেউসপুত্র একাকী শত্রুপক্ষীয় আক্রমণকে অগ্রাহ্য করে রথচালনা করে উপস্থিত হলেন নেস্টরের নিকটে। গিয়ে বললেন, মহাশয়, আমাদের এই নব যুবক যোদ্ধারা অযথা কষ্ট দিচ্ছে আপনাকে। আজ আপনি বার্ধক্য জর্জরিত, আপনার শক্তি নিঃশেষিত, আপনার সারথি নেই এবং রথাশ্ব শ্লথগতি। সুতরাং আপনি আমার রথোপরি আরোহণ করুন। তারপর দেখুন রাজা ট্রসের এই অশ্বদ্বয় কি করতে পারে, অগ্রগতি বা প্রত্যাবৃত্তি উভয় কাছেই কেমন তারা সিদ্ধ। ঈনিসের কাছে থেকে এ অশ্ব নিয়েছিলাম আমি তাকে পরাস্ত করে। আমার সারথি আপনার অশ্বের পরিচর্যা করুক। চলুন আমরা ট্রয়সৈন্যদের আক্রমণাত্মক নাগালের বাইরে চলে যাই। পরে দেখিয়ে দেব হেক্টরকে আমার হস্তনিক্ষিপ্ত বর্শার গতি কত প্রচণ্ড এবং আমাদের লক্ষ্য কেমন অব্যর্থ।
নেস্টর সেকথা মেনে নিলেন। তিনি রথের উপর আরোহণ করে অশ্বের বল্লা ধারণ করলেন। ডায়োমেডিস-এর সারথি স্থেনেলাস তাঁর অশ্বের দেখাশোন করতে লাগল। কিন্তু হেক্টর তাঁদের দিকে ক্রমেই দ্রুতবেগে অগ্রসর হতে লাগলেন। তখন হেক্টরকে লক্ষ্য করে একটি বর্শা নিক্ষেপ করলেন ডায়োমেডিস। সে বর্শাটি হেক্টরের কোন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে না লাগলেও তা তাঁর সারথি থীবিয়াসপুত্র অ্যানিওপীয়াসের বক্ষ ভেদ করল এবং বন্ধু হাতেই তিনি মৃত অবস্থায় লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে। তাঁর প্রিয় সারথির মৃত্যুতে হেক্টর দুঃখিত ও বিমর্ষ হয়ে পড়লেও তৎক্ষণাৎ অন্য সারথির খোঁজ করতে লাগলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে সাহসী বীর আর্কেপটলিমাসকে পেয়ে নিযুক্ত করলেন তাঁকে তার রথচালনার কাজে এবং রথাশ্বের বল্গা দান করলেন তাঁর হাতে।
কিন্তু তা সত্ত্বেও কোন কিছুই প্রতিহত করতে পারল না গ্রীকদের। তারা সংখ্যাবহুল মেষের পালের মধ্যে প্রবেশ করত ইলিয়াম নগরীতে যদি না ঠিক সেইমুহূর্তে ডায়োমেডিস-এর রথের সম্মুখে জ্বলন্ত অগ্নিগর্ভ এক বজ্রনিক্ষেপ করতেন জিয়াস। বন্ধুটি নেস্টরের হাত হতে পড়ে গেল এবং তার রথাশ্বগুলো প্রত্যাগমনে উন্মুখ হয়ে উঠল। নেস্টর তখন বললেন, শোন ডায়োমেডিস, পশ্চাদপসরণে প্রবৃত্ত করো তোমার অশ্বদের। তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না দেবরাজ জিয়াস আজ তোমার প্রতি ক্রুদ্ধ? আজ তিনি হেক্টরকে জয়ী করতে বদ্ধপরিকর। যদি তাঁর ইচ্ছা হয় আগামীকাল আমাদের দান করতে পারেন জয়ের গৌরব। কোন মানুষই সর্বশক্তিমান জিয়াসের উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করতে পারে না।
ডায়োমেডিস উত্তর করলেন, আপনি যা বলেছেন তা সব সত্য। তবে একটা দুঃখ আমার অন্তর ভেদ করে আমাকে যন্ত্রণা দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। কারণ হেক্টর তাহলে ট্রয়বাসীদের বলবে, আমার ভয়ে তাদের জাহাজে পালিয়ে গেছে টাইডেউসপুত্র। এ গর্ব সে করবেই। তার থেকে পৃথিবী আমায় গ্রাস করুক।
নেস্টর উত্তর করলেন, কি বলছ তুমি টাইডেউসপুত্র? হেক্টর তোমায় কাপুরুষ বলে গর্ব করলেও কোন ট্রয়বাসী বা দার্দানীয় বিশ্বাস করবে না তার কথায়। এমন কি তোমার পতন ঘটলেও কোন ট্রয়রমণী সেকথায় বিশ্বাস করবে না।
