‘সীরাত’ এর আভিধানিক অর্থ হলো জীবন পদ্ধতি বা জীবন চরিত।আর ‘সীরাত’ শব্দের পারিভাষিক অর্থ বোঝান হয়েছে মহানবী সা. এর সার্বিক জীবন চরিতকে। রাসূল সা.-এর বিখ্যাত জীবনী গ্রন্থগুলোর নামের সাথে এই ‘সীরাত’ শব্দটি সম্পৃক্ত দেখা যায়।সীরাত চর্চায় সাধারণত কুরআন, হাদীস, মাগাজী গ্রন্থাবলী, রাসূল সা.কে নিবেদিত কবিতা, প্রাচীন ইতিহাসমূলক (যেসব মক্কা-মদীনার ইতিহাস), সাহাবীদের শামায়েল প্রভৃতি সহায়ক হিসেবে বিবেচিত।পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন সূরায়ে রাসূল সা. সম্বন্ধে নানা ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য আছে। অন্যদিকে হাদীসে রাসূল সা. জীবনের সমস্ত দিক ও বিভাগের খুঁটিনাটি কথা পর্যন্ত রয়েছে।ইসলামের পঞ্চম খলীফা হযরত ওমর রা.র পরামর্শক্রমে রাসূল সা.এর ওফাতের পঁচাশি বছর পর ইমাম শিহাব আল যুহরী (জন্ম:৫১হিজরী-মৃত্যু:১২৪ হিজরী)। সীরাত চর্চা শুরু করেন। তিনি যে সংক্ষেপ্ত জীবনীটি রচনা করেন সেটিই সীরাত বিষয়ক প্রথম গ্রন্থ, যা বহুকাল আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। শিহাব যুহরীর প্রিয় ছাত্র মূসা ইবনে উকমা (মৃত্যু: ১৪১ হিজরী) দ্বিতীয় সীরাত গ্রন্থটি রচনা করেন, কিন্তু এ গ্রন্থটিও বিলুপ্ত হয়ে যায়। এরপর শিহাব যুহরীর আরও কয়েকজন ছাত্র-ইবন ইসহাক, ওমর ইবন রাশেদ, আবদুর রহমান ইবন আবদুল আযীয, ইবন সালেহ প্রমুখও সীরাত গ্রন্থ রচনা করেন।তবে প্রথম সীরাতকার হিসেবে বর্তমান বিশ্বে যার নামটি সম্মানের সাথে উচ্চারিত হয় তিনি হলেন ইবন ইসহাক (জন্ম:৮৫ হিজরী-মৃত্যু:১৫১ হিজরী)। রাসূল সা.-এর ওফাতের মাত্র ৭৪ বছর পর মদীনায় জন্মগ্রহণকারী ইবন ইসহাকের রচিত ‘সীরাতু রাসূলুল্লাহ’ সীরাত বিষয়ক সর্বাধিক প্রাচীনতম এবং পূর্ণাঙ্গ প্রামাণ্য গ্রন্থ।এরপর ইবন হিশাম তাঁর পূর্বসূরী ইবন ইসহাক রচিত ‘সীরাতু রাসূলুল্লাহ’ নামক গ্রন্থটির সংশোধিত, পরিমার্জিত, রূপ দিয়ে সংক্ষেপ্তাকারে ‘সীরাতে নবুবিয়্যা’ নামে প্রকাশ করেন যা ‘সীরাতে ইবন হিশাম’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। আজ পর্যন্ত এ গ্রন্থটি প্রামাণ্য সীরাত গ্রন্থ হিসেবে সর্বাধিক সমাদৃত।বাংলা ভাষায় সীরাত চর্চা কবে থেকে শুরু হয়েছে তা সন তারিখ ঠিক করে বলা অবশ্যই দুরূহ ব্যাপার। তবে একথা বলা যায় যে, ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর রা.এর খিলাফতকালে যখন বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার শুরু হয় তখন থেকেই মৌখিকভাবে ‘সীরাত’ চর্চার শুরু। অবশ্য লিখিতভাবে ‘খোদা’, ‘মহামদ’, ‘টুপি’, ‘পেকাম্বর’, ‘আদম্ফ’, ‘গাজী’, ‘কাজী’, ‘ফকির’, ‘মলানা’ প্রভৃতি শব্দগুলো ত্রয়োদশ শতাব্দীর কবি রামাই পন্ডিত তার ‘শূন্যপূরান’ কাব্যের ‘নিরঞ্জনের রুষ্মা’ নামক কবিতায় প্রথম ব্যবহার করেন।মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলমান কবি হলেন শাহ মুহম্মদ সগীর (জন্ম:১৩৩৯ খ্রি.-মৃত্যু:১৪০৯ খ্রি) ‘ইউসুফ জোলায়খা’ কাব্যে তিনি রাসূল প্রশস্তি করে তাঁর কাব্য শুরু করেছেন।ষোড়শ শতাব্দীতে গৌড়ের সুলতান ইউসুফ শাহের দরবারে কবি জৈনুদ্দীন ও শাহ বিরিদ খান ‘রছুল বিজয়’, নামে আলাদা আলাদা কাব্য রচনা করেছেন।ষোড়শ শতকের কবি সৈয়দ সুলতান (জন্ম:১৫৫০ খ্রি.-মৃত্যু: ১৬৪৮ খ্রি.) রচনা করেন- ‘ওফাতে রসূল’, ‘রসূল বিজয়’, ‘নবী বংশ’, ‘শবে মিরাজ’, ‘রসূল চরিত’,প্রভৃতি কাব্য। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী কবি সৈয়দ সুলতানের কাব্য চর্চার মূল উদ্দেশ্য ছিল রাসূল সা.-এর কর্মময় জীবন ও ইসলামের মর্মকথা জনসমক্ষে তুলে ধরা।আধুনিক বাংলা কাব্যের প্রথম দিকে রাসূল সা.এর প্রসঙ্গ এসেছে আখ্যান কাব্য, খন্ড কবিতা, গযল-গান ও দোয়া দরূদ ইত্যাদির মাধ্যমে। ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে মীর মশাররফ হোসেনের সম্পাদনায় ‘মৌলুদ শরীফ’ নামে যে গ্রন্থ প্রকাশিত হয় সেটি খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল।‘বিশ্বনবী’র লেখক কবি গোলাম মোস্তফা বাংলা মিলাদ শরীফের ক্ষেত্রে যে অনন্য সাধারণ সংযোজন করেছেন তার তুলনা বিরল। বর্তমানে বাঙালি মুসলমানের ঘরে ঘরে বা মিলাদ মাহফিলে সুর করে যে কিয়ামটি পড়া হয় তা গোলাম মোস্তফারই রচনা।
“তুমি যেন নূরের রবি
নিখিলের ধ্যানের ছবি
তুমি না এলে দুনিয়ায়
আঁধারে ডুবিত সবি
ইয়া নবী সালাম আলায়কা
ইয়া রাসূল সালাম আলায়কা”
একই সময়ে বাংলা সাহিত্যে সর্বপ্লাবী বহুমুখী প্রতিভা নিয়ে আবির্ভূত হন কবি কাজী নজরুল ইসলাম (জন্ম: ১৮৯৯ খ্রি.-মৃত্যু:১৯৭৬ খ্রি.)। উল্কার মত আবির্ভাব হয়ে একের পর এক হামদ, না’ত, ইসলামী গান ও কবিতা রচনা করে মুসলিম সমাজে নবজাগরণের সৃষ্টি করে সূচনা করলেন এক নতুন অধ্যায়ের।১৯২০ এর নভেম্বর-ডিসেম্বর সংখ্যা মোসলেম ভারতে প্রকাশিত হয় ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজদহম: আবির্ভাব’। ঠিক এর এক বছর পর মোসলেম ভারতেই প্রকাশিত হয় ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজদহম : তিরোভাব’, শিরোনামে অসাধারণ দু’টি কবিতা।কাজী নজরুলের পর বিপুল প্রতিভা ও মমত্ব নিয়ে রাসূল সা.-এর ওপর কবিতা লিখেছেন ফররুখ আহমদ (জন্ম: ১৯১৮ খ্রি.-মৃত্যু: ১৯৭৪ খ্রি.)। ‘সিরাজাম মুনীরা’ নামে একটি পূর্ণাঙ্গ কাব্য রচনা করেছেন।বাংলা গদ্য সাহিত্যে রাসূল সা.কে নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে প্রথম গ্রন্থ রচনা করেন, শেখ আব্দুর রহীম (জন্ম: ১৮৫৯ খ্রি.-মৃত্যু:১৯৩১খ্রি.)। গ্রন্থটির নাম ‘হযরত মুহম্মদের (স.) জীবন চরিত ও ধর্মনীতি’।
প্রিয় নবীজি সা.-এর সীরাত চর্চার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সর্বকালে সর্বযুগে এই জন্য রয়েছে যে, তিনি ছিলেন ইসলামের সর্বশেষ নবী। মানবজাতির কল্যাণের প্রতীক হয়ে আগমন করেন এই ধরণীতে। বিশ্ববাসীকে আহ্বান করেন কল্যাণের পথে, বিরত রাখেন সমূহ অকল্যাণ থেকে।পবিত্র কুরআনের বাস্তব ও সার্থক রূপায়ণ ছিলো মহানবীর গোটা সীরাত বা জীবনচরিত।পবিত্র কুরআনে যত সুন্দর, সত্য, সততা, মানবতা ও কল্যাণময় গুণাবলীর কথা বলা হয়েছে, তার নিখুঁত ও পরিপূর্ণ চিত্রায়ন ঘটেছিলো রাসুল সা.-এর জীবনাদর্শে। মানব সমাজের উন্নতি, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আর্থিক ও চারিত্রিক সকল ক্ষেত্রে গৌরবময় উত্তরণের পথই হলো অনুসরণীয় আদর্শ।মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর জীবন সাধনা মানবজাতির চিরন্তন আদর্শ! তার বাণী জগতের চিরন্তন সম্পদ! পবিত্র কোরআনের তিনি প্রতিবিম্ব! পবিত্র কুরআনের প্রতিটি অক্ষর ও বাণী তাঁর পবিত্র জীবন! তিনি শুধু সমকালের নন, তাঁর অতীত, সমকাল ও ভবিষ্যৎ জগতের মানুষের কল্পনা ও চেতনাকে তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন! তাঁর জীবন ও ব্যক্তিত্বের আলোয় সমকালীন পৃথিবী আলোকিত হয়ে উঠেছিল! যুগযুগান্তব্যাপী মানবজাতিকে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে দিয়েছে চরম ও পরম উপলব্ধি! সেই উপলব্ধিরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে মানুষের জীবনে জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, কাব্যে, সাহিত্যে- এককথায় সর্বত্র! মহানবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর জীবন সাধনা তাই মানুষের শুধু অনুকরণীয় আদর্শ হয়নি, যুগশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী-গুণী, পন্ডিত ও চিন্তা নায়কদের গভীরভাবে ভাবিয়েছে! সেই ভাবনারই ফসল রূপে বিশ্বসাহিত্যে সংযোজিত হয়েছে একটি মহৎ সাহিত্য ধারা! সে সাহিত্য মানুষকে দিয়েছে জীবন ও জগৎ,ইহকাল ও পরকাল- সর্বোপরি মানুষের জ্ঞানের চিন্তা ও চেতনায় দিয়েছে এক মহত্তম উপলব্ধি! বিশ্ব সাহিত্যে তা সীরাত সাহিত্য নামে পরিচিত!মহানবী সা.-এর সীরাত বা জীবনচরিত সম্পর্কে অসংখ্য সীরাত গ্রন্থ লেখা হয়েছে! তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাছাই কয়েকটি সীরাত গ্রন্থকে তুলে ধরে আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে, যাতে পাঠক এই সীরাত পুস্তকগুলি পাঠে উৎসাহিত হন এবং রাসূল সা. এর বিশ্বস্ত জীবনচরিত পাঠ করে নিজেদের জীবনকে আলোকিত করতে পারেন!
বাংলা ইসলামী সাহিত্যের অগ্রপথিক ইসলামী রেনেসাঁ আন্দোলনের অগ্রদূত ,দূরদর্শী ইসলামী চিন্তাবিদ, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী ব্যক্তিত্ব মাসিক মদীনা সম্পাদক হযরত আল্লামা হযরত মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.) বাংলা ভাষায় সবচেয়ে বেশী সীরাত গ্রন্থ অনুবাদ করেন। বাংলা ভাষায় সিরাত চর্চার পথিকৃত মাওলানা মূহিঊদ্দীন খান । মাসিক মদীনা, মুসলিম জাহান এর সীরাতুন্নবী সংখ্যা বিশাল কলেবরেঈদ সংখ্যার মতো প্রকাশ করার আইডিয়ার জনক তিনি ।তিনি মদীনা পাবলিকেশন্স এর মাধ্যমে অসংখ্য সীরাত গ্রন্হ প্রকাশ করেছেন। আল্লামা শিবলী নোমানী (রহ.) ও আল্লামা সৈয়দ সুলাইমান নদভী (রহ.) লিখিত বিখ্যাত সীরাত গ্রন্থ ‘সীরাতুন্নবী’ এর অনুবাদ করেন তিনি। ভূমিকায় তিনি লিখেছেন সীরাতুন্নবী গ্রন্থখানা বিশ্বসাহিত্যে সর্ববৃহৎ জীবনীগ্রন্থ গুলোর অন্যতম! এই শুদ্ধতম গ্রন্থখানি দীর্ঘকাল যাবৎ সীরাত শাস্ত্রের একখানা আকরগ্রন্থ রূপে ব্যবহৃত হয়ে আসছে! যুগশ্রেষ্ঠ মনীষী আল্লামা শিবলী নোমানী ও তার সুযোগ্য সাগরেদ আল্লামা সৈয়দ সুলাইমান নাদভী র সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই গ্রন্থ কয়টি খন্ড প্রথম রচিত ও প্রকাশিত হয়! শুদ্ধতম বর্ণনা থেকে সংগৃহীত তথ্যাবলী এবং উপস্থাপনের অপূর্ব মুন্সিয়ানার গুনে মহাগ্রন্থ যে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে তা বর্ণনাতীত! সীরাতুন্নবীর মূল জীবনী অংশঃ প্রথম দুটি খণ্ডে সমাপ্ত হয়েছে! পরবর্তী চারটি খন্ড বিশ্লেষণধর্মী এবং দার্শনিক আলোচনার সমাহার! আমি আগ্রহী সীরাত পাঠকগণের জন্য প্রথম দুটি খন্ড কিঞ্চিত সংক্ষিপ্ত এবং একত্রিত করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একখানা সহজপাঠ্য পূর্ণাঙ্গ জীবনী গ্রন্থ রূপে সাজিয়েছি! হলে গ্রন্থটি এখন আর মূল গ্রন্থের হুবহু অনুবাদ থাকেনি! তবে আমি নিজের পক্ষ থেকে এতে কোন নতুন তথ্য সংযোজিত বা গুরুত্বপূর্ণ কোন তথ্য বাদ ও দেইনি! সাধারণ পাঠকগনের সুবিধার্থেই এটা করতে হয়েছে! আমার ধারণা এর ফলে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সীরাত গ্রন্থ রূপান্তরিত হয়েছে এবং পাঠকগণের জন্য তা সহজপাঠ্য ও হয়েছে!সীরাতুন্নবী পুস্তকের ‘পবিত্র আখলাক’ পর্বটি পাঠ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয়! মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.র পবিত্র জীবনের এই অধ্যায়টি এমনই এক অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত যা তাঁকে দুনিয়ার অন্যান্য ধর্ম প্রবর্তক ও সংস্কারকদের মধ্যে অন্তহীন স্বাতন্ত্রে ভাস্বর করে রেখেছে! তাঁর শিক্ষার সর্বপ্রথম নমুনা ছিলেন তিনি নিজেই! তিনি বাইরে জনসমাবেশে যা বলতেন ঘরের নিভৃত কোণে ও ঠিক তেমনি আদর্শের বাস্তব নমুনা হিসাবেই বিরাজ করতেন! আখলাক এবং আমলের যে সমস্ত কথা তিনি অন্যকে বলতেন সর্বপ্রথম তা নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করে তা অন্যের সামনে পেশ করতেন! মানুষের বাস্তব চরিত্র সম্পর্কে ঘরের স্ত্রীর চাইতে বেশি ওয়াকিবহাল আর কে হতে পারেন? একবার কিছু লোক হযরত আয়েশার খেদমতে হুযুর সা.র ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিছু বলার জন্য আরজ করলেন! জবাবে মা আয়েশা তাদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি কোরআন পড়ো না? রসূলুল্লাহ সা.এর চরিত্র ছিল জীবন্ত কোরআন! যতগুলো ধর্মগ্রন্থ দেখা যায় তা সংশ্লিষ্ট ধর্ম প্রবর্তকদের বাণীসমূহেরই সমষ্টি মাত্র! কিন্তু সে সমস্ত গ্রন্থের কোন একটি হরফ ওকি স্ব স্ব প্রচারকের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কোন প্রকার ইশারা প্রদান করতে সক্ষম? অথচ লক্ষ কোটি বিরুদ্ধবাদীদের মুখের উপর এই পবিত্র কোরআন ঘোষণা করছে: ‘নিঃসন্দেহে আপনি মহৎ চরিত্রের অধিকারী’! যখন আরবের অধিকাংশ মানুষই কোরআন বহনকারীর বিরুদ্ধে সর্বশক্তিতে সমালোচনামুখর ছিল, তখনও কোরআন শত্রুদের সামনেই তাঁর সম্পর্কে সাক্ষ্য প্রদান করেছে: ‘আল্লাহর অনুগ্রহে আপনি তাদের প্রতি নম্র ব্যবহার করে থাকেন! যদি আপনি বক্র স্বভাবের ও কঠিন হৃদয়ের হতেন তাহলে, এরা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত’! অন্য এক স্থানে বলা হয়েছে: ‘তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের কাছে একজন পয়গম্বর আগমন করেছেন! তোমাদের কষ্ট তাঁর কাছে বড় বেদনাদায়ক! তিনি তোমাদের কল্যাণকামী ও বিশ্বাসিদের প্রতি অত্যন্ত বিনয়ী ও দয়ালু’! মানুষের যাবতীয় অবস্থা সম্পর্কে স্ত্রীর চেয়ে অধিক অভিজ্ঞতা দুনিয়ার আর কারো থাকতে পারে কি!? হযরত খাদিজাতুল কোবরা যিনি নবুওয়াতের পূর্বে ও পরে দীর্ঘ ২৫ বছর পর্যন্ত পতি সেবায় নিয়োজিত ছিলেন, তিনি ওহী প্রাপ্তির প্রাথমিক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ সা.কে এই বলে সান্ত্বনা দান করতেন যে, ‘কখনো নয়, খোদার কসম আল্লাহ আপনাকে কখনো দুশ্চিন্তায় ফেলবেন না! আপনি আপনজনের প্রতি সদ্ব্যবহার করে থাকেন, ঋণগ্রস্তদের দায়িত্ব গ্রহণ করে থাকেন, দরিদ্রজনের সাহায্য করে থাকেন, অতিথিসেবা করে থাকেন, সত্যের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করে থাকেন, বিপদে মানুষকে সাহায্য করেন’! উম্মাহাতুল মোমেনীনদের মধ্যে হযরত আয়েশার চেয়ে আর কেউ রাসূলুল্লাহ সা.এর গুনাবলী বিস্তারিত বর্ণনা দান করতে পারেননি! তিনি বলেছেন, ‘কখনো কাউকে মন্দ বলার স্বভাব রসূলুল্লাহ সা.এর ছিল না! মন্দের পরিবর্তে কখনো মন্দ ব্যবহার করতেন না! বরং তা পরিত্যাগ অথবা ক্ষমা করে দিতেন! কখনো নিজের কোনো ব্যাপারে কারো কাছ থেকে কোনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি! তিনি কখনও চিহ্নিত করে কোন মুসলমানকে অভিশাপ দেননি! কখনো কোন দাস-দাসীকে, কোন নারী, এমনকি পশু কেউ নিজের হাতে মারধর করেননি! কারো কোন আবেদন কখনো প্রত্যাখ্যান করেননি! তবে তা যদি নাজায়েজ কিছু না হতো! যখন ঘরে প্রবেশ করতেন তখন সুন্দর হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় মুচকি হেসে এসে প্রবেশ করতেন! বন্ধু জনের মধ্যে কখনো পা ছড়িয়ে বসতেন না! কথাবার্তা ধীরে ধীরে এমন ভাবে বলতেন যে, যদি কেউ মনে রাখতে চাইতো তবে সহজেই তা করতে পারত’! হযরত আলী রা.যিনি মহানবী সা.এর কাছে দীক্ষা লাভ করেছিলেন এবং নবুয়তের প্রথম থেকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অন্ততপক্ষে ২৩ বছর তাঁর খেদমতে ছিলেন! হযরত ইমাম হুসাইন রা.একদিন তার কাছে রাসূলুল্লাহ সা.এর চরিত্র ও স্বভাব সম্পর্কে প্রশ্ন করলে জবাবে বললেন, ‘তিনি হাসিমুখ, নম্র স্বভাব ও দয়ালু প্রকৃতির লোক ছিলেন! কঠোর স্বভাব ও সংকীর্ণ হৃদয়ের ছিলেন না! কথায় কথায় কলহ করতেন না! কোন প্রকারের মন্দভাষা কখনো উচ্চারণ করতেন না! ছিদ্রান্বেষী ও ক্ষুদ্রমনা ছিলেন না! কোন কথা তাঁর পছন্দ না হলে, তা থেকে বিরত থাকতেন! তাঁর কাছে কেউ কোনো কিছুর আবদার করলে, তাঁকে নিরাশ করতেন না! নামঞ্জুরের কথাও প্রকাশ করতেন না! অর্থাৎ প্রকাশ্যভাবে নিষেধ বা প্রত্যাখ্যান করতেন না! বরং তা পূরণ করা সম্ভব না হলে নীরব থাকতেন! ফলে বিচক্ষণ ব্যক্তিগণ সে নীরবতার মধ্যেই উদ্দেশ্য বুঝে নিতে পারতেন! তিনি নিজের জীবন থেকে তিনটি বিষয়কে সম্পূর্ণরূপে দূর করে দিয়েছিলেন! যেমন পরস্পরে কূট তর্ক করা, প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলা এবং লক্ষ্যহীন কোন কিছুর পেছনে লেগে থাকা! অপর লোকদের ক্ষেত্রেও তিনি তিনটি বিষয়ে সংযমী ছিলেন! কাউকে ও মন্দ বলতেন না, কাউকে দোষারোপ করতেন না এবং কারো আভ্যন্তরীন ব্যাপারে অনুসন্ধানে লিপ্ত থাকতেন না! যে কথা মানুষের কল্যাণকর তাই বলতেন! কথোপকথনের সময় সাহাবীগণ এমন নীরবতায় শুনতেন, যাতে মনে হতো যেন তাদের মাথায় পাখি বসে আছে! যখন তাঁর কথা বলা শেষ হতো তখন সাহাবীগণ পরস্পরে কথাবার্তা বলতেন! কেউ কোনো কথা বলা আরম্ভ করলে তার কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি নীরবে শুনতে থাকতেন! যে কথায় মানুষ হাসতো, তিনিও সে কথায় মুচকি হাসতেন! যাতে মানুষ বিস্মিত হতো, তিনি ও তাতে বিস্মিত হতেন! বহিরাগত কোন ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে ঔদ্ধত্যের সঙ্গে কথা বললে তা তিনি সহ্য করে নিতেন! লোকমুখে নিজের প্রশংসা শোনা পছন্দ করতেন না! কিন্তু যদি কেউ তাঁর অনুগ্রহ ও দানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করত তা গ্রহণ করতেন! যতক্ষণ পর্যন্ত কোন ব্যক্তি তার কথা শেষ না করত ততক্ষণ তার মাঝে ছেদ টানতেন না! তিনি অত্যন্ত উদার, সত্যবাদী ও অতিশয় নম্র স্বভাবের ছিলেন! তাঁর সাহচর্য ছিল মহোত্তম! তাঁর এমন চেহারা ছিল যে অকস্মাৎ দেখলে অন্তর কেঁপে উঠতো! কিন্তু যতই ঘনিষ্ঠ ভাবে পরিচিত হতে থাকত, ততই ভালবাসা দৃঢ়তর হতো’! চরিত্রের সর্বপ্রথম ও অত্যধিক প্রয়োজনীয় দিক হলো মানুষ যে বিষয়ই অবলম্বন করবে তাতে এমন দৃঢ় থাকবে! যেন তা দ্বিতীয় প্রকৃতিতে পরিণত হয়ে যায়! একমাত্র মানুষ ব্যতীত জগতের সমস্ত সৃষ্ট জীবই শুধু এক রকম কাজ করতে সক্ষম এবং সে প্রকৃতিগত কারণেই তা করতে বাধ্য থাকে! কিন্তু মানুষ আল্লাহর তরফ থেকেই স্বাধীকার নিয়ে জন্মলাভ করেছে! সে প্রাণিজগতের মত কোন বিশেষ ধরনের কার্যাদি ও চরিত্রের উপর বাঁধা নেই! কিন্তু চরিত্রের একটি সূক্ষ্মতত্ত্ব হলো এই যে মানুষ চরিত্রের সুন্দর যে দিকটি নিজের জন্য বেছে নেবে কঠোরভাবে তা অনুসরণ করে চলতে থাকবে! এরই নাম সংকল্পে দৃঢ়তা ও কর্মে স্থিরতা! রসূলুল্লাহ সা.যাবতীয় কাজে নিয়মের অনুসরণ করতেন! যে কাজ যে পদ্ধতিতে, যে সময় আরম্ভ করতেন, তার উপর সব সময় দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত থাকতেন! শরীয়তের মূল নিয়ম থেকে সুন্নত শব্দের উৎপত্তি! সুন্নত সেই কাজ যা রসূলুল্লাহ সা.সর্বদা দৃঢ়তার সঙ্গে পালন করতেন! রসূলুল্লাহ সা.তাঁর যাবতীয় কার্যাদি ও আচার-আচরণ এত পরিপক্ব মজবুত ছিল যে, সমগ্র জীবনে কখনো তার এতোটুকু বাত্যয় ঘটেনি! একবার কোন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সা.এর এবাদত ও কার্যাবলী সম্পর্কে হযরত আয়েশা রা.র কাছে জিজ্ঞেস করলেন যে, তিনি কি কোন বিশেষ দিনে এসব কাজ করতেন? তিনি উত্তরে বললেন, না তাঁর কাজ মেঘের বৃষ্টিপাতের ন্যায় হত! অর্থাৎ যেভাবে মেঘ থেকে বৃষ্টি অবিরাম বর্ষিত হতে থাকে তেমনি তাঁর আমলও ছিল বিরামহীন! তিনি একবার যে কাজ গ্রহণ করেছেন সব সময় তার অনুসরণ করে চলেছেন! রসূলুল্লাহ সা.যদি কোনো কাজ শুরু করতেন তবে সব সময় তাতে দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত থাকতেন! তিনি এরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় কাজ হলো, তার উপর স্থির থাকা’! তিনি রাত জেগে এবাদত করতেন! হযরত আয়েশা রা.বলেন যে, ‘রাসূলুল্লাহ সা. কখনো রাতে এবাদত পরিহার করেননি! যদি কখনো অসুস্থ অথবা দুর্বল হয়ে পড়তেন তখন বসে বসে হলেও নির্ধারিত সেই আমলগুলো করতে থাকতেন! যে কাজের যে সময় নির্দিষ্ট করে নিতেন কখনো তার ব্যতিক্রম করতেন না! নামাজ ,তাসবিহ ও তাহলীল এর সময় সমূহে, নফল নামাজের সংখ্যাসমূহে, নিদ্রা ও জাগরণের নির্ধারিত সময়ে লোকের সঙ্গে সাক্ষাতের পদ্ধতিতে কোনদিন পরিবর্তন দেখা যায়নি! ফলে এ কঠোর নিয়মানুবর্তিতা ও মুসলমানদের জীবনে মূলনীতি হিসেবে পরিগণিত হয়েছে! হযরত আলী রা.,হযরত আয়েশা রা.,হযরত আনাস রা.প্রমূখ প্রখ্যাত সাহাবীগণ যাঁরা দীর্ঘকাল রাসূলুল্লাহ সা.এর খেদমতে ছিলেন, তাঁদের সবার সর্বসম্মত বর্ণনা হলো এই যে, তিনি নম্র স্বভাবের, সুন্দর চরিত্রের এবং সৎ প্রকৃতির লোক ছিলেন! তাঁর মুখমণ্ডল হাস্যোজ্জ্বল থাকতো বা গুরুগম্ভীর ভাবে কথাবার্তা বলতেন! কারো মন ভেঙে যেতে পারে এমন কোনো কথা বলতেন না! কারো সঙ্গে সাক্ষাতের সময় প্রথমে সালাম ও মুছাফাহা করতেন! কোন ব্যক্তি তাঁর কানের কাছে ঝুঁকে কথা বলতে চাইলে যতক্ষণ সে তার মুখ না সরাতো ততক্ষণ তার দিক থেকে তিনি মুখ ফিরিয়ে নিতে না! মুছাফাহার ও একই নিয়ম ছিল! অর্থাৎ যদি কারো সঙ্গে হাত মেলাতে যতক্ষণ না সে হাত ছাড়িয়ে নিতে ততক্ষণ তিনি হাত ছেড়ে দিতেন না! মজলিসে বসা অবস্থায় তাঁর হাঁটু কখনো অন্যান্যদের সামনে প্রসারিত থাকতো না! বাদশা নাজ্জাশীর পক্ষ থেকে একবার এক দূত এলেন! রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে নিজে মেহমান হিসাবে গ্রহণ করলেন এবং নিজ হাতে আতিথিয়তার যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করলেন! সাহাবীগণ মেহমানদারী সম্পাদনের জন্য আরও জানালেন! জবাবে বললেন, ‘এরা আমার বন্ধুদের সেবা করেছেন সুতরাং আমি এদের সেবা করতে চাই’! বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবী আতবান ইবনে মালেকের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল, তিনি হযরত নবী করীম সা. খেদমতে হাজির হয়ে আবেদন করলেন যে, আমি নিজেও মহল্লার মসজিদে নামাজ পড়ে থাকি! কিন্তু যখন বৃষ্টি হতে থাকে তখন আমার পক্ষে মসজিদ পর্যন্ত যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে! সুতরাং আপনি যদি আমার বাড়ি এসে নামাজ পড়তেন তাহলে আমি সেই স্থানটিই নামাযের জন্য নির্ধারিত করে নিতাম! পরেরদিন নবী সা.আবুবকর সা.কে সঙ্গে নিয়ে তাঁর বাড়ি গেলেন এবং বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে অনুমতি চাইলেন! ভেতর থেকে প্রবেশের অনুমতি এল! তারপর ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন কোথায় নামাজ পড়বো? স্থান বলে দেওয়া হল! রাসূল সা.তাকবির বলে সেখানে দু’রাকাত নামায আদায় করলেন! নামাজ শেষে লোকেরা খাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করলো, খাজিরা নামক এক প্রকার খাদ্য যা কিমার মধ্যে আটা বিছিয়ে তৈরি করা হয়, তাঁর সামনে হাজির করা হলো! মহল্লার সকল লোক খাওয়ায় অংশগ্রহণ করলো! উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে কেউ বলে উঠলো মালেক ইবনে দাহিশকে তো দেখা যায় না! এক ব্যক্তি বললেন, সে তো মুনাফিক! এরশাদ হলো, এমন কথা কখনো বলোনা! সে লাইলাহা ইল্লাল্লাহ বলেছে! লোকেরা বলল হ্যাঁ! তবে তার ঝোঁক মুনাফিকদের দিকে! মহানবী সা.বললেন, যে ব্যাক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ’ বলেছে, আল্লাহ তার প্রতি দোযখের আগুন হারাম করে দিয়েছেন! সঙ্গীদের মজলিসে অপছন্দনীয় ব্যবহার ও সহ্য করতেন কিন্তু তা প্রকাশ করতেন না! হযরত যয়নব রা.সঙ্গে বিয়ের সময় সাহাবীদের ওলিমার দাওয়াত করা হয়েছিল! খাওয়া-দাওয়ার পর কিছু লোক হযরত জয়নবের ঘরে বসে গল্প গুজব করতে লাগলেন! তখন ও পর্দা ফরজ হয়নি! হলে হযরত জয়নব এক অস্বস্তিকর অবস্থায় বসে থাকতে বাধ্য হলেন! নবী সা.এ পরিস্থিতিতে মনে মনে কামনা করছিলেন যে লোক গুলো উঠে চলে যাক! কিন্তু চক্ষুলজ্জার খাতিরে মুখ বন্ধ ছিল! অস্বস্তির মধ্যে একবার উঠে হযরত আয়েশার ঘরে চলে গেলেন! কিন্তু কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে দেখলেন মজলিস তেমনই চলছে! এই অবস্থা দেখে ফিরে গেলেন এবং কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর আবার ফিরে আসলেন! পর্দার আয়াত এসময়ই নাযিল হয়!
