বাংলা নাটক প্রসঙ্গে বলতে গেলে একটি বিষয় না বললেই নয়। বাংলাদেশের নাট্য শিল্প এখন অনেকটাই এগিয়ে। সেই সাথে আমরাও এগিয়েছি অনেক দূর। নাটক ছাড়া টেলিভিশন চ্যানেলে অন্য অনুষ্ঠান কল্পনা করা যায় না। টিভিঅনুষ্ঠান তৈরিতে সবচেয়ে বেশি খরচ কিন্তু নাটকেই, স্যুটিং, অভিনেতা/অভিনেত্রী, কলাকুশলীদের পারিশ্রমিক ইত্যাদি মিলিয়ে দেখা যায় বেশ খরচ। কিন্তু এত খরচ করে আমরা কি দিচ্ছি দর্শকদের। একগাদা অভিনেতার ভিড়ে কিছু পরিবেশনা, ঘুরে ফিরে সেই একই কথা, একই লেখা আমি তুমি আর তুমি আমি। আবার এর সাথে যুক্ত হয় এক গাদা বিজ্ঞাপন। নাটক শুরু হতে না হতেই বিজ্ঞাপন আর বিজ্ঞাপন। যেনো নাটক দেখাটাই অপরাধ। বাংলাদেশের চ্যানেল গুলিতে প্রচারিত নাটকের কাহিনী, গল্প , মূখ্য বিষয় না হলেও, স্টার অভিনেতা আর বাহারী বিজ্ঞাপনই মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে মানুষ যে আগ্রহ নিয়ে নাটক দেখতে টেলিভিশনের সামনে বসে, পরে বিরক্তি নিয়ে টিভি সেটের সামনে থেকে চলে আসতে হয়। আর না হয় রিমোটের সাহায্যে ইন্ডিয়ান নাটক, মেগা সিরিয়াল বা সিনেমার দিকে মনোযোগ চলে যায়। ফলে বাংলা নাটক সস্তা, গল্পহীন অরুচিশীল হয়ে পড়েছে।
অপর দিকে মঞ্চ নাটকের ত্যাগী নাট্যকর্মীরা আজ কোথায় ? কোথায় সেই মঞ্চ? যেখানে বড় বড় শিল্পী তৈরির কারখানা ছিল,যে জায়গা এখন বিরানভূমি। এখন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে নাট্য-আন্দোলনের অবস্থা বেশ করুণ। নাটক আগে ছিল সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার, প্রতিবাদের অন্যতম ভাষা, সমাজের দর্পণ, কিন্তু আজ সে নাটক হয়েছে সস্তা বিনোদনের মাধ্যম, ২/১ টি ভালো নাটক ছাড়া অধিকাংশ নাটক এখন দর্শক জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলেছে।
ইসলামি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নাট্যান্দোলনের ইতিহাস আরো করুণ। এক বুক আশা নিয়ে নাটক করতে আসা নাট্যকর্মীরা আজ নাটক ছেড়ে যার যার কাজ নিয়ে খুবই ব্যস্ত সময় পার করছে। এখানে নানাবিধ সমস্যা প্রায়শঃই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ১ম: ভালো কোন নাট্য সংগঠক না থাকা ২য় : নাট্যকার ও নাট্য নির্দেশকের অভাব সর্বত্র। ৩য় : ত্যাগী, পরিশ্রমী নাট্য কর্মীর সংকট। ৪র্থ : সঠিক মানের নাট্য সংগঠন না থাকা।
সবচাইতে বড় যে অভাবটি সেটা হল কেন্দ্রীয় বা স্থানীয়সমন্বয়কের অভাব। একজন সমন্বয়কই পারে এই আন্দোলন চাঙ্গা করে তুলতে। আমাদের শিল্পীগোষ্ঠী গুলির প্রধান সমস্যা হল ক্ষণস্থায়ী সংগঠক, শিল্পী, নাট্যকর্মী ইত্যাদি। যাদের একমাত্র ভরসা ছাত্রত্ব। যার ছাত্রজীবন শেষ তার সকল সুকুমার বৃত্তিও শেষ। এর যদিও নানাবিধ কারণও আছে। এর মধ্যে আবার অন্য দিক হলো শিল্পী ও শিল্পীগোষ্ঠী গুলির নির্দিষ্ট কোন দিক নির্দেশনা না থাকা। শিল্পীদের জীবনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য স্থির না করা ইত্যাদি।কবি মতিউর রহমান মল্লিক এ বিষয়টি বেশ ভালো ভাবে বুঝতে পেরেছিলেন তাই তিনি বলতেন কপাট বন্ধ করা যোগ্যতা সম্পন্ন শিল্পীর চেয়ে, ‘চলমান কম যোগ্যতার শিল্পী অনেক শ্রেয়।’
