চরি­ত্র চরি­ত্রশক্তি

রায় নরে­ন্দ্র­নাথ সেন বল­তেন, ‘এশিয়া আধ্যা­ত্মি­ক­তায় ইউ­রোপ অপে­ক্ষা শ্ৰেষ্ঠ। ইউ­রোপ এশিয়ার কা­ছে আধ্যা­ত্মি­ক­তা শি­খুন—’ এ কথার অর্থ আমি এখনও বু­ঝি না। জ্ঞান, চরি­ত্র, মনু­ষ্য­ত্ব ও কর্ম ছাড়া যদি আধ্যা­তি­ক­তা স্ব­ত­ন্ত্র জি­নিস হয়, তবে সে আধ্যা­ত্মি­ক­তায় কোন কা­জে নেই।

মা­নু­ষের মূল্য কো­থায়? চরি­ত্র, মনু­ষ্য­ত্ত্ব ও কর্মে। বস্তুত চরি­ত্র বল­লেই মা­নু­ষের জী­ব­নের যা কি­ছু শ্রে­ষ্ঠ­তা বু­ঝ­তে হবে। চরি­ত্র ছাড়া মা­নু­ষের গৌ­রব কর­বার আর কি­ছুই নাই। মা­নু­ষের শ্র­দ্ধা যদি মা­নু­ষের প্রা­প্য হয়, মা­নুষ যদি মা­নু­ষ­কে শ্র­দ্ধা করে তবে সে শু­ধু চরি­ত্রের জন্য। অন্য কোন কা­র­ণে মা­নু­ষের মা­থা মা­নু­ষের সা­ম­নে নত হবার দর­কার নাই।

জগ­তে যে সম­স্ত মহা­পু­রুষ জন্ম­গ্র­হণ করে­ছেন, তা­দের গৌ­র­বের মূল এই চরি­ত্র-শক্তি। তু­মি চরি­ত্র­বান লোক, এ কথার অর্থ এ নয় যে, তু­মি লম্পট নাও। তু­মি সত্য­বা­দী, বি­নয়ী এবং জ্ঞা­নের প্র­তি শ্ৰদ্ধা পো­ষণ কর। তু­মি পর­দু­ঃ­খ­কা­তর, ন্যায়বান এবং ন্যা­য্য স্বা­ধী­ন­তা ও ব্য­ক্তি­ত্ব­কে অস্বী­কার কর­তে লজ্জা বোধ কর।

চরি­ত্র­বান অর্থ এও নয় যে, তু­মি বো­কা-কা­রো সঙ্গে কথা বল না। মা­নু­ষের দি­কে চেয়ে সা­হ­সের সঙ্গে কথা বল­তে তো­মার ভয় হয়। চরি­ত্র­বান সব সময়েই সা­হ­সী ও নি­র্ভীক। মা­নুষ অপে­ক্ষা নি­জের অন্ত­র্নি­হিত সু­বু­দ্ধি বা বি­বে­ক­কে সে বে­শী ভয় করে। নি­জের কাজ ও কথার উপর সে সব সময় দৃ­ষ্টি রা­খে। মা­নুষ তার অপ­রা­ধের কথা না জা­ন­লেও সে নি­জেই তার অপ­রা­ধের জন্য লজ্জিত হয়। চরি­ত্র­বান ব্য­ক্তি অত্যা­চা­রী বা তস্ক­র­কে সম্মান দে­খা­তে লজ্জা বোধ করে। সা­ধু সত্য­বা­দীই তার সম্মা­নের পা­ত্র। সে সর্ব­দাই আত্ম-মর্যা­দা জ্ঞা­ন­স­ম্প­ন্ন।

তু­মি চরি­ত্র­বান হবে। জী­ব­নের সকল লক্ষ্যের উপর হবে তো­মার লক্ষ্য-চরি­ত্র­বান হবার দি­কে।নি­জের মন­কে শা­সন কর­বার দি­কে, মি­থ্যা ও পা­পের বি­রু­দ্ধে আত্মা­কে বি­দ্রোহ করে তো­ল­বার দি­কে, মা­নু­ষের মহ­ত্ত্বই এই­স্থা­নে। এছাড়া পৃ­থি­বী­তে আর কি আছে, যার জন্য মা­নু­ষের জী­ব­নের আব­শ্য­ক­তাও হতে পা­রে?

