পবিএ কোরআনের বাণী। ‘ইন্নাদ্ দীনা ইনদাল্লাহিল ইসলাম’ নিশ্চয় ইসলাম হচ্ছে মহান আল্লাহর কাছে একমাএ মনোনীত জীবন বিধান।পবিএ কোরআন এবং সুন্নাহ সমর্থিত যে জীবন সে জীবনই ইসলাম। কাজেই ইসলামী মূল্যবোধ ও আমাদের সংস্কৃতির মূল উৎস পবিএ কুরআন ও হাদীস। ‘ইসলাম’ শব্দটি উদ্ভূত হয়েছে ‘সালমুন’থেকে এবং এর আভিধানিক অর্থ শান্তি। ইসলামের অধিনায়ক হযরত রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শান্তির দূত। পবিএ কুরআনে তাঁকে আখ্যায়িত করা হয়েছে ‘রহমাতুল্লিল আলামীন’- সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত এবং ‘উসওয়াতুন হাসানা’ বা অনুপম আদর্শ। মহাকবি শেখ সাদী র. রসূলে করীম সা. এর প্রশংসায় আরবীতে যে মাএ চার লাইনের না’ত রচনা করেন এবং এই চারটি লাইনেই রসূলে করীম সা.-এর পূর্ণ জীবনের ইংগিত বহন করে।
‘বালাগাল উলা বি কামালিহী
কাশাফাদ দোজা বি জামালিহী
হাসুনাত জামিউ খেসালিহী
সাল্লু আলায়হে ওয়া আলিহী।’
তিনি উচ্চে আসীন হয়েছেন তাঁর কর্ম দ্বারা, তাঁর ব্যাবহারের সৌন্দর্য দিয়ে তিনি ইহকাল -পরকাল উভয়কালের অন্ধকার বিদূরিত করেছেন: তাঁর স্বভাব-চরিত্র সবই ছিল পরম সৌন্দর্যবান, অতএব তাঁর উপর এবং তাঁর বংশ পরস্পরার উপর দরুদ পাঠ করো। প্রসঙ্গতঃ কবি ইবনে জুবাইর-এর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বানাত সুজাদ’ থেকে দুটো লাইনের উদ্ধৃতি দেয়া যায়, ইন্নার রাসূলা লা নূরুণ ইউস তাদাবিহী/ মুহাম্মাদুন্ মিন্ য়ূসুফিল্লাহি মাসলুলু। অর্থাৎ রসূলের আলোকে নেই পৃথিবীতে কোন অন্ধকার। মুহাম্মদ আল্লাহর প্রিয় ঝলসানো মুক্ত তলোয়ার।’ রসূলে করীম সা. যে সময় আবির্ভূত হন তখনকার আরবের অবস্থা সবারই জানা। সে যুগ ‘আইয়্যামে জাহেলিয়া’ বা অন্ধকার-মূর্খতার যুগ বলে চিহ্নিত। সে সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা এখানে সম্ভব নয় এবং আমার অভিপ্রেতও নয়। তবে হ্যাঁ, রাসূলে করীম সা. বয়ে এনেছিলেন ‘ইসলাম’ বা শান্তির শুভদ শিক্ষা এবং মহান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। মহানবীর আদর্শ এবং মহৎ গুনাবলীর বলেই আরবের লোক শান্তির ছায়াতলে এসে দলে দলে আশ্রয় গ্রহণ করে এবং তাঁর তীরোধানের পর কয়েকশ’ বছরের মধ্যে সমগ্র বিশ্বে ইসলামের প্রচার এবং প্রসার ঘটে। ইসলাম সার্বজনীন এবং বিশ্ব মানবতার ধর্মে রুপ লাভ করেছিল বলেই এত তাড়াতাড়ি এই বিস্তৃতি সম্ভব হয়েছিল। ইসলামের মূল্যবোধ সবার হৃদয় জয় করেছিল বলেই একমাত্র ইসলাম পরিপূর্ণ জীবণবিধান নিয়ে বিশ্বজনীনতা অর্জন করে আছে। আগেই বলেছি , ইসলামী মূল্যবোধ ও আমাদের সংস্কৃতির মূল উৎস পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ। পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে যদি আমাদের জীবণ উদ্ভাসিত হয় তবে সত্যিকার মূল্যায়ন হবে ইসলামের এবং তখনই হবে জীবণ বিধানের পূর্ণতা এবং সাফল্য। রসূলে করীম সা.