সমন্বয়কের কাজ করার মত কাউকে না কাউকে এগিয়ে আসতেই হবে। ইসলামি সাংস্কৃতিক ও নাট্য আন্দোলন বুঝবেন এমন লোক প্রতিনিয়ত আমাদের তৈরি করে রাখতে হবে।
আর তিনিই নাট্যকর্মীদের সংগঠিত করবেন। নাট্যকর্মীদের কাজ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা থাকতে হবে। তাদের শুধুমাত্র নাটক করা নয়, বরং নাট্য আন্দোলন সম্পর্কে বিশেষ ভাবে অবগত থাকতে হবে। বিশেষ করে ইসলামি সংস্কৃতির মর্মকথা ভালোভাবে রপ্ত থাকতে হবে।
বাংলাদেশের ভৌগলিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে দেখা যাবে চারদিক দিয়েই ভারত বেষ্টিত এই দেশ। ভারতের শিক্ষা, সভ্যতা, সংস্কৃতি এখন আমাদের সংস্কৃতির সকল কিছুতেই প্রবেশ করেছে। কাপড় কিনতে গেলে ইন্ডিয়ান কাপড়, ফ্যাশন হাউজগুলো ইন্ডিয়ানদেরই সাজানো, কাঁচাবাজারে গেলে ইন্ডিয়ান পিঁয়াজ পর্যন্ত চলে এসেছে। তো সে দেশের শিক্ষা, সভ্যতা, সংস্কৃতি আমরা ইচ্ছা করেই মনে প্রাণে গ্রহণ করে ফেলেছি। হিন্দি চ্যানেল গুলোর ম্যাগা সিরিয়ালে আমাদের মা-বোনদেরকে অনেক আগেই গ্রাস করে ফেলেছে। এমনকি আমরাও ইচ্ছা অনিচ্ছায় অনেকটা এর প্রভাবে ঝুঁকে পড়েছি।
তা হলে এই দেশের সংস্কৃতি সভ্যতা, কৃষ্টি, সব কিছুই কি পরিবর্তন হয়ে যাবে? এটা এখন সময়ের দাবি মাত্র। একটি জাতিকে ধ্বংস করার জন্য দুটি জিনিস দরকার ১. শিক্ষা ২. সংস্কৃতি।
আর আমাদের এ দুটিই বিকলের পথে, ক্যামোথেরাপি দিয়ে বাংলাদেশের সংস্কৃতি কোন মতে চলছে। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি শিল্পী, কলা-কুশলীর জ্ঞানগত ও শৈল্পিক মান অন্য সবার চেয়ে কোন অংশে কম নয়। তাই একটু নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের দিকে তাকালেই ঘুরে ফিরে দাঁড়ানো সম্ভব। বাংলাদেশের পিঁয়াজ ভিনদেশি পিঁয়াজের চেয়ে অনেক গুণ ও মানে সুন্দর এবং সুস্বাদু। বাংলাদেশের কাপড় বর্হি:বিশ্বে অনেক উচু মানের কাপড়। বাংলাদেশের মানুষের সংস্কৃতি অন্য সকল বিশ্বের মনুষের চেয়ে অনেক উন্নত। ইসলাম পৃথিবীর সকল ধর্মের উপর শ্রেষ্ঠ। সকল কিছুই আমাদের নাগালের মধ্যেই । তবুও কেন আমরা বার বার পিছিয়ে যাচ্ছি? এর জন্য প্রথমেই আমাদের হতাশা ও হীনমন্নতা দূর করতে হবে। ইসলামি সংস্কৃতির মর্ম উপলব্ধি করতে হবে।
কবি মতিউর রহমান মল্লিকের কথা বার বার চলে আসে কেননা তিনি মিউজিক/ বাদ্য যন্ত্র ছাড়া ইসলামি গানের ভূবন তৈরি করে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নাম লিখে গেছেন। অথচ আমরা নতুন করে বিকল্প চিন্তা করছি । বাদ্য যন্ত্র দিয়ে কিভাবে গান গাওয়া যায়। আমরা নিজেরাই আমাদের স্বকীয়তা বজায় রাখতে পারছি না । সেখানে অন্যরা কি করবে? যেমন নাপাক পানি দিয়ে কাপড় পবিত্র করা যায় না, তেমনি বাদ্য যন্ত্র দিয়ে বা ইসলামি সংগীত বৈধ করা যায় না। যেটা হারাম আমরা সেটাকে আমরা হারামই বলবো। আর যেটা হালাল সেটাকে হালালই বলবো।
