ব্য­ক্তি­ত্ব শক্তির সফ­­তা

যে যে­খা­নেই থাক, নি­জের বলে বড় ও উন্নত হতে চে­ষ্টা কর। জী­ব­নের সকল অব­স্থায় নি­জ­কে বড় করে তো­লা যায়-এ তু­মি বি­শ্বাস কর।

জা­তীয়তা ও স্বা­ধী­ন­তার কথা ভা­ব­বার আগে তু­মি নি­জ­কে মা­নুষ করো। মা­নু­ষের ব্য­ক্তি­ত্বের উন্ন­তি ও মা­র্জিত-বি­কাশ ছাড়া স্বা­ধী­ন­তা আর কি­ছুই নয়। এক ব্য­ক্তি বলে­ছেন-স্বা­ধী­ন­তা শব্দের সঙ্গে সঙ্গে দে­শের এক এক­টা মা­নু­ষের আত্মো­ন্ন­তির কথা মনে না করে আমি থা­ক­তে পা­রি না।

তু­মি তো­মার ব্য­ক্তি­ত্ত্ব­কে দৃঢ় করে তোল। কেউ তো­মার উপর অন্যায় আধি­প­ত্য কর­তে পা­রে না– এক­থা দা­র্শ­নিক মিল বলে­ছেন।

তু­মি যদি নি­জের ক্ষ­তি নি­জে কর, অজ্ঞ­তা ও পা­পে নি­জের উপর অত্যা­চার আর­ম্ভ করো, তা­হ­লে কে তো­মা­কে বড় কর­বে? তু­মি কাজ কর–তো­মার বন্ধু তু­মি-হীন নও। তো­মার ভি­ত­রে যে শক্তি আছে, সেই শক্তির চর্চা তু­মি কর, তু­মি মহা­মা­নুষ হতে পা­র­বে।

তু­মি ছোট বং­শে জন্ম­গ্র­হণ করেছ বলে তো­মায় যে ছোট করে রা­খ­তে চায়-সে বড় ছোট। তু­মি মা­নুষ, তো­মার ভি­ত­রে আত্মা আছে, ইহাই যথে­ষ্ট। বি­শ্বাস কর, তু­মি ছোট নাও।

খুব বড় বড় রা­জ­রা­জড়ারাই যে জগ­তে কী­র্তি রে­খে যা­বে, এমন কোন কথা নয়। শি­ক্ষা শু­ধু ভদ্র­না­ম­ধা­রী এক­শ্রে­ণীর জী­বের জন্য নয়। বস্তুত ভদ্র­বে­শী বলে কোন কথা নাই। ক্ষু­দ্র, ছোট এবং নগ­ণ্য যা­রা তা­রাও ভদ্র হতে পা­রে-তা­দেরও শক্তি আছে, এক­থা তা­রা বি­শ্বাস করুক।

শি­ক্ষা, জ্ঞা­না­লো­চ­না, চরি­ত্র ও পরি­শ্র­মের দ্বা­রা দরি­দ্র মা­নু­ষের শ্র­দ্ধার পা­ত্ৰ তু­মি হতে পার। যে অব­স্থায় থাক না কেন-জ্ঞান অর্জন করু, পরি­শ্র­মী হও। মা­নুষ তো­মা­কে শ্র­দ্ধা কর­বে। তু­মি ব্য­ব­সায়ী, তু­মি সা­মা­ন্য দর­জী, তু­মি পৃ­থি­বীর এক কো­ণে পড়ে আছ—তু­মি যদি সা­ধু ও চরি­ত্র­বান হও, সেই অব­স্থায় মনের দী­ন­তা ও মূর্খ­তা দূর কর­তে এক­টু এক­টু পড় ও বড় বড় লো­ক­দের উপ­দে­শা­ব­লী ও জ্ঞা­নের কথা আলো­চ­না কর, দে­খ­তে পা­বে, দিন দিন তো­মার সকল দিক দিয়ে উন্ন­তি হচ্ছে-তো­মার সম্মান, তো­মার অর্থ সবই বেড়ে যা­চ্ছে।

মে­হের উল্লাহ যশো­হর জে­লার সা­মা­ন্য দর­জী ছি­লেন।

পরী­ক্ষায় তু­মি কৃ­ত­কা­র্য হও নাই, বি­দ্যা­লয় বা কলে­জে তু­মি ঢু­ক­তে পার নাই, সে­জ­ন্য দু­ঃ­খিত হয়ো না। মা­নুষ চায় চরি­ত্র, জ্ঞান, ব্য­ক্তি­ত্ব ও শক্তি।

