ঈদ একটি পরম আনন্দের দিন। আল্লাহতা’লা মুসলিমদের যে দুটি উৎসব উপহার দিয়েছে ঈদ-উল-ফিতর তার মধ্যে একটি। দীর্ঘ ১ মাস রমজান পালন করে মুসলিম সমাজ এই উৎসব পালন করে থাকে। এ উৎসবে মুসলিমরা যেমন আনন্দ উপভোগ করে তেমনি তাদের পাশে বসবাসরত ভিন্ন ধর্মের মানুষও সেই উৎসবে যোগ দেয়। শান্তি ও সুখের মধ্য দিয়ে উদযাপন হয় ঈদ। মানুষে মানুষে যে ভেদাভেদ তা এই দিনে কুরবানী করা হয়। নতুন সমাজ নির্মাণে তারা শপথ গ্রহণ করে। জুলুম অত্যাচর মুক্ত একটি পৃথিবীর স্বপ্ন নিয়ে তারা ঈদগাহে যায়। আর তার জন্য মহান প্রভুর কাছে প্রার্থণা করে। প্রকাশ হলো ঈদ উল ফিতর সংখ্যা ২০২০ : পর্ব-৩।
আফসার নিজাম, সম্পাদক

সূ চী প ত্র
কৃষকের ঈদ :: কাজী নজরুল ইসলাম
ঈদের চাঁদ :: বেগম সুফিয়া কামাল
দাদুন’র ঈদ :: শাহানা সিরাজ
শখ পূরণের ঈদ :: আফসার নিজাম
মহামিলনের ঈদ :: নজরুল ইসলাম শান্তু
ঈদটা সবার :: রেদওয়ানুল হক
ঈদ নিয়ে দুটো কবিতা :: সেলিম মণ্ডল
আজ ঈদ ভালোবাসার পবিত্র দিন :: তাজ ইসলাম
নেই আমি আর বোকা :: নাছির বিন ইব্রাহীম
ধ্বংসের আগে শহরের বর্ণনা :: নোমান সাদিক
বর্ণহীন ঈদ দুয়ারে :: তৌফিক হাসান
কেমন কাটে ঈদ :: জয়নব জোনাকি
খুকুর ঈদ :: শারমিন সুলতানা
নিরানন্দ ঈদ :: নূর মোহাম্মদ
ঈদ আগমন :: জাহাঙ্গীর চৌধুরী
এবারের ঈদ :: মুন্সী মোঃ তোফায়েল আহমেদ
ঈদের খুশি :: আমানত উল্লাহ সোহান
অনাথের ঈদ :: আবু কওছর
ঈদের দিনেও :: রবিউল হুসাইন
ঈদ মানে তো :: আ.ফ.ম. মোদাচ্ছের আলী
ঈদের জামা দিলেন মামা :: নুরুন্নাহার শিরীন

কৃষকের ঈদ
কাজী নজরুল ইসলাম

বেলাল! বেলাল! হেলাল উঠেছে পশ্চিমে আশমানে,
লুকাইয়া আছ লজ্জায় কোন মরুর গোরস্তানে!
হেরো ঈদ্গাহে চলিছে কৃষক যেন প্রেত-কঙ্কাল
কশাইখানায় যাইতে দেখেছ শীর্ণ গোরুর পাল?
রোজা এফতার করেছে কৃষক অশ্রু-সলিলে হায়,
বেলাল! তোমার কন্ঠে বুঝি গো আজান থামিয়া যায়!
থালা ঘটি বাটি বাঁধা দিয়ে হেরো চলিয়াছে ঈদ্গাহে,
তির-খাওয়া বুক, ঋণে-বাঁধা-শির, লুটাতে খোদার রাহে।

জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসে না নিদ
মুমূর্ষু সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?
একটি বিন্দু দুধ নাহি পেয়ে যে খোকা মরিল তার
উঠেছে ঈদের চাঁদ হয়ে কি সে শিশু-পাঁজরের হাড়?
আশমান-জোড়া কাল কাফনের আবরণ যেন টুটে
এক ফালি চাঁদ ফুটে আছে, মৃত শিশুর অধর-পুটে।
কৃষকের ঈদ! ঈদ্গাহে চলে জানাজা পড়িতে তার,
যত তকবির শোনে, বুকে তার তত উঠে হাহাকার!
মরিয়াছে খোকা, কন্যা মরিছে, মৃত্যু-বন্যা আসে
এজিদের সেনা ঘুরিছে মক্কা-মসজিদে আশেপাশে।
কোথায় ইমাম? কোন সে খোৎবা পড়িবে আজিকে ঈদে?
চারিদিকে তব মুর্দার লাশ, তারই মাঝে চোখে বিঁধে
জরির পোশাকে শরীর ঢাকিয়া ধনীরা এসেছে সেথা,
এই ঈদ্গাহে তুমি কি ইমাম, তুমি কি এদেরই নেতা?
নিঙাড়ি কোরান হাদিস ও ফেকা, এই মৃতদের মুখে
অমৃত কখনও দিয়াছ কি তুমি? হাত দিয়ে বলো বুকে।
নামাজ পড়েছ, পড়েছ কোরান, রোজাও রেখেছ জানি,
হায় তোতাপাখি! শক্তি দিতে কি পেরেছ একটুখানি?
ফল বহিয়াছ, পাওনিকো রস, হায় রে ফলের ঝুড়ি,
লক্ষ বছর ঝরনায় ডুবে রস পায় নাকো নুড়ি!

আল্লা-তত্ত্ব জেনেছ কি, যিনি সর্বশক্তিমান?
শক্তি পেল না জীবনে যে জন, সে নহে মুসলমান!
ইমান! ইমান! বলো রাতদিন, ইমান কি এত সোজা?
ইমানদার হইয়া কি কেহ বহে শয়তানি বোঝা?
শোনো মিথ্যুক! এই দুনিয়ায় পূর্ণ যার ইমান,
শক্তিধর সে টলাইতে পারে ইঙ্গিতে আশমান!
আল্লার নাম লইয়াছ শুধু, বোঝোনিকো আল্লারে।
নিজ যে অন্ধ সে কি অন্যেরে আলোকে লইতে পারে?
নিজে যে স্বাধীন হইল না সে স্বাধীনতা দেবে কাকে?
মধু দেবে সে কি মানুষ, যাহার মধু নাই মৌচাকে?

কোথা সে শক্তি-সিদ্ধ ইমাম, প্রতি পদাঘাতে যার
আবে-জমজম শক্তি-উৎস বাহিরায় অনিবার?
আপনি শক্তি লভেনি যে জন, হায় সে শক্তিহীন
হয়েছে ইমাম, তাহারই খোৎবা শুনিতেছি নিশিদিন!
দীন কাঙালের ঘরে ঘরে আজ দেবে যে নব তাকিদ
কোথা সে মহান শক্তি-সাধক আনিবে যে পুন ঈদ?
ছিনিয়া আনিবে আশমান থেকে ঈদের চাঁদের হাসি
ফুরাবে না কভু যে হাসি জীবনে, কখনও হবে না বাসি!
সমাধির মাঝে গণিতেছি দিন, আসিবেন তিনি কবে?
রোজা এফতার করিব সকলে, সেই দিন ঈদ হবে।
…………………………………………..

ঈদের চাঁদ
বেগম সুফিয়া কামাল

চাঁদ উঠিয়াছে, ঈদের চাঁদ কি উঠেছে? শুধায় সবে।
লাখো জনতার আঁখি থির আজি সুদূর সুনীল নভে।
এই ওঠে, ওই উদিল গগনে সুন্দর শিশু চাঁদ—
আমিন। আমিন। রাব্বুল আলামিন করে সবে মোনাজাত।
…………………………………………..

দাদুন’র ঈদ
শাহানা সিরাজ

ঈদ এসেছে ঈদ এসেছে
দাদু তুমি কই?
বাবা নেই চাচ্চু নেই
কেমনে দাদু রই!
ঈদ-সকালে দিয়ে সালাম
বলতো তোমার বাবা
ঈদগাহে যাচ্ছি মাগো
ফিরবো নিয়ে কাবা
চাচ্চু তোমার যেতো সাথে
পরে ঈদের পোশাক
দাদু তোমার করতাম রান্না
পোলাও কোর্মা পুঁইশাক
এলে তুমি নিয়ে হাসি
বাবা মায়ের কোলে
দূর দেশে থাকো যে আহা
দাদু দাদু বোলে
বাবা চাচ্চু দুজন গেছে
নিতে উচ্চ শিক্ষা
দাদু থাকি একলা একা
দিয়ে পথের দীক্ষা
ঈদ এসেছে ঈদ এসেছে
থাকো তোমরা সুখে
দীন-দুঃখিরে নিয়ে সাথে
ঈদ কাটাবো দুঃখে
দাদুন তুমি চোখের মণি
সকল স্বপ্ন-তরী
সেই তরীতে ভেসে ভেসে
দাদুন সুখে মরি!
নতুন জামা দিয়ে গায়ে
এসো তুমি ছবি
দাদু তোমায় দেখে দেখে
প্রাণ মিলাবো রবি
ফোকলা দাঁতে হাসো দাদুন
খিলখিল খিল পরশে
হাসবো দাদু বিশ্বালোকে
দেখবো ছবি হরষে…
…………………………………………..

