ইকবাল সাহেব একজন দিনমজুর। দারিদ্রতাকে জয় করার জন্য দিনরাত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে করে চলেছেন সংগ্রাম। কিন্তু দারিদ্রতার কাছে হেরে যায় বার বার। তাই দারিদ্রতা নেচে নেচে বেড়ায় তার জীবনের চলার পথে।

তার পর পর তিন মেয়ে সাদিয়া, নাদিয়া, আদিয়াএবং সব ছোট ছেলে সোহেল। তার বড় মেয়ে সাদিয়ার বয়স খুব জোর দশ বছর হবে। সে খুব জেদি মেয়ে। তিনি তার চাহিদা পূরণ করতে হিমশিম খেয়ে যান। তবুও তাকে কোন দিন বকাঝকা করেননি। বড় মেয়ে হিসেবে তাকে আদর করেন খুব।যেন সে মেয়ে নয় মায়ের মত। তাই সে আদর পেয়ে যেন একটি বাদর সৃষ্টি হয়েছে। যা নিতে চাইবে তাই দিতে হবে। আর তা না হলে যতক্ষন না পাবে ততক্ষণ গুন গুন করে কাঁদতে থাকবে। তাই ঈদ বা অন্য কোন উৎসব এলে আগে থেকেই যেন দুশ্চিন্তার পাহাড় চেপে ইকবাল সাহেবের মাথায়।

গত ঈদে কি যেন এক নতুন ধরনের অনেক দামী একটি জামা নেওয়ার জন্য বায়না ধরে। বাধ্য হয়ে বাজারের সব চেয়ে বড় দোকান থেকে জামা ক্রয় করে দিয়ে ছিলেন। তবে বাকিরা তার মত নয় সস্তা নতুন জামা পেলেও সন্তুষ্ট হয়ে যায়। ছেলে মেয়েদের নতুন জামা কিনে দিতে গিয়ে তারা স্বামী স্ত্রী কোন ঈদে নতুন পোশাক কিনতে পারেন না।পুরোন পোশাক পরে ঈদ করেন।কত দিন থেকে যে নতুন পোশাক পরে তারা ঈদ পড়েনি তা জানেন না।

সামনে ঈদ। লক ডাউনের জন্য হাতে তেমন টাকা পয়সা নেয়। কি ভাবে যে এবার সাদিয়াদের নতুন জামা কিনে দেবেন তা নিয়ে দারুন দুশ্চিন্তায় আছেন। সাদিয়ার দিকে চোখ পড়লেই তার বুকের ভেতর সৃষ্টি হচ্ছে ভূমিকম্প। তার চোখের সামনে সব কিছু যেন অন্ধকার হয়ে আছে। ব্যার্থতার বাধার প্রাচীর ঘিরে ধরেছে তাকে। কিছুতেই তা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

ইকবাল সাহেব ইফতার সেরে বসে আছেন মেঝেতে এমন সময় সাদিয়া বলছে -আব্বা এবার ঈদের জামা কখন ক্রয় করে দেবেন?
ইকবাল সাহেব আতঙ্কে বলেন- দেব মা দেব।তোমরাকে নতুন জামা কিনে দিব মা। আর দুই এক দিন অপেক্ষা কর।
-আমি জানি তোমার কাছে তেমন টাকা নেয়। তাই ভাবছি এবার নতুন জামা নেব না। আর বাকি ভাই বোনদেরকেও বলেছি। তারাও এবার কেউ নতুন জামা নেবে না।
বাকিরা এক সাথে বলে -হ্যাঁ আব্বা।আমদের কোন দুঃখ নেই।
ইকবাল সাহেব আশ্চর্য হয়ে যান সাদিয়ার কথা শুনে। এসব কথা যেন তার বিশ্বাস হচ্ছে না। বার বার চিমটি কাটছে নিজের শরীরে। কিন্তু দেখছেন স্বপ্ন নয় বাস্তব। কিন্তু কি ভাবে সে পরিবর্তন হল তা ভাবতেই পারছেন না। তবে তার মাথার বোঝা যেন আরও বেড়ে গেল। বার বার নিজেকে তার অপরাধী মনে হচ্ছে। কেমন বাবা যে তাদের সামান্য চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু কিছু করার নেই।সে যে বড় নিরুপায়।