স্ত্রীলোকদের ঋতুকালীন সময়ে ইহুদীরা তাদের ঘর থেকে বের করে দিত! তাদের হাতের ছোঁয়া পর্যন্ত খেত না! হিজরতের পর মদিনাবাসীগণ নবী সা.এর নিকট এ সম্পর্কিত বিধান জানতে চাইলেন! এরই পরিপ্রেক্ষিতে কোরআনের আয়াত নাজিল হলো যে,‘ঋতুবর্তী হওয়া নারীদের একটি সাধারণ প্রকৃতিগত ব্যাপার মাত্র! তবে ঋতুকালীন সময়ে তোমরা তাদের সঙ্গে সহবাস করো না’! কোরআনের আয়াতের ভিত্তিতে নবী সা.বিধান দিলেন একমাত্র সহবাস ছাড়া স্বাভাবিক মেলামেশায় কোন বাধা নেই! ইহুদীরা এই নির্দেশ জানতে পেরে বলাবলি শুরু করলো, এ লোকটি প্রত্যেক ব্যাপারেই আমাদের বিরুদ্ধাচারণ করে থাকে! ইহুদিদের এ ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার খবর পেয়ে দু’জন সাহাবী মহানবী সা.র খেদমতে হাজির হলেন! কথায় কথায় উৎসাহিত হয়ে এক পর্যায়ে তারা বলে ফেললেন এরা যখন এতই চটেছে, তখন আমাদের পক্ষে আরও একটু এগিয়ে সহবাস করা উচিত! এদের এ মন্তব্য ছিল কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশ এর খেলাফ! সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই মহানবী সা.বিরক্ত হলেন! তাঁর চেহারা রক্তবর্ণ হয়ে গেল! সাহাবীদের অবস্থা দেখে ভয়ে ভয়ে সরে পড়লেন! মহানবী সা.পরে ভয় ভাঙ্গানোর জন্য তাদের বাড়িতে কিছু খাদ্যদ্রব্য পাঠিয়ে দিলেন! কারো কোনো আচরণ অপছন্দ হলেও মুখের উপর তাকে লজ্জা দিতেন না! অন্যের দ্বারা সাবধান করে দিতেন! একবার এক ব্যক্তি আরবের প্রাচীন রীতি অনুযায়ী জাফরান মেখে দরবারে হাজির হলেন! মহানবী সা.এর তা অপছন্দ হলেও তার সামনে কিছুই বললেন না! বরং লোকটি চলে যাওয়ার পর অন্য একজনকে ডেকে বললেন তাকে এ রঙ ধুয়ে ফেলতে বল!
এক ব্যক্তি সাক্ষাৎপ্রার্থী হল! মন্তব্য করলেন, লোকটি ভালো নয়, আচ্ছা আসতে দাও! লোকটি যখন এলো তখন তার সঙ্গে অত্যন্ত চমৎকার ব্যবহার করলেন! বিশেষ সহৃদয়তার সঙ্গে কথাবার্তা বললেন! ধৈর্যের সঙ্গে তার কথাবার্তা শুনে সন্তুষ্ট করে বিদায় দিলেন! লোকটি চলে যাওয়ার পর হযরত আয়েশা রা.বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি তো বলেছিলেন লোকটি ভালো নয়,এর পরও তার সঙ্গে এমন ভালো ব্যবহার করলেন কেন? মহানবী সা.জবাব দিলেন আল্লাহ তাআলার কাছে সর্বাপেক্ষা ঘৃণ্য সে ব্যক্তি, যার দুর্ব্যবহারের লোকজন তার সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়! ইহুদিরা পাষণ্ড এবং ইসলামের বড় দুশমন ছিল! এতদ্বসত্ত্বেও মহানবী সা.এসমস্ত পাষণ্ডের সঙ্গে সব সময়ই সদ্ব্যবহার করতেন! সামাজিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলতেন! কখনো এদের আচরণে ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করলে শুধু এতোটুকুই বলতেন, এদের কপালে ছাই পড়ুক!
অনেক সময় মজলিসে স্থান সংকুলান হতো না! প্রথমে যাঁরা আসতেন তাঁদের দ্বারা স্থান পূর্ণ হয়ে যেত! পরে যাঁরা আসতেন তাঁদের বসার জন্য কোন কোন দিন পার্ক বদনের চাদর খুলে পর্যন্ত বিছিয়ে দিতেন! এক সাহাবী বর্ণনা করেন একবার ঝিইররানা নামক স্থানে মহানবী সা.সঙ্গীগনের মাধ্যমে মাংস বন্টন করছিলেন! এমন সময় এক স্ত্রীলোক এসে হাজির হলেন! তাঁকে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই মহানবী সা.অত্যন্ত সম্মান করলেন! গায়ের চাদর খুলে তাঁর সামনে বিছিয়ে দিলেন! সাহাবী বললেন,আমি জিজ্ঞেস করলাম এ মহিলারটি কে? লোকেরা পরিচয় দিয়ে বললেন যে, ইনি মহানবী সা.র দুধমাতা হযরত হালিমা! অনুরূপ আরেকদিন দুধ পিতা এলে তাঁকে চাদরের একাংশ বিছিয়ে বসতে দিলেন! কিছুক্ষণ পর দুধমাতা এলে তাঁর জন্য অন্য অংশটিও বিছিয়ে দিলেন! এরপরই দুধভাই এলে মহানবী সা.উঠে দাঁড়ালেন এবং তাঁকে সামনে এনে বসালেন! সব সময় অন্য কে আগে সালাম দিতেন! রাস্তায় চলার সময় নারী-পুরুষ এমনকি শিশুদেরও সালাম দিতেন! একদিন রাস্তায় চলার সময় দেখতে পেলেন এক জায়গায় কিছু লোক বসে আছে! তাদের মধ্যে মুশরিক, কাফের সকল শ্রেণীর লোক ছিল! কাছে পৌঁছে মহানবী সা.সকলকেই সালাম দিলেন! কারো কোন আচরণ অপছন্দ হলে মজলিসে তার নাম নিয়ে তার উল্লেখ করতেন না! বরং সাধারণভাবে বলে দিতেন যে, লোকেরা এমন কাজ করে, কিছু কিছু লোকের এমন অভ্যাস আছে! কারো নামে এজন্য নিতেন না যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যেন লজ্জিত না হয়, তার আত্মসম্মানে যেন কোনরূপ আঘাত না আসে!
মহানবী সা.সর্বাবস্থাতেই লেনদেনের ব্যাপারে অত্যন্ত সাবধান থাকবেন! সর্বতোভাবে সততা বজায় রাখতেন! মদিনার ইহুদীরাই ছিল সম্পদশালী!অনেক সময় এদের কাছ থেকে মহানবী সাঃ ঋণ গ্রহণ করতেন! ইহুদি মহাজনরা সাধারণত নিত্যান্ত হীন প্রকৃতির এবং রুক্ষ স্বভাবের হয়ে থাকে! মহানবী সা.এদের সকল প্রকার নীচ ব্যবহার এবং রুক্ষতা অম্লানবদনে বরদাস্ত করতেন! কোন সময়ই শক্ত কথা বলতেন না! নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে ও যে সমস্ত লোকের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল তারা সবাই তার সততা এবং পরিচ্ছন্ন লেনদেনের তারীফ করতেন! এমনকি কোরায়েশরা এক বাক্যে তাকে আমিন (বিশ্বাসী) বলে সম্মোধন করত! নবুয়ত প্রাপ্তির পর কোরায়েশরা যদিও বিদ্বেষ বিষে জর্জরিত হয়ে গিয়েছিল, তথাপি ধন-সম্পদ আমানত রাখার জন্য সর্বাপেক্ষা নিরাপদ স্থান মহানবী সা.এর ঘর কে তারা মনে করত! আরবে সায়েব নামে এক ধনী ব্যবসায়ী ছিলেন! মুসলমান হওয়ার পর সাহাবীরা তাকে খেদমতে হাজির করলেন! এবং অনেক প্রশংসা বাণী উচ্চারণ করে তার পরিচয় করাতে লাগলেন! মহানবী সা.এরশাদ করেন, আরে একে আমি তোমাদের সবার চাইতে ভালো জানি!সায়েব তখন করজোড়ে নিবেদন করলেন ইয়া রাসূলুল্লাহ সা. আপনি একসময় আমার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন! আমার পিতামাতা কোরবান হন! আপনার সততা ও আচার-ব্যবহার ছিল তুলনা বিহীন! মহানবী সা.এর কাছে এক বেদুইনের কিছু পাওনা ছিল!সে এসে তার স্বভাবসিদ্ধ মেজাজে শক্ত শক্ত কথা বলতে শুরু করল! সাহাবীগণ লোকটিকে ধমক দিয়ে বললেন জানো তুমি কার সঙ্গে কথা বলছো?বেদুইন জবাব দিল, আমার তা জানার দরকার কি? আমি তো আমার হক পাওনা আদায় করতে এসেছি! মহানবী সা.তখন সাহাবীদের বললেন, সে পাওনাদার শক্ত কথা বলার তার অধিকার আছে! তোমাদের উচিত ছিল তার পক্ষ সমর্থন করা! এরপর নির্দেশ দিলেন তোমাদের মধ্য থেকে কেউ এর পাওনা পরিশোধ করে তাকে সন্তুষ্ট করে দিও! নিয়ম ছিল কোন জানাজা উপস্থিত হলে মহানবী সা.জিজ্ঞেস করতেন,এ মৃতের উপর কোন ঋণের বোঝা নেই তো? যদি জানা যেত যে মৃত ব্যক্তি ঋণগ্রস্থ, তবে সাহাবীদের মধ্যে কাউকে ডেকে বলে দিতেন, যেন জানাজা পড়িয়ে দেওয়া হয়! নিজে তার জানাজা পড়াতেন না, শরিকও হতেন না! একবার এক বেদুইনকে উটের মাংস বিক্রি করতে দেখে এক ওয়াসকে শুকনো খেজুরের বদলায় কিছু মাংস নিয়ে এলেন! ধারণা ছিল ঘরে খেজুর রয়েছে!কিন্তু বাড়ি ফিরে দেখলেন খেজুর ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে! বাইরে এসে বেদুইন কসাইকে বিষয়টি বুঝিয়ে বললেন! কিন্তু বেদুইন না বুঝে হৈচৈ শুরু করে দিল! সে বলতে লাগল হায় হায় এত প্রবঞ্চনা! সাহাবীগণ বেদুইনকে এহেন দৃষ্টতা থেকে নিবৃত্ত করতে এগিয়ে এলেন! বললেন, রাসূলুল্লাহ সা.কখনও কারো সঙ্গে প্রবঞ্চনা করেন না! মহানবী সা.সাহাবীগণকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ওকে বলতে দাও, এমনটি বলার তার অধিকার রয়েছে! বেদুইন বারবার এ কথা বলে গেল এবং মহানবী সা.একই কথা বলে সাহাবীদের নিবৃত্ত করতে লাগলেন! শেষ পর্যন্ত বেদুইনকে একজন আনসারীর কাছ থেকে মূল্য বাবদ খেজুর নিয়ে যেতে পাঠিয়ে দিলেন! আনসারীর কাছ থেকে খেজুর পাওয়ার পর বেদুইন তার ভুল বুঝতে পেরে কিছুটা লজ্জিত হল! তদুপরি মহানবী সা.তার দুর্ব্যবহারের ধৈর্যের পরিচয় দিলেন, তাতে সে প্রভাবান্বিত হয়ে পড়ল! দাম নিয়ে ফেরার পথে সে দেখতে পেল মহানবী সা.সাহাবী পরিবেষ্টিত হয়ে বসে আছেন! সে এগিয়ে গিয়ে বলে উঠল মোহাম্মদ সা.আপনি মূল্য পরিশোধ করেছেন, বরং ভালো দিয়েছেন! একবার মদীনার উপকণ্ঠে একটি ছোট কাফেলা এসে তাঁবু ফেলল! তাদের সঙ্গে একটি লোহিত বর্ণের চমৎকার উট ছিল! এ পথে যাওয়ার সময় মহানবী সা.উটটি দেখে এর মূল্য জিজ্ঞেস করলেন! উটের মালিক যে দাম চাইল কোন দরাদরি না করে সে দামেই সম্মত হয়ে গেলেন এবং উটের লাগাম ধরে শহরের দিকে রওয়ানা হলেন! কিছুক্ষণ পর কাফেলার লোকদের খেয়াল হল অপরিচিত একটি লোককে মূল্য না নিয়ে এভাবে উট দিয়ে দেওয়া ভুল হয়েছে! বিষয়টি আলোচনা করে কাফেলার সবাই উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করলো কাফেলায় একজন স্ত্রীলোক ও ছিল! সে বলতে লাগল তোমরা ভেবোনা! আমি আমার জীবনে এমন জ্যোতির্ময় চেহারার কোনো লোক আর দেখিনি! এমন লোক কখনো ধোকাবাজ হতে পারে না! দেখতে দেখতে রাত ঘনিয়ে এলো! এমন সময় দেখা গেল মহানবী সা.কাফেলার সবার জন্য খাবার এবং মূল্য বাবদ খেজুর পাঠিয়ে দিয়েছেন!
খয়বার দুর্গ বিজয়ের পর সন্ধির শর্ত অনুযায়ী সেখানকার সমস্ত সম্পত্তি মুজাহিদদের মধ্যে বন্টন করে দেওয়া হয়! মুজাহিদগণ এ সমস্ত সম্পত্তি ইহুদি কৃষকদের সঙ্গে ভাগ চাষের বন্দোবস্ত করেন! সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সাহল তার চাচাতো ভাই মাহিসা সহ ফসলের ভাগের জন্য খায় পরে গেলে এক অসতর্ক মুহূর্তে কে বা কারা তাকে হত্যা করে একটি গর্তে ফেলে দেয়! মাহিসা ভাইয়ের হত্যার সংবাদসহ ফরিয়াদ নিয়ে দরবারে হাজির হলেন!মহানবী সা.মাইসাকে জিজ্ঞেস করলেন আব্দুল্লাহকে ইহুদীরাই হত্যা করেছে এমর্মে তুমি কসম করতে পারো? মাহিসা বললেন, আমি স্বচক্ষে দেখিনি! বললেন তবে ইহুদিদের দেখে কসম দেয়া হোক? মাহিসা জবাব দিলেন হুজুর এরা তো একশবার মিথ্যা কসম খেতে পারে! খয়বার ইহুদী ছাড়া অন্য কোন জাতি বাস করত না! সুতরাং ইহুদীরাই যে আব্দুল্লাহকে হত্যা করেছে তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ ছিল না! কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী কোন সাক্ষী না থাকায় মহানবী সা.ইহুদীদের উপর হত্যার দায়িত্ব না চাপিয়ে বরং আব্দুল্লাহ ইবনে সোহেলের পরিবারকে হত্যার ক্ষতিপূরণ স্বরূপ বায়তুলমাল থেকে একশটি উট দিয়ে দিলেন! সুরাকা নামক জনৈক সাহাবী এক বেদুঈনের কাছ থেকে উট ক্রয় করে তার মূল্য পরিশোধ করলেন না! বেদুইন তাকে ধরে মহানবী সা.এর দরবারে হাজির করল! ঘটনা শুনে মহানবী সা.এর মূল্য পরিশোধ করে দিতে বললেন! সাহাবী নিবেদন করলেন মূল্য পরিশোধ করার মত সামর্থ্য আমার নেই! মহানবী সা.তখন সে অপরিচিত বেদুঈনকে নির্দেশ দিলেন তোমার বিবাদীকে বাজারে নিয়ে বিক্রি করে তোমার পাওনা উসুল করে নাও! বেদুইন তাকে নিয়ে বাজারে গেল এবং সত্যসত্যই বিক্রি করে তার পাওনা আদায় করে নিল! অবশ্য সুরাকাকে একজন মহৎপ্রাণ মুসলমান খরিদ করে আজাদ করে দিলেন! সাহাবী আবু হাদরাদ সলমীর কাছে জনৈক ইহুদির কিছু পাওনা ছিল! ইহুদি তাকে ধরে মহানবী সা.এর দরবারে উপস্থিত করল! রায় হলো এই মুহূর্তে ইহুদির ঋণ পরিশোধ করে দিতে হবে! সাহাবী তার অপরাগতার কথা নিবেদন করলেন! কিন্তু বারবার তাকে একই নির্দেশ দেওয়া হলো! এ সময় খয়বার অভিযান এর আয়োজন চলছিল! সাহাবী আরজ করলেন হয়তো আসন্ন খয়বার অভিযান থেকে ফিরে এসেই এর কর্জ পরিশোধ করার মত সঙ্গতি হবে! মহানবী সা.আবু হাদরাদদের কোন ওজর আপত্তিতেই কর্ণপাত করলেন না! তার পরিধানের কাপড় খুলে ইহুদিকে দিয়ে দিলেন! এভাবে ঋণ পরিশোধ হওয়ার পর আবু হাদরাদ সলমী মাথায় পাগড়ি পড়ে বাড়ি ফিরলেন! ন্যায় বিচারের নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করার ফলে মুসলমানদের সঙ্গে সঙ্গে চিরশত্রু ইহুদিরা ও তাদের সকল মামলা-মোকদ্দমা নিষ্পত্তি করার জন্য মহানবী সা.এর দরবারে হাজির হতো! ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থের বিধান অনুযায়ী তাদের মামলা মোকদ্দমার বিচার করা হতো! কোরআন শরীফে ইহুদীদের বিচার নিষ্পত্তি সম্পর্কে উল্লেখ দেখা যায়! ইসলাম পূর্ব যুগে মদিনায় প্রখ্যাত দুটি ইহুদি গোত্র বনি নজির ও বনূ কোরাইজার মধ্যে মান-মর্যাদার এক অদ্ভুত সীমারেখা বিদ্যমান ছিল! বনু কুরাইযার কোন ব্যক্তি যদি বনি নজীরের কাউকে হত্যা করত তবে বিচারে তার প্রাণদণ্ড হতো! কিন্তু বনি নজীরের কেউ যদি বনু কুরাইযার কোন লোককে হত্যা করত তবে একশ উটের বোঝা পরিমাণ খেজুর নিহত ব্যক্তি ওয়ারিশানকে দন্ড বাবদ প্রদান করতে হতো! মদিনায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর এ ধরনের একটি হত্যাকান্ডের বিচার পেশ করা হলে মহানবী সা.তাওরাতের নির্দেশ মোতাবেক ‘জানের বদলে জান’ অর্থাৎ দু’গোত্রের মধ্যেই হত্যার সমান দন্ড প্রযোজ্য বলে ঘোষণা করে দিলেন! শেষ রোগশয্যায় শায়িত অবস্থায় মহানবী সা. সাহাবীদের একত্রিত করে ঘোষণা করেছিলেন, যদি আমার কাছে কারো পাওনা থাকে অথবা আমার দ্বারা যদি কখনো কারো জান,মাল, মান-সম্মান এ কোন আঘাত এসে থাকে তবে এ সময় তোমরা তার বদলা নিয়ে নাও! বিরাট জনতার মধ্যে শুধু এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে নিবেদন করলেন, তার কয়েকটি দেরহাম পাওনা আছে! সঙ্গে সঙ্গেই তা পরিশোধ করে দেওয়া হল! কিন্তু এছাড়া আর কেউ কোনো রূপ দাবি উত্থাপন করতে এলো না!
দানশীলতা ছিল মহানবী সা.এর প্রকৃতিগত অভ্যাস! হযরত ইবনে আব্বাস এর বর্ণনা রসূলুল্লাহ সা.ছিলেন সর্বাপেক্ষা অধিক দানশীল এবং রমজান মাসে তার দানশীলতা প্রভাত সমীরনের ব্যাপকতাকেও ছাড়িয়ে যেত! না বলে কোন প্রার্থীর প্রসারিত হাত ফিরিয়ে দিয়েছেন সারা জীবনে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি! জবান মোবারকে উচ্চারিত হতো,আমি শুধুমাত্র রক্ষণাবেক্ষণ বন্টন করে থাকি, দেন আল্লাহ! একবার জনৈক বেদুঈন এসে দেখতে পেল রাসূল সা.এর সামনে একটি বৃহৎ ছাগলের পাল রয়েছে! সে তার অভাবের কথা নিবেদন করার সঙ্গে সঙ্গে গোটা ছাগল পালটি তাকে দিয়ে দিলেন! বেদুইন তার গোত্রে ফিরে গিয়ে প্রচার করতে লাগলো, তোমরা সকলে ইসলাম গ্রহণ করো! মুহাম্মদ সা.এমন একজন উদার লোক যে নিজে দরিদ্র হয়ে যাবেন এরূপ ভয় না করেই মুক্তহস্তে দান করতে থাকেন! মহানবী সা.এমন উদার ছিলেন যে কেউ কিছু সওয়াল করলে তাকে কিছু না কিছু অবশ্যই দিতেন! হাতের কাছে কিছু না থাকলে পরে দেওয়ার জন্য অঙ্গীকার করতেন! এর ফলে লোকজন এমন ভয় শূণ্য হয়ে পড়েছিল যে একবার নামাজে দাঁড়ানোর সময় জনৈক বেদুইন এসে চাদর জড়িয়ে ধরল! সে বলতে লাগল আমার আরো একটা প্রয়োজন রয়ে গেছে! পরে হয়তো ভুলে যাব তাই এখনি এসে তা পূরণ করে দিয়ে যান! মহানবী সা.বিনা বাক্যব্যয়ে তার সঙ্গেই চলে গেলেন এবং প্রয়োজন মিটিয়েছে নামাজ পড়লেন! নিতান্ত সাধারণ খাদ্যবস্তুও একা খেতে না উপস্থিত সকল সাহাবীকে নিয়ে তা খেতেন! কোন সামগ্রী হাতে এলে তা সম্পূর্ণরূপে বন্টন না করা পর্যন্ত মহানবী সা.স্বস্তি লাভ করতেন না! ক্রমাগত অস্বস্তি অনুভব করতেন! অনেক সময় এমন হতো যে নগদ কোনো কিছু হাতে এলে তা সম্পূর্ণরূপে খয়রাত না করা পর্যন্ত আরামে শুতেন না! একবার ফেদাকএর গোত্রপতি চারটি উট বোঝাই খাদ্যশস্য উপহারস্বরুপ প্রেরণ করেন! হযরত বেলাল সে শস্য বিক্রি করে জনৈক ইহুদীর পাওনা ঋণ পরিশোধ করে দিলেন! বাজার থেকে ফিরে তিনি এ সংবাদ নিবেদন করলেন! মহানবী সা.জিজ্ঞেস করলেন, ঋণ পরিশোধ করার পর কি কিছু অবশিষ্ট নেই? বেলাল রা.জবাব দিলেন অল্প কিছু বেঁচে গেছে! নির্দেশ দিলেন খয়রাত করে দাও! যতক্ষণ কিছু অবশিষ্ট থাকবে ততক্ষণ আমি ঘরে গিয়ে আরাম করতে পারব না! বেলাল রা.নিবেদন করলেন কোন সায়ের পাওয়া যাচ্ছে না! সুতরাং সে রাত্রে রাসূল সা.মসজিদেই কাটিয়ে দিলেন! পরদিন ভোরে হযরত বেলাল যখন খবর দিলেন যে আল্লাহ আপনাকে দায়মুক্ত করেছেন, তখন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বাড়ির ভেতর তাসরিফ নিয়ে গেলেন! মহানবী সা.সাধারণভাবে ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে, কোন মুসলমান যদি ঋণগ্রস্ত অবস্থায় মারা যায় তবে আমাকে খবর দিও, আমি নিজের তরফ থেকে তার সমস্ত ঋণ পরিশোধ করে দেবো! সে যা কিছু রেখে যায়, সেসব কিছুই তার ওয়ারিশানের প্রাপ্য হবে, এসবের সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক থাকবে না! একদা হুযুর সা.সাহাবীগণ সহ বসে আছেন এমন সময় জনৈক বেদুইন এসে চাদর টেনে ধরল এবং স্বভাবসিদ্ধ ক্রুদ্ধ ভাষায় বলতে লাগলো মোহাম্মদ সা.মাল যা কিছু আছে তা আপনার নয়, আপনার পিতৃ-পুরুষেরও নয়! সুতরাং আমাকে এর মধ্য থেকে একটি উট বোঝাই করে দিন! মহানবী সা.তৎক্ষণাৎ খাদ্যশস্য দিয়ে তার একটি উট বোঝাই করে বিদায় করলেন! একবার আনসারদের কিছু লোক এসে সাহায্য চাইলেন! মহানবী সা.তাদের কিছু দিলেন!তারা তারপরও কিছু চাইলেন এবং মহানবী সা. দিয়ে যেতে থাকলেন! শেষবার বললেন, মনে রেখো আমার কাছে যা কিছু আছে,তা তোমাদের চোখের আড়ালে আমি জমা করি না!