শখ পূরণের ঈদ
আফসার নিজাম

সন্ধ্যা রাতে দেখবে যেদিন হাসলো নতুন চাঁদ
বাড়িয়ে দিও বন্ধু তুমি ছোট্ট দুটি হাত

হাতের ভেতর ছড়ায় দেবো লক্ষ তারার ফুল
ফুলগুলোকে বিলিয়ে দিতে করবে না তো ভুল

ভুল করো না বন্ধু তুমি দিও সবার হক
ফুলের ভেতর লুকিয়ে আছে অনেক মনের শখ

শখ পুরনের আসলো ঈদের দিন
উঠলো হেসে আদম-পরী-জ্বীন।
…………………………………………..

মহামিলনের ঈদ
নজরুল ইসলাম শান্তু

পৃথিবীর বুকে মুসলিম জাতি
ভেঙেছে পাপের পাহাড়,
ঈদের খুশিতে রমজান শেষে
ধরেছে দিনের আহার।

মক্কা এবং মদিনার পরে
বিশ্বের যতো দেশ,
ঈদের জামাতে আল্লাহর পথে
গড়ে এক পরিবেশ।
…………………………………………..

ঈদটা সবার
রেদওয়ানুল হক

ঈদটা সবার জন্য হোক
কালো-ধলোর বিভেদ ভেঙে
চাঁদটা হেসে উঠুক রেঙে
সবাই সবার অতি প্রিয়
মানুষ বলে গণ্য হোক।

যেই ঘরেতে নেইকো খাবার
অসুস্থতায় ভুগছে আবার
তার ঘরেও ঝরুক রহম
কোরমা-পোলাও অন্ন হোক।

পথের ধারে যেই শিশুটি
উদোম দেহ নেই কিছুটি
তার গায়েও নতুন জামা
জড়িয়ে প্রসন্ন হোক।

যেই মানুষটা পলে পলে
স্বজন হারার শোকে জ্বলে
তার কাছেও ঈদটা এসে
অতুল ও অনন্য হোক।

ঈদটা সবার জন্য হোক
ধন্য চির ধন্য হোক।
…………………………………………..

ঈদ নিয়ে দুটো কবিতা
সেলিম মণ্ডল

ঈদচাঁদ-১

মাঝেমাঝে তোমার কাছে ফেতরা নিতে আসি
যাতে ঘনঘন ঈদচাঁদ ওঠে

দীর্ঘ নির্বাসনের রোজা রাখি
সেহেরিতে দেখি— পাশে নেই, তুমি

শুধুই ইফতারের আয়োজন


আমার ফুটো থালায় তোমার ঈদচাঁদ
আলো গড়িয়ে পড়ে পথে

পথে পথে মিছিল, মিছিলে
ক্ষুধাকাতর সন্ন্যাসী জিকির তোলে

হে প্রেম, তুমি লা ইলাহার চেয়েও প্রাচীন

ঈদচাঁদ-২

বছরে একবার আমি বাজার করি
ঈদের আগেরদিন
এজন্য আমাকে আর নতুন করে চাঁদ দেখতে হয় না

কাস্তের মতো চাঁদটা আকাশ ছেড়ে
ঢুকে পড়ে আমাদের ঘরে
যেন জোৎস্না! আর বাবা-মা তার নীচে দাঁড়িয়ে

কেউ বিশ্বাসই করে না—
এটাই দীর্ঘ অমাবস্যার পর প্রথম চাঁদ ছিল
…………………………………………..

