আজ থেকে তেরো বছর আগের কথা। সম্পর্কের শুরুটা ঠিক কিভাবে হয়েছিল সাহলের সঠিক মনে নেই। কিন্তু, মেয়েটির নাম সাহল আজও ভোলেনি। কোনদিন ভুলতেও পারবে না।সে কী ভোলা যায়! কী মায়া! কী ভীষণ প্রেম-প্রীতি, হৃদয়ে লেনদেন, মায়া-মমতা জড়ানো স্মৃতি! আহা কী মায়া! ঠিক যেন মায়াদেবী!মেয়েটি যেমনি ছিলো জেসমিন ফুলের মতো অপরুপ ঠিক তেমনি ছিলো একটি প্রজাপতির মতো সুন্দর ও নমনীয়। মেয়েটির নাম ইয়ারা। সুন্দরী! মায়াবী! মায়াময় মুখখানি যেনো দীঘির কালো জল!নজর কাড়ার মতো বিশেষ এক চাহনী যা দেখলে যে কেউ ফিট হয়ে যেতো! অন্ধকার রাতের মিটিমিটি জোনাকিপোকার মতো আলো ছড়াতো; যাতে চাঁদের আলোও হার মানতো! বলতে কী মাঝে মাঝে জোনাকিপোকার আলোও চন্দ্র-সূর্যের আলোকে হার মানায়। কেউ মানুক আর না মানুক সাহল এটা বিশ্বাস করতো।

আজ বড্ড বেশি মনে পড়ছে সাহলের সেই ইয়ারার কথা। সাহল এক বেকার ছেলে। সে মস্ত বড় এক শহরের উপশহর এলাকায় থাকে। চাকরির পরীক্ষা দিতে ঢাকায় তার অবাধ বিচরণ! মাসে মাসে পরীক্ষা লেগেই থাকে। সাহল সাধারণত দেশ ট্রাভেলসে ঢাকায় যাতায়াত করতো। চাকরির পরীক্ষাগুলো বিশেষত শুক্রবারেই হয়। হয়তো ক্ষেত্র বিশেষ তার ব্যত্যয়ও ঘটতে পারে। সে বৃহস্পতিবার নাইটে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতো। সাহল প্রায়-ই একা একা ঢাকাতে যেতো দেশ ট্রাভেলসে। যথারীতি টিকিট কাটে এবং নির্দিষ্ট সিটে যেয়ে বসে। সে স্বভাবতই গাড়ির জানালার ধারে বসতো। পাশের ছিটটা ফাঁকা আপাতত কেউ তার পাশে নেই। সে একাকী বসে ধ্যানমগ্ন কী যেন ভাবছেই।যেন সমুদ্রের গহীন জলে ডুব মেরে আছে। কেউ কোথাও নেই!
গাড়ি যাত্রার শুরুর ঠিক পাঁচ মিনিট আগে পাশের যাত্রীটাও এসে সিটে বসে। কিন্তু, সাহলের ওদিক কোনো খেয়াল ছিলো না যে পাশে এসে কে বসলো। কিন্তু, সাহল বুঝলো কেউ একজন পাশে এসে বসেছে। এমন সময় সে বসে বসে আনমনে ফেসবুকিং করছিলো। কিন্তু, হঠাৎ সে ফোনটা ব্যাগের ভেতর রেখে বাম হাতটার বৃদ্ধাঙ্গুলি,তর্জনী আর মধ্যমা আঙুল দিয়ে কপালটা টিপতে লাগলো। তার মাইগ্রেনের সমস্যা ছিলো কিছুটা। তারচেয়ে বড় সমস্যা ছিলো তার প্রিয়তমকে হারানোর ব্যথা! কিন্তু অন্য কোনো কারণে তার মাথাটা সেদিন ধরার কথা ছিলো না। সে সুস্থ স্বাভাবিক ছিলো!বিশেষত সে শারীরিকভাবে ফিট ছিলো কিন্তু মানুষিকভাবে অতোটা ছিলো না। সে বসে বসে অঝোরধারায় কাঁদছিলো; শ্রাবণের মেঘগুলো যেন খসে খসে নামছিলো। পাশের সিটে বসা ব্যক্তিটি কিছুটা পর্যালোচনা করে তার মতিগতি আর হাবভাব।