-এর নবুয়্যত প্রাপ্তির সময়কাল অর্থাৎ আইয়্যামে ইসলামিয়া থেকে শুরু করে বর্তমান কাল পর্যন্ত পৃথিবীতে যত মুসলিম পন্ডিত, দার্শনিক,কবি-সাহিত্যিক, সূফি দরবেশ, অলিয়ে কামিল প্রমুখের আবির্ভাব ঘটেছে তাঁদের বক্তব্য, রচনাবলী ইত্যাদি সবই কুরআন ও সুন্নাহ সমর্থিতএবং ইসলামী মূল্যবোধে আকীর্ণ। রসূলে করীম সা. ছিলেন একাধারে শাসক, ধর্মপ্রচারক, শান্তির অমোঘ নায়ক, বিচারক, যোদ্ধা ইত্যাকার সবকিছু এবং সব মিলিয়ে একজন আদর্শ মহামানব এবং পরিপূর্ন মহামানব। তাঁর বিশ্বমানবতার স্বরুপ ব্যাখ্যায় যে শুধু মুসলিম মন্ডিত মনীষী, দার্শনিক-লেখক, কবি সাহিত্যিকরা তৎপর হয়েছেন তাই নয়, বহু ভিন্নধর্মী পন্ডিত লেখকরাও রসূলে করীম সা. এর আদর্শ এবং ইসলামী দর্শন ও মূল্যবোধ ব্যাখ্যায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। কয়জনের নাম উল্লেখ করবো? উদাহরন স্বরুপ আরবী ভাষাভাষি খ্রীষ্টান লেখক মিশরের জুরজী জায়দান, লেবাননের জীবরান খলীল জীবরান, ইংরেজী ভাষার কবি লর্ড বাইরন, অনুবাদক পন্ডিত এ, জে, আরবেরী, জার্মান ভাষার মহাকবি গ্যাটে এবং এই উপমহাদেশখ্যাত পন্ডিত ও সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহন রায় ও স্বামী বিবেকানন্দের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। ইসলামী আদর্শ ও মূল্যবোধে আকৃষ্ট হয়েই তারা ইসলামের ব্যাখ্যায় নিজেদের ব্যাপৃত রেখে অমর হয়ে আছেন। ভাই গিরিশচন্দ্র অবশ্যি পবিত্র কুরআনের সুর লালিত্যে মুগ্ধ হয়ে আরবী ভাষা শিক্ষা লাভ করেন এবং পবিত্র কুরআন বাংলায় অনুবাদ করেন এবং তিনিই বাংলাভাষায় পবিত্র কুরআনের প্রথম এবং স্বার্থক অনুবাদক। বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে পবিত্র কুরআনের বাংলা অনুবাদ পৌঁছে দেয়া কম কৃতিত্বের কথা নয়, বিশেষ করে একজন ভীন্নধর্মী লোক হয়ে। ইসলামের মূল্যবোধ এবং আদর্শে আকৃষ্ট হয়েই তাঁরা এসব করেছেন। জীবণ ব্যাবস্থার মধ্যে ধর্মনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, সব কিছুই অঙ্গীভূত। তবে সব নীতির সার নীতি ইসলামী নীতি এবং সেই ইসলামী নীতির মধ্যেই ইসলামী মূল্যবোধ সংগুপ্ত। বলা হয়েছে , মুসলিম পন্ডিত দার্শনিক, কবি সাহিত্যিক, সূফি-দরবেশ এবং অলিয়ে কামিলরাই বেশী মাত্রায় সোচ্চার হয়েছেন ইসলামের প্রচার, প্রসার এবং মূল্যবোধ ব্যাখ্যায়। যুগে যুগে তাঁরাই ইসলাম রক্ষা করে চলেছেন। যদি বাংলাদেশের কথা ধরি তবে বলা যায়, অষ্টম শতাব্দীতে যখন এই দেশে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে তখন এদেশের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। কারণ ইসলাম বয়ে এনেছিল প্রশান্তির ধারা। এর ফলে বৌদ্ধ শাসন ও হিন্দু শাসন আমল অর্থাৎ পাল ও সেন রাজত্বের সময় সাধারণ মানুষ জাতিগত ভেদাভেদ এবং আচার অনুষ্ঠানের যাঁতাকলে যে নিষ্পেষিত হচ্ছিল তার অবসান ঘটাল ইসলামের অমীয় বাণী।ত্রয়োদশ অর্থাৎ ১২০১ খ্রিষ্টব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ারের আগমনে এ দেশের মানুষ তার ইসলামী মূল্যবোধ সম্পৃক্ত শাসন ব্যাবস্থায় সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে স্বাগত জানায়। একই ব্যাপার ঘটলো নৃপতি হোসেন শাহের বেলাও। তবে একটি ব্যাপার লক্ষনীয় যে, ইসলামী মূল্যবোধ তথা ইসলামের প্রচার ও প্রসারে প্রশাসক গোষ্ঠী অর্থাৎ রাজন্যবর্গের যতোটা ভূমিকা না ছিল তার চেয়ে বেশী ভূমিকা ছিল বিভিন্ন সময়ে এ দেশে আগত সূফি দরবেশ এবং অলিয়ে কামিল খ্যাত মহান ব্যাক্তিবর্গের। এ দেশের জনগনের মধ্যে ইসলাম প্রচার এবং ইসলামী মূল্যবোধ জাগরণে তাঁদেরই অবদান অত্যাধিক বলে স্বীকৃত।