আত্মবিলাপ না এই স্বর,আত্মোপলদ্ধির৷স্মৃতি ও বিস্মৃত অনুভুতির গভীর মর্মস্পর্শী সংযোগ প্রতিটি কবিতা৷ঠিক কবিতা ও তন্দ্রার মাঝে যেমন তিনি দেখেন স্মৃতির দেয়াল৷তেমনি যেনো সেঁটে আছে দেয়ালময় জীবনের গুঢ় আলাপ,যা ভাবায়,আলোড়িত করে,উদ্দীপ্ত করে চেতনায়৷সদা জীবন্ত,প্রাণবন্ত এক আত্মা কিংবা জীবসত্তার উপস্থিতি কবিতায়৷

জীবনের প্রগাঢ় তন্দ্রা ভেঙে জেগে দেখি
আমার শরীরে এখনো সামুদ্রিক শ্যাওলা,মুক্তা—প্রবালের ঘ্রাণ৷

জীবন ,কালে কালে যতোটা তন্দ্রার মতো যাক কেটে,তবু এতোটুকু জাগানিয়া,সম্বিৎ হতে থাকে -না,আমি ই আছি সর্বত্র৷শুধু একটা তন্দ্রার ভেতর ছিলো অবসর৷আছে তাঁর কবিতায় গভীর জীবনবোধ,উপমিত সৌন্দর্য্য,চিন্তার বিস্তৃতি আছে মিথ আর কল্পনার সৌন্দর্য্য৷

একটি চিন্তা অপরাধের কারণে অভিযুক্ত করে
আমাকে দন্ডিত করা হয়েছিলো
অথচ চিন্তাটি কি ছিলো তা আমি আদৌ জানিনা৷

কবি ইশিতা জেরীন কবিতায় নিজেকে প্রকাশ করেছেন উদারতায়,তিনি আত্মোপলদ্ধিজাত চেতনার কিংবা ভাবনার যে দুঃখ তা বিন্যস্ত করেছেন সহজিয়া ভাষায় অথচ কি গভীর এবং শব্দের পরতে পুরে রেখে চিন্তার জগত৷চিন্তারও অপরাধ আছে,ভুল আছে৷কখনো তবু আমরা বিশ্বাস করি ফেলে আসা সময়ে থেমে নেই মস্তিষ্ক,তাই বিশ্বাস করি অপরাধ হতে নেই৷

একটি ক্রীতদাস নগরবাতির তির্যক আলো
ঢুকে পড়েছিলো আমার মস্তিষ্কে
বিষাক্ত শঙ্খচুড়ের মতো পাক খেতে খেতে
ফণা তুলেছিলো-ঠিক তখনই—
একটি চিন্তা ৷অজ্ঞ -পৃ-১১

বলা যায় আলোতে ই মুগ্ধতা৷কখনো আলোর ভেতর প্রবেশ করি,দূরীভূত করি আঁধার৷ঠিক তা না,যা মন যাচে আলোর কাছে,আলো যেনো ডাকে হাতছানিতে কখনো আলোর বিভ্রম ফণা রূপে,চিন্তার ভুল ঘটে৷যেনো সংঘটিত সেখানেই অপরাধ যা ভাবায় নিয়তকাল৷
আবার এসব ভুলের ভেতর আমাদের জাগে চোখ৷চোখের ভেতর সুড়ঙ্গপথ৷কবির শিঙা কবিতায় তাই যেনো এসেছে দৃশ্যত সত্যের মতোন৷

দুটি চোখের ভেতরে দুটি চোখের মাঝে দুটি চোখের আরশিতে
দুটি চোখের চর্যাপদ—পদে পদে চৌর্য্যবৃত্তি—পদস্থলন
চোখের ভেতরে,চোখের চাহনিতে চোখ
এভাবেই একটি দৃষ্টির সুড়ঙ্গপথ৷শিঙা-পৃষ্টা -১৪৷

ঠিক তাই৷চোখের ভেতর পুরে থাকে চোখ,চাহনি৷মুগ্ধরূপ৷চোখেই ধরে রাখে হাসি,কান্না বিদ্বেষ আবার চোখের আড়াল করেই চোখেই ধরে রাখে চৌর্য্য কীর্তি,বৃত্তি৷এভাবে চোখের ভেতর যেনো নির্মিত চোরা গলি ,গলি থেকে যেমন গলি অথবা কঠিন সুরঙ্গপথ৷ভাবনার নান্দনিকতা তার কবিতাকে করেছে নিঃসন্ধেহে সমৃদ্ধ৷কবিতা পাঠে আবিষ্টতা আছে,আছে ছুঁয়ে যাবার ,একাত্ম হবার৷যেনো ছুঁয়ে যাচ্ছি,সমস্ত ভাবনা অনুভুতি মুহুর্মুহু৷