সে সাহলকে বলে কিরে তোর কি হইছে? কোনো সম্বোধন ছাড়াই আচমকা এমন প্রশ্নের প্রতিত্তোরে সাহল শুধু চেয়ে দেখে যে তার শৈশব-কৈশোরের বাল্যবন্ধু আলিফ। দেখেতো সাহল বিস্মিত এবং হতবাক! সে সিঙ্গাপুরে থাকতো। জানতোই না সে কবে বাড়ি এসেছে। তাদের দু’জনের মধ্যে দীর্ঘদিন তেমন কোনো যোগাযোগ ছিলো না।তবে ছেলেবেলায় তাদের মতো জুটি মেলা ভার ছিলো।

যাইহোক দুই বন্ধু কিছুক্ষণ আলিঙ্গনে জড়াজড়ি কোলাকুলি করলো; বহুদিন পর দেখা বলে কথা।
তারপর তুই কেমন আছিস? আলিফ বলল এইতো আমি বেশ ভালোই আছি। কবে দেশে ফিরলি.. এভাবেই তার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানল।
আলিফও তার বন্ধু সম্পর্কেও অনেক কিছু জানাশোনা করলো।

আলিফ সাহলকে বললো, বন্ধু কি হয়েছে তোর?
সে কোনোপ্রকার ভণিতা ছাড়াই তার প্রাণের সখাকে বললো সে অনেক কথা৷ বলে কয়ে আর কী হবে!
ইতিমধ্যে ঢাকার উদ্দেশ্যে গাড়ি যাত্রা শুরু করলো।কাঁদোকাঁদো স্বরে সাহল কথা বলতে বলতে আলিফকে বললো তোর শুনতে হবে না। থাক না সে সমস্ত কথা।সে তো নাছোড়বান্দা না শুনে ছাড়বে না। কিন্তু, সে বলতে নারাজ ছিলো। তবুও আলিফ শোনার প্রচেষ্টা করে যাচ্ছিলো। দেখ বন্ধু তুই তো বিদেশে চলে গেলি।আমিও সেই থেকে বাইরে বাইরে থাকি লেখাপড়ার জন্য।তুই তো জানিস অজপাড়া গাঁয়ে লেখাপড়া করার মতন তেমন পরিবেশ ছিলো না।তাই বাড়ি থেকে চলে আসা।তুই বিদেশ চলে যাবার পরপরই।শোন তোকে বলি, যখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি তখন একটি মেয়ের প্রেমে পড়ি।সে ক্লাস সেভেনে পড়তো।আমি যখন অনার্সে ভর্তি হই তখন সে এসএসসি পাশ করে। পরবর্তীতে সেও গ্রাম ছেড়ে চলে এসে শহরের একটি কলেজে ভর্তি হয়।একই বিভাগে আমরা থাকতাম। সে থাকতো বিভাগীয় শহরে আর আমি জেলা শহরে।ইয়ারা হোস্টেলে আর আমি একটা মেসে থাকতাম।তাতে কী! প্রায়ই দু’জন একটা নির্দিষ্ট সময়ে বাইরে বের হতাম। এক সাথে চলতে চলতে তার সাথে আমার খুবই ঘনিষ্ঠতা হয়ে যায়। দু’জনের মধ্যে আমাদের খুব-ই আস্থা, বিশ্বাস, ভরসা ছিলো।আমরা দু’জনে কমিটেড ছিলাম যে কেউ কাউকে কখনো ছেড়ে যাবো না।যে কথাটা না বললেই নয়; ইয়ারার বাবা ছিলেন কলেজের অধ্যাপক আর আমার বাবা ছিলেন একজন মৎস্যজীবী।তুই তো জানিস আমাদের পরিবার সম্পর্কে । আলিফ শুধু সায় দিয়ে যাচ্ছিলো সাহলের কথায়। আব্বার একশো বিঘার ঘেরবেড়ী যাতে গলদা বাগদা চিংড়ীসহ আরো অনেক সাদা মাছ চাষ করতো।তাছাড়া বড় বড় তিন চারটি পুকুর ছিলো এবং আবাদি অনাবাদি অনেক জায়গাজমি ছিলো।কিন্তু,ইয়ারার বাবার ঝোঁক ছিলো কোনো সরকারি চাকুরিজীবী ছেলে।তার ফ্যামিলি আমাকে পছন্দ করে না। যেটা আমি জানছি ইয়ারার কাছ থেকে।কিন্তু সে তো আমার ছাড়া অন্য কারো কথা ভাবেই না। তবুও একটা ভয় থেকেই যেতো।
-থাক না সে কথা পরে বলছি।

