আজ সূর্য ওঠে নি বলে কাল কি উঠবে না? মেঘে মেঘে ছেয়ে যাওয়া আকাশটাকে আকাশ মনে হচ্ছে না দেখে কি সেটা আকাশ না? বারান্দায় বিরিঝিরি বাতাস বইছে না বলে কি বলবে বাতাস বলে কোনো পদার্থ পৃথিবীতে নেই? পাখির গুঞ্জন হৃদয়ের শ্রুতি শুনতে পাচ্ছে না বলে কি পাখিদের অস্তিত্ব অস্বীকার করে ভুলে যাবে তোমার কোনো পাখিকাল ছিলো না? এইসব ভেবে ভেবে নির্বোধের মতো নিজেকে উন্মত্ত করার মানেই হলো নিরর্থকতা বা অ্যাবসার্ড।

এই মূহুর্তে আমরা কোনো এক নির্মম নিরর্থকতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। এখানে কি করতে পারি? আলবেয়্যার কামুর মতে, এতে একটি সত্যিকার দার্শনিক সমস্যা রয়েছে। আর তা হচ্ছে আত্মহত্যা। জীবনের এই নির্মম নিরর্থকতায় মানুষ একটি কাজই খুব সহজে করতে পারে, তা হচ্ছে আত্মহত্যা।

আমরা কি সত্যিই আত্মহত্যা করবো? কখনো না। আত্মহত্যা কোনো মসৃণ পথ নয়। আমরা সেটা করবোও না। আমরা বেঁচে থাকবো। আমার বাঁচার চেষ্টা করবো। আমরা মৃতপ্রায় প্রানগুলোকে বাঁচাবার চেষ্টা করবো। কারণ কামু এও মনে করেন, এই নিরর্থকতাকে মানুষ এড়াতে পাড়ে না যতদিন সে বেঁচে থাকে। অতএব স্বাভাবিকভাবেই মানুষ কামুর পরের ধারণাকে বিশ্বাস করে বাঁচতে চাইবে।

আর যখনই মানুষ নিরর্থকতা বা অ্যাবসার্ডকে এড়িয়ে চলতে চাইবে তখনই তার পথ হবে পিচ্ছিল। তখনই যে কোনো সহজ বস্তুও হয়ে উঠবে দুর্লভ। দুর্লভ হয়ে হয়ে উঠবে দুস্কর। কাছেকে মনে হবে অনেক দূরের। দূরকে মনে হবে অনেক সুদূরের।

আমরা দূরে সড়ে যাচ্ছি। এখানে দূরে যাওয়ার মানে দূরত্ব নয়। আমাদের আশপাশের জানাশোনা কেমন অচেনা হয়ে উঠছে। এই অচেনার মানে অন্ধকার নয়। এই অ্যাবসার্ডে ভীত হওয়া যাবে না। তাকে দেখে পিছিয়ে যাওয়াও যাবে না। কামুর প্রথম ধারণা বেছে নিয়ে আত্মহত্যা করাও যাবে না।

যারা আত্মহত্যার পথে হাঁটবে, অনেক অ্যাবসার্ড হবে, তারা মানুষ না। তাহলে তারা অন্য কিছু। তাহলে তারাই মরার আগে মরে যাওয়া কাপুরুষ। জেতার আগে হেরে যাওয়া যোদ্ধা। তারাই পৌঁছাতে পারে না সহস্র সৌরবর্ষ পেরিয়ে নতুন কোনো গ্রহের গণ্ডি অব্দি। তারাই বিজ্ঞানকে না বুঝে ব্যবহার করে। তারাই প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে যুদ্ধতা সৃষ্টি করে।

আমরা এই যুদ্ধ চাই না। প্রকৃতির বিনাশ চাই না। চাই না আমাদেরও বিনাশ হোক। আইনস্টাইনের মতে, হয়তো সব একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। ধর্মগ্রন্থগুলোর মতে, হয়তো সেই ধ্বংসসস্তূপ থেকে সৃষ্টি হবে কোনো এক নতুন পৃথিবীর। অথবা কোনো এক নতুন গ্রহ বা গ্রহাণুর। সেখানে কি মানুষ থাকবে? নাকি সেখানে এলিয়েনের মতো ভিনগ্রহবাসীরা? নাকি নতুন কোনো প্রান প্রতিষ্ঠিত হবে সেখানে? এইসব দ্বিধা-দ্বন্ধ আপাতত বন্ধ থাক। ভুলে থাকা যাক এই নির্মম নিরর্থকতা বা অ্যাবসার্ডকে।

বিজ্ঞান আমাদের বেগ দিয়েছে। এও যেমনভাবে বিশ্বাস করি। বিজ্ঞান আমাদের আবেগ কেড়ে নিয়েছে এও তেমনভাবে অবিশ্বাস করি। কারণ বিজ্ঞান কখনো আবেগ কাড়তে পারে না। কেবল সে আবেগের অভিব্যক্তিতে আনতে পারে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের নাম নিরাবেগ নয়। অমানুষিকতা নয়।

