বাংলায় সাড়ে পাঁচ’শ বছর মুসলিম শাসনামলকে (১২০৪-১৭৫৭) নানাদিক থেকে ‘স্বর্ণযুগ’ বলে আখ্যায়িত করা চলে। এ দীর্ঘ সময়কালে বাংলার রাজনৈতিক অবস্থা ছিল অপেক্ষাকৃত শান্ত ও স্বাভাবিক। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক সমৃদ্ধি ঘটে, সামাজিক দিক থেকে শান্তিপূর্ণ, সহনশীল ও স্বাচ্ছন্দপূর্ণ অবস্থা বিরাজমান ছিল। সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এসময় বাংলার খ্যাতি বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ধর্মীয়ভাবে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সৌহার্দপূর্ণ অবস্থা বিদ্যমান ছিল। শাসকগোষ্ঠী উদারভাবে বাংলা ভাষা-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করতেন। মুসলিম শাসকগোষ্ঠী এবং সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিগণ স্বেচ্ছায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন ও বিনা খরচে সেখানে ছাত্রদের থাকা-খাওয়া ও পড়াশোনার ব্যবস্থা করেন। এ কারণে বিদ্যাশিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটে।
কিন্তু ১৯৫৭ ঈসায়ীতে পলাশী যুদ্ধে বাংলার ভাগ্য-বিপর্যয়ের ফলে রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক, শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ভাষার ক্ষেত্রে চরম বিপর্যয় ঘটে। ইংরাজ শাসক ও তাদের দোসর হিন্দু জমিদার-জোতদার-গোমস্তা-কর্মচারী ও পাইক-বরকন্দাজদের শোষণ-জুলুম- অত্যাচারে বাংলার রাজনৈতিক-সামাজিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে, শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিপর্যয় নেমে আসে এবং বাংলা ভাষার চর্চা ব্যাহত হয়। এতদিন পর্যন্ত শাসক ও অভিজাত শ্রেণীর লোকদের আশ্রয়ে ও পৃষ্ঠপোষকতায় কবি-শিল্পীগণ সাহিত্য, সঙ্গীত ইত্যাদির চর্চায় নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু পলাশীর ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধে নবাব সিরাজউদৌলার পরাজয়ের পর এবং বেনিয়া ইংরাজদের ক্ষমতা দখলের পর স্বাভাবিকভাবে বাংলার রাজনৈতিক- সামাজিক-অর্থনৈতিক, শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি তথা সামগ্রিক ক্ষেত্রে সমূহ বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। কবি-সাহিত্যিক ও বিদগ্ধ সংস্কৃতিসেবীগণ অকস্মাৎ পৃষ্ঠপোষকহীন, অসহায়, ছিন্নমূল মানুষে পরিণত হন। রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন ও অনিশ্চয়তার কারণে মানুষের মনে সদা সশংকভাব বিরাজ করে। এ পরিবর্তিত অবস্থায় মানুষের মানস-রাজ্য নিতান্তই অভিব্যক্তিহীন, ফ্যাকাশে ও সংক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। জনগণ সর্বদা ইংরাজ ও তাদের এদেশীয় অনুচরদের নানারূপ অত্যাচার, অর্থনৈতিক শোষণ, সামাজিক পীড়ন ও জুলুমের আশংকায় সদা চিন্তান্বিত থাকে। এরূপ উদ্বেগাকুল পরিবেশ সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার উপযোগী নয়।
ইংরাজগণ প্রথম ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আমাদের দেশে আগমন করে। কিন্তু অর্থ-লিপ্সা ক্রমে রাজনৈতিক আধিপত্য লাভের আকাক্সক্ষায় রূপান্তরিত হয়। এদেশীয় বিশ্বাসঘাতক স্বার্থপর কিছু ব্যক্তি তাদের এ উচ্চাকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে সাহায্য করে। এভাবে বেনিয়া শ্রেণীর ইংরাজগণ যখন তাদের এদেশীয় অনুচরদের সহযোগিতায় ছলে-বলে-কৌশলে রাজনৈতিক আধিপত্য লাভে সক্ষম হলো, তখন তাদের থেকে কল্যাণ-বুদ্ধিসম্পন্ন কোন সুশাসন প্রত্যাশা করা ছিল দুরাশা মাত্র। ব্যবসায়-বুদ্ধিসম্পন্ন ইংরাজগণ নবলব্ধ রাজশক্তিকে অর্থনৈতিক শোষণের নিষ্ঠুর যন্ত্রে পরিণত করে। সামাজিক উন্নয়ন ও শিক্ষা-সাংস্কৃতিক কোন কর্মসূচীই তাদের ছিল না। এরূপ পরিবেশে জনগণের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সুকুমার বৃত্তির চর্চা ও বিকাশ সম্ভব ছিল না। অবশ্য ক্ষমতা দখলের প্রায় অর্ধশত বছর পর তারা উপলব্ধি করে যে, রাজনৈতিক আধিপত্য স্থায়ী করতে হলে এদেশের মানুষকে মানসিক দিক দিয়ে তাদের গোলামে পরিণত করতে হবে। ফলে তারা এদেশে একশ্রেণীর রাজানুগত লোক তৈরির উদ্দেশ্যে ইংরাজি ভাষা ও শিক্ষা-পদ্ধতি চালু করে তার দ্বারা ইংরাজি সভ্যতা-সংস্কৃতির ব্যাপক প্রসার ঘটাবার প্রয়াস পায়। সঙ্গে সঙ্গে তারা খৃস্টান ধর্ম প্রচারের মাধ্যমে এদেশে তাদের ঔপনিবেশিক স্বার্থকে স্থায়ী করার চেষ্টা চালায়। এদেশের মানুষকে পাশ্চাত্যের মত জ্ঞানী-গুণী, শিক্ষিত করার উদ্দেশ্যে তারা ইংরাজি ভাষা ও শিক্ষা-পদ্ধতি চালু করেনি; বরং এদেশীয় এক শ্রেণীর মানুষকে তাদের অনুগত গোলামে পরিণত করাই এর লক্ষ্য ছিল। এসব অনুগত গোলামদের মাধ্যমে এদেশে ইংরাজদের শাসন ও শোষণ-যন্ত্রকে মজবুত করা ও রাজনৈতিক গোলামীর সঙ্গে সঙ্গে চিন্তা মনন ও সংস্কৃতির দিক থেকেও এদেশীয় মানুষের মধ্যে হীনমন্যতা ও দাসত্ব সৃষ্টি করাই ছিল এর লক্ষ্য। ইংরাজদের এ লক্ষ্য সম্পর্কে তাদের নিজেদের স্বীকারোক্তিঃ
“বর্তমানে আমাদের এমন একটি শ্রেণী গড়ে তুলতে হবে, সমাজে যারা শাসক ও শাসিতের মধ্যে দোভাষীর কাজ করবে। তারা রক্ত-মাংসের গড়নে ও বর্ণে ভারতীয় হবে বটে, কিন্তু রুচি-চিন্তা ও মননের দিক দিয়ে হবে খাঁটি ইংরাজ। (Woodrow: MacaulayÕs Minutes on Education in India-1862)।
এ নব্য শিক্ষা-সভ্যতা প্রচলনের ফলে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর হিন্দুদের মধ্যে যথেষ্ট উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেলেও সাধারণ জনগণ বিশেষত বাঙালি মুসলিম সমাজ এর প্রতি আকৃষ্ট হয়নি। পলাশীর বিপর্যয় বাঙালি হিন্দুদের নিকট ছিল শুধুমাত্র প্রভু বদল। তাদের মধ্যে একশ্রেণীর অতি স্বার্থপর লোক এ পরিবর্তন আগে থেকেই প্রত্যাশা করে আসছিল। বরং এ পরিবর্তন সাধনের ষড়যন্ত্রে তারা সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল। তাই তাদের নিকট এটা একান্ত অপ্রত্যাশিত ছিল না। বরং এটাকে রাতারাতি ভাগ্য বদলের সুযোগ হিসাবে গ্রহণে তারা রীতিমত তৎপর হয়ে ওঠে। ফলে নতুন প্রবর্তিত শিক্ষা-সভ্যতা অনুসরণ-অনুকরণেও তারা দ্রুত এগিয়ে আসে। কিন্তু এ পথে অগ্রসর হতে যুক্তিসঙ্গত কারণেই বাঙালি মুসলিম সমাজের দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হয়। এ সম্পর্কে ইংরাজ লেখক ইউলিয়াম হান্টার বলেনঃ
“আমাদের প্রবর্তিত শিক্ষা-ব্যবস্থা হিন্দুদেরকে শতাব্দীর নিদ্রা থেকে জাগ্রত করে তাদের নিষ্ক্রিয় জনসাধারণকে মহৎ জাতিগত প্রেরণায় উজ্জীবিত করে তুলতে পারলেও তা মুসলমানদের ঐতিহ্যের পরিপন্থী, তাদের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যহীন এবং তাদের ধর্মের কাছে ঘৃণার্হ। … আমাদের প্রবর্তিত জনশিক্ষা ব্যবস্থা যেমন তাদের নিকট গ্রহণযোগ্য হয়নি, তেমনি তাদের নিজস্ব ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য যে আর্থিক সাহায্য এতকাল তারা পেয়ে এসেছিল, তাও আমরা বিনষ্ট করেছি, (ডবলিউ ডবলিউ হান্টার ‘দি ইন্ডিয়ান মুসলমান’, পৃ. ১৫৪,১৬০)।
বাঙালি মুসলিম সমাজের প্রতি ইংরাজদের বৈষম্যমূলক আচরণের ফলে তারা শাসক শ্রেণীর প্রতি সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠে। ফলে তারা ইংরাজদের সাথে সহযোগিতা করা থেকে বিরত থাকে। তাছাড়া, বাঙালি মুসলিমগণ তাদের ধর্ম ও প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধের কারণে ইংরাজদের ভাষা-শিক্ষা-সভ্যতা থেকে তারা আত্মরক্ষামূলক নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান গ্রহণ করে। অন্যদিকে, হিন্দুদের অবস্থা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা শাসন কার্যে ও সামাজিক সকল ক্ষেত্রে ইংরাজদেরকে শুরু থেকেই সহযোগিতা দিয়ে আসছিল এবং সেকারণে তারা ইংরাজদের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করে স্বীয় স্বার্থ উদ্ধারে সচেষ্ট হয়। ইংরাজি ভাষা-শিক্ষা-সভ্যতা দ্রুত রপ্ত করে, ইংরাজদের সঙ্গে বন্ধুত্বের বন্ধন দৃঢ় করে তাদের নিকট থেকে নানারূপ সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে নিয়ে উন্নতির সোপান বেয়ে দ্রুত অগ্রসর হতে থাকে। অন্যদিকে, মুসলমনারা সর্বক্ষেত্রে বঞ্চিত হতে হতে একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়ে।