এই কথা বলে অশ্বের গতি বিপরীতমুখী করে পশ্চাদপসরণ করতে লাগলেন তাঁরা। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে হেক্টর ও ট্রয়সৈন্যরা কলঙ্ককালিমাযুক্ত নিন্দাবাক্য বর্ষণ করতে লাগলেন তাঁদের প্রতি। হেক্টর চিৎকার করে বললেন, শোন টাইডেউসপুত্র, এতদিন গ্রীকরা তোমার প্রচুর সম্মান দান করেছে, ভোজসভায় পানাহারে তৃপ্ত করেছে। এবার থেকে তারা তোমায় ঘৃণা করবে, কারণ একজন নারীর থেকে কোন অংশে শ্ৰেষ্ঠ নও তুমি। ঠিক আছে, ভয়ে পালিয়ে যাও বালিকাবৎ কাপুরুষ, তোমরা কোনদিন আমাদের নগরপ্রাচীর অতিক্রম করতে বা আমাদের রমণীদের ধরে নিয়ে যেতে পারবে না।
তখন স্বাভাবিকভাবে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে উঠল ডায়োমেডিস-এর মন। অশ্বের গতি ফিরিয়ে তিনি হেক্টরের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন কি না তা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারলেন না। কিন্তু সংশয়াচ্ছন্ন চিত্তে যতবার একথা ভাবতে যান তিনি ততবারই আইডার পর্বতশিখর হতে অগ্নিগর্ভ বজ্র নিক্ষেপ করে জিয়াস এই সংকেত দান করেন যে আজকের যুদ্ধে তিনি হেক্টরকেই জয়ী করবেন। হেক্টর তখন তাঁর সৈন্যদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলতে লাগলেন, হে ট্রয়, লাইসিয়া ও দার্দানিয়া যুদ্ধপ্রিয় জনগণ তোমরা আমার প্রকৃত বন্ধুর মত দেহ-মনের সমস্ত শক্তি দিয়ে যুদ্ধ করো। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি জিয়াস আজ আমাকে ভূষিত করতে চান এক বিরল জয়ের গৌরবে আর গ্রীকদের উপর বর্ষণ করতে চান ধ্বংস আর পরাজয়ের গ্লানি। ওরা নির্বোধের মত যে তুচ্ছ প্রাচীর নির্মাণ করেছে তা আমার গতিবেগের প্রচণ্ডতাকে কোনমতেই প্রতিহত করতে পারবে না। এক অনায়াস উল্লম্ফনে ওদের খনিত পরিখাগুলো অতিক্রম করবে আমার রথাশ্ব। ওদের জাহাজে আমি উপস্থিত হলে তোমরা আগুন এনে দেবোমার হাতে আর তাই দিয়ে আমি অগ্নিদগ্ধ করে মারব। সেই অগ্নি ও ধূমরাশিতে আচ্ছন্ন ও অন্ধ হয়ে যাবে গ্রীকদের চক্ষু।
হেক্টর তারপর তার অশ্বগুলোকে সম্বোধন করে বললেন, হে জ্যানথাস, পদার্গাস, ঈথন ও ল্যাম্পাস, এতদিন যাবৎ আমার স্ত্রী অ্যান্ড্রোমেক তোমাদের যেভাবে লালন ও রক্ষণাবেক্ষণ করে এসেছে, যে মধুবিনিন্দিত শস্যকণা ও মদ্যমিশ্রিত জলের দ্বারা তোমাদের প্রীত করেছে আজ তার প্রতিদান দাও। আমি তার স্বামী। আমার কথা শোন, আমার এই আক্রমণাত্মক অভিযানে দ্রুতগামিতার দ্বারা সাহায্য করো আমাকে। আরও বেগে প্রধাবিত হও তোমরা যাতে আমি আকাশচুম্বী যশে সমৃদ্ধ বীর নেস্টরের ঢালটি সহজে করায়ত্ত করতে পারি, যাতে আমি হিফাস্টাননির্মিত বর্মটি তার স্কন্ধ ও দেহগাত্র হতে বিচ্ছিন্ন করতে পারি। এই দুই কাজ যদি আমি করতে পারি তাহলে আজ রাতেই পালিয়ে যাবে গ্রীকরা। সমুদ্রে পাড়ি দেবে।
কিন্তু হেক্টরের এই দম্ভোক্তি শুনে এক প্রচণ্ড ক্রোধাবেগে বিচলিত হয়ে উঠলেন হেরা তাঁর সিংহাসনে বসে আর সেই প্রবল বিচলনে কেঁপে উঠল সমগ্র অলিম্পাস পর্বতের শিখরদেশ। হে ঝঞ্ঝা ও ভূমিকম্পের দেবতা পসেডন, তোমার মনে কি দয়ামায়া নেই? যে গ্রীকরা তোমার কতবার বলির উৎসর্গের দ্বারা তুষ্ট করেছে সেই গ্রীকদের মৃত্যু ও ধ্বংস দেখে কেন বিচলিত হও না তুমি? আমরা সকল দেবতারা যদি গ্রীকদের সাহায্য করি এবং জিয়াসকে ট্রয়বাসীদের সাহায্য করতে না দিই তাহলে আইডা পর্বতের শিখরদেশে একা বসে বসে এক নিষ্ফল আক্রোশে গর্জন করা ছাড়া কি করতে পারেন তিনি।
এ-কথায় বিশেষভাবে বিচলিত হয়ে উঠলেন ভূকম্পন ও ঝঞ্ঝাধিপতি পসেডন। তিনি উত্তর করলেন, হে দ্রুতভাষিণী দেবরাজ্ঞী হেরা, কি বলছ তুমি? আমরা সাধারণ দেবতারা কখনই দেবরাজ জিয়াসের বিরুদ্ধাচরণ করতে পারি না, কারণ তিনি আমাদের সকলের হতে অধিকতর শক্তিশালী।
