মহামারী ॥ অ্যাগামেমনন ও অ্যাকেলিসের মধ্যে কলহ

হে দেবী, তোমার স্বভাবসুলভ সুললিত কণ্ঠের অপরূপ গীতিমাধুর্যে পেলেউসপুত্র অ্যাকেলিসের প্রচণ্ড ক্রোধাবেগের কারণ বিবৃত করো। বল কিভাবে সে ক্রোধাবেগ একিয়ান বা গ্রীকদের উপর নিয়ে আসে দুর্বিষহ অভিশাপের বোঝ। যেদিন আত্রেউসপুত্র মহারাজ অ্যাগামেমনন ও মহান অ্যাকেলিসের মধ্যে প্রথম কলহের সূত্রপাত হয়, সেদিন হতে দেবরাজ জিয়াসের অভিপ্রায় অনুসারে বাধ্য হয়ে নরকে গমন করে বহু বীরের আত্মা। শকুনি পথ কুকুরদের ক্ষুধার খাদ্যে পরিণত হয় কত বীরের মৃতদেহ।
বল দেবী, যে কোন দেবতা যদি যিনি এই ভয়ঙ্কর কলহের জন্য দায়ী। তবে কি লিটোর গর্ভে উৎপন্ন জিয়াসপুত্র অ্যাপোলোই সেই দেবতা যিনি সহসা ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন রাজা অ্যাগামেমননের উপর এবং তাঁর প্রজাপঞ্জুকে প্রপীড়িত করার জন্য মহামারী নিয়ে আসেন তাঁর রাজ্যে? অ্যাপোলোর ক্রোধের কারণ এই যে, একবার অ্যাগামেমনন রাজপুরোহিত ক্রাইসিসকে চরম অপমান করেন।
একবার আপন কন্যাকে মুক্ত করার জন্য গ্রীকদের জাহাজে গিয়ে অনুনয় বিনয় করেন ক্রাইসিস। সঙ্গে এনেছিলেন কিছু উপঢৌকন। হাতে ছিল ফুলের মালা জড়ানো অ্যাপোলোর রাজদণ্ড। গ্রীকবীরদের সম্মুখে আত্রেউসের দুই পুত্রের কাছে কাতরকণ্ঠে তিনি বললেন, হে মহান আত্রেউসপুত্রদ্বয় ও অন্যান্য গ্রীকবীরগণ অলিম্পাসবাসী দেবতাদের কৃপায় রাজা প্রিয়ামের সুরক্ষিত ট্রয়নগরী বিধ্বস্ত করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করো। কিন্তু তার আগে এই উপঢৌকন গ্রহণ করে আমার কন্যাকে মুক্ত করো। অন্তত জিয়াসপুত্র অ্যাপোলোর প্রতি শ্রদ্ধাবশত এই উপকারটুকু আমার করো।
অন্যান্য গ্রীকদের এ প্রস্তাবে সম্মতি থাকলেও ঘোরতর আপত্তি জানালেন রাজা। অ্যাগামেমনন। বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে বললেন, শোন বৃদ্ধ, তোমাকে যেন আমাদের শিবিরে আর কোনদিন পদার্পণ করতে না দেখি, তোমার হস্তধৃত পুষ্পমালিকাশোভিত ঐ দেবরাজদও কোন উপকার সাধন করতে পারবে না তোমার। আমি তোমার কন্যাকে মুক্ত করব না। আর্গসস্থিত আমার বাসভবনে সারা জীবন বন্দিনী থাকতে হবে তাকে। প্রতিদিন দিনের বেলায় সুঁচের কাজ করে আর রাত্রিবেলায় আমার শয্যাসঙ্গিনীরূপে আমাকে প্রীত করে সে কাটাবে তার সারা জীবন। সুতরাং যাও, আমায় বিরক্ত করো না।
সুন্দরী গ্রীকবন্দিনী ক্রাইসেইসের পিতা ক্রাইসিস ভয়ে বাধ্য হয়ে চলে গেলেন সমুদ্র উপকূলে। নীরবে অপ্রতিবাদে মেনে নিলেন রাজা অ্যাগামেমননের ভয়ঙ্কর নির্দেশ। নির্জন বেলাভূমিতে গর্জনশীল সমুদ্রতরঙ্গের সম্মুখে দাঁড়িয়ে দেবরাজ অ্যাপোলোর উদ্দেশ্যে সকরুণ প্রার্থনার ভঙ্গিতে বললেন, হে দেবরাজ, তোমার হস্তপ্ত যে রজতশুভ্র ধনুর্বাণ দ্বারা তেনেদস ও তোমার স্বর্গরাজ্য রক্ষা করো, যদি আমি তোমার পবিত্র মন্দির ফুলমালা দ্বারা শোভিত করে থাকি কোনদিন, যদি তোমাকে উৎসর্গ করার জন্য ছাগ ও গোমাংস অগ্নিদগ্ধ করে থাকি, তাহলে তোমার সেই ধনুর্বাণ দ্বারা আমার এই নীরব অশ্রুপাতের জন্য অত্যাচারী গ্রীকদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করো অবিলম্বে।
ক্রাইসিসের এই কাতর প্রার্থনায় বিগলিত হলো অ্যাপোলোর অন্তর। এক প্রচণ্ড ক্রোধাবেগে উত্তপ্ত হয়ে নেমে এলেন তিনি অলিম্পাস পর্বতের শিখরদেশ হতে। হস্তে ধনর্বাণ, পৃষ্ঠে তূণ। তাঁর ক্রোধকুটিল আতপ্তগম্ভীর মুখখানাকে রাত্রির মতো কালো করে ক্রমাগত নয় দিন ধরে অসখ্য রজতশুভ্র শর নিক্ষেপ করে যেতে লাগলেন গ্রীক জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে। প্রথমে খচ্চর, শিকারী কুকুর প্রভৃতি জন্তুজানোয়ার, পরে নিহত হতে লাগল অসংখ্য মানুষ। শুরু হলো মড়ক আর মহামারী।