আজ ঈদ ভালোবাসার পবিত্র দিন
তাজ ইসলাম

বাঁশবাগানে একটা বাঁকা ঈদ হেসে উঠতেই
লাফিয়ে উঠল একদল শিশু কিশোর উল্লাস
জোয়ারের পানিতে লাফিয়ে উঠা পুঁটি মলার মত।
ঈদ! ঈদ! ঈদ!
ঈদ ছুটে বেড়াচ্ছে মসজিদের সামনে,
বাড়ির আঙিনায় শিশু কিশোর চঞ্চল পায়ে।
সন্ধায় চায়ের কাপে খোশগল্পরত ঈদ,
শহর ছেড়ে গ্রামমুখি চাঁনরাত ঈদ
মসজিদের মাইক থেকে দ্রুতবেগে উড়ে যায় ঈদ কানে কানে।

হিংসা সমাহিত।
রাগ- ক্রোধ-ক্ষোভ,
জিগাংসা, অহমিকা সুনামীর স্রোতে ভাসে ভালোবাসার জোয়ারে।

স্বামী স্ত্রীর গিট্টুলাগা অভিমানটা এখন নিখোঁজ।
এই মুহুর্তে খোকার দাদু দাদু গোলাবর্ষনে দাদুর মন থেকে নাই হয়ে গেছে সযতনে পোষে রাখা দাদার বিয়োগ বৃক্ষ।
বেদনার দাগগুলো পুঁতপবিত্র আনন্দ রাবারে মুছতে মুছতে স্বর্গীয় ভোরের আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠে একেকটি ঈদখানা।
মুসলিম মিল্লাত এক আকাশের তারার মত তারা একতার মন্ত্রে এখন বিশ্ব ঈদখানায় সবাই ভাই ভাই।
কাতার বন্দি রক্তাক্ত আফগানিস্তান,ফিলিস্তিন,
বিপর্যস্ত রোহিঙ্গা,
নির্যাতিত উইঘুর,
ক্ষত বিক্ষত ইরাক,লিবিয়া।
ভাইয়ে ভাইয়ে হানাহানিরত সিরিয়ানরাও ঈদের আনন্দ স্রোতে গোসল সেরে ঈদখানামুখী এখন।
বদ্ধরুমে একটা সুইচ টিপলেই ভরে যাওয়া আলোর ন্যায়
বাঁশবাগানে একটা বাঁকা ঈদ উঁকি দিতেই
শিশুর সরল হাসির মত খল খল করে হেসে উঠে সমগ্র পৃথিবী।
আজ ঈদ।
দুঃখ বেদনা ভুলে
শুধু আনন্দ আর ভালোবাসার পবিত্র দিন।
…………………………………………..

নেই আমি আর বোকা
নাছির বিন ইব্রাহীম

ঈদ এসেছে সবার মনে খুশির জোয়ার নিয়ে
দস্যি ছেলে ভাবছে নেবে টাকা ফের ছিনিয়ে
খালা ফুফু ছোট মামা
দিক না যত নতুন জামা
টাকা ছাড়া মন ভরে কি ঈদে,
কে দেবেনা টাকা আবার ধরলে খোকা জিদে?

দিতেই হবে টাকা,বললো ছোট কাকা
নইলে তুমি নতুন জামা করবে ধুলোয় মাখা,
ছোট কাকা বন্ধু খোকার
বুদ্ধিও আঁটেন বেশ,
খোকার ভাগের টাকা নিয়ে ঘুরবে সারা দেশ।

খোকা এবার ভাবছে মনে মনে
ঈদের জমা টাকা নিয়ে ঘুরবে জনে জনে,
নতুন জুতো পাইনি যারা, ময়লা জামা পরে
বন্ধুরা সব মিলে যাবে তাদের ঘরে ঘরে,

ঈদের টাকা বিলিয়ে দিয়ে আনবে মুখে হাসি
তাদের নিয়ে ঘুরবে এবার হোকনা বাবা চাষি।
মনে মনে করে আঁকা ঝোঁকা
কাকাকে সে দিবেই এবার ধোঁকা,
ঈদের দিনে বুঝবে কাকা নেই আমি আর বোকা।।
…………………………………………..