এই অবসরে প্রিয়ামপুত্র হেক্টর গ্রীকদের দ্বারা সম্প্রতিনির্মিত সমুদ্রের বেলাভূমিসংলগ্ন সেই প্রাচীর আর পরিখার সন্নিকটে অসংখ্য রথ ও সৈন্য সমাবেশ করতে লাগলেন। জিয়াসের শুভেচ্ছার বলে বলীয়ান হয়ে উচ্চাভিলাষে মত্ত হয়ে উঠেছেন তিনি। যদি সেই মুহূর্তে দেবসম্রাজ্ঞী হেরা গ্রীক সৈন্যদের উৎসাহিত করার জন্য রাজা অ্যাগামেমননকে নির্দেশ দান না করতেন তাহলে হয়ত তখনই গ্রীকদের রণতরীগুলোতে অগ্নিসংযোগ করতেন হেক্টর। সেই দৈব নির্দেশ লাভ করার সঙ্গে সঙ্গে এক নীলবর্ণের বহিরাবরণ বহন করে সমস্ত গ্রীক রণতরীগুলো ঘুরে ঘুরে অবশেষে সমস্ত রণতরীর মধ্যভাগে অবস্থিত ওডিসিয়াসের জাহাজের পাটাতনের উপর এসে দাঁড়ালেন রাজা অ্যাগামেমনন। এই স্থান থেকে কোন কথা বললে আপন আপন জাহাজের আশ্রয়ে বিশ্রামরত সমস্ত গ্রীকসৈন্যগণ শুনতে পারবে তার কথা। এই রণতরীগুলোর এক প্রান্তে আছে বীর অ্যাজাক্স আর এক প্রান্তে আছে অ্যাকেলিসের শিবির। আপন শক্তি ও বীরত্বে সুনিশ্চিত হয়েই দুই দিকের শেষ প্রান্তে শিবির স্থাপন করেছেন তারা। সেই স্থান হতে চিৎকার করে সকলের উদ্দেশ্যে বলতে লাগলেন অ্যাগামেমনন, হীন কাপুরুষ, ইতরপ্রাণীবিশেষ যে গ্রীক-সন্তানগণ, তোমাদের যত বীরত্ব তা শুধু কি তোমাদের বহিরঙ্গেই সীমাবদ্ধ? তোমরা লেমস দ্বীপে শৃঙ্গযুক্ত পশুমাংস ভক্ষণ ও আকণ্ঠ মদ্যপানে তৃপ্ত হয়ে অবশ্যই জয়ী হবে বলে যে সগর্ব। প্রতিশ্রুতি দান করেছিলে তা কি ব্যর্থ হবে? তোমরা সেদিন শপথ করে বলেছিলে, তোমরা এক একজনে একশত ট্রয়বাসীর সমান আর আজ মাত্র একজন হেক্টরের প্রতিরোধ করতে পারছ না? এই হেক্টর অবিলম্বে অগ্নিসংযোগ করবে তোমাদের জাহাজে। হে পরম-পিতা জিয়াস, তুমি কি আমার মত একজন রাজাকে তার সমস্ত গৌরব হতে বঞ্চিত করে তার সমূহ সর্বনাশ সাধন করবে? অথচ ট্রয়নগরী ধ্বংসের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে যখন আমি সমুদ্রযাত্রা করি তখন তোমার প্রতিটি বেদীমূলেই সুপুষ্ট গোবৎস উৎসর্গ করি তোমার উদ্দেশ্যে। অন্তত দয়া করে আমার এই প্রার্থনা টুকু মঞ্জুর কর–আমরা যেন সম্পূর্ণরূপে ট্রয়বাসীদের হাতে পরাস্ত না হই এবং আমরা যেন অন্ততপক্ষে আমাদের প্রাণ নিয়ে পলায়ন করতে পারি।
রাজা অ্যাগামেমননের এই কাতর প্রার্থনায় অনুকম্পা জাগল জিয়াসের মনে। অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল তাঁর চক্ষুযুগল। তিনি তাঁকে এই আশ্বাস দান করলেন যে তাঁর জনগণের প্রাণ রক্ষা পাবে, তাদের মৃত্যু ঘটবে না এ যুদ্ধে। অতঃপর তিনি পক্ষীশ্রেষ্ঠ এক ঈগলশিশুকে পাঠালেন গ্রীকদের মাঝে। গ্রীক জাহাজের অভ্যন্তরভাবে অবস্থিত যে বেদীতে দেবরাজ জিয়াসের উদ্দেশ্যে বলি উৎসর্গ করত গ্রীকগণ সেখানে অকস্মাৎ উড়ে গিয়ে সেই ঈগলশিশুটি বসতেই গ্রীকরা বুঝতে পারল এ ঈগলশিশু জিয়াসের দূত। অধিকতর সাহস ও বিক্রমে প্রমত্ত হয়ে যুদ্ধ করতে লাগল তারা তা দেখে
কিন্তু পরিখাসংলগ্ন শত্রুসৈন্যব্যুহ ভেদ করে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার সাহস একমাত্র টাইডেউসপুত্র ডাওমিডস ছাড়া আর কারো হলে না। এ গর্বে গর্বিত হবার সুযোগ আর কোন গ্রীক পেল না। সকলের আগে এক আক্রমণাত্মক অভিযানে অগ্রসর হয়ে বীর ক্যাডমনপুত্র অ্যাজিনরকে হত্যা করলেন তিনি। অ্যাজিনর পালিয়ে যাবার আগেই ডাওমিডন এর বর্শা তার পৃষ্ঠদেশ ভেদ করে বক্ষস্থপর্যন্ত বিদীর্ণ করে এবং তিনি তৎক্ষণাৎ রথ হতে পড়ে যান।