সময় এবং জীবন রীতিসিদ্ধ৷যেমন আপাতঃ দৃষ্টিতে যেমন দেখি দিবা শেষে রাত,জীবন এবং মৃত্যু তার সুন্দর এক প্রকাশ কবি ইশিতা জেরীনের রীতি কবিতাটি৷

প্রতিটি পরিসমাপ্তির পিঞ্জর ছেড়ে বেরিয়ে আসে একটি প্রারম্ভ
যেভাবে গহন রাত্রির সঘন গহবরে গুপ্ত থাকে গগনসূর্য ৷রীতি—পৃ ১৯৷

ঠিক এমনিই আঁকেন তিনি জীবনের ছবি৷প্রতিটি পরিসমাপ্তি মানেই শেষ বলে পিছপা হবার না বরং প্রারম্ভ নামে উদ্বেলিত হবার৷যেমন গভীর রাত পেরোলেই আসে ভোরের খরকর আলো দিগ্নবিস্তারি৷ধূয়ে পাপ,যেমন সাফ হয় আবার৷ঠিক নদী ভাটার গানে যেমন বক্ষে রাখে জোয়ারের টান৷এভাবে কবিচোখে এঁকেছেন জীবন ও সময় রীতিবদ্ধ৷যা থেকে না বিচ্যুত হবার৷এই গ্রহ,উপগ্রহ সমস্ত তাবৎ বিশ্বভ্রম্ক্ষান্ড আর মানব জীবন৷ভোর থেকে সান্ধ্যগানে দেখি রীতিসিদ্ধ সবখানে৷কবি ইশিতা জেরীন তন্দ্রা ও তমিস্রার কাব্যখানি সুখপাঠ্য৷প্রতিটি কবিতায় তিনি সুচারুরূপে করেছে সৌন্দ্যর্য্যের বয়ান,আত্মোপলদ্ধিজাত স্বজ্ঞানের স্বয়ম্ভর স্বারক৷এক্ষেত্রে তিনি সিদ্ধহস্ত কবিতায়৷প্রতিটি কবিতা পাঠে নিজস্ব উপলদ্ধি,যেনো যাপনকালের একটি দৃশ্য ভাস্বর হয়ে উঠে সমুখে৷যেনো মিশে যাচ্ছি,ছুঁয়ে যাচ্ছি কিংবা ঠিক তাই হচ্ছে যাই পাঠ করছি সমস্ত শব্দে শব্দে৷

আমি আমার ঘরের জানালা খুলে বসে থাকি
ইন্দ্রিয়াতীত অমোঘের তৃষ্ণাতুর প্রতীক্ষায়৷জানালা-পৃষ্টা২১৷

কবি জানালা খুলে রাখেন৷ঠিক জানালা বলতে যা কিছু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়৷যা সব যোগায় আলোড়ন,জাগায় চৈতন্য তারই প্রকাশ তাঁর জানালা কবিতায়৷

করোটিকে মনে হয় কফিন
আর মস্তিষ্ক কাফনে জড়ানো লাশ৷রক্তপুরীর খনিজ-পৃ-২৭৷

কবির যাপনকাল চিন্তাজগত আর লদ্ধ উপলদ্ধি বিচ্যুত না৷তাঁর কবিতায় আছে ইহজগতের নানাবিধ অনুভুতি,রীতিসিদ্ধ সমস্ত যা ,একদিন ইতিবৃত্ত হয়ে উড়ে যাবে৷আর তাই কবি অনুভব করেন সেই চরম রূপ,ঠিক কেমন তা৷অসাড় হতে থাকে এসব ভেবে৷তখন জাগতিক জগত এবং পরজগত রূপ তিনি অনুধাবণ করেন কবিতায়৷মৃতের মতো৷বোধহীন হয়ে উঠে পরক্ষণেই এই সমস্ত সময়৷

কবি ইশিতা জেরীন উত্তরাধুনিক সাহিত্যের প্রতিভাধর এক উজ্জল নক্ষত্র,তাঁর কবিতা ভাবনা,শাব্দিক প্রয়োগ বহুমাত্রিক,চিন্তার জগত বিস্তৃত৷প্রতিটি কবিতায় সুখপাঠ্য হয়ে বাড়ায় পাঠ একাগ্রতা,ভেতর ভাবনা ছুঁয়ে যাবার আছে স্পৃহা৷আর তাই প্রত্যেকটি কবিতা ই হয়ে উঠেছে যথার্থ জীবনবোধের এবং যাপনের সমূহ উপলদ্ধির৷

কবি অবসাদ না বরং সাধে সাজায় রাত৷যেমন এতোটুকু আঁধার,ঘুমের মতো কিংবা এতোটুকু উত্তাপে আশ্রিত হবে বুক,তাতেই যেনো এই বিষাদ বিষাদ করে রাখা হৎপিন্ডের কবর খুঁজে সুখ ৷তাও না,তবু জমে থাকে অপ্রাপ্তি,তবু উঁকি দ্যায় স্বপ্ন ডানা অরব ভালোবাসার গহীন অবগাহনে৷তাই কবি ইশিতা জেরীন অনুভব করেন

