মর্যা­দা ও শ্ৰেষ্ঠ­ত্বের আসন-নি­জের শক্তি সা­ধ­না

কোন বংশ চি­র­কাল পু­রা­নো মর্যা­দা ও সম্মান নিয়ে টি­কে থা­ক­তে পা­রে না। জা­তির যে­মন পতন হয়, পরি­বা­রেরও তে­মন পতন হয়।

শি­ক্ষা, চরি­ত্র ও জ্ঞান মা­নুষ ও পরি­বা­র­কে সম্মা­নী করে-অর্থে সম্মা­নে সব দিক দিয়েই বড় করে। মা­নুষ যখন মূর্থি ও চরি­ত্র­হীন হয়ে পড়ে তখন তার প্র­ভু­ত্ব ও সম্মান থা­কে না।

তু­মি আজ ছোট আছ—চরি­ত্র­বান ও জ্ঞা­নী হও, তু­মিও শ্রে­ষ্ঠ হবে ৷ কপা­লে ভদ্র বলে কা­রো কি­ছু লে­খা নাই।

জান? মু­স­ল­মান জা­তি কত বড় ছিল? জগৎ তার সভ্য­তা অনু­স­রণ কর­তে গৌ­রব বোধ কর­তো। তা­দের পতন হয়েছে কি­সে?

জা­পা­ন­কে সে­দিন পর্য­ন্ত লো­কে অস­ভ্য মনে কর­তো। সা­ধ­নার ফলে এখন তা­দের স্থান কত উচ্চে। আমা­দের না­সি­কা কু­ঞ্চ­নের মূল্য কি?

আজ যে পরি­বা­র­কে তু­মি হীন বলে মনে কর­ছে—যা­দের সা­ধ­না ও পরি­শ্র­মের ফল­কে তু­মি ঘৃ­ণার চা­ে­খে দে­খ­ছো, কি­ছু­দিন পরে তো­মা­কে তা­দের কৃ­পা ভি­ক্ষা কর­তে হবে। তো­মার কুড়ে সস্তা­ন­কে তার বাড়ীর চা­কর হতে হবে! এজ­গ­তে শু­ধু সা­ধ­না, চরি­ত্র ও জ্ঞা­নের জয়। মূর্থি, কুড়ে ও মা­র্কা­মা­রা ভদ্র­লো­কের কোন মূল্য নাই। বা­পের না­মে তু­মি পরি­চিত হতে যেয়ো না! তু­মি ভদ্র­ঘ­রে জন্মেছ, এ কথা তু­মি বল না।

সম্রাট জন­কে যে সম­স্ত জমি­দার হা­তের পু­তুল করে রে­খে­ছি­লেন নাম কর­বার মতো তা­দের এক­জনও বেঁচে নেই।

সম্রাট প্র­থম এডওয়ার্ডের এক বং­শ­ধ­র­কে মা­ংস বে­চে বেড়াতে দে­খা গিয়েছে। ডি­উক অভ ক্লা­রে­ন্সের এক বং­শ­ধ­র­কে স্ত্ৰপস্যা­রায় শহ­রে জু­তো সা­র­তে হয়েছিল। বি­লা­তের শ্রে­ষ্ঠ জমি­দার সা­ই­ম­নের বং­শের এক­জন লণ্ডন শহ­রে ঘোড়ার জিন তৈরী কর­তো।

অতী­ত­কা­লে যাঁরা শ্রে­ষ্ঠ আসন অধি­কার করে­ছি­লেন, তা­দের শক্তি ও সম্মান নতুন নতুন মা­নু­ষের মধ্যে দে­খা দিয়েছে।

তু­মি ছোট আছ? মহ­ত্ত্ব, সা­ধ­না ও জী­বন—সং­গ্রা­মে তু­মি জয়ী হও-জ্ঞান ও মনু­ষ্য­ত্বের বি­কাশ তো­মা­তে হোক—তো­মার বড় আসন হবে।