মহানবী সা.এর চরিত্রে যে গুণটি সর্বাপেক্ষা অধিক মাত্রায় স্পষ্ঠ হয়ে উঠত তা ছিল অপূর্ব ত্যাগ-তিতিক্ষা! সন্তানদের প্রতি তাঁর মমতা ছিল সীমাহীন! তন্মধ্যে হযরত ফাতেমার স্থান ছিল সর্বোচ্চ! তিনি কখনো খেদমতে হাজির হলে মহানবী সা.এর চেহারা মোবারক আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠতো! আনন্দের আতিশয্যে উঠে দাঁড়াতেন, তাঁর ললাটে চুম্বন করতেন এবং পাশে বসাতেন! অথচ হযরত ফাতেমা রা.এমন কঠিন দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন যাপন করতেন যে, তাঁর ঘরে কোন চাকরানী ছিল না! তিনি নিজেই আটার চাক্কি পিষতেন, মশক ভরে পানি তুলে আনতেন! চাক্কি পিষতে পিষতে দুই হাতে কড়া পড়ে গিয়েছিল! মশক তুলতে তুলতে বুকে নীল দাগ পড়ে গিয়েছিল! একদিন পিতার খেদমত এসে একটি কাজের লোক প্রার্থনা করতে মনস্থ করলেন! কিন্তু লজ্জা সংকোচ কাটিয়ে কথাটি তিনি পেশ করতে পারলেন না! হযরত আলী রা.একথাটি তুললেন! মাত্র কয়েকদিন আগেই এক যুদ্ধলব্ধ সম্পদের সঙ্গে কয়েকটি দাসীও এসেছিল! তার মধ্য থেকে একটি দাসীর জন্য আবেদন করলেন! মহানবী সা.জবাব দিলেন দেখো এখনো আসহাবে সুফফার ছিন্নমূল লোকদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হয়নি! যে পর্যন্ত এদের কোন সুব্যবস্থা করা না যাবে, সে পর্যন্ত তোমাদের জন্য আমি কিছুই করতে পারবো না! কত কষ্টই না মহানবী সা.এর জীবন যাত্রা চলত! তৃতীয় হিজরীর পর থেকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ প্রাপ্তি শুরু হওয়ার পর প্রচুর সম্পদ হাতে আসতো! কিন্তু এত কিছুর পরও নিজের প্রয়োজনের কথা মোটেও স্মরণ না করে অপরের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলে জীবনযাত্রায় কোনো পরিবর্তন আসেনি! আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ ছিল ফলবান বাগবাগিচা! তৃতীয় হিজরীতে মুখাইরাক নামক বনি নজির গোত্রীয় এক ইহুদী মৃত্যুর সময় অত্যন্ত উৎকৃষ্ট সাতটি বাগান মহানবী সা.এর জন্য ওয়াকফ করে যান! বাগান কয়টির নাম ছিল মুসাইয়্যাব,সানেকা,দাল্লাল,জেসাইনি,বারকা,আওয়াফ মাশরাবায়ে, ও উম্মে ইব্রাহিম! কিন্তু এ কষ্টের জীবনেও মহানবী সা.বাগানগুলোর একটিও নিজের জন্য না রেখে ছিন্নমূল দরিদ্রদের কল্যাণে ওয়াকফ করে দেন! শেষ পর্যন্ত বাগানগুলোর আয় গরিব-মিসকিনদের মধ্যেই বন্টিত হতো! জনৈক সাহাবী ওলিমার খানার জন্য কিছু সাহায্য চাইতে এলেন! মহানবী সাল্লাল্লাহু সাল্লাম তাকে বলে দিলেন আয়েশার ঘরে এক টুকরি আটা আছে তাই চেয়ে নাও! সাহাবী কথামতো আটা নিয়ে চলে গেলেন! কিন্তু খোদ মহানবী সা.এর ঘরে এ আটাটুকু ছাড়া খাবার আর কিছুই ছিলনা!
আরবের প্রতিটি এলাকা থেকে দলে দলে লোক এসে মহানবী সা.এর খেদমতে সমবেত হত! বিশিষ্ট লোকেরা এসে মসজিদে নববীতে অবস্থান করতেন! এসমস্ত মেহমানকে মহানবী সা.নিজে আপ্যায়ন করতেন! এমনকি তাদের সেবা-যত্ন নিজে হাতেই করতেন! এমনিতেও যারাই খেদমতে হাজির হতেন তাদের সবাইকে কিছু না কিছু না খাইয়ে ছাড়তেন না! আতিথিয়তার ক্ষেত্রে কাফের, মুশরিক বা মুসলমানের কোন পার্থক্য করা হতো না! অনেক অমুসলমান এসেও নিঃসংকোচে মেহমান হতো! মহানবী সা.সবাইকে সমভাবে গ্রহণ করতেন এবং আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করতেন! একবার এক কাফের এসে মেহমান হলো! মহানবী সা.একটি ছাগল দোহন করে তাকে খেতে দিলেন! সে এক চুমুকেই সবটুকু দুধ খেয়ে ফেলল! তারপর আরেকটি ছাগল দোহন করে আনা হলো এবং একইভাবে পর্যায়ক্রমে সাতটি ছাগলের দুধ খাওয়ানোর পরও সে তৃপ্ত হলো না! কিন্তু মহানবী সা.অম্লানবদনে তাকে দুধ পান করাতে থাকলেন! কোন কোন দিন মেহমানদারি করতে গিয়ে ঘরের সমস্ত খাবার শেষ হয়ে যেত এবং মহানবী সা.রাতে উঠে মেহমানদের খোঁজ-খবর নিতেন! সাহাবীদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অভাবগ্রস্ত এবং অসহায় ছিলেন আসহাবে সুফফার দল! এরা সবাই মুসলমানদের সাধারণ মেহমান ছিলেন! তবে অধিকাংশ সময়ই মহানবী সা.এর মেহমান হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করতেন! আসহাবে সুফফার অন্যতম বিশিষ্ট সদস্য হযরত আবু হুরাইরা রা.তাঁর সে কৃচ্ছতার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বর্ণনা করেন, একদিন ক্ষুধার তাড়নায় অস্থির হয়ে রাস্তার একপাশে বসে পড়লাম! এক সময় হযরত আবু বকরকে যেতে দেখি আমার অবস্থার কথা পরোক্ষভাবে বুঝাবার জন্য আমি তার নিকট কোরআন শরীফের একটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম! কিন্তু তিনি আমার অবস্থা বুঝতে পারলেন না, সোজা চলে গেলেন! তারপর হযরত ওমর কে দেখলাম, তাঁর সঙ্গেও ঠিক একই ব্যাপার হল! এরপর মহানবী সা.কে আসতে দেখলাম! তিনি আমাকে দেখে মুচকি হেসে বললেন আমার সঙ্গে আসো! বাড়ি পৌঁছে দুধভর্তি একটি পাত্র দেখতে পেলেন! জিজ্ঞেস করে জানা গেল, কে যেন এ দুধ হাদিয়া স্বরূপ রেখে গেছেন! আমাকে নির্দেশ দিলেন আসহাবে সুফফার সবাইকে ডেকে আন! আমরা সবাই সমবেত হলে দুধের পাত্রটি আমার হাতে দিয়ে এরশাদ করলেন, সবার মধ্যে বন্টন করে দাও!
সর্বদা সর্বত্রই মহানবী সা.এর অনুগ্রহ বাড়ি অবিরাম বর্ষিত হতে থাকত বটে, তবে সামান্য বিপদে বা অকারণে হাত পাতা অত্যন্ত ঘৃণা করতেন! এরশাদ করতেন, মানুষের কাছে হাত পেতে খাওয়ার চাইতে কাঠ কুড়িয়ে তার বিক্রয়লব্ধ অর্থ ইজ্জত আব্রু রক্ষা করা কতইনা উত্তম কর্ম! একবার এক আনসারী এসে কিছু সওয়াল করলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে কি কিছু নেই? তিনি বললেন,শুধুমাত্র একটি কম্বল আছে যার এক অংশ বিছিয়ে এবং অন্য অংশ গায়ে দিয়ে রাত কাটাতে হয়! আর পানি খাওয়ার একটি পেয়ালা আছে! মহানবী সা.তার এই দুটি সম্বল আনালেন এবং বলতে লাগলেন কে এগুলো খরিদ করবে? একজন দু দেরহাম দাম করলেন! মহানবী সা.পুনরায় ডেকে বললেন, কেউ কি এর চাইতে বেশি দাম দিতে রাজি আছো? অন্য একজন দ্বিগুন দাম বললে তাকে ডেকে দিলেন এবং দেরহাম কয়টি আনসারীর হাতে দিয়ে বললেন এর দ্বারা কিছু খাদ্য এবং দড়ি খরিদ করো! দড়ি নিয়ে শহরের বাইরে যাও, লাকড়ি সংগ্রহ করে নিয়ে বাজারে বিক্রি করতে থাকো! পনেরো দিন পর সে সাহাবী পুনরায় খেদমতে হাজির হয়ে নিবেদন করলেন খরচ পত্র বাদিও তার হাতে এখন দশ দেরহাম সঞ্চয় হয়েছে! সেগুলোর দ্বারা তিনি কিছু প্রয়োজনীয় স্বচ্ছ এবং কাপড় খরিদ করে আনলেন! মহানবী সা.তাকে সম্বোধন করে এরশাদ করলেন, হাশরের ময়দানে ভিক্ষাবৃত্তি জনিত গ্লানির চিহ্ন মুখে নিয়ে ওঠার চাইতে তোমার এপেশা অনেকগুনে উত্তম নয় কি? একবার কয়েকজন দরিদ্র আনসারী এসে কিছু সওয়াল করলে মহানবী সা.তাদের কিছু দিলেন! তারা বারবার সওয়াল করতে থাকলেন! যতক্ষণ ছিল ততক্ষণ এ সওয়ালকারীদের দিতে থাকলেন! কিন্তু যখন সব শেষ হয়ে গেল তখন বললেন, দেখো আমার হাতে যতক্ষণ কিছু থাকবে আমি কখনো তা তোমাদের না দিয়ে সঞ্চয় করতে চেষ্টা করব না! তবে মনে রেখো যদি কেউ ভিক্ষার ন্যায় লাঞ্ছনাকর কাজ থেকে বেঁচে থাকার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করে, তবে আল্লাহ পাক তাকে তা থেকে বাঁচিয়ে রাখেন! যে ব্যক্তি আত্মনির্ভরশীলতার জন্য দোয়া করতে থাকে, আল্লাহ তাকে আত্মনির্ভরশীল করে দেন এবং যে কষ্টে পড়েও সবর করে আল্লাহ তাকে সাবের বানিয়ে দেন! সবর এর চাইতে উত্তম এবং ব্যাপক কোন সম্পদ আর কিছু হতে পারে না!
মহানবী সা.নিজের বা পরিবারের কারো জন্য সদকার মাল গ্রহণ করা অত্যন্ত গ্লানিকর বলে মনে করতেন! তিনি বলতেন অনেক সময় আমি ঘরে এসে দেখি বিছানায় পাকা খেজুর পড়ে আছে! ইচ্ছা করে তা তুলে নিয়ে মুখে দেই, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই যখন মনে হয় এগুলো সদকার খেজুর নয় তো? তাই সে সমস্ত খেজুর হাতে নিয়েও রেখে দেই! একবার বালক হযরত ইমাম হুসাইন রা.সদকার খেজুর থেকে একটি খেজুর তুলে মুখে দিলে নবী সা.তাকে ভর্ৎসনা করে বললেন তুমি জানো না যে আমাদের খানদানের কারো পক্ষে সদকার কোন কিছু খেতে নেই? অতঃপর সে খেজুরকে উদগীরণ করে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন! কেউ কোন জিনিস নিয়ে হাজির হলে মহানবী সা.তাকে জিজ্ঞাসা করতেন সেটি সদকা না তোহফা? তোহফা হলে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করতেন আর সদকা হলে তা যথার্থ হকদারদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন! বন্ধুবান্ধব এবং ভক্তজনের হাদিয়া- তোহফা মহানবী সা.হৃষ্ট চিত্তে গ্রহণ করতেন! এমনকি পরস্পর উপহার বিনিময়ে হৃদ্যতা বৃদ্ধির জন্য নির্দেশ দিতেন! এরশাদ করতেন পরস্পরের মধ্যে উপহার বিনিময় করতে থাকো, এতে হৃদ্যতা বৃদ্ধি পায়! সাহাবীগণ মহব্বতের নিদর্শন স্বরূপ প্রতিদিনই কিছু না কিছু মহানবী সা.র দরবারে পাঠাতেন! বিশেষত যেদিন হযরত আয়েশার ঘরে অবস্থান করতেন সেদিন সর্বাপেক্ষা বেশি তোহফা-হাদিয়া আসতো! মহানবী সা.যাদের তোহফা-হাদিয়া গ্রহণ করতেন, প্রতিদানে তাদের কাছেও কিছু না কিছু পাঠিয়ে দিতেন! হযরত আয়েশা রা.বর্ণনা করেন মহানবী সা.হাদিয়া কবুল করতেন, তবে অতি অবশ্যই তার প্রতিদান দিতেন! একবার বনী ফুযারা গোত্রের এক ব্যক্তি হাদিয়া স্বরূপ একটি উট দান করলে মহানবী সা.তার প্রতিদান দেওয়ায় সে নিজেকে অপমানিত বোধ করে ক্ষুব্ধ হলো! মহানবী সা.এর পরিপ্রেক্ষিতে মিম্বরে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে তোমরা আমাকে উপহার হিসাবে নানা জিনিস দিয়ে থাকো! আমিও সাধ্যানুযায়ী তার প্রতিদান দিতে চেষ্টা করলে অসন্তুষ্ট হও! তাই আমি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি যে কোরাইশ, আনসার, সাকীফ গোত্র এবং দাওস গোত্র ব্যতীত অন্য কারো কোনো উপহার গ্রহণ করব না! মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম কারও অনুগ্রহভাজন হওয়া মোটেই পছন্দ করতেন না! হযরত আবু বক্কর এর চাইতে বেশি আপনজন আর কে ছিলেন? এতদসত্ত্বেও হিজরতের সময় যখন তিনি একটি দ্রুতগামী উটনী পেশ করলেন তখন মূল্য পরিশোধ না করে তা গ্রহণ করেননি! মদিনায় মসজিদ তৈরি করার জন্য যখন জমির প্রয়োজন হল, তখন জমির মালিকের আতা বিনামূল্যে দান করতে চাইলেও মহানবী সা.মূল্য পরিশোধ না করে তা গ্রহণ করলেন না!
মহানবী সা.অন্যের ব্যাপারে সবসময়ই সহজ পন্থা অবলম্বন করার পক্ষপাতি ছিলেন! বিশিষ্ট সাহাবী হযরত মাআয ইবনে জাবাল কোন এক মহল্লায় ইমামতি করতেন! এক ব্যক্তি এসে অভিযোগ করল যে হযরত মাআয এত লম্বা নামাজ পড়েন যে আমি তার পেছনে নামাজ পড়তে অসমর্থ হয়ে পড়ি! হযরত আবু মাসউদ আনসারী বর্ণনা করেন,অভিযোগ শুনে মহানবী সা. যেমন রাগান্বিত হয়েছিলেন, আমি তাঁকে আর কখনো এমন রাগান্বিত হতে দেখিনি! উপস্থিত সবাইকে লক্ষ্য করে ভাষণ দিলেন, কোন কোন লোক নিজেদের আচরণ দ্বারা অন্যকে বিরক্ত করে ফেলে! তোমাদের যারা নামাজ পড়াও তারা সংক্ষিপ্ত নামাজ পড়াবে! কেননা নামাজিদের মধ্যে বৃদ্ধ, দুর্বল এবং কাজ-কর্মে ব্যস্ত লোকজনও থাকে! কোন অপরাধের দন্ড প্রদান করার সময় নেহায়েত সাবধানতা অবলম্বন করতেন! যেন কোনো নিরপরাধ ব্যক্তির শাস্তি না হয় অথবা অল্প অপরাধে গুরুদন্ড দেওয়া না হয়! বরং চেষ্টা করতেন যেন যথাসম্ভব লঘুদণ্ড অথবা ক্ষমা করে দেওয়ার মত কোন দিক খুঁজে পাওয়া যায় কিনা! এক ব্যক্তি একবার এসে নিবেদন করলেন আমার দ্বারা গোনা হয়ে গেছে দণ্ডবিধান করুন! মহানবী সা.চুপ হয়ে গেলেন! ইতিমধ্যে নামাজের সময় হয়ে গেল! নামাজের পর সে ব্যক্তি পুনরায় দন্ড গ্রহণ করার জন্য আবেদন করল! তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি নামাজ পড়ো নি? আল্লাহ তাআলা তোমার গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন!
মহানবী সা.সন্ন্যাস জীবন বা বৈরাগ্য পছন্দ করতেন না! সাহাবীদের মধ্যে কেউ কেউ সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাস জীবন যাপন করার আগ্রহ প্রকাশ করলে তাদেরকে কঠোরভাবে এ পথ থেকে বিরত রাখেন! কোন কোন দরিদ্র সাহাবী বিয়ে করতে অসমর্থ হয়ে অঙ্গ ছেদনের মাধ্যমের প্রবৃত্তি দমনের উদ্যোগী হলে ও তাদের প্রতি অত্যন্ত অসন্তোষ প্রকাশ করেন! কুদামা ইবনে মাসউদ নামক জনৈক সাহাবী একজন সঙ্গীসহ এসে আরজ করলেন, আমাদের একজন বিবাহ না করার এবং অন্যজন পশুর বাহন বর্জন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি! জবাবে মহানবী সা.এরশাদ করলেন, আমি তো দুইটির স্বাদ গ্রহণ করেছি! মহানবী সা.এর সম্মতি না পেয়ে দুজনেই ইচ্ছা পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্ত করলেন! প্রাচীন আরবের সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে একাদিক্রমে কয়েকদিন পর্যন্ত রোজা রাখার প্রচলন ছিল! সাহাবীদের মধ্যে কেউ কেউ এ ধরনের রোজা রাখার আগ্রহ প্রকাশ করলে মহানবী সা.কঠোরভাবে তাদের নিবৃত্ত করেন! হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.অত্যন্ত সাধক প্রকৃতির লোক ছিলেন! তিনি একাদিক্রমে দিনে রোজা রেখে সারা রাত্রি জেগে এবাদত করতে শুরু করলেন! খবর পেয়ে তাকে ডেকে পাঠালেন এবং জিজ্ঞেস করলেন,এটা কি সত্য? হযরত আব্দুল্লাহ রা.জবাব দিলেন জি হাঁ! তখন মহানবী সা.এরশাদ করেন, দেখো তোমার উপর, তোমার শরীরের, তোমার চোখের এবং তোমার স্ত্রীর হকও রয়েছে! মাসে তিন দিন রোযা রাখাই তোমাদের জন্য যথেষ্ট! হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.আরজ করলেন এর অনেক বেশি করার মত ক্ষমতা আমার রয়েছে! বললেন, তবে প্রতি তৃতীয় দিনে রোজা রাখ! আব্দুল্লাহ বললেন আমার এর চাইতেও বেশি শক্তি আছে! তারপর নির্দেশ দিলেন, তবে মধ্যে এক দিন বিরতি দিয়ে এক দিন রোজা রাখো! হযরত দাউদ আ.এভাবে রোজা রাখতেন! রোজার এ নিয়মই সর্বোত্তম! হযরত আব্দুল্লাহ আরজ করলেন আমার এর চাইতেও বেশি করার ক্ষমতা আছে! বললেন,না এর বেশি করা ভালো নয়! বাহেলা গোত্রের এক ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে চলে গেলেন এবং এক বছর পর সাক্ষাৎ করার উদ্দেশ্যে সে খেদমতে হাজির হলেন! কিন্তু এ এক বছরে তার চেহারা এমন পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল যে মহানবী সা.তাকে চিনতে পারলেন না! আগন্তুক নিজের নাম বলে যখন পরিচয় দিলেন তখন মহানবী সা.কিছুটা আশ্চর্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তো অত্যন্ত সুপুরুষ ছিলে,এক বছরেই এমন পরিবর্তিত হয়ে গেলে কেমন করে? জবাব দিলেন, আমি গত এক বছর রোজা রেখে কাটিয়েছি! বললেন, তোমার জন্য মাসে একদিন রোযা রাখাই যথেষ্ট! আগন্তুক আরজ করলেন, এর বেশি করার সাধ্য আমার আছে! তখন দুদিনের অনুমতি হলো! কিন্তু আগন্তুক যখন আরো বৃদ্ধির আরজ করলেন, তখন তিন দিনের কথা বললেন! কিন্তু এতেও যখন তৃপ্তি হল না! তখন এরশাদ করলেন, বৎসরে সম্মানিত চার মাস রোজা রেখো! একবার সাহাবীদের একদল উম্মুল মোমেনিনদের খেদমতে হাজির হয়ে মহানবী সা.ল্লাল্লাহু সাল্লাম এর নফল ইবাদত সম্পর্কে জানতে চাইলেন! তাদের ধারণা ছিল মহানবী সা.বোধহয় দিনরাত শুধু এবাদত এর মধ্যেই অতিবাহিত করেন! তাই উম্মুল মোমেনিনদের জবাব তাদের ধারণা মাফিক হলো না! তারা পরস্পর বলাবলি করতে লাগলেন রাসূলুল্লাহ সা.এর সঙ্গে কি আমাদের তুলনা হয়! আল্লাহ পাক তো তাঁর সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন! তাদের একজন বললেন, আমি সারারাত জেগে নামাজ পড়তে থাকবো! অন্য একজন বললেন, এখন থেকে আমি সারা জীবন রোজা রেখে কাটাবো! তৃতীয় ব্যক্তি বললেন, আমি কখনো বিয়ে করবো না! মহানবী সা.সকলের কথোপকথনে শুনছিলেন! তিনি বললেন, আল্লাহর কসম আমার অন্তরে আল্লাহর ভয় তোমাদের সবার চাইতে অনেক বেশি, তথাপি আমি রোজা করি,বিরতি ও দিই, বিবাহও করি! যে ব্যক্তি আমার তরিকা মোতাবেক চলবে না, সে আমার জামাতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে না!
মুখের উপর অতিরিক্ত প্রশংসাবাণী আন্তরিক হলেও মহানবী সা.তা অপছন্দ করতেন! একসময় আসওয়াদ ইবনে সুরাই নামক এক কবি খেদমতে হাজির হয়ে নিবেদন করলেন, আমি আল্লাহর প্রশংসা এবং হুজুরের প্রশস্তিমূলক কিছু কবিতা রচনা করেছি, অনুমতি হলে পেশ করতে পারি! জবাব দিলেন, আল্লাহর প্রশংসা যথার্থ! অনুমতিপ্রাপ্ত হয়ে আসওয়াদ কবিতা পাঠ করতে শুরু করলেন! ইতিমধ্যে এক লোক এসে হাজির হলে আসওয়াদকে থামিয়ে দিয়ে তার সঙ্গে কথাবার্তা বললেন! সে লোক চলে গেলে আসওয়াদ পুনরায় কবিতা পাঠ শুরু করলেন! কিছুক্ষণের মধ্যেই সে লোক পুনরায় এসে হাজির হলেন! আবারো আসওয়াদকে থামিয়ে দিয়ে তার সঙ্গে কথাবার্তা বললেন! বেশ কয়েকবারই এমন হলো! আসওয়াদ আরজ করলেন,লোকটি কে যার জন্য আপনি বারবার আমাকে থামিয়ে দিচ্ছেন? জবাব দিলেন, সে এমন লোক যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বাক্যালাপ মোটেও পছন্দ করে না! এখানে প্রশ্ন জাগতে পারে যে মহানবী সা.তো কবি হযরত হাসসানকে মিম্বরে বসিয়ে নিজে তাঁর কবিতা শুনতেন এবং এ বলে দোয়া করতেন যে, আল্লাহ! তাঁকে পবিত্র আত্মা জিব্রাইলের মাধ্যমে সাহায্য করো! অথচ এই সমস্ত কবিতা মহানবী সা.এর প্রশংসায় ই রচিত হত! কারণ ছিল হাসসান যে সমস্ত কবিতা পাঠ করতেন, তা হতো দুর্মুখ কাফের কবিরা মহানবী সা.সম্পর্কে ভিত্তিহীন নিন্দাবাদ করে যে সমস্ত কবিতা লিখত তারই দাঁতভাঙ্গা জবাব! আরবের কবিরা আকর্ষণীয় কবিতার মাধ্যমে যাকে ইচ্ছা অতুলনীয় সম্মানের অধিকারী করতে পারতো, আবার নিন্দাবাদে অমর্যাদার চরমে ও নিয়ে পৌঁছাতে পারতো! ইহুদি কবি কাব ইবনে আশরাফ এবং ইবনুয যাবারা মহানবী সা.সম্পর্কে জঘন্য নিন্দাবাদ মূলক কবিতা লিখে জনসমক্ষে তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করতে সদা সচেষ্ট থাকতো! হযরত হাসসান এর কাব্য প্রতিভা সে দুরাচারদের কাব্যগাথার বিরুদ্ধে সাধারণ্যে মহানবী সা.এর মর্যাদা বৃদ্ধির পক্ষে সহায়ক হতো! সেজন্যে হযরত হাসসান এর এ প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করা হতো!
মহানবী সা.জীবনে কখনো আড়ম্বর পছন্দ করতেন না! সরলতায় ছিল তাঁর জীবনের ভূষণ বিশেষ! অনেক সময় মজলিস থেকে উঠে খালি পায়ে বাড়ির ভিতরে চলে যেতেন! জুতা মসজিদের দরজাতেই পড়ে থাকতো! এর দ্বারা অবশ্য সাহাবীগণ অনুমান করতেন যে খুব শীঘ্রই পুনরায় তিনি মজলিসে ফিরে আসবেন! প্রতিদিন চুল আঁচড়ানো পছন্দ করতেন না! বলতেন একদিন অন্তর একদিন চিরুনি ব্যবহার করাই উত্তম! খাওয়া পরা ওঠাবসা প্রভৃতি কোন কিছুতেই লৌকিকতা পছন্দ করতেন না! খাওয়ার সময় সামনে যাই পরিবেশন করা হতো, বিনা দ্বিধায় তাই আহার করতেন! পরিধানের জন্য সাধাসিধে যেকোনো মোটা কাপড় পাওয়া যেত তাই পরতেন! জমিন, ফরাস বা চাটাই যেখানে সুবিধা হতো বিনা দ্বিধায় বসে পড়তেন! কখনো তাঁর জন্য আটার ভুসি ছাড়িয়ে রুটি তৈরি করা হতো না! জামার বুক অধিকাংশ সময় খোলা থাকতো! পোশাকে আড়ম্বর অত্যন্ত অপছন্দ করতেন! প্রকৃতিগতভাবেই সাজসজ্জার বিরোধী ছিলেন! সর্ব বিষয়ে সহজ সরলতা ছিল মহানবী সা.এর প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ!
