ঈদের আনন্দ মূলত শিশুদের। আমরা যখন শিশু ছিলাম ঈদ যেভাবে আমাদের জীবনে আনন্দের বার্তা নিয়ে আসতো আজকের শিশুদের কাছেও সমপরিমাণ আনন্দের বার্তা নিয়ে ঈদ আসে। জীবনের ভিন্ন স্তরে আনন্দের আবহ ভিন্ন হয়। এখন আমাদের আনন্দের চেয়ে দায়িত্ব বেড়েছে কয়েকগুণ। এখন সন্তানের আনন্দই পিতা-মাতার আনন্দ। আমাদের শৈশব এবং কৈশোর কেটেছে গ্রামে। গ্রামের ঈদ আনন্দ আর শহরের ঈদ আনন্দের মধ্যে বিস্তর ফারাক। ধরণও ভিন্ন। গ্রামে ঈদ দিনে দিনে শেষ হয়ে যায়। শহরের ঈদ অনেক জৌলুসপূর্ণ। চলতেই থাকে। শেষ হয় না।

আমাদের সময়ে ঈদের চাঁদ দেখা কমিটি ছিল না। বায়তুল মোকাররমে চাঁদ দেখা কমিটির জরুরী সভা বসতো না। গ্রামের মানুষ আকাশে চাঁদ দেখে নিজেরাই দিনক্ষণ গুণে ঈদের দিন ঠিক করে নিতো। তারা চাঁদ দেখা কমিটির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতো না। এখন ডিজিটাল যুগে চাঁদ দেখা কমিটি আছে। তারা আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে আকাশে তন্ন-তন্ন করে চাঁদ খোঁজে। তারপর তাদের ঘোষণানুযায়ী ঈদ হয়। তাদের নির্দেশনানুযায়ী ফিৎরা নির্ধারিত হয়। পশু কিভাবে জবাই হবে তাও বলে দেওয়া হয়।

ঈদ বলতে সবারই বড় আনন্দ হলো নতুন পোশাক। ঈদে নতুন পোশাক পরে তরতরে একটা ভাব নিয়ে ঈদগাহে যাওয়া, সে এক ভিন্নধরনের-মানে অন্যরকম আনন্দ। কিন্তু ঈদগাহের আনন্দ আমাদের বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারতো না। হুজুরের বয়ান আমাদের তখন আকর্ষণ করতো না। বুঝতামও না। শোনার আগ্রহ ছিল না। আমরা ঈদের আগে থেকে পয়সা জমিয়ে রাখতাম ঈদের জন্য। ঈদগাহ থেকে খানিকটা দূরে বাজারে মেলা বসতো। আমরা সেই মেলায় গিয়ে নানারকম খেলনা কিনতাম। আমরা আমাদের মতো আনন্দে মেতে উঠতাম।

ঈদে প্রতিবারই যে আমাদের নতুন পোশাক জুটতো তা কিন্তু নয়। ঈদে নতুন পোশাক না পাওয়া সেই শিশু মনে বিরাট ধরনের শূন্যতা মনে চেপে বসতো। ফিকে হয়ে আসতো ঈদের আনন্দ। আমার পিতা ছিলেন অদ্ভূত চরিত্রের মানুষ। আমাদের তিনি অনেক আদর সোহাগ দিয়ে মানুষ করেছেন। আমরা চারভাই ছিলাম তাঁর চোখের মণি। তিনি আমাদের কোন চাওয়া অপূর্ণ রাখেননি। শুধু একটি জিনিশ ছাড়া। সেটা ভাবলে আজও তাঁর আদর সোহাগ নিয়ে আমরা অন্যরকম মজা করি। আমাদের সব ভাইয়েরই দুটো করে জামা। একটি সাধারণ। অন্যটি কিঞ্চিত দামী। সেটা ভাঁজ করে ট্রাঙ্কে তুলে রাখা হতো। এই জন্যে যে, ওই জামাকে আমরা বলতাম ‘তোলা জামা’। আত্মীয় বাড়ি কিংবা কোন বিয়ের অনুষ্ঠানে কিংবা বিশেষ কোন কারণে সেই জামা পরতাম। অনুষ্ঠান শেষে আবার সেই জামা ধুয়ে ভাঁজ করে ট্রাঙ্কে তুলে রাখা হতো। আমার বাবা ছিলেন প্রচন্ড ভোজন বিলাসি। তিনি নিজে ভাল মাছ তরকারি ফলমূল খেতে পছšদ করতেন। আমাদের খাওয়াতেন। খাওয়ার ব্যাপারে তার কোন কমতি ছিল না। কোনভাবে তার কানে কথাটা বলা হলো, ছেলেরা দই খেতে চেয়েছে। পরদিন ঘুম থেকে উঠে আমরা দেখতাম বাড়িতে খাসা দই এসে গেছে। এছাড়া মাছ-মাংসের কথা বলাই বাহুল্য। কিন্তু আমরা যদি কোন ভাই তার কাছে নতুন জামা চাইতাম তিনি রেগে যেতেন। বলতেন, ‘জামা আছে না? কয়টা জামা লাগে?’

