নৌ-বিহারে যাবেন দেওয়ান ভৈরব চন্দ্র রায়। চারদিকে চলছে সাজ সাজ আয়োজন। সাজানো হয়েছে বিশাল আকৃতির পানসি। পানসিকে বেয়ে নেয়ার জন্য প্রস্তুত হলো বার দাঁড়ি মাল্লা-মাঝি। পাইক-পিয়াদা, নায়েব-গোমস্তা তো সঙ্গে যাচ্ছেই। পাক-শাকের জন্য সঙ্গে নেয়া হল দেওয়ান বাড়ির সবচেয়ে পুরাতন ও দক্ষ পাকশি রাধারাণীসহ আরো কয়েকজন রাধূনি। বাটনা বাটা আর কুটনা কূটার জন্য নেয়া হল কয়েকজনকে। বিহারের সম্পূর্ণ আয়োজন সম্পন্ন হলে, শুভক্ষণ দেখে ভাসান হলো দেওয়ান সাহেবের গৌরবে গৌরবান্বিত ও সুসজ্জিত পানসি। সেই ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগের কথা। চাকলা রোসনাবাদের মধ্যে নূর নগর পরগনাই ছিল সবচেয়ে বড়। বিশাল এ পরগনার বিস্তৃত তালুকের অধিকারী বিটঘরের এ দেওয়ান যেমন ছিলেন সাহসী তেমনই দূরদান্ত প্রকৃতির। তিনি যখন যা করার মনস্থির করতেন তখন তা করেই ছাড়তেন। সেই দেওয়ান যাচ্ছেন নৌ-বিহারে।
পল্লীবালার হাতের কাকনের মতো আঁকাবাঁকা তিতাস নদীর কলকল ছলছল জলের উপর দিয়ে বেয়ে বার দাঁড়ের পানসি যখন তিতাস-মেঘনার মোহনার কাছে এসে পৌঁছল তখন বেলা প্রায় পড়ে গেছে। বিরাট নদী মেঘনা। যেমন তার গভীরতা তেমন তার বিস্তৃতি। আর জলের উচ্ছলতা তো আছেই। কূলজোড়া তার ঢেউ, বুকভরা উচ্ছাস। আর সর্বগ্রাসী রূপের জন্য সর্বনাশা পদ্মার পরেই তার স্থান। নদীর এ-পার থেকে ও-পারের তটরেখা দেখা যায় না। বাড়ি-ঘর এবং গাছ-পালাকেও অস্পষ্ট দেখায়। উত্তরে আসাম রাজ্যের বরাক নদীর জল এক সময় সুরমা-কুশিয়ারার দ্বৈত¯্রােতে প্রবাহিত হয়ে অনেক পথ পাড়ি দিয়ে পুনরায় এসে মিলেছে এ মেঘনায়। যে সে নদী নয় সে। সুদীর্ঘ এ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে তার দু‘তীরে রেখে এসেছে কত জনপদ, হাট-বজার, গঞ্জ, বন-জঙ্গল, ফসলের মাঠ আর ছোট বড় চরাভূমি। কৃপা করে দু‘হাত ভরে দান করে এসেছে জল-আহার-অন্ন দু‘তীরের মানুষকে। জলজ সম্পদেও সমৃদ্ধ করে এসেছে তাদের জীবন। কোথাও আবার রুদ্ররোষে কেড়েও নিয়েছে তাদের ভিটে-মাটি, সহায়-সম্পদ, হালের গরু, ফসলেভরা মাঠ এমন কি জীবন পর্যন্ত। এবং সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে বিশাল বঙ্গপসাগরে পতিত হওয়ার পূর্ব অবধি। সেই মেঘনাতে পতিত হওয়ার আগে মোহনার কাছে চলে এসেছে দেওয়ানের পানসি। লাল টুকটুকে সূর্যটা তখন ঝুলে পড়েছে পশ্চিমাকাশে। অস্তগামী রবীর আবীরমাখা রঙ ছড়িয়ে পড়েছে সমস্তটা মোহনাজুড়ে। রূপালী জলের ওপর লালের আভা মাখামাখি হয়ে সোনালী বর্ণে চিকচিক করছে মোহনার মিলিত জল। মোহনাটির ডানদিকে বিস্তৃর্ণ ফসলের চর। প্রচুর রবিশস্য ফলে আছে সেই চরে। পেঁয়াজ, রসুন, টমেটো, ফুল কপি, বাঁধা কপিসহ অন্যান্য শাক সবজি। নদী তীরবর্তী সেই ফসলের চরে গ্রীষ্মের সময় আলু বাদাম এবং নিম্নাঞ্চলে কিছু কিছু ধানও উৎপন্ন হয়।