ইসলাম সন্ন্যাসের ধর্ম নয়! বৈরাগ্যপূর্ণ জীবন-যাপন ইসলাম অনুমোদন করেনি! বলা হয়েছে, ‘ইসলামে বৈরাগ্য নেই’! এজন্যে মহানবী সা.সর্বপ্রকার বৈধ বস্তুর স্বাদ গ্রহণ অনুমোদন করেছেন! এবং সময় সময় নিজেও ব্যবহার করে নজির স্থাপন করে গেছেন! কিন্তু তাই বলে বিলাসিতা বা আড়ম্বরপূর্ণ জীবনের স্পর্শ কোন অবস্থাতেই নিজেকে স্পর্শ করতে দেননি! জাঁকজমক থেকে শুধু যে নিজেই দূরে থাকতেন তাই নয় অন্য কেউও তা থেকে দূরে থাকতে উদ্বুদ্ধ করতেন! একদিন কোন এক ব্যক্তি হযরত আলীকে দাওয়াত করে বাড়িতে খানা পাঠিয়ে দেন! হযরত ফাতেমা রা.বললেন এমন উত্তম খানায় মহানবী সা.কে শরিক করে নিলে ভালো হতো! কথামতো হযরত-আলী খবর দিলেন! মহানবী সা.এসে দেখলেন সুদৃশ্য পর্দা দ্বারা সমস্ত ঘর সাজানো! সাজগোজ দেখে দরজা থেকেই ফিরে চলে গেলেন! হযরত আলী ব্যস্তসমস্ত হয়ে ফিরে যাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করতে এরশাদ করলেন,‘আড়ম্বরপূর্ণ ঘরে প্রবেশ করা পয়গম্বরের শানের সম্পূর্ণ খেলাফ’! তিনি বলতেন, ঘরে একটি বিছানা নিজের জন্য, একটি স্ত্রীর জন্য এবং আরেকটি মেহমানের জন্য থাকতে পারে! চতুর্থটি থাকলে তা হবে শয়তানের ভোগ! একবার কোনো এক যুদ্ধ অভিযান থেকে ফিরে হযরত আয়েশা রা.ঘরে গিয়ে দেখলেন, কামরার ভেতর শামিয়ানা টাঙানো রয়েছে! মহানবী সা.তৎক্ষণাৎ সেটি এই বলে ছিড়ে ফেললেন যে, ‘ইট-পাথর কে পোশাক পরানোর জন্য আল্লাহপাক আমাদের টাকা পয়সা দেন না’! সিলমোহর করার প্রয়োজনে প্রথমে সোনার আংটি তৈরি করা হয়েছিল! কিন্তু যখন সাহাবীদের মধ্যে কেউ কেউ দেখাদেখি সোনার আংটি তৈরি করিয়ে পরতে শুরু করলেন! তখন একদিন মিম্বরে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, দেখো এখন থেকে আমি আর সোনার আংটি ব্যবহার করব না! এ বলে আংটি খুলে ফেলে দিলেন! মহানবী সা.এর কথা শুনে সাহাবীরাও সঙ্গে সঙ্গে আংটি খুলে ফেললেন! মহানবী সা.নিজে যেমন সহজ-সরল জীবন পছন্দ করতেন, তেমনি পরিবার-পরিজন কেও অনাড়ম্বর সরল জীবনে অভ্যস্ত করার জন্য যত্নবান থাকতেন! ভোগবিলাসের জীবন থেকে দূরে থাকার জন্য সর্বদা তাদের তাগিদ দিতেন! সোনার অলংকার ব্যবহার করা স্ত্রীলোকদের জন্য মোবাহ! কিন্তু নবী সা.তাঁর পরিবারের লোকদের জন্য অলঙ্কারের ব্যবহার অনুচিত মনে করতেন! একবার হযরত ফাতেমা রা.র গলায় সোনার হার দেখে বলেছিলেন, ‘বৎস, লোকে যদি বলে যে পয়গম্বরের কন্যা গলায় আগুনের ফাঁস পরেছেন,তবে তা শুনে তুমি কি অসন্তুষ্ট হবে না? একবার হযরত আয়েশার হাতে সোনার কঙ্কন দেখে মন্তব্য করলেন, এগুলো খুলে যদি হাড়ের কাঁকন জাফরানের রং করে পরতে তবে ভালো হতো! নবম হিজরীতে যখন ইয়ামন থেকে সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল ভুবন ইসলামী হুকুমতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছিল, তখন ইসলামের মহান নবীর ঘরে একটি দড়ির চারপায়া এবং শুকনো চামড়ার একটি মশক ছাড়া আর কোন আসবাব ছিলনা! হযরত আয়েশা রা.বর্ণনা করেন, ইন্তেকালের সময় হুজুর সা.র ঘরে সামান্য কয়েক মুঠো যব ছাড়া খাওয়ার মত আর কিছুই ছিল না! সব সময় সাহাবীদের বলতেন, দুনিয়াতে একজন মানুষের জন্য ততটুকু সম্পদই যথেষ্ট, যতটুকু একজন মুসাফিরের পাথেয় হিসাবে সঙ্গে থাকা দরকার! ‘মশরাবাহ’বা মহানবী সা.র আরাম করার এবং মূল্যবান ব্যক্তিগত জিনিসপত্র রাখার জন্য নির্মিত বিশেষ কামরাটিতে একদিন হযরত ওমর রা.প্রবেশ করে দেখলেন, দড়ির একটি চারপায়ায় একটি অতি সাধারন চাদর বিছানো রয়েছে, শিয়রে খেজুরের ছাল ভর্তি একটি চামড়া শক্ত বালিশ, একপাশে কয়েক মুঠো জব এবং কয়েকটি চামড়ার মশক খুঁটির সঙ্গে বাঁধা এবং পায়ের দিকে একটি পশুর চামড়া লটকানো! শাহানশাহে মদিনার খাসকামরায় এধরনের আসবাবপত্র দেখে হযরত ওমরের চোখে অশ্রুর ধারা নেমে এলো! মহানবী সা. ক্রন্দনের কারণ জিজ্ঞেস করায় তিনি নিবেদন করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ সা.আপনার পবিত্র অঙ্গে চার পায়ার দড়ির প্রত্যেকটি গিরার দাগ পড়ে গেছে! এটি আপনার আসবাবপত্র রাখার কামরা! এর মধ্যে যে সমস্ত জিনিসপত্র আছে তা তো নিজের চোখেই দেখছি! রোম ও পারস্য সম্রাটগন দুনিয়ায় কত বিলাস পূর্ণ জীবনী না যাপন করছে, আর আপনি আল্লাহর মনোনীত সর্বশ্রেষ্ঠ রসূল হওয়া সত্ত্বেও আপনারে এই আসবাবপত্র! ওমর বলেন, আমার এই আক্ষেপ বাণী শুনে মহানবী সা.এরশাদ করেন, ‘খাত্তাবতনয় তুমি কি ভালো মনে করো না যে,তারা দুনিয়া ভোগ করুক আর আমরা আখেরাত’!
মহানবী সা.এর দৃষ্টিতে আমির ফকির ছোট-বড় দাস মালিকের কোন পার্থক্য ছিল না! সুকৃতির ভিত্তিতে যার যে মর্যাদা প্রাপ্য তাকে সে মর্যাদায় প্রদান করতেন! অনুরূপ অপরাধের শাস্তি বিধান করার বেলায়ও কারো প্রভাব-প্রতিপত্তির প্রতি মোটেও ভ্রুক্ষেপ করা হতো না! হযরত সালমান, হযরত শোয়াইব এবং হযরত বেলাল রা.পূর্ববর্তী জীবনে ক্রীতদাস ছিলেন! এক সময় কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের উপর তাঁদের নজর পড়লো! বলাবলি করতে লাগলেন এখনো সত্যের তরবারি আল্লাহ ওরে দুশমনের গর্দান নাগাল পেল না! হযরত আবুবকর একথা শুনে বলে উঠলেন পোড়ায় সর্দার সম্পর্কে তোমরা এত বড় কথা বলছ?মহানবী সা.এর দরবারে উপস্থিত হয়ে তিনি এ ঘটনা বিবৃত করলেন!মহানবী সা.ঘটনা শুনে বলে উঠলেন আবু বকর আপনি এঁদের নারাজ করেন নি তো? এঁরা যদি নারাজ হন তবে আল্লাহতালা ও নারাজ হবেন!একথা শুনে হযরত আবুবকর তৎক্ষণাৎ বেলাল ও সালমানের কাছে ফিরে গেলেন এবং কাতর স্বরে নিবেদন করলেন, ভাইসব আপনারা আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হন নি তো? তাঁরা জবাব দিলেন না আমরা আপনাকে ক্ষমা করে দিলাম! মজলিসে কোনকিছু বন্টন করতে হলে ডান দিক থেকে শুরু করা হতো! এরমধ্যে ধনী-দরিদ্র ছোট-বড় কোন পার্থক্য করা হতো না! সবার ক্ষেত্রেই সমতাপূর্ণ ব্যবহার করা হতো! একবার সাহাবীদের মজলিসে সবার ডানে সর্বকনিষ্ঠ সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস বসেছিলেন! বামদিকে ছিলেন বয়স্ক এবং সম্মানিত সাহাবীগণ! এমন সময় কোন খান থেকে কিছু দুধ এলো! মহানবী সা. সামান্য পান করে ডান দিকে উপবিষ্ট হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসকে লক্ষ্য করে বললেন তুমি যদি অনুমতি দাও তবে প্রথমে বাম দিককার এঁদের থেকে পরিবেশন শুরু করতে পারি! হযরত ইবনে আব্বাস বললেন, এ সম্মান আমি ত্যাগ করতে প্রস্তুত নই ইয়া রাসূলুল্লাহ সা.! অগত্যা পেয়ালা হযরত ইবনে আব্বাসের হাতে দিতে হলো! হযরত আব্বাস রা.বর্ণনা করেন একবার হুজুর সা.আমার বাড়িতে তাসরিফ আনলেন! খাবার পানি চাইলে আমি দুধ এনে পেশ করলাম! মজলিসে বামে হযরত আবু বকর, মধ্যস্থলে হযরত ওমর এবং ডানদিকে জনৈক বেদুইন বসেছিলেন! হুজুর সা.দুধ পান শেষ করলে হযরত ওমর রা. ইশারা করলেন যেন অবশিষ্টটুকু হযরত আবু বকরের হাতে দেওয়া হয়! কিন্তু দুধের পেয়ালা ডানদিকে উপবিষ্ট বেদুইনের হাতে দেওয়া হল! সাহাবীরা যখন সম্মিলিতভাবে কোন কাজ করতেন তখন হুজুর সা.ও তাঁদের সঙ্গে সে কাজে শরীক হতেন এবং সাধারণ শ্রমিক এর মতো গায়ে খেতে পরিশ্রম করতেন! মদিনায় পদার্পণ করে মসজিদ নির্মাণ ছিল সাহাবীদের সর্বপ্রথম সম্মিলিত কাজ! একাজে হুযুর সা.ও সাধারণ মজদুরদের মত ইট পাথর বহন করেন! সাহাবীদের কেউ কেউ আরজ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ সা.আমরা থাকতে আপনি কেন এত কষ্ট করছেন? কিন্তু কোন অনুরোধই তাঁকে কর্তব্যচ্যুত করতে পারল না! আহযাবের যুদ্ধের সময় মদিনার চারিদিকে গভীর পরিখা খনন করে দুশমনের আক্রমণ প্রতিহত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়! পরিখা খনন করার কাজেও হুযুর সা.একজন সাধারণ মজুরের মতই মাটি কাটার কাজে যোগদান করেন! মাটি কাটতে কাটতে পেটে পিঠে পর্যন্ত মাটির আস্তরন লেগে যায়! কোন এক সফরে সাহাবীরা সম্মিলিতভাবে খানা তৈরি করার উদ্যোগ গ্রহণ করলেন! প্রত্যেকেই এক একটি দায়িত্ব বন্টন করে নিলেন! জঙ্গল থেকে জ্বালানি কাঠ কুড়িয়ে আনার দায়িত্ব হুযুর সা. নিজে গ্রহণ করলেন! সাহাবীগণ আরজ করলেন, আমরা সেবকরা এ কাজ করতে পারব! জবাব দিলেন, তা তোমরা পারো ! তবে আমি নিজেকে তোমাদের মধ্যে বিশিষ্ট করে রাখতে চাই না! যে ব্যক্তি সহযাত্রীদের মধ্যে বিশিষ্ট হয়ে থাকতে চায় আল্লাহ তাকে পছন্দ করেন না!
ঘরের সমস্ত কাজকর্ম ছেঁড়া কাপড়ের তালি লাগানো, ঘর ঝাঁট দেওয়া, দুধ দোহন, জুতা সেলাই, বাজার থেকে সওদাপত্র বয়ে আনা প্রভৃতি সবকিছুই মহানবী সা.নিজে হাতে করতেন! গাধার পিঠে আরোহন করে কোথাও যাওয়া বা ক্রীতদাস এবং মিসকিনদের সঙ্গে বসে আহার করাতেও মহানবী সা.বিন্দুমাত্র সংকোচ বোধ করতেন না! একবার ঘর থেকে বের হয়ে এলে সাহাবীরা সম্মানের জন্য উঠে দাঁড়ালে সবাইকে বারণ করে এরশাদ করলেন, অনারবদের মত সম্মান প্রদর্শনের জন্য উঠে দাঁড়াবে না! নিতান্ত কোন দরিদ্র লোকের ও অসুস্থতার সংবাদ পেলে বাড়িতে গিয়ে তাকে দেখে আসতেন! ফকির-মিসকিন এবং দরিদ্র লোকদের কাছে গিয়ে তাদের সঙ্গে বসতেন! সাহাবীদের মজলিসে বসে থাকলে কোন অপরিচিত লোক সহজে তাঁকে চিনতে পারতো না! কোন মাহফিলে গেলে যেখানে জায়গা পেতেন সেখানেই বসে পড়তেন, বিশেষ কোন স্থানের জন্য অপেক্ষা করতেন না! এক ব্যক্তি তাঁকে হে মানব শ্রেষ্ঠ বলে সম্মোধন করলে তিনি বলেছিলেন, এ কথাটি হযরত ইব্রাহীম সম্পর্কে প্রযোজ্য! মদিনায় এক পাগল ধরনের বৃদ্ধা বাস করত! একদিন সে দরবারে এসে বলল মুহাম্মদ সা.আমার একটি কাজ করে দিতে হবে! বললেন, চলো তোমার কাজ করে দেব! বৃদ্ধা চলতে লাগলো, হুজুর সা.তার পেছন পেছন চললেন! বেশ কিছুদূর গিয়েছে একটি গলি মুখে বসে পড়ল! মহানবী সা.ও তার সামনে বসে পড়লেন এবং বিনা দ্বিধায় তার কাজ করে দিয়ে এলেন! কোন ব্যক্তির পক্ষে তখনি অহংকারী হয়ে ওঠার অত্যন্ত স্বাভাবিক যখন তার একটি অঙ্গুলির ইশারায় অগনিত বীরযোদ্ধা জীবনের পরোয়া না করে নির্দেশের অপেক্ষায় উন্মুখ হয়ে থাকে! বিশেষত এমন একটি দুর্ধর্ষ বাহিনীর নেতৃত্ব দান করে কোন বিজয়ী যখন সদ্য পদানত কোন জনপদে প্রবেশ করেন, তখন তার পক্ষে বীরের আত্মশ্লাঘা প্রকাশ নিতান্তই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়! কিন্তু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.যখন বিজয়ী বীরের বেশে মক্কা শহরে প্রবেশ করেন, তখন বিনয় তাঁর মস্তক নিচু হয়ে হাওদার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল!
শেরেকীর প্রথম সোপান হচ্ছে নবী-রাসূল এবং পীর আউলিয়াদের প্রতি সীমা বহির্ভূত সম্মান প্রদর্শন! মহানবী সা.এই বিষয়টি সম্পর্কে অত্যধিক সাবধানতা অবলম্বন করতেন! হযরত ঈসা আ. এর অনুসারী হিসাবে যারা পরিচয় দিত, তাদের নজির সামনেই ছিল! বলতেন, তোমরা আমার এমন সীমাতিরিক্ত প্রশংসা করো না যেমন খ্রিস্টানরা মরিয়ম তনয় সম্পর্কে করে থাকে! আমি শুধু আল্লাহর একজন বান্দা এবং মনোনীত পয়গম্বর মাত্র! কায়োস ইবনে সাদ বর্ণনা করেন, আমি হীরা শহরে গিয়ে দেখলাম, লোকেরা নগর অধিপতির দরবারে সেজদার মাধ্যমে সম্মান প্রদর্শন করছে! মহানবী সা.র খেদমতে এসে সেখানকার বর্ণনা দিলাম এবং নিবেদন করলাম আমরাও কেন আপনাকে সেজদা করি না? আপনিতো তাদের তুলনায় অনেক বেশি মর্যাদার অধিকারী! জবাব দিলেন, তোমরা কি আমার কবরের পাশে গিয়ে সেজদা করবে? আমি বললাম না! বললেন, তবে জীবিত অবস্থায় সেজদা করা উচিত নয়! মহানবী সা. কুমারী মেয়েদের চাইতে অধিক লজ্জাশীল ছিলেন! প্রতিটি অভিব্যক্তিতে লজ্জাশীলতার প্রভাব ধরা পড়তো! তিনি জীবনে কখনো মুখ খারাপ কথা উচ্চারণ করেননি! বাজারে গিয়ে চুপচাপ এক পাশ দিয়ে চলে যেতেন! মৃদু হাস্য ছাড়া কোন সময় মুখে অট্টহাস্য শোনা যায়নি! মজলিসে উপবিষ্ট অবস্থায় কোন কথা পছন্দ হলেও মুখে কিছু বলতেন না, চেহারার অভিব্যক্তি দেখে সাহাবীরা সাবধান হয়ে যেতেন! অন্যান্য দেশের মতো তৎকালীন আরব সমাজে লজ্জা শরমের বালাই খুব কমই ছিল! উলঙ্গ হয়ে গোসল করা ছিল অতি সাধারন ব্যাপার! উলঙ্গ হয়ে কাবা তওয়াফ করা ছিল সাধারণ রেওয়াজ! মহানবী সা.এসমস্ত নির্লজ্জতা প্রকৃতিগতভাবেই অত্যন্ত ঘৃণা করতেন! এক সময় এরশাদ করেছিলেন, তোমরা হাম্মামে গোসল করতে যেও না! সাহাবীরা আরজ করলেন, হাম্মামে গোসল করলে শরীর পরিষ্কার হয়, রোগ থেকে মুক্ত থাকা যায়! বললেন, হাম্মামে গোসল করলেও পর্দার প্রতি খেয়াল রেখো! আবু দাউদে বর্ণিত আছে, মহানবী সা.প্রথম প্রথম হাম্মামে গোসল করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন! পরে পুরুষদের কাপড় পড়ে প্রবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয়, কিন্তু স্ত্রী লোকদের জন্য সর্বাবস্থাতেই তা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়! আরবে শৌচাগারের কোন রেওয়াজ ছিল না! লোকেরা মাঠে-ময়দানে মলমূত্র ত্যাগ করতে অভ্যস্ত ছিল! কিন্তু এর মধ্য আড়াল করার কোনো প্রয়োজনীয়তা অনুভব করত না! বরং মুখোমুখি বসে মলমূত্র ত্যাগ করতে করতেও কথাবার্তা বলতে থাকতো! মহানবী সা.এ ধরনের নির্লজ্জতা প্রদর্শন করতে নিষেধ করতেন এবং বলতেন আল্লাহ তাআলা এই ধরনের লজ্জাহীনতা এ নারাজ হন! মহানবী সা.প্রস্রাব-পায়খানার জন্য এতদূর চলে যেতেন যে, লোক চক্ষুতে সম্পূর্ণরূপে আড়াল হয়ে পড়তেন! মক্কায় অবস্থানকালে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার প্রয়োজনে হারাম শরীফের সীমা ছেড়ে সম্পূর্ণ বাইরে চলে যেতেন, যা কাবা শরীফ থেকে অন্তত তিন মাইল দূর পর্যন্ত বিস্তৃত!
সাহাবীদের সবাই সর্বক্ষণ সেবার জন্য উন্মুখ হয়ে অপেক্ষারত থাকা সত্ত্বেও মহানবী সা. সর্বাবস্থাতেই নিজের কাজকর্ম নিজে হাতে করাই পছন্দ করতেন! হযরত আয়েশা, হযরত আবু সাঈদ খুদরী এবং হযরত হাসান রা.থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি সব সময় নিজের কাজকর্ম নিজেই করতেন! এক ব্যক্তি হযরত আয়েশাকে জিজ্ঞেস করলেন মহানবী সা.ঘরে অবস্থানকালে কিভাবে সময় অতিবাহিত করতেন? জবাব দিলেন, গৃহস্থালি কাজ কর্মে লিপ্ত থাকতেন! নিজে হাতে কাপড়ে তালি লাগাতেন, ঘর ঝাঁট দিতেন, দুধ দোহন করতেন, বাজার থেকে সওদা খরিদ করে আনতেন, জুতো ছিঁড়ে গেলে নিজে হাতে সেলাই করে নিতেন, বালতিতে রশি বাঁধতেন,উট বাঁধতেন, নিজের হাতে ঘাস পানি দিতেন, অন্যান্যদের সঙ্গে মিলে আটা গুলতেন!খাব্বাব ইবনে আরত নামক জনৈক সাহাবী যুদ্ধে চলে গিয়েছিলেন! তাঁর বাড়িতে অন্য কোন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ মানুষ ছিলেন না! মেয়েরা দুধ দোহন করতে জানতেন না! এজন্য মহানবী সা.প্রতিদিন তাঁর বাড়িতে গিয়ে দুধ দোহন করে দিয়ে আসতেন! মদিনার দাসী বাঁদীরা পর্যন্ত এসে বলতো ইয়া রাসূলুল্লাহ সা.আমার অমুক কাজটি করে দিন! তিনি বিনা দ্বিধায় তাদের কাজ করে দিতেন! সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে আবু আওফা বর্ণনা করেন, বিধবা মিসকিনদের সঙ্গে গিয়ে তাদের কাজকর্ম করে দিতে মহানবী সা.কখনও দ্বিধাবোধ করতেন না!
উন্নততর মানবীয় চরিত্রের মূল ভিত্তি হলো বীরত্ব, সংকল্পে দৃঢ়তা, লক্ষ্যে স্থিরতা অকপটে সত্য প্রকাশের প্রেরণা! এসব কিছুই অন্তরের দুর্জয় সাহস থেকে জন্মলাভ করে! মহানবী সা.জীবনের শুরু থেকেই সীমাহীন দুর্যোগের মাঝে এগিয়ে গেছেন, বহু যুদ্ধের বিভীষিকার মোকাবিলা করেছেন, বিপদের পর বিপদের কালো মেঘে চারিদিক অন্ধকার করে দিয়েছে, কিন্তু মুহূর্তের জন্যেও তাঁর হৃদয়ে সামান্যতম ভয়-ভীতি ছায়াপাত করতে পারেনি! সিংহ হৃদয় হযরত-আলী-রাঃ বর্ণনা, বদরের সে ভয়ঙ্কর যুদ্ধে শত্রুবাহিনীর ক্রমবর্ধমান চাপে পর্যদুস্ত হয়ে আমরা মহানবী সা.এর আড়ালে এসে আশ্রয় গ্রহণ করতাম! তিনি ছিলেন সবার চাইতে বড় বীর! সেদিন তাঁর চাইতে শত্রু বুহ্যের বেশি কাছে আর কেউ ছিলনা! হুনাইনের যুদ্ধে মুসলিম সৈন্য বাহিনীর ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পরও মুষ্টিমেয় কয়েকজন সঙ্গীসহ মহানবী সা.ময়দানে দাঁড়িয়ে ছিলেন! তিনি ছিলেন শত্রুর সম্মিলিত আক্রমণের একমাত্র লক্ষ্য! এ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী হযরত বারা নামক জনৈক সাহাবী কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল হুনাইনের যুদ্ধে নাকি আপনারা ময়দান ছেড়ে পালাতে শুরু করেছিলেন? তিনি জবাব দিয়েছিলেন, হ্যাঁ একথা সত্য! তবে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মহানবী সা.তাঁর স্থান থেকে এক পাও পিছনে হটেননি! আল্লাহর কসম আক্রমণের তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে আমরা মহানবী সা.এর পাশেই আশ্রয় নিতাম! আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর গণ তাঁরই পাশে দন্ডায়মান থাকতেন! হযরত আনাস ইবনে মালেক রা.বর্ণনা করেন, মহানবী সা.সবার চাইতে বড় বীর ছিলেন! একবার মদিনায় গুজব ছড়িয়ে পড়লে শত্রুরা শহর আক্রমণ করে বসেছে! লোকেরা অস্ত্রসহ মুকাবিলা করতে বেরিয়ে পড়লেন! সর্বাগ্রে যাঁকে বের হতে দেখা গেল তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সা.! তাড়াহুড়োর মধ্যে ঘোড়ার পিঠে জিন বাঁধার জন্য অপেক্ষা করলেন না, খালি পিঠে লাফিয়ে উঠে তীর বেগে শহর প্রদক্ষিণ করে এসে লোকজনকে বলে সান্ত্বনা দিলেন যে, ভয়ের কোন কারণ নেই! শত্রুর চিহ্ন কোথাও দেখা যায়নি! মহানবী সা.সারা জীবনে নিজে হাতে কাউকে হত্যা করেননি!
ইউরোপীয় খ্রিষ্টান লেখকদের ধারণা মহানবী সা.মক্কায় অবস্থান কাল পর্যন্ত নবী সুলভ জীবন যাপন করতেন! তবে মদীনায় আসার পর তাঁর জীবন একজন নরপতির জীবনে রূপান্তরিত হয়! এদের উপরোক্ত ধারণা যে কত বড় মিথ্যা তা নতুন করে প্রমাণ করার অপেক্ষা রাখে না! সমগ্র আরব একচ্ছত্র শাসনক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও মহানবী সা.কে উপবাস করতে হয়েছে! এমনকি বোখারী শরীফের বর্ণনা অনুযায়ী, ওফাতের সময় ব্যক্তিগত ব্যবহারের একটি বর্ম পর্যন্ত এক ইহুদী ঘরে মাত্র তিন ছা জবের বিনিময় দায়বদ্ধ ছিল! যে কাপড় পরা অবস্থায় তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করেন তার আগাগোড়াই অনেকগুলো তালি লাগানো ছিল! এটা সেসময়কার ঘটনা যখন সিরিয়া সীমান্ত থেকে আদন পর্যন্ত বিজিত হয়ে গিয়েছিল! আর স্বাভাবিকভাবেই সম্পদের স্রোতধারায় চারিদিক থেকে মদীনার দিকে দ্রুত প্রবাহিত হতে শুরু করেছিল! ইসলামে বৈরাগ্যের প্রশ্রয় দেওয়া হয়নি! বরং বৈরাগ্যের নামে ধর্মের যে উদ্ভট মূর্তি পূর্ব থেকে গড়ে তোলা হয়েছিল ইসলামের প্রবর্তন তার উৎখাত সাধন করে ভারসাম্যপূর্ণ স্বাভাবিক মানব জীবন প্রতিষ্ঠার সাধনা করে গেছে! ধর্মের নামে যে বৈরাগ্য মানুষকে অর্থহীন আত্মনির্যাতনে নিক্ষেপ করে কোরআনে তার নিন্দা করেই বলা হয়েছে: ‘বৈরাগ্য যা তারা নিজেরা সৃষ্টি করে নিয়েছে’! বৈরাগ্য উৎখাতের জন্য স্বাভাবিক জীবনের সরল সহজ আদর্শ স্থাপন করার লক্ষ্যেই মহানবী সা.কখনও কখনও উত্তম খাদ্য এবং মূল্যবান পোশাক ব্যবহার করেছেন! কিন্তু ভোগের প্রতি সামান্যতম আকর্ষণ তাঁকে কখনও স্পর্শ করতে পারেনি! জীবনযাত্রার দর্শন বর্ণনা করতে গিয়ে এরশাদ করতেন, মানব সন্তানের জন্য বাস করার মত একটি ঘর, লজ্জা-নিবারণ করার মত পোশাক, ক্ষুধা তৃষ্ণা নিবৃত্তির জন্য শুকনো রুটি ও পানি ছাড়া অন্য কোন সম্পদে কোন অধিকার নেই! হযরত আয়েশা রা.বর্ণনা করেন, কোনদিন তাঁর কোন কাপড় ভাঁজ করা হয়নি! অর্থাৎ এক জোড়ার অতিরিক্ত কোন কাপড়ই কোনদিন রাখতেন না! যা ভাঁজ করে রাখার প্রয়োজন হতে পারে! অনেক সময় ঘরে খাবার থাকত না, উপবাসে কাটাতে হতো! বিশেষত তিনি জীবনের অধিকাংশ রাত্রি না খেয়ে কাটিয়ে গেছেন! তিরমিজী শরীফে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সা.এবং তাঁর পরিবারের লোকজন উপর্যুপরি কয়েক রাত্রিও না খেয়ে শুয়েছেন, কেননা রাতে খাওয়ার মত কোন কিছুই যুক্ত না! কোন কোন সময় একাধারে দু মাস পর্যন্ত ঘরের চুলায় আগুন জ্বলেনি! একবার এই ঘটনা বর্ণনা করার সময় ওরওয়া ইবনে যুবায়ের জিজ্ঞেস করেছিলেন তখন আপনাদের চলত কি করে? জবাব দিয়েছিলেন, শুধু খেজুর এবং পানি খেয়ে আমরা জীবনধারন করতাম! অবশ্য মাঝে মধ্যে পড়শীরা ছাগলের দুধ পাঠিয়ে দিলে তাও পান করতাম! হযরত আয়েশা রা.বলেন যে, মদিনার জীবনে মহানবী সা. কোনদিন দুবেলা তৃপ্তি সহকারে রুটি খাননি! হযরত আনাস বর্ণনা করেন, একদিন খেদমতে হাজির হয়ে দেখতে পেলাম মহানবী সা. কাপড় দ্বারা কষে পেটের উপর গিরা লাগাচ্ছেন! খোঁজ নিয়ে জানা গেল ক্ষুধার তীব্রতা কিছুটা প্রশমিত করার জন্যই এমন করা হয়েছে! একদিন কয়েকজন সাহাবী ক্ষুধার কষ্টের কথা বলতে বলতে জামা খুলে খুলে দেখাচ্ছিলেন যে, প্রত্যেকেই তারা উপবাসে কাতর হয়ে পেটে পাথর বেঁধে রেখেছেন! মহানবী সা.নিজের পেট খুলে উন্মুক্ত করে দেখালেন আমরা দেখলাম সেখানে দুটি পাথর বাধা রয়েছে! অনেক সময় সকালবেলায় বিবিদের ঘরে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেন খাবার কিছু আছে কিনা! যদি বলতেন যে কিছু নেই, তবে এই বলে বেরিয়ে আসতেন নিজে, তবে আজ আমি রোজা রাখলাম!
