কর্মে প্রা­ণ­যো­গ্য-দৃঢ় ইচ্ছা

যে কা­জই কর না, তা­তে যদি কোন রক­মে তো­মার মন ঢে­লে দি­তে পা­ের, তা­হ­লে আর কোন ভয় নাই। সং­শয়কে মনে স্থান দি­তে নাই। সং­শয়ে মনের বল কমে যায়, এমন কি কা­র্যে সি­দ্ধি­লাভ হয় না।

কোন কাজ কর­তে ইচ্ছা করেছ। ভে­বে নাও-বি­শ্বাস কর—তু­মি কৃ­ত­কা­র্য হবে-তা­র­পর পরি­শ্রম কর। তু­মি নি­শ্চয়ই কৃ­ত­কা­র্য হবে।

ফরা­সী দে­শে এক ব্য­ক্তি ঘরের ভি­তর ঘু­রে বেড়াতেন। আর বল­তেন-আমি এক­জন বড় যো­দ্ধা হবো, তাই তি­নি হয়েছি­লেন।

এক­টি ছা­ত্র­কে জা­নি-সে। কয়েক বছর আগে­কার কথা। তি­নি পড়তে বসে­ছি­লেন, গায়ে তখন জ্বর। সা­ম­নে পরী­ক্ষা-না পড়লেই চল­বে না। পরী­ক্ষায় পাশ না হলে হয়ত তা­কে মর­তে হবে। জ্বর এসে­ছে, সে কথা ভু­লে গিয়ে তি­নি পড়তে আর­ম্ভ কর­লেন। কি­ছু­ক্ষ­ণের মধ্যেই তাঁর জ্বর চলে গেল।

এক ভদ্র­লো­কের অসুখ হয়েছিল—তি­নি ইচ্ছা কর­লেন অবি­ল­ম্বে তাঁকে ভাল হতেই হবে—সত্যিই তি­নি ভাল হলেন।

সম্রাট বা­ব­রের কথা সবাই জা­নেন। পু­ত্রের ব্যা­ধি তি­নি কে­মন করে নি­জের ভি­তর টে­নে নি­লেন।

এক­বার এক সৈন্যা­ধ্য­ক্ষের অসুখ হয়। খুব সা­ং­ঘা­তিক অসুখ। হঠাৎ এক­টা যু­দ্ধ বে­ধে উঠ­লো। অসু­খের কথা ভু­লে এক­টা অমা­নু­ষিক শক্তির দ্বা­রা বলীয়ান হয়ে সেই শরীর নিয়েই ময়দা­নে না­ম­লেন।যখন জয়লাভ হলো তখন তি­নি প্ৰাণ­ত্যাগ কর­লেন।

শু­ধু ইচ্ছা কর­লে কি হবে? দৃঢ়ভা­বে ইচ্ছা করো এবং বি­শ্বাস করো, তু­মি কৃ­ত­কা­র্য হবে-সা­ধ­না আপ­না হতেই চলে আস­বে। দু­ঃ­খে ভীত হবে না, অভা­বে দমে যা­বে না— অসীম বলে, নি­র­ব­চ্ছি­ন্ন সা­ধ­নায় নি­জের পথ নি­জে পরি­ষ্কার করে নি­তে পা­র­বেই।

বি­শ্বাস ও দৃঢ় ইচ্ছার সম্মু­খে অস­ম্ভব সম্ভব হয়ে পড়ে। তো­মার সা­ধ­নায় যদি তু­মি জয়ী হতে যাও, তবে সম­স্ত মন তো­মার কর্মে ঢে­লে দাও-প্রাণ দিয়ে বি­শ্বাস করো, তু­মি কৃ­ত­কা­র্য হবে। সং­শয় ও অবি­শ্বাস মন থে­কে দূর করে দাও। সং­শয়ী যা­রা তা­রা কা­পু­রুষ, তা­দের সা­ধ­নার কোন মূল্য নাই—তা­দের পরা­জয় হবে।

এক সা­ধু বলে­ছেন- যা আম­রা হতে চাই, তাই হতে পা­রি। এই হতে চাওয়ার ইচ্ছা খুব দৃঢ় এবং কঠিন হওয়া চাই।