বাবার এই কথার পর মা আর কথা বাড়াতেন না। আমরা মাকে ঘিরে বায়না করতে থাকতাম। টাকা পয়সার হিসেব থাকতো মায়ের কাছে। গোপনে মা আমাদের ঈদের নতুন পোশাক কিনে দিতেন। সেটাও প্রতি ঈদে জুটতো না। মা এক ঈদে বড়ছেলেকে নতুন পোশাক দিলে পরের ঈদে আরেক ছেলেকে দিতেন। তিনি স্নেহের ভারসাম্য রক্ষা করতেন। তবে আমার ব্যাপারে তাঁর একটু পক্ষপাত ছিল। কেন ছিল সেটা তিনি জানেন। এই নিয়ে আমার অন্য ভাইরা তেমন গা করতেন না। তারা ধরেই নিতেন আমাকে মা একটু বেশি দেবেন। এটা যেন আমার প্রাপ্য ছিল।

আরো একটু বড় হওয়ার পর বুঝলাম কাপড়ে মার দিয়ে ইস্ত্রি করলে পুরনো কাপড়ও নতুনের মতো কড়কড়ে দেখায়। এর আগে আমরা ধোয়া কাপড় হাতে পানি নিয়ে কোকড়ানো ভাঁজ সমান করার চেষ্টা করতাম। গ্রামের অবস্থাপন্ন মানুষেরা ধোপা বাড়ি থেকে জামা কাপড় ইস্ত্রি করে আনতেন। সাধারণ মানুষেরা সোডা কিংবা শুকনো কলাপাতা পুড়িয়ে ক্ষার তৈরী করে সেই ক্ষার দিয়ে ধুয়ে কাপড় কোকড়ানো অবস্থায় পরতেন। আমার এক বড়বোন তার বিয়ের পর শহর থেকে আমাদের জন্য নতুন একটি ইস্ত্রি নিয়ে এলেন। অদ্ভূত ধরনের ইস্ত্রি। ঢাকনা খুলে ওর মধ্যে কয়লা দিয়ে আগুন ধরিয়ে বাতাস করতে হতো। সব গুলো কয়লা আগুন ধরে লাল টকটকে হলে তারপর ইস্ত্রির ঢাকনা বন্ধ করে হাতল ধরে কাপড় ঘষে ইস্ত্রি করতে হতো। এই কাজে আমার ছোটভাই ছিল ভীষণ দক্ষ। কাজটি আমি কখনই ভালবাসতে পারিনি। আমার কাছে ভীষণ বিরক্তিকর মনে হতো।

ঈদের মাসখানেক আগে থেকে ছোটভাইয়ের কাজ ছিল কায়লা সংগ্রহ করে রাখা। বাড়িতে কাঠের চেলা দিয়ে রান্না করলে আমার ছোটভাই পরে সেই ছাই ঘেটে কয়লা আলাদা করে যত্ন করে রেখে দিত।

ব্যাপারটি এমন দাঁড়াল যে গ্রামের অনেকে পোশাক ধুয়ে ঈদের আগের দিন সন্থ্যায় আমাদের বাড়ি এসে হাজির হতো। এটাও আমাদের ঈদের একটা বাড়তি আনন্দের মতো ছিল। অনেক মানুষ আসতো জামা ইস্ত্রি করতে। আমার ছোটভাইয়ের তাতে বিরক্ত হতো না। সে একমনে ইস্ত্রি করে চলেছে। কেউ অধৈর্য হয়ে বলে উঠলে, ‘খার বেটা আমারটা আগে ইস্ত্রি কইরা দেও।’ সঙ্গে সঙ্গে আমার ছোটভাই কাজ করতে করতে রসিকতা করে বলতো, ‘আপনারটা সবার পরে হবে। আপনি জামা রেখে যান। আমি ইস্ত্রি করে রাখবো। আপনি কাল ইদগাহে যাওয়ার সময় এখান থেকে জামা পরে যাবেন।’