টা­কা-কড়ি, অর্থ-সম্পদ জী­ব­নের উদ্দে­শ্য নয়। অন্যায় ও মি­থ্যার উপর যে সম্প­দের ভি­ত্তি সে অর্থ তু­মি ঘৃ­ণায় বন-জঙ্গ­লে ফে­লে দাও-আঁখি তো­মার সে­খা­নে ক্ৰোধে রক্ত­ময় হোক।

চরি­ত্র­বা­নই সম্মা­নী। সে-ই মা­নু­ষের শ্ৰদ্ধার পা­ত্ৰ-সে ভদ্র­লোক, জ্ঞা­নী, কর্মী, সত্য­বা­দী মা­নু­ষই ভদ্র­লোক আর কেহ নয়।

বাড়ীতে দা­লান মা­নু­ষ­কে অপ­মান করে, তু­মি তো­মার গৌ­রব প্র­চার কর। তো­মার বাপ নবা­বী আম­লে বি­চা­রক (কা­যী) ছি­লেন। সেই খা­তি­রে তু­মি নি­জে­কে ভদ্র­লোক বল­তে পার না।

তু­মি কি সত্য­নি­ষ্ঠ? তু­মি কি মা­নু­ষের নি­ন্দা কর­তে ঘৃ­ণা বোধ কর? তু­মি কি আত্মা­কে কল­ঙ্কিত কর­তে লজ্জা বোধ কর। তু­মি অন্যায়ের শক্র? তু­মি নি­ত্য­ন­তুন জ্ঞান লাভ কর­তে সচে­ষ্ট? মা­নু­ষের সঙ্গে তো­মার ব্য­ব­হার সদাই মধুর। নি­জে যা, তাই হয়ে প্র­কাশ হতে তো­মার সঙ্কোচ হয় না? আমি তো­মায় নম­স্কার করি, তো­মার পি­তার নাম জি­জ্ঞা­সা কর­তে চাই না, তো­মার মহ­ত্ত্ব­কে আমি শ্ৰদ্ধা করি।

এক যু­বক এক­দিন এক ট্রাক চা­ল­কের হা­তে এক­টা সি­কি দিয়ে টি­কিট আর দুই আনা ফে­রত চা­ই­লেন। তখন চা­লক তা­কে দু’আনার পরি­ব­র্তে চৌ­দ্দ পয়সা দিয়ে বল­লে, আপ­নি নে­মে যান।

যু­বক বল­লেন— আমি আমার হা­ত­কে কল­ঙ্কিত কর­তে চাই না, এই নাও তো­মার বা­কী পয়সা।তু­মি সব চু­রি করো, আমি এক পয়সাও নি­তে পা­রি না।

চরি­ত্র­বান ব্য­ক্তি যে, সে এমন করে মি­থ্যা ও নী­চ­তার প্র­তি ঘৃ­ণা পো­ষণ করে। মা­নু­ষ­কে ফাঁকি দি­তে পে­রেছ বলে নি­জে­কে চতুর মনে করো না। টি­কিট না কি­নে রে­লে ভ্ৰমণ কর­তে সক্ষম যদি হয়ে থাক, তবে নি­জে­কে খুব হী­নই মনে কর। গা­র্ড সা­হেব তো­মা­কে দে­খে নাই, কি­ন্তু বি­বেক তো­মার ভি­ত­রে বসে তো­মার এই নী­চ­তা দে­খে অবাক হয়েছে।

লো­ক­কে ফাঁকি দিয়ে পয়সা উপায় করে তু­মি জা­নিয়ে দিয়েছ তু­মি তস্কর। কর্ত­ব্য­কে অব­হে­লা করে নী­চের মতো তু­মি মা­নু­ষের পয়সা সং­গ্রহ করেছ, বু­ঝ­বো তু­মি নীচ। ঘু­ষের পয়সা দিয়ে ধর্ম উৎসব করে আত্ম­প্ৰসাদ লাভ করছ? তো­মার বি­বেক ভি­তর হতে হে­সে বল­ছে, তস্ক­রের ধর্ম কা­র্যের কোন মূল্য নাই।