ইউরোপীয় শিক্ষা-সভ্যতা আমদানির সাথে সাথে রাজভাষা এবং শিক্ষার মাধ্যম হিসাবেও ইংরাজি ভাষা চালু হয়। এতদিন পর্যন্ত রাজ-ভাষা ছিল ফারসি এবং সাহিত্যের ভাষা ছিল বাংলা বা আরবি-ফারসি মিশ্রিত বাংলা। জনগণের ভাষাও ছিল তাই। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকলেই এ আরবি-ফারসি মিশ্রিত বাংলা ভাষায় কথা বলতেন ও সাহিত্য চর্চা করতেন। তুলনামূলকভাবে মুসলমানদের ব্যবহৃত ভাষায় যদিও আরবি-উর্দু-ফারসি শব্দের পরিমাণ একটু বেশি ছিল। কারণ মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ আল-কুরআন আরবি ভাষায় লেখা এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনে ধর্মীয় পরিভাষা হিসাবে তারা অসংখ্য আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। তবু হিন্দুদের ব্যবহৃত ভাষায়ও আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার কম নয়। সপ্তদশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি ভারতচন্দ্রের সুবিখ্যাত ‘অন্নদা মঙ্গল’ তারই প্রকৃষ্ট প্রমাণ। ইংরাজ আমলে শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে প্রচলিত বাংলার পরিবর্তে ফোর্ট উইলিয়মীয় সংস্কৃত বাংলা তথা ‘সাধু বাংলা’ চালু হয়। পরবর্তীতে ১৮৩৭ সনে রাজভাষা হিসাবে ফারসির পরিবর্তে ইংরাজি প্রচলনের ফলে সকল বাঙালিসাধারণ এবং বিশেষভাবে বাঙালি মুসলমানের সমূহ ক্ষতি সাধিত হয়। সাহিত্য-সৃষ্টির ক্ষেত্রে চরম বন্ধ্যাত্ব দেখা দেয়। অবশ্য হিন্দু সমাজে এ বন্ধ্যাত্ব দীর্ঘস্থায়ী না হলেও মুসলিম সমাজে নানা কারণে এ বন্ধ্যাত্ব দীর্ঘ দিন পর্যন্ত বহাল থাকে। ইংরাজ আগমনের পূর্বে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সামাজিক আধিপত্য ছিল প্রধানত মুসলমানদেরই হাতে। শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও মুসলমানদের প্রাধান্য ছিল। পলাশী প্রান্তরে ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধে বাংলা-বিহার-উড়েষ্যার স্বাধীনতা-সূর্য অস্তমিত হবার পর আকস্মিকভাবে সকল ক্ষেত্রে মুসলমানদের আধিপত্য হারানোর বেদনা তাদেরকে চরমভাবে হতাশ ও বিক্ষুব্ধ করে। এ প্রসঙ্গে ডক্টর ওয়াকিল আহমদ বলেনঃ
“বস্তুতঃ ১৯৫৭ সনে পলাশী যুদ্ধে পরাজয়ে রাজক্ষমতা-চ্যুতি, ১৭৯৩ সনে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদারির সংখ্যা হ্রাস, ১৮২৮ সালে বাজেয়াপ্ত আইনে নিষ্কর ভূমির রায়তি স্বত্ব লোপ, ১৮৩৭ সনে ফারসীর রাজভাষা চ্যুতি-পর পর এই চারটি বড় আঘাতে পূর্বের শাসক শ্রেণী নিঃস্ব-রিক্ত, নিরক্ষর, নিষ্ক্রিয়, নির্জীব জাতিতে পরিণত হয়। ইংরাজদের প্রশাসনিক আইন ও শিক্ষানীতির ফলেই এই রূপটি হয়েছে।” (ড. ওয়াকিল আহমদঃ ঊনিশ শতকে বাঙালি মুসলমানদের চিন্তা-চেতনার ধারা, প্রথম খন্ড, পৃ. ৪১)।
নিজস্ব গৌরবময় ঐতিহ্য, রাজ্য-হারানোর বেদনা ও বিগত দীর্ঘস্থায়ী ক্রুসেডের (মুসলমানদের সাথে খৃস্টানদের কয়েক শতাব্দীব্যাপী ধর্মযুদ্ধ) তিক্ততার কারণে ফিরিঙ্গি শিক্ষা-সভ্যতা-সংস্কৃতি ও ভাষাকে মুসলমানগণ কিছুতেই সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। এদিক দিয়ে হিন্দুদের থেকে মুসলমানদের পার্থক্য ছিল স্পষ্ট। ইংরাজদের আগমনের ফলে হিন্দুদেরকে কিছু হারাতে হয়নি। শাসন-ক্ষমতা মুসলমানদের নিকট থেকে ইংরাজদের হাতে চলে যাওয়ায় প্রত্যক্ষভাবে তাদের কোন ক্ষতি হয়নি। বরং মুসলমানদের তুলনায় তারা সহজে ইংরাজদের আনুগত্য স্বীকার করে নেয়ায় অত্যল্পকালের মধ্যেই তারা ইংরাজদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয় এবং প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ব্যবসা-বাণিজ্য, জমিদারী-জোতদারী ও সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুসলমানদের স্থলাভিষিক্ত হয়। ফলে হিন্দুরা অতি দ্রুত একটি মুসলিম-প্রাধান্যপূর্ণ সমাজকে হিন্দু-প্রাধান্যপূর্ণ সমাজে পরিণত করে। ইংরাজি শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রেও তারা দ্রুত অগ্রসর হয়। এ অবস্থার বর্ণনা দিয়ে জনৈক ঐতিহাসিক লিখেছেনঃ
“ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলাতে বৃহত্তর জনসাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যারা অগ্রসর হলো, অর্থনৈতিক বিচারে তাদের নাম মধ্যবিত্ত শ্রেণী, রাষ্ট্রনৈতিক বিচারে তাদের নাম বৃটিশের সহযোগী, সাংস্কৃতিক বিচারে তাদের নাম পাশ্চাত্য শিক্ষিত শ্রেণী, সামাজিক বিচারে তাদের নাম হিন্দু সম্প্রদায়।” (সুরজিত দাশ গুপ্ত ঃ ভারতবর্ষ ও ইসলাম, পৃ. ১৬৯)।
শ্রী সুরজিত দাশ গুপ্ত তাঁর বক্তব্য ব্যাখ্যা করে লিখেছেনঃ “বৃটিশের সৌভাগ্য গড়ে তোলার কাজে তিন প্রকার দেশীয় মানুষ সামর্থ ও সাহায্য যুগিয়েছে : পাইক সম্প্রদায়-এরা বৃটিশদের বাহুবল যুগিয়েছে; করণ সম্প্রদায় ও তৃতীয় এক ধরনের বিত্তবান সম্প্রদায়… এরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর এ দেশীয় বাণিজ্য পরিচালনার ব্যাপারে যোগসূত্র হিসাবে কাজ করেছে। লক্ষণীয় যে, ধর্মের বিচারে বৃটিশদের সামর্থ্য ও সাহায্য যোগানদার এই তিন সম্প্রদায়ই হিন্দু ধর্মাবলম্বী।”
অন্যদিকে, মুসলমানগণ মানসিকভাবে ইংরাজ শাসন মেনে নিতে না পারায় এবং দীর্ঘকাল পর্যন্ত হারানো রাজশক্তি ফিরে পাবার আকাক্সক্ষা মনে মনে পোষণ ও এ জন্য যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত থাকায় তারা কেবল সামাজিক সুযোগ-সুবিধা ও আধিপত্য হারিয়েছে তাই নয়, শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রেও অনেক পিছনে পড়ে গেছে। উপরন্ত, মুসলিম শাসনামলে যে শিক্ষা-ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল, মূলত সেটা তাদের ধর্ম ও সামাজিক মূল্যবোধের সাথে ছিল সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। ইংরাজদের প্রচলিত শিক্ষা-ব্যবস্থা ছিল এর বিপরীত। ফলে এ শিক্ষা-ব্যবস্থাকে তারা সহজে গ্রহণ করতে পারে নি।
১৮৫৭ সনে মহাবিদ্রোহের (সিপাহী বিদ্রোহ) পূর্ব পর্যন্ত এ অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। মহাবিদ্রোহ ব্যর্থতা বরণ করায় এবং অদূর ভবিষ্যতে বড় কোন বিদ্রোহ বা অভ্যূত্থানের আয়োজন করার সম্ভাবনা তিরোহিত হওয়ায় মুসলমানদের রাজনৈতিক আধিপত্য লাভের আকাক্সক্ষা সাময়িকভাবে নস্যাৎ হয়ে যায়। এরপর থেকে গত্যন্তর না দেখে মুসলমান সমাজের কেউ কেউ ইংরাজদের প্রবর্তিত শিক্ষা-দীক্ষা অনুসরণে উদ্যোগী হন। এসময় কতিপয় মুসলিম মনীষী ও সমাজসেবী এ ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। মুসলিম সমাজের সার্বিক অধঃপতন ও দুরবস্থা অবলোকন করে তাঁরা অতিশয় ব্যথিত হন এবং শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে মুসলমানগণ যাতে দ্রুত এগিয়ে আসে, সে ব্যাপারে তাঁরা সর্বতোভাবে প্রচেষ্টা চালান। ইতঃমধ্যে পুরো এক শতাব্দীকাল অতিক্রান্ত হয় এবং ততদিনে শিক্ষা-সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভৃতি সকল ক্ষেত্রে মুসলমানদের অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়ে পড়ে। এ শোচনীয় অবস্থায় ও মহাবিদ্রোহ ব্যর্থতা বরণের পটভূমিতেই মুসলমানগণ সর্বপ্রথম ব্যাপক ও কিছুটা সচেতনভাবে ইংরাজি শিক্ষা-দীক্ষার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে।
ইংরাজি শিক্ষা-দীক্ষার প্রতি অনেক দেরিতে মুসলমানদের আগ্রহ দেখা গেলেও বাস্তব ক্ষেত্রে তাদের সামনে অনেক অন্তরায় ছিল। প্রথমত ইংরাজদের প্রবর্তিত শিক্ষা-ব্যবস্থা মুসলমানদের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক জীবনধারা বিকাশের উপযোগী ছিল না। দ্বিতীয়ত ইংরাজি শিক্ষা-সভ্যতার নামে যে ধরনের ইয়াংকীপনা ও সামাজিক অনাচার সৃষ্টি হয়, মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের সাথে তা ছিল সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ। ফলে মুসলিম সমাজ ইংরাজি শিক্ষার প্রতি তখনও মনের সম্পূর্ণ সায় খুঁজে পায়নি। এ সম্পর্কে হান্টার বলেনঃ
