ব্য­ব­সা, শি­ল্প বা­ণি­জ্য

এক ওয়াচ-মে­কা­রের দো­কা­নে দে­খ­তে পেয়েছি­লাম, তার ছে­লে চমৎকার যন্ত্র তৈরী করে­ছে।এরূপ জি­নিস যে আমা­দের দে­শে সম্ভব তা আগে জা­ন­তাম না।

ঢা­কা জে­লার পশ্চিম বা­না­রির এক­টা লোক স্টি­মা­রের ভি­তর হা­তের তৈরী কত­ক­গু­লি ঝি­নু­কের গহ­না আমা­কে দে­খায়। আমি সেই সব জি­নিস দে­খে অবাক হয়েছি­লাম।

অনেক জায়গায় সা­মা­ন্য অশি­ক্ষিত মু­চি চমৎকার চমৎকার জু­তো প্র­স্তুত করে। ভা­রত উপ­ম­হা­দে­শের বি­ভি­ন্ন স্থা­নে বহু মা­নুষ সু­ন্দর আশ্চ­র্য জি­নিস প্র­স্তুত করে। বি­জ্ঞা­নের শক্তির সম্মু­খে প্র­তি­যো­গি­তায় টি­কে থা­ক­তে পা­রে না বলেই তা­দের আদর হয় না।

বি­লা­তের লো­কের মধ্যে না­না প্র­কার সা­ং­সা­রিক সুখ-স্বা­চ্ছ­ন্দ্যের উপ­ক­রণ প্ৰস্তুত করার ঝোঁক চি­র­কা­লই বে­শী। কোন চি­ন্তা বা ফল নিয়ে তা­রা বসে থা­কে না। উন্ন­তির পর উন্ন­তি কর­তে চে­ষ্টা করে।আমা­দের দে­শের লোক তা করে না। করা দর­কার বি­বে­চ­না করে না। বর্ধ­মান জে­লায় চি­ক­নের কাজ, শা­ন্তি­পু­রের ফুল তো­লার কাজ দে­শের লোক শ্ৰদ্ধার চো­খে দে­খে না।

ব্য­ব­সার মধ্যে জা­তির বেঁচে থা­ক­বার উপ­কার অনেক বে­শী। লে­খা­পড়া শি­ক্ষা করা বা জ্ঞা­না­নু­শী­লন চা­ক­রির জন্য কি­ছু­তেই নয়। জ্ঞা­নের সা­হা­য্য নিয়ে সকল দি­কে উন্ন­তি করা তু­মি ভাল চা­ষা, কা­মার, দর­জি, মি­স্ত্রী এবং কা­রি­গ­রী হও। বি­শ্বাস কর চা­ক­রির জন্য জ্ঞান নয়। তো­মা­দের যে­মন হাত-পা আছে, জ্ঞানও তে­ম­নি তো­মা­তে থাক। চা­ক­রির জন্য জ্ঞা­না­র্জন করো না।

শি­ল্পী বা ব্য­ব­সায়ী হলে তো­মা­কে ছোট থা­ক­তে হবে তা নয়। সব জায়গা­তেই অধ্য­ব­সায়ী ও পরি­শ্র­মী হতে হবে। কত­ক­গু­লো লো­কের কথা বল­বো যা­দের জী­বন কা­হি­নী শু­নে তু­মি বু­ঝ­তে পা­র­বে—হীন অব­স্থা হতে অধ্য­ব­সায়, বু­দ্ধি ও পরি­শ্রম দ্বা­রা কে­মন করে শি­ল্প—বা­ণি­জ্যে উন্ন­তি করে নি­জের, দে­শের ও মা­নু­ষের কল্যাণ সা­ধন করে­ছেন। সা­ধ­না­প­থে বা­ধা এসে­ছিল—তা­রা সে সব গ্রা­হ্য করেন নি। শি­ল্প-বা­ণি­জ্যের প্র­তি অশ্র­দ্ধার কঠিন শা­স্তি মা­নু­ষ­কে চি­র­কা­লই ভোগ কর­তে হয়!

