“তোমরা প্রজাপীড়ন থেকে বিরত থাক, কেয়ামত দিবসে জুলুম ও প্রজাপীড়ন কৃষ্ণবর্ণ হয়ে আসবে৷ বরং ইনসাফের আলোকচ্ছটায় পৃথিবী ভরে দাও৷ মাপজোপ ঠিকঠাক মতো করো৷ ইসলামের পথে দৃঢ়পদ ও শক্তপোক্ত থাক৷ এক্ষেত্রে পূর্ণ সচেতন হও, যেনো বিভ্রান্তি ও দুনিয়ার তুচ্ছ মোহ তোমাদের স্খলন না ঘটায়৷ আল্লাহ প্রদত্ত দীপ্র ও কান্তিমান পথে অনড় থাকাই আমাদের ঈপ্সিত লক্ষ্য৷ পৃথিবীব্যাপি যুদ্ধ-বিগ্রহ ও দখলদারিত্ব চলবে কেবল আল্লাহর সন্তোষকামনায়, দুনিয়ার তুচ্ছতর ভোগসামগ্রী ও ক্ষণিকের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য হাসিলের জন্য নয়৷ ইসলামের জ্ঞানে-গুণে পারদর্শী এবং আল্লাহওয়ালা বুজুর্গদের কাছে তোমাদের অজানা বিষয়ে জানতে চাও৷ সর্ববিষয়ে তাঁদের সাথে পরামর্শ করো৷ যথোচিত সম্মান ও ইজ্জত করবে তাঁদের৷ সর্বোপরি আল্লাহর ধ্যানজ্ঞান ও আদেশ-ফরমান বিষয়ে বেখবর হয়োনা কখনো”৷

উল্লিখিত নসিহতমালা উসমানি সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম সুলতান উসমান বিন আরতুগ্রুল কর্তৃক তাঁর সৈনিকদের উদ্দেশে ছিলো৷ তিনি স্বীয় মন্ত্রীবর্গ ও গভর্নরদের এমনই হৃদয়গলানো নসিহত করেছেন যা স্বর্ণাক্ষরে লিপিত হওয়ার যোগ্য৷ সুযোগ পেলেই তিনি উপদেশ আর বাণীমালার ঝাঁপি খুলে বসতেন৷ একদিকে তিনি যেমন ছিলেন শৌর্যশালী বীর মুজাহিদ ও রাষ্ট্রনায়ক৷ অপরদিকে ছিলেন আধ্যাত্মিক মানস প্রজাহিতৈষী আল্লাহওয়ালা সাধক৷ সৈনিকদের তিনি ঈমানের অজেয় শক্তি ও বীরদর্পি সাহস নিয়ে যুদ্ধের মাঠে লড়বার জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন৷ তিনি কুরআন-হাদিসে বর্ণিত জীবনবিধান মেনে চলতেন৷ হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীরাত ও সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমের জীবনবৃত্তান্তকে আদর্শ জেনে রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন৷ ইসলামি জ্ঞানের প্রতি তাঁর ছিলো প্রবল আগ্রহ৷ শরিয়তপ্রাজ্ঞ আলেম-পণ্ডিতদের সাথে ছিলো তাঁর নিবিড় যোগাযোগ৷ তাঁদের তিনি পরম ভালোবাসায় বরণ করে নিতেন৷ তিনি আলেমদের অনুমতি দিয়েছিলেন যে, যদি কোনো ক্ষেত্রে আমার ভুল-ভ্রান্তি প্রকাশ পায় তাহলে আমার ভুল ধরিয়ে দিতে কুণ্ঠিত হবেন না ৷ তিনি আল্লাহকে ভয় করতেন এমনই, যেনো তাঁর চোখের সামনেই মনোরম বেহেশত ও বিপদগর্ভ দোজখ প্রতিস্থাপিত৷