রি­চা­র্ড না­মে এক দরি­দ্র কৃ­ষ­ক­শ্রে­ণীর যু­বক বি­লে­তে এক মি­লে কাজ কর­তো। সে-মি­লে লো­হার কা­টা তৈরী হতো। এই মি­লের ব্য­ব­সা ক্র­মে নষ্ট হতে লা­গ­লো। কা­রণ, সু­ই­ডেন হতে এক রকম কাঁটা আস­তো, সে­গু­লি যে­মন সস্তা তে­ম­নি মজ­বুত। যু­বক রি­চা­র্ড মি­লে আপন মনে কাজ কর­তো আর ভা­ব­তো, কি করে কাঁটা­গু­লি সু­ই­ডে­নের কাঁটার মত সস্তা এবং মজ­বুত করা যায়?

কি­ছু দিন যায়—হঠাৎ এক­দিন রি­চা­র্ড­কে মি­লে কাজ কর­তে দে­খা গেল না। সক­লে মনে করল, রি­চা­র্ড আল­সে­মী করে সে­দিন কাজ কর­তে আসে­নি। বস্তুত তখন পা­গ­ল­বে­শে এক­খা­না বে­হা­লা কাঁধে ফে­লে এক­টা মহা উদ্দে­শ্য বু­কের ভি­তর চে­পে রে­খে সু­ই­ডে­নের জা­হা­জে পাড়ি দি­লেন। স্ব­দে­শের এই লা­ভ­জ­নক ব্য­ব­সা­টি­কে বঁচিয়ে দে­শের মা­নু­ষের সম্পদ অক্ষু­ন্ন রা­খাই তাঁর উদ্দে­শ্য ছিল। তার গান গা­ই­বার ক্ষ­ম­তা ছিল! যথা­স­ময়ে সু­ই­ডেন পৌ­ছে সে­খা­ন­কার মিলওয়ালা­দি­গ­কে গা­নের দ্বা­রা মু­গ্ধ করে এক­টা আধ-বো­ঝা বো­কারূপে সে কা­র­খা­নায় প্র­বেশ কর­বার ও থা­ক­বার অনু­ম­তি পায়। সক­লে মনে কর­তে লা­গ­লো, লো­ক­টির বু­দ্ধি নাই—শু­ধু এক­টু গা­ই­তে পা­রে। কেউ তা­কে সন্দেহ কর­লো না।

কা­রোর সন্দে­হের পা­ত্র না হয়ে রি­চা­র্ড দে­খ­তো, কি উপায়ে এরা কা­টা তৈরী করে­তা­দের মি­লের বি­শে­ষ­ত্ব কো­থায়, এমন করে কয়েক বছর কে­টে গেল। এক প্ৰভা­তে মিলওয়ালা দে­খ­লো তা­দের বহু­দি­নের সঙ্গী সেই চে­না পা­গ­লা আর নাই।

রি­চা­র্ড যখন বু­ঝে­ছি­লেন, কাঁটা তৈরীর সব কৌ­শল শে­খা হয়েছে তখ­নই তি­নি পা­লিয়েছি­লেন।

স্ব­দেশ প্র­ত্যা­ব­র্তন করে তাঁর সহ­সা অন্ত­হিঁত হবার অর্থাৎ সু­ই­ডেন যা­ত্রার কা­রণ যখন সক­লে জা­ন­লেন, তখন মহা­জ­নে­রা লা­ভের আশায় উৎসা­হিত হয়ে রি­চা­র্ড­কে ম্যা­নে­জার করে এক বৃহৎ কা­র­খা­না স্থা­পন কর­লেন। রি­চা­র্ডের নি­র্দেশ অনু­যায়ী যন্ত্র­পা­তি স্থা­পন করা হলো, কি­ন্তু বড় দু­ঃ­খের বি­ষয় কল চল­লো না।সক­লে নি­রুৎসাহ হয়ে পড়লো-রি­চা­র্ডও যথে­ষ্ট অপ্ৰস্তুত হলেন। রি­চা­র্ড ভা­ব­লেন, এত কষ্ট, অর্থ ও পরি­শ্রম সবই কি বৃ­থা হলো। রি­চা­র্ডের বি­শ্বাস ও মনের বল কি­ন্তু কম­লো না।