ঈদের দিন সূর্য উঠার আগেই সাদিয়ারা ঘুম থেকে উঠে কি আনন্দ করছে। মোবাইলের সাথে ছোট একটি বক্স লাগিয়ে বাজাচ্ছে ঈদের গান। আগের দিন তারা রঙিন কাগজ কিনে এনেছিল তা কেটে কেটে বাড়ির চারিদিকে লাগাচ্ছে। তাদের দেখে মনে হয় না যে তারা নতুন জামা পায়নি। তারাকে দেখে মনে হয় এরকম আনন্দ এর আগে কোনদিন পায়নি। ঈদের খুশিতে ভরে উঠেছে তাদের বাড়ি।

সূর্য উঠলেও ইকবাল সাহেব বিছানা থেকে উঠেনা। তার মনের ভেতর বইছে দুঃখের কাল বৈশাখী ঝড়। উপড়ে ফেলে দিচ্ছে সকল অনুভূতির স্তম্ভ। এত খারাপ ঈদ তার এর আগে কখনও যায়নি।তার মনে হচ্ছে পুরুষ না হয়ে জন্মালে বেশি ভালো হত। তাই তার মরে যেতে ইচ্ছে করছে। সাদিয়ারা তার বাবা বিছানা থেকে উঠেনি দেখে চার ভাই বোন এক সাথে ঘরে যায়।সবাই এক সাথে তারা ইকবাল সাহেবের শরীরে চুমু খেতে শুরু করে। আর সব এক সাথে বলে-ঈদ মোবারক আব্বা। তাড়াতাড়ি উঠ।
ইকবাল সাহেব উঠতে না চাইলেও তারা তাকে উঠিয়ে নিয়ে যায় নলকূপের কাছে। গসল করিয়ে দেয় তাকে। আগেই সাদিয়ারা তার মাকে গসল করিয়ে দিয়ে ছিল। ইকবাল সাহেব ছেলে মেয়েদের এরকম ব্যবহার দেখে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছেন। যেন তারা ভুলিয়ে দিচ্ছে সকল দুঃখ। তার মনের পর্দায় ভাসতে শুরু করে ঈদের খুশি।

ইকবাল সাহেব গসল করার পর পুরনো পোশাক পরে বের হচ্ছেন। ঠিক তখন সাদিয়া ব্যাগ থেকে একটি নতুন পাঞ্জাবি বের করে তার বাবাকে দিল। আর বলল- পরোতো আব্বা। দেখি তোমাকে কেমন লাগে।
ইকবাল সাহেব আশ্চর্য হয়ে যান তা দেখে আর বলেন- তুই এই পাঞ্জাবি কথায় পেলি।
সাদিয়া হাসতে হাসতে বলে- তোমার জন্য কিনে এনেছি।
-এত টাকা কোথায় পেলি।
-বিড়ি বেঁধে।
-না তুই কারও টাকা চুরি করেছিস।তোকে তো কোন দিন বিড়ি বাঁধতে দেখিনি। তুই মিথ্যা কথা বলছিস।
-না বাবা সত্য কথা বলছি।
-সত্য কথা বল। না হলে তোকে মারব কিন্তু।
তখন সাদিয়াকে ডাকার জন্য তাদের বাড়ি আসে আলিয়া। এক সাথে ঈদগাহ যাওয়ার জন্য। আলিয়া সাদিয়ার ভালো বান্ধবী। আলিয়া পড়াশুনা না করলে অনেক বেশি চালাক। তার বাড়ি গিয়ে বুঝে নেয় তাদের কথপকথন। আলিয়া ইকবাল সাহেবকে বুঝিয়ে বলেন সব কথা। কি ভাবে সে তার বাবা মার জন্য পোশাক কিনেছে।

গত বছর ঈদের দিনের আগের রাতে ইকবাল সাহেবের স্ত্রী গভীর রাতে ছেলে মেয়ে ঘুমানোর সময় তাকে বলছিলন- তোমার জন্য একটা নতুন পোশাক কেন কিনলেন না।
ইকবাল সাহেব বলেছিলেন- ছেলেমেয়েদের জন্য পোশাক কিনতে গিয়ে দম ফুরিয়ে আসছে দারিদ্রতার জন্য।কি করে নিজের জন্য কিনব বল। তাছাড়া তোমাকে তো নতুন শাড়ি কিনে দিতে পারিনি।
-আমার কথা বাদ দাও।আমি তো বাড়িতে থাকি। আর তুমি তো ঈদগাহ যাও। সব তোমাকে দেখতে পাবে। এ সব ভেবে খুব আমাকে খুব খারাপ লাগছে।
-ও সব কথা বাদ। কপালে না থাকলে কি ঈদের উপহার পাওয়া যায়।
-কেন এমন কথা বলছ
-তুমি তো জান অমি জ্ঞান হওয়ার আগে আমার বাবা দুজনেই মারা যায়। দাদাদের কাছে মানুষ হই। দাদারা কোন দিন ভাল ব্যবহার করেনি। শুধু তাদের কাজ করিয়ে নিয়েছিল। কোন ঈদ আসেনি যে ঈদে নতুন জামা পরেছি। বাদ দাও সে সব কথা। ঘুমাও অনেক রাত হয়েছে। হটাৎ ঘুম ভেঙে যায় সাদিয়ার আর শুনে নেয় এসব কথা। সে নিজেকে স্থির রাখতে পারেনা। বার বার তার নিজেকে অপরাধী মনে হয়। তার জেদের জন্য তার বাবা কত কষ্ট পায়। তার চোখ দিয়ে ঝরতে শুরু করে অনুশোচনার জল। ব্যথায় বুকের ভেতর সৃষ্টি হয় বিশাল ক্ষতের। সাদিয়ার সব জেদ যেন আসতে আসতে নিশ্চিহ হয়ে যেতে লাগল। তখন সে মনে মনে স্থির করে যে করে হোক এর পরের ঈদে বাবা মাকে নতুন পোশাক কিনে দিবেই।

ঈদের দিন নতুন পোশাক পরতে ইচ্ছা করছিলনা সাদিয়ার। কিন্তু না পরে উপায় নেয়। কারণ না পরলে তার বাবা মা বুঝে যাবে সে শুনেছে তাদের রাতের কথা। তাই বাধ্য হয়ে পরল। যেন কাঁটার মত পুরো শরীরকে বিঁধছে। অনেক কষ্ট করে হাসার চেষ্টা করলেও তার আর হাসি বের হয় না। নির্বাক হয়ে বার বার তার বাবার পোশাকের দিকে তাকাচ্ছে।

আলিয়াকে খুলে বলে সব কথা। আলিয়ারাও খুব গরিব । সে, তার মা ও দিদিরা সব বিড়ি বাঁধে। তাদের বিড়ি বাধা দেখে এক দিন আলিয়াকে সাদিয়া বলে- আমি বিড়ি বাঁধব।
আলিয়া বলে- তুই পারবি না।
-তোরা পারলে আমি কেন পারব না। একদিন আমাকে শিখিয়ে দিবি। তারপর দেখবি আমি তোর থেকে বেশি বিড়ি বাঁধব।
-ঠিক আছে তাহলে দেখা যাবে।
-তবে আমার বাড়িতে জানাবি না। রোজ বিকালে না খেলে বিড়ি বাধা শুরু করব।
-ঠিক আছে। তবে কেন জানাব না একথা কিন্তু আমাকে বলতে হবে।
-তোকে একদিন বলেছিলাম আমার বাবা মার ঈদের আগের রাতের কথা গুলি। তুই মনে হয় সব ভুলে গেছিস।
-না ভুলিনি। তোর সব কথাই মনে রাখি। আলিয়া নিজে খুব লজ্জিত হল।
-আমি এক দিন বাবা মার মুখে হাসি ফুটাব এটাই এখন লক্ষ্য।
-আমি সব সময় তোর পাশে থাকব।
তারপর রোজ সাদিয়া বিড়ি বাঁধতে থাকে।

আলিয়ার কথা শুনে ইকবাল সাহেব সাদিয়াকে বুকে জড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করেন। কাঁদতে শুরু করে বাড়ির সকলে। আর ইকবাল সাহেব বলে সাদিয়া তুই আমার মেয়ে নয় তুই আমার মা। তোর দেওয়া এই ঈদের উপহার সারা জীবন বুকের ভেতর আগলে রাখব রে মা। যা এত দিন কেউ দেয়নি তা তুই অনেক কষ্ট করে দিলি ঈদের উপহার। তুই তো আমার গর্ব। তোর মত মেয়ে যেন সবার ঘরে ঘরে জন্মায়।