তাঁর এই হৃদয়জাগানিয়া উপদেশ সৈনিকদের মনের জমিনে এমনই রেখাপাত করেছে যে, তারা দুনিয়ার অসাড় বাস্তবতা ভুলে হরদম শাহাদাতের স্বপ্নীল তামান্না বুকে লালন করতো৷ আল্লাহর পথে শহিদ হওয়ার তীব্র বাসনা তাদের আত্মসত্তাকেও বেমালুম ভুলিয়ে দিতো৷ এক সৈনিক তো ঈমানের তপ্তজোশ আর শাহাদাতের দুর্বিনীত তামান্নায় তার অনতিদূরে জান্নাতের অবারিত সৌন্দর্যবিভা দেখতে পেয়ে উচ্চকণ্ঠে বলতে লাগলো— আহ! জান্নাতের সুঘ্রাণ! জান্নাতের সুভাস!! অচিরেই আমি মহান অধিপতির সান্নিধ্য পেতে যাচ্ছি৷ তোমরা সাক্ষ্যি থাক এবং আমি আল্লাহকেও সাক্ষ্যি রাখছি, আমি ঘর থেকে বেরিয়েছি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও শাহাদাত লাভ এবং জান্নাতের সুমহান মর্যাদায় ভূষিত হওয়ার জন্য৷

পৃথিবীর অবাধ্য ভূ-খন্ডগুলোতে এক আল্লাহর মনোনীত দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতে সুলতান প্রথম উসমানের জানবাজ সৈনিকেরা সর্বস্ব বিলিয়ে দিতেও উৎকণ্ঠিত হতো না৷ আল্লাহর পথের মওতকে তারা পরম ভালোবাসায় বরণ করে নিয়েছিলো৷ দুনিয়ার যৎসামান্য উপকরণ ও স্ত্রী-সন্তানের মমতাজড়ানো ভালোবাসাকে কুরবানি দিয়ে আল্লাহর পথের লড়াইকেই নিজেদের আপন করে নিয়েছিলো৷ কারণ তারা দেখছিলো বর্ণিল জান্নাত ও তার ভরপুর উপঢৌকন এবং সেখানকার মনোহর উদ্যান উপবন ও সুশোভিত বিলাসকুঞ্জ ৷ আরো দেখছিলো জান্নাতের মনজুড়ানো নানা রকম সুপেয়-সুমিষ্ট জলাধার, নদ-নদী আর দৃষ্টি নন্দন প্রস্রবণগুলো৷ রয়েছে সেখানে মহান অধিপতি রাব্বে কারীমের কাঙ্খিত দর্শন ও রাসুলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চিরসুখময় সঙ্গ লাভ৷

দীন প্রতিষ্ঠায় সুলতান প্রথম উসমান যেমন ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ উচ্চকণ্ঠ ও আধিপত্য বিস্তারকারী, অনুরূপ তাঁর সঙ্গীরাও ছিলো আত্মোৎসর্গী অকুতোভয় বীর-সেনানি৷

যুদ্ধজয়ের অভিযানে এভাবেই সৈনিকদের অন্তঃকরণে বীরত্ব ঢেলে দিয়ে বহু রাজ্য জয় করেছেন সুলতান প্রথম উসমান৷ ইসলামি খেলাফতের শুভসূচনা ও পরবর্তী উসমানীয় সালতানাতের বিস্তৃতি ও রাজ্য পরিচালনা এর ওপর ভিত্তি করেই বহুদূর এগিয়ে গেছে৷

একজন সৈন্যের বিবৃতি— আমরা কয়েকজন আল্লাহর ওপর ভরসা করে উসমান বিন আরতুগ্রুলের জানবাজ মুজাহিদ বাহিনীর সঙ্গে যাত্রা শুরু করলাম বাইজেন্টাইনদের অধিকৃত ‘বুরসা’ শহর অবরোধ করার জন্য৷ যা ছিলো দশাধিক বছরব্যাপি দীর্ঘ ও ইতিহাসের সবচে বড় অবরোধ৷ এই সুদীর্ঘ অবরোধের মুষ্ঠ্যাঘাত ‘বুরসা’কে উসমানীয় সালতানাতের প্রধান রাজধানী ও সাম্রাজ্য পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে বাধ্য করে ৷ ‘বুরসা’ দখলের পর স্থানীয়দের ওপর নৃশংস গণহত্যা কিংবা জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালানো হয়নি৷ স্বদেশ থেকে তাদের বিতাড়িত, উৎসাদন বা অন্য রাজ্যে শরণার্থী হতেও বাধ্য করা হয়নি৷ বরং ঘোষণা করা হয়েছে— এসো আমরা ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে জড়িয়ে যৌথভাবে মহান সুলতান উসমান বিন আরতুগ্রুলের শাসনাধীনে এই কলঙ্কযুক্ত পৃথিবীকে আলোকমালায় ভরিয়ে দিই৷