“আমাদের প্রবর্তিত শিক্ষা-ব্যবস্থা হিন্দুদেরকে শতাব্দীর নিদ্রা থেকে জাগ্রত করে তাদের নিষ্ক্রিয় জনসাধারণকে মহৎ জাতিগত প্রেরণায় উজ্জীবিত করে তুলতে পারলেও তা মুসলমানদের ঐতিহ্যের পরিপন্থী, তাদের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যহীন এবং তাদের কাছে ঘৃণার্হ।” (ডবলিউ ডবলিউ হান্টার : দি ইন্ডিয়ান মুসলমান, পৃ. ১৫৪)।
এ কারণেই পরবর্তীকালে মুসলমানদের জন্য মাদ্রাসা শিক্ষা-ব্যবস্থা নামে অন্য একটি শিক্ষা-ব্যবস্থা চালু করা হয়। তবে এটা সমস্যার কোন সঠিক সমাধান ছিল না। মাদ্রাসা শিক্ষা-ব্যবস্থায় সীমিত অর্থে ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও উক্ত শিক্ষা-ব্যবস্থায় উচ্চতম ডিগ্রী হাসিলের পরও যথাযথ সামাজিক স্বীকৃতি লাভ সম্ভব ছিল না; অর্থাৎ সরকারী চাকরী লাভ বা সামাজিক কোন দায়িত্ব পালন বা কোনরূপ উৎপাদনমুখী ভূমিকা পালনের যোগ্যতা সৃষ্টি হতো না বা সেসব ক্ষেত্রে তাদেরকে কোন রূপ সুযোগ দেয়া হতো না। মক্তব-মাদ্রাসায় শিক্ষকতা অথবা মসজিদের ইমামতী ব্যতীত অন্য কোন পেশায় নিয়োজিত হওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হতো না। তাই সরকারী চাকুরী লাভ ও সামাজিক স্বীকৃতি লাভের আশায় কিছুসংখ্যক মুসলমান ইংরাজি শিক্ষার দিকে আকৃষ্ট হয়। এভাবে মুসলমানগণ মূলত ত্রিধা বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদিকে, ইংরাজি শিক্ষিত আধুনিক সমাজ, অন্যদিকে আরবি-ফারসি শিক্ষিত ধর্মীয় সম্প্রদায়, আর এ দু’য়ের মাঝখানে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অশিক্ষিত সমাজ। এরূপ ত্রিধা বিভক্ত সমাজে ভারসাম্যপূর্ণ সুষ্ঠু সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ অতিশয় দুরূহ। বাঙালি মুসলমানদের জন্য এটা ছিল এক বিপর্যয়কর অবস্থা। এ প্রসঙ্গে বাঙালি মুসলমানদের পটভূমি সম্পর্কে কিঞ্চিত আলোকপাত করা যেতে পারে।
বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে অধিকাংশই নিম্নবর্ণীয় হিন্দু ও নির্যাতিত বৌদ্ধদের থেকে ধর্মান্তরিত। বিদেশাগত মুসলমানদের মধ্যে দুটো শ্রেণী। প্রথমত ধর্ম-প্রচারক। তাঁরা ঈসায়ী অষ্টম শতক থেকে বিভিন্ন সময়ে স্থল ও নৌপথে বাংলাদেশে আগমন করেন। ধর্ম প্রচার ছিল তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য। তবে ঐ সময় থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আগত কিছুসংখ্যক আরব বণিকও ব্যবসা-বাণিজ্যের অবকাশে ইসলাম প্রচারে অবতীর্ণ হন। বাংলাদেশের অসংখ্য মাজার ও প্রাচীন মসজিদসমূহ এ সকল ইসলাম-প্রচারক অলিআল্লাহদের স্মৃতি বহন করে চলেছে। দ্বিতীয় শ্রেণীর বিদেশাগত মুসলমান হলেন শাসক সম্প্রদায় ও তাঁদের সঙ্গে আগত সিপাহী-সান্ত্রী ইত্যাদি বিভিন্ন শ্রেণীর রাজকার্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ। ত্রয়োদশ শতকের গোড়ার দিকে তুর্কী বীর ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজীর নেতৃত্বে তাঁরা এদশে বিজয়াভিযান পরিচালনা করে গৌড়ের রাজা লক্ষণ সেনকে বিতাড়িত করে মুসলিম রাজত্ব কায়েম করেন। এ দু’শ্রেণীর বিদেশাগত মুসলমানদের মধ্যে উদ্দেশ্যগত পার্থক্য যেমন ছিল, তেমনি আখলাক বা আচরণগত পার্থক্যও ছিল সুস্পষ্ট।
ধর্ম-প্রচারক মুসলমানদের উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের মাহাত্মা প্রচার ও তাওহীদের মন্ত্রে সকলকে দীক্ষিত করা। প্রচারক ও তাঁদের অনুসারী শিষ্যদের চরিত্র ছিল ত্যাগ-তিতিক্ষায় পরিপূর্ণ, পূত-পবিত্র, মাধুর্যময় ও অনুসরণযোগ্য। ইসলামের সর্বজনীন মানবতাবাদ, সাম্য-ভ্রাতৃত্ব, সুবিচার-সৌন্দর্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের সুমহান আদর্শ শতধাবিভক্ত পৌত্তলিক বাঙালি সমাজে এক অভূতপূর্ব বিপ্লবের সূচনা করে। সুন্দর চরিত্রের অধিকারী মুবাল্লিগদের আদর্শ জীবনচরণও সকলকে মুগ্ধ ও আকর্ষিত করে। ফলে জাতিভেদ প্রথা ও নানা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হিন্দু সমাজ বিশেষত নিম্নবর্ণীয় হিন্দু ও নির্যাতিত বৌদ্ধগণ দলে দলে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। এভাবে মুসলিম বিজয়ের পূর্বেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করে। ১২০৪ ঈসায়ীতে বাংলায় মুসলিম রাজত্ব কায়েম হওয়ার পর ইসলাম ধর্ম অপ্রতিহত গতিতে প্রসার লাভ করে। এ ব্যাপারে রাজশক্তির যদিও কোন প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল না, তবু শাসক শ্রেণীর ধর্ম ইসলাম হওয়ার কারণে পরোক্ষভাবে ইসলামের প্রচার-প্রসারে এটা খানিকটা সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ফলে অত্যল্পকালের মধ্যেই বাংলার অর্ধেকেরও বেশি লোক ইসলামে দীক্ষিত হয়। বাংলার ইতিহাসে এত অল্প সময়ে বহিরাগত কোন ধর্ম এত অধিক সংখ্যক মানুষের নিকট গ্রহণীয় হয়েছে বলে জানা যায় না।
বাংলার জমীনে ইসলামের এ অভূতপূর্ব সাফল্যের কারণ প্রধানত দুটি। প্রথমত, ইসলামের বিশ্বজনীন মানবিক আবেদন; সাম্য, সৌভ্রাতৃত্ব ও ইনসাফপূর্ণ কল্যাণময় উদার আদর্শ। দ্বিতীয়ত, বাংলার তৎকালীন ধর্মীয় ও সামাজিক চরম বিপর্যস্ত অবস্থা। বাংলার জমীন থেকে জৈনধর্ম অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। বৌদ্ধধর্মের মধ্যে যেটুকু মানবতাবাদের অস্তিত্ব ছিল, তা নিয়ে বাংলার মাটিতে বৌদ্ধধর্ম হয়তো মোটামোটি স্থায়ী আসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হতো। কিন্তু সেন আমলে ব্রাহ্মণদের রোষাণলে পতিত হয়ে বাংলার সমতলভূমি থেকে বৌদ্ধধর্ম সমূলে উৎক্ষিপ্ত হয়। পার্বত্য প্রত্যন্ত ও দুর্ভেদ্য বনাঞ্চলে এবং প্রচ্ছন্নভাবে লোকজ ধর্ম-সম্প্রদায়ের মধ্যে যদিও তার অস্তিত্ব কিছুটা বজায় ছিল কিন্তু সমাজে তার প্রকাশ্যে সদর্প প্রকাশ ছিল প্রায় অসম্ভব। বাঙালি সমাজে তখন একমাত্র হিন্দুধর্মেরই প্রচন্ড দাপট। কিন্তু সে হিন্দুধর্ম বেদ উপনিষদের হিন্দুধর্ম নয়; হিন্দুধর্মের নামে তখন বহিরাগত আর্য-ব্রাহ্মণদের সংকীর্ণ, বিভেদাত্মক, অনুদার পৌত্তলিক আদর্শই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। বৃহত্তর হিন্দু সমাজ তখন অস্পৃশ্য, ঘৃণিত, নিগৃহীত, মানবেতর জীবন যাপন করছিল। শতধাবিভক্ত হিন্দু সমাজে উচ্চ-নীচের ব্যবধান ছিল অতিশয় প্রকট। তেত্রিশ কোটি দেব-দেবী, ছুঁতমার্গ, অবাঞ্ছিত অমানবিক সংস্কার, ধর্মীয় নেতা ও সমাজপতিদের শোষণ ও নৈতিকতাহীন স্বেচ্ছাচারে সমাজ-দেহ পঙ্কিল-বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ইসলামের আগমনকে তাই এ সমাজের নিগৃহীত, নিরীহ জাতীয় অগণিত মানুষ সোৎসাহে স্বাগত জানায়। ইসলামের প্রগতিশীল সাম্যবাদী মানবিক আদর্শ তখন বাংলার ভঙ্গুর সমাজ- ব্যবস্থায় এক অভূতপূর্ব বিপ্লব সৃষ্টি করে। মুসলিম রাজ-শক্তি তখন ইসলাম প্রচারে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা প্রদান করলে এবং শ্রীচেতন্য দেব প্রমুখ হিন্দু-সমাজপতি ও সংস্কারকণ হিন্দুধর্মের সংস্কার ও পুনরুজ্জীবনে ব্যাপকভাবে সচেষ্ট না হলে হয়তো সমগ্র বাঙালি সমাজই তখন ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে পড়তো।