মেঘনা বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে পাল তোলা কিংবা গুন টানা বড় বড় পাতাম এবং মাঝারি আকারের গয়না নৌকা। দ্বি-খন্ডিত, কখনও ত্রি-খন্ডিত পালও দেখা গেল সেসবের কোন কোন নৌকায়। ঐসব বড় পালকে স্থানভেদে বলা হয় বাদাম। বিরাট মাস্তুলের সাথে কপিকল বেঁধে বড় বড় কাছি বা মোটা দড়ি দিয়ে টেনে টেনে ঐসব বাদামকে উপরে ওঠায় মাঝিরা। আর আয়তাকার রঙ-বেরঙের পালওয়ালা ছোট ডিঙ্গি-দাইরল-সরঙ্গা ইত্যাদি নৌকাতো আছেই। ঐসব নৌকা থেকে জলো বাতাসে ভর করে ভেসে আসছে মাঝির উদাস কন্ঠে ভাটিয়ালি সুর- ‘মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে আমি আর বাইতে পারলাম না…’। কিংবা ‘সাগর কূলের নাইয়ারে অপুর বেলা। মাঝি কোথায় আই চলছ বাইয়ারে। বেলা গেল সন্ধ্যা হল মাঝি…’। সেসব পাল তোলা নৌকার ছৈ-এ বসে রয়েছে ব্যাপারি। পড়নে দুই দিকে দুই পকেটওয়ালা ফতুয়া। এর নিচে কোমরে বাঁধা টাকা-পয়সা রাখার জন্য মোটা কাপড়ের খুতি। মাথায় মণিপরি বা সাঁওতালি গামছায় বাঁধা পটকা। তাদের হাক-ডাক শোনা গেল। মাঝিরা গুন আরও জোরে টান। বেলা তো পড়ে এলো। সামনের সুবিধামত কোন খাঁড়িতে নৌকার নোঙর করতে হবে। তবে উজান পানি বাইয়া সেই সুনামগঞ্জের ভাতের ট্যাক যাইতে কিন্তু তিন দিনের বেশি সময় লাগানো যাইব না। আবার কোন কোন নৌকার মাঝিরা তাদের বাদাম নামিয়ে ফেলছিল। তারা নিশ্চয় আর এগুতে চায় না। নোঙর গাড়বে পছন্দের কোন খাঁড়িতে। পরের দিন সকালে আবার পাড়ি জমাবে স্ব স্ব গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।
আর বাম দিকে সঙ্গমস্থলটি হতে উত্তর-পূর্বদিকে ঢুকে গেছে দু‘নদীর মিলন মোহনার কিছু জল নিয়ে একটি খাঁড়ি। দেওয়ান সাহেব মাল্লাদের সিদান্ত দিলেন সেদিনকার মতো যাত্রা-বিরতির। সেই খাঁড়িতে পানসি ঢুকে নোঙর করবে। সেখানে হবে রাত্রীযাপন।
খাঁড়ির পারের গ্রামের নাম দূরগ্রামপুর। নদী শিকস্তি গ্রাম। মেঘনার ভাঙনে সে গ্রামের বহু ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। সে গ্রামে আজকের দিনের মতো এত লোক বসতি ছিলনা। তথাপি যাদের বসতি ছিল তাদের মধ্যে কিছুক্ষণের মধ্যেই খবর ছড়িয়ে পড়ল। বিটঘরের দেওয়ানের পানসি নোঙর গ্যাড়েছে তাদের গ্রামের খাঁড়ির ভেতর। মেঘনা-তিতাসের জলে মাছধরা আর দেওয়ানের তালুকদারিতে চাষ-বাসের মাধ্যমেই গ্রামের মানুষের জীবন-জীবিকা। পানসিতে বাঁধা ছোট ডিঙি নিয়ে নায়েব এসে দেওয়ান আসার খবর দিল গ্রামে। খবর পেয়ে গ্রামবাসির তো পড়ি-মরি অবস্থা। কি সেবা তারা করতে পারে দেওয়ান সাহেবের। তাদের