ইবনুল আরাবি আন্দালূসী-র বর্ণনা— সুলতান প্রথম উসমান অধিকাংশ বড় বড় শহর, ভূখন্ড ও মজবুত কেল্লাগুলো দখলে আনার পর সে গুলোকে উসমানীয় সাম্রাজ্যভুক্ত করেন৷ এরপর তিনি রাজনৈতিক কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া তৃণমূল ও অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোর ওপর শক্ত অবরোধ আরোপ করে সে গুলোকেও উসমানীয় সালতানাতের অধিভুক্ত করেন৷ পাশাপাশি তিনি ‘বুরসা’ শহরের কাছেই দুটি উঁচু কেল্লা নির্মাণ করন৷ একটি ‘কাবিলজাহ ‘ অঞ্চলের পাশ ঘেঁষে, অপরটি ‘উলুতাগ ‘পাহাড়ের পাদদেশে৷ প্রথমটির দায়িত্ব অর্পণ করেন ‘আক তৈমুরে’র হাতে, অপরটি ‘বলবন’ বা ‘বলবন বেগ’ নামক এক মন্ত্রীর নিকট৷

‘বুরসা’য় উসমানীয়দের কৃত অবরোধ ১০-১১ বছর স্থায়ী হওয়ার পর যুদ্ধাস্ত্র ও প্রয়োজনীয় রসদসামগ্রী ফুরিয়ে যাওয়ায় বেশ কষ্টের মধ্যে পড়তে হয় সৈনিকদের৷ এ দীর্ঘ অবরোধ সত্ত্বেও বুরসার বিশালায়তন ও মজবুত প্রাচীরী বেষ্টনের কারণে তার নিয়ন্ত্রণাধিকার লাভ করতে সময় লাগছিলো তাদের৷ মূলত এ শহরটিই প্রতিরোধক্ষমতা সম্পন্ন৷ ছয়টি বিশালাকৃতির প্রবেশদ্বার ও চৌদ্দটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার সম্বলিত এ প্রাচীরের দৈর্ঘ্য ছিলো ৩৪০০ (তিন হাজার চারশো) মিটার৷ যা ছিলো সমকালীন প্রাচীরগুলোর অন্যতম৷ তাছাড়া ‘উলুতাগ’ পাহাড়ের পাদদেশস্থ অঞ্চলের জন্য নির্মিত দুটি উঁচু শক্ত দেয়ালও বাধা হিসেবে দণ্ডায়মান ছিলো৷

‘বুরসা’ অবরোধ চলাকালীনই উসমান বিন আরতুগ্রুল আশেপাশের গ্রীক দূর্গাধিপতি ও রাজ্যগুলোকে শায়েস্তা করার জন্য স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং আল্লাহর মদদ ও সাহায্যে খুব দক্ষতা ও সফলতার সাথে একের পর এক দূর্গ দখল করে চলেছেন৷ কোনো শহর বা কেল্লা দখল করার সময় শুরু থেকেই মহামান্য সুলতান স্বীয় দূরদর্শিতা ও রাজনৈতিক পলিসি ব্যবহার করে চারদিক থেকে কঠোর অবরোধ অরোপ করে চাপ সৃষ্টি ও ভীতির সঞ্চার করেন৷ এতে সহজেই লোকেরা অনুগত হয়ে পড়ে এবং শহর দখলে চলে আসে৷

গ্রীক কেল্লাগুলোর অনেক নেতৃবর্গ মহামান্য সুলতানের কাছে এসে ইসলাম গ্রহণ করলে সেখানে উসমানীয়দের অবস্থান আরো পাকাপোক্ত হয়ে যায়৷ ফলে দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা অবরোধের কাঙ্খিত বিজয় অর্জনের পথে বাধা বহিরাঞ্চল থেকে আগত শহরের জন্য সব রকমের ত্রাণ-সাহায্যের পথ বন্ধ হয়ে যায়৷

