জা­তির উত্থান

কোন জা­তি­কে যদি বলা হয়-তো­ম­রা বড় হও, তো­ম­রা জাগ-তা­তে ভাল কাজ হয় বলে মনে হয় না। এক এক­টা মা­নুষ নিয়েই এক এক­টা জা­তি। পল্লীর অজ্ঞাত-অব­জ্ঞাত এক এক­টা মা­নু­ষের কথা ভা­ব­তে হবে।

মা­নু­ষ­কে শক্তি­শা­লী, বড় ও উন্নত করে তো­লার উপায় কি? তা­কে যদি শু­ধু বলি-তু­মি জা­গো-আর কি­ছু না, তা­তে সে জা­গ­বে না। এই উপ­দেশ বা­ণীর সঙ্গে অনেক কি­ছু জড়িত আছে। এই­টে ভাল করে বো­ঝা চাই।

আবার বলি-কোন জা­তি­কে যদি বা­হির হতে বলি-বড় হও, তা­তে কাজ হবে না। মা­নু­ষ­কে এক এক­টা করেই ভা­ব­তে হবে।

এক­টা লোক জা­তীয় সহা­নুভূতি­তে অনু­প্রা­ণিত হয়ে হা­জার হা­জার টা­কা তু­র­স্কে পা­ঠিয়েছি­লেন। তি­নি যখন অগ­ণ্য আর্ত মা­নু­ষের বে­দ­না কা­হি­নী গা­ই­তে গা­ই­তে ভি­ক্ষার বু­লি স্ক­ন্ধে নিয়ে পথে বের হতেন তখন প্র­ত্যেক মা­নু­ষের প্রাণ সহা­নুভূতি বে­দ­নায় ও করু­ণায় ভরে উঠত। এই ব্য­ক্তি কি­ছু­দিন পর তার এক নি­র­ন্ন প্র­তি­বে­শীর সর্ব­স্ব হরণ কর­তে দ্বি­ধা­বোধ করেন নাই। মা­নু­ষের এই ভা­বের জা­গ­রণ ও বে­দ­না-বো­ধের বে­শী মূল্য আছে বলে মনে হয় না। কোন জা­তির যখন পতন আর­ম্ভ হয়; তখন দে­শ­সে­বক যে কেউ থা­কে না তা নয়। স্বা­ধী­ন­তার মম­তায় কেউ প্ৰাণ দেয় না, তা বলি না; যা­রা মন দেয় তা­দের মন ভি­ত­রে ভি­ত­রে অন্ধ হতে থা­কে। জা­তি­কে খাঁটি রক­মে বড় ও ত্যা­গী কর­তে হলে সমা­জের প্র­ত্যেক মা­নু­ষ­কে বড় ও ত্যা­গী কর­তে হবে কি উপায়ে? দে­শের মা­নু­ষের ভি­তর আত্ম­বোধ দে­বার উপায় কি? প্ৰত্যেক মা­নুষ শক্তি­শা­লী-উন্নত হৃ­দয়-প্ৰেম-ভা­বা­প­ন্ন-সত্য ও ন্যায়ের প্র­তি শ্ৰদ্ধা­বান, অন্যায় ও মি­থ্যার প্র­তি বি­তৃ­ষ্ণ হবে কে­মন করে? জা­তির প্র­ত্যেক বা অধি­কা­ংশ মা­নুষ এই­ভা­বে উন্নত না হলে জা­তি বড় হবে না।

প্র­ত্যেক মা­নু­ষের ভি­তর জ্ঞা­নের জন্য এক­টা স্বা­ভা­বিক ব্যা­কু­ল­তা জন্মিয়ে দেওয়া চাই। সং­সার এম­ন­ভা­বে চলে­ছে, যা­তে সক­লের পক্ষে বি­দ্যা­লয় বা উচ্চ জ্ঞা­নের যোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। অথ­বা সা­রা ছা­ত্র­জী­বন ধরে বি­দ্যা­লয়ে জ্ঞা­ন­লাভ করা হয়ে ওঠে না।

কেউ বা­ল্যে পি­তৃ­হীন হয়, কা­রো পি­তা জ্ঞা­ন­লো­চ­না­কে বি­শেষ আব­শ্যক কাজ মনে করেন না করে ছে­লে­কে স্কু­লে পা­ঠান না, কেউ পা­ঠা­ভ্যাস কা­লে উদ্ধত ও দু­র্ম­তি হয়ে পড়াশু­না ত্যাগ করে, কেউ বি­দে­শী ভা­ষার নি­ষ্পে­ষ­ণে বো­কা ভে­বে পড়াশু­না বাদ দেয়।