ইসলামের এ অপ্রতিরোধ্য প্রসারের যুগেও সর্বাধিক অনুধাবনযোগ্য বিষয় হলো এই যে, মুসলিম রাজশক্তি কিংবা মুসলিম মুবাল্লিগগণ বা ধর্ম-প্রচারকদের মধ্যে কখনো অসহিষ্ণুতার পরিচয় পাওয়া যায়নি। শাসক শ্রেণী তখন প্রতিরোধহীন রাজকীয় আধিপত্য লাভেই সন্তুষ্ট ছিলেন। ধর্ম-প্রচারকগণ নিজেদের চেষ্টায় প্রায় স্বাধীনভাবেই ধর্ম-প্রচারে সচেষ্ট ছিলেন। অবশ্য বিরুদ্ধ শক্তির মুকাবিলায় স্থানীয়ভাবে কখনো ছোট-খাট সংঘর্ষের সৃষ্টি হলেও সামগ্রিক ইতিহাসের পটভূমিতে তা ছিল উপেক্ষণীয়। বাংলায় ব্রাহ্মণ্য রাজশক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সাথে তুলনা করলেই এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এক ব্যাপক সামাজিক সংঘর্ষ, নৃশংস হত্যাষজ্ঞ ও ধ্বংস-লীলা সাধনের মাধ্যমে বৌদ্ধ-যুগের অবসান ঘটিয়ে ব্রাহ্মণ সেন রাজাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা ও ইসলামের প্রচার-প্রসার ঘটেছে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে। ইসলামের ব্যাপক প্রসারের ফলে অকস্মাৎ বাঙালি সমাজে আদর্শ ও মূল্যবোধগত তাৎপর্যময় ব্যাপক পুনর্বিন্যাস ও পরিবর্তন সংঘটিত হলেও তা কখনো ব্যাপক সামাজিক সংঘর্ষ সৃষ্টি করেনি বা সামাজিক অগ্রগতির পথে কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি। বরং পরিবর্তিত অবস্থায় নতুন জীবনবোধে উদ্বুদ্ধ সামাজিক কাঠামোতে নতুন প্রাণময় গতি সঞ্চারিত হয়েছে। মুসলিম শাসনামলে মুসলমনাদের সাথে অমুসলিমদের সম্পর্ক ছিল সর্বদাই প্রীতিপূর্ণ ও সৌহার্দমূলক। রাজশক্তি মুসলিম হলেও সকল ধর্মের লোকদের প্রতি তাঁরা ছিলেন উদার ও সহনশীল। বাংলার সামাজিক ইতিহাসে এমন সম্প্রীতিপূর্ণ দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষহীন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের গতিশীল চিত্র আর কখনো দেখা যায় নি।দাক্ষিণাত্যের কর্ণাটক থেকে আগত ব্রাহ্মণ সেন রাজাগণ সংস্কৃত ভাষাকে রাজ-দরবারের ভাষার মর্যাদা দেন। দেশীয় ভাষা বাংলা রাজ-দরবারে ঠাঁই পাওয়া তো দূরের কথা, বাংলা ভাষাকে তারা ‘পক্ষীভাষা’, ‘স্লেচ্ছ ভাষা’ ইত্যাদি নানা তুচ্ছাত্মক অভিধায় আখ্যায়িত করে এ ভাষার চর্চাচারীগণ ‘রৌরব’ নামক নরকের অধিবাসী হবে বলে তারা ফতোয়া জারি করে। এ সত্ত্বেও সাধারণ বাঙালি মুখের ভাষা হিসাবে বাংলাই ব্যবহার করতো। কারণ এছাড়া মনের ভাব ব্যক্ত করার অন্য কোন উপায় তাদের ছিল না। তবে দেশী ভাষায় সাহিত্য চর্চা করার সাহস বা পরিবেশ তখন ছিল না। অন্যদিকে, মুসলিম শাসনামলে রাজভাষা প্রথমে তুর্কি এবং পরে ফারসি হলেও দেশীয় ভাষা বাংলাকে তারা কখনো অবজ্ঞা করেনি। বরং বাংলা ভাষা-সাহিত্যের চর্চায় তারা সর্বদাই যথোচিত পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেছে। তাই বাংলা ভাষার প্রকৃত নবজন্ম ঘটেছে যেমন এ সময়েই বাংলা সাহিত্যেরও ব্যাপক চর্চা হয়েছে এ মুসলিম আমলেই। তার আগে বাংলা ভাষা ছিল যেমন দীন-হীন মৃতপ্রায়, বাংলা সাহিত্যেরও তেমনি পাল আমলের একমাত্র চর্যাপদ ছাড়া আর কোন নিদর্শনই পাওয়া যায় না। ইসলামের সাম্যবাদী আদর্শ এবং মুসলিম শাসক-সম্প্রদায়ের ঔদার্য ও পৃষ্ঠপোষতায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হিন্দু-মুসলমান সকলেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চার যথাযোগ্য অধিকার লাভ করে। অবশ্য ধর্মীয় বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক চেতনা ও ঐতিহ্যগত স্বাতন্ত্র্যের কারণে উভয় সম্প্রদায়ের সাহিত্য স্ব স্ব বৈশিষ্ট্যে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ স্বাতন্ত্র্য সত্ত্বেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এ সময় চরম উৎকর্ষ লাভ করে।
ইংরাজ আগমনের সাথে সাথে সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। হতাশাগ্রস্ত সামাজিক পরিবর্তনের বিশৃঙ্খল পটভূমিতে শিল্প-সাহিত্যের বিকাশ সম্ভব ছিল না। ফলে পলাশী যুদ্ধের পর প্রায় এক শতাব্দীকাল পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে কোন উল্লেখযোগ্য অবদান চোখে পড়ে না। তাই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সেন আমলকে যেমন ‘তমসা যুগ’ বলা হয় এ যুগকেও তেমনি অনেকটা ‘নিষ্ফলা যুগ’ বলা যায়। তবে সেন আমলের মত এ যুগটি অতটা তমসাচ্ছন্ন ছিল না। রাজ-পৃষ্ঠপোষকতা বঞ্চিত কবিরা এ সময় গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অবস্থায় এক ধরনের সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন, যেগুলোকে বাউল গান, কবিয়ালদের গান, গ্রাম্য ছড়া, গান, হেঁয়ালী, সারি, জারি, মুর্শিদী, বয়াতী, ফকিরী, কীর্তন, ভাটিয়ালী ইত্যাদি নামে অভিহিত করা চলে। এর অধিকাংশই ছিল অতিশয় নিম্নমানের। এ জাতীয় সাহিত্যের মধ্যে এক ধরনের মানসিক দৈন্য, হতাশা, নৈরাশ্য, বৈরাগ্য ও ক্ষেত্রবিশেষে হৃদয়বৃত্তির রুচিবিগর্হিত উৎকট প্রকাশ ঘটেছে। অবশ্য ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’র মতো উন্নত মানের মানবিক গুণ ও হৃদয়বৃত্তির প্রকাশ ঘটেছে, এরূপ সাহিত্যের সৃষ্টিও হয়েছে এ বন্ধ্যা আমলে।
ঊনবিংশ শতকের শুরুতেই সামাজিক অস্থিরতা ও মানসিক বৈরাগ্য ও দৈন্য ভাব বিদূরিত হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়। কিন্তু সে লক্ষণ কেবল মাত্র বাঙালি হিন্দু সমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কলকাতায় ১৮০০ সনে ফোর্ট উই্লিয়াম কলেজ ও ১৮১৭ সনে হিন্দু কলেজ স্থাপিত হওয়ার ফলে বাঙালি মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত হিন্দুগণ বিদ্যাশিক্ষার দিকে এগিয়ে আসে। ফলে হিন্দু সমাজে নবজাগরণের সূচনা হয়। রাজা রামমোহন রায়কে (১৭৪৪-১৮৩৩) এ নবজাগরণের প্রাণ- পুরুষ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। তাঁর পরবর্তী যেসব শিক্ষিত প্রতিভাবান ব্যক্তি এ নবজাগরণের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যান, তাঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলেন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (১৮১২-১৮৫৯), প্যারীচাঁদ মিত্র ওরফে টেকচাঁদ ঠাকুর (১৮১৪-১৮৮৩), দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭-১৯০৫), ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১), মাইকেল মুধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩), ভূদেব মুখোপাধ্যায় (১৮২৫-১৮৯৪), রঙ্গলাল (জন্ম ১৮২৭-), দীনবন্ধু মিত্র (১৮৩০-১৮৭৪), বিহারী লাল চক্রবর্তী (১৮৩৫-১৮৯৪), হেমচন্দ্র (১৮৩৬-১৯০৩), বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪) প্রমুখ কবি-সাহিত্যিক, সমাজ-সংস্কারক ও বিদ্বজ্জন ব্যক্তির আবির্ভাবের ফলেও হিন্দু সমাজে জাগরণের এক অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে যায়। কিন্তু বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে তখনো এমন কোন পরিবর্তন বা জাগরণ পরিলক্ষিত হয়নি। বরং নবজাগ্রত হিন্দুদের বৈরিতা, ইংরাজদের বিরূপতা এবং রাজশক্তির অসহযোগিতার কারণে বাঙালি মুসলমান সমাজ তখনো চরম হতাশা ও দৈন্যদশার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করছিল। সামাজিক কর্মযোগ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা থেকে তাদের জীবন ছিল প্রায় বিচ্ছিন্ন। ফলে এ সময় তাদের মধ্যে বৈরাগ্য ভাব সৃষ্টি হয় রাষ্ট্রীয় তথা বাস্তব দিক থেকে নির্লিপ্ত ও নিরাসক্ত হয়ে পড়ায়, সামাজিক সকল ক্ষেত্রে শোষিত-বঞ্চিত হওয়ার ফলে এ সময় তাদের মধ্যে আধ্যাত্মিক বৈরাগ্যভাবেরও জন্ম হয়। বাঙালি মুসলিম সমাজে তখনও রাজা রামমোহন রায় কিংবা স্যার সৈয়দ আহমদের মতো কোন নেতার আগমন ঘটেনি। তারফলে “বাংলাদেশে দু’একটি পরিবার ছাড়া মোটামুটি সমগ্র উনবিংশ শতাব্দী ধরেই বাংলার মুসলমানেরা ইংরাজি শিক্ষা গ্রহণ করেনি।” (বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত ঃ মুহম্মদ আবদুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান, পৃ. ১৬)।
