অধ্য­ব­সায়, পরি­শ্রম, বি­শ্বাস ও সহি­ষ্ণু­তা

যে কা­জই কর, প্র­থম বা­রেই যে কৃ­ত­কা­র্য হবে তা নয়। চে­ষ্টার দ্বা­রা ব্য­র্থ­তা জয় কর­তে হবে।চে­ষ্টা কর, বা­রে বা­রে আঘাত কর, তো­মার চে­ষ্টা ফল­ব­তী হবে।

কে কবে ভা­গ্য­ব­লে বড় হয়েছে? সা­ধ­না ও পরি­শ্রম ব্য­তীত কে অর্থ ও সম্মান লাভ করে­ছে?

বড় মা­নুষ যা­রা তা­দেরও গৌ­রব-সম্মা­নের মূলে অনেক বছ­রের ধৈর্য ও সা­ধ­না আছে; যে সম­স্ত মা­নুষ ব্য­র্থ­তা­কে ভয় করে না।–জয়ী হবে, এ বি­শ্বা­সে যা­রা কাজ করে তা­রাই জয়ী হয়। লে­খা­পড়া তু­মি জান না, তো­মার মধ্যে যদি শু­ধু এই দু­টি গুণ থা­কে, তা­হ­লে তু­মি বড় হতে পার! সে দু­টি গুণ, অধ্য­ব­সায় ও বি­শ্বাস।

প্র­তি­ভা­ব­লে অনেক মা­নুষ অসা­ধা­রণ কাজ করে, কি­ন্তু বহু বছ­রের সহি­ষ্ণু সা­ধ­নার কা­ছে প্র­তি­ভার কোন মূল্য নাই। কাজ কর, ধীর শা­ন্ত হয়ে তু­মি তো­মার কর্ত­ব্য করে যাও, প্র­তি­ভা তো­মা­কে দে­খে সঙ্কোচ বোধ কর­বে।

জগ­তে বহু মা­নুষ জন্মে­ছেন। তা­দের মধ্যে প্র­তি­ভা­বান অপে­ক্ষা পরি­শ্র­মী মা­নু­ষই অধিক। এক লে­খক বলে­ছেন-প্ৰতি­ভার অর্থ ধৈর্য ও পরি­শ্রম।

নি­উ­টন বলে­ছেন–আমার আবি­ষ্কা­রের কা­রণ আমার প্র­তি­ভা নয়। বহু বছ­রের পরি­শ্রম ও নি­র­ব­চ্ছি­ন্ন চি­ত্তার ফলেই আমি আমা­কে সা­র্থক করে­ছি; যা যখন আমার মনের সা­ম­নে এসে­ছে, শু­ধু তা­রই মী­মা­ং­সায় আমি ব্য­স্ত থা­ক­তাম। অস্প­ষ্ট­তা হতে ধী­রে ধী­রে স্প­ষ্ট­তার মধ্যে উপ­স্থিত হয়েছি।

ডা­ক্তার বে­ন­ট­লে­কে তি­নি এক­বার বলে­ছি­লেন–মা­নব সা­ধা­র­ণের যদি কোন কল্যাণ আমার দ্বা­রা হয়ে থা­কে, তবে তা আমার অনেক বছ­রের সহি­ষ্ণু সা­ধ­নার দ্বা­রাই হয়েছে।

ভল­টেয়ার বলে­ছেন—প্ৰতি­ভা বলে কোন জি­নিস নাই। পরি­শ্রম কর, সা­ধ­না কর–প্র­তি­ভা­কে গ্ৰাহ্য কর­তে পা­র­বে।

লো­কে বলে সব মা­নুষ কবি হতে পা­রে না। বক্তা হওয়াও ঈশ্ব­রের দেওয়া গুণ, এ কথা আমি বি­শ্বাস করি না।

ডা­ল­ট­ন­কে লো­কে প্র­তি­ভা­বান বল­তো। তি­নি অস্বী­কার করে বল­তেন–পরি­শ্রম ছাড়া আমি কি­ছু জা­নি না।