ঠিক এ সময়ে উসমান বিন আরতুগ্রুল বিশেষ এক রোগে আক্রান্ত হয়ে একেবারে শয্যাশায়ী হলে বাহিনীর নেতৃত্ব দানে পূর্ণ অক্ষম ও অচল হয়ে পড়েন৷ তাই তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে প্ৰথম ওরহানের হাতে নেতৃত্বভার অর্পণ করে তিনি চিন্তামুক্ত হন৷ ছেলে প্রথম ওরহানের কাছ থেকে শহর ও কেল্লাগুলো দখল এবং পূর্ণ কর্তৃত্ব লাভ করা পর্যন্ত এ অবরোধ চালিয়ে নেয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেন৷ ছেলেকে সারগর্ভ লম্বা উপদেশ দিয়ে তিনি তার মনোবল তৈরি করে দেন৷ এ অসিয়তনামা সর্বকালের দীনের মুজাহিদীনদের জন্য অবশ্য পালনীয় এবং দীন প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্বরূপ৷ যা ছিলো এই—

“হে আমার প্রাণপ্রিয় ছেলে!

আল্লাহ নির্দেশ করেন নি, এমন কাজে ব্যতিব্যস্ত হবে না। শাসনকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে যদি কোনো সমস্যার সম্মুখীন হও, তাহলে ওলামায়ে কেরামের দ্বারস্থ হয়ে তাদের পরামর্শ গ্রহণ করবে। তোমার চারপাশে যারা থাকবে, তাদেরকে সম্মান দেখাবে। সৈন্যদের প্রতি সদয় আচরণ করবে। তোমার শক্তি-সৈন্য-সম্পদের কারণে শয়তান যেন তোমাকে ধোঁকা দিতে না পারে। তুমি তো জানই, আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর অনুগ্রহ পাওয়া। আর জিহাদের মাধ্যমে আমাদের দীনের আলো ছড়াবে চারদিকে। জিহাদের মাধ্যমেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হবে।

আমরা তাদের মতো নই, যারা ক্ষমতার লিপ্সায় বা কারো ওপর আধিপত্য বিস্তার করার জন্যে যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হয়। আমরা তো ইসলামের জন্যই বাঁচি, ইসলামের জন্যই মরি।

তুমি তো তার যোগ্য।

ইসলাম প্রচার করা। মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করা৷ মুসলমানদের ইজ্জত-সম্মান ও সহায়-সম্পদ রক্ষা করার দায়িত্ব তো তোমার ওপর আমানতস্বরূপ। আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে অবশ্যই এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করবেন। আমি তো আমার রবের সান্নিধ্যে চলে যাব। আমি তোমাকে নিয়ে গর্বিত, কারণ তুমি প্রজাদের প্রতি ইনসাফগার হবে। আল্লাহর রাস্তার নিবেদিতপ্রাণ মুজাহিদ হবে। যথাযতভাবে দীন-ইসলামকে প্রচার করবে।

সর্বদা উলামা-আওলিয়াদের সংস্পর্শে থাকবে। তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা ও দিকনির্দেশনা মেনে চলবে। তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন দিনদিন বাড়াবে বৈ কমাবে না। তাঁদের সিদ্ধান্ত মতোই চলবে। কারণ তাঁরা তোমাকে সব সময় কল্যাণের পরামর্শই দেবে।

আল্লাহ পছন্দ করেন না, এমন কাজ সম্পূর্ণরূপে বর্জন করবে। তোমার কাছে কোনো বিষয় কঠিন মনে হলে, ওলামায়ে কেরামের শরণ গ্রহণ করবে। তাঁরাই তোমাকে সঠিক সমাধান বলে দেবে।

