জীবনে রাঙা ভাঙা হাজারো সময় পেরিয়েছি মহান রাব্বুল আলামিনের অসীম দয়ায়। তাঁরই দয়ার কারণে আজো বেঁচে আছি এই মাটির পৃথিবীতে। তাই প্রশংসা শুধু তাঁরই জন্য।আমাদের শৈশব জীবনে স্কুলে কত বন্ধু ছীলো, ছিলো স্নেহ মমতা ও ভালোবাসা। আমাদের একের প্রতি অন্যের যে ভালোবাসা ছিলো তা কালের বিবর্তনে তা আজ অনেকেই হারিয়ে গেছে চিরতরে আবার কিছু আজো অম্লান হয়ে আছে হৃদয়ের প্রতিটি তারে তারে। সেই বন্ধুদের কাউকে আজো ভোলা যায় না। আমরা যখন জোট বেঁধে চলতাম, সকলের বাড়ি নিজের বাড়ি মনে করতাম।সকলের মা বাবা ভাই বোন যেমনটি ছিলেন ওরা আমাদের সবাইর। ওরা সবাই আমাদেরকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন, আদর করতেন। ভোরের আযান হলে আমি ও আমরা ছুটে যেতাম মসজিদে নামাজ পড়ার মানসে আবার জোহর আছর মাগরিবে যোগ দিতাম মসজিদে। মাগরিবের নামাজ পড়ার পর চলে আসতাম বাড়িতে, এসে পড়ার টেবিলে বসতাম। মা নাস্তা দিতেন। খেতাম পরে পড়তাম। এশার নামাজ পড়ে রাতে খেয়ে ঘুমোতাম আর ভোরে পাখির কলকন্ঠে ও মোয়াযযিনের আষানের ধ্বণি শুনে জেগে ওঠে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে এসে পড়ার টেবিলে বসতাম।

মা নিয়মানুযায়ী সকালের নাস্তা দিতেন। খেয়ে দেয়ে গোসল করে আবার পান্তা ভাত বা গরম ভাত খেয়ে বই খাতা কোলে নিয়ে স্কুলে যেতাম। দুই টাকা নিয়ে স্কুলে যেতাম কোন সময় নিতেও পারতাম না। এই দুই টাকা দিয়েই বিরতির পর কিছু খেতাম তাতে আবার বন্ধুদেরকে সাথে রাখতাম আনন্দ লাগতো যা ঈদেও এমনটি হতো কম। আমাদের এই আনন্দের ধারায় আমরা প্রত্যহ অবগাহিত হতাম। কৈশোর বয়সে বন্ধুদের বাঁধন আরো সুস্নিগ্ধ হতে শুরু করেছে,তাই একে অপরের খোঁজ খবর নেয়া দেয়া থেকে কখনই বিরত থাকিনি আমরা। বিকেল বেলায় স্হানীয় স্কুল মাঠে বল ও ক্রিকেট খেলতাম; সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের আযান পড়লে ছুটি, নামাজ পড়ে সোজা যে যার বাড়ি চলে যেতাম। আমাদের সেই বন্ধুদেরকে কোন পাড়ার লোক খারাপ দৃষ্টিতে কখনো দেখেনি তার কারণ হচ্ছে আমরা জীবনে কখনই মন্দ কাজে জড়িত হইনি এমনকি দরিদ্র অসহায় মানূষের পাশে দাঁড়াতে তখনও আমাদের মাঝে সেই ভাব ছিলো এবং আমরা সবাই সুশৃংখল ছিলাম। সেই বয়সে গ্রামের বাড়িতে প্রত্যেকের কিছু না কিছু নারিকেল গাছ ছিলো, আমরা আমাদের গাছের নারিকেলের ডাব পেড়ে খেতাম।

বৈশাখে গাছের পাকা আম জাম খেতাম দল বেঁধে। কিন্তু কখনো কারুর গাছ থেকে পেড়ে খাইনি। এইগুলো আমাদের মাতা পিতা ভাই বোন সবাই ভালো করে জানতো। আমাদের ভাই বোনের বিয়েতে আমাদের একে অপরের দাওয়াত থাকতো যেন আমরা ছাড়া কোন সুন্দরই সুন্দর বলে প্রতীয়মান হতো না। বর্ষ মৌসুমে রাতে পড়ার পর মাছ ধরতে বের হতাম। কখনো পেতাম বেশি কখনো কম। বাড়ি এসে ভাগাভাগী করে নিতাম। মজার কথা হচ্ছে যে বাড়িতে মাছ ভাগ হতো, সেই বাড়িতেই আবার ভাত খেতাম। এইভাবে জীবনের কৈশোর কাটালাম আমরা। ঈদের সময় এলে বিশেষকরে রোজার সময় রোজা রাখতাম, ভাঙতামও। বাড়ির শাসন ত্রাশোসনে রোজা ভাঙা যেত না কিন্তু অনেক সময় ভাঙতাম পানির তৃষ্ণায় আর তা মেটাতাম পুকুরে গোসল করতে গিয়ে ডুব দিয়ে পানির নিচে পানি খেয়ে পেত ভরাতাম এই ভেবে যে ওখানে কেউ দেখবে না কিন্তু সীমাবদ্ধ জ্ঞান পেরুলো যখন তখন বুঝতে পেরেছি যে আল্লাহ সোবাহানাতাআলা সবখানে সবত্রই বিরাজমান এবং তিনি সব খবরই রাখেন আর ক্যামেরায় বন্ধী করে রাখেন আমাদের সব। তাই সুজ্ঞান হওয়ার পর থেকে আজ অবধি রোজা ভাঙিনি।