পরি­শ্রম, পর্য­বে­ক্ষণ ও সহি­ষ্ণু সা­ধ­নার সম্মু­খে কি­ছু অস­ম্ভব নয়।

জগৎ ও সমাজ যা­রা গড়ে তু­লে­ছেন, তা­রা যে সব প্র­তি­ভা­বান অসা­ধা­রণ, বি­শি­ষ্ট-ক্ষ­ম­তায় ভা­গ্য­বান ছি­লেন তা নয়। তা­রা ছি­লেন পরি­শ্র­মী এবং সহি­ষ্ণু সা­ধক।

প্র­তি­ভা­কেও যদি সা­ধ­না বা পরি­শ্রম দ্বা­রা উজ্জ্বল করে না তো­লা যায়, তবে তার আদর হয় না। জগ­তের কল্যা­ণে তা বড় আসে না।

স্যার রবা­র্ট পিল যখন বা­লক, তখন তার বাপ তা­কে এক­খা­না ছোট টে­বি­লের উপর তু­লে দিয়ে বক্তৃ­তা দি­তে বল­তেন। প্র­থম প্র­থম কি­ছু হতো না। কি­ন্তু বা­রে বা­রে চে­ষ্টা করার ফলে বা­ল­কের শক্তি জে­গে উঠল। শেষ বয়সে তি­নি বল­তেন তার অসা­ধা­রণ বা­গ্মি­তা ও তর্ক করার ক্ষ­ম­তা সেই ছে­লে বয়সের সা­ধ­নার মধ্যেই ছিল।

ধীর হয়ে লে­গে থাক, তো­মা­কে দু­ঃখ কর­তে হবে না। ধী­র­ভা­বে লে­গে থা­কাই হচ্ছে কৃ­ত­কা­র্য হবার পথ। হাল কখনও ছেড়ো না। তরী জে­গে উঠ­বে।

ভাল রকম কাজ কর­তে হলে তো­মা­কে অস­হি­ষ্ণু হলে চল­বে না। সে যে কা­জই হোক না। এক বা­দ­ক­কে এক যু­বক জি­জ্ঞা­সা করে­ছিল–বা­জ­না শি­খ­তে আমার কত দিন লা­গ­বে? তি­নি বলে­ছি­লেন–প্র­ত্যহ ১২ ঘণ্টা করে যদি পরি­শ্রম কর, তা­হ­লে বিশ বছর লা­গ­বে।

এক পণ্ডিত বলে­ছেন–যে ব্য­ক্তি ধী­র­ভা­বে অপে­ক্ষা করে, সে-ই সফল হতে পা­রে। বস্তুত কত কাল অপে­ক্ষা কর­তে হবে, তা কে জা­নে? আশায় বুক বেঁধে খো­দা­কে ভর­সা করে কাজ কর­তে থাক, তু­মি সফল হবে।

সা­ধ­না­কে আন­ন্দ দিয়ে পূর্ণ করে তোল। কবে তু­মি কৃ­ত­কা­র্য হবে, সে কথা ভে­বো না।–তা­হ­লে সা­ধ­নায় ক্লা­ন্তি আস­বে। ব্য­র্থ­তা তো­মা­কে ভে­ঙ্গে দে­বে। আন­ন্দ ভরা, সা­ধ­না-নিয়ত ফল সম্ব­ন্ধে উদা­সীন তো­মার মন ধী­রে ধী­রে অজ্ঞা­ত­সা­রে তো­মার গন্ত­ব্য স্থা­নে নিয়ে যা­বে। শুভ প্র­ভা­তে দে­খ­তে পা­বে, তো­মার মা­থা বি­জয়-মু­কুট শো­ভিত হয়েছে। তু­মি নি­জেই জয়ে বি­স্মিত হবে।

আশাশূন্য ও নি­রা­ন­ন্দ মনে কোন কাজ করো না। পা­দ­রী উই­লিয়ম ক্যা­রি যে­মন উদ্য­ম­শীল কর্মী পু­রুষ ছি­লেন, তে­ম­নি তি­নি তার কর্ম সম্ব­ন্ধে আশা ও বি­শ্বাস পো­ষণ কর­তেন। শ্ৰীরা­ম­পুর কলেজ তাঁরই চে­ষ্টায় প্র­তি­ষ্ঠিত হয়।