মধ্য­যু­গে ইউ­রো­পে না­ইট না­মে এক সম্প­প্ৰদায় ছিল। তা­রা দু­স্থ ও অত্যা­চা­রিত মা­নু­ষের সে­বা করার জন্য দে­শে দে­শে ঘু­রে বেড়াতেন। পীড়িত রম­ণী জা­তির সম্মান রক্ষা­র্থে তা­রা প্রয়োজন হলে জী­বন পর্য­ন্ত দান কর­তেন। ন্যায় ও সত্য ছাড়া আর কি­ছু জা­ন­তেন না। দে­শে দে­শে ঘু­রে বেড়ান বাদ দিয়ে দু­স্থ মা­নু­ষের দু­ঃখ মো­চ­নে, চরি­ত্র­বান ব্য­ক্তি না­ইট ছাড়া আর কি­ছু নয়। চরি­ত্র­কে নি­ষ্ক­ল­ঙ্ক করে রা­খা, জী­ব­ন­কে সত্য­প­রায়ণতা, ভদ্র­তা, ন্যায়বান ও নৈতিক শক্তি দিয়ে অল­স্কৃত করে রা­খা হোক তো­মার ব্ৰত। লোভ তো­মা­কে তো­মার সৎ পথ হতে আক­র্ষণ কর­তে পা­র­বে না। তো­মার দু­র্জয় চরি­ত্র­ব­লের সম্মু­খে পাপ, নী­চ­তা ও দু­র্ব­ল­তা চূৰ্ণ হয়ে যা­বে, তবেই হবে তু­মি খা­টি ভদ্র­লোক।

চরি­ত্র, চি­ন্তা ও জী­বন যার উন্নত, যি­নি সর্বা­ংশ নি­র্মল, উচ্চ মা­ন­ব­তা যার লক্ষ্য, তি­নিই ভদ্র­লোক।

নি­ম্ন­লি­খিত গল্পে এক­টা আশ্চৰ্য উন্নত চরি­ত্র মা­হা­ত্ম্য প্ৰকাশ পেয়েছে। স্পে­নে এক ভদ্র­লো­কের বাড়ীতে এক সন্ধ্যায় এক ব্য­ক্তি এসে কা­তর কণ্ঠে নি­বে­দন কর­লেন, “মহা­শয়, আমি বড় বি­প­ন্ন, কতি­পয় ব্য­ক্তি আমা­কে হত্যা কর­তে আস­ছে। এখ­নই তা­রা আস­বে।” ভদ্র­লোক ব্য­থিত অথচ ক্ষি­প্ৰকণ্ঠে বল­লেন— আপ­নি আর এক মু­হুৰ্তও দে­রি কর­বেন না। ভি­ত­রে আসুন।

পর­দিন প্রা­তঃ­কা­লে গৃ­হ­স্বা­মী এক­টা অশ্ব আর এক­খা­নি তর­বা­রী এনে অতি­থি­কে অত্য­ন্ত বি­স্মিত করে বল­লেন— ভ্ৰাতঃ! এই নাও তর­বা­রি। আর এই ঘোড়া। তো­মা­কে এই দণ্ডে পা­লা­তে হবে। আমার ছে­লে­কে তু­মি গত­কাল হত্যা করেছ। তু­মি বি­প­ন্ন হয়ে আমার কা­ছে এসে­ছি­লে, আমি তো­মার রক্ষা ছাড়া ক্ষ­তি কর­তে পা­রি না। তবুও পি­তা যখন আমি, আমার মধ্যে দু­র্ব­ল­তা আস­তে পা­রে— তু­মি এই দণ্ডেই পা­লাও, প্ৰভাত হয়েছে।