ধ্বংসের আগে শহরের বর্ণনা
নোমান সাদিক

‘এভাবে কত জনপদকে আমি ধ্বংস করে দিয়েছি’-আল কুরআন

তখন বিকেলগুলো জমে উঠতো খুব
রাত যেন মোমবাতি ঝালড়ে আড়াল
ধ্বংসের আগে সে শহরে প্রতিদিন
কেঁদে কেটে ফিরে যেত একলা সকাল

দুপুরেও মরাঘুম কোথাও রমন
পাখিরা অভিজাত, নিরব কাননে
দরোজায় কারুকাজ, রক্ষী কড়াচোখে
মুসাফির ফিরে যেত ইতস্তত মনে

দরবারে কার্পেট, সুরের মুর্ছনা
ঢেকে দিতো আসন্ন দিনের ডর-ভয়
ভাড়ের বেতন বাড়ে,সৈনিকে বকেয়া
তলোয়ারে মরিচা, দিনকে দিন ক্ষয়

ব্যাবসায়ী ডানকানা, বাজখাই স্বর
ক্রমশ মানচিত্র ছোট, বিরাট সিন্ধুক
কবিরা রূপক শ্লেষে বিশেষ চতুর
প্রেমিকা ছলনাময়ী প্রেমিক মিথ্যুক

গিলাফে কোরান বন্দি, উন্মুক্ত বহস
‘প্লেটো কি নবী?’ ‘গন্তব্য কি হিন্দুস্থানে?’
মুর্তির সোকর্যে ব্যাস্ত ভাস্করের হাত
মুফতীরা পরস্পর মিথ্যুক প্রমানে

আরো কিছু দৃশ্য ছিল শহরের প্রান্তে
শহরবাসীর চোখ পড়েনি যেখানে
ক্ষুধা, রোগ, তাপদাহ, শৈত্যপ্রবাহ
আর্তের বাড়ানো হাত ধ্বংস ডেকে আনে

ধ্বংসের আগে শহরের কতিপয়
যুবক পালিয়ে গিয়েছিল দূরবাসে
আকাশের ঢাকনা খুলে নামছিল ক্রোধ,
শত্রুরা নিরবে এসে পাঁচিলের ওপাশে
…………………………………………..

বর্ণহীন ঈদ দুয়ারে
তৌফিক হাসান

পবিত্র মাহে রমজান হয়ে এলো শেষ
ঘর দুয়ারে দেয় উঁকি ঝুঁকি ঈদ,
মহামারী কালো ধোঁয়ার বিষাক্ত রেশ
ভয়াল ছোবলে অশান্তির নিদ!

দেশে দেশে মহামারীর ভয়ে মৃত্যুর সায়
সকলের অস্বস্তি ছোঁয়াচ আঘাত,
রমজানের তারাবি গৃহে বসেই আদায়
ঘরে বসেই দোয়া-দরূদ দিন রাত!

ডাঙায় ব্যাঘ্র ভাইরাসের তীব্র আকার
হটাৎ জল প্রলয়ী আম্ফান কুমির,
জলে স্থলে কুমির বাঘের মরণ হুঙ্কার
ধ্বংস ছোবলে স্বপ্ন শেষ আগামীর!

শ্রমজীবীরা কর্মহীনে খাদ্যে হাহাকার
লকডাউনে অর্থনীতিতে অচলতা,
মানব মনে সুখ উবে বাঁচার চিৎকার
জীবন তরীতে কবে যোগ সচলতা?

ঈদ কেনাকাটার নেই তো আয়োজন
ছেলে বুড়ো মলিন মুখে গৃহবন্দি,
কায়মনে ঘন ঘন বিধাতাকেই স্মরণ
কবে স্বচ্ছ আলোয় মুক্তির সন্ধি?

অসহায় কত মুখ ছিন্ন বস্ত্রে মলিনতা
ঈদের আনন্দ ভাটা পড়ে শেষ,
কত আশার উৎসবে করুণ নীরবতা
ভাইরাস আতঙ্কে মরণের রেশ!

লকডাউনে যাতায়াতের নেই উপায়
দেশ বাড়িতে কত প্রিয় প্রিয় মুখ,
তাঁরা বিনে ঈদ যাপনে মন অসহায়
আলো নিভিয়ে কোথা খুঁজি সুখ?

বাবা মায়ের ঈদ আশীর্বাদে কত মন
ছিলো চেয়ে উম্মুখ ছুটির পানে,
লম্বা ছুটির কঠোর পৈশাচিক নাচন
দম বন্ধ অবস্থা ঈদ উদযাপনে!

দল বেঁধে ঈদ জামাতে কই যাওয়া
নামাজ শেষে নেই কোলাকুলি,
আবদারে ছোটদের সেলামি চাওয়া
মায়ের রান্নার অমৃত স্বাদ ভুলি!