এক সময় এই বরে­ণ্য পু­রু­ষ­কে এক ব্য­ক্তি মু­চির ছে­লে বলে উপ­হাস করে­ছিল। ক্যা­রি কি­ছু­মা­ত্র লজ্জিত না হয়ে উত্তর কর­লেন–এতে আমার এক­টু লজ্জা নেই।

ছো­ট­কা­লে এক­বার তি­নি এক গা­ছে উঠ­তে যেয়ে পা ফস­কে পড়ে যান। ফলে এক­খা­না পা ভে­ঙ্গে গিয়েছিল। কয়েক মাস পরে বি­ছা­না থে­কে উঠে পু­ন­রায় সেই গা­ছে উঠ­লেন, তবে ছাড়লেন। এই­খা­নেই মহা­পু­রু­ষ­দের জী­ব­নের বি­শে­ষ­ত্ব!

দা­র্শ­নিক ইয়ং বল­তেন, মা­নুষ যা করে­ছে, মা­নুষ তা পা­র­বে। এর সম্ব­ন্ধে এক­টা মজার গল্প আছে। এক­বার তি­নি এক বন্ধুর সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে যা­চ্ছি­লেন। এর আগে তি­নি কখ­নো ঘোড়ায় চড়েন­নি, সে­ই­বার প্র­থম। বন্ধু খুব ভাল ঘোড়সোয়ার, তি­নি অবা­ধে এক­টি উঁচু বেড়া পার হয়ে গে­লেন। ইয়ং-এরও ইচ্ছা হলো, বেড়া টপ­কে যান। যে কো­ন­কা­লে ঘোড়ায় চড়েনি, তার পক্ষে কা­জ­টা সহজ নয়। লাফ দি­তে গিয়ে ঘোড়া হতে পড়ে গে­লেন। ক্ষু­ণ্ন না হয়ে দ্বি­তীয়বার চে­ষ্টা কর­লেন। এবা­রে ঘোড়া থে­কে পড়লেন না ঠিক, কি­ন্তু ঘোড়ার গলা জড়িয়ে থা­ক­তে হয়েছিল। আবার চে­ষ্টা। এবার কৃ­ত­কা­র্য হলেন।

বিশ বছর পরি­শ্রম করে নি­উ­টন এক­খা­নি বই লে­খেন। তাঁর প্রিয় কু­কুর এক­টা জ্ব­ল­ন্ত বা­তি ফে­লে এই বই­খা­নি মু­হু­র্তের মধ্যে ছাই করে দিয়েছিল। বিশ বছ­রের পরি­শ্র­ম­জাত-চি­ন্তা হঠাৎ সর্ব­নাশ হয়ে গেল। নি­উ­ট­নের খুব দু­ঃখ হয়েছিল। কি­ন্তু কি আশ্চ­র্য সহি­ষ্ণু­তা! তি­নি দম­লেন না। আবার সেই বই লে­খা আর­ম্ভ কর­লেন এবং শেষ কর­লেন।

কা­র­লা­ইল ফরা­সী বি­প্ল­বের ইতি­হাস লি­খে এক প্র­তি­বে­শী সা­হি­ত্যি­ক­কে পড়তে দেন। বন্ধু মহো­দয় বই­খা­নি ভু­ল­ব­শত বা­ই­রেই ফে­লে রা­খেন। ফলে বই­খা­নি হা­রিয়ে গেল। অনু­স­ন্ধা­নে জা­না গেল বাড়ীর চা­ক­রা­ণী বা­জে কা­গজ মনে করে সেই মূল্য­বান গ্ৰন্থ­খা­নি পুড়িয়ে ফে­লে­ছে।

কা­র­লা­ইল যখন এই ভয়ানক সং­বাদ শু­ন­লেন, তখন তার মা­ন­সিক অব­স্থা কি তা অনু­মা­ন­সা­পে­ক্ষ।

এই পু­স্তক নতুন করে লি­খ­তে কা­র­লা­ই­ল­কে কত কষ্ট পে­তে হয়েছিল, তা বলা যায় না। না লি­খে উপায় ছিল না। কঠিন অধ্য­ব­সায়, ধী­র­তা এবং মনের বলে তি­নি আবার সেই বই লি­খ­লেন। কা­র­লা­ই­লের এই ধী­র­তা ও মনের বল যা­র­প­র­নাই বি­স্ময়াবহ। জর্জ স্টি­ফে­ন­সন তাঁর ছে­লে­দি­গ­কে বল­তেন–তো­মা­দি­গ­কে কি বল­বো!–আমা­কে অনু­স­রণ করো-আঘা­তের পর আঘাত করো!