দশ দিনের দিন অ্যাকেলিস গ্রীকদের একত্রিত করে বললেন, হে আত্রেউসপুত্র অ্যাগামেমনন, আমার মতে এই মুহূর্তে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করা উচিত, তা না হলে একদিকে যুদ্ধ আর অন্যদিকে অ্যাপোলোর রোষ সঙ্টিত এই মড়ক ও মহামারীর আঘাতে বিনষ্ট হয়ে যাব আমরা সম্পূর্ণরূপে। দয়া করে কোন পুরোহিত বা ভবিষ্যদ্বক্তা বা কোন স্বপ্নপরীক্ষককে জিজ্ঞাসা করে দেখ ফিবাস বা অ্যাপোলো কেন এত রোষাবিষ্ট আমাদের প্রতি। আমরা কি কোন শপথ ভঙ্গ করেছি, আমরা কি কোন বলির পশু উৎসর্গ করি নি? অথবা জিজ্ঞাসা করে দেখ আমরা তাঁর উদ্দেশ্যে মেষশাবক বা ছাগশিশু উৎসর্গ করলে তিনি এই মড়ক বা মহামারীর শাস্তি প্রত্যাহার করে নেবেন কি না।
এই কথা শুনে জ্যোতিষশাস্ত্রবিশারদ নেস্টরপুত্র ক্যালকাস যিনি তাঁর নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণীর দ্বারা গ্রীক রণতরীগুলোকে ইলিয়ামের পথে নিরাপদে চালনা করে নিয়ে আসেন তিনি এসে বললেন, হে দেববল্লভ অ্যাকেলিস, তোমার আদেশ অনুসারে আমি দেবরাজ অ্যাপোলোর রোষের কারণের কথা বর্ণনা করব, তবে তার জন্য তোমাকে শপথ করতে হবে, আমি আমার কথার দ্বারা এমন একজন রাজাকে রুষ্ট করে তুলব যার জন্য গ্রীকগণ শাপজর্জরিত, সেই রাজা যদি আমার প্রতিও ক্রোধাবিষ্ট হয়ে পড়েন তাহলে কথায় ও কাজে আমাকে সাহায্য করবে তুমি। কারণ কোন একজন সাধারণ মানুষ কখনো কোন রাজার মনে অসন্তোষ সৃষ্টি করে তাঁর প্রতিশোধ আকর্ষণ করে বাঁচতে পারে না। সুতরাং আমাকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দাও।
অ্যাকেলিস তখন উত্তর করলেন, ভয় করো না ক্যালকাস, তুমি যখন এই ভয়ঙ্কর দৈববাণী প্রকাশ করবে তখন গ্রীকসৈন্যদের একজনও এমন কি রাজা অ্যাগামেমনন স্বয়ং সাহস করবেন না তোমার গায়ে হাত তুলতে। সুতরাং বল, অকপটে ব্যক্ত করো।
জ্যোতিষশ্রেষ্ঠ ক্যালকাস তখন সাহসের সঙ্গে বললেন কোন বলি বা উৎসর্গের জন্য রুষ্ট হন নি দেবরাজ, বন্দিনী ক্রাইসিসকন্যাকে মুক্ত না করে রাজপুরোহিত ক্রাইসিসকে যে অপমানিত করেছেন রাজা অ্যাগামেমনন, সেই অপমানের জন্যই ক্রুদ্ধ হয়েছেন দেবরাজ। বন্দিনী ক্রাইসিসকন্যাকে মুক্ত না করা পর্যন্ত এই মড়ক ও মহামারীর শাস্তি হতে তিনি মুক্তি দেবেন না গ্রীকদের।
এই কথা বলে ক্যালকাস নীরবে আসন গ্রহণ করলে উঠে দাঁড়ালেন ক্রুদ্ধ অ্যাগামেমনন। ক্যালকাসের প্রতি গর্জন করে বললেন, হে অশুভ বার্তার ভবিষ্যদ্বক্তা, তুমি আমার জীবনে যত সব অশুভ ভবিতব্যের কথাই ব্যক্ত করো; আমার জীবনের কোন শুভ ঘটনার ভবিষ্যদ্বাণী আজ পর্যন্ত কখনো কর নি। তুমি বলেছ বন্দিনী ক্রাইসিসকন্যাকে মুক্তি দিই নি বলেই অ্যাপোলোর ভয়ঙ্কর অভিশাপের দ্বারা প্রপীড়িত হচ্ছি আমরা। কিন্তু জেনে রেখো, আমি তাকে আমার ধর্মপত্নী ক্লাইতেমোর থেকেও ভালবাসি বলেই আমার অন্যতম জীবনসঙ্গিনীরূপে তাকে আমার বাড়িতে বন্দী করে রেখে দিতে বদ্ধপরিকর আমি। রূপে, গুণে, বুদ্ধি ও উপলব্ধিতে সে আমার স্ত্রীর থেকে কোন অংশে কম নয়। তথাপি আমি আমার প্রজাপুঞ্জের জীবন রক্ষার্থে প্রয়োজন হলে তাকে ত্যাগ করব। কিন্তু তার পরিবর্তে অন্য এক নারীকে পারতোষিকরূপে এনে দিতে হবে আমায়।
তখন অ্যাকেলিস বললেন, হে মহান আত্রেউসপুত্র, মানবজাতির মধ্যে সর্বাপেক্ষা উচ্চাভিলাষী তোমার পারিতোষিকস্বরূপ অন্য এক নারী কোথায় খুঁজে পাবে গ্রীকরা? যে সব শত্রুনারীকে জয় করে বন্দী করেছি আমরা তাদের আগেই অন্যান্য গ্রীকবীরদের পারিতোষিকরূপে দান করা হয়েছে। সুতরাং পূর্বপ্রদত্ত সেই সব নারীকে তো আর তাদের কাছ থেকে ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। এই সব পর্যালোচনা করে বন্দিনী ক্রাইসিসকন্যানে তুমি দেবতাদের হাতে প্রত্যার্পণ করো। দেবরাজ জিয়াসের কৃপায় যদি আমরা ট্রয়নগরী জয় করতে পারি তাহলে এরপর তিন চারগুণ পারিতোষিক দিয়ে তুষ্ট করব তোমায়।