চরি­ত্র যার উন্নত— যি­নি ভদ্র­লোক, যি­নি বো­ঝেন সম্মান তার কোন জায়গায় নষ্ট হবে। তি­নি সম্মা­ন­হা­নির ভয়ে মহ­ত্ত্বের পরি­চয় দি­তে লজ্জা বোধ করেন না। সম্মান কো­থায় এবং কি­সে হয়— তাঁর ভাল করে জা­না আছে। সি­সি­লি ও নে­প­লস দ্বী­পের রা­জা পথ দিয়ে যা­চ্ছি­লেন। পথে এক­টা লোক এক­টা বো­ঝা সা­ম­নে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। কত লোক সেই পথ দিয়ে যা­চ্ছিল, কেউ সম্মা­ন­হা­নির ভয়ে বো­ঝা­টি লো­ক­টির মা­থায় তু­লে দিল না। সম্রাট নিজ হা­তে বো­ঝা­টি বে­চা­রার মা­থায় তু­লে দিয়ে আত্ম­প্ৰসাদ লাভ কর­লেন। যা­রা পথ দিয়ে যা­চ্ছিল। আর সেই নি­রু­পায় লো­ক­টির দি­কে উদা­সীন দৃ­ষ্টি নি­ক্ষেপ কর­ছিল, তা­দে­রই সম্মা­ন­হা­নি হয়েছিল।

ঘৰ্মা­ক্ত কলে­ব­রে তো­মার পা­র্শ্বে এসে এক­টি লোক দাঁড়ালো। হোক ছোট, তা­কে দে­খে তু­মি কি উঠে দাঁড়িয়ে তো­মার চেয়ার­খা­নি ছেড়ে দে­বে না? তা­তেই যে তো­মার মহ­ত্ত্ব, এ তো­মার মনু­ষ্য­ত্ব কি শি­ক্ষা দেয় নাই? ধর্ম যে মনু­ষ্য­ত্বে­রই আর এক নাম।

অপ­রের জন্য তু­মি তো­মার প্রাণ দাও— আমি বল­তে চা­ই­নে। অপ­রের ক্ষু­দ্র ক্ষু­দ্র দু­ঃখ তু­মি দূর কর, অপ­র­কে এক­টু­খা­নি সুখ দাও। অপ­রের সঙ্গে এক­টু­খা­নি মি­ষ্ট কথা বল! পথের অস­হায় মা­নু­ষ­টির দি­কে এক­টি করুণ কটা­ক্ষ নি­ক্ষেপ কর— তা­হ­লেই অনেক হবে।

ছো­ট­লো­কের ভি­তর অনেক সময় আম­রা যে মহ­ত্ত্ব দে­খি, তা­তে মন আমা­দের ভা­বে মু­গ্ধ হয়ে যায়। পৰ্য­টক পা­র্ক সা­হেব এক সময়ে আফ্রি­কায় অত্য­ন্ত ক্লা­ন্ত ও ক্ষু­ধিত হয়ে এক গা­ছের তলায় বসে­ছি­লেন।অনেক জায়গায় তি­নি আশ্রয় চেয়েছি­লেন, কি­ন্তু কেউ তা­কে আশ্রয় দিয়েছিল না, তখন সন্ধ্যা হয়ে আস­ছিল।পা­র্ক নি­রু­পায় হয়ে ভা­ব­ছি­লেন, ক্ষু­ধার ক্লা­ন্তি­তে অথ­বা বাঘ-ভা­লু­কের হা­তে তা­কে সেই অজা­না দে­শে প্ৰাণ হা­রা­তে হবে। এমন সময় এক দরি­দ্র অস­ভ্য রম­ণী এসে তা­কে বল­লে–আপ­না­কে এক­জন ক্লা­স্ত পথিক বলে মনে হচ্ছে, আমা­দের ছোট কু­টি­র­খা­নি­তে আপ­নি আসুন। দরি­দ্রের আহার দিয়ে আপ­না­কে তু­ষ্ট কর­বো। অস­হায় পর্য­টক এই বর্বর রম­ণীর আতি­থ্যে জী­বন লাভ করেন।

পা­র্কের সঙ্গে কি­ছু ছিল না। গায়ের কো­টে মা­ত্র চা­র­টা রু­পার বো­তাম ছিল। বি­দায় নে­বার সময় তা­রই দু­টাে খু­লে দিয়ে তি­নি রম­ণীর মহ­ত্ত্ব ও মনু­ষ্য­ত্ব­কে পু­র­স্কৃত কর­লেন।