ওয়াট ত্ৰিশ বছর ধরে পরি­শ্রম করে জগৎকে ঋণী করে গিয়েছেন। দী­র্ঘ ত্ৰিশ বছ­রের সা­ধ­না-কম নয়! কম­তি-দি-বা­ফুন দে­খিয়েছেন, ধী­র­ভা­বে পরি­শ্রম কর­লে আম­রা কত বড় হতে পা­রি। তি­নি বল­তেন–প্ৰতি­ভা মা­নে ধৈর্য ও পরি­শ্রম। বা­ফু­নের স্ম­র­ণ­শ­ক্তি ছিল না, কি­ন্তু সা­ং­সা­রিক অব­স্থা ছিল খুব ভাল। ফলে স্ব­ভা­বে কুড়েমি ঢু­কে­ছিল। অনেক বে­লা পর্য­ন্ত শুয়ে থা­কা তার এক­টা রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অনেক চি­ন্তা করেও তি­নি এই রোগ হতে অব্যা­হ­তি না পেয়ে, শে­ষ­কা­লে উপায়ান্তর না দে­খে ভৃ­ত্য যো­সে­ফ­কে বলেন–কাল হতে সকাল সকাল তু­মি আমায় উঠিয়ে দে­বে। প্র­ত্যেক দি­নের জন্য পু­র­স্কার এক টা­কা। পর­দিন বে­চা­রা যো­সেফ প্র­ভু­কে উঠা­তে গিয়ে কিল-ঘু­ষি খেয়ে ফি­রে এল। বা­ফুন যখন দু­পুর বে­লা যো­সে­ফ­সে তার কর্ত­ব্য কা­জের অব­হে­লার জন্য খুব তি­র­স্কার কর­লেন, তখন মনে মনে পণ কর­লো, পরের দিন প্র­ভু­কে যে­মন করেই হোক উঠা­বে। সকাল বে­লা বি­ছা­নার কা­ছে যেয়ে যো­সেফ আগের দি­নের মত প্র­ভু­কে উঠা­তে চে­ষ্টা কর­লো, ঘু­মের ঘো­রে প্র­ভু ভৃ­ত্য­কে গা­লি দি­লেন। বল­লেন—আমার অসুখ হয়েছে। রা­ত্রি­তে ভাল ঘুম হয়নি—যাও, বি­র­ক্ত করো না। প্র­ভুর কথা অমা­ন্য কর­লে চা­ক­রি থা­ক­বে না—ইত্যা­দি। যো­সেফ ফি­রে গেল।

পর­দিন প্র­ভু­কে উঠা­তে যেয়ে যো­সেফ কোন কথাই শু­ন­লো না। প্ৰভু কি­ছু­তেই ঘুম থে­কে উঠ­বেন না—যো­সেফও না­ছোড়বা­ন্দা। বা­ল­তি ভরা ঠা­ণ্ডা পা­নি প্র­ভুর বি­ছা­নার উপর সে যখন ঢে­লে দিল, তখন বা­ফু­ন­কে বা­ধ্য হয়ে আরাম ছেড়ে উঠ­তে হলো। যো­সেফ পু­র­স্কার লাভ কর­লো!

প্র­ত্যহ নয় ঘণ্টা করে চল্লিশ বছর ধরে বা­ফুন পরি­শ্রম করেন। পরি­শ্রম না করে তি­নি থা­ক­তে পা­র­তেন না। সে­টা তাঁর অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। তাঁর জী­ব­ন­চ­রিত রচিয়তা লি­খে­ছেন—খে­লার চেয়ে কা­জই তার আমো­দের জি­নিস বে­শী ছিল। অন­ব­রত পড়তে তাঁর কোন কষ্ট হতো না।

এক এক­খা­না বই তি­নি কত­বার করে বদ­লিয়েছেন—লি­খে­ছেন। পু­স্তক প্র­ণয়নে কোন সা­হি­ত্যিক বোধ হয় বা­ফু­নের মত পা­রেন নাই।