ভা­ব­লেন তাঁর নি­জের পর্য­বে­ক্ষ­ণের ভুল আছে। আবার তি­নি এক­দিন ছদ্ম­বে­শে দেশ ত্যাগ করে সু­ই­ডেন উপ­নীত হলেন।

বহু­কাল পরে মিলওয়ালা তা­দের পু­রান বন্ধু­কে দে­খে খু­বই খু­শী হলো। এবার অধি­ক­তর মনো­যোগ ও অভি­নি­বেশ সহ­কা­রে তি­নি তা­দের মিল পৰ্য­বে­ক্ষণ কর­তে লা­গ­লেন। আবার অনেক বছর তার সে­খা­নে কে­টে গেল।

অধ্য­ব­সায়, মনো­যোগ ও চে­ষ্টার ফলে সম­স্ত ভু­লের যখন মী­মা­ং­সা হয়ে গেল, তখন রি­চা­র্ড আবার এক­দিন পলায়ন করেন। এবার আর তা­কে অপ্ৰস্তুত হতে হলো না।

ইং­ল­ন্ডের এক­টি অতি লা­ভ­জ­নক ব্য­ব­সার পথ তি­নি প্ৰস্তুত কর­লেন। স্ব­দে­শের ধন­স­ম্পদ তাঁর অমা­নু­ষিক চে­ষ্টার ফলে অনেক পরি­মা­ণে বেড়ে গেল।

সম্রাট দ্বি­তীয় চা­র্লস এই ত্যা­গী মহা­পু­রু­ষের গুণ স্বী­কার করে তা­কে স্যার উপা­ধি­তে ভূষিত কর­লেন। সা­মা­ন্য কৃ­ষ­কের সন্তান ইং­ল­ন্ডের শ্রে­ষ্ঠ মনী­ষী সম্প­প্র­দায়ের আসন লাভ কর­লেন।

উই­লিয়াম ফি­লি­প­সের জী­বন-কা­হি­নী অতি বি­স্ময়জনক। সা­মা­ন্য রা­খাল বা­লক উই­লিয়ম নি­জের শক্তি­তে সমা­টের দ্বা­রা সম্মা­নিত হয়েছি­লেন। রা­খা­লের পক্ষে দে­শের শ্ৰেষ্ঠ উপা­ধি লাভ করা সা­মা­ন্য কথা নয়। মা­নুষ শক্তি ও গু­ণ­কে অব­হে­লা করে না। তা­তে যে তা­দের নি­জে­রই ক্ষ­তি। গুণ ও শক্তি মহা মা­নু­ষের অব­ল­ম্বন-পি­তার নাম নহে! জান না, খো­দার কা­ছে গুণ ছাড়া অন্য কি­ছুর আদর নাই।

উই­লিয়মের বাপ বন্দুক সা­রার কাজ কর­তেন। উই­লিয়ম আর তার ভা­ইয়েরা একু­নে ছিল ছা­ব্বিশ জন। সকল ভাই মজু­রের কাজ করে ব্যা­প­কে সা­হা­য্য কর­তো। উই­লিয়ম গরু চরা­তেন। রা­খা­লের জী­বন নিয়ে থা­ক­তে উই­লিয়াম জন্মে­ছি­লেন না। ভি­ত­রে তার শক্তি ঘু­মিয়েছিল। তাঁর ইচ্ছা হলো উত্তাল সা­গর তর­ঙ্গের সঙ্গে তি­নি খে­লা করেন। অন্ত­হীন নী­ল­স­মু­দ্রের উপর দিয়ে জা­হা­জে দে­শে দে­শে ঘু­রে বেড়াতে তাঁর বা­ল্য হৃ­দয়ে ইচ্ছা হলো। কোন সু­বি­ধা না হওয়ায় তি­নি এক জা­হা­জের মি­ন্ত্রীর কা­ছে কাজ শি­খ­তে লা­গ­লেন। অল্প সময়ে জা­হাজ নি­র্মা­ণে তি­নি দক্ষ হয়ে উঠ­লেন। এই কাজ শি­খ­বার কা­লে উঅ­ব­সর সময়ে তি­নি বই পড়তেন।জা­হা­জের কাজ আরও ভাল করে শি­খে তি­নি বো­স্টন শহ­রে নি­জেই জা­হাজ নি­র্মাণ আর­ম্ভ করেন। এখা­নে তি­নি এক বি­ধ­বার পা­ণি­গ্র­হণ করেন।