পলাশী যুদ্ধের ঠিক একশো বছর পর ১৮৫৭ সনে ‘মহাবিদ্রোহ’, যা ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ নামে বিশেষভাবে খ্যাত, ব্যর্থতা বরণের পর চরম বাস্তবতার নিদারুণ আঘাতে মুসলমানদের মধ্যে এ বৈরাগ্য ও নিরাসক্তভাবের অবসান ঘটতে থাকে। এরপর বাঙালি মুসলিম সমাজে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে শুরু করে, শিক্ষা, সাহিত্য ক্ষেত্রে অগ্রসর হতে থাকে। এক্ষেত্রে নবাব আবদুল লতিফ (১৮২৬-৯৩) ও সৈয়দ আমীর আলী (১৮৪৯-১৯২৮) বিশেষ অবদান স্মরণযোগ্য। নবাব আবদুল লতিফের প্রতিষ্ঠিত ‘মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি’ (১৮৬৩) এবং সৈয়দ আমীর আলী ‘ন্যাশনাল মোহামেডান এ্যাসোসিয়েশন’ (১৮৭৮) তৎকালীন স্বল্প সংখ্যক শিক্ষিত মুসলিম সমাজে বিশেষ অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে। অবশ্য ‘সোসাইটি বা এ্যাসোসিয়েশন কোনটার প্রতিই বাঙালি মুসলমানদের বৃহত্তর জনসমাজের কোনো আস্থা ছিল বলে মনে হয় না। (আধুনিক বাংলা সাহিত্য মুসলিম সাধনাঃ কাজী আবদুল মান্নান, পৃ. ৮২), এরূপ ভিন্ন মতও কেউ কেউ প্রকাশ করেছেন। তা সত্ত্বেও বাঙালি মুসলমানদের নবজাগরণের উন্মেষলগ্নে নবাব আব্দুল লতিফ ও সৈয়দ আমীর আলীর বিশেষ অবদানের কথা অধিকাংশ ঐতিহাসিকই স্বীকার করেছেন।
এভাবে দেখা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে মুসলমানদের আত্মাগ্লানি অপনোদন, আত্ম-সচেতনতাবোধ সৃষ্টি ও আত্মজাগরণের স্পৃহা সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ সুপ্তির অবসান ঘটিয়ে নবউত্থানের প্রথম লগ্নে তাদের মধ্যে এক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ স্বাতন্ত্র্য-চেতনা পরিলক্ষিত হয়। এ স্বাতন্ত্র্য জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে যেমন সাহিত্যেও তেমনি তাদের স্বকীয় ধর্মীয়বোধ, ভাব- বিষয়-উপজীব্য ও ঐতিহ্য-চেতনা ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রেও পরিলক্ষিত হয়। ভাষার ক্ষেত্রেও তাদের একটা স্বাতন্ত্র্য ছিল, কিন্তু শুরুতেই তা অতটা স্পষ্ট ছিল না। বরং মীর মশাররফ হোসেন, কায়কোবাদ(১৮৫৮-১৯৫১), মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ (১৮৬৯-১৯৬৭), ইসমাইল হোসেন সিরাজী (১৮৮০-১৯৩১) প্রমুখের রচনায় তথাকথিত সাধু বাংলার ব্যবহারই পরিলক্ষিত হয়। এছাড়া, সাহিত্যিক হিসাবে স্বীকৃতি লাভ তখন সহজসাধ্য ছিল না। কারণ সাহিত্য ক্ষেত্রে ঐসময় মোড়লী ছিল একচেটিয়াভাবে হিন্দুদের হাতে। অবশ্য ঐসময় একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্য-রতœ (১৮৬০-১৯২৩)। পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিশেষ করে কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) হাতে তা অতিশয় সুস্পষ্ট ও মহিমান্বিত রূপ লাভ করে।
উনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মসুলমানগণ যখন শিক্ষা-সাহিত্য ক্ষেত্রে এগিয়ে এল, তখনকার অবস্থাও একবার বিবেচনা করা দরকার। এ শতকের শুরুতেই ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ছত্রছায়ায় ইংরাজ পাদ্রী ও ব্রাহ্মণ সংস্কৃত পণ্ডিতদের যৌথ চেষ্টায় বাংলা ভাষার রূপ পরিবর্তনের প্রয়াস চলে। আরবি-ফারসি উর্দু ভাষার অসংখ্য শব্দরাজি যা বিগত কয়েকশো বছর ধরে বাংলা ভাষার সাথে মিলেমিশে বাংলা ভাষার শব্দ ভাণ্ডারকে সুসমৃদ্ধ করে তুলেছিল, সেগুলোকে ‘মুসলমানী জবান’ রূপে আখ্যায়িত করে অপাংতেয় করে রাখা হয়। বাংলা ভাষা থেকে আরবি-ফারসি-উর্দু শব্দ ঝেটিয়ে তাড়িয়ে তার পরিবর্তে দুর্বোধ্য ও অপ্রচলিত সংস্কৃত শব্দরাজিতে পূর্ণ করে ‘সংস্কৃতের দুহিতা’ রূপে নতুন কৃত্রিম বাংলা চালু করা হয়। এ কৃত্রিম ভাষায় পাঠ্য বই রচনা করে শিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যে রাতারাতি বাংলা চালু করা হয়। এ কৃত্রিম ভাষায় পাঠ্য বই রচনা করে শিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যে রাতারাতি এটাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করা হয়। অধিকাংশ হিন্দু লেখক যথাসাধ্য এ নতুন ‘সংস্কৃত বাংলায়’ সাহিত্য চর্চার প্রয়াস পান। ‘বাংলা গদ্যের জনক’ নামে পরিচিত রামমোহন ও আধুনিক বাংলা কবিতার জনক হিসাবে পরিচিত মধূসূদনের ন্যায় যুগ-প্রবর্তক কবি এ ভাষায় সাহিত্য চর্চা করে এ ভাষাকে সর্বজনগ্রাহ্য করে তোলেন। তাই উনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মুসলমানরা যখন শিক্ষা ও সাহিত্য চর্চায় এগিয়ে আসেন তখন তাঁরাও বহুলাংশে এ ভাষাই গ্রহণ করেন। অবশ্য একথাও ঠিক যে, কালক্রমে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র প্রমুখের হাতে ফোর্ট উইলিয়মীয় ‘সংস্কৃত বাংলা’ বহুলাংশে মার্জিত ও সহজবোধ্য হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয়ত, ইংরাজি শিক্ষা-সভ্যতার প্রভাবে উনবিংশ শতকের শুরুতেই বাঙালি হিন্দুর সমাজ ও ধর্মে পরিবর্তন, পুনর্বিন্যাস এবং সে সাথে নবজাগরণের আভাস পরিলক্ষিত হয়। ধর্মীয় চিন্তার ক্ষেত্রে শিক্ষিত অনেক হিন্দু যারা সনাতন হিন্দুধর্মকেই আঁকড়ে থাকতে চায় তারাও স্বধর্মে ব্যাপক সংস্কার সাধনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। এ ধর্মীয় সংস্কার সাধনের প্রয়াসে অনেকে হিন্দুধর্মের মাহাত্ম্য ও প্রাধান্য প্রকাশার্থে অন্য ধর্ম বিশেষত ইসলাম ধর্ম তথা মুসলমানদের হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে। বঙ্কিম ছিলেন এ ক্ষেত্রে সর্বাগ্রাগণ্য। বঙ্কিম তাঁর বিভিন্ন উপন্যাসে ইসলাম, মুসলমান ও মুসলমানদের ইতিহাস বিকৃত করে হিন্দুধর্ম ও হিন্দুদের মাহাত্মা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করার জন্য নানারূপ মিথ্যা ও বিকৃত ঘটনা ও অলীক কাহিনীর আশ্রয় নেন। উনবিংশ শতকের শেষার্ধে মুসলমানদের নবজাগরণ ও সাহিত্য চর্চার প্রয়াস প্রধানত এ সনাতনপন্থী হিন্দুদের বিদ্বেষমূলক প্রচারণা ও চরম বিদ্বিষ্ট মনোভাবেরই প্রত্যক্ষ ফল। এ কারণে মুসলমানগণ তাঁদের সাহিত্যে ইসলামের শাশ্বত আদর্শ মুসলমানদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও গৌরবময় অতীতের স্মৃতি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এত আবেগ-উত্তেজনা ও আত্মারক্ষামূলক প্রবণতার প্রকাশ ঘটেছে। প্রচ্ছন্নভাবে এটা মুসলমানদের আত্ম-পরিচয় লাভ ও নবজাগরণের চেতনা সঞ্চারে বিশেষ সহায়ক হয়েছে।
ঊনবিংশ শতকের মধ্য ভাগে বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার সূত্রপাত। কালগত বিচারে নয়, প্রধানত উপজীব্যগত ও শিল্পগত বিচারেই আধুনিকতার লক্ষণ বিচার করা হয়। সেকারণে মধুসূদনকেই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম ও সার্থক রূপকার হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। মধুসূদনের শিক্ষা, জীবন-পরিবেশ, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গী বহুল পরিমাণে তাঁর সাহিত্যে রূপায়িত হয়েছে। ইউরোপীয় শিক্ষা, সভ্যতা ও সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য-প্রকরণ ইত্যাদি আত্মস্থ করে মুধূসূদন বাংলা সাহিত্যে এক যুগান্তকারী সাহিত্য সৃষ্টি করেন। তিনি ইংরাজি ও অন্যান্য পাশ্চাত্য ভাষা ও সাহিত্য অধ্যয়ন করে তার অনুসরণে বিস্ময়কর কৃতিত্বের সাথে বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতায়ন সম্পন্ন করেন। ইংরাজি ভাষা-সাহিত্যের ছাত্র হিসাবে বাংলা সাহিত্যের ধারাবাহিকতার সাথে তাঁর তেমন কোন পরিচয় ছিল না। ইংরাজি সাহিত্যের আদলে বাংলা সাহিত্যের আধুনিকায়ন তাঁর জন্য সহজসাধ্য হয়। ইংরাজি ভাষার ছাত্র হিসাবে প্রচলিত বাংলা ভাষার জ্ঞানও তাঁর তেমন একটা ছিল না। তাই ইংরাজি সাহিত্যের চর্চা ছেড়ে যখন তিনি বাংলা ভাষায় সাহিত্য-চর্চায় মনোনিবেশ করেন তখন পণ্ডিতদের সংস্কৃতবহুল বাংলাকেই তিনি মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করেন। তাছাড়া, রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনী ও চরিত্র নিয়ে রচিত ইউরোপীয় মহাকাব্যের আদলে তৈরি ধ্র“পদ সাহিত্য রচনায় সংস্কৃতবহুল ভাষাটাকে তিনি বিশেষ উপযোগী বলে বিবেচনা করেন। মধূসূদনের পরে যাঁরা সাহিত্য চর্চা করেছেন তাঁরা অনেকেই তাঁর দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। বিশেষ করে এক্ষেত্রে হেমচন্দ্র, নবীন চন্দ্র, কায়কোবাদ প্রমুখ কবির নামোল্লেখ করা যায়।