সাধ্যিই বা কি আছে। তাদের আশ্বস্ত করলেন নায়েব। তোমরা উদ্বিগ্ন হয়ো না। দেওয়ান সাহেবকে নিয়ে তোমাদের ভাবতে হবে না। তিনি বের হয়েছেন নৌ-বিহারে। বিশাল মেঘনা বেয়ে পানসি যাবে আরো উত্তরে। তিতাস-মেঘনার এ মোহনায় এসে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো বলে তোমাদের এ খাঁড়িতে আজ রাত্রী যাপনের সিদ্ধান্ত হলো। তারপরও গ্রামের পঞ্চায়েতের ক‘জন মুরুব্বি মিলে সকলের পক্ষ থেকে দেওয়ান সাহেবের সম্মানে একটি ডিঙি নৌকা করে একটি খাসি ও নদী থেকে ধরে আনা বড় একহাড়ি জিওল-কালি বাউস, বোয়াল, লিটা, আইর ও শোল মাছ নিয়ে গিয়ে দেখা করল। কুশল বিনিময় করল। তাদের গ্রামের পাশের খাঁড়িতে পানসির নোঙর গাড়াতে কৃতার্থতার কথা জানাল। দু‘একজন পঞ্চায়েত সাহস করে তাদের খাজনা-টেকস নিয়েও আলাপ আলোচনা করলো। যুক্তি উপস্থাপন করল যে, চরের অনেক ফসলি জমি যেহেতু বর্তমানে শিকস্তি হয়ে গেছে সেহেতু সেগুলির পয়স্তি খাজনা যেন মাফ করার ব্যবস্থা করেন। কেবলমাত্র শিকস্তি খাজনা নিলে গ্রামের গরীব কৃষকরা জানে বাঁচতে পারে ইত্যাদি। পানসিতে গ্রামবাসির পক্ষ থেকে দেয়া উপহারের খাসিটি ও জিওল মাছগুলি রান্না করা হল। রাতে গ্রামের লোকজন দেওয়ানের সম্মানে পানসিতে গিয়ে বসাল লোক গানের আসর। স্থানীয় গায়ক পরাণ ফকির, রমেশ দাস, হারাদন পাল ছাড়াও আরো দু‘তিনজন লোকগায়ক তাদের আঞ্চলিক গান ও ভাটি বাংলার লোকগান পরিবেশন করল। সাথে খোল-করতালে বাজনা ও মলির বাঁশিতে সুর তুলেছে আরও দু‘তিন জন। পরাণ ফকির গেয়ে শোনাল দীন শরৎ চন্দ্র দাশের সেই বিখ্যাত লোক সঙ্গীত ‘গুরু উপায় বলনা, জনম দুখী কপাল পোড়া গুরু আমি একজনা। গিয়েছিলাম ভবের বাজারে, ছয়অ চোরা চুরি করে গুরু বানল আমারে। গুরুঅ গুরু।’ রমেশ দাস শোনাল ভাটি বাংলা সুনামগঞ্জ-নেত্রকোনার হাওড়াঞ্চলের মানুষের মুখে গাওয়া কয়েকটি হৃদয়ছোঁয়া গান। বেহেলা-লক্ষিন্দরের কিচ্ছাও শোনাল একজন। সব শেষে রাতের খাবার শেষে দেওয়ান সাহেবসহ দাঁড়ি-মাঝি, নায়েব-গোমস্তা সকলে ঘুমিয়ে পড়ল। জেগে রইল নৌ-পাহারাদার লাঠিয়াল-পিয়াদাররা।

পরের দিন সকালে বার দাঁড়ের পানসি ভেসে চলল বিশাল মেঘনার বিপুল জলরাশি ভেদ করে উত্তরাভিমুখী। বৃহৎ ময়মনসিংহের বুক চিরে সুদীর্ঘ ব্রহ্মপুত্র নদের শেষ ¯্রােত এসে যেখানটায় মেঘনায় মিলেছে, সে সঙ্গমস্থলে পানসি ভিড়ালেন দেওয়ান সাহেব। সামনে বিরাট চর। যতদূর চোখ যায় শুধু বালি আর নলখাগড়ার জঙ্গল। উলুবনে ছাওয়া বিস্তৃত চরাঞ্চল। নীলকাশের সাথে হালকা হাওয়ায় মিতালি করে আছে শাদা শাদা কাশফুল। দেওয়ান ভৈরব রায়ের জায়গাটা বড় পছন্দ হলো। দু‘দিকেই নদী। নৌ-যোগাযোগের সুব্যবস্থা সম্পন্ন এমন জায়গাতে বাজার জমবে