রোজার ঈদের আগের দিন রাত আমি ও আমরা একত্রিত হতাম। টিভিতে আনন্দ মেলা দেখতাম। অনেক কথার ফুলঝুরি ফুটিয়ে শেষতক বাড়ি গিয়ে ঘুমোতাম। ভোরে মা জাগিয়ে দিতেন ফজরের নামাজ পড়ার জন্য। ফজরের নামাজ পড়ে যখন বাড়ি আসতাম ততক্ষণে মা শেমাই রান্না করে রাখতেন আর আমি ও আমরা এসে খেতাম। এর পর ঈদের নামাজ পড়তে মসজিদে যেতে হতো। কি আনন্দ লাগতো বলে শেষ করা যাবে না। নামাজ পড়ে বন্ধুদের সাথে দেখা, তাদের বাড়িতে যাওয়া আসা হতো। ঈদের দিন মা বাবা টাকা দিতেন আর তা দিয়ে বাঁশিসহ নানান খেলনা সামগ্রী কিনতাম আর তাতেই মহানন্দ লাগতো। এর পর বাড়ি এসে সবার ঘরে ঘরে যাওয়া হতো মা’কে জেঠীকে সালাম করতে হতো আর তাতে টাকাও পেতাম। তারপর ঘরে এসে মা’য়ের হাতে রান্না করা গরুর গোস্ত দিয়ে ভাত খাওয়া কি যে আনন্দ আহ! তা কি ভোলা যায়?

ঈদের দিন বিকেলে বিবাহিত ও অবিবিহিতদের মধ্যে ফুটবল খেলা প্রতিযোগিতার আয়োজন হতো আমরা তা উপভোগ করতাম অতি সানন্দে। মাঠের চারিদিকে ভীড় ভীড় জনতা। GOAL GOAL সোরগল ধ্বণিতে মুখরিত হতো দশদিক। সব খেলায় বেশিরভাগই অবিবাহিতরা বিজয়ী হতো আমরাও তাদের দলে থাকতাম বলে বেশি হই হুল্লুড় করতাম। খেলা শেষ হলে সবাই জড়াজড়ি করে মাঠ ত্যাগ করত। বড়রা ছোটদেরকে স্নেহ করত আর ছোটরা সর্বদাই বড়দেকে শ্রদ্ধা করত-শ্রদ্ধার চোখে দেখত যা এখন খুব কমই পরিলক্ষিত হচছে। যে পুলিশ ক্লাশ এইট পাস করা, সে যখন বিশ্ব বিদ্যালয়ের ছাত্রকে গালি দেয় ও পিটায় তখন আর নিজকে শিক্ষিত বলে মনে করতে খারাপ না লাগলেও ভালো লাগে না।

সে যাহোক, পূর্বের কথায় ফিরে আসি। ঈদের আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতাম ভাইয়েরা কখন বাড়ি আসাসবে .আমার জন্য ভাই বোনের জন্য জামা কাপড় আনবে কিন্তু তারা কোন ঈদে আসত আবার কোন ঈদে কেউ আসত না তবে টাকা পাঠিয়ে দিতেন কিন্তু তাতে মা খুশী হতেন না। তবু ভাইদের চাকরির ঝামেলা থাকার কারণে তারা যেহেতু আসতে পারত না এই জন্য মা’কে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিতেন তাদের না আসার কারণ। আমার মায়ের ছিলেন দুই ভাই তাঁরা দুইজনই আফিসার ছিলেন তাঁরা আমার মায়ের ও আমাদের খোঁজ খবর ঠিকই রাখতেন আর মামাদের সহযোগিতার কারণেই আমরা ভাই বোন শিক্ষার আলো দেখেছি। দুই ভাই সরকারী চাকরি করতেন আর আমি ছোট। আমি একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছি। মা আমাকে সবচেয়ে ভালোবাসতেন আর মৃত্যৃর আগ পর্যন্ত মা আমারই কাছে ছিলেন। মায়ের স্নেহ মমতা ও ভালোবাসা ভুলার নয়। এখন ঈদে আসছে মা নেই কিন্তু আমার সেই চোখ সারা রাত দিন আজো মা’কে খুঁজে বেড়ায়। আমার কন্ঠে আমার গান বেজে ওঠে প্রায়শ রাত-বিরাতে
মাগো তোমার ডাক সুমধুর
যায়নি বহুদর।
আজো আমার কাণে শুনি,
তোমার ডাকের ধ্বণি।
সব হয়েছে হইনি আমি
তোমার থেকে দূর
যাইনি বহুদূর

আজ জীবনের উন্নতিতে ও পড়া লেখার উন্নত দ্বার যখন উম্মিলিত হয়েছে তখনই মা বাবা এখন চলে যেতে হচ্ছে বৃদ্ধিশ্রমে যা আগে কখনই ছিলো না। প্রতিটি ঈদে মা বাবা ছেলে মেয়েদেরকে নিয়ে খুশীতে ঈদ উদযাপন করতেন, ছেলেরা মাথা উপরের দিকে রেখে মা বাবাকে সালাম জানাত আর মা বাবা ছেলেদের মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করে দিতেন। তাতে করে মা বাবাদের মনে প্রশান্তি আসত আর ছেলে মেয়েদের মনও আহ্লাদে ভরে ওঠত আর এখন তা খুব কম দৃশ্যমান যা হওয়ার কথা ছিলো না তা হচ্ছে আর হওয়ার কথা তা হচ্ছে না তবুও ঈদ আসে ঈদ আসবে আমাদের প্রাণ বিধুরিত হোক পূণ্যর আহ্বানে এই কামনা করি রাব্বুল আলামিনের কাছে।