আলফ্রেড নোবেল একজন পরমাণু বিজ্ঞানী ছিলেন। তিনি ডিনামাইট আবিস্কার করেন। তার ডিনামাইট আবিস্কারের পর ব্যাপকভাবে তৈরি হতে থাকে পারমাণবিক বোমা। সেই বোমা থেকে উদগত ধ্বংসস্তূপের ভেতর তিনি দেখেছিলেন মানবতার মৃত্যুকে। শুনেছিলেন মৃতদের আর্তনাদ। জীবীতদের পুঙ্গত্বতার নিষ্ঠুর নিয়তি। আলফ্রেড নোবেলের এই যে, উপলব্ধি, এই যে অনুশোচনা, এগুলো কি আবেগ নয়? এতে প্রমাণিত হয় যে বিজ্ঞান কখনো আবেগ কেড়ে নিতে পারে না। বিজ্ঞানের সেই শক্তি নেই। সামর্থ্য নেই। কারণ আবেগ কোনো রাসায়নিক পদার্থ নয়।

তাহলে আবেগ কী? তাহলে আবেগ হলো অদৃশ্য আন্দোলন সমূহ। আমার কাছে আবেগ মানে আমার ভেতর আমাকে উপলব্ধি করা। আমার ভেতর থেকে অন্যকে উপলব্দি করা। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হওয়া। বিভীষিকা দেখে কান্না ও করুণায় ফেটে পড়া। আমরা আবেগ হারিয়ে ফেলি নি। আদিমকাল থেকে আমরা আবেগ আঁকড়েই বেঁচে আছি। আবেগ হলো আমাদের বেঁচে থাকার পরম কৌশল।

আমরা হারিয়ে ফেলেছি আমাদের বিবেক বোধের নিউরোন। আমরা ভুলে যাতে চাই বিজ্ঞানের অপসংজ্ঞা। ভুলে যেতে চাই অপসংস্কার। ভুলে যেতে চাই কুসংস্কারও। আমরা মরার আগে মরতে চাই না। হারার আগে হারতে চাই না। আমরা জিততে চাই। আমরা মানুষ হয়ে মরতে চাই। আমরা বিজ্ঞানকে বিশ্বাস করতে চাই। বিজ্ঞানের সঠিক ব্যবহার করতে চাই। আমরা প্রকৃতির বন্ধু হতে চাই। প্রকৃতপক্ষে আমরা মানুষ হতে চাই।

সময় কখনো ঘাতক করাত নয়। আমাদেরকে সময়জ্ঞান করে চলতে হবে। অনুকুল সময়ে যেমন আমরা বেঁচে থাকার প্রণোদনায় মেতে থাকি, প্রতিকুল সময়ের সঙ্গেও তেমন যুদ্ধ করে বেঁচে থাকবার প্রণোদনা সঞ্চয় করতে হবে। আমরা এ জীবনের জয় চাই। জীবন কখনো হারতে জানে না। হেরে যায় জীবনের সাথে জড়িয়ে যেতে আসা ভয়, দুঃস্বপ্ন আর হতাশার জীবাণু।

আমরা সেসব জীবাণুর ভয়ে ভীত নই। দুঃস্বপ্ন নয়, আমরা স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি। স্বপ্ন দেখাতে ভালোবাসি। আমরা কামুর মতো নিরাশ নই, আবার আশাবাদীও। কোনো একদিন মানুষ জিতবেই। জীবন জয়ী হবেই। সেই আলোয় আমরা হেঁটে চলি। দুর্গম পথ পাড়ি দিই। জয়ের গন্তব্য খুঁজে নিই। এরই নাম বেঁচে থাকা। এরই নাম জীবনের জার্নি।

মেঘ তো সাময়িক কিন্তু সূর্য চিরস্থায়ী। সময় অভিশপ্ত নয়। আমরা তাকে অভিশাপ দেবো না। আমরা অভিশাপ দেবো আমাদের অকর্মণ্যতাকে। আমাদের আত্মঘাতী লোভের বেড়ালগুলোক, হিংস্র হাঙ্গরগুলোকে। আমরা লজ্জা দেবো আমাদের বোকামিকে।

আজ নয় কাল, কাল নয় পরশু, পরশু নয়- কোনো একদিন আকাশ মেঘ মুক্ত হবে। সূর্যের সৌন্দর্য ছড়িয়ে পড়বে চারদিক। সময় অভিশাপ মুক্ত হবে। মানুষের ভেতর মানুষ ফিরে আসবে। পৃথিবী লাভ করবে মহা আরোগ্য। সেদিন ভেঙে যাবে অবরুদ্ধতার তালা। পথে পথে নামবে মানুষের ফুল। বিরিঝিরি বাতাস বইবে বারানন্দায় জুড়ে। পাখিদের গুঞ্জনে ভেসে যাবে প্রত্যুষের প্রান্তর। সেইদিন হবে উৎসব। উৎসব চুমু খাবে পৃথিবীর শুষ্ক গালে। হৃদয় জেগে উঠবে প্রেমে-কামে-কাক্সক্ষায়।