-শোন বন্ধু! আরো কিছু কথা আছে।মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ কর।অনেকদিন পর তোর সাথে দেখা আর দুঃখের কথায় শোনায় তোকে।ভালো লাগবে।আমার কথা শুনে যেনো তোর কষ্ট না লাগে। আমি সুখী!
-ইয়ারা যেখানে থাকতো সেখান থেকে আমি বেশ খানিকটা দূরেই থাকি।দেখা প্রতিদিন না হলেও ফোনে প্রতিদিন কথা হতো। আমাদের সম্পর্কের চার পাঁচ বছর পর থেকে কিছু ঝামেলা হতে থাকে। সেটা হলো ফোনে আমি প্রচুর বলতাম ইয়ারার সাথে। ও যখন বাড়িতে যেতো তখন অতোটা কথা বলতে পারতাম না।ওর থেকে মিস কল না আসলে আমি কল দিতে পারতাম না। কিন্তু আমার অতো তর সইতো না। আমি কল দিয়ে বসতাম। মাঝে মাঝে কল ওয়েটিং পেতাম। জিজ্ঞাসা করতাম কার সাথে কথা বলো। ও বলতো বাবার সাথে কথা বলি৷ আম্মুর সাথে, ভাইয়ার সাথে অথবা নিকটাত্মীয়দের সাথে।প্রাথমিক পর্যায়ে আমি ঠিকঠাক মেনে নিতাম যে কথা বলতেই পারে। ব্যাপার না।কিন্তু, যতদিন যেতে থাকে ততই কল ওয়েটিং পেতেই থাকি।বিষয়টি মানতে খুবই কষ্ট হতো। এক পর্যায়ে ইয়ারার প্রতি সন্দেহের জাল সৃষ্টি হতে থাকে।

-যাই হোক ইয়ারা বাড়ি গেলে আমিও বাড়িতে চলে আসতাম।আমাদের দু’জনের বাড়ি পাশাপাশি ছিলো। শুধু মাঝে একটা ইটের ছলিংএর রাস্তা ছিলো। ইয়ারার যখন বই পড়তে বসতো কানে ইয়ার ফোন লাগিয়ে ঘোমটা দিয়ে বইয়ের দিকে তাকিয়ে আমার সাথেই কথা বলতো। এভাবে তিন বছর লুকোচুরি করে আমার সাথে ও কথা বলেছে। ওর আব্বু আম্মু বুঝতো যে মেয়েটি গুনগুন করে বই পড়ছে। আসলে সে আমার সাথেই কথা বলতো।
ইয়ারার বই পড়ার অভ্যাসটাই অমন ছিল। আমি বাড়িতে থাকাকালীন প্রায় লুকিয়ে লুকিয়ে ক্ষেত-খামার, বাগান পেরিয়ে বাড়ির পেছনের সুপারি গাছ বেয়ে ওদের বাড়ির ছাদে উঠতাম। ইয়ারা সিঁড়ির দরজা খুলে রাখতো। সাহল ওর ঘরে চলে যেতো। মাঝে মাঝে সকাল হয়ে যেতো ইয়ারার ঘরে। সাহল তো একদিন ধরা খেয়েই গেছিল। ইয়ারা খুবই বুদ্ধিমতী ছিলো। তার কল্যাণে বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া।