এর উত্তরে অ্যাগামেমনন বললেন, অ্যাকেলিস যত বড় বীরই হও না কেন, বুদ্ধিতে পেরে উঠবে না তুমি আমার সঙ্গে। তোমরা যখন তোমাদের আপন আপন বন্দিনীকে কাছে রেখে উপভোগ করে যাবে তাদের আমি তখন কেন তোমার আদেশে আমার বন্দিনীকে ত্যাগ করব? যদি তোমরা আমার মনোম নারীকে এনে নিতে না পার তাহলে আমি তোমার বা অ্যাজাক্স অথবা ওডিসিয়াস-এর বন্দিনীকে গ্রহণ করব। কিন্তু এ বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। আপাতত একটি জাহাজে করে এক বলির পশুকে দেবতার কাছে উৎসর্গ করার জন্য পাঠিয়ে দাও। সঙ্গে যাক পুরোহিত ক্রাইসিস আর একজন গ্রীকবীর। এই বলির দ্বারা দেবতার রোষকে প্রশমিত করার চেষ্টা করগে।
গর্জন করে উঠলেন অ্যাকেলিস লোভ আর মাৎসর্যের গভীরে আকণ্ঠ মগ্ন তুমি। গ্রীকদের মধ্যে এমন কে আছে যে তোমার আদেশ তোমার ভয়ে অথবা স্বেচ্ছায় মেনে নেবে? কত পর্বতমালা ও গর্জনশীল সমুদ্রের দুরন্ত বাধা অতিক্রম করে আমি এখানে যুদ্ধ করতে এসেছি শুধু মেনেলাস আর তোমার খাতিরে। ট্রয়বাসীদের সঙ্গে আমার কোন বিবাদ নেই, তারা আমার কোন ক্ষতি করে নি অথবা আমার কোন দ্রব্য অপহরণ করে নি। যদিও ট্রয়যুদ্ধে আমি সবচেয়ে সাহস ও বীরত্ব দেখিয়েছি, সবচেয়ে বেশি কষ্ট স্বীকার করেছি তথাপি পারিতোষিক দিক থেকে লাভবান হয়েছ তুমিই সবচেয়ে বেশি। সুতরাং এভাবে একমাত্র শুধু তোমার স্বার্থ পূরণ করে নিজেকে অপমানিত করে যাওয়ার থেকে আমি দেশে ফিরে যাবো আমার জাহাজ ও সৈন্যদের নিয়ে।
অ্যাগামেমনন বললেন, ইচ্ছা করলে যেতে পার তুমি। আমি কোন অনুরোধ করব না থাকতে। তুমি ছাড়া আমার স্বার্থ দেখার জন্য অনেকেই আছে এখানে। সবচেয়ে বড় কথা, আমার সহায় আছেন দেবরাজ জিয়াস। তুমি বড় কলহপ্রিয় ও আক্রমণাত্মক। তোমার মত আর কোন রাজাকে আমি এতখানি ঘৃণা করি না। মনে রেখো, যত বড় বীরই তুমি হও না কেন, সে বীরত্ব ঈশ্বরেরই দান। যাও, তোমার জাহাজ আর দলবল নিয়ে তোমার দেশ মার্মিডনে ফিরে যাও, দেশ শাসন করগে। ঠিক আছে, অ্যাপোলো যদি আমার বন্দিনী ক্রাইসেইসকে চান তাহলে আমি তাকে জাহাজে করে সঙ্গে আমার অনুচর দিয়ে পাঠিয়ে দেব। তবে তারপর আমি তোমার বন্দিনী ব্রিসেইসকে তোমার তাঁবুতে গিয়ে ধরে নিয়ে আসব যখন তখন বুঝতে পারবে আমি কত শক্তিধর তোমার থেকে এবং আমার সে শক্তির প্রতিরোধ করা কত বড় কঠিন কাজ।
এ কথায় প্রচণ্ড হয়ে উঠল পেলেউসপুত্রের ক্রোধাবেগ। তখন দ্বিধাবিভক্ত চিত্তে ভাবতে লাগলেন তিনি। তরবারি উন্মুক্ত করে তিনি তৎক্ষণাৎ আত্রেউসপুত্রকে হত্যা করবেন না তার উত্তাল ক্রোধাবেগকে শান্ত করবেন তা বুঝে উঠতে পারলেন না।
এইভাবে অ্যাকেলিস যখন দ্বিধাবিভক্ত চিত্তে কোষ হতে তরবারি নিষ্কাশিত করার উদ্যোগ করছিলেন তখন এথেন স্বর্গ থেকে নেমে এলেন সহসা। তিনি অ্যাকেলিসের মাথার চুল ধরে টানছিলেন। একমাত্র অ্যাকেলিস ছাড়া কেউ তাঁকে দেখতে পেল না। কারণ যেকোন মানবচক্ষের কাছে তিনি ছিলেন দুর্নীরিক্ষ্য। কথিত আছে, ধূসর বর্ণের চক্ষুতারকাবিশিষ্ট এথেনের উদ্ভব হয় জিয়াসের মস্তক হতে, স্বর্গস্থিত টিটোনিস হ্রদের ধারে। তিনি ছিলেন জ্ঞান, বিদ্যা, শিল্পকলা ও শান্তির অধিষ্ঠাত্রী দেবী।
অ্যাকেলিসের কেশপাশ আকর্ষণ করতেই অ্যাকেলিস ঘুরে চোখের আগুন দেখে চিনতে পারলেন এথেনকে। তিনি ভয়ে ভয়ে বললেন, হে জিয়াসকন্যা তুমি কি এই দুর্বিনীতি অ্যাগামেমননের গর্বোদ্ধত আচরণ ও অপকর্ম স্বচক্ষে দেখার জন্য নেমে এসেছ সুউচ্চ স্বর্গলোক থেকে? তবে দেখ, ওর এই অপকর্মের জন্য কিভাবে প্রাণবিসর্জন দিতে হয় ওকে।