খুব। এই চরে লোক বসতি করাতে হবে। উলুবনে ছেয়ে থাকা এ জাগার নাম উলুকান্দি। এ জায়গার মালিক ঈশা খাঁর বংশধর সৈয়দ দেওয়ান আহাম্মদ রেজা, যিনি ভাগলপুরের জামিদার। জমিদার হলেও জমিদারী কিংবা বৈষয়িক বিষয় সম্বন্ধে উদাসীন তিনি। সুফি প্রকৃতির এ মানুষটির সময় কাটে বিচিত্র বিষয়ে জ্ঞানাহরণ, লোক সংস্কৃতির বিভিন্ন বিষয় আশয় সংগ্রহ ও ধর্মতত্ত্বের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। এক প্রকার বাওলপনা জীবন-যাপন করেন সেই জমিদার। ভৈরব রায় নায়েবকে পাঠালেন ভাগলপুরে। ভৈরব রায়ের অভীলাষ শুনে দেওয়ান আহাম্মদ রাজা হাসলেন শুধু। বিরাট চরাভূমি এমনিতে জঙ্গলে ভর্তি হচ্ছে। লোক বসতি করাতে চায়, সে তো ভাল কথা, থাকুক না মানুষ। ভৈরব রায় জবাব শুনে খুব খুশি হলেন।
লোক বসতি শুরু হলো উলুকান্দিতে। ত্রিপুরার নূর নগর পরগনা ও ঢাকা জেলার চরাঞ্চল থেকে ধীরে ধীরে মানুষ আসতে শুরু করল। দেওয়ান ভৈরব রায়ের নায়েব-গোমস্তরা নতুন চরে বসতি স্থাপনকারি মানুষদের মধ্যে চরের জমি চৌহদ্দি করে করে ভাগ-ভাটোয়ারা করে দিলেন। দেখতে দেখতে বাজারসহ মানুষের বসতিতে ক‘বছরেই উলুকান্দির জঙ্গলাকীর্ণ চরাঞ্চলে জনাকীর্ণ জনপদ গড়ে উঠলো। দেওয়ান আহাম্মদ রাজা সুফি সাধক-বাউল আল্লাহওয়ালা মানুষ। বিটঘরের দেওয়ানের সাথে তার কোন দলিল পাট্টাই লেখা হলনা। ভৈরব চন্দ্র তার খুশিমতো উলুকান্দিতে লোকবসতি করালেন। মেঘনা-ব্রহ্মপুত্রের সংযোগস্থলে প্রতিষ্ঠিত হলো বাজার। বাজারটির নাম দিলেন তাঁর মায়ের নামানুসারে কমলগঞ্জ। কিন্তু প্রকাশ্যে রইল ভৈরব বাজারই। আর আশেপাশের গ্রামগুলির নামকরণ করলেন তাঁর ভাই ও বোনের নামে। কোনটার নাম কালিপুর, জগন্নাথপুর, শম্ভুপুর, চন্ডীবেড়, লক্ষীপুর ইত্যাদি।
এমনি করে বেশ কয়েক বছর কেটে গেল। ইতোমধ্যে ভাগলপুর জমিদারী নিলামে উঠে। দেশে চলছে সূর্যাস্ত আইন। যথাসময়ে খাজনা দাখিল না করায় জমিদারী নিলামে ওঠে গেল। দেওয়ান আহাম্মদ রেজার ম্যানেজার ভবানী কিশোর আচার্য চক্রান্ত করে জমিদারী কিনে নিলো। বিশ্বাসঘাত ম্যানাজার হলো জমিদার। তিনি ময়মসিংহের মুক্তাগাছার জমিদার হিসেবে পরিচিতি পেলেন। তিনি জমিদার হওয়ার পর ভৈরব বাজার দখলে নেয়ার কথা ভাবেন। দলিল কাগজ-পত্র মোতাবেক ভৈরব বাজারের মালিক তো ভবানী কিশোর আচার্যই। ভৈরব রায়ের তো আইনত কোন স্বত্ব নেই। তবে তার স্বত্ব হলো দখলের। উলুকান্দি চরের জমি সাফ করে তিনি মানুষের আবাসভূমি করেছেন। বাজার স্থাপন করেছেন। এত সহজে ছেড়ে দেবেন কেন ভৈরব রায় তার দখলী স্বত্ব। নূর নগরের তালুকদারগণ চিরকালই শাস্ত্রবিদ্যার চেয়ে অস্ত্রবিদ্যাকেই বেশি মূল্য দিয়ে এসেছেন। এত সহজে ছেড়ে দেবার পাত্র নয় ভৈরব রায়।