ঘুরাঘুরির মজা নিভে বর্ণহীন মনন
লাজ লাজ কত সাজ আঁধারে,
ঘরে বসে সবে আগামীর স্বপ্ন খনন
আলোহীনে জগতে রুদ্ধ দ্বারে!

কি আর করা ঘরেই হবে ঈদ যাপন
গরিবের মাঝে খাদ্য বস্ত্র বিলি,
সামাজিকতার সুখ পাবে না আপন
ভাইরাস তুই সবই কেড়ে নিলি!!
…………………………………………..

কেমন কাটে ঈদ
জয়নব জোনাকি

মায়ের কাছে বায়না খুকুীর একটা নতুন জামার
পরীর মতো নীল জামাটার কতই বলো দাম আর?
আদর করে হাত বুলিয়ে বললো খুকীর মা
সোনা মানিক এমন করে বায়না ধরো না!

লকডাউনে ক্ষুধার জ্বালায় চলছে করুণ হাল
কোরোনাতে সবার এখন দূর্বিষহ কাল।
এবার ঈদে ঘোরাঘুরি কেনাকাটা নয়,
বাইরে গেলে মহামারির আছে বিপদ ভয়।
অবুঝ খুকী কিনবে জামা জেদ ধরেছে খুব,
নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিলো অভিমানে ডুব।

মা বুঝালো সঙ্কটে দেশ মরছে গরীব হায়!
তোমার মতো কতো শিশু থাকে উদোম গায়।
এমন করেই দিন গড়িয়ে কাটছে ওদের রাত,
ছেঁড়া জামায় দেহ ঢেকে হয়যে বছর পার-
ওদের প্রতি বাড়ায় না কেউ দয়ামায়ার হাত।

বারমাসই বন্দী জীবন পথের শিশু সোমার
বুকের মঝে ক্ষুধার বিকট শব্দ বাজে বোমার।
অনাহারে একলা ঘরে পায়নি আদর ও মার!
বলো এবার বন্দি ঘরে কেমন কাটে তোমার!
বেদনাতে উঠলো ভরে ছোট্ট খুকীর বুক
কল্পনাতে দেখলো সোমার অশ্রুভেজা মুখ।

খুকী এবার মায়ের কথায় শিক্ষা নিলো বেশ
পথশিশুদের কষ্টে নিজের ইচ্ছে হলো শেষ।
নতুন জামা কিনতে খুকী করেনি আর জিদ,
বুঝলো সে আজ গরীব দুখির কেমন কাটে ঈদ।
…………………………………………..

খুকুর ঈদ
শারমিন সুলতানা

কেন তোমার মনটি খারাপ
খুলে আমায় বলো
লাগবে তোমার ঈদের জামা
আমার সাথে চলো।
একটু হেঁসে বলল খুকু
লাগবেনা নতুন জামা
এই দুর্যোগে ঘরেই থাকো
বাইরে যতে মানা।
ছোট্ট শিশু বুঝে গেল
আমার মনের কথা
বড়রা কেন খোঁড়া অভিযোগে
যাচ্ছ যথাতথা।
…………………………………………..

নিরানন্দ ঈদ
নূর মোহাম্মদ

গগণ-কোণে ঈদের চাঁদ
হাসলো রোজার পরে,
কিন্তু তবুও নয়ন থেকে
রাবেয়ার জল ঝরে।

জননী তার পাড়ায় ঘুরে
বাবায় মাটির তলে,
ঈদের আনন্দ মিশে গেলো
যমুনা নদীর জলে।

পরণে তার ছেঁড়া কাপড়ে
দেখা যায় গো ময়লা,
দারিদ্রের অনলেতে পুড়ে
জীবন হলো কয়লা।

কদম দু’টিতে জুতো নেই
অগোছালো রুক্ষ চুল,
শেকড়ের জন্যে মরে বৃক্ষ
ফুটে না সুখের ফুল।

পিঠে-সেমাই খাবে কীভাবে
জোটে না সর্বদা অন্ন,
তবু রাবেয়া ঝিনুক-মাঝে
মুক্তো খুঁজে করে তন্ন।

মেহেদী পাতার রঙে তার
হাত হয় নাতো লাল,
প্রসাধনীর অভাবে শুষ্ক
কৃষ্ণবর্ণ দু’টি গাল।

দু’নয়নের স্বপ্ন কেবল
শকুনের মতো ওড়ে,
ওদিকে ধনীর দুলালীরা
মাতে আনন্দের ঝড়ে।

গায়ে ওদের রঙীন জামা
সাজ-সজ্জার বাহার,
নঁকশী পিঠা-মাংস পোলাও
করবে কত আহার!