শান্ত কণ্ঠে এথেন বললেন, আমি স্বর্গ থেকে এসেছি তোমার ক্রোধাগ্নিকে শান্ত করার জন্য। তোমাদের প্রতি স্নেহবশত জিয়াসপত্নী হেরা আমায় পাঠিয়েছেন। আমার কথা শোন, মুখে যা কটুবাক্য বলার বল। অসি নিষ্কাশিত করো না। আজ যদি তুমি এই দৈব আদেশ মেনে নিয়ে যথোপযুক্ত ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিতে পার তাহলে এর পুরস্কারস্বরূপ ভবিষ্যতে এত তিনগুণ সুফল তুমি লাভ করবে।
এর উত্তরে অ্যাকেলিস বললেন, দেবী, আমি যত ক্রুদ্ধই হই না কেন, শিরোধার্য করে নিলাম তোমার আদেশ। যে মানুষ দৈব আদেশ মেনে নেয় অপ্রতিবাদে তার প্রার্থনায় অবশ্যই অভয় দেন তারা।
অ্যাকেলিস তরবারির রজতনির্মিত হাতলে হাত দিয়ে কোষবদ্ধ করে রাখলেন সেটিকে। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন এথেনের আদেশে। তখন নিশ্চিন্ত মনে অন্যান্য দেবতাদের সঙ্গে মিলিত হবার জন্য জিয়াসকন্যা এথেন চলে গেলেন স্বর্গস্থিত অলিম্পাস পর্বতের শিখরদেশে।
কিন্তু এথেন চলে যেতেই অ্যাগামেমননকে লক্ষ্য করে আবার শুরু হলো তাঁর নিন্দাবাক্যবাণবর্ষণ। বললেন, কাপুরুষ! তোমার মুখখানা কুকুরের মত এবং তোমার অন্তরটা বনহরিণীর মত ভীরু, দুর্বল। তুমি যে দুর্বল জনগণের রাজা তাদের ধরে ধরে গ্রাস করো, যে কোন লোকের রক্ষিতাকে ধরে আন। স্বর্গীয় বিধানের রক্ষকস্বরূপ এই ন্যায়দণ্ড স্পর্শ করে আমি শপথ করছি যে তোমার প্রজাগণ এবার হতে অ্যাকেলিসকে শ্রদ্ধার চোখে দেখবে আর এই যে তুমি আমাকে অপমান করলে এর জন্য তোমার অন্তর একদিন অসহায়ভাবে বিদীর্ণ হবে এবং ট্রয়বীর হেক্টরের দ্বারা নিপীড়িত ও মরণাপন্ন তোমার প্রজাদের তুমি কোনভাবে কোন সাহায্যই করতে পারবে না।
এই কথা বলে পেলেউসপুত্র অ্যাকেলিস স্বর্ণখচিত ন্যায়দণ্ডটিকে সজোরে ঘর্ষণ করলেন ভূমিপরে। তারপর আসন গ্রহণ করলেন। ওদিকে অ্যাগামেমনন তাঁর আপন আসনে বসে গর্জন করতে লাগলেন ভয়ঙ্করভাবে।
তখন পাইলস অধিপতি বাগীশ্রেষ্ঠ নেস্টর উঠে দাঁড়িয়ে মধুনিষ্যন্দী কণ্ঠে বলতে লাগলেন, আপনারা জানেন সমগ্র গ্রীকজাতির উপর নেমে এসেছে এক বিরাট দুঃখ ও বিপর্যের অভিশাপ। আপনারা দুজনেই বীর যোদ্ধা এবং সমরকুশলী। আপনাদের দুজনের মধ্যে সংঘটিত এই বিবাদের সংবাদ যদি ট্রয়নগরীতে কোনভাবে উপনীত হয় তাহলে অবশ্যই আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠবেন রাজা প্রিয়াম ও তাঁর পুত্রগণ। উল্লাসে ফেটে পড়বে ট্রয় রাণীগণ। আমি আপনাদের দুজনের থেকেই বয়সে প্রবীণ। আমার কথা সকলেই শোনে শ্রদ্ধার সঙ্গে। আপনারা আমার কথা শুনুন। মানবজাতির মধ্যে যারা শ্রেষ্ঠ বীর হিসেবে সর্বজনবন্দিত সেই পিরিথিয়, ড্রায়াস, কেথিয়াস, অ্যাকজ্যাডিয়াস ও থিথিয়াসপুত্র ঈগাস, যারা দুর্ধর্ষ পার্বত্য উপজাতিদের সম্মুখযুদ্ধে সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত ও নির্জিত করেন, যাদের প্রতিরোধ করা কোন মানুষের পক্ষেই সম্ভব না, তাঁরা সকলেই আমার কথামত কাজ করতেন। সুতরাং আপনারা আমার পরামর্শ শুনুন। সুতরাং হে বীর অ্যাগামেমনন, আপনি অধিকতর বলশালী হলেও যে বন্দিনী নারীকে গ্রীকগণ অ্যাকেলিসকে দান করেছে তাঁর পারিতোষিকস্বরূপ সে বন্দিনীকে আপনি জোরপূর্বক কেড়ে নেবেন না; শুনুন অ্যাকেলিস, দেবরাজ জিয়াসের কৃপায় যিনি রাজদণ্ড ধারণ করেছেন সেই দেবানুগৃহীত রাজা অ্যাগামেমননের সঙ্গে আপনি আর বিবাদ করবেন না। যদিও আপনি কোন দেবকন্যার গর্ভজাত ও দৈব আশীর্বাদধন্য মানবসন্তান তথাপি দৈহিক শক্তির দিক হতে রাজা অ্যাগামেমনন অধিকতর শক্তিশালী আপনার চেয়ে। কারণ তাঁর জনবল বেশি। হে আত্রেউসপুত্র, আপনার ক্রোধ সংবরণ করুন। আপনি অ্যাকেলিসের সঙ্গে সমস্ত বিবাদ বিসম্বাদ মিটিয়ে ফেলুন। মনে রাখবেন, যুদ্ধকালে অ্যাকেলিসের শক্তি ও সাহস গ্রীকদের পক্ষে এক অত্যাবশ্যক স্তম্ভম্বরূপ।