এক­দিন এক মি­স্ত্রী এক­খা­নি চেয়ার তৈরী করে বল­লেন, চেয়ার তৈরী করি।—বস­তে পা­রি।না। প্র­তি­জ্ঞা কর­লাম, এই চেয়ারে আমি বস­বো। বি­স্ময়ের কথা! মি­স্ত্রী কা­লে মা­নু­ষের শ্ৰদ্ধার পা­ত্র হয়ে সেই চেয়ারেই বসে­ছি­লেন।

নি­জে­কে দু­র্বল ও শক্তি­হীন মনে কর­লে চল­বে না; তু­মি মা­নুষ-তো­মার ভি­তর এই শক্তি আছে-যে শক্তির সম্মু­খে গি­রি মা­থা নত করে, বি­শ্ব-সং­সার কাঁপতে থা­কে।

তু­মি বি­প­দে পড়েছি? ভয় কি? বি­প­দ­কে উপ­হাস করে-দরি­দ্র্যের বি­ষ্পে­ষ­ণ­কে ঠে­লে ফে­লে দাঁড়াও, তু­মি সফ­ল­তার উচ্চ শি­খ­রে উঠ­তে পা­র­বে।

এক ব্য­ক্তি­কে জা­নি। তা­কে এক নি­ষ্ঠুর ভদ্র­লোক বলে­ছি­লেন, এই শি­লা­খা­নি মা­থায় করে রা­স্তার ধা­রে নিয়ে যাও। তা­হ­লে বু­ঝ­বো।–তু­মি শক্তি­শা­লী পু­রুষ, দশ টা­কা বখ­শিশ, পা­বে। লো­ক­টি অর্থ অপে­ক্ষা গৌ­রব লো­ভে পা­থ­র­খা­নি মা­থায় করে বে­রো­লো। সে খু­বই উৎসা­হের সঙ্গে শি­লা­খা­নি মা­থায় নিয়েছিল। অর্ধ­পথ আসার পর তার মু­খ­খা­না শু­কিয়ে গেল, যা­ত­নায় বুক ঘন ঘন স্প­ন্দিত হতে লা­গল, চোখ দু’টি রক্ত­ময় হয়ে গেল।

এক ভদ্র­লোক কৌ­তু­হল ও সহা­নুভূতি­তে লো­ক­টির পে­ছ­নে পে­ছ­নে যা­চ্ছি­লেন।

ভদ্র­লোক সেই লো­ক­টির অব­স্থা এক­টু বু­ঝে তার কা­ছে যেয়ে দাঁড়াতেই লো­ক­টি বল­লে–আর পা­র­ছি না-পা­থর ফে­লে দিই-কি বলেন?

ভদ্র­লোক রু­দ্র কণ্ঠে বল­লেন—বল কি? তো­মার মতো শক্তি­শা­লী লো­কের কা­ছে পা­থ­র­খা­না তো শো­লার মতো হা­ল­কা, ফে­ল­বে কেন? চল, নিয়ে চল। আমি তো­মার সঙ্গে যা­চ্ছি।

ক্লা­ন্ত লো­ক­টি উৎসাহ ও বি­শ্বা­সে পা­থ­র­খা­নি গন্ত­ব্য­স্থা­নে নিয়ে গেল।

জী­ব­নের প্র­থম থে­কে ঠিক করে নাও, তু­মি কোন কা­জের জন্য উপ­যু­ক্ত। এটা এক­বার ওটা এক­বার করে যদি বেড়াও তা­হ­লে তো­মার জী­ব­নের কোন উন্ন­তি হবে না। এইরূপ করে অনেক লো­কের জী­বন নষ্ট হয়ে গিয়েছে-তো­মার যেন তা না হয়।

ঠিক কর­লে-ব্য­ব­সায়ী হবে, সম­স্ত প্ৰাণ ব্য­ব­সা­তে ঢে­লে দাও। খেয়াল চে­পে­ছে আর ব্য­ব­সা কর­তে যেও না-দু­দিন পরেই তো­মার মন বি­র­ক্ত হয়ে উঠ­বে। তো­মার শক্তি বৃ­থা ক্ষয় মত­ল­বে। যদি জোর না থা­কে, তা­হ­লে সা­ধ­নায় তো­মার মন বস­বে না। ইচ্ছা থা­ক­লেই পথ আছে—এ প্র­বা­দ­টির চল­তি সবার মধ্যেই আছে।