না —এইসব যথেষ্ট নয়৷
জীবনের প্রবাহ আরো বেশি কিছু চায়
বুকের সম্পূর্ণ বর্গক্ষেত্রে এক কবরস্থান বয়ে বেড়াই আমি আজন্মকাল
হতচ্ছাড়া এই হৃৎপিন্ড তোর সমগ্রতার কবর৷

নিঃসন্দেহে কবি ইশিতা জেরীন সমসাময়িক কাব্য ভাবনায় অগ্রবর্তী,তাঁর কবিতায় আছে স্বপ্ন ও বাস্তব যাপনের সাথে এক দ্বান্দিক সম্পর্ক৷ দৃশ্যত দৃশ্যের কাছে কি হচ্ছে অথবা কিইবা হবার ছিলো,সময়ব্যাপি এক অমোঘ দ্বন্দ ৷ঠিক এমনো এক সময়ের কাছে মানুষ উপনীত হয় ,যেমন চোখময় ঘনায় বিষন্ন মেঘরূপ তখন আড়ষ্ট হয়ে সমস্ত ইন্দ্রিয় আর তখনই স্মৃতি থেকে উঠে আসে দৃশ্য ৷কখনো ফিরে যাই শৈশবে কখনো বা যুদ্ধবিগ্রহে কিংবা স্মৃতি থেকে স্মৃতির ভেতর ডুব সাঁতারে৷তাবৎ পৃথিবী মনে হতে থাকে ছেয়ে গেছে নিমজ্জিত অদ্ভুত,গুঢ় অন্ধকারে৷তাঁর এমনও হৃদয় নাড়িয়ে দেওয়া চিত্রে ভাবনাকে জাগিয়ে তোলে তন্দ্রা ও তমিস্রার কাব্য কবিতাটিতে৷

অদ্ভুত জ্বর এক নেমেছে আমার পৃথিবীতে
জানালায় আবছায়া শার্সি ভেদ করে প্রবেশ করেছে
স্বপ্নজাগানিয়া মৎকুণের মতো এক ঝাঁক তরঙ্গিত জ্বর৷
প্রান্তর থেকে প্রান্তর পেরিয়ে,আরো দূর—সুদূর প্রান্তর
প্রাচীন পৃথিবীর
আরণ্যক আলোতে-৷তন্দ্রা ও তমিস্রার কাব্য৷পৃ-৭৮৷

পুরো পৃথিবীটায় যেনো ধূমায়িত,ধোঁয়াশায়৷যা কবিকে তাড়িত করে৷অসাড়,অবসন্ন করে—আয়ুহীন তন্দ্রাচ্ছন্নতায় স্বপ্নাহত করে৷

আর কবি ইশিতা জেরীন এসব ক্লান্তির ভেতর আঁকেন শৈশবের দৃশ্য৷বেড়ে উঠা সময় কাল৷কলকল ধ্বণী,ভাঙন নেশার গ্রাসী নদী৷জাগে চোখময়৷প্রত্যেক জীবনের সাথে,বৈচিত্রের সাথে আছে নদী ও তার সময় প্রবাহের নিবিড় সম্পর্ক৷কবি নদীরূপ এঁকেছেন,স্মরণে এনে যেনো বিগত সময় তিনি ব্যস্ত হয়ে উঠছেন এসব যাপন ক্লান্তি নাশিতে কিংবা লোপাট করতে নিদ্রা ও জাগরণের সমস্ত বিভেদকে৷

জ্বরদাহ্য বালিশাবদ্ধ তন্দ্রার তন্ত্রীতে ইন্দ্রিয় ঢেলে আমি
আমার মাতৃনদীর ধূ-ধূ জলের কলস্রোত শুনি
ক্রমবর্ধমান;মনে হয়,
যেন সূদুর অতীতের যজ্ঞাগ্নির ধূম ভেদ করে
ধেয়ে আসছে স্বপ্নগ্রাসি জলোচ্ছাস৷তন্দ্রা ও তমিস্রার কাব্য-পৃ-৭৯৷

এমনো ৪৫টি কবিতার সৃষ্টি সম্ভারে কবিমানসের অনবদ্য সৃজন তন্দ্রাও তমিস্রার কাব্য”পুস্তকখানা নিঃসন্ধেহে বাংলা সাহিত্যের অনন্য সাক্ষর৷যা পাঠে ক্লান্তি নেই,আছে কবিতার পরম আস্বাদ অথবা যাকে বলি পরতে পরতে মুগ্ধতার বিন্যাস৷৮০ পৃষ্টার বইটি বাজারে এনেছে রোদেলা প্রকাশনী৷প্রচ্ছদ জান্নাতুল ফেরদৌস৷১৫০টাকা দামের বইটি পাঠে আগ্রহী পাঠককুল প্রকৃত কবিতার এবং কবি ইশিতা জেরীনের অনুভুতির সংস্পর্শ নিতে পারেন৷