পাঁচ হা­জার ছা­ত্রের মধ্যে পঞ্চা­শ­জন ছাড়া বা­কী সব ছে­লেই সময়ে জ্ঞা­না­ন্ধ, হীন ও মৌন মূক হয়ে যায়। ইহা জা­তির পক্ষে কত ক্ষ­তির কথা।

মনু­ষ্য­ত্ব লা­ভের পথ জ্ঞা­নের সে­বা। জী­ব­নের সকল অব­স্থায়-সকল সময়ে-আহার স্না­নের মত মা­নু­ষের পক্ষে জ্ঞা­নের সে­বা করা প্রয়োজন।

উন্নত, ত্যা­গী, শক্তি­শা­লী, প্রে­মিক, সত্য ও ন্যায়ের প্র­তি শ্ৰদ্ধা­বান মা­নুষ বি­দ্যা­হীন বা অল্প­শি­ক্ষিত মা­নু­ষের মধ্যে পাওয়া যায় না; মা­নু­ষের বা জা­তি­কে বড় হতে হলে সব সময়ই তা­কে জ্ঞা­নের সে­বা কর­তে হবে।

দে­শের সকল মা­নু­ষ­কে জ্ঞা­নী করে তো­লার উপায় কি? জা­তির জী­ব­নের মে­রু­দ­ণ্ড মনু­ষ্য­ত্ব ও জ্ঞান। এই দু­টি চা­পা রে­খে জা­তি­কে জা­গ­তে বল­লে সে জা­গ­বে না।

বু­দ্ধির দো­ষে হোক বা অব­স্থার চক্ৰে হোক, কোন দে­শে যদি বহু মা­নুষ অশি­ক্ষা, অল্প­শি­ক্ষিত বশ­তঃ অমা­র্জি­ত­চি­ত্ত এবং জ্ঞা­নের প্র­তি শ্ৰদ্ধা­বো­ধ­হীন হয়ে পড়ে, তা­হ­লে সে জা­তির জী­বন টে­ক­সই হবে না।এই সব লক্ষ মৌন আত্মায় স্প­ন্দন আন­বার এক উপায় আছে, কো­টি­ব­দ্ধ মু­খে ভা­ষা তু­লে দে­বার এক পন্থা আছে। সকল দে­শে সকল সময়ে সেই পস্থা কা­র্য­ক­রী হয়ে থা­কে। সেই পন্থা না থা­ক­লে কোন জা­তি বা­চিত না-উন্নত হওয়া স্ব­প্ন অপে­ক্ষা অস­ম্ভব হতো।

জা­তি­কে শক্তি­শা­লী কর­তে প্র­ত্যেক সময়ে মা­নুষ এই পন্থা অব­ল­ম্বন করে­ছে। গ্ৰীক জা­তি, রো­মান জা­তি, বর্ত­মান ইউ­রো­পীয় জা­তি-এই পথ­কে অব­ল­ম্বন করে শ্ৰেষ্ঠ­স্থান অধি­কার করে­ছেন।

যা­রা এই পথ­কে অব­হে­লা করে নি­জ­দি­গ­কে প্র­তি­ষ্ঠিত কর­তে ইচ্ছা করে, তা­রা এক­টা অস­ম্ভব কাজ আর­ম্ভ করে।

এই পথ আর কি­ছু নয়—দে­শের বা জা­তির সা­হি­ত্যের পু­ষ্টি­সা­ধন। যে সমা­জে সা­হি­ত্যের কোন আদর নাই, তা­হা সা­ধা­র­ণত বর্বর সমাজ। কথা কা­গ­জে ধরে অসং­খ্য মা­নু­ষের দৃ­ষ্টির সম্মু­খে ধরার নাম সা­হি­ত্য-সে­বা। এই যে কথা, এ কথা সা­ধা­রণ কথা নয়-এই কথার ভি­তর দিয়ে জী­ব­নের সন্ধান বলে দেওয়া হয়, পু­ণ্যের বা­ণী ও মো­ক্ষের কথা প্র­চার করা হয়, বর্ত­মান ও অন্তিম সু­খের দ্বার মু­ক্ত করে দেওয়া হয়।