পঞ্চাশ বছর ভে­বে তি­নি এক­খা­নি বই লে­খেন; আশ্চ­র্য!—এতেও তি­নি সন্তু­ষ্ট হতে পা­রেন নাই।এক­বার, দু’বার এম­নি এগা­র­বার তি­নি সেই বই­খা­না লে­খেন।

বা­ফু­নের মত ধৈৰ্য আর কারও ছিল না।

পীড়ার মধ্যে থে­কেও তি­নি বড় বড় বই লি­খে­ছেন। কা­জে থা­কাই ছিল তাঁর আন­ন্দ ও শা­স্তি।

স্যার ওয়াল­টার স্কট পরি­শ্র­মী ছি­লেন। অফি­সের কা­জের সঙ্গে সঙ্গে তি­নি জ্ঞা­না­লো­চ­না ও সা­হি­ত্য­সে­বা কর­তেন। অফি­সের কাজ কম নয়—তার উপর সা­হি­ত্য­সে­বার কঠিন পরি­শ্রম!

ভোর পাঁচটার সময় উঠে নি­জেই চু­লো ধরা­তেন, এক­টু কি­ছু খেয়ে বই-এর বো­ঝা সা­ম­নে নিয়ে সা­হি­ত্য­সে­বায় বসে যে­তেন। ছে­লে­পি­লে, বউ-ঝি­রা ঘুম হতে উঠ­বার অনেক আগে তি­নি অনেক কাজ করে ফে­ল­তেন।

বহু বছ­রের পরি­শ্রম ও গভীর জ্ঞা­না­র্জন সত্ত্বেও স্কট বল­তেন—আমি আমার অজ্ঞ­তার কথা মনে করে লজ্জিত না হয়ে পা­রি না।

ট্রি­নি­টি কলে­জের অধ্যা­প­কের কা­ছে যেয়ে এক ছা­ত্র বি. এ. উপা­ধি লাভ করে। বল­লেন—মহা­শয়, আমার লে­খা­পড়া তো শেষ হয়েছে। কত­কাল পরি­শ্রম কর­বো-বাড়ী যেয়ে এখন আরাম করি। অধ্যা­পক বি­স্মিত হয়ে উত্তর দি­লেন—তো­মার জ্ঞা­না­র্জন শেষ হয়েছে? আমি কি­ন্তু মা­ত্র আর­ম্ভ করে­ছি।

যা­রা কি­ছু জা­নে না। তা­দে­রই কাজ শেষ হয়ে যায়। মহা­প­ণ্ডিত নি­উ­টন জী­বন শে­ষে বলে­ছি­লেন—জ্ঞা­ন­স­মু­দ্রের বে­লায় দাঁড়িয়ে কে­বল ধু­লো­বা­লি নিয়ে নাড়াচাড়া করে­ছি।—অন­ন্ত সমু­দ্রের কি­ছুই দে­খা হয়নি।

জন ব্রি­ট­ন­কে তার কা­কা দো­কান হতে একে­বা­রে অস­হায় করে তাড়িয়ে দেন। ব্রি­টন যখন ছোট তখন তার বাপ পা­গল হয়ে যান। বাপ ছি­লেন রু­টিওয়ালা।

ব্রি­টন তার হো­টেলওয়ালা কা­কার কা­ছে থা­কত এবং কাজ-কাম করে কি­ছু কি­ছু পয়সা উপায় কর­তো। হঠাৎ তার অসুখ হয়ে পড়লো—এমন অসুখ যে, তা­তে তার স্বা­স্থ্য ভে­ঙ্গে গেল, কাজ করার সা­ম­র্থ্য রইল না। নি­ষ্ঠুর কা­কা এ ক্ষ­তি সহ্য কর­তে পা­র­লেন না। ভা­ই­পোর হা­তে গো­টা দশেক টা­কা ফে­লে দিয়ে বল­লেন— এখা­নে আর তো­মার থা­কার দর­কার নেই।

এর­পর সাত বছ­রের বা­লক ব্রি­ট­নের কষ্টের অব­ধি ছিল না। কি­ন্তু কোন দিন সে পড়া ত্যাগ করে নাই। সকল অব­স্থায় সে এক­টু—এক­টু করে জ্ঞা­না­র্জন কর­তো। স্কু­লে যাওয়া হয় নাই বলে বো­কার মত চুপ করে বসে থা­কত না।