মা­নব-সমা­জে, রা­স্তা­ঘা­টে, দো­কা­নীর দো­কা­নে, রে­লে, ষ্টি­মা­রে-লক্ষ্য করে পর্য­বে­ক্ষণ কর, তু­মি যদি ইচ্ছা কর প্রভূত জ্ঞা­ন­লাভ কর­তে পা­র­বে। নি­জের চি­ন্তা কর­বার শক্তি জা­গিয়ে তোল, দৃ­ষ্টি খু­লে যা­বে। সে দৃ­ষ্টি দিয়ে সব কি­ছুর ভি­তর-বা­হির দে­খ­তে থাক, তু­মি মা­নুষ হবে।

কলেজ তো­মার শু­ধু পথ দে­খিয়ে দেয়-সা­রা­জী­বন তো­মায় দে­খ­তে হবে, শি­খ­তে হবে, জ্ঞা­না­র্জন কর­তে হবে।

কলে­জের কাজ তো­মা­কে স্বা­র্থ­পর, চতুর, অর্থ­গৃ­ধ্বু ও তস্কর করা নয়। বাড়িতে দা­লান দে­বে, চোর-দা­রো­গা হয়ে, পু­কুর কে­টে সমা­জে মর্যা­দা লাভ কর­বে। সে জন্য কলেজ নয়। কলেজ তো­মা­কে জী­ব­নের কর্ত­ব্য­পথ দে­খিয়ে দেয়; তো­মা­কে দৃ­ষ্টি­স­ম্প­ন্ন, কর্ত­ব্য­প­রায়ণ ও চরি­ত্র­বান, আত্ম­নি­র্ভ­র­শীল, বি­নয়ী ও সৎসা­হ­সী হতে বলে। কলে­জের যে এই লক্ষ্য, তা তু­মি ঠিক করে নিয়ে নি­জে­কে নি­জে গঠন কর­তে চে­ষ্টা করো। তো­মার কলে­জে যা­বার দর­কার হবে না।

কলে­জে বা স্কু­লে যা­বার সু­যোগ হলে খুব ভাল। যদি তা তো­মার অব­স্থায় না। কু­লায়, তা­হ­লে নি­রাশ হয়ো না। তো­মা­কে ছোট হয়ে থা­ক­তে হবে না। জী­ব­নের সকল অব­স্থায়, সকল বয়সে তু­মি চে­ষ্টার দ্বা­রা বড় হতে পার। তু­মি মা­নুষ, তু­মি অগ্নি­স্ফু­লি­ঙ্গ, তো­মার পতন নাই, তো­মার ধবংস নাই। অর্থ ও পশু-সু­খের বি­নি­ময়ে জী­ব­নের অপ­মান করো না।

শে­ক­স­পীয়র এক­জন সা­মা­ন্য লো­কের ছে­লে ছি­লেন, আমা­দের দে­শে হলে তা­কে ছো­ট­লো­কের ছে­লে ছাড়া আর কেউ কি­ছু বল­তো না। যে মহা-মা­নু­ষের কা­ছে সম­স্ত ইং­রাজ জা­তির শক্তি ও সভ্য­তা অনেক অং­শে ঋণী, তি­নি ছি­লেন সা­মা­ন্য লো­কের ছে­লে। জ্ঞা­ন­চ­র্চার দ্বা­রা নি­জের ব্য­ক্তি­ত্ত্ব­কে তি­নি এত বড় আসন দি­তে সক্ষম হয়েছি­লেন; যার তু­ল­না পাওয়া কঠিন।

ডা­ক্তার লি­ভি­ং­স্টো­নের নাম তো­ম­রা জা­েন? লি­ভি­ং­স্টোন ছি­লেন এক­জন জো­লা।

নৌ­যু­দ্ধ বি­শা­রদ স্যার ক্লা­উ­ডে­স­লে শো­ভেল (Sir Cloudeswly Shovel), তড়িৎ তত্ত্ব­বিদ স্টা­র্জন, লে­খক সো­মুয়েল ড্র, পা­দ­রী উই­লিয়ম ক্যা­রি চা­মা­রের কাজ কর­তেন।