চরি­ত্র­বান মনু­ষ্য­ত্ত্ব-সম্প­ন্ন মা­নুষ নি­জের চেয়ে পরের অভা­বে বে­শী অধীর হন। পরের দু­ঃ­খের কা­ছে নি­জের দু­ঃ­খ­কে ঢে­কে রা­খ­তে গৌ­রব বোধ করেন। এক সময় এক যু­বক অভা­ব­গ্ৰস্ত হয়ে এক ভদ্র­লো­কের কা­ছে চা­ক­রি প্রা­র্থ­না করেন। এই ভদ্র­লো­কের এক­জন মা­নুষ দর­কার হয়েছিল। নিয়োগ­কা­লে যু­বক দে­খ­লেন, আরও এক যু­বক সে­খা­নে উপ­স্থিত হয়েছেন। কথায় কথায় প্র­থম যু­বক যখন জা­ন­তে পা­র­লেন, তাঁর নতুন বন্ধু­টির অভাব তার চেয়েও বে­শী, তখন তি­নি নি­জের অভা­ব­কে গো­পন করে বল­লেন, তার চা­ক­রির কোন দর­কার নাই! শে­ষের যু­ব­ক­টিই নি­যু­ক্ত হলেন।

চরি­ত্র­বান ব্য­ক্তি মা­নুষ অপে­ক্ষা ন্যায়কে অধিক শ্ৰদ্ধার চো­খে দে­খেন। ন্যায় ও সত্যের জন্য তি­নি যে কোন বি­পদ মা­থায় নি­তে সম্মত হন। অৰ্থ সম্পদ, আত্মীয়-বন্ধু সব পরি­ত্যাগ কর­তে পা­রেন, তবু নি­জের বি­বে­কের বা­ণী­কে অমা­ন্য কর­তে পা­রেন না। কা­জী গিয়াস উদ্দিন সম্রা­টের ভী­তি­কে উপ­হা­সের চা­ে­খে দে­খে­ছি­লেন। রা­জা চতু­র্থ হে­ন­রীর পু­ত্র যখন তাঁর অপ­রা­ধী বন্ধুর জন্য জজের উপর ঘু­ষি উঠিয়ে বল­লেন— জজ, আমার বন্ধু­কে ছেড়ে দাও। ন্যায়পরায়ণ জজ রা­জ­কু­মা­রের কথায় কৰ্ণ­পাত কর­লেন না। নি­র্ভী­ক­চি­ত্তে তি­নি তার কর্ম­চা­রী­কে হু­কুম দি­লেন—ন্যায়দণ্ড বি­ধা­নের অব­মা­ন­না­কা­রী রা­জ­কু­মা­র­কে জে­লে নিয়ে যাও।

নি­জে­কে উন্নত ও চরি­ত্র­বান করার উপায় কি? এর জন্য সা­ধ­না চাই। তু­মি হয়তো মি­থ্যা কথা বল­তে অভ্য­স্ত। কে­মন করে হা­সি কথার মধ্যে মি­থ্যা বল, তা বু­ঝ­তে পার না। হঠাৎ যদি প্ৰতি­জ্ঞা করে বাস-পরের দিন থে­কে এক­দম মি­থ্যা কথা বল­বে না, প্ৰতি­জ্ঞা রা­খ­তে পা­র­বে না।

অভ্যাস ভয়ানক জি­নিস— একে হঠাৎ স্ব­ভাব থে­কে তু­লে ফে­লা কঠিন। মা­নুষ হবার সা­ধ­না­তেও তো­মা­কে ধীর ও সহি­ষ্ণু হতে হবে। সত্য­বা­দী হতে চাও? তা­হ­লে ঠিক কর— সপ্তা­হে অন্তত এক­দিন তু­মি মি­থ্যা কথা বল­বে না। ছ’মাস ধরে নি­জে­কে সত্য­ক­থা বল­তে অভ্য­স্ত কর, তা­র­পর এক শু­ভ­দি­নে আর এক­বার প্র­তি­জ্ঞা কর, সপ্তা­হে দু’দিন তু­মি মি­থ্যা কথা বল­বে না। এক বছর পরে দে­খ­বে, সত্য­ক­থা বলা তো­মার কা­ছে অনে­ক­টা সহজ হয়ে পড়েছে। সা­ধ­না কর­তে কর­তে এমন এক দিন আস­বে তখন ইচ্ছা করেও মি­থ্যা বল­তে পা­র­বে না। নি­জে­কে মা­নুষ কর­বার চে­ষ্টায় পাপ ও প্র­বৃ­ত্তির সং­গ্রা­মে হঠাৎ জয়ী হতে কখ­নো ইচ্ছা করো না।—তা­হ­লে সব পণ্ড হবে।