লে­খা­পড়া জান না, যদি অধ্য­ব­সায়ী, চি­ন্তা­শীল এবং দৃ­ষ্টি­স­ম্প­ন্ন হও—তু­মি মা­নু­ষের উপ­কার কর­তে পা­র­বে, তো­মার উদ্ভা­ব­না শক্তি, প্র­তি­ভা ও আবি­ষ্কা­রের দ্বা­রা তু­মি বি­শ্বের নর-না­রী­কে চি­র­কা­লের জন্য উপ­কার করে যে­তে পার।

সা­ধু­তা­কে অব­ল­ম্বন করে তু­মি ব্য­ব­সা কর—পরি­শ্রম করে জী­বি­কা অর্জন কর—তো­মার আসন নী­চে হবে না। প্র­তা­র­ণা ও মি­থ্যায় ভরা ভদ্ৰ(?)জী­বন ত্যাগ করে তু­মি সা­মা­ন্য ব্য­ব­সা অব­ল­ম্বন কর।অসার জী­ব­ন­কে ঘৃ­ণা কর­তে শেখ, সত্য জী­ব­ন­কে শ্র­দ্ধা কর­তে শেখ। এখা­নেই তো­মার মনু­ষ্য­ত্ব। ব্য­ব­সায়ী ঘরের বহু প্ৰাতঃ­স্ম­র­ণীয় মা­নুষ জগ­তের কত উপ­কার করে গিয়েছেন। দে­শীয় বা জা­তীয় শ্ৰীবৃ­দ্ধির মূল কা­রণ ব্য­ব­সায়ীর পরি­শ্রম ও বু­দ্ধি কৌ­শল। মি­স্ত্রীর ছে­লে ওয়াটের আবি­ষ্কা­রের ফলে জগ­তের কত উপ­কার হয়েছে।পৃ­থি­বীর সভ্য­তা তার কা­ছে কত­খা­নি ঋণী। জ্বাল দি­লে জল থে­কে যে বা­ম্প ওঠে সে বা­ম্পের যে কত শক্তি আছে তা কে জা­নত? হা­জার ঘোড়ার শক্তি­তে যা না হয়, বা­ম্পের কল্যা­ণে তা হয়। ওয়াট যদি মা­নু­ষ­কে এই কথা বলে না দি­তেন, তা হলে পৃ­থি­বীর সভ্য­তা এত হতো না। রে­ল­গাড়ির গতি, ছা­পা­খা­না, যু­দ্ধ সবই বা­ম্পের শক্তি­তে পরি­চা­লিত হচ্ছে।

ওয়াটের আবি­ষ্কা­রের ফলে আর্ক­রা­ইট সু­তা প্ৰস্তুত কর­বার উন্নত ধর­নের কল প্ৰস্তুত কর­তে সক্ষম হন। আর্ক­রা­ইট কোন বড় ঘরের ছে­লে নন। প্রে­স­টন শহ­রে ১৭৩২ খ্ৰীষ্টা­ব্দে তার জন্ম হয়। বা­বার অব­স্থা খুব শো­চ­নীয় ছিল। তের ছে­লের মধ্যে আর্ক­রা­ইট ছি­লেন সৰ্ব­ক­নি­ষ্ঠ। কোন কা­লে তার স্কু­লে যা­বার ভা­গ্য হয়নি। নি­জে নি­জে যা এক­টু পড়েছি­লেন।

প্ৰথমে বাপ তাঁকে এক না­পি­তের কা­র­খা­নায় পা­ঠান। কাজ শে­খা হলে আর্ক­রা­ইট নি­জে এক­টা দো­কান খো­লেন এবং সঙ্গে সঙ্গে পর­চু­লা লা­গা­বার ব্য­ব­সাও আর­ম্ভ কর­লেন। শহ­রে শহ­রে মে­লায় মে­লায় ঘু­রে তি­নি চুল কি­নে বেড়াতেন। এই ব্য­ব­সা টে­ক­সই হয় নাই। বি­প­ন্ন হয়ে আর্ক­রা­ইট ভা­ব­লেন, এক­টা সু­তা তৈরী কর­বার উন্নত ও ভাল রক­মের যন্ত্র আবি­ষ্কার কর­লেই হয়। তা­র­পর রা­ত­দিন কে­বল ভা­ব­তে লা­গ­লেন। রো­জ­গার বন্ধ হয়ে গেল। অব­স্থা যা­র­প­র­নাই শো­চ­নীয় হয়ে পড়লো। এর আগেই তি­নি বিয়ে করে­ছি­লেন। স্ত্রী স্বা­মীর এই মা­থা­পা­গ­লা­মী সহ্য কর­তে না পে­রে এক­দিন যত যন্ত্র­পা­তি ছিল, সব ভে­ঙ্গে­চু­রে বা­ই­রে ফে­লে দি­লেন।আর্ক­রা­ইট এতে অত্য­ন্ত ক্রু­দ্ধ হন—ফলে, স্বা­মী-স্ত্রী­তে চি­র­বি­চ্ছেদ সং­ঘ­টিত হয়। গায়ে জা­মা নাই—পর­নে জু­তা নাই—ছিড়ে গিয়েছে—কি­ন্তু সে­দি­কে তাঁর ভ্ৰুক্ষেপ নাই। এক মনে তি­নি ভা­ব­তে লা­গ­লেন কি করে উন্নত প্ৰণা­লী­তে বা­ষ্পীয় শক্তির সা­হা­য্যে সু­তা তৈরী কর­বার যন্ত্র আবি­ষ্কার করা যায়।