কায়কোবাদসহ সমকালীন অনেক মুসলিম কবি-সাহিত্যিক মধুসূদন-প্রবর্তিত সাহিত্যের আঙ্গিক, প্রকরণ ও অন্যান্য শিল্পগত বৈশিষ্ট্য অনুসরণ করলেও উপজীব্য, বিষয়, চরিত্র ও অনুপ্রেরণার দিক দিয়ে তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্বাতন্ত্র্য লক্ষণীয়। স্বতন্ত্র জীবনদৃষ্টি, স্বকীয় গৌরবময় ঐতিহ্য-চেতনা ও নব-জাগরণের উদ্দীপনা তাঁর সাহিত্য-সৃষ্টির প্রধান উপজীব্য হিসাবে গণ্য হয়। ইংরাজদের প্রভাবে ‘ইঙ্গ-বঙ্গ’ সমাজের সৃষ্টি, ‘ইয়ং বেঙ্গল’দের এ্যাংলো-ইন্ডিয়ান’দের প্রাদুর্ভাব এ সময় যেমন বাঙালি হিন্দুসমাজকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করে, বাঙালি মুসলিম সমাজে তেমন কোন সমস্যা ছিল না। ইসলামের প্রভাবে মুসলিম সমাজ এ সমস্ত সামাজিক অনাচার ও বিশৃঙ্খলা থেকে অনেকটাই মুক্ত ছিল। বরং ইসলামী ভাবাদর্শ, ইতিহাস ও ঐতিহ্য-চেতনা তখন মুসলমানদের মধ্যে নব উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল। এসবকে উপজীব্য করেই কায়কোবাদ ও তাঁর সম-সমায়িক মুসলিম কবি-সাহিত্যিকগণ এ সময় সাহিত্য-সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন।
ঊনবিংশ শতকের এ যুগ-পরিবেশ, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে মীর মশাররফ হোসেনের সাহিত্য চর্চা শুরু হয়।
মীর মশররফ হোসেন (১৮৪৮-১৯১১) উনবিংশ শতকের প্রথম উল্লেখযোগ্য ও সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম গদ্য লেখক। তবে গদ্য ছাড়াও কিছু পদ্য রচনায়ও তাঁর অবদান রয়েছে। তাঁর প্রতিভা ছিল বহুমুখী। সাহিত্যের বিভিন্ন প্রকরণ নিয়ে তিনি কাজ করেছেন।
কুষ্টিয়া জেলার লাহিনী পাড়া গ্রামে মশাররফ হোসেন জন্মগ্রহণ করেন। জীবনের বেশির ভাগ সময়ে তিনি দেলদুয়ার এস্টেটের ম্যানেজার ছিলেন। তাঁর পূর্বে উনবিংশ শতকে উল্লেখযোগ্য তেমন কোন মুসলমান লেখকের পরিচয় পাওয়া যায় না। মুনশী শেখ আজিম উদ্দীন, শামসুদ্দীন মোহাম্মদ সিদ্দিকী, মুনশী নামদার, করিমুন্নেছা খানম, গোলাম হোসেন প্রমুখ মশাররফ হোসেনের পূর্বে যেসব মুসলিম কবি-সাহিত্যিকের পরিচয় পাওয়া যায়, তাঁরা নামমাত্র এবং পুঁথি-রচয়িতা শ্রেণীর লেখক ছিলেন। তাই মশাররফ হোসেনের মত উঁচুমানের শক্তিশালী মুসলিম লেখকের আর্বিভাব ছিল যেমন আকস্মিক তেমনি বিস্ময়কর। তাঁর সমকালে যেসব হিন্দু সাহিত্যিক বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন, তিনি তাঁদের সমপর্যায়ভুক্ত যশস্বী সাহিত্যিক হিসাবে সমাদৃত। তাঁর গ্রন্থসংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। মশাররফ হোসেনের উপর রচিত প্রথম গ্রন্থ-রচয়িতা অধ্যাপক আব্দুল লতিফ চৌধুরীর মতেঃ
“আমরা আজ পর্যন্ত বিগত (উনবিংশ শতাব্দী) শ্রেষ্ঠ মুসলিম সাহিত্যসেবী মীর মশাররফ হোসেনের ৩৮ খানা গ্রন্থের সন্ধান পেয়েছি।”
বাংলা একাডেমী প্রকাশিত ‘মশাররফ রচনা সম্ভার’-এর সম্পাদক ডক্টর কাজী আব্দুল মান্নান বলেনঃ “এখন পর্যন্ত মশাররফ হোসেনের মোট ৩৬ খানা গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায়।”
এখানে মীর মশাররফ হোসেন প্রকাশিত ২৭ খানা গ্রন্থের একটি তালিকা প্রদত্ত হলোঃ
১। রতœাবতী (উপন্যাস, ১৮৬৯)
২। গোরাই ব্রিজ অথবা গৌরি সেতু (কাব্য ১৮৭৩)
৩। বসন্ত কুমার নাটক (১৮৭৩)
৪। জমিদার দর্পণ (নাটক, ১৮৭৩)
৫। এর উপায় কি? (প্রহসন, ১৮৭৫)
৬। বিষাদ সিন্ধু (ঐতিহাসিক উপন্যাস মহরম পর্ব-১৮৮৫)
৭। সঙ্গীত লহরী (গান, ১৮৮৭)
৮। গো-জীবন (প্রবন্ধ, ১৮৮৯)
৯। বেহুলা গীতভিনয় (গদ্য-পদ্যে রচিত নাটক, ১৮৮৯)
১০। উদাসীন পথিকের মনের কথা (আত্মজৈবনিক উপন্যাস, ১৮৯০)
১১। তহমিনা (উপন্যাস, ১৮৯৭)
১২। টালা অভিনয় (প্রহসন, ১৮৯৭)
১৩। নিয়তি কি অবনতি (নাটক, ১৮৯৮)
১৪। গাজী মিয়ার বাস্তানী (আত্মজৈবনিক রচনা, ১৮৯৯)
১৫। মৌলুদ শরীফ (গদ্যে-পদ্যে লেখা মিলাদ শরীফ, ১৯০৩)
১৬। মুসলমানদের বাংলা শিক্ষা (পাঠ্য পুস্তক, ১ম ভাগ, ১৯০৩)
১৭। বিবি খোদেজার বিবাহ (কাব্য, ১৯০৫)
১৮। হজরত ওমরের ধর্মজীবন লাভ (কাব্য, ১৯০৫)
১৯। হজরত বেলালের জীবনী (কাব্য, ১৯০৫)
২০। হজরত আমীর হামজার ধর্মজীবন লাভ (কাব্য, ১৯০৫)
২১। মদীনার গৌরব (কাব্য, ১৯০৬)
২২। মোসলেম বীরত্ব (কাব্য, ১৯০৬)
২৩। এসলামের জয় (গদ্য, ১৯০৮)
২৪। মুসলমানের বাংলা শিক্ষা (২য় ভাগ)
২৫। বাজিমাত (কাব্য, ১৯০৮)
২৬। আমার জীবন (১ম খণ্ড, ১৯১০)
২৭। আমার জীবনীর জীবনী কুলসুম জীবনী (গদ্য, ১৯১০)
উপরোক্ত তালিকা থেকে মীর মশাররফ হোসেনের সৃষ্টি-বৈচিত্র্য ও তাঁর প্রতিভার বহুমুখিনতার পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর গ্রন্থ-সংখ্যা যেমন অনেক, তাঁর সৃষ্টি-বৈচিত্র্যও তেমনি বিস্ময়কর। একাধারে তিনি উপন্যাস, নাটক, প্রহসন, কবিতা, গান, প্রবন্ধ, আত্মজৈবনিক রচনা, জীবনীগ্রন্থ পাঠ্য-পুস্তক ইত্যাদি লিখেছেন। তাঁর এসব রচনায় যেমন রয়েছে ধর্মভাব, ইতিহাস ও ঐতিহ্য-চেতনা, তেমনি রয়েছে সমাজ-সচেতনতা, সাময়িক প্রসঙ্গ, রাজনৈতিক বিষয়, সাম্প্রদায়িক সমস্যা ও তার সমাধানের উপায়। সর্বোপরি মুসলমানদের উন্নয়ন ও নবজাগরণ প্রয়াসেও তিনি সর্বদা লেখনি পরিচালনা করেছেন। এত অসংখ্য বিষয়, ভাব ও অনুভূতি মশাররফ হোসেন তাঁর বিশাল সাহিত্যে এক অসাধারণ নৈপুণ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন। এর দ্বারা তাঁর প্রতিভার বহুমাত্রিকতা ও বর্ণিল পারঙ্গমতার বিষয়ই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মশাররফ হোসনের সাহিত্য-চর্চার সূত্রপাত এবং তাঁর অনুপ্রেরণা সম্পর্কে জানা যায়, ছোটবেলায় তাঁর বাড়িতে পুঁথি পাঠের আসর বসতো। তিনি ছিলেন তার একজন বিমুগ্ধ শ্রোতা। বাউল কবি লালন শাহের এলাকায় তাঁর বাড়ি হওয়ার কারণে বাঊল গানের দ্বারাও তাঁর মানস-প্রকৃতি কিছুটা প্রভাবিত হয়। গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’র সম্পাদক কুমারখালির কাঙ্গাল হরিনাথের পত্রিকায়ও মশাররফ হোসেন প্রতি সপ্তাহে বার্তা পরিবেশন করতেন। এছাড়া, তিনি কলকাতা থেকে প্রকাশিত কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত ‘সংবাদ-প্রভাকর’-এও সংবাদদাতার কাজ করতেন। এভাবে পুঁথিপাঠের আসরে বসবার অভিজ্ঞতা, বাউল গানের অধ্যাত্ম-চেতনা, সংবাদপত্রের অভিজ্ঞতা এবং জমিদারের কাচারীতে কার্যরত অবস্থায় সমাজের বিভিন্ন স্তরের অসংখ্য মানুষের সংস্পর্শে আসার ফলে তাদের বিচিত্র স্বভাব-প্রকৃতি সম্পর্কে তিনি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর সাহিত্যে। সাংবাদিক হিসাবে তিনি প্রথম জীবনে যে কাজ শুরু করেছিলেন তারই সূত্র ধরে তিনি এক সময় ‘আজিজন নেহার’ ও ‘হিতকারী’ নামক দুটি পত্রিকা প্রকাশেও আত্মনিয়োগ করেছিলেন।
মীর মশাররফের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ‘রতœাবতী’। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৬১। গ্রন্থের কাহিনী কৃত্রিম, উপকথা জাতীয়। তবে গ্রন্থকার এটাকে কৌতুকাবহ উপন্যাস হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। গ্রন্থের ভাষা কৃত্রিম, সাধু বাংলা। যেমন-”রাজনন্দিনী যুবরাজ সুকুমারকে দর্শন করিবা মাত্র সগর্ব্বে স্বীয় সহচরীকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, আমি যুবরাজের নিকট বিংশতি সহস্র স্বর্ণমুদ্রা প্রার্থনা করি।” গ্রন্থটির ভূমিকায় (বিজ্ঞাপন) লেখক লিখেছেনঃ “গ্রন্থ রচনা করিয়া গ্রন্থকার নামে পরিচয় দেওয়া এই আমার প্রথম উদ্যম। অতএব, ইহার মধ্যে শত শত দোষ বিদ্যমান থাকা সম্ভব।” গ্রন্থ প্রকাশের পর ‘ঢাকা প্রকাশ’ মন্তব্য করেঃ “ইহার লেখা অতি সরল, প্রাঞ্জল ও বিশুদ্ধ হইয়াছে বটে, কিন্তু উপন্যাসটিতে বিশেষ চাতুর্য কিছু প্রকাশ পায় নাই।” মীর মশাররফের এ প্রথম গ্রন্থের ভাষা ও বর্ণনায় তাঁর পূর্বসূরী বঙ্কিমচন্দ্রের প্রভাব অনেকটা স্পষ্ট। তবে বঙ্কিমচন্দ্রের মত উপন্যাস রচনার প্রতিভা তাঁর এ গ্রন্থে লক্ষ্য করা যায় না ।