দুনিয়াতে একটাই পথ আছে, সেটা হলো আল্লাহর পথ। আমাদের একটাই উদ্দেশ্য, তা হলো দীনের প্রচার-প্রসার। আমরা পদ-পদবি ও দুনিয়ার ভোগসামগ্রীর প্রত্যাশী নই। আমি তোমাদের সবাইকে বলে যাচ্ছি! তোমরা জিহাদকে বেগবান করার মাধ্যমে দীনের উন্নতি-অগ্রগতি অব্যাহত রাখবে। পরিপূর্ণ জিহাদের মাধ্যমে ইসলামের পতাকা সুউচ্চে স্থাপন করবে। সর্বদা ইসলামের সেবা ও কল্যাণ জারি রাখবে। কেননা, আল্লাহ আমার মতো দুর্বল ও শক্তিহীনকে বিভিন্ন দেশ জয় করার দায়িত্ব দিয়েছেন। তোমরাও একত্ববাদের কালিমা নিয়ে আল্লাহর ওয়াস্তে জিহাদ ও সংগ্রাম করার নিমিত্তে দূর-দূরান্তের জনপদে যাও। আমার বংশধরদের মধ্যে যারা সততা ও ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত হবে, তারা হাশরের ময়দানে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুপারিশ থেকে বঞ্চিত হবে।

মৃত্যুর কাছে কাবু হয় না, এমন কেউ পৃথিবীতে নেই৷ আল্লাহর হুকুমে আমার মৃত্যুও ঘনিয়ে এসেছে। আমি এই সাম্রাজ্যকে তোমার হাতে সোপর্দ করে গেলাম আর তোমাকে আমার মালিকের কাছে আমানত রেখে গেলাম।

সকল বিষয়াশয়ে ইনসাফ ও সমতা বজায় রেখো! সবার আগে দীনি ও ধর্মীয় কাজগুলোর প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখবে। শরীয়তের বিধান মেনে চললে তুমি একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারবে।

দায়িত্বজ্ঞানহীন, অবিশ্বাসী ও পাপাচারী অথবা বিলাসপ্রিয় অলস অনভিজ্ঞ ব্যক্তিকে কখনো কোনো দায়িত্ব প্রদান করবে না। কারণ যার মধ্যে আল্লাহভীতি নেই, তার মধ্যে অন্য সকল কিছুর খেয়ানত ও আত্মসাতের ব্যাপারেও কোনো ভয় নেই।

যে ব্যক্তি নিয়মিত কবীরা গুনাহ করে, সে তার রবের কাছে বিশ্বস্ত হতে পারে না৷ বান্দার কাছে কীভাবে বিশ্বস্ত হবে? আলেম, পরহেযগার, দক্ষ শ্রমিক, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈনিকরাই রাষ্ট্রের কাঠামো শক্তিশালী করে। তাঁদের সাথে সহনশীন এবং সম্মানজনক আচরণ করবে।

কোনো আল্লাহভক্ত ব্যক্তির সন্ধান পেলে, তাঁর সাথে ভাল সম্পর্ক তৈরী করবে ৷ তাঁকে প্রয়োজনীয় খোরাক ও সাধারণ হাদিয়া দেবে।

রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিভিন্ন দায়দায়িত্ব একটি নির্দিষ্ট কাঠামোয় দাঁড় করাবে। আমার থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো, আমি এখানে এসেছিলাম একজন দুর্বল ও অভিজ্ঞতাহীন নেতা হিসেবে, আর আল্লাহ আমাকে আজ এমন এক উঁচু অবস্থানে নিয়ে এসেছেন যার যোগ্য আমি আদৌ নই। আমার পদাঙ্ক অনুসরণ করবে এবং ইসলামকে সর্বাবস্থায় রক্ষার চেষ্টা করবে ৷ যে কোনো মুমিন ও তোমার অনুসারীদেরকেও রক্ষা করবে। আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের হক ও প্রাপ্য অধিকারের প্রতি পূর্ণ নযর রাখবে। তোমার উত্তরসুরীদেরও এভাবে পরামর্শ দিতে সংকোচবোধ করবেনা। সঠিক আইন ও ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠায়, নির্মমতা-নিষ্ঠুরতা দূরীকরণে ও প্রতিটি কর্তব্য পালনে আল্লাহর সাহায্যের উপর নির্ভর করবে। শত্রুর আক্রমণ ও তাদের নির্দয় আচরণ থেকে তোমার প্রজাদেরকে রক্ষা করবে। কারো সাথেই অসৎ ও কুরুচিপূর্ণ আচরণ করবেনা। তোমার জনগণকে সন্তুষ্ট রাখবে এবং তাদের জানমালের নিরাপত্তা দেবে।”