এই কথার ধা­রা গান ও গল্প, কখনও কবি­তা ও দর্শন, কখনও প্ৰবন্ধ ও বি­জ্ঞা­নের রূপ নিয়ে মা­নু­ষের সম্মু­খে রঙীন হয়ে, মধু­র­ভা­বে দে­খা দেয়।

দু­র্গত কণ্ট­কা­কী­র্ণ আঁধার পথে কেউ যদি প্ৰদীপ না নিয়ে চল­তে থা­কে কি­ং­বা আলোর যে আব­শ্য­ক­তা আছে, এক­থা উপ­হা­সের সঙ্গে অস্বী­কার করে, তা­হ­লে তা­কে কি বলা যায়? কোন জা­তি সা­হি­ত্য­কে অস্বী­কার বা অব­হে­লার চো­খে দে­খে উন্নত হতে চে­ষ্টা কর­লে সে জা­তি আদৌ উন্নত হবে না।

শি­ক্ষি­ত­কে আরও শি­ক্ষিত, ভা­বু­ক­কে আরও গভীর কর­বার জন্য, দে­শের অশি­ক্ষিত বা অর্ধ­শি­ক্ষিত শি­ক্ষা­কে­ন্দ্রের বা­হি­রের লো­ক­গু­লি­কে শক্তি­শা­লী, জ্ঞা­নী ও মনু­ষ্য­ত্ব­বোধ সম্প­ন্ন কর­বার জন্য প্র­ত্যেক দে­শে বহু মনী­ষী জন্ম­গ্র­হণ করেন।

জা­তির পথ­প্র­দ­র্শক তাঁরাই। তাঁরাই জা­তি গঠন করেন। গ্রীস, আরব, হি­ন্দু ও ইউ­রো­পীয় শক্তি সভ্য­তার জন্ম­দা­তা তাঁরাই।

প্ৰত্যেক দে­শের সা­হি­ত্যের ভি­তর দিয়ে এই­সব শি­ক্ষিত শ্রে­ণী জা­তি­কে উর্ধ্বে টে­নে তো­লেন।ক্ষু­ধা­তুর আর্ত তা­দের স্প­র্শে রা­জা হয়ে ওঠে, পল্লীর কৃ­ষক, দূর অজ্ঞাত-কু­টি­রের ভি­খা­রী, জমি­দা­রের ভৃ­ত্য, দরি­দ্র গো-যান-চা­লক, অন্ধ­কা­রের পা­পী, বা­জা­রের দর­জী, নগ­রের ঘড়ি নি­র্মা­তা, নবা­বের ভৃ­ত্য, গ্ৰাম্য উরু­টে যু­বক শ্রে­ণী তাঁদে­রই মন্ত্রে মহা­পু­রুষ হয়। এই মন্ত্র গ্ৰহণ কর­বার উপ­যো­গী তা­দের কি­ছু শক্তি-অর্থাৎ কি­ছু বর্ণ জ্ঞান থা­কা চাই। এরাই জা­তির মে­রু­দ­ণ্ড-ছোট বলে এদি­গ­কে অস্বী­কার কর­লে জা­তি প্ৰাণ-শক্তি­হীন হয়ে পড়ে।

জা­তি­কে শক্তি­শা­লী, শ্ৰেষ্ঠ, ধন­স­ম্প­দ­শা­লী, উন্নত ও সা­ধা­র­ণের মধ্যে সম­ভা­বে বি­ত­রণ কর­তে হবে। দে­শে সরল ও কঠিন ভা­ষায় না­না প্র­কা­রের পু­স্তক প্র­চার কর­লে এই কাৰ্য সি­দ্ধ হয়। শক্তি­শা­লী দৃ­ষ্টি­স­ম্প­ন্ন মহা­পু­রু­ষ­দের লে­খ­নীর প্র­ভা­বে এক­টা জা­তির মা­ন­সিক ও পা­র্থিব পরি­ব­র্তন অপে­ক্ষা­কৃত অল্প সময়ে সং­শো­ধিত হয়ে থা­কে। দে­শের প্র­ত্যেক মা­নুষ তার ভুল ও কু­সং­স্কার, অন্ধ­তা ও জড়তা, হী­ন­তা ও সঙ্কী­র্ণ­তা­কে পরি­হার করে এক­টা বি­নয়হি­মো­জ্জ্বল উচ্চ জী­ব­নের ধা­র­ণা কর­তে শে­খে। মনু­ষ্য­ত্ব ও ন্যায়ের প্র­তি­ষ্ঠা করাই সে ধর্ম মনে করে, আত্ম­ম­র্যা­দা জ্ঞা­ন­স­ম্প­ন্ন হয় এবং গভীর পু­ষ্টি লাভ করে। তা­র­পর বি­রাট শক্তি জে­গে উঠে।