এরপর এগিয়ে এলেন অভিযানে সাহস ও বীরত্বের জীবন্ত প্রতিমূর্তি রাজা অ্যাগামেমনন, মেনেলাস আর অ্যাজাক্সবীরদ্বয়। এগিয়ে এলেন আইডোমেনেউস, মেরিওন ও ইউরিপাইলাস। এরপর এলেন প্রখ্যাত তীরন্দাজ পিউসার যিনি তেলামনপুত্র অ্যাজাক্সের বিশাল ঢালের ছত্রছায়ায় দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করতে লাগলেন। অ্যাজাক্সের ঢাল থেকে একবার বেরিয়ে এসে শত্রুপক্ষের একজনকে শরবিদ্ধ ও নিহত করে আবার সেই ঢালের আশ্রয়ে অদৃশ্য হয়ে যান টিউসার।
টিউসারকে হত্যা করার মত সাহস কোন ট্রয়বীরের হবার আগেই তিনি ওর্সিলোকাস, ওর্থেলাস, ওফেলেন্টস, দাঁতর, ক্রোমিয়াস, দেবোপম লাইকোফোনটেস, অ্যামোপেসন ও মেলানিপ্লাস–এই দশজন ট্রয়বীরকে হত্যা করলেন। একে এক এই সব ট্রয়বীরদের ধরাশায়ী করলেন যখন টিউসার তাঁর ভয়ঙ্কর ধনুর্বাণ দ্বারা তখন তা দেখে বিশেষ আনন্দিত হয়ে তাঁর কাছে গিয়ে অ্যাগামেমনন বললেন যে, আমার পিতা তেলামনপুত্ৰ গ্ৰীক অধিনায়ক, এইভাবে অবিরাম শরনিক্ষেপ করে যাও, এইভাবে গ্রীকজাতির যশস্বী হয়ে তোমার পিতার গৌরব বৃদ্ধি করো, তুমি তোমার পিতা তেলামনের অবৈধ সন্তান হলেও তোমার শৈশবাবস্থায় তিনিই তোমাকে লালন পালন করেন। সুতরাং আজ তিনি বহু দূরে থাকলেও তাঁর নামকে গৌরবমণ্ডিত করে তোল। আমি তোমাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি এবং সে প্রতিশ্রুতি আমি অক্ষরে অক্ষরে অবশ্যই পালন করব। যদি জিয়াস ও এথেনের কৃপায় ইলিয়াম নগরী ধ্বংস করতে পারি তাহলে আমার পরেই শ্রেষ্ঠ পারিতোষিকে ভূষিত হবে তুমি। তুমি পাবে ত্রিপদবিশিষ্ট কোনও কাষ্ঠ শিল্পকর্ম অথবা অশ্বসংযোজিত এক রথ অথবা কোন সুন্দরী নারী যে শয্যাসঙ্গিনীরূপে প্রীত করবে তোমায়।
টিউসার উত্তর করলেন, হে মহান আত্রেউস পুত্র, যখন আমরা শত্রুপক্ষকে ইলিয়াম নগরীতে তাড়িত করে নিয়ে চলেছি তখন আমাকে এভাবে প্ররোচিত করার কোন প্রয়োজন নেই। তবে জেনে রাখবেন, জীবনে কখনো এর আগে মাত্র একজনকে হত্যা করার জন্য এমনভাবে খুঁজি নি। আমি অনেক শক্ৰযোদ্ধাকে হত্যা করেছি, কিন্তু ঐ উন্মত্ত কুকুরটাকে এখনো পর্যন্ত হত্যা করতে পারি নি।
এই বলে হেক্টরকে লক্ষ্য করে একটি শর নিক্ষেপ করলেন টিউসার। কিন্তু সে শর হেক্টরের পরিবর্তে বিদ্ধ করল অন্যতম প্রিয়ামপুত্ৰ গৰ্গাইথনকে। স্বর্গের দেবীর মত সুন্দরী কাস্তিয়ানেইয়ার গর্ভে জন্ম হয় গৰ্গাইথনের। পর্যাপ্ত ফুলুকুসুমস্তবকান বৃক্ষশাখার মত শিরস্ত্রাণ পরিহিত গৰ্গাইথনের মস্তক অবনত হয়ে ঢলে পড়ল মাটির কোলে।
হেক্টরকে লক্ষ্য করে আবার শর নিক্ষেপ করলেন টিউসার। কারণ হেক্টরকে বিদ্ধ করার জন্য অতিশয় ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন তিনি। কিন্তু অ্যাপোলো যে শরটি স্বহস্তে অন্য দিকে সরিয়ে দেওয়ায় এবারও লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেন টিউসার। তবে সে শর হেক্টরের সারথি আর্কেপটলিমাসের বক্ষস্থল বিদ্ধ করল। রথ হতে আর্কেপটলিমাস পড়ে যেতেই অশ্বগুলো বিচলিত হয়ে পড়ল আর সারথির মৃত্যুতে এবার সবিশেষ দুঃখিত হলেন হেক্টর। কিন্তু কালবিলম্ব না করে তার অদূরস্থিত ভ্রাতা সেব্রিডনের হাতে তুলে দিলেন তাঁর রথাশ্বের বন্ধু। হেক্টর তখন একটি বিরাট আকার প্রস্তরখণ্ড নিক্ষেপ করলেন টিউসারের উপর। টিউসার তখন সবেমাত্র তাঁর ধনুকের ছিলায় একটি নতুন শর সংযোজিত করছিলেন। এমন সময় হেক্টর নিক্ষিপ্ত প্রস্তর খণ্ডটি তার স্কন্ধ ও বক্ষস্থলে জোর আঘাত করল এবং সেই সঙ্গে তাঁর ধনুর্বাণও চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল। সামনের দিকে মুখ করে পড়ে গেলেন টিউসার। তাই দেখে তাঁর ভ্রাতা অ্যাজাক্স ছুটে এসে তাঁর ঢালদ্বারা তাকে রক্ষা করলেন এবং তার সহকারীর এসে টিউসারকে তার জাহাজে যন্ত্রণাকারত অবস্থায় নিয়ে গেল।
জিয়াস আবার অনুপ্রাণিত করলো ট্রয়বাসীদের। হেক্টরের নেতৃত্বে ট্রয়সৈন্যগণ আবার গ্রীকদের বিতাড়িত করে পরিখার ওপারে দিয়ে এল। শিকারকালে কোন বন্য শূকর বা সিংহকে তাড়িয়ে নিয়ে যেতে যেতে যেমন কোন শিকারী কুকুর কেবল তার পশ্চাদভাগ আক্রমণ করে তেমনি হেক্টরও গ্রীকদের বিতাড়িত করে নিয়ে যাবার কালে কেবল তাদের পশ্চাদভাগের সৈন্যদের আক্রমণ করছিলেন। তাদের ভীত সন্ত্রস্ত পশ্চাসরণরত সৈন্যদের হত্যা করেছিলেন। তাদের বহু সহকর্মীকে হারিয়ে গ্রীকসৈন্যরা তাদের পরিখা পার হয়ে আপন আপন জাহাজে গিয়ে পরস্পরের সঙ্গে মন্ত্রণা ও হাত তুলে দেবতাদের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করতে লাগল। কিন্তু হেক্টর বীরবিক্রমে ইচ্ছামত রথাশ্ব ও রথচক্র নিয়ন্ত্রিত করে অপ্রতিহত বেগে বেড়াতে লাগল। যুদ্ধ ও নরহতার দেবতা অ্যারেসের মত অস্বাভাবিকভাবে উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল তাঁকে।
গ্রীকদের এই শোচনীয় অবস্থা দেখে দয়া হলো হেরার। তিনি এথেনকে ডেকে বললেন, হায় বৎসে, গ্রীকদের জন্যে শেষবারের মত কিছু কি ভাবতে পারি না আমরা? এ অপরিসীম ক্রোধবেগের দুর্বিষহ প্রচণ্ডতায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছে প্রিয়ামপুত্র হেক্টর এবং এই একটি লোকের আক্রমণে মৃত্যুবরণ করতে করতে এক শোচনীয় পরিণতির দিকে দুর্বারবেগে এগিয়ে চলেছে তারা।
এথেন উত্তর করলেন, এই লোকটা অনেক আগেই মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য হত তার নগরসীমার মধ্যে, কিন্তু অহেতুক ক্রোধের বশবর্তী হয়ে পিতা জিয়াস আমার উপর অন্যায় অবিচার করেছেন। তিনি ভুলে গেছেন ইউরিথিয়াস প্রদত্ত দুঃখকষ্টের কবল থেকে কতবার আমি তাঁর পুত্র হেরাকলসকে রক্ষা করেছি। একবার ইউরিথিয়াস জিয়াসপুত্র হেরাকলসকে পাতাল হতে নরকের শিকারী কুকুরটি এরেবাসের কাছ থেকে আনতে বলেন। নরকের স্ট্রাইক্স নদীর গভীর জলরাশি পার হয়ে জীবিত অবস্থায় ফিরে আসতে পারতেন না হেরাকলস। তাঁর কাতর চিৎকার সুদূর নরকগর্ভ হতে স্বর্গে উপনীত হওয়ায় তা শুনে জিয়াস আমাকে প্রেরণ করেন তাঁর উদ্ধারের জন্য। কিন্তু আজ তিনি সেদিনের কথা ভুলে গিয়ে আমাকে ঘৃণা করেছেন, কারণ থেটিস তাঁর দাড়িতে হাত বুলিয়ে তাঁর জানু চুম্বন করে বলে। আজ সেই থেটিসের ইচ্ছাই পূরণ করছেন তিনি অ্যাকেলিসকে সম্মানিত করার জন্য। যাই হোক, শীঘ্রই এমন সময় আসবে তখন আমাকেও তিনি স্নেহবশত আদর করতে বাধ্য হবেন। আমাদের অশ্ব প্রস্তুত করো। আমি আমার বর্ম পরিধান করে আসি। তারপর দেখব প্রিয়ামপুত্র হেক্টর যুদ্ধক্ষেত্রে আমাদের দেখে আনন্দিত হয় কি না অথবা ট্রয়সৈন্য গ্রীক রণতরীগুলোর পাশে মৃত্যুবরণ করে শকুনি ও কুকুরদের খাদ্যে পরিণত হয় কি না।