লোকটি এবার কাতর কন্ঠে অনুনয় করে বলে, ‘আমারটা এখন না দিলা আমার ছোয়ালের পাঞ্জাবিটা ইস্ত্রি কইরা দেও। আমি খালি হাতে ফিরা গেলে ছোয়াল রাতে আর ঘুমাইব না। সারারাত কান্নাকাটি করবো।’
ছোটভাই হেসে বলতো, ‘ভাই মজা করছি। আপনি খাড়ান। এখনই আপনারটা ধরবো।’

প্রায় চল্লিশ পঞ্চাশজনের একটি দল আমাদের উঠোনে এসে ভীড় করতো। কারো হাতে পাঞ্জাবি, কারো হাতে সার্ট। কারো হাতে পায়জামা। ধীরে ধীরে গানের জলসায় মেতে উঠতো সবাই। আমার পিঠেপিঠি বড়ভাই ভাল গান গাইতে পারতো। বাইরের উঠোনে আসর জমে উঠতো আমার ভাইকে ঘিরে। কেউ কাসার বাটিতে সুর তুলতো। কেউ এ্যালোমেনিয়ামের পাতিল বাজিয়ে আমার ভাইয়ের গানের সঙ্গে সঙ্গত করতো। সেটাই ছিল আমাদের ঈদের মূল আকর্ষণ। সারারাত আমাদের বাড়ি গমগম করতো। বাইরে গান হচ্ছে বাড়ির ভেতরে বাবা তাহাজ্জতের নামাজ পড়ছেন। তিনি বিরক্ত হলেও আমাদের আনন্দে তিনি কখনো বাঁধা দিতেন না।

একচাচা নতুন লুঙ্গি নিয়ে এসেছেন ইস্ত্রি করতে। অন্যরা এই কথা শুনে নানা রকম টিপ্পনি কাটতে লাগলেন। বেচারা চাচা লজ্জায় চুপসে গেছেন। একজন বললো, ‘গেঞ্জির আবার বুক পকেট।’ একজন বললেন, ‘চাচা কি লুঙ্গি পইরা বেয়াই বাড়ি যাবেন?’ একজন একটু বেমক্কা রসিকতা করে বসে, ‘চাচা, চাচীর পেটিকোটটা আইনা ইস্ত্রি কইরে নিয়া যাইতেন। চাচী খুশি অইতো।, চাচাও রসিক মানুষ। সে হেসে বলে, ‘তোমার চাচীরে নতুন পেটিকোট কিনা দিছি। সে ভাঁজ কইরা স্যুটকেসে তুইলা রাখছে। ঈদের দিন পরবে।’

‘চাচী পরবো নতুন পেটিকোট আর তুমি পরবা পুরান লুঙ্গি। জিনিসটা পছন্দ খাইলাম না।’
আরেকজন বলে, ‘চাচা, কামটা কইলাম মোটেও ভাল হয় নাই।’
চাচা জবাবে বলে, ‘ভাল মন্দ তোরা কি বোঝস? বিয়া কর তখন বুঝবি।’ তার এ কথায় সবাই হো হো করে হেসে ওঠে।
‘তাই বলে তুমি ঈদের দিন পুরান লুঙ্গি-জিনিসটা মানতে পারলাম না চাচা।’
‘তুই পুরান কোনে পালি? গত শক্রুবারের হাঁট থেকে কিনছি। শুইকা দেখ, এখনো নতুনের গন্ধ যায় নাই।’
আমি বললাম, ‘ওরা না বলে চাচা, আপনার লুঙ্গি ঠিক আছে। ইস্ত্রি করলে নতুনের মতো সুন্দর লাগবে।’
চাচা এক গাল হেসে বললো, ‘তোমার চাচীও তাই কলো। কইলো, যাও। খাঁর বেটা ভাল ইস্ত্রি করতে পারে। তুমি গিয়া লুঙ্গিটা ইস্ত্রি কইরে আনো। তাই আইলাম।’
বললাম, ‘চাচা ভাল করেছেন। আপনি বসেন।’
একালের ঈদে এসব ঝক্কি নেই। মানুষের অবস্থার আমূল পরিবর্তন হয়েছে। এখন বাহারি ধরনের পাঞ্জাবি পরে কিশোর যুবকরা ঘুরে বেড়ায়। এমন দৃশ্য খুবই দৃষ্টিনন্দন। বর্তমানে ঈদে জৌলুস বেড়েছে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে আনন্দ। অর্থের সঙ্গে আনন্দের নিবিড় সম্পর্ক আছে। অর্থ ছাড়া আনন্দ পূর্ণাঙ্গ হয় না।