সা­ধ­নার দ্বা­রা এঁরা জগ­তে কী­র্তি রে­খে গিয়েছেন। যে কী­র্তি শ্রে­ষ্ঠ মা­নু­ষে­রা রে­খে যে­তে পা­রে না। বস্তুত কর্ম ও কীৰ্তি­হীন শ্রে­ষ্ঠ মা­নু­ষের কোন মূল্য নাই।

সমু­দ্র উপকূলের এক নগ­রে এক ইং­রাজ বা­লক কোন এক দর­জীর দো­কা­নে কাজ কর­ছিল।নি­কট দিয়ে এক­খা­না যু­দ্ধ জা­হাজ যা­চ্ছিল। ছে­লে­দে­রই মতো সে সেই জা­হা­জের দৃ­শ্য দে­খ­তে গেল। জা­হা­জের মূর্তি দে­খে সহ­সা তার ইচ্ছা হলো, সে জা­হা­জে কোন কাজ নেয়। তাড়াতাড়ি এক­খা­না নৌ­কা নিয়ে সুঁচ-কাঁচির কথা ভু­লে বা­লক জা­হা­জের অধ্য­ক্ষের নি­কট উপ­স্থিত হলো। অধ্য­ক্ষ বা­ল­কের উৎসাহ দে­খে চমৎকৃত হলেন এবং তা­কে গ্ৰহণ কর­লেন। এই সা­মা­ন্য দর­জী বা­লক শে­ষে এড­মি­রেল (Admiral) হয়েছি­লেন।

আমে­রি­কা যু­ক্ত­রা­ষ্ট্রের রা­ষ্ট্র­নায়ক এগু­রু জন­স­ন­কে এক সময়ে এক­জন ঠা­ট্টা করে বলে­ছিল–দে­শ­মা­ন্য রা­ষ্ট্র­নায়ক হলেও আপ­নি এক কা­লে দর­জী ছি­লেন। নায়ক সে কথায় লজ্জিত না হয়ে বল­লেন-দর­জী ছি­লাম, কি­ন্তু সব­স­ময়েই ঠিক কাজ করে­ছি, কোন দিন কা­উ­কেই ঠকা­ই­নি।

তু­মি যে কা­জই কর না, লজ্জা নাই। লজ্জা হয় অসৎ উপায়ে অর্থ উপাৰ্জন করায়, ভি­ক্ষা করায় কি­ং­বা মূর্খ হয়ে থা­কায়। জ্ঞান লাভ কর, নি­জের ভি­ত­রে যে শক্তি আছে তাই জা­গিয়ে তোল, তু­মি ছোট হয়ে পড়ে থা­ক­বে না।

নি­জ­কে নি­জে বড় কর, জগৎ তো­মা­কে বড় বলে মে­নে নে­বে। নি­জ­কে নি­জের কা­ছে শ্র­দ্ধার পা­ত্র করে তোল-মা­নু­ষের শ্র­দ্ধা তু­মি লাভ কর­বে। মা­নুষ কার কা­ছে মা­থা নত করে? কা­রা পায়ে ভক্তি-অশ্রু ফে­লে?

জর্জ স্টি­ফে­ন­সন ছি­লেন কয়লাওয়ালা।

নি­উ­টন চা­ষার ছে­লে। মি­ল­ট­নের বা­বা পো­দ্দার।

স্যার হ্যা­ম­ফ্রে ডে­ভি বলে­ছেন–তার উচ্চা­স­নের কা­রণ তার চে­ষ্টা। রা­জা এড্রিয়ান যখন বা­লক, তখন তাঁর পড়বার তেল জু­টত না। রা­স্তার আলো­তে তি­নি পড়তেন। এই সহি­ষ্ণু­তা এবং এই সা­ধ­নাই তা­কে বড় করে­ছিল–অদৃ­ষ্ট নহে।

ফক্স সা­হেব যখন বক্তৃ­তা দি­তে উঠ­তেন, তখন প্র­ত্যেক বা­রেই এই কথা বলে আর­ম্ভ কর­তেন–‘যখন নরউ­ইচ শহ­রে তা­তের কা­লের চা­কর আমি ছি­লাম…।’

ইং­ল­ন্ডের বহু মনী­ষীর জন্ম­বৃ­ত্তা­ন্ত খু­বই হীন। পরি­শ্রম ও জ্ঞা­না­র্জন দ্বা­রা তাঁরা মা­নুষ হতে সক্ষম হয়েছি­লেন। তু­মি কেন পা­র­বে না?