খবর এলো মুক্তাগাছার জমিদার নৌকাযোগে সশস্ত্র লাঠিয়াল বাহিনী নিয়ে মেঘনা নদীতে উপস্থিত হয়েছে।
দাঙ্গার সাজে তখন ভৈরব রায়ও সাজায় তার বিশাল পানসিসহ আরো দু‘টি ছিপ নৌকা। দাঙ্গার সাজে সু-সজ্জিত শত শত লাঠিয়াল, শহস্ত্রাধিক লাঠি, তীর, বল্লম, রামদা ইত্যাদি নিয়ে রণ সাজে সাজল পানসি ও ছিপ দু‘টি। নিশাগাজী জংবাহাদুর হলেন সমগ্র নূর নগর পরগনার নামকরা পালোয়ান। তার দুঃসাহসিকতা ও হিং¯্রতার কথা রূপকথার মতো প্রচলিত হয়েছিলো এ অঞ্চলের মানুষের কাছে কিংবদন্তির মতো। ভৈরব চন্দ্র তার বিশাল লাঠিয়াল বাহিনীর সেনাপতির দায়িত্ব ন্যস্ত করলেন বিখ্যাত কিংবদন্তি লাঠিয়াল নিশাগাজীর হাতে। নিশাগাজী জংবাহাদুরের নেতৃত্বে ভৈরব রায়ের বিশাল লাঠিয়াল বাহিনী দুর্দান্ড প্রত্যাপে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভবানী কিশোর আচার্যের লাঠিয়াল বাহিনীর নৌকার উপর। শুরু হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। তীর, বল্লম আর রামদার আক্রমণের সামনে মুক্তাগাছার লাঠিয়ালরা নাস্তানুবাদ হলো বিপর্যস্থভাবে। খুব কম লাঠিয়ালই জানে রক্ষা পেল। একটা লোকও উঠতে পারল না বাজারে। নররক্তে লাল হয়ে গেল মেঘনার কালো জল। সে রক্ত গিয়ে জমল দক্ষিণের এক চরে। পরে সেই চরের নাম হয়ে গেল লালপুর। জংবাহাদুর নিশাগাজীর নেতৃত্বে ভৈরব চন্দ্র রায়ের লাঠিয়াল বাহিনী নৌকা বোঝাই করে মুক্তাগাছা বাহিনীর মৃত লাঠিয়ালদের ছিন্নমুন্ড বিটঘরে নিয়ে গিয়ে দেখাল ভৈরব চন্দ্র রায়কে।
এদিকে মারামারি কাটাকাটিতে সবাই যখন ব্যস্ত তখন নলিনী কান্ত নামের একজন দাঙ্গাকারি ষাট ছিপের একটি নৌকা নিয়ে কোন ফাঁকে একটি খালের জঙ্গলের ভেতর লুকালো তা কেউ দেখেনি। নলিনী কান্ত ছিল ভারী ধুরন্দর প্রকৃতির লোক। সেই খালে জঙ্গলের ভেতর মুক্তাগাছার কয়েকজন লাঠিয়াল আত্মগোপন করেছিল। তাদের একজনের নাম নিদুগাজী। নিদুগাজী নলিনী কান্তকে চিনতে পারল। তাই নিজস্ব লোক দেখে নিদুগাজী সাঁতার কেটে এসে সেই নৌকার গলুই ধরে উপরে উঠতে চায়ল। ঠিক তখনই নলিনী কান্ত তার হাতে থাকা বল্লমের গুতো দিয়ে নিদুগাজীকে হত্যা করল। হত্যা করে তার লাশ টেনে ছিপ নৌকায় তুলে ফেলল। তারপর লাশসহ নলিনী কান্ত ষাট ছিপের নৌকা দ্রুত চালিয়ে সোজা গিয়ে হাজির হল ময়মনসিংহ জেলা সদরে। কোর্টে মামলা দায়ের করা হল ভৈরব চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে। সেই মামলা চলল বছরের পর বছর। জজকোর্ট, হাইকোর্ট করে শেষে সুপ্রীম কোর্টে গেল। উচ্চ আদালতের রায়ে জমিদার ভবানী কিশোর আচার্য জয়লাভ করে। এবং বাজার চলে গেল তার অধীনে।
কিন্তু সেদিনের সেই উলুকান্দি চর ‘ভৈরব বাজার’ নামে ইতিহাসে স্থান পায় ভৈরব চন্দ্র রায়ের নামেই।