সীরাতের সমস্ত লেখক এবং বর্ণনাকারী দ্বিধাহীন চিত্তে একথা স্বীকার করেছেন যে মহানবী সা.জীবনে কখনো কারো উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি! বুখারী ও মুসলিমে হযরত আয়েশা রা.থেকে বর্ণিত আছে যে মহানবী সা.জীবনে কোনদিন ব্যক্তিগত কারণে কারো উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি! একমাত্র দ্বীনের ব্যাপারে কেউ সীমা লংঘন করলেই তাকে প্রতিশোধের সম্মুখীন হতে হতো! ওহুদের পরাজয়ের চাইতে তায়েফবাসীদের সে অত্যাচার মহানবী সা.এর অন্তরে বেশি দাগ কেটেছিল! এতদ্বসত্ত্বেও সে নির্যাতনের দশ বছর পর তাই অবরোধের সময় একদিকে যখন শহরবাসীরা ‘মেনজানিক’ দ্বারা মুসলিম বাহিনীর প্রতি প্রস্তর বর্ষণ করছিল, ঠিক সেই মুহুর্তে ধৈর্য ও ক্ষমতার প্রতীক মহানবী সা.হাত তুলে পরম করুনাময়ের দরবারে দোয়া করছিলেন, ‘আয় আল্লাহ এদের সুমতি দান করুন এবং এদের সবাইকে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করার তৌফিক দান করুন’! শেষপর্যন্ত এ দোয়ার বরকতে হিজরি নবম সনে যখন তায়েফবাসীদের প্রতিনিধিরা মদিনা এসে উপনীত হলো, তখন তাদের বিশেষ যত্নসহকারে গ্রহণ করলেন এবং মসজিদ প্রাঙ্গণে পরম আদর আপ্যায়ন করার ব্যবস্থা করলেন!
কোরাইশরা অশ্লীল গালি দিয়েছে, হত্যার চেষ্টা করেছে, পবিত্র বদনে ময়লা নিক্ষেপ করেছে, গলায় ফাঁস লাগিয়ে কষ্ট দিয়েছে, পদে পদেই নানাভাবে অপদস্থ করার চেষ্টা করেছে, কখনো জাদুকর, কখনো পাগল বা ব্যর্থ কবি বলে বিদ্রুপ করেছে! কিন্তু কোন সময়ই মহানবী সা.তাদের প্রতি রাগান্বিত হননি! একজন নিতান্ত তুচ্ছ মানুষ কেউ যদি কেউ জনসমক্ষে মিথ্যেবাদী বলে প্রতিপন্ন করতে চায়, তবে তার পক্ষে ক্রোধে আত্মহারা হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক!
একবার মহানবী সা.র খেদমতে এক বেদুঈন এসে হাজির হলো! মূর্খ বেদুইন মসজিদের মর্যাদা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিল না! প্রস্রাবের প্রয়োজন দেখা দিলে মসজিদের ভিতরে দাঁড়িয়েছে প্রস্রাব করতে শুরু করলো! সাহাবীগণ তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য চারিদিক থেকে ছুটে এলেন! মহানবী সা. এরশাদ করলেন, ওকে কিছু বোলো না! এক বালতি পানি এনে প্রস্রাব টুকু ধুয়ে ফেললেই পাক হয়ে যাবে! আল্লাহ তাআলা তোমাদের পাঠিয়েছেন লোকজনের সঙ্গে সহজ সরল ব্যবহার করতে, কঠিন হতে নয়!
মানুষের চরিত্র ভান্ডারে সর্বাপেক্ষা দুষ্প্রাপ্য বিষয়টি হলো শত্রুর প্রতি অযাচিত অনুগ্রহ এবং উদার ক্ষমা প্রদর্শন! কিন্তু ওহী ও নবুয়তের বাহক মহানবী সা.এর চরিত্র ইতিহাসে ক্ষমা ও অনুগ্রহের বাস্তব দৃষ্টান্ত সীমাহীন! শত্রুর উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করা একটি আইনগত অধিকার! কিন্তু মহানবী সা.এর উদার চরিত্রের আওতায় এসে তা বিলীন হয়ে যায়! তাঁর মহান চরিত্র সম্পর্কে যত ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়, তাতে একটি বিষয়ে সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত যে, জীবনে কখনো তিনি ব্যক্তিগত কারণে কারো উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি! শত্রুর উপর প্রতিশোধ গ্রহণের পক্ষে সর্বপেক্ষা উত্তম সুযোগ ছিল মক্কা বিজয়ের দিন! যে জঘন্য শত্রুরা দীর্ঘ বিশটি বছর এমন কোন অত্যাচার নেই যার মাধ্যমে আল্লাহর রসূল সা. এবং তাঁর সাহাবীদের জীবন ওষ্ঠাগত করে রাখেনি! তারাই তখন অবনত মস্তকে সামনে নীত হল, তখন উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন: ‘তোমাদের প্রতি আজ আমার আর কোন ভর্ৎসনা নেই! যাও আজ তোমরা সবাই মুক্ত’! যে ওয়াহ্শী ইসলামের সর্বপেক্ষা দৃঢ়বাহু হযরত হামজাকে হত্যা করেছিল! মক্কা বিজয়ের পর সে পালিয়ে তায়েফে আশ্রয় গ্রহণ করে! কিন্তু তায়েফ ও যখন প্রধানত হলো, তখন আর তার কোন আশ্রয় রইল না! সে শুনে ছিল আল্লাহর রসূল সা.কোন দূতের সঙ্গে কঠোরতা করেন না! তখন সেও তায়েফের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মদিনা এসে ইসলাম গ্রহণ করে! মহানবী সা.সেদিন নিজের প্রিয়তম চাচার হত্যাকারী কেও সাদরে আশ্রয় দান করেছিলেন! তবে শুধু এতোটুকু বলে দিয়েছিলেন যে, সচরাচর আমার সামনে এসো না, তোমাকে দেখলেই চাচার কথা মনে পড়ে যায়! আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা ওহুদের ময়দানে হযরত হামজার কলিজা চিবোতে চিবোতে নৃত্য করেছিল! মক্কা বিজয়ের দিন নেকাবে মুখ ঢেকে খেদমতে হাজির হলো এবং ইসলাম গ্রহণ করে কৌশলে নিরাপত্তা সনদ করে নিল! কিন্তু এ নাজুক সময় ও বেয়াদবি করতে পিছপা হলো না! মহানবী সা.তাঁকে চিনে ফেললেন, কিন্তু কিছুই বললেন না! এ আশ্চর্য ব্যাপার প্রত্যক্ষ করে কঠিন হৃদয় নারীর অন্তর এমন ভাবে বিগলিত হয়ে গেল যে, সে স্বতস্ফূর্তভাবে বলে উঠলো রসূলুল্লাহ সা.কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত আমার চোখে আপনার তাঁবুর চাইতে ঘৃণ্য আর কোন তাঁবু ছিলনা! কিন্তু এখন আপনার সে তাঁবুর চাইতে প্রিয়তম কোন তাঁবু আমার চোখে আর একটিও নেই! আবু জাহলের পুত্র ইকরিমা ছিলেন মহানবী সা.এর জঘন্যতম দুশমনদের অন্যতম! পিতার মৃত্যুর পর থেকে তিনি ইসলামের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়োগ করে কোরায়েশদের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন! মক্কা বিজয়ের পর তিনি পালিয়ে গিয়ে ইয়া মনে চলে যান! তার স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করলেন! ইয়ামনে স্বামীর নিকট গিয়ে তাকেও ইসলামে দীক্ষিত করলেন এবং সঙ্গে করে নিয়ে এসে দরবারে হাজির করলেন! মহানবী সা.ইকরামাকে দেখে আনন্দে এমন উচ্ছ্বসিত হয়ে অভ্যর্থনার জন্যে এগিয়ে এলেন যে শরীর থেকে চাদর খসে পড়ল: জবান মোবারক থেকে উচ্চারিত হতে লাগলো: ‘স্বাগত: হে মোহাজের সওয়ার’! হোবার ইবনে আসওয়াদ ছিলেন সেসব দুষ্কৃতকারীর অন্যতম! মক্কা বিজয়ের পর যাদের সম্পর্কে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল! মহানবী সা.এর কন্যা হযরত জয়নাব যখন মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেছিলেন, তখন সে তাকে আটকে অকথ্য নির্যাতন করেছিল! হযরত জয়নাব তখন সন্তানসম্ভবা ছিলেন! হোবার তাকে উটের উপর থেকে ফেলে এমন আঘাত দিয়েছিল যে, তা সহ্য করতে না পেরে তার গর্ভপাত হয়ে যায়! এছাড়াও মুসলমানদের উপর আরো কতিপয় জঘন্য নির্যাতনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তার বিরুদ্ধে ছিল! মক্কা বিজয়ের পর তিনি পালিয়ে ইরানে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন! কিন্তু হেদায়েতের আলো তাকে আকর্ষণ করে, মহানবী সা.এর দরবারে পৌঁছে দেয়! খেদমতে হাজির হয়ে নিবেদন করলেন, ইয়া রসূলুল্লাহ সা.প্রাণভয়ে ইরান চলে যাওয়ার জন্য রওয়ানা হয়েছিলাম! কিছুদুর যাবার পর আপনার দয়া ও ক্ষমাশীলতার কথা মনে পড়ে গেলে ইসলাম গ্রহণ করার জন্য ফিরে এসেছি! আমার সম্পর্কে আপনার কাছে যে সমস্ত অভিযোগ এসেছে তা সবই সত্য! আমার মূর্খতা ও অপরাধ অকপটে স্বীকার করছি! অপরাধীর অনুশোচনার কন্ঠ রহমতে আলম এর করুণার দ্বারে আঘাত করলো! হাত বাড়িয়ে তাকেও বিনাদ্বিধায় রহমতের ছায়াতলে আশ্রয় দান করলেন! ইসলাম গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত ইসলামের বিরুদ্ধে আবু সুফিয়ানের ভূমিকাই ছিল সবচেয়ে নিকৃষ্টতম! মক্কার জীবনে হযরত নবী করীম সা.এর যাবতীয় কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি এবং হিজরতের পর বদর থেকে মক্কা বিজয় পর্যন্ত প্রত্যেকটি যুদ্ধের নেতৃত্বদান সহ ইসলাম এবং মহানবী সা.র বিরুদ্ধে যতগুলো ষড়যন্ত্র হয়েছে, প্রায় প্রত্যেকটি পুরোভাগে ছিলেন আবু সুফিয়ান! ইসলামের সর্ব প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে তাকে সর্বাগ্রগণ্য করা হতো! মক্কা বিজয়ের দিন মুসলিম বীরগণ তাকে গ্রেফতার করে মহানবী সা.এর খেদমতে হাজির করলেন! হযরত আব্বাস এর সঙ্গে সঙ্গে আসছিলেন! হযরত ওমর রা.এ বন্দীকে হত্যা করার অনুমতি প্রার্থনা করলেন! কিন্তু মহানবী সা.তাঁর সর্বপ্রধান শত্রুকে হাতের মুঠোয় পেয়ে শুধু যে রেহাই করে দিলেন তাই নয়, ঘোষণা করলেন আবু সুফিয়ান ই শুধু মুক্ত নয়, যেসব লোক আবু সুফিয়ানের ঘরে আশ্রয় নেবে তারাও নিরাপদ! দুনিয়ার ইতিহাসে অন্য কোনো বিজেতার জীবনে কি এমন উদার নজির আরেকটি খুঁজে পাওয়া যাবে! মক্কার কুরাইশরা দীর্ঘ তিনটি বছর মহানবী সাল্লাম কে পরিবার-পরিজনসহ শেয়াবে আবু তালেবে বন্দি করে রেখেছিল! সে কঠিন দিনগুলোতে জালেমরা তৃণ-লতাহীন সে গিরি-সংকটে শস্যের একটি দানাও পৌঁছাতে দিত না! ক্ষুধায় কাতর হয়ে শিশুরা যখন আর্তস্বরে ক্রন্দন করত, তখন দুরাত্মারা দূরে বসে অট্টহাস্যে ফেটে পড়তো! কিন্তু যখন সুযোগ এলো তখন এ পিশাচ প্রকৃতির দুশমন দুরাত্মাদের সঙ্গে রহমতে আলম কি ব্যবহার করেছিলেন, ইতিহাস পাঠকগণ তাও একবার ভেবে দেখতে পারেন!
মহানবী সা.শিশুদের অত্যাধিক স্নেহ করতেন! সফর থেকে ফিরে এলে পথে শিশুদের সাক্ষাৎ পেলে তাদের সওয়ারীর অগ্র-পশ্চাতের তুলে নিতেন! পথে দেখা হলে শিশুদেরকে সালাম দিতেন! একবার সাহাবী হযরত খালেদ ইবনে সায়ীদ দরবারে হাজির হলেন! সঙ্গে তার একটি শিশু কন্যা ছিল! তার পরনে লাল রঙের জামা দেখে তার তারিখ করলেন! তার সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন! এই শিশুটির জন্ম হয়েছিল হাব্শাতে! হাব্শা দেশে সুন্দর অর্থে আরবি হুসনা শব্দটি সাননা উচ্চারিত হয়! মহানবী সা.কৌতুক করে তাকে সাননা বলে সম্বোধন করলেন! কথাবার্তার মধ্যে এক সময় মেয়েটি তার শিশুসুলভ কৌতুহলবশে মহানবী সা.এর পৃষ্ঠদেশস্থ মোহরে নবুয়তে হাত রেখে খেলা করতে শুরু করলো! খালেদ তা দেখে কন্যাকে ধমক দিলেন! কিন্তু মহানবী সা.খালেদকে বারণ করে বললেন, ‘আহা ওকে খেলতে দাও’! মেয়েটির নাম ছিল উম্মে খালেদ! একবার দুদিকে সুন্দর আঁচল যুক্ত একটি কালো রঙের ছোট চাদর পাওয়া গেলে মহানবী সা.উম্মে খালেদকে তা দিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘বড় মানিয়েছে ,পুরাতন না হওয়া পর্যন্ত পরবে-এটি সাননা না? মহানবী সা.তার সঙ্গে কৌতুক করে হাবশি ভাষায় কথা বলতেন! সন্তানের প্রতি মাতৃস্নেহ প্রকাশ জনিত যে কোন ঘটনা মহানবী সা.র হৃদয়-মন স্পর্শ করত! একবার নিত্যান্ত দরিদ্র এক মাতা ছোট ছোট দুটি কন্যাসহ হযরত আয়েশার কাছে এসে সাহায্যপ্রার্থিনী হল! ঘরে কিছুই ছিল না! হযরত আয়েশা একটিমাত্র খেজুর এনে স্ত্রীলোকটির হাতে দিলেন! সে তা সমান দু’টুকরো করে দুটি মেয়েকে খেতে দিল! মহানবী সা.বাইরে থেকে আসার পর হযরত আয়েশা রা.ঘটনাটি বর্ণনা করলে এরশাদ করলেন: আল্লাহ পাক যদি কাউকে সন্তান দিয়ে পরীক্ষায় নিপতিত করেন, আর সে তার হোক যথাযথ পালন করে যায়, তবে সে দোযখের আগুন থেকে নিরাপদ থাকতে পারবে! শুধু মুসলমানের শিশুদের প্রতি মহানবীর সা.এমন স্নেহ-মমতা পোষণ করতেন তাই নয়! কাফের মুশরিকদের শিশুদের প্রতিও একই রূপ মমতা প্রকাশ করতেন! কোন এক যুদ্ধে আক্রমণের মুখে প্রতিপক্ষের কয়েকটি শিশু নিহত হলো! মহানবী সা.তা দেখে অত্যন্ত মর্মাহত হলেন! লোকেরা নিবেদন করলো এরা যে মুশরেকদের সন্তান ছিল! জবাব দিলেন, ‘মুশরিকদের শিশুরাও তোমাদের চেয়ে উত্তম’! খবরদার কখনো শিশুদের হত্যা করো না! মনে রেখো প্রত্যেক শিশুই আল্লাহর স্বভাব ধর্মের উপর জন্মগ্রহণ করে থাকে! নতুন ফসল ওঠার সময় কেউ কোন সময় ফলমূল এনে পেশ করলে ছোট ছোট শিশুকে তা বেঁটে দিতেন! বাচ্চাদের আদর সোহাগ করতেন, কোলে তুলে চুমু খেতেন! একবার জনৈক বেদুইন খেদমতে হাজির হয়ে দেখল মহানবী সা.একটি শিশুকে কোলে তুলে চুমু খাচ্ছেন! সে বলতে লাগল আপনারা বাচ্চাদের চুমু খান, অথচ আমার দশ দশটি বাচ্চা রয়েছে কিন্তু কোনোদিন আমি তাদের এমন ভাবে আদর করিনি! মহানবী সা.জবাব দিলেন,আল্লাহ পাক যদি তোমার অন্তর থেকে স্নেহ-মমতা তুলে নিয়ে থাকেন, তবে আমার কি করার আছে?
মহানবী সা.দাস-দাসীদের প্রতি বিশেষভাবে মমতা প্রকাশ করতেন! সাহাবীদের উপদেশ দিতেন দেখো এরা তোমার ভাই, নিজেরা যা খাবে এদেরও তাই খেতে দেবে, নিজেরা যা পরবে তাদেরও তাই পরতে দেবে! মহানবী সা.র মালিকানায় কোন দাস-দাসী এলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে মুক্ত করে দিতেন! কিন্তু তারা মহানবী সা.র স্নেহ মমতার বন্ধন থেকে কোনোকালেই আর মুক্ত হতে পারতেন না! মাতা পিতার স্নেহ এবং কবিলা রেশতার মায়া কাটিয়ে তারা চিরজীবনে মহান দরবারে গোলামী করেই জীবন কাটিয়ে দিতেন! হযরত যায়েদ ইবনে হারেস ক্রীতদাস ছিলেন! মহানবী সা.তাকে মুক্ত করে দেওয়ার পর তার পিতা তাকে নিতে এলেন! কিন্তু দরবারের সালাতের মমতার বন্ধন এর কাছে পিতৃস্নেহের দাবি হার মানল! জায়েদ বাকি জীবনে দরবারেই থেকে গেলেন! জায়েদের পুত্র উসামাকে এত স্নেহ করতেন যে নিজে হাতে তার নাক পর্যন্ত পরিষ্কার করে দিতেন! এরশাদ করতেন, ওসামা যদি মেয়ে হতো তবে আমি তাকে অলংকার তৈরি করে দিতাম! দাস-দাসীকে গোলাম বা বাঁদী বলে সম্বোধন করলে তাদের অন্তরে যে আঘাত লাগে মহানবী সা. নিজের দরদী অন্তর দিয়ে তা অনুভব করতেন! বলতেন, তাদের গোলাম বা বাঁদী বলে সম্মোধন করো না, বরং ছেলে-মেয়ের ন্যায় ডেকো! দাস-দাসীরা ও যেনো মালিকদের প্রভু বলে সম্বোধন না করে!! কেননা মানুষের মালিক বা প্রভু আল্লাহ! দাসীদের তিনি কতটুকু ভালোবাসতেন তার প্রমান রয়েছে জীবনের শেষ মুহূর্তে পবিত্র জবান থেকে উচ্চারিত কয়েকটি কথায়! সর্বশেষ বলেছিলেন, তোমাদের দাসদাসীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো! দাসেদের প্রতি এহেন সহানুভূতি এবং কোমল ব্যবহারে আকৃষ্ট হয়ে বহু ক্রীতদাস কাফের মালিকদের কবল থেকে পালিয়ে এসে মহানবী সা.র নিরাপদ সান্নিধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করত! তিনি তাদেরকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করতেন! যুদ্ধ লব্ধ গনিমতের মাল থেকে দাসেদেরকেও অংশ দেওয়া হতো! বিশেষত সদ্য মুক্ত নিঃস্ব দাসদাসীদের পুনর্বাসনের জন্য গণিমতের একটি বিশেষ অংশই বরাদ্দ রাখা হতো! বন্টনের সময় সর্বপ্রথম এদেরই দেওয়া হতো!
যুগে যুগে এই নারী জাতি ছিল উপেক্ষিতা ও নির্যাতিতা! এদের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার কোন প্রয়োজনে তার কথা কেউ কোনদিন অনুভব করেছে বল বড় একটা জানা যায় না! মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর পূর্বে কোন ধর্ম প্রবর্তক বা সংস্কারক নারী জাতির প্রতি কোনরূপ মর্যাদা প্রদর্শন করেছেন বলেও কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না! নারীদের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত আচার-আচরণ কেমন ছিল তাও কোথাও উল্লেখ নেই! ইসলামে সর্বপ্রথম নারী জাতিকে পুরুষের সমান মর্যাদা দান করেছে! উপেক্ষার অন্ধকার থেকে টেনে এনে সমঅধিকারের আলোকে উজ্জ্বল জীবন পথে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে! ইসলাম নারী জাতিকে অধিকার দিয়েছে! শরীয়তে তাদের অধিকার সম্পর্কে বিধি-বিধান অবতীর্ণ হয়েছে! সেইসঙ্গে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর ফল এবং ব্যক্তিগত আচার-ব্যবহার নারী জাতির মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত করার কাজ দ্রুততর করেছে! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম এর দরবারে সবসময়ই লোকের ভিড় থাকতো! এভি খেলেছি লোকেদের পক্ষে উপদেশনা কষ্টকর হয়ে উঠতো! তারা এসে সপ্তাহে একটি দিন স্ত্রীলোকদের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়ার আবেদন করলে তা মঞ্জুর করা হল এবং তারপর থেকে নির্ধারিত সেট দিনটিতে স্ত্রীলোকদের প্রতি উপদেশ দান এবং তাদের নানা সমস্যা সম্পর্কে আলোচনার জন্য নিয়মিতভাবে বৈঠক বসছে শুরু করে! এক ঈদের দিনে মহানবী সাল্লাল্লাহু আয়েশার ঘরে চাদরে মুখ ঢেকে শুয়ে ছিলেন! ছোট ছোট কয়েকটি মেয়েদর বাজিয়ে গান গাইছিল! এমন সময় হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এসে তাদেরকে ধমক দিলেন! শুনে মহানবী সাল্লাল্লাহু সাল্লাম বললেন আবুবকর এদের গাইতে দাও! আজ ঈদের দিনের আনন্দ করুক! স্ত্রী লোকেরা অত্যন্ত নিঃসংকোচে এসে নানা গাথবো বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন! অনেক সময় এদের সাহস দেখে সাহাবীরা বিস্মিত হতেন! কিন্তু মহানবীর সাল্লাহু সাল্লাম কোন সময়ই তাদের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করতেন না! স্ত্রীলোকের আজিত অত্যন্ত কোমল স্বভাবের অভিমানী প্রকৃতির হয়ে থাকে তাই তাদের অনুভূতির প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা হতো! আন্দাসা নামক এক হাবসি গোলাম অত্যন্ত আকর্ষনীয় সুরে হুদি গান গাইতে জানতেন! এক সফরে আন্দাসা উষ্ট্র পালের আগে আগে হু দিকে যাচ্ছিলেন, গানের সুরে আকৃষ্ট হয়ে উঠল দ্রুত ছুটলাম! মহানবী সাল্লাল্লাহু কাফেলা স্ত্রীলোকদের প্রতি ইঙ্গিত করে মন্তব্য করলেন আন্দাসা তোমার হুদিগান এর করুণ সুরে কাচের অন্তর গুলো না ফেটে যায়!
যুগে যুগে এই নারী জাতি ছিল উপেক্ষিতা ও নির্যাতিতা! এদের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার কোন প্রয়োজনে তার কথা কেউ কোনদিন অনুভব করেছে বল বড় একটা জানা যায় না! মহানবী সা.এর পূর্বে কোন ধর্ম প্রবর্তক বা সংস্কারক নারী জাতির প্রতি কোনরূপ মর্যাদা প্রদর্শন করেছেন বলেও কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না! নারীদের সঙ্গে তাঁদের ব্যক্তিগত আচার-আচরণ কেমন ছিল তাও কোথাও উল্লেখ নেই! ইসলামে সর্বপ্রথম নারী জাতিকে পুরুষের সমান মর্যাদা দান করেছে! উপেক্ষার অন্ধকার থেকে টেনে এনে সমঅধিকারের আলোকে উজ্জ্বল জীবন পথে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে! ইসলাম নারী জাতিকে অধিকার দিয়েছে! শরীয়তে তাঁদের অধিকার সম্পর্কে বিধি-বিধান অবতীর্ণ হয়েছে! সেইসঙ্গে মহানবী সা.এর কওল এবং ব্যক্তিগত আচার-ব্যবহার নারী জাতির মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত করার কাজ দ্রুততর করেছে! রসূলুল্লাহ সা.এর দরবারে সবসময়ই লোকের ভিড় থাকতো! এ ভীড় ঠেলে স্ত্রীলোকেদের পক্ষে উপদেশ শোনা কষ্টকর হয়ে উঠতো! তাঁরা এসে সপ্তাহে একটি দিন স্ত্রীলোকদের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়ার আবেদন করলে, তা মঞ্জুর করা হল এবং তারপর থেকে নির্ধারিত সেই দিনটিতে স্ত্রীলোকদের প্রতি উপদেশ দান এবং তাঁদের নানা সমস্যা সম্পর্কে আলোচনার জন্য নিয়মিতভাবে বৈঠক বসতে শুরু করে! এক ঈদের দিনে মহানবী সা.আয়েশার ঘরে চাদরে মুখ ঢেকে শুয়ে ছিলেন! ছোট ছোট কয়েকটি মেয়ে দফ বাজিয়ে গান গাইছিল! এমন সময় হযরত আবু বকর রা.এসে তাদেরকে ধমক দিলেন! শুনে মহানবী সা.বললেন আবুবকর এদের গাইতে দাও! আজ ঈদের দিনের আনন্দ করুক! স্ত্রী লোকেরা অত্যন্ত নিঃসংকোচে এসে নানা জ্ঞাতব্য বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন! অনেক সময় এঁদের সাহস দেখে সাহাবীরা বিস্মিত হতেন! কিন্তু মহানবী সা.কোন সময়ই তাঁদের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করতেন না! স্ত্রীলোকেরা যেহেতু অত্যন্ত কোমল স্বভাবের অভিমানী প্রকৃতির হয়ে থাকে, তাই তাঁদের অনুভূতির প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা হতো! আনজাশা নামক এক হাবসি গোলাম অত্যন্ত আকর্ষনীয় সুরে হুদি গান গাইতে জানতেন! এক সফরে আনজাশা উষ্ট্র পালের আগে আগে হুদি গেয়ে যাচ্ছিলেন, গানের সুরে আকৃষ্ট হয়ে উটগুলো দ্রুত ছুটছিল! মহানবী সা.কাফেলা স্ত্রীলোকদের প্রতি ইঙ্গিত করে মন্তব্য করলেন, আনজাশা তোমার হুদিগান এর করুণ সুরে কাচের অন্তরগুলো না ফেটে যায়!
জীবের প্রতি দয়া প্রদর্শন ছিল মহানবী সা.এর অন্যতম চরিত্র বৈশিষ্ট্য! মানুষ যুগের পর যুগ ধরে বোবা জীব-জানোয়ারের প্রতি যে অত্যাচার করে এসেছে মহানবী সা.সে হৃদয়হীন আচরণ সম্পর্কে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন! উটের গলায় বেড়ি পড়ানোর রীতি রহিত করা হয়! কোন পশুর লেজ কাটা বা কেশরের পশম কেটে নেওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়! এরশাদ করেন, লেজ হলো পশুর ব্যজনী এবং কেশর তার ভূষণ এগুলো কর্তন করোনা! পিঠে গদি এঁটে দীর্ঘ সময় কোন সওয়ারীর পশুকে দাঁড় করিয়ে রাখতে নিষেধ করতেন! বলতেন, জীব জানোয়ার কে তোমরা বিছানা কুরসি মনে করোনা, এগুলোর ও আরামের প্রয়োজন হয়! দুম্বার শরীর থেকে বর্ধিত গোশতের টুকরো কেটে নিয়ে তা খাওয়া হতো! জীবন্ত জীব জানোয়ারের কোন অংশ কেটে খাওয়ার প্রাচীন প্রথা ও নিষিদ্ধ করা হয়! একটি বিশেষ প্রথা অনুযায়ী কোন জীবন্ত জানোয়ারকে বেঁধে তার গায়ে তীর নিক্ষেপের অনুশীলন করা হতো! এ নিষ্ঠুর প্রথা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করে দিলেন! অনুরূপ জীব জানোয়ারের লড়াই লাগানো সুপ্রাচীন প্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দিলেন! একদিন পথে একটি গাধা দেখতে পেলেন! সেটির মুখে লোহা ফুটিয়ে অনেকগুলো দাগ দেওয়া হয়েছিল! বলে উঠলেন, যে এই নিরীহ জীবটিকে এমন নিষ্ঠুর ভাবে দাগ দিয়েছে, তার উপর আল্লাহর লানত! পরিচয় চিহ্ন দেওয়া এবং অন্যান্য কারণে উট বকরীর দেহে দাগ দেওয়ার প্রয়োজন হতো! কিন্তু এমতাবস্তায় মহানবী সা.শরীরের কোন কোমল অংশে দাগ দিতে নিষেধ করতেন! কোন এক সফরে এক জায়গায় কাফেলা থামল! কাছেই গাছের ডালে একটি পাখি বাসা বেঁধে ডিম পেড়েছিলো! জনৈক সাহাবী পাখির ডিম তুলে আনলেন! পাখিটি তার অপহৃত ডিমের জন্য মহা কলরবে ছটপট করে পাখা ঝাপটাতে শুরু করলো! মহানবী সা.এ দৃশ্য দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ডিম ছিনিয়ে এনে কে এ পাখিটিকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছে? সাহাবী নিবেদন করলেন, আমি রসূলুল্লাহ সা.! হুকুম দিলেন, এক্ষুনি ডিম গুলো যথাস্থানে রেখে এসো! একবার পথিমধ্যে এমন একটি উট চোখে পড়ল ঘাস পানি না পেয়ে তার পেট পিঠ এক হয়ে গিয়েছিল! মন্তব্য করলেন, এ সমস্ত নিরীহ জন্তু সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় করো!