বাংলাদেশের ধর্মীয় সংস্কৃতিতেও রয়েছে এক অপূর্ব বন্ধন। মুসলিম, হিন্দু, বৈদ্ধ, খৃস্টান সকল ধর্মের লোকের এক সাথে মিলে এই দেশকে ভালোবেসে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে অবস্থায় কেন জানি মানুষ সবাই পাল্টে যাচ্ছে, ভালোবাসা পাল্টে যাচ্ছে, সম্প্রীতি পাল্টে যাচ্ছে সংস্কৃতি পাল্টে যাচ্ছে, ধর্মীয় মূল্যবোধ পাল্টে যাচ্ছে, পরস্পর পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ পাল্টে যাচ্ছে ইত্যাদি।
আর দ্রুত এই পাল্টানোর ফলে এখানে প্রবেশ করেছে ভিনদেশি সংস্কৃতি, সভ্যতা ও শিক্ষা। আমরা না পারছি দেশিয় সংস্কৃতি ধরে রাখতে। না পারছি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রুখে দাঁড়াতে। এখন আমরা ভুলেই গেছি সংস্কৃতির ভেদাভেদ।
আমাদের ছবিগুলোতে ইসলামি মূল্যবোধ দেখানোর প্রয়োজন বোধ করি না । অন্য দিকে ভারত ছবির শুরুতেই মন্দির ,পূজা এগুলো খুব সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করে। আমরা দাড়ি টুপি পরা অভিনেতাকে শয়তান বা খারাপ/খল চরিত্রের মানুষ বানাই। মসজিদের নামাজ কিংবা দোয়া দেখানো বাদে আমরা মাজার পূজা দেখাই, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবার বদলে কবরে মৃত বাবার নিকট সাহায্য চাওয়া কিংবা সেখানে গানের মাধ্যমে শিরক এর মতো অন্যায় কাজ ধর্মীয় কাজ বা পূণ্যের কাজ বলে চালিয়ে দেই। এ হচ্ছে আমাদের সংস্কৃতি।
আমরা ইসলাম বুঝি না তাই ধর্মও বুঝি না সে কারণে সংস্কৃতিও বুঝি না। ইসলাম মানে মসজিদের চার দেয়ালের মাঝের বিষয় নয়। প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিটি মূহুর্তে আমাদের ইসলামি জীবন ব্যবস্থার মাঝেই থাকতে হবে।
প্রতিকার এর বা উত্তরণের উপায়
টেলিভিশন সিরিয়ালগুলোর বিপরীতে নতুন সুন্দর পরিকল্পনা করে মেগা সিরিয়াল তৈরি করা। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই চিন্তা ভাবনা করে দেশের মানুষের কল্যাণের ইসলামি মূল্যবোধ, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান, সম্প্রীতি, ইত্যাদি বিষয় সিরিয়ালে আনতে হবে।
অশ্লীলতার কাছে তরুণ প্রজন্মকে ছেড়ে দেয়া যাবে না। তাদেরকে সুন্দর বিনোদন, শিক্ষামূলক আকর্ষণীয় স্ক্রীপ্ট করে নতুন কিছু প্রদান করতে হবে। তাদের চিন্তা শক্তিতে বিকাশ ঘটাতে হবে। সে অনুযায়ী স্ক্রীপ্ট নির্মাণ করা দরকার।
মঞ্চ নাটককে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। নাট্যকার, নির্দেশক, শিল্পীদেরকে নিয়ে মাঝে মাঝেই বসা দরকার। পরিকল্পনা ভিত্তিক কাজ করলে দেখা যাবে ভালো ফল আশা করা যায়। এ ক্ষেত্রে:
১. নাট্যকারদের নাটক লেখার কৌশলের উপর সপ্তাহ কিংবা মাস ব্যাপী প্রশিক্ষণ কোর্স।
২. নাটকের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে নাট্যকারদের নাটক লেখানো এবং তার মঞ্চায়নের ব্যবস্থা করা।