ব্য­ব­সা বেশ চল­ছিল। এক­দিন রা­স্তা দিয়ে যা­চ্ছেন-সহ­সা কত­গু­লি লো­কের মু­খে শু­ন­তে পে­লেন, এক­খা­না জা­হাজ বহু দ্র­ব্য­স­ম্ভা­রে পরিপূর্ণ হয়ে সমু­দ্র দিয়ে আস­ছিল—পথে জল­ম­গ্ন হয়েছে। যে এই জা­হাজ উদ্ধার কর­তে পা­র­বে, সে কো­টি টা­কা পু­র­স্কার পা­বে।

ঘৃ­তের ভি­তর আগুন দি­লে যেন সে ভী­ষণ ভা­বে জ্ব­লে ওঠে-এই শুভ সং­বা­দ­টিও তে­ম­নি করে উই­লিয়মের বু­কের ভি­তর উদ্যম ও আশার আগুন জ্বে­লে দিল! সমু­দ্র­ম­গ্ন জা­হা­জ­টি যদি উদ্ধার করা যায়, তা­হ­লে কত লক্ষ লক্ষ টা­কা লাভ হয়।

অবি­ল­ম্বে উই­লিয়ম না­বিক ও সব কি­ছু সং­গ্ৰহ করে ঘট­না­স্থ­লে উপ­স্থিত হলেন। এই জা­হা­জ­খা­না ডু­বে­ছিল আমে­রি­কার সন্নি­ক­টে বা­হা­মা দ্বী­প­পু­ঞ্জের কা­ছে।

উই­লিয়মের আশা ও পরি­শ্রম ব্য­র্থ হলো না। তি­নি ডু­বো­জা­হা­জের সন্ধান পে­লেন এবং বহু মূল্য­বান সা­ম­গ্ৰী উদ্ধার কর­লেন। কি­ন্তু বি­স্তর খর­চের সম্মু­খে বি­শেষ লাভ হলো না।

এর কি­ছু­কাল পরে তি­নি লোক মু­খে গল্পা­কা­রে শু­ন­তে পে­লেন আর এক­খা­না জা­হা­জের কথা। সে­খা­নে সমু­দ্র­গ­র্ভে প্র­চুর রত্ন­সা­ম­গ্ৰী নিয়ে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে এক­টি জা­হাজ ডু­বে­ছি­লা জন­শ্রু­তি ও উড়ো কথা­কে অব­ল­ম্বন করে উই­লিয়ম নতুন করে রত্ন লা­ভের আশায় সা­গর অম্বে­ষ­ণে বহি­র্গত হতে ইচ্ছা কর­লেন।

উই­লিয়মের অব­স্থা তত ভাল ছিল না। ভাল হলেও এক­জন মা­নু­ষের পক্ষে অত বড় এক­টা ব্যয়সা­পে­ক্ষ কাজ ঘাড়ে নেওয়া নি­তা­ন্তই অস­ম্ভব।

উপায়াত্তর না দে­খে তি­নি সমাট দ্বি­তীয় চা­র্ল­সের কা­ছে সা­হা­য্যের জন্য সকল কথা নি­বে­দন কর­লেন। তার কথা, উৎসাহ ও বি­শ্বাস দে­খে শে­ষ­কা­লে সম্রাট চা­র্লস তা­কে সা­হা­য্য কর­তে প্ৰস্তুত হলেন।