তু­মি হয়ত বড় বা­চাল— পা­গ­লের মতো বক­তে অভ্য­স্ত। আস্তে আস্তে অল্প কথা বল­তে অভ্যাস কর। যে-কোন সৎগু­ণই লাভ কর­তে চাও না কেন, তাড়াতাড়ি করো না। হঠাৎ তু­মি মহা­পু­রুষ হবে, এ অস­ম্ভব। চি­ত্ত­কে শা­স­নে আনা বড় ভয়ানক কথা। ধী­রে ধী­রে তু­মি নি­জে­কে উন্ন­তির পথে টে­নে তোল। সা­ধ­নায় হতাশ হয়ে না, পু­নঃ­পুন চে­ষ্টা কর, জয়ী হবে। সা­ধ­নায় অনে­ক­বার তু­মি পদ­ষ্ম­লিত হবে।—কি­ন্তু ভয় পেয়ো না।

তো­মার লোভ প্র­বৃ­ত্তিই খুব প্র­বল! অন্যের চেয়ে নি­জের ভা­গ­টাই তু­মি বড় করে চাও। তা­হ­লে এক কাজ কর-বড় খুঁয়ে ছো­ট­কে গ্ৰহণ কর­তে চে­ষ্টা কর। লো­ভ­কে জয় কর­বার আর এক­টা পন্থা আছে। কোন প্রিয় জি­নি­সের খা­নি­ক­টা না খেয়ে কোন শি­শু, পশু-পক্ষী বা কু­কু­র­কে দি­তে অভ্যাস কর­বে। মা­ঝে মা­ঝে এই করো, তা­হ­লে শু­ধু লোভ-প্র­বৃ­ত্তি দু­র্বল হয়ে আস­বে তা নয়, পরের সু­খের জন্য নি­জের কষ্ট স্বী­কার কর­বার অভ্যাসও হবে। সা­ধ­না ছাড়া চি­ত্তের উন্ন­তি স্ব­ভা­বের মহ­ত্ত্ব লাভ করা যায় না। পর­কে সুখ দি­তে মন যখন বি­র­ক্ত হবে না, তখ­নই তো তু­মি মহা­পু­রুষ। এই ধর­নের ক্ষু­দ্র ক্ষু­দ্র সা­ধ­না ও জয়ের উপর বড় বড় জয়ের ভি­ত্তি-এ যেন মনে থা­কে।

মা­নুষ এক গা­লে চড় দি­লে আর এক গাল ফি­রিয়ে দে­বে, এ আমি বলি না। যত­টু­কু ত্যাগ স্বী­কার ভদ্র­লো­ক­দের পক্ষে সম্ভব, সেরূপ ত্যাগ স্বী­কার কর­তে তু­মি কখনও কু­ষ্ঠিত হয়ো না। শু­ধু ধৌত জা­মা পরে ও ইটের ঘরে মা­নু­ষ­কে নী­চে বসিয়ে, তু­মি ভদ্ৰলোক হতে চে­ষ্টা করো না। ভদ্র­লোক হবার আরও পথ আছে।

ধী­রে ধী­রে আত্মা­কে উন্নত কর­তে হবে। চি­স্তা ও দৃ­ষ্টির সা­হা­য্যে তো­মার সকল দোষ হতে তু­মি মু­ক্ত হও। গু­রুর আশীৰ্বাদ ও অনু­গ্র­হের কোন মূল্য নাই। তু­মি তো­মার শ্রে­ষ্ঠ গু­রু। গু­রু মা­নু­ষ­কে মু­ক্তি দেন না।মু­ক্তির মা­লিক তু­মি— এ যদি না মা­নো, তা­হ­লে বু­ঝ­বো তো­মার আত্মার মৃ­ত্যু হয়েছে। জা­তি যখন অন্ধ হয়ে যায় তখন তা­রা গু­রুর নাম বে­শী নেয়। নি­জের আত্মা­কে একে­বা­রে অস্বী­কার করে।

