নব্বই দশকেই বাংলা কবিতার যে নতুন পর্ব শুরু হয়েছিল তার চূড়ান্ত রূপ ফুটে ওঠে শ্রীজাতের কবিতায়। সমাজ এবং ব্যক্তিগত দুই পারিপার্শ্বিক নিবিড় ক্ষেত্র থেকে শিল্পী তাঁর জগৎ খুঁজেছেন। শব্দ, উপমা, মাত্রা, পর্ব, মিলের অভিঘাত যেমন বাহ্যিক প্রকাশে ধ্বনি সাম্যের অনন্যতা এনেছে, তেমনি বুদ্ধিদীপ্তির সঙ্গে আত্মরসায়নের স্বচ্ছন্দ অনুঘটন এক মৌলিক রূপটানে উপস্থিত হয়েছে। শ্লেষ, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের সঙ্গে আত্মতার ঘোর অভিনিবেশ সাবলীল ও সরাসরি আত্মপ্রকাশে কবিতা সজীব, প্রাণময়। সেখানে ভাঙচুর ঘটেছে, বক্রোক্তি বিরোধাভাসে জীবনের অনেক নঞর্থক শূন্যতা ধরা পড়েছে, তবু শেষ পর্যন্ত সদর্থক অস্তিবাদকেই খুঁজে পেতে চেয়েছেন। যে জীবন নিয়ে শ্রীজাত জন্মেছেন, যে পরিবেশ পরিস্থিতি তাঁকে বিচলিত করেছে, যে স্বপ্ন-চপলতা তাঁর দরজা খুলতে চেয়েছে, যে নারী-বন্ধুত্ব তাঁর মনোযোগ দাবি করেছে–

সেসব সম্পর্ককে তিনি আড়াল করেননি। জীবনের টানাপোড়েন অভাব-শূন্যতাকে আত্মস্থ করেই কামে-প্রেমে-স্বপ্নে-ভোগে-ত্যাগে জীবনকে উপভোগ করতে চেয়েছেন। নিজের অতীত আর বর্তমানকে নিয়েই তাঁর যাত্রা, ভবিষ্যৎ নয় মুহূর্তের আবেগে যতদূর নিজের ছায়া দেখতে পান, ততদূরই হাত বাড়ান, আর ততদূরেই উঠে আসে সময়ের স্বরলিপি। তাঁর ক্ষতগুলি উন্মোচিত হয়। গোপনতা প্রকাশিত হয়। নিজের প্রতি যেমন নির্মম, তেমনি সদয়ও। যে পথে ঠেলে দেন তা সবসময় সুখের নয়, দুঃখেরও, চোখের জলের, বেদনার এবং বিস্ময়েরও। এক কৌতুকের ভেতর দিয়ে পাঠককে নিয়ে যেতে চান, কখনো রূপকের ভেতর দাঁড়িয়ে থেকে সম্পর্ক নির্ণয় করেন। ব্যক্তি অনুভবের বারান্দায় চাঁদ-পৃথিবী-আকাশ-মাটি-গান এবং স্তব্ধতাও কবির সত্তায় অনিবার্য ভূমিকা হয়ে ওঠে। স্বপ্নের বিভূতি জাগরণের নিঃশ্বাসে পা-তোলা পা-ফেলা জীবনের ছন্দ-মুগ্ধতায় মিশে যায়। আত্মা শরীরের কাছে ধরা দেয়, ভাবনা মনের ফসলে ফলে ওঠে, ব্যক্তির নিরিখে মানব-রস পরিবেশিত হয়। আদিরস কখনো কটুকথার তিক্ততায় ভরা, কখনো রসিকতায় হালকা, নাগরিক ভদ্রতায় সলজ্জ, কখনো আলাপী নিষ্ঠাবান। কিন্তু সবক্ষেত্রে কৃৎকৌশলে ধোপদুরস্ত, বিন্যস্ত, সুন্দর ও স্বভাবদক্ষ।