খুশির সীমা নেই ওদের
রাবেয়া কাঁদে গো দুখে,
করুণা করে একটু খাদ্য
তুলে দাও তার মুখে।

একটু করুণা তার মনে
আনবে খুশির বান,
আল্লাহ পাকের দরবারে
বাড়বে তোমার মান।
…………………………………………..

ঈদ আগমন
জাহাঙ্গীর চৌধুরী

মুসলিম দোরে ঈদ আগমন,
বিষাদ কুহোরে মানব জীবন।
অশন শূন্য আজ অশরণ,
গতরে তাদের ছিন্ন বসন।
ঈদ মুসলিমের খুশীর দিন
মিলে মিশে নামাজ পড়ার দিন।
ফেতরা জকাত বস্ত্র করে দান
মানবো আমরা বিধির বিধান।
মানুষ হলো আল্লার বান্দা,
মানব সেবায় হব’না আন্ধা।
পুলকিত রাখবো সবার মন,
যার আঙ্গিকে সাধ্য যেমন ।
ভালোবাসেন মানুষ যেজন
প্রভুর রহমত পান সে জন।
ধর্ম কর্মতে থাকবো সাফ ,
আখেরে আল্লাহ করবেন মাফ।।
…………………………………………..

এবারের ঈদ
মুন্সী মোঃ তোফায়েল আহমেদ

এবারের ঈদটা একটু ভিন্ন রকমের,
একদিকে করোনার প্রভাব,
অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড় তান্ডবের ক্ষতি।
এবারের ঈদটা একটু অন্য রকমের,
একদিকে ঘরের ভিতরে থাকা,
অন্যদিকে ঘর না থাকা।
এবারের ঈদটা কাটাবো অন্য রকমের,
একদিকে মেনে চলবো সামাজিক দূরত্ব,
অন্যদিকে উপকূলীয় ও তার আশেপাশের মানুষদের বিভিন্ন ক্ষতি হওয়ায় তাদের সাহায্য করবো।
এবার ঈদে না হয় না করললাম কোলাকুলি,
এবার ঈদে না হয় না রাখলাম হাতে হাত মিশে,
এবার ঈদে না হয় না নিলাম সেলামী,
কিন্তু সম্পর্ক থাক হ্নদয় মাঝ।
আর এবার ঈদে সকলে সর্তক হয় করোনা থেকে,
এবার ঈদে সকলে মিলে দাঁড়াই ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্ত সবার পাশে।
একটি মাস রমজানের শিক্ষা
(ধৈর্য, একতাবদ্ধতা, একে অন্যকে সহযোগী ইত্যাদি)
নিয়ে করবো সবাই করোনা ও ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের ক্ষতি প্রতিহত।
এবারের ঈদটা না হয় পালন করি
আমরা সকলে অন্যরকম।
…………………………………………..

ঈদের খুশি
আমানত উল্লাহ সোহান

এলো ঈদ
গেলো নিদ
এলো খুশির ঝিলিক,
মনের ঘাটে
ঝগড়া বাটে
হাজার খুশির হিরিক ।

ছুটবো আমি
ছুটবে তুমি
কতো খুশির গল্প,
পরীর দেশে
যাবো হেসে
আঁকবো হাজার কল্প ।

সুখের নদী
নিরবধী
বাইবো সুখের খেয়া,
দুখের চুলে
দেব ভূলে
সবুজ রঙের কেয়া ।

টানবো বুকে
পরম সুখে
ধনী গরীব সবি,
তাদের তরে
পরাণ ভরে
লিখে হবো কবি ॥

ঈদের নামায
দুখের সমাজ
নেই ভেদাভেদ কোনো,
দুখ ভূলিতে
রং তুলিতে
সুখের হাসি বুনো ॥

ঈদের সালাম
হাজার সালাম
সবার সুখের তরে,
ঈদের খুশি
পরাণ পুশি
থাকুক পরাণ ভরে ॥
…………………………………………..