অ্যাগামেমনন উত্তর করলেন; মহাশয় যা বললেন তা সবই সত্য। কিন্তু অ্যাকেলিস আমাদের সকলের স্বাধীনতা ও সম্মানের উপর হস্তক্ষেপ করে আমাদের সকলের উপর আধিপত্য করতে চান। দৈবানুক্রমে উনি বীর যোদ্ধার গৌরব অর্জন করেছেন বলে উনি কি আমাদের অপমান করার অধিকারও লাভ করেছেন।
অ্যাকেলিস তখন তাকে বাধা দিয়ে বললেন, আমি যদি তোমার এই সব দর্প সহ্য করি তাহলে লোকে আমায় বলবে হীন কাপুরুষ। আমার জাহাজ হতে কোন বস্তুই তুমি জোর করে নিয়ে যেতে পারবে না। সে চেষ্টা যদি তুমি করো তাহলে আমার এই সুতীক্ষ্ণ বর্শাফলকে রঞ্জিত হয়ে উঠবে তোমার রক্ত।
এইভাবে তীব্র বাদ-প্রতিবাদের মধ্যে অসম্পূর্ণ রয়ে গেল অ্যাগামেমনন ও অ্যাকেলিসের কলহ। তারা আপন আপন জাহাজে চলে গেলেন। অ্যাগামেমনন ওডিসিয়াসের নেতৃত্বে একদল লোক সঙ্গে নিয়ে একটি স্বতন্ত্র জাহাজে করে ক্রাইসেইসকে দেবতাদের কাছে পাঠিয়ে দিলেন।
ক্রাইসেইসকে পাঠিয়ে দেবার পর সমুদ্রকূলে প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুণ্ডে দেবতাদের উদ্দেশ্যে ছাগ ও বলদ উৎসর্গ করলেন রাজা অ্যাগামেমনন। তিনি কিন্তু ভুলে যান নি তার প্রতিজ্ঞার কথা। অ্যাকেলিসকে যে কথা বলে তিনি শাসিয়েছেন সেকথা মিথ্যা আস্ফালন বা বাগাড়ম্বর নয়। সেকথা তিনি কার্যে রূপায়িত অবশ্যই করবেন। তিনি টলথিবিয়াস ও ইউরিবেটস নামে দুইজন বিশ্বস্ত অনুচরকে ডেকে বললেন, যাও, তোমরা এই মুহূর্তে পেলেউসপত্র অ্যাকেলিসের শিবিরে গিয়ে তার বন্দিনী ব্রিসেইসকে হাত ধরে জোর করে এখানে নিয়ে এস। সে যদি তার বন্দিনীকে তোমাদের কোনমতে দেয় তাহলে আরও লোকজন সঙ্গে নিয়ে আমি নিজে গিয়ে তাকে নিয়ে আসব।
এই নির্দেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্মিডনের জাহাজে চলে গেল অ্যাগামেমননের অনুচরদ্বয়। তাদের দেখে নিবিড় বিরক্তিতে কুঞ্চিত হয়ে উঠল অ্যাকেলিসের মুখমণ্ডল। অ্যাকেলিসের মুখ দেখে ভয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল অ্যাগামেমননের অনুচরদ্বয়। অ্যাকেলিস তাদের চিনতে পেরে বললেন, স্বাগত হে দূতগণ, তোমাদের সঙ্গে আমার কোন বিবাদ নেই। যে অ্যাগামেমনন আমার বন্দিনীকে নিয়ে যাবার জন্য তোমাদের পাঠিয়েছেন, আমার যত কিছু বিরোধ সেই অ্যাগামেমননের সঙ্গে। তিনি ব্রিসেইসকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যাবার জন্য পাঠিয়েছেন। সুতরাং প্যাট্রোক্লাস, ব্রিসেইসকে নিয়ে এসে ওদের হাতে তুলে দাও। তবে স্বর্গের দেবতাবৃন্দ এবং মর্তে এই সব মানুষ সাক্ষী থাক, তারা দেখুন অ্যাগামেমননের ক্রোধ কত প্রচণ্ড। আর তারা আরও শুনে রাখুক ভবিষ্যতে যদি গ্রীক জনগণকে বাঁচাবার জন্য আমার সাহায্যের কখনো প্রয়োজন। হয় তাহলে কিন্তু আমাকে কোনদিন তারা পাবে না। ক্রোধের আবেগে এমনই অন্ধ হয়ে উঠেছেন অ্যাগামেমনন যে তিনি ভূত বা ভবিষ্যৎ কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না, কিভাবে গ্রীকরা নিরাপদে যুদ্ধ করতে পারে সেকথাও একবার ভেবে দেখছেন না।
অ্যাকেলিসের কথামত বন্দিনী ব্রিসেইসকে তাঁবুর ভিতর থেকে এনে অ্যাগামেমননের দূতগণের হাতে তুলে দিল প্যাট্রোক্লাস। ব্রিসেইসের মন চাইছিল না ওদের সঙ্গে যেতে। কিন্তু কোন উপায় ছিল না।
দুঃখে জল এল অ্যাকেলিসের চোখে। একাকী সমুদ্রতীরে গিয়ে চোখের জল ফেলতে লাগলেন নীরবে। সীমাহারা সমুদ্রের অনন্ত জলরাশির পানে তাকিয়ে তার মাতা সমুদ্রতলবর্তিনী এক দেবকন্যার উদ্দেশ্যে বলতে লাগলেন, হে মাতঃ, তুমি কি