ইং­রা­জের বি­রাট শক্তির অন্ত­রা­লে বহু লে­খ­কের লে­খ­নী শক্তি আছে। বস্তুত লে­খক বা জগ­তের পণ্ডি­ত­বৃ­ন্দ নি­ভৃ­তে লো­ক­চ­ক্ষুর অন্ত­রা­লে বসে বি­শ্বের সকল অনু­ষ্ঠান ও কা­ম­কে­ন্দ্রে গতি প্ৰদান করেন।তা­দের অজা­না হস্তের কা­র্য-ফলে অসং­খ্য মা­নুষ মরুভূমে সা­গর রচ­না করেন, সা­গ­র­ব­ক্ষে পা­হাড় তো­লেন-জগৎ সভ্য­তার নি­র্মা­তা তাঁরাই।

কোন দে­শের মা­নুষ যদি এই লে­খ­ক­শ্রে­ণীর বা দে­শীয় সা­হি­ত্যের প্র­তি শ্ৰদ্ধা পো­ষণ না করে তবে তা­রা বড় হীন। জা­তির ভি­ত­র­কার সকল পণ্ডি­ত­কে হত্যা কর-সম­স্ত জা­তি­টা শক্তি­হীন হয়ে পড়বে।

কোন সভ্য জা­তি­কে অস­ভ্য কর­বার ইচ্ছা যদি তো­মার থা­কে তা­হ­লে তা­দের বই­গু­লি ধ্বংস কর, সকল পণ্ডি­ত­কে হত্যা কর, তো­মার উদ্দে­শ্য সি­দ্ধ হবে।

লে­খক, সা­হি­ত্যিক ও পণ্ডি­ত­রাই জা­তির আত্মা। এই আত্মা­কে যা­রা অব­হে­লা করে, তা­রা বাঁচে না।

দে­শ­কে বা জা­তি­কে উন্নত কর­তে ইচ্ছা কর­লে, সা­হি­ত্যের সা­হা­য্যেই তা কর­তে হবে। মা­নব মঙ্গ­লের জন্য যত অনু­ষ্ঠান আছে, তার মধ্যে এই­টিই প্র­ধান ও সম্পূর্ণ। জা­তির ভি­তর সা­হি­ত্যের ধা­রা সৃ­ষ্টি কর, আর কি­ছুর আব­শ্যক নাই। কোন দে­শ­কে সভ্য ও মা­নুষ কর­বার বা­স­না তো­মার আছে? তা­হ­লে বি­ধি-ব্য­ব­স্থার সঙ্গে সেই দে­শের সা­হি­ত্য­কে উন্নত কর­তে তু­মি চে­ষ্টা কর। মা­তৃ­ভা­ষার সা­হা­য্যে সা­হি­ত্য­কে উন্নত কর­তে চে­ষ্টা কর­তে হবে। বি­দে­শী সা­হি­ত্যে মা­নব সা­ধা­র­ণের কোন কল্যাণ হয় না। দে­শীয় সা­হি­ত্য­কে উন্নত কর­তে হবে, আবার বি­শ্বের উন্নত সা­হি­ত্যের সার সং­গ্ৰহ কর­তে হবে। নি­জে­দের যা কি­ছু আছে তা­তেই সস্তু­ষ্ট থা­ক­লে জা­তির উন্ন­তির পথ রু­দ্ধ হয়ে যায়।

সা­হি­ত্যের শক্তি­তে দে­শের প্র­ত্যেক মা­নুষ শক্তি­শা­লী মহা­পু­রুষ হতে পা­রে। মা­নু­ষের সকল বি­প­দের মী­মা­ং­সা সা­হি­ত্যের ভি­তর দিয়েই হয়ে থা­কে।

জা­তি যখন দৃ­ষ্টি­স­ম্প­ন্ন ও জ্ঞা­নী হয়, তখন জা­গ­বার জন্য সে কা­রো আহ্বা­নের অপে­ক্ষা করে না, কা­রণ, জা­গ­র­ণই তার স্ব­ভাব।