‘উড়ন্ত সব জোকার’ বইয়ের ভূমিকায় শ্রীজাত জানিয়ে দিয়েছেন:
‘এবার খেলা অন্যরকম হোক–
জলখাবারের-গল্প শুনুক লোক
তেল-আগনের কাছে।’

তখন বুঝতে পারি আঁশবটিতে কুচিয়ে নেওয়া চাঁদের সঙ্গে আড়াইশো গ্রাম লাল-নীল আহ্লাদের কীরকম রান্নাবান্না। তারপরেই টাটকা কিছু ক্ষতও পরিবেশন করেন তার সঙ্গে। প্রতিনিয়ত আমাদের ব্যক্তি-অবয়ব যেভাবে কুঞ্চিত, দীক্ষিত এবং বিভক্ত হয়ে পড়ছে তাতে ঐতিহ্য উত্তরাধিকার এবং ধারাবাহিক বিশ্বাস বজায় রাখা কঠিন। তখনই অন্যতর খেলায় নামতে হয় আমাদের। জীবনকে অন্যভাবে পরিমাপ করতে হয়। তেল-আগুন দুই-ই দাহ্য-দাহক, অস্তিত্বের নিঃশেষ নির্যাস সেখানেই। বেঁচে থাকাটাই জলখাবারের গল্প। সুতরাং বিশেষণও তার জায়গার বদল করে। উপমানও উপমেয় হয়ে যায়। ক্রিয়াও তার বাহ্যিক ক্রিয়া হারিয়ে ফেলে।কর্তাটি বিভক্ত মানুষ। সমস্তই ডিগবাজি খাওয়া উড়ন্ত জোকার। সেসব জোকারের হাসি তামাশায় কখনো কখনো দার্শনিক উক্তিও বেরিয়ে আসে :

‘জীবন কিন্তু প্রেমদিওয়ানা, সাবধানে তার গায়ের গন্ধ শুঁকো–
বলছে আমায় উড়ন্ত দুই পাগল। জোকার দেরিদা আর ফুকো।’
(উড়ন্ত সব জোকার)

এই প্রেমদিওয়ানা জীবনের কথাই বারবার ফিরে এসেছে প্রতিদিনের জীবনে। ‘রঞ্জিনীকে লেখা চিঠি’তে রবীন্দ্রনাথের ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’ ব্যক্তির অকৃতকার্যতায় ‘ঢপের আকাশ, সূর্য, তারা…’ হয়ে যায়, আর সেই কারণেই ‘স্বপ্নগুলোও বাস্তুহারা’। সুতরাং প্রেমের ইতি টেনে নিজেকে ‘ফালতু লোক’ বলে জানিয়ে দিয়েছেন। তবু প্রেমকে বারবার শুঁকেছেন। দেহের স্বাদেই তাকে পেয়েছেন। ইন্দ্রিয়েই উপলব্ধি করেছেন– এরকম বোধ থেকেই লিখেছেন:

‘এখনও লোক হাঁপায় আর টিকটিকিরা দেয়ালে মাথা কোটে
এখনও প্রেম জনপ্রিয়। এখনও টবে গোলাপফুল ফোটে…’
(ধর্ম)
আর এই জন্যই কবি’র স্বীকারোক্তি:
‘তোমার কথা ভাবলে আজও পুরুষাঙ্গ শক্ত হয়ে ওঠে’
‘ছোটদের চিড়িয়াখানা’ বইয়েও কবির অনুভব:
‘দেখি জীবন কত ছোট’

বলেই জীবনকে ভোগের নেশায় নামিয়ে দেন। কিন্তু ভোগের মধ্যেও সুখ থাকে না। ‘চুমু বিষের চেয়েও তেতো….’ হয়ে যায়। তখন সবই জৈবনিক, মানিয়ে নেওয়া জীবনের অভ্যাস ফিরে আসে। অলীক অবস্তুতে মিইয়ে যায় প্রাকযৌবনের স্বপ্ন:
‘আচার ভেবে চেখেছিলাম ক্ষত
তুমিও চুমু ভাতের সঙ্গে খেতে
এখন আমি কারিগরের মতো
ছাইয়ের ঘর বানাই অ্যাশট্রেতে’
(ছেড়ে যাওয়া)