আমার এই দুঃভোগের জন্যই গর্ভে ধারণ করেছিলে? দেবরাজ জিয়াস একটু অনুগ্রহ করলে আমার জীবন গৌরবময় হয়ে উঠত এর থেকে অনেক বেশি। যে জিয়াস অলিম্পাস পর্বতের কোন দুর্নীরিক্ষ্য শিখরদেশ হতে বজ্রনিক্ষেপ করেন তিনি আমাকে কোন কৃপা প্রদর্শন করেন নি বলেই আত্রেউসপুত্র অ্যাগামেমনন আমাকে অপমানিত করে আমার বন্দিনীকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল আমার কাছ থেকে। একথা বলতে বলতে উচ্চৈঃস্বরে রোদন করতে লাগলেন অ্যাকেলিস। সেই সকরুণ রোদনধ্বনি শুনতে পেয়ে সমুদ্রতল থেকে উঠে এলেন তাঁর মাতা থেটিস। একচাপ ধূসর কুয়াশার আকার ধারণ করে কোন এক বিশাল সমুদ্রতরঙ্গশীর্ষে আরোহণ করে থেটিস এসে ক্রন্দনরত অ্যাকেলিসের সম্মুখে উপবেশন করলেন। অদৃশ্য হস্তে অ্যাকেলিসকে সান্ত্বনা দান করে বললেন, বল পুত্র, তোমার দুঃখের কারণ কি? আমার কাছে কোন কিছু গোপন না করে সব কিছু বিবৃত করো।
একটি দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে অ্যাকেলিস বললেন, আমি যে কাহিনী বিবৃত করব তোমার সকাশে তা তোমার অজ্ঞাত নেই মাতঃ। তবু শোন আমার কাহিনী। আমরা একবার থবস নগরী ধ্বংস করে কয়েকজন বন্দিনীকে নিয়ে আসি। তাদের মধ্যে অন্যতম গ্রীকবীর অ্যাগামেমনন পায় ক্রাইসিসকন্যা সুন্দরী ক্রাইসেইসকে আর আমি পাই বিক্রিয়াসকন্যা ব্রিসেইসকে। কিন্তু যেহেতু ক্রাইসিস জিয়াসপুত্র রোগ ও মহামারীর দেবতা অ্যাপোলোর পুরোহিত ও অনুগ্রহভাজন ব্যক্তি, তাঁর অনুরোধক্রমে স্বয়ং অ্যাপোলো সমগ্র গ্রীকজাতির মধ্যে ছড়িয়ে দেন ভয়ঙ্কর এক মড়ক আর মহামারী এবং আমাদের আদেশ করেন ক্রাইসিসকন্যা ক্রাইসেইসকে ফিরিয়ে দেবার জন্য। তখন আমরা বাধ্য হয়ে অ্যাপোলোকে সন্তুষ্ট করার জন্য ক্রাইসেইসকে কিছু বলির পশুসহ তাঁর পিতার কাছে পাঠিয়ে দিই। কিন্তু এর জন্য অ্যাগামেমনন তার দূত পাঠিয়ে আমার বন্দিনী ব্রিসেইসকে জোর করে নিয়ে যায়।
যদি পার তোমার এই বীর পুত্রকে সাহায্য কর মাতঃ। এই মুহূর্তে তুমি অলিম্পাস পর্বতে গিয়ে দেবরাজ জিয়াসের সাহায্য প্রার্থনা করগে। একবার হেরা, জলদেবতা পসেডন ও প্যালাস এথেন ক্রোনাসপুত্র জিয়াসকে বিপদে ফেললে কিভাবে তুমি অতল সমুদ্রগর্ভ হতে শতহস্ত সমন্বিত এক আশ্চর্য দানব ব্রিয়াবিয়াসকে (মানুষে যা বলে ঈজিয়ন) ডেকে এনে বিপন্মুক্ত করো জিয়াসকে–সেকথা তুমি তাঁকে স্মরণ করিয়ে দাওগে। তাঁর জানু ধরে অনুনয়বিনয়সহকারে প্রার্থনা জানাওগে তাঁর কাছে তিনি যেন ট্রয়বাসীদের সুযোগ-সুবিধা দান করে আর গ্রীকরা যেন তাদের সমুদ্রোপকূলবর্তী জাহাজগুলোর মধ্যে থেকে এমনভাবে শক্রপরিবৃত ও বিপদাপন্ন হয়ে পড়ে যাতে তারা জাহাজ থেকে নামতে না পারে। তাদের রাজা অ্যাগামেমনন তাদের রক্ষা করুক আর অ্যাগামেমননও যেন অজ্ঞতা ও মূঢ়তাবশত আমাকে অপমানিত করে যে ভুল করেছে তারজন্য আক্ষেপ ও অনুশোচনা করতে বাধ্য হয়।
অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে তখন দেবী থেটিস বললেন, হে পুত্র! ধিক আমায়! আমি তোমাকে গর্ভে ধারণ করেছি, স্তন্য দান করে লালন করেছি। অথচ তুমি সর্বপ্রকার বিপদ হতে মুক্ত হয়ে তোমার জাহাজে কালযাপন করতে পারছ না। এটা খুবই দুঃখের কথা যে তোমার এই স্বল্পপরিসর জীবনের মধ্যে এত দুঃখ তোমাকে ভোগ করতে হচ্ছে। যাই হোহাক, গ্রীসদেশের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত গ্রীকদেবতাদের আবাসভূমি অলিম্পাস পবর্তের তুষারাবৃত শিখরদেশে গিয়ে জিয়াসের কাছে এ কাহিনী আমি বিবৃত করব। কিন্তু বর্তমানে জিয়াস অন্যান্য দেবতাদের সঙ্গে ইথিওপিয়া গেছেন প্রাকৃতিক শাক্তিনিচয়ের দেবতা ওসিয়ানাসের সঙ্গে এক ভোজসভায় মিলিত হবার জন্য। দ্বাদশ দিন পর স্বস্থানে প্রত্যাবর্তন করবেন তিনি। ইতিমধ্যে তুমি ট্রয়যুদ্ধ হতে বিরত হয়ে আপন জাহাজে অলসভাবে বসে থেকে গ্রীকদের প্রতি এক নীরব নিরুচ্চার ক্রোধ পোষণ করবে অন্তরে। আমি যথাসময়ে দেবরাজ সকাশে গিয়ে তাঁকে প্ররোচিত করব এ কাজে।