চরি­ত্র­কে উন্নত করো— মি­থ্যা, নী­চ­তা, অন্যায় পরের ভা­বের প্র­তি অশ্র­দ্ধা ও ঔদা­সী­ন্য, অস­ভ্য­তা, স্বা­র্থ­প­র­তা যা­বে; ধাৰ্মিক ও সা­ধক কোন আশ্চ­র্য জীব নয়।

নীচ, স্বা­র্থ­পর, মূর্খ, চোর, পরের সুখ ও পয়সা অপ­হ­র­ণ­কা­রী, ঘু­ষ­খোর উপা­স­না ও উপ­বাস করুক তা­তে কোন লাভ নাই। পর­মে­শ্বর তো­মা­দের ভো­লেন না-তি­নি চান। সত্য প্রাণ, তি­নি চান মা­নুষ। শু­ধু উপা­স­না করে মা­নুষ মু­ক্তি পা­বে না। তা­কে কর্মী ও পর­দু­ঃ­খ­কা­তর, জ্ঞা­নী ও দৃ­ষ্টি­স­ম্প­ন্ন, চি­স্তা­শীল ও যু­ক্তি­বা­দী মনু­ষ্য­ত্ব­স­ম্প­ন্ন এবং ন্যায়নি­ষ্ঠ হতে হবে। সে কখনও অন্ধের মতো ধর্ম পা­লন কর­বে না। পি­তা রৌ­দ্রের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি কর­তে নি­ষেধ কর­ছেন-পি­তৃ­আ­জ্ঞা লঙ্ঘন ভয়ে সু­বোধ বা­ল­কের মতো অগ্নি­দ­গ্ধ ঘর­খা­নি­কে রক্ষা কর­তে সঙ্কু­চিত হয়ো না। আত্মার এই জ্ঞান মৃ­ত্যু-জা­তির পক্ষে সর্ব­না­শের কথা।

মা­নুষ যখন চরি­ত্র­বান হয়, তখন তার ভি­তর অজেয় পু­ণ্য­শ­ক্তির আবি­র্ভাব হয়। সে শক্তি­কে দমিয়ে রা­খা একে­বা­রেই অস­ম্ভব। জা­তির প্র­ত্যেক মা­নুষ যখন চরি­ত্র­বান হয়, তখন তা­দের শক্তি হয় অসা­ধা­রণ। দু­র্জয় শক্তির আধা­রই চরি­ত্র। কখ­নো ভে­বো না— মূর্খ­তার সঙ্গে চরি­ত্রের কোন যোগ আছে। লো­ক­টি মূর্খ হলেও তার চরি­ত্র ভাল, এক­থা বলার কোন অর্থ নাই। মূর্থের আবার চরি­ত্র কি? নি­র­ক্ষার মা­নু­ষের ভি­তর যদি চরি­ত্র­বান লোক দে­খ­তে পাও, তা­হ­লে মনে করো পুঁথির বি­দ্যা সে পায় নাই— কি­ন্তু বি­দ্যার উদ্দে­শ্য যা, তা তার লাভ হয়েছে। না পড়েও সে বড়।

মু­স­লিম জা­তি চরি­ত্র­ব­লেই বড় হয়েছিল; এখন সে চরি­ত্র­হীন— তাই সে নি­ম্না­সন গ্ৰহণ কর­ছে।জ্ঞান, মনু­ষ্য­ত্ব, দৃ­ষ্টি এসব গুণ যখন জা­তির ভি­তর দে­খ­তে পাই তখ­নই তা­কে বলি সভ্য ও বড়। পতিত জা­তির সভ্য­তা বি­স্তা­রের অর্থ, মা­নু­ষ­কে উচ্চ­ত্র­জী­ব­নে দী­ক্ষিত করা, উন্ন­ত­ভা­বে ভা­বু­ক­রা-মা­নু­ষ­কে উদার চরি­ত্র­বান ন্যায়ের সে­বক করে তো­লা।