বি­পুল উদ্য­মে রত্ন উদ্ধার আশায় উই­লিয়াম আবার সমু­দ্র যা­ত্রা কর­লেন। যা­রা তাঁর সঙ্গে গিয়েছিল তা­দেরও উৎসা­হের সী­মা ছিল না, তা­দের দৃঢ় বি­শ্বাস হয়েছিল বহু অর্থ লাভ করে তা­রা বাড়ী ফি­র­বে।

নি­র্দি­ষ্ট স্থা­নে উপ­নীত হয়ে উই­লিয়াম লো­ক­জ­ন­সহ সমু­দ্র­গ­র্ভ অন্বে­ষ­ণে ব্যা­পৃত হলেন। অন্ধের মত অজা­না রা­জ্যে রত্বের সন্ধান করার কাজ সো­জা নয়।

এই­ভা­বে ক্লা­ন্তি ও পরি­শ্র­মে মা­সের পর মাস চলে যে­তে লা­গ­লো-কি­ন্তু কোন সু­বি­ধা হলো না।ক্র­মে না­বি­ক­গ­ণের মধ্যে চা­ঞ্চ­ল্য দে­খা দিল। উই­লিয়মের বি­শ্বাস কি­ন্তু এক­টুও শি­থিল হলো না।

এক­জন বি­শ্বা­সী কর্ম­চা­রীর সা­হা­য্যে উই­লিয়ম জা­ন­তে পা­র­লেন তা­কে সমু­দ্রের ভি­তর ফে­লে দে­বার ষড়যন্ত্র চল­ছে। জা­হাজও স্থা­নে স্থা­নে ভে­ঙ্গে গিয়েছিল। অব­শে­ষে না­না কা­র­ণে উই­লিয়াম­কে ফি­রে আস­তে হলো।

উই­লিয়াম নি­ম­জ্জিত জা­হাজ সম্ব­ন্ধে আরও অনেক সং­বাদ জে­নে­ছি­লেন। বি­লে­তে এসে তি­নি সক­ল­কে সেই জা­হাজ সম্ব­ন্ধে নতুন নতুন তথ্য জা­না­লেন। তাঁর উৎসাহ এক­টুও কমে­ছিল না-নতুন মা­নুষ নিয়ে তি­নি আবার সে­খা­নে যা­ত্রা কর­তে ইচ্ছক হলেন। কি­ন্তু এবার সম্রা­টের কা­ছে তার কথা ও বি­শ্বা­সের মূল্য হলো না।

অগ­ত্যা তি­নি সা­ধা­র­ণের কাছ থে­কে দ্বি­তীয় বার যা­ত্রার ব্যয় তু­ল­তে চে­ষ্টা কর­লেন। কি­ন্তু কে তা­কে বি­শ্বাস কর­রে? নতুন করে সা­ধা­র­ণের বি­শ্বাস জন্ম­তে তাঁর দী­র্ঘ চার বছর ধরে চে­ষ্টা কর­তে হয়েছিল।দী­র্ঘ চার বছ­রের চে­ষ্টায় কেউ কেউ তা­কে বি­শ্বাস কর­তে অগ্র­সর হলেন।

সা­ধা­র­ণের অর্থ সা­হা­য্যে উই­লিয়ম চার বছর পরে নতুন জা­হা­জে আবার ঘট­না­স্থ­লে উপ­স্থিত হলেন। আগের মতই দি­নের পর দিন, মা­সের পর মাস সমু­দ্র­তল অন্বে­ষ­ণে কে­টে যে­তে লা­গল। উই­লিয়ম মা­ঝে মা­ঝে ভা­ব­তে লা­গ­লেন, তার বি­শ্বাস কি মি­থ্যা হলো?