বুকের মধ্যে এক প্রচণ্ড ক্রোধ আর দুঃখ বহন করে চলে গেলেন থেটিস। এদিকে ওডিসিয়াস দেবপুরোহিতের কাছে গিয়ে অ্যাপোলোর পূজাদেবীর সম্মুখে ক্রাইসেইস ও বলির পশুগুলোকে দান করলেন রাজা অ্যাগামেমননের পক্ষ থেকে। তখন ক্রাইসিস অ্যাপোলোর নিকট প্রার্থনা করলেন, হে দেবতাশ্রেষ্ঠ অ্যাপোলো, তুমি যেমন আমার পূর্বেকার প্রার্থনা শুনেছিলে তেমনি এখনকার প্রার্থনার কথা শোন, গ্রীকগণের উপর থেকে মহামারীর অভিশাপ তুলে নাও।
এ প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন অ্যাপোলো। তখন বলির পশুগুলোকে কেটে চর্বি মাখিয়ে প্রজ্জ্বলিত কাষ্ঠাগ্নিতে ঝলসিয়ে সকলে মিলে দেবতাদের প্রসাদ হিসেবে খেতে লাগলেন। মাংসের পর মদ। প্রাণভরে সকলে মদ পান করলেন। যুবকরা ওজস্বিনী স্তোত্রগান করতে লাগল। সে গানের গুরুগম্ভীর ধ্বনি শুনে প্রীত হলেন দেবতারা। তারপর রাত্রির অন্ধকার ঘন হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে জাহাজের মধ্যেই নিদ্রাভিভূত হয়ে পড়ল তারা।
রাত্রির অন্ধকার অপগত হবার সঙ্গে সঙ্গে গোলাপকলিকাতুল্য অঙ্গুলিসম্পন্ন প্রভাত তনয় বাল তপনদেব উদিত হলেন পূর্বাকাশে। রাজা অ্যাগামেমননের দূতগণ জাহাজ ত্যাগ করলেন প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্যে। অ্যাপোলো দিলেন অনুকূল বাতাস। অনুকূল। বাতাসে দুপাশে শুভ্রফেনপুঞ্জসমন্বিত তরঙ্গ তুলে এগিয়ে চলল গ্রীকদূতদের জাহাজ। ফিরে এল তারা আপন শিবিরে।
এদিকে আপন জাহাজের অভ্যন্তরে বসে আপন বক্ষের নিভৃতে সেই ক্রোধের আবেগকে লালন করে যেতে লাগলেন অ্যাকেলিস। তিনি গ্রীকবীরদের সভায় গেলেন না, যুদ্ধেও গেলেন না। শুধু এক নিষ্ফল আক্রোশের কাঁটা দিয়ে আঁচড় কেটে যেতে লাগলেন আপন অন্তরে।
দেখতে দেখতে দ্বাদশ দিন অতিক্রান্ত হলো। সুদূর ইথিওপিয়া হতে দেবকূলপতি ফিরে এলেন অলিম্পাস পর্বতশিখরস্থ তাদের সেই আবাসভূমিতে। দেবরাজ জিয়াস অলিম্পাস পর্বতের স্বর্ণশিখর দেশে ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে জলদেবী থেটিসও তৎপর হয়ে উঠলেন সমুদ্রগর্ভে। তিনি ভুলে যান নি তার সন্তান অ্যাকেলিসের অনুযযাগের কথা।
সমুদ্রের তলদেশ হতে উঠে এলেন থেটিস। আকাশের বায়ুমণ্ডল অতিক্রম করে এগিয়ে গেলেন দেবরাজ জিয়াসের কাছে। জিয়াস তখন বসেছিলেন অলিম্পাসের পর্বত শিখরে। তাঁর কাছে বসলেন থেটিস। বাম হাত দিয়ে জিয়াসের জানু আর দক্ষিণ হাত দিয়ে তাঁর চিবুক ধরে বললেন, হে পরম পিতা জিয়াস, যদি আমি কোনদিন কথায় বা কাজে তোমার কোন উপকার করে থাকি তাহলে তার প্রতিদানে আমার যে পুত্র অকালে তার অমূল্য জীবন হারাতে বসেছে তার মঙ্গল করো। তার প্রাপ্য বন্দিনীকে। কেড়ে নিয়ে তাকে লোকচক্ষে হেয় ও অপমানিত করেছে রাজা অ্যাগামেমনন। সেই অলিম্পাস অধিপতি, এই অপমানের প্রতিশোধ গ্রহণ করো। বিজয়গৌরব তৃপ্ত করে ট্রয়বাসীদের। গ্রীকরা আমার পুত্রকে তার প্রাপ্য সম্মান ও ঐশ্বর্যে পুনরায় অধিষ্ঠিত না। করা পর্যন্ত তুমি ছাড়বে না।
কোনরূপ বাখ্য স্ফুরণ না করে কিছুক্ষণ নীরবে বসে বইলেন জিয়াস। থেটিস কিন্তু ক্ষান্ত হলেন না। জিয়াসের জানুটিকে তেমনি ধরে রইলেন তিনি। তার পর চাপ দিয়ে তিনি বলতে লাগলেন, এ কাজ তুমি যে করবে তার প্রতিশ্রুতি দাও সুরপতি। কথা না বলো অন্তত মাথা নেড়ে সম্মতি দাও। অথবা প্রত্যাখ্যান করো আমার অনুরোধ–তুমি যে আমায় ঘৃণা করো অকারণে সে কথা আমায় স্পষ্টই বুঝিয়ে দাও।
একথায় বিচলিত হলেন দেবরাজ জিয়াস। বললেন, আমাকে কিন্তু বিব্রত হতে হবে। কারণ ট্রয়বাসীদের সাহায্য করার জন্য আমার সঙ্গে কলহ করেছে হেরা। এ সাহায্যের ব্যাপারে সে আমাকে এমনিতেই তীক্ষ্ণ বিদ্রূপবাণে জর্জরিত করে আমায়। তুমি এই মুহূর্তে চলে যাও এখান থেকে, তা না হলে সে আমায় দেখে ফেলবে। আমি তোমার কথাটা ভেবে দেখে তোমার ইচ্ছা পূরণ করব যথাসময়ে। এই দেখ আমি আমার ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাচ্ছি। দেবতাদের কথায় আমি এইভাবে সর্বাপেক্ষা সততা ও নিষ্ঠাসহকারে সম্মতি জানাই। আমি আমার প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করি না কখনো।