পিতার উপদেশ গ্রহণ করে ওরহান তার সঙ্গীদেরসহ সৈন্যদলের সাথে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বেরিয়ে পড়েন এবং নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য অনড় অবস্থান গ্রহণ করেন৷

সাহেবজাদা প্রথম ওরহান দক্ষতার সাথে শহরগুলোতে অবরোধ অব্যাহত রেখে কোনো প্রকার যুদ্ধ ও লড়াই ব্যতীত সমুদ্রবেষ্টন বিচ্ছিন্ন করে ‘মোদানে’ দখল করেন৷ এরপর একে একে ‘ইজমিরে’র দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চল ‘প্রুনতাকুস’ (পরে এর নামকরণ করেন ‘কারাহ মুরসিল’ এর বিজেতার নামে কারাহ মুরসিল বেগ থেকে), ‘বুরসা’র দক্ষিণাঞ্চলের ‘আনাতোলিয়া’ পর্বতের পাশ ঘেঁষে অবস্থিত শহর ‘আদ্রানুস’ বা ‘আদেরনুস’, (এর নাম করণ করেন ‘ওরহান আলাই’ নামে) দখল করেন ৷

উসমানীয়রা ‘বুরসা’য় আরো কঠোর চাপ সৃষ্টি করে তাদের বিপদে ফেলে দেন৷ এতে করে তদাঞ্চলের নেতৃস্থানীয়দের মনে হতাশার পারদ আরো ঘণীভূত হতে থাকে৷ শেষ মুহূর্তে বাইজেন্টাইন সম্রাট বুঝতে পারলেন, মুসলমানদের হাতে আমাদের পরাজয় এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র৷ তাই তিনি কঠিন এক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন৷ শহর থেকে তার সৈন্য-সামন্তদের বেরিয়ে যাওয়ার আদেশ করে নিজেও কেটে পড়েন৷

২ জুমাদাল উলা ৭২৬ হিজরি মোতাবেক ৬ এপ্রিল ১৩২৬ খ্রিস্টাব্দে সাহেবজাদা প্রথম ওরহান ‘বুরসা’য় প্রবেশ করে সেখানে উসমানীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে ‘বুরসা’কে উসমানীয় সাম্রাজ্যভুক্ত বলে ঘোষণা করেন৷ স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতি কোনোরূপ অন্যায় আচরণ করা হয়নি৷ তবে মহামান্য সুলতান উসমান বিন আরতুগ্রুল কর্তৃক নির্ধারিত টেক্স বা কর বাধ্যতামূলক করা হয়৷

নগরপিতা ‘আকরিনুস’ প্রথম ওরহানের হাতে আত্মসমর্পণ করেন এবং প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করে উসমান বিন আরতুগ্রুলের আনুগত্য স্বীকার করতঃ বাইআত গ্রহণ করেন৷ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অব্যাহত রাখা অবরোধের মধ্যেও আকরিনুসের ধৈর্য ও বীরত্ব সবার নযর কেড়েছে৷ ফলে সম্মানের রাজটীকা হিসেবে তাকে ‘বেগ’ উপাধি দেয়া হয় এবং পরবর্তিতে উসমানীয় গভর্নরদের মধ্যে তার নামও লিপিবদ্ধ করা হয়৷ এ ঘটনায় প্রভাবিত হয়ে রোম সাম্রাজ্যের কতেক নেতাও প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং উসমানীয় সালতানাতের পতাকাতলে মিলিত হোন৷

এরপর ওরহান ‘সোগুত’এ বাবা উসমানের কাছে এসে ‘বুরসা’ দখল ও বাইজেন্টাইনের কিছু অংশ জয় করার বিস্তারিত বর্ণনা দেন ৷

সাহেবজাদা ওরহানের হাত ধরে তার বাবা উসমান ও দাদা আরতুগ্রুলের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়৷ ‘বুরসা’ ও আশেপাশের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো জয় হয় এবং সর্বত্ৰ উসমানীয় পতাকা ওড়তে থাকে৷ দীর্ঘ প্রতিক্ষিত স্বপ্নভূমি ‘বুরসা’য় উসমানীয় সালতানাতের রাজধানী স্থানান্তর করা হয়৷ যা ছয় শতাধিক বছরের অটোমান সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় রাজধানী হয়ে ঐতিহ্য বহন করে আছে এখনো৷