তো­মার কোন কি­ছু কর­বার বা হবার দৃঢ় বা­স­না আছে—তা­হ­লে কোন বা­ধা তো­মার গতি­কে ঠে­কিয়ে রা­খ­তে পা­র­বে না। শু­ধু চাই তো­মার সঠিক ইচ্ছা এবং বি­শ্বাস। এই বি­শ্বা­সের সঙ্গে খো­দার শক্তি তু­মি পা­বে।

ধর্মে—যে যা কঠি­ন­ভা­বে পে­তে ইচ্ছা করে, তা সে পায়।

নে­পো­লিয়ান বলেন— অস­ম্ভব বলে জগ­তে কি­ছু নাই। ডা­ক্তার লি­ভি­ং­ষ্টান যখন ছোট তখন তি­নি এক কা­র­খা­নায় মজু­রি কর­তে গে­লেন। প্র­থম সপ্তা­হে তি­নি যে বে­তন পে­লেন তাই দিয়ে তি­নি এক­খা­না ল্যা­টিন ভা­ষার গ্রা­মার কি­ন­লেন। আম­রা আজ­কাল ইং­রে­জী পড়ি, সে­কা­লে ইং­রে­জ­রাও তে­ম­নি ল্যা­টিন ও গ্ৰীক পড়তেন। দি­নে দি­নের কাজ, রা­তে দু­পুর রাত পর্য­ন্ত জে­গে জে­গে বই পড়া।

এমন করে নি­জে নি­জে পড়ে লি­ভি­ং­ষ্টান ল্যা­টিন ভা­ষার খুব বড় বড় বই পড়ে ফে­ল­লেন। বে­শী করে তি­নি বি­জ্ঞা­নের বই পড়তেন।

এর­পর তাঁর ইচ্ছা হলো মা­নু­ষের উপ­কার করে এবং তা­দি­গ­কে জ্ঞান দিয়ে তি­নি জী­বন শেষ কর­বেন। এই কা­জে খুব দক্ষ হবার ইচ্ছায় তি­নি চি­কিৎসা­শা­স্ত্ৰ অধ্যয়ন কর­তে আর­ম্ভ কর­লেন। সঙ্গে সঙ্গে তি­নি গ্রীক ভা­ষাও আলো­চ­না কর­তে লা­গ­লেন।

গ্লা­স­গো বি­শ্ব­বি­দ্যা­লয়ের ছা­ত্র যখন তি­নি-তখন ছু­টির সময় অর্থ জমা­বার জন্য তি­নি কা­র­খা­নায় মজু­ররূপে কাজ কর­তেন।

ইচ্ছা ছিল তাই কোন রকম দু­ঃখ-কষ্টের ভি­তর দিয়ে তি­নি বি­শ্ব­বি­দ্যা­লয়ের উপা­ধি লাভ কর­তে সম­র্থ হলেন।

জী­বন তি­নি পতিত মা­নু­ষের কল্যা­ণেই কা­টিয়েছেন। যখন তি­নি মি­স­রে তখন অনেক সময় তা­কে গরু চরা­তে দে­খা যে­তো। কখনও কখনও তি­নি লা­ঙ্গল চষ্য­তেন। পরের সে­বা ও পরি­শ্র­মের উপর নি­র্ভ­র­শীল না হয়ে নি­জে পরি­শ্রম কর­তে গৌ­রব বোধ কর­তেন।

অষ্টা­দশ শতা­ব্দী­তে জন হাওয়ার্ড না­মক এক মহা­পু­রুষ বি­লে­তে কয়েদি­দের অব­স্থার উন্ন­তির জন্য কত পরি­শ্রম করে­ছি­লেন। তাঁর চে­ষ্টায় কয়েদি­দের প্র­তি নি­ষ্ঠুর ব্য­ব­হার অনেক পরি­মা­ণে কমে­ছে। গভ­র্ন­মে­ন্ট এবং দে­শের মনী­ষী­বৃ­ন্দ তাঁর চি­স্তা ও ভাব গ্ৰহণ করে­ছি­লেন। কোন দু­ঃখ কোন বা­ধা তা­কে তাঁর সা­ধ­না হতে ধরে রা­খ­তে পা­রে­নি। শক্তি ও বি­শ্বাস তা­কে জয়যু­ক্ত করে­ছিল। প্র­তি­ভা কি­ং­বা শু­ধু ভা­ষার পরী­ক্ষা তা­কে জয়যু­ক্ত করে নাই।