এথেনের কথামত তার সুবর্ণশোভিত রথাশ্বগুলো প্রস্তুত করে বসে রইলেন হেরা। ইতিমধ্যে রণসাজে সজ্জিত হয়ে এলেন এথেন। প্রদীপ্ত বহ্নিশিখাবৎ উজ্জ্বল তার রথে আরোহণ করে একটি বর্শা ধারণ করলেন দৃঢ় মুষ্টিতে। হেরা রথাগুলোকে প্রহার করতেই রথ কালরূপ প্রহরীবেষ্টিত স্বর্গদ্বার অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে লাগল শূন্যপথে।
আইডা পর্বতের শিখর হতে তা দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন জিয়াস। পক্ষবিশিষ্ট বার্তাবহ দূত আইরিসকে পাঠালেন তাদের কাছে। দ্রুতগতি আইরিস, তুমি এখনি তাদের কাছে যাও, তাদের বলগে তারা যেন আমার কাছে না আসে। যদি আমরা দ্বন্দ্বে প্রবৃত্ত হই নিজেদের মধ্যে তাহলে তাদের ক্ষতি হবে। এই কথাই আমি তাদের জানাতে চাই এবং আমার এই কথামতই কাজ করব আমি। আমি তাদের অশ্বগুলোকে রথ হতে বিযুক্ত করে তাদের খণ্ড করে দেব। তাদের নিম্নে নিক্ষেপ করে তাদের অস্থিমজ্জা ভেঙ্গে দেব। আমার বিদ্যুৎ তাদের দেহে যে ক্ষতির সৃষ্টি করবে তা দশ বছরের মধ্যেও আরোগ্যলাভ করবে না। ধূসর চক্ষুবিশিষ্টা আমার কন্যা তখন বুঝতে পারবে তার পিতার সঙ্গে কলহ করার পরিণাম কি। আমি অবশ্য এ ব্যাপারে হেরার প্রতি কম ক্রুদ্ধ এবং তার ঔদ্ধত্যে কম বিস্মিত হব, কারণ স্বভাবতই সব সময়ে সে আমার কথার বিরোধিতা করে।
বায়ুবৎ দ্রুতগামিনী আইরিস আইডা পর্বতের শিখরদেশ হতে যাত্রা করে তৎক্ষণাৎ উপনীত হলেন অলিম্পাস পর্বতের শিখরদেশে। স্বর্গলোকের শেষ দ্বারপ্রান্তে হেরা ও এথেনের সাক্ষাৎ লাভ করলেন তিনি। তাদের দেখে বললেন, আপনারা কি পাগল হয়েছেন, কোথায় যাচ্ছেন আপনারা? ক্রোনাসপুত্র আপনাদের যেতে নিষেধ করেছেন। তার বক্তব্য হলো এই যে তিনি আপনাদের অশ্বকে খঞ্জ করে দেবেন। আপনাদের রথ ভেঙ্গে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেবেন। আপনাদের নিম্নে নিক্ষেপ করবেন এবং তাঁর প্রেরিত বিদ্যুৎ এমন ক্ষতির সৃষ্টি করবে আপনাদের দেহে যা দশ বৎসরের মধ্যে আরোগ্যলাভ করতে পারবে না। তখন বুঝতে পারবেন আপনারা পিতার সঙ্গে কলহ করার প্রতিফল কি। তবে তিনি হেরার প্রতি কম ক্রুদ্ধ।
এই কথা জানিয়ে আইরিস চলে গেল। তখন হেরা এথেনকে বললেন, সত্যি কথা বলতে কি, জিয়াসের বিরুদ্ধাচরণ করে আমি মানুষদের সঙ্গে আর যুদ্ধ করতে চাই না। তারা আপন আপন ভাগ্য অনুসারে বাঁচবে অথবা মরবে। তার আপন ইচ্ছানুসারে ট্রয়বাসী ও গ্রীকদের মধ্যে জয়-পরাজয় নির্ণয় করবেন জিয়াস।
তার রথের গতি ফিরিয়ে দিলেন হেরা। স্বর্গলোকের কালরূপ প্রহরী তাঁদের রথ হতে অশ্বগুলোকে বিযুক্ত করলেন। তারা অলিম্পাসের দেবসভায় গিয়ে আপন আপন আসন নীরবে গ্রহণ করলেন। এক বিষাদসিক্ত ক্রোধের আবেগে মুখগুলো গম্ভীর ও ভারাক্রান্ত হয়ে রইল তাঁদের।
এদিকে আইডা পর্বত হতে তৎক্ষণাৎ রথারূঢ় হয়ে অলিম্পাসে চলে এলেন জিয়াস। যোগদান করলেন দেবতাদের সভায়। জিয়াসের রথ হতে তাঁর অশ্বগুলো বিযুক্ত করলেন পসেডন। জিয়াস তার স্বর্ণসিংহাসনে উপবেশন করলেন। কিন্তু হেরা বা এথেন তার নিকটে গেলেন না। তারা দূরে বিমর্ষ মুখে বসে রইলেন নীরবে। তাদের দেখে জিয়াস বললেন, বল এথেন, বল হেরা, কেন তোমরা ক্রুদ্ধ হয়েছ? ট্রয়বাসীদের হত্যা দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে কি তোমাদের চোখ? যা হবার হবে, আমার ইচ্ছাশক্তির বা কর্মশক্তির গতি পরিবর্তন করার সাধ্য স্বর্গের অন্যান্য দেবতাদের নেই। তোমরা যে যুদ্ধ দেখে ভয়ে কাঁপতে থাকবে। আমি বিদ্যুতের দ্বারা তোমাদের এমন আঘাত করতাম যাতে তোমাদের রথ আর কোনদিন এই অলিম্পাসে ফিরিয়ে আনতে পারত না।