এই কথাগুলো বলার সঙ্গে সঙ্গে জিয়াসের মৃত্যুত্তীর্ণ বিশাল জটাজাল আন্দোলিত হতেই প্রকম্পিত হতে লাগল সমগ্র পর্বতদেশ। জিয়াস তাঁর স্বীয় প্রকোষ্ঠের ভিতরে চলে গেলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে অলিম্পাস পর্বতের সেই বিশাল স্বর্গীয় ঐশ্বর্য ত্যাগ করে সমুদ্রগর্ভে চলে গেলেন থেটিস।
তাঁর স্বীয় প্রকোষ্ঠের মাঝে দেবতাদের এক সভা আহ্বান করলেন দেবরাজ জিয়াস। হেরা কিন্তু জিয়াসকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলেন জলদেবী থেটিস নিশ্চয় কোন চক্রান্ত করেছেন। নিশ্চয় জিয়াস আবার সাহায্য করবেন ট্রয়বাসীদের। এইরূপ সন্দেহের বশবর্তী হয়ে এক তীক্ষ্ণ তীব্র তিরস্কারে ফেটে পড়লেন হেরা। তুমি সব সময় সব ব্যাপার আমার কাছে গোপন করে চল।
শোন হেরা, জলদমন্ত্রে বলে উঠলেন দেবরাজ জিয়াস। যা জানবার দরকার তা অবশ্য জানাব। কিন্তু যা একান্ত গোপনীয় সেকথা তুমি শোনার আশা করতে পার না।
এক তীক্ষ্ণ প্রত্যুত্তরে ফেটে পড়লেন হেরা। আমি তোমার একান্ত গোপনীয় কোন কথাই শুনতে চাই না। আমি জানি আজ সকালে থেটিস তোমার সঙ্গে কথা বলছিল। আমি বুঝতে পেরেছি থেটিসপুত্র অ্যাকেলিসকে গৌরব ও মর্যাদা দানের জন্য বহু গ্রীককে হত্যা করবে তুমি।
জিয়াস বললেন, হে আমার ধর্মপত্নী, আমি এমন কোন কাজ করব না যার কথা তুমি জানতে পারবে না। কিন্তু তা জেনে তোমার কোন লাভ হবে না। বরং তাতে তোমার ক্ষতিই হবে। ধরে নিলাম তুমি যা বলছ তা সব সত্যি। তাই হোক, আমি তাই চাই। তুমি শান্ত হও, নীরবে অপ্রতিবাদে আমার সব আদেশ মেনে চল। যদি আমি তোমার উপর রাগান্বিত হয়ে তোমার গায়ে হাত দিই তাহলে স্বর্গের সমস্ত দেবতারা তোমার পক্ষ অবলম্বন করেও আমার কিছু করতে পারবে না।
একথা শুনে ভীত হলেন হেরা। তিনি তাঁর ইচ্ছার সব উগ্রতাকে অবদমিত করে নীরবে উপবেশন করলেন। কিন্তু স্বর্গের অন্যান্য দেবতারা অস্বস্তি অনুভব করতে লাগলেন জিয়াসের এই উক্তিতে।
অবশেষে হেরার পুত্র হিফাস্টাস এসে তার মাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, তোমরা দুজনে ঝগড়া বিবাদ করলে দুর্বিষহ হয়ে উঠবে আমাদের জীবন। আমাদের স্বর্গের ভোজসভা হয়ে উঠবে নিতান্ত নিরানন্দময়। বজ্ৰাধিপতি জিয়াস দেবতাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী। তিনি যদি ইচ্ছা করেন আমাদের সকলকে স্বর্গচ্যুত করতে পারেন। সুতরাং তাঁকে মধুনিষ্যন্দী ভাষায় তুষ্ট করো।
এক পাত্র মদ হেরার দিকে দিয়ে হিফাস্টাস বললেন, এটা একচুমুকে পান করে নাও। আমি তোমার এই দুঃখে কিছুই করতে পারি না। একবার এর আগে জিয়াসের বিরুদ্ধতা সত্ত্বেও তোমাকে সাহায্য করার জন্য তিনি আমাকে স্বর্গ হতে সজোরে এমনভাবে নিক্ষেপ করেন যে সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত সারাদিন ধরে আমি শূন্যে ভাসতে ভাসতে অধোগমন করতে থাকি। অবশেষে লেমনস দ্বীপে আমি পতিত হই। আমি তখন মৃতপ্রায় হয়ে পড়ি। সিনটিয়ানস এসে আমার সেবা শুশ্রূষা করে কোনরকমে আমায় বাঁচায়।
এরপর হিফাস্টাস স্বর্গের সকল দেবতাদের হাতে তুলে দিলেন এক একটি পানপাত্র। তখন উচ্চৈঃস্বরে হাসতে লাগলেন দেবতারা। এইভাবে অনাবিল হাসি আর আনন্দের মাঝে শুরু হলো স্বর্গের ভোজসভা। অ্যাপোলো তাঁর বীণাটি হাতে তুলে নিয়ে বাজাতে শুরু করে দিলেন। গীতবাদ্যের দেবতা মিউজ গাইতে লাগলেন গান। কিন্তু সূর্য অস্ত যাবার সঙ্গে সঙ্গে সে ভোজসভা ভেঙ্গে গেল। দেবশিল্পী হিফাস্টাস দ্বারা নির্মিত আপন আপন শয়নমন্দিরে চলে গেলেন দেবতারা। সকলের শেষে দেবরাজ জিয়াসও ধর্মপত্নী হেরাকে নিয়ে প্রবেশ করলেন তাঁর অত্যুজ্জ্বল রত্নখচিত রতিমন্দিরে।