মহানবী সা.দুনিয়ার প্রতি রহমত হিসাবে আগমন করেছিলেন! হযরত মুসা বলেছিলেন, আমি শান্তির রাজপুত্র! কিন্তু শান্তির রাজকুমারের জীবনালেখ্য এর মধ্যে শান্তির কোন বাস্তব নমুনা খুঁজে পাওয়া যায় না! অর্থাৎ তাঁর অনুসারী হওয়ার দাবিদাররা তা সংরক্ষন করতে পারেনি! অপরদিকে শান্তির সাহানসা মুহাম্মদ সা.কে খোদ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেনঃ সমগ্র বিশ্ব জাহানের জন্য আপনাকে রহমত স্বরূপ পাঠানো হয়েছে! যে রহমতের ছায়া দোস্ত -দুশমন, কাফের- মুসলিম, শিশু- বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ এমনকি হিংস্র জীব জন্তুর উপর পর্যন্ত সমভাবে বিস্তৃত হয়েছে! এক কথায় দুনিয়ার সবকিছুই তাঁর সে রহমতের ছায়ার অংশিদার ছিল! এক ব্যক্তি এসে কোন দুশমনের প্রতি অভিশাপ করার আবেদন জানালে ক্রোধান্বিত হয়ে এরশাদ করলেন, আমি কারো প্রতি অভিশাপ করার জন্য আগমন করিনি! আমাকে দুনিয়ার সবার প্রতি রহমত স্বরূপ পাঠানো হয়েছে! দুনিয়াবাসীকে তিনি পয়গাম দিয়েছেন, তোমরা একে অপরের প্রতি হিংসা বিদ্বেষ পোষণ করো না! একের দিক থেকে অন্যের মুখ ফিরিয়ে রেখোনা, আল্লাহর সমস্ত বান্দা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও! তুমি নিজের জন্য যা পছন্দ করো ,অন্য সব মানুষের জন্য তাই পছন্দ করো, পরিপূর্ণ মুসলমান হতে পারবে! হযরত আনাস রা.বর্ণনা করেন, তোমাদের মধ্যে কেউ সে পর্যন্ত পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যে পর্যন্ত সে অন্য সবার জন্য তা পছন্দ না করে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে থাকে! আর যে পর্যন্ত না কোন ব্যক্তি তার অপর ভাইকে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির খাতিরে ভালবাসতে না শেখে!
মহানবী সা.ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু এবং কোমল অন্তর বিশিষ্ট! কন্যা হযরত জয়নাব এর একটি শিশুপুত্রের মৃত্যুর সময় তিনি পিতাকে বিশেষভাবে খবর দিয়ে বাড়িতে নিয়ে গেলেন! সঙ্গে ছিলেন হযরত সা’আদ ইবনে উবাদা,মাআয ইবনে জাবাল, উবাই ইবনে কাআব এবং জায়েদ ইবনে সাবেত প্রমুখ বিশিষ্ট সাহাবীগণ! শিশুটির তখন শেষ সময়! লোকেরা তাকে তুলে এনে মহানবী সা.এর সামনে রাখল! মৃত্যুপথযাত্রীর চেহারায় দৃষ্টি নিপতিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দু চোখে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল! সাহাবীরা নিবেদন করলেন, ইয়া রসূলুল্লাহ সা.এ কি? জবাব দিলেন, যেসব লোক অন্যের প্রতি স্নেহ বিগলিত হয়, আল্লাহ পাক তাঁদের প্রতি রহম করেন! ওহুদ যুদ্ধ থেকে ফিরে মদীনায় এসে দেখতে পেলেন ঘরে ঘরে মাতম এর রোল উঠেছে! শহীদানের আত্মীয়-পরিজন তাঁদের আপনজনদের কথা স্মরণ করে বিলাপ করছেন! এ মর্মবিদারী দৃশ্য দেখে মহানবী সা.এর কোমল অন্তর বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো! কান্নাভেজা কণ্ঠে বলতে লাগলেন, আজ হযরত হামজার জন্য ক্রন্দন করার কেউ এখানে নেই! একবার জনৈক সাহাবী তার জাহেলিয়াতের যুগের কাহিনী বর্ণনা প্রসঙ্গে বলছিলেন, আরবের কোন কোন এলাকার দস্তুর মোতাবেক আমি আমার একটি কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দিচ্ছিলাম! গর্তে ফেলে আমি তার উপর মাটি ও পাথর চাপা দিচ্ছিলাম, আর হতভাগী আব্বা আব্বা বলে আর্তনাদ করছিল! এমনিভাবেই আমি আমার সে সন্তানটিকে জীবন্ত পুঁতে ফেললাম! মহানবী সা.এ কাহিনী শুনে অঝোরে কাঁদতে লাগলেন! সাহাবীকে ডেকে বললেন তোমার কাহিনীটি আবার বল! তিনি আবারও বর্ণনা করলেন, শুনে কাঁদতে কাঁদতে হুজুর সা.এর চেহারা মোবারক ভিজে গিয়েছিল! সাহাবী হযরত মুসআব ইবনে ওমাইর ছিলেন খুব ধনী পিতা-মাতার নিত্যান্ত আদরের সন্তান! বাল্যকাল থেকে পিতামাতা তাকে অত্যন্ত যত্নে লালন পালন করতেন! বহু মূল্যবান পোশাক পরাতেন! কিন্তু ইসলাম গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গেই সেই স্নেহ মমতা কঠোরতায় রূপান্তরিত হল! একদিন তিনি পিতা-মাতা কর্তৃক লাঞ্ছিত হয়ে উলঙ্গ প্রায় অবস্থায় এসে দরবারে হাজির হলেন! বিলাস ব্যসনের প্রাচুর্যে লালিত মুসআবের দুরবস্থা দেখে মহানবী সা.এর অন্তর কেঁপে উঠলো! দু চোখ অশ্রু ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো!
রোগ শোকে সান্ত্বনা প্রদান এবং বিপদের সমবেদনা প্রকাশ করার ব্যাপারে মুসলমান ও অমুসলমান, শত্রু মিত্রের কোন পার্থক্য করতেন না! আবু দাউদে বর্ণিত আছে যে মহানবী সা.রোগশোকে সমবেদনা প্রকাশ করার ব্যাপারে অত্যন্ত বেশি খেয়াল রাখতেন! বুখারী ও আবু দাউদ এ উল্লেখিত আছে যে মহানবী সা.একবার জনৈক ইহুদি ক্রীতদাসকে রোগশয্যায় দেখতে গিয়েছিলেন! সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সাবেত কে মৃত্যুশয্যায় দেখতে গেলেন! ততক্ষনে হযরত আব্দুল্লাহর বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল! তাকে নাম ধরে ডাক দিলেন, কিন্তু কোন জবাব এলো না! আক্ষেপ করে বললেন, আবু রাফে’র ব্যাপারে এই মুহুর্তে আমার আর কোন জোর চলবে না! একথা শুনে স্ত্রীলোকেরা উচ্চস্বরে কাঁদতে শুরু করলেন! লোকেরা কাঁদতে বারণ করলে এরশাদ করলেন, কাঁদতে দাও, তবে মৃত্যুর পর যেন আর কেউ না কাঁদে! জনৈক হাবসি মসজিদে ঝাড়ু দিতেন! হঠাৎ তার মৃত্যু হলে সাহাবীরা মহানবী সা.কে কিছু না জানিয়েই তাকে দাফন করে ফেললেন! কয়েকদিন তাকে না দেখে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন তার মৃত্যু হয়েছে! অভিযোগ করলেন, আমাকে তোমরা খবর দিলে না কেন? সাহাবীরা জবাব দিলেন এর জানাজার জন্য আবার আপনাকে কষ্ট দেওয়া সমীচীন মনে করিনি! কিন্তু মহানবী সা.লোকজনের কাছে জিজ্ঞেস করেছে লোকটির কবরের পাশে গিয়ে তার জানাযা পড়ে এলেন! জানাজা যেতে দেখলে মহানবী সা.দাঁড়িয়ে পড়তেন! বুখারী শরীফে বর্ণিত আছে এরশাদ করতেন, জানাজা যেতে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে যেও! যদি তা সম্ভব না হয় তবে অন্তত যতক্ষণ না চলে যায় ততক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকো! মহানবী সা.এর অন্তর ছিল যেমন কোমল তেমনি স্পর্শকাতর’! বিশেষত কোন আপনজনের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে অত্যন্ত বিচলিত করে তুলত! কিন্তু তা সত্ত্বেও বিলাপ করার অনুমতি দিতেন না!
কোন কোন সময় সঙ্গীদের সঙ্গে খোশমেজাজে কথাবার্তাও বলতেন! একদিন এক বৃদ্ধা এসে নিবেদন করলেন, ইয়া রসূলুল্লাহ সা.আমাকে সওয়ারীর জন্য একটি উট দান করুন! জবাব দিলেন যাও তোমাকে একটি উটের বাচ্চা দেব! বৃদ্ধা আরজ করলেন উটের বাচ্চা দিয়ে আমি কি করব? হেসে বললেন দুনিয়াতে এমন কোন উট আছে কি যা অন্য কোন উটের বাচ্চা নয়? এক বৃদ্ধা এসে আরজ করলেন ইয়া রসূলুল্লাহ সা.দোয়া করুন আমি যেন বেহেস্তে যেতে পারি! মহানবী সা.বললেন কোন বৃদ্ধা বেহেশতে প্রবেশ করবে না! একথা শুনে বৃদ্ধার অন্তর ভেঙ্গে পড়ল! কাঁদতে কাঁদতে ফিরে চললেন! তখন মহানবী সা. সাহাবায়ে কিরাম কে বলে দিলেন ওকে ডেকে বলে দাও সত্যসত্যই বৃদ্ধা অবস্থায় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যখন যাবে যুবতী হয়েই যাবে! জাহের নামক এক বেদুঈন সাহাবী ছিলেন! তিনি ধাতুর জিনিসপত্র তৈরি করে বিক্রি করতেন! মাঝে মাঝে তিনি সে সমস্ত জিনিসপত্র মহানবী সা.কে উপঢৌকন হিসেবে পাঠাতেন! একদিন বাজারের পথে যেতে যেতে দেখলেন জাহের জিনিসপত্র বিক্রি করছে! রসিকতা করে তাকে পেছন দিক থেকে জড়িয়ে ধরেন! জাহের বলতে লাগলেন, কেমন রসিকতা শুরু করল, ছেড়ে দাও! কিন্তু ঘাড় ফিরিয়ে যখন দেখলেন রসূলুল্লাহ সা.তখন পিঠ আরো চেপে ধরলেন! জনৈক সাহাবী এসে জানালেন তার ভাইয়ের পেটে পীড়া দেখা দিয়েছে! বললেন, মধু খাইয়ে দাও! মধু খাওয়ানোর পর দাস্ত শুরু হল! সাহাবী ছুটে এসে জানালে পুনরায় মধু খাওয়াতে বললেন! কিন্তু মধু খাওয়ানোর পর যখন দাস্ত আরো বাড়লো তখন সাহাবী ছুটে এসে জানালেন, তিনবার এরূপ হওয়ার পর এরশাদ করলেন, আল্লাহর কিতাব মিথ্যা হতে পারেনা! তোমার ভাইয়ের পেটি মিথ্যা যাও আবারো তাকে মধু খাইয়ে দাও! এবার মধু খাওয়ানোর পর পেটের সমস্ত বদ্ধমল বেরিয়ে গিয়ে রোগী সুস্থ হয়ে উঠলো!
সন্তানের প্রতি মহানবী সা.র সীমাহীন মমতা ছিল! কোথাও সফরে বের হলে সর্বশেষ ফাতেমার কাছে তাসরিফ নিতেন এবং বাইরে থেকে এসেও সর্বপ্রথম হযরত ফাতেমাকে কাছে ডাকতেন! কোন এক যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে দেখলেন হযরত ফাতেমা রা.তাঁর দুই শিশুসন্তান হযরত হাসান ও হযরত হোসাইন এর হাতে রুপোর বালা পরিয়েছেন এবং ঘরের দরজায় রঙিন পর্দা ঝুলিয়ে রেখেছেন! মহানবী সা.তা দেখে এবার আর প্রথমে হযরত ফাতেমার ঘরে প্রবেশ করলেন না! চিরাচরিত অভ্যাস এর ব্যতিক্রম করে দরজা থেকেই ফিরে গেলেন! হযরত ফাতেমা রা.বিষয়টি আঁচ করতে পেরে বাচ্চাদের হাত থেকে কঙ্কন খুলে ফেললেন এবং কাঁদতে কাঁদতে খেদমতে গিয়ে হাজির হলেন! মহানবী সা. কঙ্কন বাজারে পাঠিয়ে দিয়ে বলে দিলেন, এগুলো বিক্রি করে হাতির দাঁতের কঙ্কণা আনিয়ে দাও! হযরত ফাতেমা রা.কখনো এসে হাজির হলে মহানবী সা.উঠে দাঁড়িয়ে যেতেন! তাঁর কপালে চুমু খেতেন! আসন থেকে সরে নিজের জায়গায় বসাতেন! সাহাবী হযরত আবু কাতাদা বর্ণনা করেন, একদিন আমরা মসজিদে বসে ছিলাম, দেখলাম উমামা নাম্নী এক নাতনিকে কাঁধে বসিয়ে মহানবী সা.মসজিদে তাসরিফ আনলেন! উমামা কে কাঁধে নিয়েই তিনি নামাজ পড়লেন, রুকু সেজদার সময় তাকে একহাতে নামিয়ে রাখতেন এবং দাঁড়াবার সময় পুনরায় তাকে কাঁধে বসিয়ে নিতেন! এ অবস্থায়ই নামাজ সমাপ্ত করলেন! হযরত আনাস রা.বর্ণনা করেন আমি মহানবী সা.এর চাইতে অধিকার কাউকেও সন্তানের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে দেখিনি! পুত্র ইব্রাহিম শহর থেকে তিন চার মাইল দূরে শহরের উপকণ্ঠে লালিত-পালিত হচ্ছিলেন! মহানবী সা.পায়ে হেঁটে প্রায়ই সেখানে যেতেন! দাইয়ের ঘরে গিয়ে শিশুকে কোলে তুলে দিতেন, তার মুখে চুমু খেতেন এবং পায়ে হেঁটে ফিরে আসতেন! হযরত হাসান হুসাইন কে সীমাহীন স্নেহ করতেন! বলতেন,এই দুটি আমার বাগানের দুটি ফুল! হযরত ফাতেমার ঘরে গিয়ে বলতেন, আমার দাদুরা কোথায়? তারা সামনে এলেই জড়িয়ে ধরতেন, চুমু খেতেন! একবার মসজিদে খুতবা দেওয়ার সময় হযরত হাসান হুসাইন লাল জামা পরে কম্পিত পায়ে মসজিদে এসে উঠলেন! মহানবী সা.থাকতে পারলেন না! খুতবা স্থগিত রেখে মিম্বর থেকে নেমে এসে কোলে তুলে সামনে এনে বসালেন! তারপর পুনরায় খুতবা শুরু করতে গিয়ে বললেন আল্লাহ তাআলা ঠিকই বলেছেন: তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি একটি পরীক্ষার বস্তু! এরশাদ করতেন, হোসাইন আমার আমি হোসাইন এর! যে ব্যক্তি হোসাইন এর সঙ্গে মহব্বত রাখবে আল্লাহ যেন তাকে মহব্বত করেন! কন্যা হযরত জয়নবের জামাতা বদর যুদ্ধে গ্রেপ্তার হয়ে আসলেন! মুক্তিপণ দেওয়ার মতো কোন সম্বল তার ছিল না! অনন্যপায় হয়ে স্ত্রী হযরত জয়নাব এর কাছে খবর পাঠালেন! হযরত জয়নাব তাঁর গলার হার খুলে পাঠিয়ে দিলেন! এ হারটি হযরত খাদিজা রা.কন্যাকে বিয়ের সময় দিয়েছিলেন! প্রিয়তমা পত্নী হযরত খাদিজার স্মৃতিবিজড়িত হারের উপর বৃষ্টি পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই মহানবী সা.র পবিত্র নয়নযুগল অশ্রুসিক্ত হয়ে গেল! আদ্র কন্ঠে সাহাবীদের বললেনঃ যদি তোমরা হারটি জয়নবকে ফিরিয়ে দাও তবে ভালো হয়! সাহাবীরা অত্যন্ত হৃষ্টচিত্তে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন! পুত্র হযরত ইব্রাহিম এর মৃত্যুর সময় মহানবী সা.এর পবিত্র চোখ অশ্রু প্লাবিত হয়ে উঠেছিল! কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘চোখ অশ্রু বর্ষণ করছে, অন্তর শোকে অভিভূত, কিন্তু মুখে আমি সে কথাই উচ্চারণ করব, আল্লাহপাক যা পছন্দ করেন’! নিজের পরিবারের শিশুদের মাঝে মহানবী সা. এর স্নেহ-মমতা সীমাবদ্ধ ছিল না, সাধারণভাবে সব শিশুর প্রতি তাঁর অন্তরে স্নেহের ফল্গুধারা সদা প্রবাহিত থাকতো!
মহানবী সা.র পবিত্র স্ত্রীগণের সংখ্যা নয়ে পৌঁছেছিল! তন্মধ্যে প্রকৃতির সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী স্বভাব ও রুচির বিস্তর পার্থক্য ছিল! পরস্পরের মধ্যে মানব সুলভ হিংসা বিদ্বেষ এবং মান-অভিমান ও ছিল! অভাব-অনটন এবং কঠিন দারিদ্র্য ছিল মহানবী সা.র জীবনের চিরসঙ্গী! ফলে স্ত্রীগণের যজ্ঞ ভরণপোষণের ব্যবস্থা হতোনা! তাই তাঁদের অভিযোগের সুযোগ হত! কিন্তু এই অবস্থায় দিনাতিপাত করে সদা প্রফুল্ল চেহারা মোবারক এ কখনো কোনো বিরক্তির ছাপ প্রকাশ পেত না! হযরত খাদিজার সঙ্গে ছিল তাঁর সীমাহীন ভালোবাসা! খাদিজার সঙ্গে যখন বিয়ে হয় তখন রসূলুল্লাহ সা.ছিলেন নবীন যুবক এবং খাদিজা ছিলেন মধ্যবয়সী পৌড়া! তা সত্ত্বেও তাঁর জীবনকাল পর্যন্ত মহানবী সা.আর কোন বিয়ে করেননি! মৃত্যুর পরও খাদিজার কথা কখনো তিনি ভুলতে পারেননি! খাদিজা রা.র প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলেই তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে উঠতেন! হযরত খাদিজার পর সর্বপেক্ষা প্রিয় ছিলেন হযরত আয়েশা রা.! তবে এ ভালোবাসার ভিত্তি রুপ যৌবন ছিলনা! কেননা রূপে যৌবনে হযরত সাফিয়া রা. ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ! অন্যান্য স্ত্রীগণ ও কোন দিক দিয়েই খাটো ছিলেন না! হযরত আয়েশার প্রাধান্য লাভের কারণ ছিল তাঁর দৃষ্টি, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, গভীর প্রজ্ঞা এবং শরীয়তের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে তাঁর অপূর্ব পর্যবেক্ষণ শক্তি! একবার অন্যান্য বিবিগন হযরত ফাতেমা কে মধ্যস্থ করে অভিযোগ উত্থাপন করলেন, মহানবী সা.অণ্যান্য সবার তুলনায় আবু বকরতনয়াকে কেন বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন? অভিযোগের জবাবে মহানবী সা.কন্যাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বৎস, আমি যাকে পছন্দ করি, তুমি কি তাঁকে পছন্দ করো না’? কন্যা হযরত ফাতেমার পক্ষে এটুকুই যথেষ্ট ছিল! তিনি ফিরে এসে সৎ মাতাগণকে বললেন, আমি এ ব্যাপারে আর কোনদিন অংশগ্রহণ করতে পারব না! এরপর হযরত জয়নাবকে প্রশ্ন উত্থাপন করার জন্য ধরা হলো! রূপে-গুণে তিনিও হযরত আয়েশার চাইতে কোন অংশেই খাটো ছিলেন না! একদিন তিনি বিবিগনের উপস্থিতিতেই প্রশ্ন উত্থাপন করলেন! তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে প্রশ্নটি উত্থাপন করে যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, হযরত আয়েশাকে যে প্রাধান্য দেয়া হয় তিনি তাঁর মোটেও উপযুক্ত নন! হযরত আয়েশা ও মনোযোগের সঙ্গে জয়নবের বক্তব্য শুনছিলেন এবং বারবার মহানবী সা.এর প্রতি দৃষ্টিপাত করে চেহারা মোবারকের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করে যাচ্ছিলেন! হযরত জয়নাব এর বক্তব্য শেষ হলে মহানবী সা.আয়েশাকে জবাব দেওয়ার অনুমতি প্রদান করলেন! তিনি এমন হৃদয়গ্রাহী যুক্তি পেশ করলেন যা শুনে হযরত জয়নবের ও মাথা শ্রদ্ধায় নত হয়ে পড়লো! মহানবীর সা. শুধু মন্তব্য করলেন, ‘হবে না কেন, সে যে আবুবকরের কন্যা’! মহানবী সা.র এরশাদ হলো, বিয়ের সময় চারটি দিক দেখা হয় বংশ,ধন, ধর্ম এবং রূপ! তবে তোমরা সর্বাবস্থায় ধার্মিকতাকে অগ্রাধিকার দিও! মহানবী সা. স্বীয় স্ত্রীগণের মধ্যে তাঁকেই বেশি পছন্দ করতেন যাঁর দ্বারা দ্বীনের খেদমত বেশি হতো! স্ত্রীগণ একান্ত সান্নিধ্যের সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন! জীবনে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সমস্ত দিক সম্পর্কে তাঁরা বেশি ওয়াকিবহাল ছিলেন! ব্যবহারিক জীবনের অপ্রকাশ্য দিক সম্পর্কে তাঁদের বর্ণনাই উম্মতের জন্য একমাত্র নির্ভরযোগ্য দলিল হিসাবে গ্রহণ করা হতো! স্ব স্ব যোগ্যতা অনুসারে তাঁরা এ বিষয়ে পূর্ণ খেদমত করে গেছেন! শরীয়তের বিভিন্ন দিক গভীরভাবে অনুধাবন করা এবং সর্বোচ্চ মেধা অনুযায়ী তা প্রকাশ করার মধ্যে যে তারতম্য হত বিবিগনের পারস্পরিক মর্যাদার তারতম্য নির্ধারিত হওয়ার এটাই ছিল প্রধান ভিত্তি! অসাধারণ ধীশক্তি এবং শরীয়তের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা যে পরিচয় হযরত আয়েশা রা.প্রদান করেছেন অনেক বিশিষ্ট সাহাবীর তুলনায় তা বেশি ওজনই বলে মনে হতো! শরীয়তের অনেক সূক্ষ্ম প্রশ্নে হযরত আয়েশার অভিমতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতো! একই ভিত্তিতে হযরত আয়েশা উম্মতের মধ্যে এক অনন্য মর্যাদার আসন লাভ করতে সমর্থ হয়েছেন!মহানবী সা.এর সাধারন অভ্যাস ছিল প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিবিগনের ঘরে যেতেন এবং কিছু সময় তাঁদের মাঝে অবস্থান করতেন! যাঁর ঘরে যেদিন রাত্রিযাপন করার পালা হতো শেষ পর্যন্ত সে ঘরেই থেকে যেতেন! এটি আবু দাউদের বর্ণনা! যারকানিতে হযরত উম্মে সালমার বরাত দিয়ে বর্ণিত হয়েছে যে, প্রথম হযরত উম্মে সালমার ঘরে যেতেন! তারপর একে একে প্রত্যেক বিবির ঘরে গিয়ে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলতেন! কোন কোন বর্ণনায় এমনও দেখা যায় যে যেদিন যে ঘরে অবস্থানের পালা আসতো সে ঘরে চলে যেতেন এবং অন্যান্য বিবিগন সেঘরে এসেই সমবেত হতেন এবং নানা আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় কাটাতেন! রাত্রি গভীর হলে সবাই যার যার ঘরে চলে যেতেন! এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে বিবিগনের মধ্যে সাময়িক হিংসা-বিদ্বেষ দেখা দিলেও কোনো বিরোধী স্থায়ী হতো না! বরং সবাই একত্রিত হয়ে প্রতিদিনই একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মহানবী সা.এর পবিত্র সান্নিধ্য উপভোগ করতেন! বিবিগনের পারস্পরিক সম্পর্কে যে সমস্ত নাজুক পরিস্থিতির উদ্ভব হত মহানবী সা.ধৈর্য ও বিচক্ষণতার সঙ্গে তার মোকাবিলা করতেন! প্রত্যেকেরই মেজাজে রক্ষা করে চলতেন! হযরত সাফিয়া রা.ভাল রান্না করতে পারতেন! একদিন তিনি কিছু খাবার রান্না করে মহানবী সা.এর খেদমতে পাঠালেন! মহানবী সা.তখন হযরত আয়েশার ঘরে অবস্থান করছিলেন! আয়েশা রা.রাগান্বিত হয়ে খাবার শুদ্ধ পেয়ালাটি মাটিতে ছুড়ে মারলেন! পেয়ালা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল! হযরত সাফিয়া বিষয়টি জানতে পারলে দুঃখ পাবেন ভেবে মহানবীর সা.পেয়ালার ভাঙ্গা টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিলেন এবং অন্য একটি পেয়ালা নিয়ে হযরত সাফিয়ার ঘরে পাঠিয়ে দিলেন! একবার হযরত আয়েশা রা.কোন কারণে রাগান্বিত হয়ে মহানবী সা.এর সঙ্গে চড়াস্বরে কথা বলছিলেন! এমন সময় হযরত আবু বকর রা.উপনীত হলেন! আয়েশার আচরণে তিনি রাগান্বিত হয়ে বললেন, তুমি মহানবীর সা.ল্লাহু সালাম এর সঙ্গে চেঁচিয়ে কথা বলার সাহস করো! একথা বলে তাঁকে চপোটাঘাত করতে উদ্যত হলেন! মহানবী সা.অবস্থা বেগতিক দেখে দুজনের মাঝখানে এসে আয়েশাকে আড়াল করে দাঁড়ালেন! হযরত আবুবকর রাঃ লজ্জিত হয়ে রাগান্বিত অবস্থায় ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন! মহানবী সা.তখন আয়েশাকে লক্ষ্য করে বললেন, দেখো আজ আমি কেমন করে তোমাকে বাঁচিয়ে দিলাম! একদিন মহানবী সা.হযরত আয়েশার সঙ্গে কথা বলতে বলতে মন্তব্য করলেন, তুমি কখন খুশি থাকো আর কখন রাগান্বিত হও আমি অনুভব করতে পারি! জিজ্ঞেস করলেন, তা কিভাবে? জবাব দিলেন, যখন তুমি খোশমেজাজে থাকো তখন কসম করতে গিয়ে বল মোহাম্মদের আল্লাহর কসম! আর যখন তোমার মেজাজ খারাপ হয় তখন বল যে ইব্রাহিমের আল্লাহর কসম! হযরত আয়েশা রা. হেসে জবাব দিলেন, ‘হাঁ ইয়া রসুলুল্লাহ সা.!আমি তখন আপনার নাম ছেড়ে দিই’!