প্রেমে আঘাত অভিযোগ সবই থাকে, থাকে বিচ্ছেদও। গরম-ঠান্ডা সম্বন্ধ। তবুও অভাবের দিনে চুমু খেয়েই বেঁচে থাকা যায়। কিংবা নাসির-শাবানা হয়েই থাকা যায় একটু দূরে দূরে। সব সময় সহজ লোকের মতো সবকিছু স্বাভাবিক ঘটবে তা তো নয়। ছন্দের মাত্রা বাড়া কমার মতোই জীবনও ঢালু পথ ছেড়ে উল্টো পথেও এগিয়ে যায়:
‘খ্যাপা উল্টো স্রোতেই সাঁতরায়
তার দু’মাত্রা তিন মাত্রায়
কিছু যায় আসে না আজকাল’
(প্রেমপর্ব)

এভাবেই ‘ভোলামন পোস্টমডার্নিয়া’ গেয়ে চলেছেন ‘সন্দেহ তত্ত্বের গান’। নিজেকে নিজের মতোই উপস্থাপনা করেছেন। দেশ-কালের অসামঞ্জস্য পরিস্থিতিকে আত্মস্থ করেই সাময়িকের আরাম আহ্লাদেই তাঁর প্রাপ্তি বুঝে নিতে চেয়েছেন:
‘এসো আমরা ঘুমোই একটু
এই শেষবার জড়ামড়ির অসহ্য আহ্লাদ
পায়ের নীচে ফালতু মাটি
মাথার ওপর টেম্পোরারি চাঁদ…’
(জাজমেন্ট ডে)

প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকেই দেখেছেন মন্দ কপাল, প্রতারক, যৌনব্যবসায়ী. নিঃসঙ্গতা– আর সে-সবই প্রাত্যহিক জীবনের এক-একটি প্রচ্ছদ, কাহিনির প্রেক্ষাপট। তখন মনে হয় এসব রঙ্গও আমাদের সভ্যতার ভঙ্গুর ছায়াচিত্র যা প্রতিনিয়ত ধ্বসে পড়ছে আর আমাদের অভিযোজন ঘটছে:
‘সামনে রাস্তা।জল আগুনের কেচ্ছা
অন্ধকে পথ বাতলে দিচ্ছে বেশ্যা’
(রওনা)

বেশ্যার জীবনের পথ যেখানে রুদ্ধ, অন্ধও সেই বেশ্যার চোখে পথ দেখছে– এ যেমন স্বচ্ছ নয়, তেমনি অসম্পূর্ণও। সভ্যতার এই নিরবচ্ছিন্ন যাত্রায় কবিরও সদ্গতি এই কবিতাটির শেষ দুই চরণে:
‘জানালা হাঁ মুখ। দেয়াল ভর্তি সাপখোপ…
নতুন বাড়ি, নতুন করে থাকব।’
এখানেই জীবনকে মানিয়ে নেওয়া অথবা ভালোবাসা দুইয়েরই দেখা মেলে।

বাস্তব সময়ের পরিধি কীভাবে আমাদের গ্রাস করেছে; মৃত্যু ধর্ষণ সন্ত্রাস প্রতিমুহূর্তে খবর তৈরি হচ্ছে; কত রকম টিভি চ্যানেল, প্রতিহিংসার এক ঝগড়ামাখা পৃথিবীর রূপ দেখতে পাচ্ছি চারিদিকে। বস্তা থেকে কাটা মুন্ডু বেরোচ্ছে। এসব দেখতে দেখতে টিউশনির রোজগার শূন্য ব্যক্তিটি নিজের কাছে ধরা পড়ে যান। তখন লিখতেই হয়:
‘শান্তি নেই। শান্তি নেই। শান্তি
চাঁদের মতো কাটামুন্ড উঠেছে,
উঠেছে কালো আকাশে…’
(প্রতিহিংসা)