ঐকা­ন্তিক সা­ধ­নার সম্মু­খে কি­ছু বে­ধে থা­কে না। আর্ক­রা­ই­টের সা­ধ­না ব্য­র্থ হলো না। জগৎ সভ্য­তার প্র­ধান ভি­ত্তি তি­নি প্র­তি­ষ্ঠা কর­লেন।

আর্ক­রা­ই­টের চরি­ত্র বল অসীম ছিল। পরি­শ্রম কর­বার শক্তিও তার ছিল অসা­ধা­রণ। এই আবি­ষ্কা­রের পর তি­নি বড় বড় কা­র­খা­না স্থা­পন কর­লেন। এই­সব কা­র­খা­নার কা­জে তা­কে প্ৰাতঃ­কাল হতে রা­ত্ৰি ন’টা পর্য­ন্ত অন­ব­রত খা­ট­তে হতো।

যখন তার বয়স পঞ্চাশ, তখন তি­নি ইং­রে­জী ব্যা­ক­রণ পড়া আর­ম্ভ করেন। কা­রণ, শু­দ্ধ করে তখনও তাঁর দুই লা­ইন লি­খ­বার ক্ষ­ম­তা ছিল না।

সম্পদ ও গৌ­রব তার লাভ হলো। মা­নু­ষের কল্যাণ তি­নি কর­লেন। তাঁর মহৎ জী­ব­ন­কে সম্মান কর­বার জন্য সম্রাট তাঁকে উপা­ধি দি­লেন।

বি­লা­তের অন্য­তম শ্রে­ষ্ঠ পু­রু­ষ­সি­ংহ স্যার রবা­র্ট পি­লের নাম তো­ম­রা শু­নেছ। তি­নি সম্রাট চতু­র্থ জর্জের মন্ত্রী ছি­লেন। তাঁর বাপ ছি­লেন সা­মা­ন্য কৃ­ষক। বৃহৎ পরি­বা­রের গ্ৰাসা­চ্ছা­দন চা­লান কঠিন হয়ে পড়াতে পি­লের বা­বা কা­পড় বো­না আর­ম্ভ কর­লেন। তখনও কা­পড়ের কা­র­খা­না বি­লা­তে স্থা­পিত হয় নাই।লোক তখন বাড়ী বাড়ী কা­পড় বু­ন­তো। পি­লের পি­তা সা­ধু প্র­কৃ­তির ও পরি­শ্র­মী লোক ছি­লেন। এই ব্য­ব­সা কর­তে কর­তে কা­পড়ে ছাপ লা­গা­নোর পন্থা আবি­ষ্কার কর­তে ইচ্ছে কর­লেন। আর্ক­রা­ই­টের ন্যায় বহু চি­ন্তা, পরি­শ্রম এবং ব্য­র্থ­তার পর তি­নি সা­ধ­নায় জয়ী হলেন। মা­নু­ষের চে­ষ্টা, অধ্য­ব­সায় ও চি­ন্তার সম্মু­খে কি­ছু অস­ম্ভব নয়।

স্যার রবা­র্ট পিল তাঁর পি­তা সম্ব­ন্ধে বলে­ছেন—পি­তা বু­দ্ধি­মান এবং দৃ­ষ্টি­স­ম্প­ন্ন লোক ছি­লেন।তাঁর দ্বা­রাই আমা­দের বং­শের শ্ৰীবৃ­দ্ধির সূচনা হয়। জা­তির উন্ন­তি ব্য­ব­সার উপর নি­র্ভর করে। দে­শের সকল মা­নু­ষের শ্ৰীবৃ­দ্ধির প্রাণ ব্য­ব­সা। এখা­নে—ওখা­নে দুই এক­জ­নের এক­টু আধ­টু উন্নত অব­স্থার কোন মূল্য নাই।

বিশ বছর বয়সে পিল কয়েক­খা­না ভা­ঙ্গা ঘর আর মা­ত্র কয়েক শত টা­কা নিয়ে ব্য­ব­সা আর­ম্ভ করেন।

সা­ধু, পরি­শ্র­মী এবং মি­ত­ব্যয়ী পিল ক্ৰমে উন্ন­তি করে না­না জায়গায় নতুন নতুন কা­র­খা­না খু­ল­লেন।

সম্পদ, সম্মান, কো­টি কো­টি টা­কার মা­লিক পিল প্র­থম বয়সে মজুর ছি­লেন। সা­ধু­তা, পরি­শ্রম ও অধ্য­ব­সায়ের দ্বা­রা তি­নি দে­শ­মা­ন্য পু­রুষ হতে পে­রে­ছি­লেন।