বিশেষ কোন ব্যক্তি হয়তো নিজে কৃচ্ছসাধন করতে পারেন, কঠিনতর কষ্ট সহ্য করতে পারেন, দুনিয়ার সমস্ত বাহুল্য সম্পূর্ণরূপে বর্জন করতে পারেন! কিন্তু পরিবার পরিজন বিশেষত প্রিয়তম সন্তান-সন্ততিকে অনুরূপ কঠোরতাপূর্ণ জীবনের সমভাবে অভ্যস্ত করা সম্ভবপর হয় না! তাই দেখা যায় যে, যারা বৈরাগ্য পূর্ণ জীবনের সাধনা করেছেন তাঁদের অধিকাংশই স্ত্রী পুত্র পরিজনের সংশ্রব বর্জন করে তা করেছেন! অনেকে হয়তো পারিবারিক জীবনের ঝামেলা থেকে মুক্ত থেকেছেন! সাধনা জগতের ইতিহাসে একমাত্র মোহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ সা.এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি এ নিয়মের সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম করে দুনিয়াবাসীর সামনে একটি অনন্য নজির স্থাপন করে গেছেন! তাঁর নয় জন স্ত্রীর সংসার ছিল! এদের অধিকাংশই ছিলেন ঐশ্বর্যের মাঝে লালিত-পালিত বিশিষ্ট সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ে! সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই উত্তম খাদ্য এবং জাঁকজমকপূর্ণ গহনা পোশাকের প্রতি তাঁদের আকর্ষণ সৃষ্টি হওয়া ছিল স্বাভাবিক! এঁদের মধ্যে কয়েকজন কোমলমতি অল্পবয়স্কা ও ছিলেন যাঁদের উত্তম আহার, জমকালো পোশাকের হাতছানি সহজেই আকৃষ্ট করতে পারত! স্ত্রী এবং সন্তানের প্রতি মহানবী সা.র স্নেহ-মমতা ও ছিল সীমাহীন! ধর্মের নামে তথাকথিত বৈরাগ্যসাধনে তিনি মূলোৎপাটন করেছিলেন! অধিকন্তু বিজয় অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে ধন-ঐশ্বর্যর কোন অভাব ছিল না! কিন্তু তা সত্বেও মহানবী সা.যেমন কৃচ্ছতা পূর্ণ জীবনের অনুশীলন করতেন, স্ত্রী পরিবার-পরিজনের প্রত্যেকেই সেরূপ কৃচ্ছতাপূর্ণ জীবনে অভ্যস্ত করে তুলেছিলেন! নিজে যেমন কোনোদিন পার্থিব কোন ভোগবিলাসের প্রতি আকৃষ্ট হননি! তেমনি পরিবারের কোনো সদস্যকেও সেদিকে আকৃষ্ট হওয়ার সুযোগ দেননি! বরং অবিরাম সাধনার ফলে পরিবারের প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যেই তাঁর কৃচ্ছতাপূর্ণ চরিত্রের সর্বোত্তম বিকাশ সম্ভবপর হয়েছিল! হযরত ফাতেমা রা.ছিলেন মহানবী সা.এর প্রিয়তমা সন্তান! এ দুনিয়ায় ফাতেমার চেয়ে অধিক স্নেহ মমতা আর কেউ লাভ করতে সমর্থ হয়নি! এতদসত্ত্বেও এ মমতার মাধ্যমে হযরত ফাতেমা রাঃ পিতার কাছ থেকে পার্থিব কোন উপকার পাননি! শাহানশাহে মদিনার প্রিয়তম কন্যার সাংসারিক জীবনের সাধারণ আলেখ্য ছিল এরূপ যে, আটার চাক্কি পিষতে পিষতে হাতে কড়া পড়ে গিয়েছিল! মশক বয়ে পানি তুলতে তুলতে বুকে কোমরে দাগ পড়ে গিয়েছিল! ঘর ঝাড়ু দেওয়া, কাপড় কাচা থেকে শুরু করে গৃহস্থালির প্রত্যেকটি কাজ নিজের হাতে করতে হতো! চুলা ফুঁকতে ফুঁকতে সোনার বদন ধোঁয়ায় কালো হয়ে যেত! এ অবস্থায় ও স্নেহময় পিতার কাছে কড়া পড়া হাত দেখিয়ে একটি দাসী চাইলে পরিস্কার জবাব এলো, ‘মা, বাইতুল মালের সকল সম্পদ গরীব মুসলমানদের হক! এর মধ্য থেকে তোমাকে আমি কিছুই দিতে পারব না’! প্রাণাধিক কন্যাকে একদিন দেখতে এলেন! তখন তাঁর পরনে এমন জীবন একটা চাদর ছিল যে মাথা ঢাকলে শরীরের অন্যান্য অংশ উন্মুক্ত হয়ে যাচ্ছিল! কন্যাকে আরাম-আয়েশের যেকোনো স্পর্শ থেকে এমনভাবে দূরে রাখতেন যে নিজে তো দিতেনই না, সামান্য ভোগবিলাসের স্পর্শ যুক্ত কোন কিছু তাঁরা নিজেরা সংগ্রহ করলেও অসন্তুষ্ট হতেন! স্ত্রীগণের মধ্যে সবার চাইতে আদরিনী ছিলেন হযরত আয়েশা! কিন্তু সে আদরসোহাগ কোনদিনই রঙিন পোশাক বা সুন্দর অলংকারের আকারে প্রকাশ লাভ করেনি! হযরত আয়েশার নিজের বর্ণনা, আমাদের প্রত্যেকেরই একজোড়া কাপড়ের অতিরিক্ত কোনো পোশাক ছিল না!
সার্বক্ষণিক ব্যস্ততার জন্য মহানবী সা.সাংসারিক ব্যবস্থাপনায় মনোনিবেশ করতে পারতেন না! গৃহস্থালি সকল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ছিল হযরত বেলালের উপর! তিনি পরিবার-পরিজন এবং মেহমানগণের জন্য আহারের ব্যবস্থা করতেন! জিনিসপত্র যা আসত তা তিনি হাতে রাখতেন! মহানবী সা.এর হাতে যা আসত তার শেষ ভগ্নাংশটি পর্যন্ত ব্যয়িত হয়ে না যাওয়া পর্যন্ত তিনি শান্তি পেতেন না! অনেক সময় মেহমান এবং দরিদ্র প্রার্থীদের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে হযরত বেলাল রা কে ধার কর্জ করতে হত! বনি নজীরের খেজুর বাগান উম্মুল মোমেনিনগনের জন্য একটি নির্দিষ্ট অংশ ধার্য করে রাখা হয়েছিল! এর আয় থেকেই প্রত্যেকের সারাবছরের যৎসামান্য খরচপত্র চলে যেত! খয়বর বিজয়ের পর সেখান থেকে জনপ্রতি বার্ষিক আশি ওয়াসাক খেজুর এবং কুড়ি ওয়াসাক জব বরাদ্দ করে দেওয়া হয়েছিল! হযরত ওমর রা.র খেলাফত আমল পর্যন্ত উম্মুল মোমেনিনগনের জন্য এবরাদ্দ ঠিক রাখা হয়েছিল! এভাবেই অতিবাহিত হয়েছিল উম্মত মাতাগণের সাংসারিক জীবন!
সর্বশ্রেষ্ঠ রসূল হযরত মুহাম্মদ সা.সর্বকালের সমগ্র মানব গোষ্ঠীর জন্য সর্বোত্তম আদর্শ, শ্রেষ্ঠতম পথপ্রদর্শক! তাঁর অনুকরণ ও অনুসরণের মধ্যেই নিহিত আছে ইহকালীন ও পরকালীন জীবনের কল্যাণ ও শান্তি! তিনি দ্বীন ইসলামের জীবন্ত প্রতীক! তাঁর পবিত্র জীবন পবিত্র কোরআন এর বাস্তব রূপ! তাই ধর্ম বিশ্বাসী মানুষের ইসলামী জীবন গঠনের জন্য তাঁর জীবন চারিত বা সীরাত সম্পর্কিত জ্ঞান আহরণ অপরিহার্য! ইবনে হিশাম র.(মৃত্যু 218 হিজরী) সীরাত শাস্ত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পথিকৃৎ! তাঁর সংকলিত ‘আস সীরাতুন নববিয়্যাহ’ সংক্ষেপে সীরাত ইবনে হিশাম সুপ্রাচীন মৌলিক নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ !যার ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম! সীরাত ইবনে হিশাম মূলত আল্লামা ইবনে ইসহাক এর সর্বাধিক প্রামাণ্য ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ সিরাত ইবনে ইসহাক এর সংক্ষিপ্ত রূপ! আল্লামা ইবনে ইসহাক এ গ্রন্থ প্রণয়ন করেন আব্বাসী খলিফা মামুনের শাসনামলে! এতে রয়েছে হযরত আদম আ.থেকে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সা.পর্যন্ত বিস্তারিত বর্ণনা! এর থেকে ইবনে হিশাম তাঁর গ্রন্থের সংকলন করেছেন হযরত ইসমাইল আ.থেকে হযরত মুহাম্মদ সা.পর্যন্ত ঘটনাবলী! মহানবী সা.এর পবিত্র জীবনকে কেন্দ্র করে যত পুস্তক এযাবৎ বিভিন্ন ভাষায় রচিত হয়েছে, তন্মধ্যে ইবনে ইসহাক প্রণীত সীরাত গ্রন্থটি অন্যতম! মহানবী সা.এর প্রাচীনতম প্রামাণ্য জীবনী গ্রন্থ ‘সিরাতুর রসূলুল্লাহ’ রচয়িতা হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত! প্রাথমিক যুগের সীরাত গ্রন্থ হিসেবে এর একটা আলাদা মর্যাদা, অবস্থান রয়েছে! বলতে গেলে তাঁকে অনুসরণ করেই পরবর্তীকালে সীরাত গ্রন্থ সমূহ প্রণীত হয়েছে! এদিক দিয়ে তাঁকে সীরাত শাস্ত্রের পথিকৃৎ বলা যায়! তবে তাঁর রচিত পাণ্ডুলিপি ইবনে হিশাম এর মাধ্যমে আমাদের কাছে পৌঁছেছে! ঢাকার ইসলামিক ফাউন্ডেশন এই সীরাত গ্রন্থখানি 1994 সালে বাংলায় অনুবাদ করে চার খন্ডে প্রকাশ করে! সীরাত গ্রন্থ রচনার মূল প্রেরণা হলো মহানবী সা.এর হুবহু অনুসরণের মাধ্যমে নিজের ব্যবহারিক জীবনকে সুমহান আদর্শের অনুসরণে গড়ে তোলার সুযোগ লাভ করা এবং দুনিয়া ও আখেরাতের সাফল্য লাভ করা! আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক 85 হিজরীতে মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৫১ হিজরীতে বাগদাদে মৃত্যুবরণ করেন! তিনি সংক্ষেপে ইবনে ইসহাক নামে মহানবী সা. এর প্রাচীনতম প্রামাণ্য জীবনী ‘সীরাতুর রসূলুল্লাহ’ এর রচয়িতা হিসেবে পরিচিত! এর মূল গ্রন্থ সংরক্ষণ করা হয়নি! তাঁর গ্রন্থের যে চারটি অনুলিপি করা হয়েছিল তার মধ্যে দুটো করেছিলেন তার ছাত্র আল বাককাই! একটি অনুলিপি সম্পাদনা করেছিলেন ইবনে হিশাম! সম্পাদনার খাতিরে কোথাও তিনি মূল গ্রন্থের পাঠ সংক্ষেপ করেছেন, কোথাও বিশ্লেষণ করেছেন আবার কোথাও পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করেছেন! ইবনে ইসহাক এর মূল ‘সীরাতুর রসূলউল্লাহ’ সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞানের মূলসূত্র ইবনে হিশাম সংকলিত ও সম্পাদিত গ্রন্থটি! যৌবনকাল ইবনে ইসহাক মদিনায় অতিবাহিত করেন! তারপর মিশর ও ইরাক যান! তিনি সারা জীবন ধরে হযরত মুহাম্মদ সা.এর জীবনী ও ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সর্বপ্রকার ঘটনা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও সংকলনে নিয়োজিত ছিলেন! তাঁর সেই সাধনা ও নিষ্ঠার ফসল সীরাত গ্রন্থ! ইবনে ইসহাকের সীরাত গ্রন্থের পূর্বে বেশকিছু মাগাযী পুস্তকের অস্তিত্বের কথা জানা যায়! মাগাজি হলো আরবি সাহিত্যে প্রচলিত ধর্ম যুদ্ধ সম্পর্কিত বীরত্বব্যঞ্জক ইতিহাস! বিভিন্ন ঘটনা বলি সংক্ষিপ্ত নোট আকারে লিখে রেখেছেন তাঁরা! এঁদের এই সংক্ষিপ্ত বিবরণী এবং অন্যান্য সূত্রের সাহায্যে ইবনে ইসহাক তাঁর গ্রন্থ প্রণয়নের জন্য গ্রহণ করেছিলেন! ইবনে ইসহাক মহানবী সা.র যে সীরাত গ্রন্থ রচনা করেছেন তা এই সব মাগাযী সাহিত্যের ধারা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক! তিনি রসূল সা.কে একটি ঐতিহাসিক বিবর্তনের নায়ক রূপে চিত্রিত করেন, যে বিবর্তন চূড়ান্ত পরিণতি পরিগ্রহ করে ইসলামের অভ্যুদয়ে! প্রথমে তিনি আরব ও মক্কা নগরীর ইতিহাস লেখেন! তারপর মুহাম্মদ সা.এর বংশ, বনু কুরায়শের ইতিহাস এবং সর্বশেষে তাঁর সংগ্রাম, ইসলাম প্রচার ও চূড়ান্ত বিজয়ের কাহিনী বর্ণনা করেন! সীরাত রচনায় ইবনে ইসহাক তত্ত্বগত বিশুদ্ধতা সম্বন্ধে বিশেষ সর্তকতা অবলম্বন করেছেন! সীরাতের প্রথম ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় 1955 খ্রিস্টাব্দে লন্ডন থেকে! অনুবাদক ছিলেন এ গিলাউম! ইবনে হিশাম এর জন্ম বসরাতে! কিন্তু বাল্যকালেই তিনি পরিবারের সঙ্গে মিশরে চলে যান! জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি সেখানেই অতিবাহিত করেন! ইবনে ইসহাক র.রচিত ‘সীরাতুর রসূলুল্লাহ’র সংশোধনকারী হিসাবে ইবনে হিশাম র.জগতে প্রসিদ্ধি লাভ করেন! তিনি ‘আস সীরাতুন নববিয়্যাহ’ হতে বর্ণিত কতিপয় কবিতার সঠিক লিপিবদ্ধ করেন! নতুন কবিতা তাতে যোগ করেন! কঠিন শব্দ ও বিশেষ বিশেষ শব্দ সমূহের বিস্তারিত ব্যাখ্যা সংযোজন করেন এবং কোথাও কোথাও বংশতালিকা সংশোধন করেন! অর্থাৎ গ্রন্থটির যা অপূর্ণতা ছিল তিনি তা পূরণ করেন! এতে ইবনে হিশাম র.এর সংস্করণ এর মাধ্যমে গ্রন্থটির জনপ্রিয়তা অধিকহারে বৃদ্ধি পেতে থাকে! ইবনে হিশাম র.র অনবদ্য রচনা সীরাতুন্নবী এক অমর কীর্তি! পরবর্তীকালে সীরাতে রসূল এর উপর পৃথিবীতে বিভিন্ন ভাষায় যত গ্রন্থ রচিত হয়েছে সবগুলো গ্রন্থের মূল ভিত্তি ইবনে হিশাম র. অমর গ্রন্থ! ঐতিহাসিক ধারা বিবরণী সাথে পবিত্র কোরআন নাজিলের ধারাবিবরণী এতে সন্নিবেশিত হয়ে গ্রন্থের মাহাত্ম্য অনেক গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে!
প্রচলিত অর্থে ইতিহাস কি জিনিস আরবদের কাছে তা স্পষ্ট ছিল না! তাদের কাছে ইতিহাস বলতে বুঝাতো কেবল বিভিন্ন গোত্রের পূর্বপুরুষদের নামের ধারাবাহিক তালিকা, তাদের বীরত্বগাঁথা, যুদ্ধ-বিগ্রহ ইত্যাদির বংশানুক্রমিক স্মৃতিচারণ! নিছক জনশ্রুতি নির্ভর ইতিহাস সংরক্ষণের এ ধারাটি মুহাম্মদ সা.র নবুয়তের মাধ্যমেই ইসলামের অভ্যুদয় এর আগেই অতিবাহিত হয়েছিল! সাহাবাদের কেউ যে ইতিহাস সংরক্ষণের ব্যাপারে মনোযোগী হতে পারেননি তার কারণ তাঁরা জিহাদ ও দেশজয়ের কাজে অতিমাত্রায় ব্যস্ত ছিলেন! এ কাজে সর্বপ্রথম উদ্যোগী হয়েছিলেন সাহাবীদের পরবর্তী প্রজন্ম! রসূলুল্লাহ সা.এর আমলে মুসলমানদের জীবনে যেসব ঘটনা এবং রসূল সা.এর প্রত্যক্ষ তদারকিতে যেসব যুদ্ধ-বিগ্রহ সংঘটিত হয়েছিল, তাতে সাহাবীদের মধ্য থেকে কারা কারা অংশগ্রহণ করেছিলেন, সে সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়েই তাঁদেরকে এ কাজের দিকে মনোনিবেশ করতে হয়েছিল! কিন্তু ইতিহাসের প্রচলিত ও বিস্তারিত রূপটি আত্মপ্রকাশ করে উমাইয়া যুগে! অবশ্য বনু উমাইয়ার ঐতিহাসিকদের ইতিহাস রচনায় যে একটিমাত্র উদ্দেশ্য সক্রিয় ছিল, তা হলো বনু উমাইয়াদের প্রধান প্রধান প্রশাসকদের প্রশংসা অথবা কোন এক বংশীয় বৃত্তান্ত সংগ্রহ করা যার, সাথে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ জড়িত ছিল! বিভিন্ন বর্ণনাকারীর বর্ণনা থেকে উদ্ধৃত ও সাহিত্য গ্রন্থাবলী অভ্যন্তরে বিবৃত কিছু কিছু তথ্য ছাড়া এই আমলের সংগৃহীত ইতিহাসের কোনো উপাদানই আমাদের কাছে পৌঁছেনি! এমনও হতে পারে যে আব্বাসী শাসকরা উমাইয়া শাসনামলে নিদর্শনাবলী নিশ্চিহ্ন করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ওইসব উপাদান বিনষ্ট করে দিয়েছিল! তাছাড়া এটিও একটি বাস্তব ব্যাপার যে আব্বাসী যুগ না আসা পর্যন্ত ইসলামের সত্যিকার ইতিহাস প্রণয়নের পথ সুগম হয়নি! এ যুগেই সাধারণ মানুষের ও শাসক শ্রেণীর জীবন বৃত্তান্ত রচিত হয়েছে! সবচেয়ে বস্তুনিষ্ঠ কথা এই যে, ঐতিহাসিক তত্ত্ব ও তথ্য উপাদান নিয়ে সর্বপ্রথম যে গ্রন্থের আবির্ভাব ঘটে, তা হলো মহাগ্রন্থ আল কোরআন! আল্লাহর আয়াতসমূহ বর্ণিত বিভিন্ন ঘটনাবলী থেকে শিক্ষণীয় বিষয় তুলে ধরা এই গ্রন্থের অন্যতম ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য! এরপর যখন মুসলিম মনীষীগণ পবিত্র কোরআনের সংগ্রহ তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও হাদীস সংকলনের কাজে নিয়োজিত হন, আর একাজ সম্পাদনের লক্ষ্যে যখন তাঁরা কোরআনের আয়াতসমূহ নাযিলের স্থান-কাল, উপলক্ষ এবং এতদসংক্রান্ত ঘটনাবলী রহস্য উদঘাটনের তীব্র প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন, এমনকি হাদিস সংগ্রহ করতে গিয়ে যখন তাঁরা অনুরূপ প্রয়োজন অনুভব করেন, তখন তাদেরকে রসূলুল্লাহ সা.এর জীবনী রচনার কাজেও ব্রতী হতে হয়! কেননা এটাই হচ্ছে উপরোল্লিখিত যাবতীয় বিষয়ে নির্ভুল তথ্য ও তত্ত্বের একমাত্র ভান্ডার এবং প্রশস্ততম উৎস! সীরাত বলতে বোঝায় রসূলুল্লাহ সা.র নবুওয়াত লাভের আগে, নবুয়্যাতের পটভূমি রচনাকারী ঘটনাবলী, তাঁর জন্মের আগে সংগঠিত রিসালাতের নিদর্শন সম্বলিত ঘটনাবলী, তাঁর জন্ম, জন্মের পর নবুয়াত কাল পর্যন্ত তাঁর লালন-পালন, আল্লাহর দ্বীনের প্রতি মানবজাতিকে আহ্বান, আহ্বানের পর ইসলামের প্রচার ও প্রসারের বিরোধিতা, তাঁর ও তাঁর বিরোধীদের মধ্যে সংঘটিত বাকযুদ্ধ ও সশস্ত্র যুদ্ধ এবং ইসলামের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হওয়া পর্যন্ত ইসলামের দাওয়াত গ্রহণকারীদের বিবরণ সহ রসূল সা.এর সমগ্র জীবন! সীরাতের সূচনা হয় রসূলুল্লাহ সা.এর বংশ পরিচয় দিয়ে! কিন্তু এই বংশপরিচয় সংগ্রহ করতে গিয়ে আরবের নামকরা ও শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গের বংশ পরিচয় তাদের প্রাক-ইসলামী কর্মকান্ডের বিবরণ দেওয়া অনিবার্য হয়ে পড়ে! সেইসাথে অপরিহার্য হয় তাদের আদত অভ্যাস, ঐতিহ্য, পূজা-উপাসনা এবং তৎকালীন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীর উল্লেখও! এসব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা হলো, আব্দুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম কর্তৃক জমজম কূপের পুনর্খনন! নবীর বংশ পরিচয় ছাড়াও তাঁর জীবনের অন্য যেসব বিষয় সীরাতের আওতাভুক্ত হলো, তা হল রসূলুল্লাহ সা.এর জন্ম, তাঁর লালন-পালন, তাঁর নবুওয়াত লাভ, যাঁরা তাঁর দাওয়াতে সাড়া দেন এবং তাঁর রিসালাতে বিশ্বাস স্থাপন করেন, তাঁদের বিবরণ! ইসলামের প্রচার ও প্রসারের কাজে রসূলুল্লাহ সা.ও মুসলমানগন কাফেরদের হাতে যে জুলুম নির্যাতন ভোগ করেন তার বিবরণ! দ্বীন রক্ষার খাতিরে মুসলমানদের আবিসিনিয়ায় প্রথম দফা ও দ্বিতীয় দফা হিজরত! তায়েফের বনূ সাকীফ ও অন্যান্য স্থানে অবস্থানরত বিভিন্ন গোত্রের নিকট রসূলুল্লাহ সা. কর্তৃক ইসলামের দাওয়াত পেশ ও সহযোগিতার আহ্বান! ইয়াসরিববাসী কর্তৃক সর্বান্তকরণে ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ, তারপর রসূলুল্লাহ ও তাঁর অনুসারী মুসলমানদের সেখানে হিজরত, রাসূলুল্লাহ সা. মদিনার ইহুদিদের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনা ও সম্পাদিত চুক্তি সমূহ, ইহুদিগন কর্তৃক সেই চুক্তি লঙ্ঘনের পরিণামে তাদের উপর ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসা এবং তার ফলে ইয়াসরিবের মাটি থেকে ইহুদীদের উচ্ছেদ ও আল্লাহর পক্ষ হতে মুসলমানদের চূড়ান্ত বিজয়! এরপর মদিনা শরীফ থেকে মুসলিম সেনাদলগুলো বিশ্বের দিক দিগন্তে ছুটে যায় সত্য ন্যায় ও ঈমানের পতাকা হাতে নিয়ে, দিকে দিকে দ্রুত প্রতিনিধিদল প্রেরিত হয় শান্তির বার্তা ও ইসলামের দাওয়াত নিয়ে! আর এর ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে মহান বিজয় ও সাহায্য এবং আল্লাহর দিনের ভিতরে মানুষ প্রবেশ করে দ লে দলে! এরপর সীরাতের অঙ্গীভূত হয় রসূল সা.এর সহধর্মীনিদের বৃত্তান্ত, রসূল সা.এর রোগগ্রস্ত হওয়া এবং হযরত আয়েশা রা.এর গৃহে তাঁর সেবা-শুশ্রূষা ও অবশেষে ইন্তেকাল! এরপর সাকীফায়ে বানূ সায়েদায় সংঘটিত ঘটনা, হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাঃকে মুসলমানগন কর্তৃক সর্বসম্মতভাবে রসুলের খলিফা হিসাবে নির্বাচন এবং রসূলুল্লাহ সা.এর দেহ মোবারক এর দাফন-কাফন ও কবি হাসসান ইবনে সাবিত কর্তৃক তাঁর স্মরণে শোক কবিতা পাঠ!ইবনে হিশাম স্বীয় গ্রন্থ ‘আস সীরাতুন নববিয়্যাহ’ নামক নবী জীবনীতে উল্লেখিত বিষয়াবলী নিয়ে আলোচনা করেছেন!
মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একসময়ের অধ্যাপক মাওলানা শফিউর রহমান মোবারকপুরী র আরবি ভাষায় রচিত ‘আর রাহীকুল মাখতুম’ বা ‘মোহরাঙ্কিত জান্নাতী সুধা’ মহানবী সা.এর একটি বিখ্যাত জীবনী গ্রন্থ! ১৯৭৮ সালের রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামী আয়োজিত নবী সা.এর জীবনীর উপর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় জমা পড়া ১১৮২ গ্রন্থের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছিল এই গ্রন্থটি! পরবর্তীতে লেখক ১৯৮০ সালে এটি উর্দুতে ও প্রকাশ করেন! মহানবী সা.এর এই বিশ্বখ্যাত জীবনী গ্রন্থটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে! ১৯৭৬ সালে বিশ্ব ইসলামী সংস্থা রাবেতা আল আলম আল ইসলামীর প্রথম সীরাত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় করাচিতে! বিশ্ব ইসলামী সংস্থার সম্মেলনে সৌদি আরবের বেশ গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রণী ভূমিকা ছিল! সীরাত অনুষ্ঠানের সমাপ্তি লগ্নে সম্মেলনে উপস্থিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রখ্যাত ওলামাদের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানানো হয় যে, মহানবী সা.এর জীবনী সীরাত গ্রন্থ রচনার একটি প্রতিযোগিতা হবে! সেখানে ওলামাগণ বিশ্বের যেকোনো ভাষায় মহানবী সা.এর জীবনী গ্রন্থ লিখতে পারবেন! সেরা পাঁচ জন সীরাত লেখককে যথাক্রমে পঞ্চাশ হাজার, চল্লিশ হাজার, তিরিশ হাজার, কুড়ি হাজার এবং দশ হাজার সৌদি রিয়াল দ্বারা পুরস্কৃত করা হবে! এই মর্মে রাবেতার নিজস্ব মুখপত্র আখবার আল আলমে ইসলামীর কয়েকটি সংখ্যায় এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়! মহানবী সা.র পবিত্র আদর্শ হচ্ছে চিরপুরাতন এর পথ বেয়ে আসা চিরনূতন! সর্বোচ্চ দাতার এক বিশেষ অনুগ্রহ এবং কিয়ামত দিবস পর্যন্ত বিদ্যমান এক শাস্বত পাথেয়! অবিনশ্বর আদর্শের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আলোচনা করা এবং পুস্তক আকারে তা লিপিবদ্ধ করার প্রচেষ্টা নবী সা.এর আবির্ভাবের পর থেকেই মানুষের মধ্যে প্রতিযোগিতা মূলক ভাবে চলে আসছে এবং বিভীষিকাময় কিয়ামতের সেই প্রলয়কারী ধ্বংস পর্যন্ত বহাল থাকবে! কোরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক আদর্শ এবং উদাহরণ এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা যেখানে সামান্যতম শূন্যতা, কমতি কিংবা ঘাটতির কোনই অবকাশ নেই এবং এমন একটি ছাঁচ, যে ছাঁচে সার্বিক জীবনধারা সংগঠিত এবং পরিচালিত হওয়া বিধেয়! আল্লাহ প্রদত্ত একমাত্র জীবন বিধান ইসলামের প্রত্যেকটি বিধি-বিধান অনুসরণের মাধ্যমে রসূল সা. এমন এক আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, যা সর্বকালের সর্বযুগের সকল মানুষের জন্য সমভাবে অনুসরণীয় ও অনুকরণীয়! কোরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের আশা রাখে আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে’! অতএব যারা দুনিয়া ও আখেরাতের ব্যাপারে আল্লাহ প্রদত্ত প্রদর্শিত পথে নিজেকে পরিচালিত করতে ইচ্ছুক তাদের জন্য রসূলুল্লাহ সা.এর উত্তম আদর্শ অবলম্বন ছাড়া কোনো উপায়ান্তর নেই! শুধু তাই নয় বরং তাকে অবশ্যই আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করতে হবে যে নবী সা.এর জীবন চরিত্র হচ্ছে আল্লাহর বিধান ব্যবস্থিত সরল পথ বা সিরাতুল মুস্তাকিম! সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব ও রসূল সা. জী বনের সর্বক্ষেত্রেই কোরআনে বর্ণিত বিধানাদি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সিরাতুল মুস্তাকিম বা সরল পথপ্রতিষ্ঠা করে গেছেন! নবী প্রদর্শিত পথে ধনী-নির্ধন, রাজা-প্রজা, পরিচালক- পরিচালিত, নর-নারী, শিশু- কিশোর, যুবক- বৃদ্ধ সকলের জন্যই হিদায়াত রয়েছে! অধিকন্তু আরও রয়েছে রাজনীতি, শাসন নীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, যুদ্ধ, সন্ধি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইত্যাদি ব্যাপারে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা! বর্তমানে বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায় আল্লাহ-প্রদত্ত সেই পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যখন অধঃপতনের অন্ধকারের অতল তলে হাবুডুবু খাচ্ছে তখন এটা কি তাদের জন্য উত্তম নয় যে তারা এ ব্যাপারে সতর্ক হবেন এবং শিক্ষা দীক্ষা শিল্প-সাহিত্য ও তাহজিব তামাদ্দুন সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে নবী সা.এর জীবনের চরিতকে জীবনের ধ্রুবতারা হিসেবে রেখে অগ্রসর হবেন! কেননা এটা শুধু চিন্তা ভাবনার বিষয় নয় বরং আল্লাহর পথে প্রত্যাবর্তনের এটাই হচ্ছে একমাত্র লক্ষ্য এবং এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে মানুষের যথার্থ কল্যাণ! অধিকন্তু এটাই হচ্ছে চরিত্র গঠনের উন্মুক্ত প্রান্তরে আল্লাহর কালাম কোরআন কারীমের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের শিক্ষাগত সর্বোত্তম পন্থা! যার ফলে একজন মুমিন বান্দা শরীয়তের অনুসারী হয়ে ওঠে এবং সমাজ জীবনযাপনের সকল বিষয়ে আল্লাহকে একমাত্র ব্যবস্থাপক হিসেবে গ্রহণ করে! ‘আর রাহীকুল মাখতুম’ গ্রন্থটি শাইখ শফিউর রহমান যথেষ্ট সময় শ্রম এবং কায়িক ও মানসিক শক্তি ব্যবহারের বিনিময়ে রচনা করেছেন! গ্রন্থটি অত্যন্ত উচ্চমানের নবী সা.এর জীবনচরিত বিষয়ক গ্রন্থ! এই কারণে রাবেতা আলম ইসলামী কর্তৃক নবী সা.এর জীবন চরিত বিষয়ক গ্রন্থ রচনা প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার লাভের এক দুর্লভ গৌরব অর্জন করতে সমর্থ হয়েছে! বিশুদ্ধ তথ্য ও লেখনীর গুণে গ্রন্থটি সকলের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত হয়েছে! রাবেতা আলম ইসলামী কর্তৃক নবী চরিত বিষয়ক গ্রন্থ রচনা বিজ্ঞাপন ঘোষিত হওয়ার পর পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় ১১৮২টি নবী চরিত বিষয়ে পাণ্ডুলিপি জমা পড়েছিল!যার মধ্যে আরবি ভাষায় ছিল ৮৪ টি, উর্দু ভাষায় ৬৪ টি, ইংরেজি ভাষায় ২১ টি, ফ্রান্সের ভাষায় ছিল একটি এবং হুসা ভাষায় একটি! এগুলির মধ্যে মাত্র ১৭১ টি পান্ডুলিপি প্রতিযোগিতার জন্য গৃহীত হয়েছিল! ‘আর রাহীকুল মাখতুম’ বা ‘মোহরাঙ্কিত জান্নাতি সুধা’র লেখক শাইখ সফিউর রহমান মোবারকপুরী এই সীরাত গ্রন্থ রচনা বিষয়ে লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে নবী সা.র জীবনচরিত মোহাম্মদী জীবনাদর্শ হচ্ছে এমন একটি মূল উৎস যেখান থেকে পুরাতন ইসলামী আদর্শকে নতুনভাবে পুনরুজ্জীবন দান করে! আমাদের দেশে যত সহজলভ্য জীবনচরিত আছে, তাতে বিশুদ্ধ ও সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার খুব সামান্য চেষ্টায় গ্রহণ করা হয়েছে! লেখক মন্ডলী ভক্ত হিসেবে বিশুদ্ধ, অশুদ্ধ যা তথ্য পেয়েছেন তা যাচাই না করে সেটাকেই বইয়ের পাতায় সাজিয়ে দিয়েছেন! পরিনাম স্বরূপ আমরা পেয়েছি বুযুর্গানে দ্বীনের নামে শিরক ও বিদআত এর ছড়াছড়ি! কবর পূজা, তাজিয়া পূজা, ঈদ-এ-মিলাদুন্নবী অগণিত শরীয়ত বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে রমরমা! আর এগুলোকে আসল দ্বীন হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছে! শায়খ সফিউর রহমান মোবারকপুরী মহানবী সা.এর বিশ্ব বিখ্যাত জীবনী গ্রন্থ ‘আর রাহীকুল মাখতুম’ কিতাবুস গভীর গবেষণা ও মনীষার মাধ্যমে নবী সা.এর জীবনের বাস্তব ইতিহাসকে সত্যনিষ্ঠ ভাবে তুলে ধরেছেন! তাই সারা বিশ্বে মহানবী সা.সম্পর্কে অনুসন্ধিত্সু গবেষক, পাঠকদের কাছে প্রামাণ্য পুস্তক হিসেবে এই সীরাত গ্রন্থটি বিপুলভাবে সমাদৃত হয়েছে!
কবি ও সাহিত্যিক গোলাম মোস্তফার শ্রেষ্ঠ কীর্তি তাঁর রচিত বিশ্বনবী পুস্তক! এ বিষয়ে সাহিত্য সমালোচকরা সকলেই একমত সমগ্র বাংলা সাহিত্যের এই গ্রন্থটি একটি অসাধারণ পাঠক প্রিয় গ্রন্থ! গোলাম মোস্তফা রচিত: ‘অনন্ত অসীম প্রেমময় তুমি’, ‘বাদশা তুমি দিনও দুনিয়ার’, ‘নিখিলের চির সুন্দর সৃষ্টি’, ‘হে খোদা দয়াময় রহমানুর রহিম’, ‘আমার মোহাম্মদ রাসুল’, ‘তুমি যে নূরের নবী নিখিলের ধ্যানের ছবি’ প্রভৃতি হামদ ও নাত বাংলা ঘরে ঘরে সকলের মুখে এখনও প্রচলিত! মহানবী সা.কে নিয়ে কবি গোলাম মোস্তফার বিশ্বনবী গ্রন্থটি ১৯৪২ সালে অক্টোবরে প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়! কবির জীবনকালে ১৯৬৩ সালে বিশ্বনবীর অষ্টম সংস্করণ প্রকাশিত হয়! প্রত্যেকটি সংস্করণে লেখক কিছু কিছু পরিমার্জনা ও সংযোজন করেছেন! ফলে প্রথম সংখ্যার ৫০০ পৃষ্ঠার পুস্তকটি অষ্টম সংস্করণ এসে ৫৮৪ পৃষ্ঠা হয়েছে! অষ্টম সংস্করণের ভূমিকায় লেখক নিজেই লিখেছেন, কোন পুস্তকের আটটি সংস্করণের ভূমিকা লিখিবার সৌভাগ্য খুব কম লেখক এর ভাগ্যেই ঘটে থাকে! এটা কোন গতানুগতিক জীবনীগ্রন্থ নয়! লেখক এর প্রগাঢ়ও নিষ্ঠা,গভীর ভক্তিবাদ, জ্ঞান পাণ্ডিত্য, ইতিহাস চেতনা, সর্বোপরি কবিত্বময় সাবলীলভাষা গ্রন্থটিকে যেমন অনবদ্য করে তুলেছে, তেমনি একে করেছে সর্বশ্রেণীর নিকট গ্রহণযোগ্য! কবি গোলাম মোস্তফা নিজে প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় লিখেছেন, হযরতের জীবনী সংক্রান্ত আরবি, উর্দু, ইংরেজি, বাংলা বহু গ্রন্থ দেখিবার সৌভাগ্যই হয়েছে! কিন্তু সেগুলির মধ্যে একটা বিষয়ের অভাব লক্ষ্য করিয়া নিরাশ হইয়াছি, ইমোশনাল অ্যাপিল খুব কম গ্রন্থেই দেখতে পাওয়া যায়! ফলে অধিকাংশ লেখাই হযরতের জীবনের সৌন্দর্যলোকে প্রবেশ করিতে পারে নাই! মহামানবের জীবনী শুধু ঘটনার ফিরিস্তি নয়! শুধু যুক্তিতর্কের শয্যা ও নয়! সে একটা ভক্তি-শ্রদ্ধা-বিস্ময় ও অনুভবের বস্তু! তাকে বুঝিতে হইলে যেমন চাই সত্যের আলো, বিজ্ঞানের বিচারবুদ্ধি, অপরদিকে ঠিক তেমনি চাই ভক্তের দরদ মনের সৌন্দর্যের অনুভূতি, দার্শনিকের অন্তর্দৃষ্টি আর চাই প্রেমিকের প্রেম! আশেকে রসুল না হইলে সত্যিকারে রসূলকে দেখা যায় না! লেখক এর অভিমত বিশ্বনবী সাধারণ পাঠকের জন্য নয়! এটা শিক্ষিত বিদগ্ধ পাঠকের উপযোগী! এটা সাধারণ কোনো জীবনীগ্রন্থ নয়! জ্ঞান-বিজ্ঞান, ইতিহাস, যুক্তিতর্কের মাধ্যমে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব এর জীবনী, রিসালাত, কারামত অন্য সকল মহাপুরুষের উপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য তিনি এ অমর গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন! আর বিশ্বনবীর তৃতীয় সংস্করণ এর ভূমিকায় লিখেছেন, এই আলোকের যুগে ইসলাম ও হযরত মোহাম্মদ সা.কেও উন্নত ভাবে বুঝিবার সময় আসিয়াছে! বিশ্বনবীতে আছে সেই প্রয়াস! আধুনিক দর্শন ও বিজ্ঞান সম্বন্ধে খানিকটা জ্ঞান থাকা তাই পাঠক-পাঠিকার জন্য অপরিহার্য হইয়া পড়িয়াছে! জড়বাদ, অদ্বৈতবাদ, ডায়ালেকটিক ইত্যাদি কাহাকে বলে, স্থান-কাল-পাত্র প্রভৃতি সম্বন্ধে আধুনিক বিজ্ঞানের মত কি, বৈজ্ঞানিকদের লক্ষ্য এখন কোন দিকে এসব বিষয়ে পাঠক-পাঠিকাদের সজাগ হইতে হইবে! মননশীলতার উৎকর্ষ না হইলে জাতীয় জীবন শক্তিশালী হয় না! বিশ্বনবী প্রসঙ্গে ভাষাতাত্ত্বিক ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর অভিমত, মৌলভী গোলাম মোস্তফা কবি সুপরিচিত! তাঁর নব অবদান বিশ্বনবী! বলাবাহুল্য এই বিশ্বনবী গ্রন্থটি হযরত মুহাম্মদ সা.এর একটি সুচিন্তিত প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠার জীবনচরিত! এই গ্রন্থ রচনায় গ্রন্থাকার হযরত সম্বন্ধে তাঁহার দীর্ঘকালের গভীর চিন্তা ও গবেষণার সুষ্ঠু পরিচয় দিয়েছেন! আমরা এই পুস্তক খানিতে গোলাম মোস্তফা সাহেবকে একজন মোস্তফা ভক্ত দার্শনিকভাব রূপে পাইয়া বিস্মিত মুগ্ধ হইয়াছি! ভাষাতত্ত্ব ও দার্শনিকতার দিক হইতে গ্রন্থখানি অতুলনীয় হইয়াছে!বিশ্বনবী পুস্তকের সমাপ্তি অংশে কবি গোলাম মোস্তফা লিখেছেন: এই বিশ্বের নর-নারী, এসো হিন্দু, এসো খ্রিস্টান, বৌদ্ধ এসো, নিগ্রো এসো! আজ হাতে হাত রাখি আর সেই বিশ্ব মানুষের চিরন্তন আদর্শ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সা.এর জয়গান করি-
ইয়া নবী সালাম আলাইকা
ইয়া রাসুল সালাম আলাইকা
ইয়া হাবীব সালাম আলাইকা
সালাওয়া তুল্লা আলাইকা!
তুমি যে নূরের নবী
নিখিলের ধ্যানের ছবি
তুমি না এলে দুনিয়ায়
আঁধারে ডুবিত সবি!
চাঁদ সুরুয আকাশে আসে
সে আলোয় হৃদয় না হাসে
এলে তাই হে নব রবি
মানবের মনের আকাশে
তোমারি নূরের আলোকে
জাগরণ এল ভূলোকে
গাহিয়া উঠিল বুলবুল
হাসিল কুসুম পুলকে
নবী না হয়ে দুনিয়ার
না হয়ে ফিরিশতা খোদার
হয়েছি উম্মত তোমার
তার তরে শোকর হাজার বার!

‘বিশ্বনবী’ প্রকাশিত ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে, এরই মধ্যে প্রায় ৮০ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু বিশ্বনবীর কদর পাঠকদের কাছে বিন্দুমাত্র কমেনি বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার প্রমাণ ১৯৪২ থেকে আজ পর্যন্ত অনেকগুলো সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।প্রথম খন্ডে মোট ৫৮টি পরিচ্ছেদে আলোচনা করা হয়েছে। প্রতিটি পরিচ্ছেদের আলোচনা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত, হৃদয়গ্রাহী ও প্রাঞ্জল। ‘বিশ্বনবী’ নিঃসন্দেহে একটি গবেষণাগ্রন্থ, সর্বসাধারণের বোধগম্যও। এর কোন আলোচনা যুক্তির ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েনি, আবার আবেগের বশবর্তী হয়ে কোন অযৌক্তিক কিছুকে প্রশ্রয়ও দেওয়া হয়নি।নিঃসন্দেহে ‘বিশ্বনবী’ কবি গোলাম মোস্তফা (জন্ম:১৮৯৭ খ্রি.-মৃত্যু:১৯৪৬ খ্রি.)র শ্রেষ্ঠ সাহিত্য কীর্তি। আজও এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, কবি গোলাম মোস্তফা যদি ‘বিশ্বনবী’ গ্রন্থটি ছাড়া অন্য কোনকিছু রচনা নাও করতেন তবুও যুগের পর যুগ শতাব্দীর পর শতাব্দী, বাঙালি পাঠক তথা বাঙালি মুসলিম পাঠকের কাছে তিনি বেঁচে থাকতেন, শ্রদ্ধার আসনে সমাসীন থাকতেন।
কলকাতা থেকে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ র ‘মোস্তফা চরিত’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়।ইসলামী শাস্ত্রে পন্ডিত মাওলানা আকরাম খাঁ তাঁর জ্ঞান বুদ্ধি দিয়ে তুলনামূলক বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে ‘মোস্তফা চরিত’ গ্রন্থে মুহাম্মদ সা. এর চরিত্রকে পাঠকের সামনে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন।‘মোস্তফা চরিত’ এর প্রথম সংস্করণের ভূমিকা মাওলানা আকরাম খাঁ লিখেছেন, হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সা.র জীবনী রচনা ব্যাপারে অন্যান্য লেখকগণ এযাবত সাধারণত যে পন্থা অবলম্বন করিয়াছে, আমি তাহা সম্পূর্ণরূপে বর্জন করিয়াছি! ইহাদের অধিকাংশ হযরতের জীবনের ঘটনাবলির সম্বন্ধে প্রধানত তাবরী, তবকাত,এবন হেশাম ও ওয়াকেদীর উপর নির্ভর করিয়াই ক্ষান্ত হইয়াছেন! কোরআন-হাদীসের মাপকাঠিতে এইসব বর্ণনার সত্যাসত্য নির্ধারনের চেষ্টা করেন নাই! কিন্তু সার্বভৌম মানব ধর্মের যিনি প্রবর্তক, সেই মহাপুরুষের জীবনী আলোচনায় কেবল ইতিহাসকারদের উপর নির্ভর করা আমি নিরাপদ মনে করি নাই! তাঁহাদের প্রত্যেকটি কথাকে আমি কোরআন-হাদীসের তুলাদন্ডে পরিমাপ করিয়াছি! তাঁহাদের প্রত্যেকটি বর্ণনার সত্যাসত্যের জন্য আমি কোরআন-হাদিসের আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছি! ফলে অনেক স্থলেই বহু অভিনব তথ্য অবগত হইয়াছি! একাধিক ব্যাপারে সম্পূর্ণ নতুন সত্যের সন্ধান পাইয়াছি! একদিকে অতিভক্ত ও অসতর্ক মুসলমান লেখকগণ রাশি রাশি ভিত্তিহীন ও আজগুবি গল্পগুজবের আবর্জনা দ্বারা মোস্তফা চরিতের প্রকৃত ও পবিত্র আদর্শের বিমল জ্যোতি: অজ্ঞাতসারে ঢাকিয়া ফেলিয়াছে! অন্যদিকে ইউরোপের ইসলামবিদ্বেষী লেখকগণ প্রধানত ওই সমস্ত গল্প-গুজব অবলম্বন করিয়া হযরতের পুতপবিত্র জীবনকে কলঙ্ক কালিমালিপ্ত করিবার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছে! এই উভয় শ্রেণীর লেখকগনের বর্ণনার ভিত্তিহীনতা প্রদর্শন করিয়া অকাট্য যুক্তি তর্ক সমন্বিত মীমাংসায় পৌঁছাবার জন্যই আমাকে বড় ভূমিকা লিখিতে হইয়াছে! এই অসাধ্য সাধন করিতে আমাকে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে অবিরাম নিভৃত সাধনায় সমাহিত থাকিতে হইয়াছে! এই ব্যাপারে আমাকে ইতিহাস, জীবনী, তাফসীর, হাদীস ও তাঁহার ভাষ্য প্রভৃতি হযরত এর জীবনী সংক্রান্ত উল্লেখযোগ্য অধিকাংশ গ্রন্থ আলোচনা করিতে হইয়াছে! মোস্তফা চরিত উপক্রমণিকা অংশে মাওলানা আকরাম খাঁ লিখেছেন, কোন ধর্মের বিশেষত্ব ও সত্যতা সম্পূর্ণ উপলব্ধি করিতে হইলে সেই ধর্মের প্রবর্তক যিনি, সর্বপ্রথমে তাঁহাকে সম্যকরূপে চিনিয়া ও বুঝিয়া লইতে হয়! কতকগুলি বিশ্বাস, কতগুলি অনুষ্ঠান এবং কতগুলি বিষয়ের জ্ঞান- এই ত্রিধারার একত্র সমাবেশ ফলের নামে ধর্ম! আমরা মুসলিম এবং আমাদের ধর্মের নাম ইসলাম! ইসলামের বিষয়ে সম্যকরূপে অবগত হইতে হইলে ইসলামের সত্যতা ও বিশেষত্বে বিশ্বাস স্থাপন করিতে হইলে, সর্বপ্রথমে হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা সা.র চরিত্রের মাহাত্ম্য ও বৈশিষ্ট্য গুলিকে সম্যকরূপে জ্ঞাত হইতে অন্তত জ্ঞাত হইবার চেষ্টা করিতে হইবে! ঐতিহাসিক হিসাবে জগতের সাধু সজ্জন ও মহাপুরুষগণের জীবন ও চরিত্র আলোচনার চেষ্টা করিলে প্রায়ই দেখিতে পাওয়া যায় যে, কিংবদন্তি সংকলক, ঐতিহাসিক এবং অন্ধভক্ত লেখকগণ এর দ্বারা তাঁদের প্রকৃত জীবন ও জীবনের আদর্শ স্থানীয় আসল বিষয়গুলি হয়তো একেবারে ঢাকা পড়িয়া গিয়াছে অথবা এমন পর্বত পরিমাণ কুসংস্কারও অন্ধবিশ্বাসের আবর্জনা রাশির তলে চাপা পড়িয়া গিয়াছে, যাহার উদ্ধার একেবারে অসাধ্য না হইলেও সহজসাধ্য ও নহে! মহাপুরুষগণের জ্ঞানের গভীরতা, তাঁহাদের চরিত্রের মহিমা, তাঁহাদের জীবনের সাধনা এসব লইয়া আলোচনা করিতে গেলে অনেক হাঙ্গামা উপস্থিত হয়! পক্ষান্তরে মহাপুরুষকে ভক্তি করিতে হইলে তাঁহার জীবনীকে একেবারে বাদ দিয়ে গেলেও চলে না! তাই ভক্তগণ খুব সহজে উভয় কুল রক্ষা করার জন্য কতগুলি আজগুবি, অনৈতিহাসিক, গল্প-গুজব এবং কতকগুলি অলৌকিক ও অস্বাভাবিক উপকথার আবিষ্কার করেন এবং সেগুলির মধ্য দিয়া মহাপুরুষের নামের জয়জয়কার করিয়া মনে করিয়া লন যে তাঁহাকে যথেষ্ট ভক্তি করা হইল! ক্রমে ওই সব কুসংস্কার মূলক উপকথা ও অলৌকিক কেচ্ছা কাহিনী মহাপুরুষগণের জীবনের প্রকৃত শিক্ষণীয় বিষয় গুলিকে দূরে সরাইয়া দিয়া ইতিহাস ও পুরাণ পুস্তক সমূহের পৃষ্ঠায় স্থায়ীভাবে অধিকার জমাইয়া বসে! কালক্রমে তাহাই শাস্ত্র হইয়া দাঁড়ায় এবং সেগুলি সম্বন্ধে সাধারণ সংস্কারের বিপরীত কোন কথা বলিতে চেষ্টা করিলে, তাঁহাকে শাস্ত্র দ্রোহী, ধর্মদ্রোহী ও কাফের বলিয়া নির্ধারণ করা হয়! যুক্তির দিক দিয়া কোন কথা বলিয়া উদ্ধার পাইবার আশাও এক্ষেত্রে খুবই কম! জগতের সমস্ত উন্নত প্রাচীন জাতির পতন ও মৃত্যু মূলত: একমাত্র এই রোগে সংগঠিত হইয়াছে! নবী ও রসূল অর্থাৎ আল্লাহর নিকট হইতে প্রেরণা ও ভাববাণীপ্রাপ্ত মহামানবগণ মানবজাতির ইহ- পরকালের, ধর্ম জীবনের ও কর্ম জীবনের স্বর্গীয় আদর্শ! মুসলমানদিগের ইহাও বিশ্বাস যে, হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সা.জগতের শ্রেষ্ঠ এবং শ্রেষ্ঠতম নবী! তিনি কোন দেশ বিশেষের বা জাতি বিশেষের জন্য অথবা কোন নির্দিষ্ট যুগ বা সময়ের নিমিত্ত প্রেরিত হন নাই! বরং তিনি সকল জাতির, সকল দেশের ও সকল যুগের সার্বভৌমিক, সার্বজনিক, সার্বিকভাবে সমস্ত আ’লমের জন্য আল্লাহর রহমত স্বরূপ দুনিয়ায় প্রেরিত হইয়াছেন! তথাকথিত ভক্ত রুপি শত্রুগণ এর কল্পনার বাহাদুরি ও তাহাদের সহজসাধ্য অতিভক্তির শোচনীয় ফলে কত সাধুসজ্জনের, কত আদর্শ মহাপুরুষের, কত অলি দরবেশের, এমনকি কত নবী-রসূলের পবিত্র জীবনী যে আজও সত্যের আলো হতে বঞ্চিত হইয়া আছে এবং তাহাতে জগতে জ্ঞান, ধর্ম, কর্ম ও মনুষ্যত্বের যে কত ক্ষতি হইয়া আছে ও হইতেছে তাহার বর্ণনা করা অসম্ভব! হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সা. সম্বন্ধেও অবস্থা কতকটা এইরূপ হইয়া যাইতেছে! তাঁহার জীবনী সম্বন্ধে স্বতন্ত্রভাবে যেসকল বই-পুস্তক পরবর্তীকালে লিখিত হইয়াছে, তাহার অধিকাংশই সত্য-মিথ্যা, বিশ্বাস ও অবিশ্বাস, প্রকৃত ও প্রক্ষিপ্ত রেওয়ায়াত সমূহে পরিপূর্ণ! সুতরাং অজ্ঞ ও অল্পজ্ঞ লোকদিকের কথা দূরে থাকুক অনেক পান্ডিত্যভিমানী ব্যক্তির পক্ষেও সেগুলির বাছাই করিয়া লওয়া কার্যত অসম্ভব হইয়া দাঁড়াইয়া আছে! তবে পার্থক্য এই যে, শত চেষ্টা করলেও অন্যান্য মহাজন’গনের জীবনী ও চরিত কাহিনীগুলি হইতে মিথ্যা ও প্রক্ষিপ্ত অংশগুলিকে খাঁটি ঐতিহাসিকভাবে যাচাই-বাছাই করিয়া ফেলার এখন আর কোনই সম্ভাবনা নাই! সেখানে সকল সিদ্ধান্তের ভিত্তি অনুমানের উপর স্থাপিত! কিন্তু যিনি হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সা.র জীবনী আলোচনা করিয়া সত্য ও মিথ্যাকে স্বতন্ত্র রূপে দেখিতে ও দেখাইতে চান, তাঁহার পক্ষে এই সাধনায় সিদ্ধিলাভ করা খুব সহজ সাধ্য না হইলেও, অধিক আয়াসসাধ্য ও নয়! হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সা.র জীবনী সম্বন্ধে বিশেষ আনন্দেরও সৌভাগ্যের কথা এই যে, তাঁহার নবী জীবন সম্বন্ধে সমস্ত আবশ্যকীয় বিষয় কোরআন ও হাদিস হইতে স্পষ্টভাবে জানা যায়! পরবর্তী রেওয়ায়েত, ইতিহাস গুলির প্রতি দিক্পাত না করিলেও কোন ক্ষতি হয় না! প্রায় ন’শ পৃষ্ঠার ‘মোস্তফা চরিত’-এর প্রায় তিনভাগের একভাগ নবী করীম সা. এর জীবনী সম্পর্কিত আলোচনায় নিবদ্ধ। ২২৩ পৃষ্ঠা জুড়ে তিনি যে রসূল চরিত্রের মহিমা প্রদর্শনের পটভূমি রচনা করে তাঁর সমীক্ষাধর্মী মনীষার পরিচয় দিয়েছেন, জীবনী রচনায় তা তুলনারহিত। বলাই বাহুল্য,এই বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনায় মাওলানা আকরম খাঁ যে মেধা, পরিশ্রম ও মনীষার পরিচয় দিয়েছেন তা অক্লান্ত সাধনার,অধ্যবসায়ের ফল।
মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ! বৈজ্ঞানিক কিংবা দার্শনিক কেউই জানেন না আগামী দিন সে কোথায় থাকবে, কি আহার করবে, কবে ও কোথায় তার মৃত্যু ঘটবে! দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ সমস্যা সম্বন্ধেই যখন অজ্ঞতা অপরিসীম, তখন পরকালের অনন্ত জীবন সম্বন্ধীয় জ্ঞান কোথায় পাওয়া যাবে? নবী -রসূল ও আসমানী কিতাব ব্যতীত পরকালের কোন স্পষ্ট ধারণাও মানুষ কল্পনায় আনতে সক্ষম হতো না! কাজেই যে নবী ও রসূল ইহকাল ও পরকাল সম্বন্ধে সম্যক অবগত তাঁর আদেশ, উপদেশ, কর্মধারা ও ব্যবহারিক জীবনের আদর্শের অনুসরণ ব্যতীত ইহ-পরকালীন কল্যাণ ও মঙ্গলের দ্বিতীয় পথ নেই! আর সেজন্যই ‘সীরাতুন্নবী’ বা ‘নবী চরিত’ অধ্যায়ন করা, সামাজিকভাবে চর্চা করা আমাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য!পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য সব ভাষায় মহানবী সা.এর সীরাত বা জীবনী গ্রন্থ রচিত হয়েছে! ইসলামী বিশ্বকোষ এর তথ্য অনুযায়ী শুধু বাংলাভাষায় বিগত কয়েক’শ বছরে পাঁচশ’র অধিক সীরাত গ্রন্থ রচিত হয়েছে! এসমস্ত সীরাত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পাঁচটি সীরাত গ্রন্থকে বেছে নিয়ে বিশ্বাসী ধার্মিক পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হলো! যাতে তাঁরা মহানবী সা.এর সীরাত বা জীবনী গ্রন্থ পাঠ করে সত্যের সহজ সরল আলোকিত পথে, শান্তির পথে এবং ইহকাল ও পরকাল দুই জীবনে সাফল্যের পথে নিজেদের জীবনকে পরিচালিত করতে পারেন!