হঠাৎ এক­দিন এক­জন ডু­বু­রি জলের তল থে­কে উঠে বল­লো, এক­খা­না জা­হা­জের পা­টা­ত­নের মত কি যেন আমার হা­তে ঠে­কে­ছে।

বি­পুল উদ্বে­গে উই­লিয়ম আরও কয়েক­জন ডু­বু­রি পা­ঠা­লেন। কয়েক মুহূর্তের ভি­তর এক­জন এক খণ্ড সো­নার টু­ক­রা নিয়ে ভে­সে উঠ­লো। উই­লিয়ম আন­ন্দে কর­তা­লি দিয়ে ঈশ্ব­র­কে ধন্য­বাদ দিয়ে বল­লেন-ভা­গ্য আমা­দের ফি­রে­ছে।—আর ভয় নাই।

এত পরি­শ্রম, আশা ও বি­শ্বাস ব্য­র্থ হলো না। উই­লিয়মের অধ্য­ব­সায় ও সা­ধ­নার মূল্য­স্বরূপ কয়েক­দি­নেই ডু­বো­জা­হাজ হতে ৪৫,০০,০০০ লক্ষ টা­কা উদ্ধার হলো।

ইং­ল­ণ্ডে উই­লিয়ম যখন প্র­ত্যা­ব­র্তন কর­লেন তখন অনে­কে সম্রা­ট­কে বলে­ছি­লেন—এই অর্থে উই­লিয়মের কোন দা­বী নাই, এস­বই রা­জ্য­ভা­ণ্ডা­রের প্রা­প্য। উই­লিয়ম ভাল করে সব কথা সর­কা­র­কে জা­নিয়ে ছিল না, এই অপ­রা­ধে তার সম­স্ত টা­কা বা­জেয়াপ্ত করা হউক।

ন্যায়নি­ষ্ঠ সম্রাট সে কথায় কৰ্ণ­পাত না করে কঠোর সা­ধ­না ও অধ্য­ব­সায়কে সম্মা­নের সঙ্গে গ্র­হণ কর­লেন। তি­নি উই­লিয়াম­কে স্যার উপা­ধি প্ৰদান করে শ্রে­ষ্ঠ আভি­জা­ত্যের গৌ­রব প্র­দান কর­লেন।

উই­লিয়ম শেষ বয়স পর্য­ন্ত বি­নয়ী ও সরল ছি­লেন। তি­নি কখ­নো কা­রো কা­ছে তাঁর পূর্ব জী­ব­নের ইতি­হাস গা­ে­পন কর­তেন না। হীন বং­শে তাঁর জন্ম হয়েছি­লো— আত্ম­শ­ক্তি­তে তি­নি উচ্চা­সন ও বি­লে­তের শ্রে­ষ্ঠ সম্মান লাভ করেন— এক­থা বল­তে তি­নি সব সময়েই গৌ­রব বোধ কর­তেন।

উই­লিয়াম পে­টিট বলে এক মহা­ত্মার কথা জা­নি। তাঁর বা­পের ছিল কা­পড়ের দো­কান। পে­টিট ফরা­সী দে­শে বি­শ্ব­বি­দ্যা­লয়ের ছা­ত্র ছি­লেন। সে­খা­নে যে­ভা­বে তি­নি কলেজ ও নি­জের ব্যয় নি­র্বাহ কর­তেন, তা শু­ন­লে তো­মা­দের অনে­কের মনে সা­হস আস­বে। কল­কা­তার রা­স্তায় রা­স্তায় ছোট ছোট মনো­হা­রী দো­কান দে­খেছ? পে­টিট তে­ম­নি করে পথে পথে ফে­রী করে ছা­ত্র­জী­ব­নের ব্যয় সং­গ্ৰহ কর­তেন।

পড়া এক রকম শেষ হলে তি­নি দে­শে ফি­রে এক জা­হা­জে চা­ক­রি গ্র­হণ করেন। সে কাজ তার পো­ষাল না।

জা­হা­জের কা­প্তান তাঁকে এক­দিন অপ­মান, এমন কি প্র­হার করেন। ঘৃ­ণায় ও লজ্জায় পে­টিট কাজ পরি­ত্যাগ করে পে­রী শহ­রে ডা­ক্তা­রী পড়তে চলে গে­লেন।