ঝলসানো রুটিৱ থেকেও ভয়ঙ্কর এই চাঁদ। উপমেয়টিই উপমান হয়ে গেছে এখন যুগের প্রেক্ষিতেই। পর্যবেক্ষণেরও এক সূক্ষ্ম মননে শ্রীজাত আমাদের ভাবিয়ে তুলেছেন।

শুধু আড্ডাবাজ আত্মকথার ভিড়ে তিনি হারিয়ে যাননি; হই-হুল্লোড় দিনলিপির ভেতর থেকেও বেড়াল, সিংহ, সাপ, মুরগি, ব্যাঙ, প্যাঁচা, বাদুড়, হায়না, বাঘ,পিঁপড়ে, কচ্ছপ, কুকুর, জেব্রা প্রভৃতি প্রাণীর রূপকে নিবেদন করেছেন নানা তথ্য। জৈবিক প্রবৃত্তির টানে সেসব নির্ণীত চরিত্রগুলির ভেতর নিজেও দাঁড়িয়েছেন। আত্মস্বরূপ উন্মোচন করেছেন। কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছেন, কিংবা কীভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তারও পরিচয় আছে। ছোটদের চিড়িয়াখানা তখন বড়দের এক-একটি আবিষ্কারে ভর্তি হয়ে গেছে। রূপকগুলি কী বলছে তার কয়েকটি নমুনা:

সিংহ :
‘ঘুমন্ত, আমি ঘুমন্ত,
আমি ঘুমন্ত
তবু সিংহ!’

মুরগি:
‘আমরা কিন্তু এই বাজারেও
সস্তা এবং দারুণ খেতে!’

ব্যাঙ:
‘ভেজা আড্ডা
দুটো বন্ধু
লোকে বলছে
কূপমণ্ডুক ‘

হায়না:
‘যেমন আমি রক্ত চাটা শিখছি, তবে আস্তে
ওরও একটু সময় লাগবে ঘড়ির কাঁটা বাছতে…’

বাঘ:
‘এখন কী আশ্চর্য, আমার গায়ে, আমার মুখে,
আমার চলাফেরায়, অবিকল বাঘের গন্ধ।’

কুকুর:
‘আমিও কেমন কুকুর হয়ে গেছি
চাটার আগে শুঁকে দেখছি তোমায়’

এভাবেই চিড়িয়াখানার জন্তু জানোয়ারেরা মানুষ হয়ে উঠেছে। এক-একটি চরিত্র লাভ করেছে আমাদের সমাজে। যাদের খুব চেনা, খুব কাছের ও বহুবার দেখা মনে হয়। এসবই উঠে আসে কবিতায়।

অন্ত্যমিল, পর্বমিল এবং শব্দ ব্যবহারে ধ্বনিসাম্যের বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষাও শ্রীজাত করেছেন। সব মিলিয়ে এমন এক অভিঘাত আমাদের দোলাতে থাকে, যাতে কবিতাপাঠে বিরক্তি আসে না, বরং দ্রুততার সঙ্গে এক গতিময় ধ্বনিঝংকারে ঝরনায় স্নান সেরে উঠি। ‘বর্ষামঙ্গলে’র কবিতাগুলোতেও ‘খুশিমাছ, ডিমের বিরহ’ পড়তে পড়তে বাংলা শব্দার্থের এমন ব্যবহার আছে জানতে পারি। খুব সহজভাবেই শ্রীজাত আমাদের মরমে প্রবেশ করেন, আর মিলে-ছন্দে-সুরে আমাদের অমিলকে সুন্দরতায় ভরিয়ে তোলেন। জীবন ও জীবনের বৈপরীত্যকে নাড়িয়ে তোলেন।