অনাথের ঈদ
আবু কওছর

ঈদের খুশি সবার ঘরে
আমার কেন মানা?
বন্ধুরা সব কিনছে মাগো
নিত্য নতুন জামা।
গরীব বলে আমাদের কি
ঈদের খুশি নাই?
সবার বাবা আছে মাগো
আমি কোথায় পাই?
ইরা নীরা বাবার সাথে
ঈদ বাজারে যায়,
আমার বাবা নাই ভুবনে
ভাবলে কান্না পায়।
জানি মাগো আমার প্রশ্নের
কোন উত্তর নাই,
অনাথ-এতিম ছেলে মেয়ে
নাই কোথাও ঠাই।
আর কেঁদনা মাগো তুমি
চাইনা নতুন জামা,
বাবার মতো ফাঁকি দিয়ে
তুমি চলে যেওনা।
দোয়া করো আমায় মাগো
তোল তোমার মুখ,
বড় হয়ে মোছাবো মাগো
তব মনের দুঃখ।
…………………………………………..

ঈদের দিনেও
রবিউল হুসাইন

আজ আমাদের খুশির ঈদ
আনন্দের এই দিনেতেও তাই
দু’চোখে আসে না নিঁদ
সারাটি রাত জেগে থাকি
তবু কিছুই ভেবে না পাই
এমন সুখটি কোথায় রাখি
ঈদগাহতে নামাজ পড়ে
সবার সাথে কোলাকুলি
শেষে যাই ময়দান ছেড়ে
যাত্রা করি বাড়িমুখী
বড়দের দেই সালাম নেই পদধূলি
আর দেয়ালে মায়ের মুখ দেখি
আমার মতো দুঃখী জন হায়
কেন অসহায় আর হতভাগা
মা-হারানো জীবন ধারায়
মায়ের কথা মনে করে
ঈদের দিনেও এই অভাগা
চোখের জলে কেঁদে মরে।
ঈদের খুশি আনে চাঁদ
শিউল মনজুর
চাঁদের হাসি মধুরহাসি
ছড়ায় সুখ রাশি রাশি।
চাঁদের আলো
খুউব ভালো।
অন্ধকারে জ্বালায় বাতি
চাঁদ মামা পথের সাথী।
চাঁদের আলোয় পরি আসে
বাগান জুড়ে জোনাক হাসে।
ঈদের খুশি আনে চাঁদ
মুছে দেয় মনের খাদ।
ঈদের দিনে সবার মুখে
চাঁদের হাসি পাই,
ঈদের দিনে ঘুরে ঘুরে
বন্ধুর বাড়ি যাই।
…………………………………………..

ঈদ মানে তো
আ.ফ.ম. মোদাচ্ছের আলী

ঈদ মানেতো নতুন জামা
নতুন জুতো নতুন আশা,
ঈদ মানেতো সবার মাঝে
দাও ছড়িয়ে ভালোবাসা।
ঈদ মানেতো নয় শুধু তাই
এক পরিবার সুখ
ঈদ মানেতো দাও ঘুচিয়ে
অন্য সবার দুখ।
ঈদ মানেতো দেশের তরে
ভালোবাসার পণ
ঈদ মানে তো করবো জয় আজ
সব মানুষের মন।
…………………………………………..

ঈদের জামা দিলেন মামা
নুরুন্নাহার শিরীন

খুকুর মামা আঁকেন ভালো।
কাক আঁকতে ভাবেন- কাকটা কেন কালো?
তাইতো তিনি সাদা পাতার বুকে
রঙিন সে এক কাক আঁকেন ঝুঁকে।
দেখতে সে হয় মস্ত যেন প্যাঁচা।
দেখেই খুকু বলে- ও মামা, কিনে আনো খাঁচা।
খাঁচা কিনতে মামা গেলেন হাটে।
হাটে গিয়ে চড়ে বসেন খাটে।
দোকানিরা যতই বলে নামেন
ততই মামা খেপে বলেন- থামেন ভাই থামেন।
অবশেষে দোকান থেকে একটা লাল জামা
খুকুর জন্য কিনে আনেন মামা।
আকাশে তখন ঈদের বাঁকা চাঁদ।
আনন্দে খুকু ধরে মামার হাত।
ছবির প্যাঁচা পড়েই থাকে পাতার বুকে।
আঁকাঝোঁকা ভুলে মামা সেমাই খান সুখে।