সেকথায় কর্ণপাত না করে দুজনে পাশাপাশি বসে নিম্নস্বরে বিড় বিড় শব্দে কি বলতে লাগলেন হেরা আর এথেন। তাঁরা ট্রয়বাসীদের ক্ষতির কথা চিন্তা করতে লাগলেন। এথেন তাঁর পিতার উপর বেশি ক্রুদ্ধ হওয়ায় ক্রোধের আবেগের প্রবলতাহেতু কোন বাক্যস্ফুরণ হচ্ছিল না তার মুখ হতে। কিন্তু হেরা আর নীরবে বসে থাকতে পারলেন না। তিনি জিয়াসকে সম্বোধন করে বললেন, হে ভয়ঙ্কর ক্রোনাসপুত্র, কি বলছ তুমি? তোমার শক্তির কথা আমরা জানি। তথাপি গ্রীকদের প্রতি আমার অনুকম্পা অনুভব করি। বহুসংখ্যক গ্রীকযোদ্ধা প্রাণ দিচ্ছে, তারা শোচনীয় পরিণতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে! তোমার আদেশমত অবশ্য আমরা যুদ্ধ হতে বিরত থাকব, কিন্তু গ্রীকরা যাতে সকলে ধ্বংস না হয়ে যায় তার জন্য তাদের প্রতি সতর্ক ও সাহায্যমূলক কিছু সঙ্কেত দান করব।
জিয়াস উত্তর করলেন, হেরা শোন, আগামী কাল সকালেই যদি দেখতে চাও ত দেখবে ক্রোনাসপুত্র বহুসংখ্যক গ্রীকদের হত্যা করছে। কারণ প্যাট্রোক্লাসের মৃতদেহ নিয়ে গ্রীকদের রণতরীর কাছে যে তুমুল যুদ্ধ চলছে তাতে গ্রীকবীর অ্যাকেলিস অবতীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত ট্রয়বীর হেক্টর কোনমতেই ক্ষান্ত হবেন না। তুমি পছন্দ করো আর নাই। করো, এটাই হচ্ছে বিধিনির্দিষ্ট এবং যদি তুমি এতে অসন্তুষ্ট হও তাহলে মর্ত্যভূমি অতিক্রম করে সমুদ্রের অতল গর্ভের আলোবাতাসহীন সেই অন্ধকার পাতালপুরিীতে থাকতে পার যেখানে ক্রোনাস ও ল্যাপেটাস বাস করে তার্তারাসের সঙ্গে। তোমার অসন্তোষকে আমি গ্রাহ্য করি না।
হেরা কোন উত্তর করলেন না। ধীরে ধীরে সূর্য তার সব উজ্জ্বলতা হারিয়ে ওসিয়ানাস সাগরসংলগ্ন অস্তাচলে নীরবে ঢলে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে নেমে এল রাত্রির অন্ধকার। সে অন্ধকার দেখে ট্রয়সৈন্যরা কিছু ক্ষুণ্ণ হলো, কারণ তারা ছিল জয়ের পথে ক্ৰমগ্রসরমান এবং যুদ্ধ ছিল তাদের কাম্য। কিন্তু সে অন্ধকার দর্শনে উল্লসিত হয়ে উঠল গ্রীকগণ, কারণ পরাজয়ের গ্লানি ঢাকার জন্য যুদ্ধবিরতির জন্য এই নৈশ অন্ধকারই ছিল তাদের একান্ত অভিলাষিত।
হেক্টর তখন গ্রীকরণতরী সংলগ্ন স্থান হতে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেলেন যুদ্ধরত ট্রয়সৈন্যদের। ট্রয়নগরীর উপান্তে শবসমাচ্ছন্ন স্কামান্দাস নদীর তীরে একটি প্রশস্ত জায়গা বেছে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ট্রয়সৈন্যরা তখন রথ হতে অবতরণ করে হেক্টরের বক্তব্য শোনার জন্য বসে পড়ল সেখানে। একটি দীর্ঘ বর্শা হাতে হেক্টর তাদের সম্বোধন করে বলতে লাগলেন, হে ট্রয় ও দার্দানিয়াবাসীগণ ও মিত্রশক্তিবর্গ, আমার কথা শোন, আমার ইচ্ছা সমস্ত গ্রীকদের ও তাদের রণতরীগুলোকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস না করে আমি ইলিয়াম নগরীতে প্রত্যাবর্তন করব না। কিন্তু রাত্রির অন্ধকার নেমে আসায় প্রতিনিবৃত্ত হতে হলো আমাদের। এই রাত্রিই তাদের আপাতত বাঁচিয়ে দিল। রাত্রির এ নির্দেশ মেনে নিয়ে আমাদের নৈশ ভোজন প্রস্তুত করো। রথ হতে অশ্বদের বিযুক্ত করে তাদের খাদ্য দাও। নগরমধ্যে গিয়ে তোমাদের খাদ্যের জন্য পশু ও মদ্য নিয়ে এস। জ্বালানির জন্য প্রচুর কাঠও এনো যাতে করে সারা রাত্রব্যাপী সতর্ক প্রহরার জন্য এক অনির্বাণ অগ্নিকুণ্ড