পে­রী শহ­রে এসে তার যা­র­প­র­নাই কষ্ট হতে লা­গিল। খা­লি পেট জলে ভর্তি করে অনেক সময় তা­কে পড়ে থা­ক­তে হতো।

এই দু­ঃখ ও অভা­বের মধ্যেই অতি কষ্টে কয়েক­টি টা­কা সং­গ্রহ করে পে­টিট আগের মতো আবার ফে­রী করা আর­ম্ভ কর­লেন। ফে­রী করেই তি­নি ডা­ক্তা­রী পড়া শেষ কর­লেন।

ডা­ক্তা­রীর সঙ্গে সঙ্গে সা­হি­ত্য­সে­বা কর­তে লা­গ­লেন। ক্র­মে তার শক্তি ও প্র­তি­ভার সু­খ্যা­তি চা­র­দি­কে ছড়িয়ে পড়লো-দে­শের মা­নু­ষের শ্র­দ্ধা। তি­নি লাভ কর­তে আর­ম্ভ কর­লেন। না­না বি­ষয়ে তি­নি প্ৰবন্ধ লি­খ­তেন। চি­ত্তা-কখ­নো দর্শ­নের জটিল তত্ত্বে, কখ­নো অঙ্ক­শা­স্ত্ৰে, কখনও কা­পড় তৈরীর পন্থা নি­র্ধা­র­ণে, কখনও রং প্র­স্তুত কর­বার কৌ­শল নি­র্বা­চ­নে নি­ব­দ্ধ থা­ক­তেন।

ব্য­ব­সা করে পে­টিট যথে­ষ্ট অর্থ উপা­র্জন করে­ছি­লেন। এই কর্মী উই­লিয়াম পে­টি­টের গুণ ও শক্তি-সা­ধ­না সম্রাট শ্র­দ্ধার সঙ্গে স্বী­কার করে­ছি­লেন। সম্রাট কর্তৃক উই­লিয়ম শ্রে­ষ্ঠ উপা­ধি­তে ভূষিত হয়েছি­লেন।

নে­ল­সন ও ওয়েলি­ং­টন আদৌ বনে­দী ঘরের ছে­লে নন-অথচ বৃ­টিশ জা­তির পি­তা তাঁরাই। বি­লে­তের এক লর্ড এক­খা­না ছোট স্যা­ত­সেঁতে গর্তের মতো ঘরের দি­কে আঙ্গুল উঠিয়ে তাঁর ছে­লে­কে এক­দিন বলে­ছি­লেন—ঐ ঘর­খা­নি­তে তো­মার বুড়ো দা­দা মা­নু­ষ­কে ক্ষে­উ­রি কর­তেন। তো­মার দা­দা ছি­লেন না­পিত—আমি হয়েছি লর্ড। শক্তি-সা­ধ­নায় মা­নুষ বড় হয়—এই বি­শ্বাস দে­বার জন্য তো­মা­কে এখা­নে এনে­ছি।

উন­বি­ংশ শতা­ব্দীর অন্য­তম শ্রে­ষ্ঠ পু­রুষ গো­খেল ছি­লেন দরি­দ্র সস্তান। নি­জের শক্তি­তে তি­নি ভা­রত ছাড়া বি­দে­শেও উচ্চা­সন ও শ্র­দ্ধা লাভ করে­ছি­লেন। স্যার উপা­ধি গ্র­হণ কর­তে তি­নি স্বী­কৃত হন নাই।দরি­দ্র গো­খেল নি­জে­কে কত উচ্চ আসন দি­তে পে­রে­ছি­লেন।

সম্রাট সবু­ক্ত­শীন ছি­লেন ক্রী­ত­দাস। কু­তু­বু­দ্দীন ও পরের কতি­পয় সম্রাট ছি­লেন দাস। দা­সের জী­বন হতে হয়েছি­লেন তা­রা সম্রাট-মা­নু­ষের মহা­সে­বক-জগ­তের ধর্ম, সভ্য­তা ও শা­ন্তি­র­ক্ষক।