মশাররফ হোসেনের দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘গোরাই ব্রিজ বা গৌরী সেতু’। এটি প্রকাশের পর, এর আলোচনা প্রসঙ্গে ১৮৭৩ সনে ‘বঙ্গদর্শনে বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেনঃ “তাঁহার (মশাররফ হোসেন) রচনার ন্যায়, বিশুদ্ধ বাঙ্গালা অনেক হিন্দুতে লিখিতে পারে না। ইহার দৃষ্টান্ত আদরণীয়।” গোরাই ব্রিজ একটি কবিতার বই। তাই এ মন্তব্য করার সময় নিশ্চয়ই ‘রত্মাবতী’র কথাই বঙ্কিম স্মরণ করে থাকবেন। তাছাড়া, মশাররফ হোসেনের কবিতার ভাষাও সহজ, প্রাঞ্জল ও সাধু প্রকৃতির। বঙ্কিমচন্দ্র তখন ‘সাহিত্য সম্রাট’ হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাই মশাররফ হোসেন সম্পর্কে তাঁর উপরোক্ত মন্তব্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত হিন্দুদের নিকট তখন কোন মুসলমান সাহিত্যিক হিসাবে সহজে সম্মান পেতেন না। সেসময় বঙ্কিমের মত গোঁড়া ব্রাহ্মণ এবং চরম মুসলিম-বিদ্বেষী উঁচু দরের সাহিত্যিকের উপরোক্ত মন্তব্যকে মশাররফ হোসেনের সাহিত্য- প্রতিভার যথার্থ স্বীকৃতি বলে মনে করা যেতে পারে।
গোরাই ব্রিজ প্রকাশের পর অক্ষয় কুমার সরকার ‘বঙ্গদর্শনে’ লিখেছিলেনঃ “গ্রন্থখানি পদ্য। পদ্য মন্দ নহে।… মীর মশাররফ হোসেনের বাঙ্গালা ভাষানুরাগিতা বাঙ্গালীর পক্ষে বড় প্রীতিকর। ভরসা করি, অন্যান্য সুশিক্ষিত মুসলমান তাঁহার দৃষ্টান্তে অনুরাগী হইবেন।”
১৮৭৩ সনেই মশাররফ হোসেনের ‘বসন্ত কুমারী’ ও ‘জমিদার দর্পণ’ নামে দু’খানি নাটক প্রকাশিত হয়। ‘বসন্ত কুমারী’ নাটকটি তাঁর লাহিনী পাড়ার নিজ বাড়িতে মঞ্চস্থ হয়। ‘জমিদার দর্পণে’র নামকরণে নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্রের (১৮৩০-১৮৭৪) ‘নীল দর্পণ’ নাটকের কথা হয়ত মনে জাগতে পারে। এটা অস্বাভাবিক নয়। ঐ সময় ‘নীল দর্পণ’ অত্যন্ত জনপ্রিয় নাটক ছিল। ১৮৬৩ সনে Nil Durpon, or the Indigo Planting Mirror’ নাম দিয়ে অ ঘধঃরাব-এ ছদ্মনামে এর ইংরাজি অনুবাদও প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশে তখন ইংরাজ নীলকর সাহেবদের অত্যাচারে কৃষক সাধারণ অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। নীলকরগণ বিনা পয়সায় কৃষকের জমি জবরদস্তি দখল করে, কৃষকদেরকে বিনা পয়সায় সেখানে নীল চাষে বাধ্য করে। নীল উৎপাদনের পর নীলকরগণ তা বিক্রি করে প্রচুর পয়সা রোজগার করে। কৃষকগণ তাতে কোন ফায়দা বা অংশ পায় না। কৃষকের জমি, শ্রম, কষ্ট এতে লগ্নী হলেও এর দ্বারা তাদের কোন উপার্জন হয় না। ফলে সারা বছর তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে না খেয়ে উপোস করে। এর প্রতিবাদ করতে গেলেও নীলকরদের লাঠিয়াল বাহিনী তাদের উপর অত্যাচার-নির্যাতন চালায়। এ দুঃসহ ও মর্মান্তিক কাহিনী নিয়ে দীনবন্ধু মিত্র তাঁর ‘নীল দর্পণ’ নাটক রচনা করেন। এ নাটক প্রকাশের পর ইংরাজ সরকারের টনক নড়ে এবং তারা আইন করে নীল চাষ বন্ধ করে দেয়।
‘নীল দর্পণে’র এরূপ জনপ্রিয়তা দেখে মশাররফ হোসেন হয়ত ‘জমিদার দর্পণ’ নাটক লিখতে উদ্বুদ্ধ হয়ে থাকতে পারেন, কিন্তু এর ভাব ও বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে জমিদার কাচারীতে। তাই জমিদারের স্বভাব-প্রকৃতি ও জীবন-বৃত্তান্ত তাঁর বিশদরূপে জানা ছিল। ‘জমিদার দর্পণ’ নাটকে তাঁর জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার রূপায়ণ ঘটেছে। এতে তাঁর সমাজমনস্কতার পরিচয় পাওয়া যায়। মূলত মশাররফ হোসেনের অধিকাংশ সাহিত্যই তাঁর জীবন-অভিজ্ঞতার প্রতিবিম্ব।
১৮৭৬ সনে রচিত ‘এর উপায় কি’ মশাররফ হোসেনের একটি প্রহসন। ইতঃপূর্বে রচিত মধুসূদনের ‘একেই বলে সভ্যতা’ ও ‘বুড়া শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ দুটো প্রহসনের খানিকটা প্রভাব এতে থাকলেও ভাব-বিষয় ও রচনা-শৈলির দিক থেকে এটা স্বতন্ত্র।
মশাররফ হোসেনের সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা ‘বিষাদ সিন্ধু’। ১৮৮৫-১৮৯১ পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় বছরে মোট তিন খণ্ডে রচিত বিপুলায়তন ‘বিষাদ সিন্ধু’ তাঁকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে যায়। এ ঐতিহাসিক উপন্যাসটি মশাররফ হোসেনকে বাংলা সাহিত্যে কালজয়ী অমরতা দান করেছে। এটি বাংলা ভাষায় সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে একটি। এক সময় বাঙালি শিক্ষিত মুসলমানের প্রায় প্রতিটি ঘরেই ‘বিষদ সিন্ধু’ শোভা পেত এবং বিশেষভাবে মহরম মাসে আসর করে এটি পাঠ করা হতো। ‘বিষাদ সিন্ধু’র প্রথম পর্ব প্রকাশের পর ‘ভারতী (ফাল্গুন, ১২৯৩) পত্রিকায় মন্ত্রব্য করা হয়ঃ “ইহা মহরমের একখানি উপন্যাস ইতিহাস। ইহার বাঙ্গালা যেমন পরিষ্কার, ঘটনাগুলি যেমন পরিষ্ফুট, নায়ক-নায়িকার চিত্রও ইহাতে তেমনি সুন্দররূপে চিত্রিত হইয়াছে। ইতিপূর্বে একজন মুসলমানের এত পরিপটি বাঙ্গালা রচনা আর দেখিয়াছি বলিয়া মনে হয় না।”
‘বিষাদ সিন্ধু’ সম্পর্কে ‘গ্রাম বার্তা প্রকাশিকায়’ (১১ জ্যৈষ্ঠ, ১২৯২) লেখা হয়ঃ “ইহার এক একটি স্থান এরূপ করুণ রসে পূর্ণ যে, পাঠকালে চক্ষের জল রাখা যায় না। যাহারা মুসলমানদিগের মহররম পর্বের বিবরণ জানিতে ইচ্ছা করেন, অনুরোধ করি, তাহারা বিষাদ সিন্ধু পাঠ করুন মনোরথপূর্ণ হইবে। মুসলমানদের গ্রন্থ এইরূপ বিশুদ্ধ বঙ্গ ভাষায় অল্পই অনুবাদিত ও প্রকাশিত হইয়াছে।”
“বিষাদ সিন্ধু’ সম্পর্কে বিশিষ্ট গবেষক নাজিরুল ইসলাম মোহাম্মদ সুফিয়ান বলেনঃ “পুঁথি সাহিত্যে মহরমের কাহিনী ইতঃপূর্বেও প্রচলিত ছিল। ‘মুক্তাল হোসেন’, “জারী জঙ্গনামা’ প্রভৃতি পুঁথি মশাররফ হোসেনের বহু পূর্বেই রচিত হইয়াছিল। সুতরাং ‘বিষাদ সিন্ধু’র গল্প এমন কিছু নূতন নয়। তবে তাহা মশাররফ হোসেনই সর্ব প্রথমে সাধু ভাষায় সঙ্কলন করেন। অবশ্য চরিত্র চিত্রণের মধ্যেও বহু স্থানে তাঁহার মৌলিকতা প্রকাশ পাইয়াছে।” (বাঙ্গালা সাহিত্যের নূতন ইতিহাস, তৃতীয় প্রকাশ, প্রকাশক-বাংলা সাহিত্য পরিষদ, অক্টোবর, ১৯৯২, পৃষ্ঠা-৫১৫)।
‘বিষাদ সিন্ধু’ ইতিহাস-ভিত্তিক উপন্যাস হলেও এতে ইতিহাসকে হুবহু অনুসরণ করা হয়নি। উনবিংশ শতকে ইসলামী ভাব ও মুসলিম পুনর্জাগরণের যে উদ্দীপনাপূর্ণ প্রয়াস সমকালীন মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে লক্ষ্য করা গিয়েছিল, মীর সাহেবের রচনায় তার সুস্পষ্ট প্রকাশ লক্ষণীয়। ‘বিষাদ সিন্ধু’ এর সর্বোৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। ‘বিষাদ সিন্ধু’কে যেমন উপন্যাস বলা মুস্কিল, তেমনি একে ইতিহাস গ্রন্থ বলাও চলে না। কারণ পাঠকের ভাবাবেগের প্রতি লক্ষ্য রেখে ইতিহাসের কিছুটা অপলাপ ঘটিয়ে সিজস্ব কল্পনা ও কিছুটা অতিশয়োক্তির আশ্রয় নিয়েছেন। অন্যদিকে, আধুনিক উপন্যাসের শিল্প-রীতিও এতে নিষ্ঠার সাথে অসুসরণ করা হয়নি। তবে এটাকে মধ্যযুগীয় পুঁথি সাহিত্যের ঢং-এ আধুনিক উপন্যাসের ভঙ্গীতে রচিত ইতিহাসাশ্রয়ী রচনা বলা যেতে পারে। কাহিনী, চরিত্র, ভাষা ও বর্ণনার গুণে এটা এক অসাধারণ পাঠকপ্রিয় গ্রন্থে পরিণত হয়েছে। ইসলামের ইতিহাসের এক বিষাদ-করুণ ঘটনাকে লেখক মানবিক সংবেদনা ও আর্তিতে পূর্ণ করে অপরূপ বর্ণনা ও চরিত্র-চিত্রণের আশ্চর্য কুশলতায় ‘বিষাদ সিন্ধু’কে এক অবিস্মরণীয় গ্রন্থে পরিণত করেছেন। এটা বাংলা সাহিত্যের এক সফল ক্লাসিক গ্রন্থ এবং মশাররফ হোসেনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি।
‘বিষাদ সিন্ধু’র আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর অপরূপ বাক-বিন্যাস। অলংকারপূর্ণ ভাষা, চিত্তাকর্ষক বর্ণনা, আবেগ-উচ্ছ্বাসপূর্ণ সুরময় স্বচ্ছন্দ প্রকাশ ও নৈপুণ্যময় বাক-বিন্যাস ‘বিষাদ সিন্ধু’কে এক অপরূপ কাব্য-মহিমা দান করেছে। ঘটনা ও কাহিনীর দিক থেকে এটাকে মহাকাব্যধর্মী বলা চলে। মহাকাব্যের ধ্রুপদ বৈশিষ্ট্য এতে বহুলাংশে বিরাজমান। তাই সবকিছু মিলিয়ে ‘বিষাদ সিন্ধু’ বাংলা সাহিত্যের এক অসাধারণ ব্যতিক্রমী গ্রন্থ। গদ্য, পদ্য, ইতিহাস, উপন্যাস, মহাকাব্য, বাস্তবতা ও কল্পনার এক আশ্চর্য সমন্বয় ঘটেছে এখানে।