প্রজ্জ্বলিত রাখতে পারি। গ্রীকরা রাত্রির অন্ধকারে গাঢাকা দিয়ে সমুদ্রে পাড়ি দিতে পারে দেশে ফিরে যাবার জন্য। গ্লানিময় যে ক্লেদাক্ত আঘাত লাভ করেছে তারা আমাদের হাতে সে আঘাত আপন গৃহে গিয়ে প্রিয়জনদের সেবার দ্বারা নিরাময় করে তুলতে চায় তাদের অনেকে। কিন্তু যদি কোন গ্রীক সে চেষ্টা করে তাহলে তৎক্ষণাৎ অর্থাৎ সে জাহাজে করে রওনা হবার সঙ্গে সঙ্গে তাকে লক্ষ্য করে বর্শা বা তীর নিক্ষেপ করবে। যাতে অন্য গ্রীকরা ভয় পায়, আমাদের উপর যুদ্ধ আর দুঃখের বোঝা চাপিয়ে দেবার জন্য অনুশোচনা করতে বাধ্য হয়। আমাদের প্রহরীদের বলে দেবে, তারা যেন নগরের মধ্যে গিয়ে সমস্ত বৃদ্ধ ও তরুণদের বলে দেয় যে তারা সারারাত যেন নগর প্রাকারের উপর শিবির স্থাপন করে প্রহরা দেয় এবং নারীরা যেন ঘরে ঘরে আগুন জ্বেলে সতর্ক দৃষ্টি রাখে যাতে কোন গ্রীক রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে নগরমধ্যে প্রবেশ করতে না পারে। আপাতত আমার এই কথাগুলো পালন করো, রাত্রিশেষে ঊষাকাল আগত হলে নতুন নির্দেশ দান করব তোমাদের। আমরা মনে হয় এই আশা রেখে জিয়াস ও অন্যান্য দেবতাদের মাঝে প্রার্থনা করি যে আমরা যেন ভাগ্যতাড়িত ঐ রক্তলালুপ কুকুরের দলকে আমাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করতে পারি। ভাগ্যই ওদের এখানে তাড়িত করে এনেছে। সারা রাত্রি শুধু ওদের উপর নীরবে সতর্ক দৃষ্টি রাখ, কিন্তু সকাল হলেই বর্ম পরিধান করে প্রচণ্ড বেগে ওদের জাহাজগুলোকে আক্রমণ করবে। তখন আমি দেখব টাইডেউসপুত্র ডায়োমেসিস সেখান থেকে আমাকে তাড়িয়ে দেয় কি আমি তাকে হত্যা করে তার রক্তাক্ত পোশাকগুলো তুলে নিয়ে আসতে পারি। আগামীকাল তার যত সাহস ও বীরত্ব আছে তাকে দেখাতে বলবে আমার কাছে। আগামীকাল প্রাতঃকালে সর্বপ্রথম সে এবং তার কতিপয় সহচরের পতন ঘটবে। যদি আমি দেবতাদের মত বার্ধক্যবিরহিত অমরত্ব লাভ করতে পারতাম, এবং আজকের মত দেবকৃপায় চিরবলীয়ান থাকতে পারতাম তাহলে কত শীঘ্র ধ্বংসসাধন করতে পারতাম গ্রীকদের। হেক্টরের কথা শেষ হলে হর্ষধ্বনি করে উঠল ট্রয়বাসীগণ। তারা প্রথমে তাদের রথ হতে অশ্বগুলোকে বিযুক্ত করে তাদের খাদ্য দিল। তারপর নগর হতে পশু এনে নিষ্কলঙ্ক কয়েকটি পশুকে দেবতাদের কাছে বলি দিয়ে তার মাংস ভক্ষণ করল। উৎসর্গীকৃত সেই বলির পশুগুলোকে অগ্নিদগ্ধ করার সময় তার গন্ধযুক্ত ধুমরাশিকে বাতাস স্বর্গে বহন বহন করে নিয়ে গেল দেবতাদের কাছে। কিন্তু দেবতারা তাদের সে উৎসর্গ গ্রহণ করলেন না, কারণ অধিকাংশ দেবতাই রাজা প্রিয়াম ও ইলিয়াম নগরীর জনগণকে অতীব ঘৃণার চোখে দেখতেন। অথচ ট্রয়বাসীরা আশান্বিত চিত্তে নগরপার্শ্বস্থ সেই স্তব্ধ অন্ধকার রণপ্রান্তরের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় অগ্নিকুণ্ড জ্বেলে সারারাত্রি ধরে সতর্ক প্রহরায় নিযুক্ত রইল। নিস্তরঙ্গ নৈশ বাতাসে নিষ্কম্প নক্ষত্রালোক যেমন উজ্জ্বলরূপে প্রতিভাত হয় তেমনি জ্যানথাস নদীর তীরবর্তী অন্ধকার নিবাস্তব্ধ রণপ্রান্তরে ট্রয়বাসীদের দ্বারা প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুণ্ডগুলোর উজ্জ্বল আলো বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছিল। এক একটি অগ্নিকুণ্ডকে পরিবৃত করে ছিল পঞ্চাশজন করে ট্রয়বাসী এবং এক একটি নিশ্চল রথের পাশে অশ্বগুলো শস্যকণা চর্বন করতে করতে নীরবে ঊষাকালের প্রতীক্ষা করেছিল।