-ফোন ওয়েটিং এর যে বিষয়টি বলছিলাম দোস্ত। শোন বলি তোকে সাহল আলিফকে বলছে- “আমি ওকে একটা সময় প্রচুর সন্দেহ করতাম কারণ ওকে আমি এতোটাই ভালোবাসতাম যে অন্য কারোর সাথে কথা বললে আমার অসহ্য লাগতো”।
-ইয়ারা নিজ থেকে সন্দেহের ভুলটা ভেঙ্গে দেয়। একবার পবিত্র কুরআন শরীফ শপথ করে ওয়াদা করে যে সে কারো সাথে কথা বলবে না।অন্য কারো জীবনসঙ্গিনী হবে না।
-কিন্তু, ওর বাবা চাকুরীজীবী ছাড়া অন্যত্রে মেয়েকে বিয়ে দিতে নারাজ। ইয়ারা সাহলকে বলে আমার বাবা এক ব্যাংকার ছেলের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলছে।এমতাবস্থায় সাহলের বাড়ির পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো হলে তারা না করে দেন।
-ইয়ারাকে ওর বাড়ির লোকজন তার নানার বাড়ি নিয়ে গিয়ে তার বিয়ে দিয়ে দেয়। সাহলের বাড়ির কেউ জানতে পারিনি। পরবর্তীতে সাহল যখন ফোনে কোনভাবেই যোগাযোগ করতে পারছে না তখন তার নানা বাড়ির পাশের লোকের কাছ থেকে খোঁজ নেন যে ইয়ারার বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে ঢাকা থাকেন। ঢাকায় ছেলেদের নিজস্ব ফ্ল্যাট আছে। সেখানেই নিয়ে গেছে।
-সাহল বিষটি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারিনি।ভেউভেউ করে অঝোরে অশ্রু ঝরিয়েছে।তার স্মৃতি সে কোনোপ্রকারে ভুলতে পারছে না। সে ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে।সে যাত্রায় সাহল বেঁচে যায়। পরবর্তীতে কীটনাশক বিষ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করলেও আল্লাহর রহমতে সে বেঁচে ফেরে। মুমূর্ষু অবস্থায় অনেক বিলাপ করেছে ইয়ারার জন্য। বড় বেশি ভালো বাসতো।সম্পর্কের শুরু থেকেই দুজনের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।শারীরিক মানষিক সম্পর্ক শক্তিশালী হলেও পরিস্থিতি অনূকূলে না আসলে প্রকৃতির আর কী-বা করার থাকে!
-সাহল পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার পর ইয়ারার এক বান্ধবীর কাছ থেকে খোঁজ নেয় সে আমার সাথে এমব বিশ্বাসঘাতকতা ক্যান করলো?
-তার যখন যা-কিছু লেগেছে আমি তার কোনোটাই তো অপূর্ণ রাখিনি। তার প্রসাধনী সামগ্রী, পোশাক আশাক, স্বর্ণালংকার যখন যা মুখ দিয়ে বলেছে আমি দিয়েছি। আমার সাথে এমন করলো ক্যান?
-ইয়ারা তার বান্ধবীকে বলেছে যে আমি তার চেয়ে অনেক অনেক ভালো কিছু পেয়েছি। ওরকম একটা অশিক্ষিত মূর্খদের পরিবারে আমার মতো মেয়ে বড় বেমানান! সেটা তাকে আগে বোঝা উচিত ছিলো।
-সাহল কথাগুলো শুনছিলো আর পাথর হয়ে যাচ্ছিল। শোকে বুঝি পাথরও কাঁদে – সাহল সেদিন প্রথম বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারে।
সাহল ইয়ারার বান্ধবীর সাথে ফোনে আর কোনো কথা বলতে পারছিলো না।শুনতেও ভালো লাগছিলো না।
-শুধু একটি কথা জানার বাকি ছিলো তাহলো ইয়ারা সাহল যে কমিটেড ছিলো আজন্ম কেউ কাউকে ছেড়ে যাবে না- তার কি হলো??
-ইয়ারা যে পবিত্র কুরআন শরীফ শপথ করে ওয়াদা করেছিল জীবনে ছেড়ে যাবে না, অন্য কাউকে জীবনসঙ্গী করবে না – তার কি হলো?
-ইয়ারার বান্ধবী সাহলকে জানিয়েছিল যে তার বাবা কাফফারা দিয়ে নিয়েছে। ইয়ারা যে ভুল করেছিল তা শুধরে নিয়েছে।

সাহল তার বন্ধু আলিফকে তার মনোদুঃখ, মনোবেদনার কথাগুলো ভাগাভাগি করতে করতে ঢাকায় পৌঁছে যায়৷ গাড়ি থামে। গাবতলীতে নেমে দু’জন দুজনের গন্তব্যের দিকে রওনা দেয়।

১০ ভাদ্র ১৪২৮ বঙ্গাব্দ/ কেশবপুর, যশোর।