জ্ঞান এবং শক্তি যার মা­ঝে আছে, সে কো­ন­কি­ছু পাস করুক আর না করুক, তার উচ্চা­সন হবেই, এক­থা বি­লা­তের সব লো­কে জা­নে।

ব্রি­ট­নের জী­ব­নী পড়ে জা­নি, কত কষ্টের তার জী­বন। যে ঘরে সে বাস কর­তো, সে ঘর­খা­নি কত হীন। পায়ে কত সময় জু­তো জু­ট­তো না। দা­রুণ শী­তে কত সময় গা খা­লি থা­ক­তো। কত সময় পকে­টে পয়সা থা­ক­তো না। হা­তে পয়সা নাই-না পড়লেও চলে না। খা­নি­ক­ক্ষ­ণের জন্য হলেও পরের বই নিয়ে ব্রি­টন তাঁর ব্য­গ্ৰ মনের জ্ঞা­ন­তৃ­ষ্ণা নি­বা­রণ কর­তো।

যখন তাঁর বয়স আটাশ, তখন প্র­থম তি­নি গ্র­ন্থ­কা­ররূপে আবি­র্ভূত হন। এর­পর পঞ্চাশ বছর ধরে তি­নি সা­হি­ত্য­সে­বা করেন। জন ব্রি­টন মোট সা­তা­শি­খা­নি বই লে­খেন। কোন বা­ধা তাঁর জী­ব­ন­কে ব্য­র্থ করে দি­তে পা­রে নাই।

জী­ব­নের মা­লিক তু­মি-দু­ঃখ-বে­দ­না ও অভা­ব­কে বা­ধা না মনে করে সে­গু­লি­কে বরং আশীৰ্বা­দরূপে ধরে নাও। কি­ছুই তো­মার গতি­কে রোধ কর­তে পা­র­বে না। যে­মন করে হোক, তু­মি বড় হবেই। বুক ভে­ঙ্গে গে­ছে-ভয় নাই। ভা­ঙ্গা বুক নিয়ে খো­দা ভর­সা করে দাঁড়াও।

এডি­ন­বা­র্গ শহ­রের কা­ছে লা­উ­ডেন না­মে এক বা­লক ছিল। তার বাপ ছি­লেন এক­জন কৃ­ষক।বাপ ইচ্ছা কর­লেন ছে­লে­কে বা­গা­নের কাজ শি­খা­বেন। এই কা­জে লা­উ­ডে­ন­কে দি­নের বে­লা হাড়ভা­ঙ্গা পরি­শ্রম কর­তে হতো। খা­টু­নির মধ্যে বা­লক লা­উ­ডেন সপ্তা­হে দু­ই­দিন সা­রা রাত জে­গে পা­ঠা­ভ্যাস কর­তো।

লা­উ­ডে­নের মনের দৃঢ় বা­স­না ছিল, জী­ব­ন­কে উন্নত ও গৌ­র­ব­ময় করা-মা­নু­ষের কল্যাণ করে জী­ব­ন­কে ধন্য করা।

এক­জন সা­মা­ন্য বা­ল­কের মনে এই উন্নত কল্প­না কত সু­ন্দর! অল্প­কা­লের মধ্যে লা­উ­ডেন ফরা­সী ভা­ষায় বুৎপত্তি লাভ কর­লো। ফরা­সী ভা­ষা শে­খা হলে সে জা­র্মান ভা­ষা শে­খার জন্য আগ্ৰহা­ন্বিত হলো।জা­র্মান ভা­ষাও অল্প­কা­লের মধ্যে তার আয়ত্ত হয়ে গেল।

স্যা­মুয়েল এবং জে­বেজ বলে আরও দু­ই­টি বা­লক ছিল। তা­দের বাপ ছি­লেন এক­জন মু­টে।দরি­দ্র পি­তা দু’ভা­ই­কে এক পা­ঠ­শা­লায় পা­ঠা­লেন। জে­বে­জের বেশ স্ম­র­ণ­শ­ক্তি ছিল কি­ন্তু স্যা­মুয়েল ছিল যে­মন দু­ষ্টু, তে­মন বো­কা। লে­খা­পড়ায় সু­বি­ধা হলো না দে­খে কি­ছু দিন পরে বাপ তা­কে কাজ শে­খা­বার জন্য এক জু­তোর মি­ন্ত্রির কা­ছে দি­লেন। সে­খা­নে কা­জের চা­পে চো­খে তার সর­ষে ফুল ফু­ট­তে লা­গল।