৩. ইসলামের সঠিক জ্ঞান, হালাল, হারাম ইত্যাদি সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞানের জন্য নির্দেশনা প্রদান।
৪. সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ইত্যাদি করলে ভালো (বিষয় ভিত্তিক)
৫. হাস্যকর কিংবা অহেতুক কৌতুক অভিনয় যার মধ্যে কোন শিক্ষা নেই সেগুলো কম উপস্থাপন করা।
৬. আদর্শিক, ইসলামি মূল্যবোধ সৃষ্টি করে এমন নাটক তৈরি করা।
৭. নাট্য কর্মীদের নাটক শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামি কৃষ্টি ও কোরানের সঠিক শিক্ষা প্রদান করা।
নাট্যশিল্পী ও নাট্য নির্দেশকদের পৃথক প্রোগ্রাম:
১. নাট্যশিল্পীদের দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটানো।
২. অভিনয়ের কলা-কৌশল সম্পর্কে পর্যাপ্ত বই ও সিলেবাস তৈরি করা।
৩. নিয়মিত মহড়া শিল্পীকে অভিনয়ের জন্য দক্ষ ও উপযুক্ত করে তুলে তাই নিয়মিত মহড়া নিশ্চিত করা।
৪. নাট্য কর্মশালার মাধ্যমে নাট্যশিল্পী তৈরি ও সংগ্রহ করা।
৫. ইসলাম ও আল কোরআনের বেসিক জ্ঞান অর্জনের জন্য সিলেবাস করে দেয়া।
৬. নাটককে সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনের কাজে ব্যবহার করানো।
মঞ্চ নাটকের নেপথ্য কুশলী ও ক্যামেরার পিছনের কর্মীদের শিল্প সম্পর্কে ও ইসলাম সম্পর্কে ধারণা প্রদান। তাদের মাঝে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরা চিত্রায়ন কিংবা ইসলামি শিল্পকলা সম্পর্কে ধারণা প্রদান করা। এ বিষয়ে একটি ওয়ার্কশপও করা যেতে পারে। যেমন পিছনের ব্যাক স্ক্রিনে যদি ভালো কোন কাজ থাকে কিংবা ইসলামি কোন বিষয় থাকে তবে সেটা ইসলামি মূল্যবোধের প্রচারের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
১. প্রতিটি জেলায়/উপজেলায় পৃথক পৃথক নাট্যদল করা দরকার
২. প্রতিটি নাট্যদল গুলোর একটি গঠনতন্ত্র হওয়া প্রয়োজন।
৩. নাট্যদলগুলোতে টার্গেট নির্ধারণ করে দেয় দরকার। প্রতি মাসে অন্তত একটি নাটক মঞ্চায়ন করা যেতে পারে।
৪. নাট্যদলগুলোতে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা পাঠানো দরকার।
৫. প্রতিটি জেলায় একটি নির্ধারিত তালিকা থাকা দরকার।
(ক) নাট্যদলের সংখ্যা কত?
(খ) নাট্যকারের সংখ্যা কত?
(গ) নাট্যকর্মীর সংখ্যা কত?
(ঘ) নাট্য নির্দেশকের সংখ্যা কত?
(ঙ) কলাকুশলীদের সংখ্যা কত?
প্রতিটি নাট্যকর্মীর নাম, ঠিকানা, মোবাইল নাম্বার এবং বর্তমান পেশা সম্পর্কে তথ্য উক্ত নাট্যদলে রাখা যেতে পারে। পুরানো নাট্যকর্মীদের অবস্থান, তাদের নাম ঠিকানা, মোবাইল নাম্বার ইত্যাদি সংগ্রহে রাখা যেতে পারে। শেখানোর মত লোককে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নির্দেশক তৈরি করা যেতে পারে। কিংবা বিভাগ ভিত্তিক ও এটা হতে পারে। প্রতিটি বিভাগ ও জেলা গুলোতে নাট্য প্রশিক্ষক তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। তাই আমাদের উচিৎ নাট্য আন্দোলনের জন্য একঝাঁক তরুণ নাট্য কর্মী যারা নিজেদের সর্বোচ্চ ত্যাগের মাধ্যমে এ দেশে একটি সুস্থ সুন্দর নাট্যাঙ্গন উপহার দেবে।