বদ­মা­ই­শী, আম চু­রি এসব কা­জে স্যা­মুয়েলের খুব উৎসাহ ছিল। এক­বার এক দু­ষ্টু­মি কর­তে যেয়ে তা­কে সমু­দ্রের মা­ঝে নৌ­কা ডু­বে প্রাণ হা­রা­তে হয়েছিল আর কি। তু­মি শু­নে বি­স্মিত হবে—দুই মা­ইল সাঁতরিয়ে কু­লে উঠে সে প্রাণ বাঁচায়।

এই ঘট­নার পর থে­কেই দুৰ্দা­ত্ত স্যা­মুয়েলের স্ব­ভাব বদ­লে গেল। এই চোর, এই বদ­মা­ইশ, এই মা­থা-গরম যু­বক যে এক­দিন তার বি­দ্যা ও বু­দ্ধির দ্বা­রা জগৎকে চমৎকৃত কর­বে এক­থা তখন কে ভে­বে­ছিল?

তার মনের এই দুৰ্দ­ম­নীয় উগ্র­তা ভাল হবার দি­কে ফি­রে গেল। জী­ব­নের এই দু­র্ঘ­ট­নার পর হতে তার স্ব­ভা­বে এক­টা আশ্চ­র্য পরি­ব­র্তন দে­খা গেল। সে চা­প­ল্য, সে হঠ­কা­রি­তা আর রইল না। সে সময় হতে স্যা­মুয়েল জ্ঞা­না­নু­শী­ল­নের দি­কে মন দি­লেন। যতই পড়তে লা­গ­লেন, ততই নি­জের অজ্ঞ­তা ও মূর্খ­তা বু­ঝে লজ্জিত হতে লা­গ­লেন। মনের এই অন্ধ­কার দূর কর­বার জন্য ভি­ত­রে এক দুৰ্দম বা­স­না জে­গে উঠল! এরূপ জী­বি­কা অর্জ­নে যে সময় ব্যয় হতো তা ছাড়া বা­কী সময় লে­খা­পড়া কর­তে লা­গ­লেন। এক মি­নিটও তি­নি বৃ­থা সময় নষ্ট হতে দি­তেন না। কা­জের ভিড়ে পড়বার সময় যখন পে­তেন না, তখন খা­বার সময় সা­ম­নে এক­খা­না বই রে­খে স্যা­মুয়েল ভাত খে­তেন।

বি­শেষ এক­খা­না বই পড়ে তার মন আরও উন্নত হয়ে গেল-নিৰ্মল চরি­ত্র ও আধ্যা­ত্তিক ভা­বা­প­ন্ন হয়ে পড়লেন।

কি­ছু­দিন পরে তি­নি স্বা­ধীন ব্য­ব­সা আর­ম্ভ কর­লেন। ধার হবে এই ভয়ে অনেক সময়ে রা­তের বে­লা না খেয়েই শুয়ে থা­ক­তেন।

ব্য­ব­সা, সা­হি­ত্য­সে­বা ও জ্ঞা­না­লো­চ­না করে যে সময বাঁচত, সে সময় তি­নি জন­সা­ধা­র­ণের সম্মু­খে বক্তৃ­তা দিয়ে বেড়াতেন।

ঘর-সং­সার হলে, ছে­লে­দের কাই-মাই, হৈ-চৈয়ের ভি­তর, এম­ন­কি রা­ন্না­ঘ­রে বসে তি­নি লি­খ­তেন। আর পড়তেন।

শেষ বয়সে তি­নি বল­তেন—নি­তা­ন্ত জঘ­ন্য অব­স্থা হতে আমি নি­জে­কে টে­নে তু­লে­ছি। আমার এই সা­ধ­নার সঙ্গী ছিল পরি­শ্রম, চরি­ত্র এবং মি­ত­ব্যয়িতা।