‘বিষাদ সিন্ধু’র মত ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’য়ও উপন্যাসের শিল্পরীতি যথাযথ নিষ্ঠার সাথে অনুসৃত হয়নি। এ জাতীয় রচনায় ঘটনা, কাহিনী ও চরিত্র-চিত্রণের মাধ্যমে বিষয়বস্তুকে আকর্ষণীয় করে তোলার ক্ষেত্রে লেখকের যতটা আন্তরিক প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়, উপন্যাসের প্রকৃতি ও শিল্পরীতির প্রতি লেখকের ততটা সজাগতা লক্ষ্য করা যায় না। প্রকৃতপক্ষে, উপন্যাসের ঢং-এ লেখা হলেও এটা উপন্যাস নয়, নীলকর সাহেবদের জুলুম-নির্যাতনের মর্মন্তদ কাহিনীতে পূর্ণ এক বাস্তব উপাখ্যান। লেখক নিজেই এখানে উদাসীন পথিক। ক্যানি সাহেব তার জমিদারীতে কীভাবে প্রজাসাধারণের উপর জুলুম করে ধানের বদলে নীলের চাষ করাতো, কীভাবে প্রজাদেরকে কুঠি পাহারায় নিয়োজিত করতো, অন্যান্য জমিদারগণ তার অত্যাচার থেকে প্রজাদেরকে বাঁচাবার জন্য কী ব্যবস্থা গ্রহণ করে, প্রজা-বিদ্রোহ, গভর্নরের হস্তক্ষেপ ইত্যাদি নানা ঐতিহাসিক বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে এখানে কাহিনীর পত্র-পল্লব বিকশিত হয়েছে। কাহিনী যেমন বাস্তবধর্মী, ভাষা ও বর্ণনা কৌশলে সাধারণ পাঠকের নিকট তেমনি তা আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। সমকালীন সমাজের এক বাস্তব চিত্র এ গ্রন্থে বিশ্বস্ততার সাথে বিবৃত হয়েছে।
‘গাজী মিয়ার বস্তানী’ মীর মশাররফ হোসেনের আর এক বিস্ময়কর বিশালকার সৃষ্টি। এতে সর্বমোট ২৪টি নথি বা অধ্যায় রয়েছে। প্রথম খণ্ডে ২০টি এবং দ্বিতীয় খণ্ডে ৪টি নথি সন্নিবেশিত হয়েছে। এটাকেও ঠিক উপন্যাস বলা যায় না, কালিপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম প্যাচার নক্সা’র মত এটা একটি নক্সা জাতীয় রচনা। এতে এত বিচিত্র ধরনের ঘটনা, কাহিনী ও চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে যে, লেখক এ গ্রন্থে তাঁর নাম দিতে শংকা বোধ করেছেন। গ্রন্থের উপরে লেখা ছিল, ‘স্বত্ত্বাধিকারী উদাসীন পথিক’। অনেকে এটিকে মশাররফ হোসেনের শ্রেষ্ঠ রচনা বলে মনে করেন। জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে যদিও এটা ‘বিষাদ সিন্ধু’র সমকক্ষ নয়, কিন্তু বিষয়-বৈচিত্র্য, চরিত্র-চিত্রায়ণ, সমাজ-বাস্তবতার সার্থক উপস্থাপন ও শিল্প-সম্ভাবনার দিক থেকে এটা তাঁর একটি শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি এবং বাংলা সাহিত্যেরও এক মূল্যবান সম্পদ, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। অক্ষয়কুমার মৈত্রের মতেঃ ‘গাজী মিয়ার বস্তানী’ একখানি বিচিত্র সমাজচিত্র সুশোভিত, সুলিখিত উপন্যাস। ইহাতে নাই এমন রস দুর্লভ।”
নাজিরুল ইসলাম মোহাম্মদ সুফিয়ান ‘গাজী মিয়ার বস্তানী’র কাহিনীর পরিচয় দিয়েছেন এভাবেঃ “গল্পের আরম্ভ বা ‘বস্তানী শুরু’-অরাজকপুরের হাকিম ভোলানাথ, কুঞ্জনিকেতনের বিধবা বেগম পয়জারুন্নেসাকে লইয়া। দ্বিতীয় নথিটিতে ‘সবলেট চৌধুরী’র কথা। বস্তানী প্রথম হইতে শেষ এমনি হালকা কথায় অনেকটা ‘হুতোম পেঁচার নক্সা’র রীতিতে লেখা। ইহা উনবিংশ খৃস্টাব্দের পর্যন্ত মুসলিম পতন যুগের সামাজিক চিত্র। অবশ্য সমাজের সব স্তরের চিত্র ইহাতে তেমন প্রতিফলিত হয় নাই যেমন হইয়াছে জমিদার, লম্পট ও অসৎচরিত্রের ছায়াপাত। ‘হুতোম পেঁচার নক্সা’, ‘আলালের ঘরের দুলাল’ আর ‘গাজী মিয়ার বস্তানী’ অনেকটা এক জাতীয় নক্সা’ ঠিক সেই অনুপাতে বাস্তবভিত্তিক কিনা স্থির নিশ্চয় হইয়া বলিবার উপায় নাই। ‘গাজী মিয়ার বস্তানী’ও একটি ‘জমিদার দর্পণ’। মোগল অধিকারের পর মৈমনসিংহের অনেক পাঠান জমিদার বহুকাল পর্যন্ত মধুপুরের জঙ্গলে গোপনে বাস করিতেন।… মোশাররফ হোসেন এই জমিদারের চরম পতনের যুগ দেখিয়াছেন এবং তাহাদের চিত্র আঁকিয়াছেন।…
“… উপন্যাস হিসাবে ইহা যে বিশেষ উঁচুদরের তাহা বলিবার উপায় নাই। কারণ ইহাতে ঘটনা অনেক থাকিলেও সবগুলি এক সূতায় গ্রথিত হইয়া জমাট বাঁধে নাই। অনেক কথা রাখিয়া-ঢাকিয়া বলিতে হইয়াছে। অনেক কথা অপ্রকাশ থাকিয়া গিয়াছে। তাছাড়া বস্তানীকে কাহিনী করিয়া তুলিবার দিকে লেখকের তেমন দৃষ্টি ছিল না। … বস্তানীতে ঘটনা অনেক থাকিলেও ঘটনার ভিতর দিয়া চরিত্র ফুটিয়া উঠে নাই। চরিত্র সৃষ্টি হইয়াছে লেখকের বর্ণনায়, ধিক্কারে, অতিশয়োক্তিতে; নানা কাজের ভিতরে নানা আবেষ্টনীর সংঘাতে এ চরিত্র আপনা হইতেই পরিষ্ফুট হয় নাই। ইহাতে কল্যাণবোধ আছে কিন্তু তাহা স্থূল, মানসতা ও মননশীলতা গভীর হইতে উদ্ভুত নয়। তবু যে এ গ্রন্থ মর্মস্পর্শী তাহার কারণ রসানুভূতি নয়- সামাজিক কল্যাণবোধ।” (নাজিরুল ইসলাম মোহাম্মদ সুফিয়ানঃ ঐ, পৃ. ৫১৬,৫১২)
মীর মশাররফ হোসেনের ‘সঙ্গীত লহরী’, ‘গোজীবন’, ‘বেহুলা গীতাভিনয়’, মৌলুদ শরীফ’ প্রভৃতি কাব্য, প্রবন্ধ, গীতিনাটক, নাত-এ রাসূল ইত্যাদির মধ্যে একাধারে তাঁর প্রতিভার বহুমুখিতা এবং প্রেম ও মরমী ভাবের প্রকাশ লক্ষণীয়।’
মশাররফ হোসেনের সমগ্র সাহিত্য-কর্মকে মোটামুটি সাত ভাগে বিভক্ত করা চলেঃ
(এক) উপন্যাস জাতীয় রচনা। রত্নাবতী, বিষাদ সিন্ধু, উদাসীন পথিকের মনের কথা, তহমিনা এ শ্রেণীভুক্ত গ্রন্থ।
(দুই) আত্মচরিতমূলক রচনা। গাজী মিয়ার বস্তানী, আমার জীবন, আমার জীবনীর জীবনী, কুলসুম জীবনী প্রভৃতি এ শ্রেণীভুক্ত। অবশ্য গাজী মিয়ার বস্তানী উপন্যাসের ঢং-এ লেখা আবার উদাসীন পথিকের মনের কথাও বহুলাংশে আত্মজীবনীমূলক রচনা।
(তিন) নাটক। বসন্ত কুমারী নাটক, জমিদার দর্পণ, বেহুলা গীতাভিনয়, নিয়তি কি অবনতি এ শ্রেণীর অন্তর্গত।
(চার) প্রহসন। এর উপায় কি? টালা অভিনয় এ শ্রেণীভুক্ত।
(পাঁচ) কবিতা ও গান। গোরাই ব্রিজ অথবা গৌরি সেতু, মৌলুদ শরীফ, বিবি খোদেজার বিবাহ, হজরত ওমরের ধর্মজীবন লাভ, হজরত বেলালের জীবনী, হজরত আমীর হামজার ধর্মজীবন লাভ, মদীনার গৌরব, মোসলেম বীরত্ব, এসলামের জয়, বাজিমাত ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থ।
(ছয়) প্রবন্ধ। গো-জীবন মশাররফ হোসেনের একমাত্র প্রবন্ধ গ্রন্থ।
(সাত) পাঠ্য-পুস্তক। মুসলমানের বাংলা শিক্ষা ১ম ভাগ, মুসলমানের বাংলা শিক্ষা ২য় ভাগ তাঁর পাঠ্য-পুস্তক জাতীয় রচনা।
মশাররফ হোসেনের রচনায় মোটামুটি তিনটি বিষয় প্রাধান্য লাভ করেছে।
১. ধর্মীয় ভাব, মুসলিম ঐতিহ্য ও ইতিহাস চেতনা।
২. স্বদেশ-প্রীতি, সমাজ-সচেতনতা, সমাজ-সংস্কার ও কল্যাণবোধ।
৩. মানবিক প্রেম ও মরমী সংবেদশীলতা।
উনবিংশ শতকের সকল মুসলিম কবি-সাহিত্যিকের রচনায় এ বিষয়গুলো লক্ষ্য করা যায়। ধর্মীয় অনুপ্রেরণা, স্বদেশ ও স্বজাতি প্রীতি, মানবিক সংবেদনা ও লাঞ্ছিত-দুর্দশাগ্রস্ত সমাজের প্রতি আত্যন্তিক সহানুভূতি ও কল্যাণকামিতা তাঁর রচনার কেন্দ্রীয় ভাব।
মশাররফ হোসেনের সমকালে একদিকে বিদেশী শাসকের শোষণ, নীলকর সাহেবদের হৃদয়হীন পীড়ন এবং অন্যদিকে ঔপনিবেশিক শক্তির দেশীয় প্রতিভূ নব্য জমিদার ও সামন্ত প্রভুদের অমানুষিক অত্যাচার, উপরন্ত উকিল-মোক্তার, পেশকার-ফরিয়া, পাইক-পেয়াদা-মুৎসুন্দি, বরকন্দাজ ইত্যাদি শ্রেণীর অসৎ-বাটপার লোকদের শোষণ-জুলুমে সমাজের সাধারণ মানুষের জীবন তখন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। মশাররফ হোসেনের দরদী মন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এ নিগৃহীত মানবতার বিচিত্র করূণ চিত্র অঙ্কন করেছে। সমাজের বিভিন্ন দুর্বলতা, স্খলন-পতন ও অন্যায়-অবিচারের কথা বিচিত্র রস ও ভঙ্গীতে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে মশাররফ হোসেনের আশ্চর্য কুশলতা ও নৈপুণ্যের পরিচয় পাওয়া যায়।
উনবিংশ শতকের শ্রেষ্ঠ মুসলিম গদ্য-লেখক মীর মশাররফ হোসেন বাংলা সাহিত্যের এক উল্লেখযোগ্য প্রতিভা। তাঁর বিচিত্র অবদান বাংলা সাহিত্যের এক মূল্যবান সম্পদ। ভাষার ক্ষেত্রে তিনি বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমের গদ্য-রীতির অনুসরণ করলেও শিল্প-রীতির ক্ষেত্রে তিনি কোন বিশেষ ব্যক্তিকে অনুসরণ করেননি। তবে টেকচাঁদ, বঙ্কিম, কালীপ্রসন্ন, দীনবন্ধুর কিছু কিছু প্রভাব ক্ষেত্র বিশেষে মশাররফ হোসেনের উপর লক্ষণীয়। তা সত্ত্বেও প্রায় সর্বক্ষেত্রে তাঁর নিজস্বতাও অনেকটা স্পষ্টগ্রাহ্য। মশাররফ হোসেনের অনেকগুলো গ্রন্থ বিংশ শতকের প্রথম দিকে রচিত হলেও তাঁর প্রধান প্রধান গ্রন্থগুলো উনবিংশ শতকে রচিত। তাছাড়া, তাঁর মানস-প্রকৃতি ও চিন্তা-চেতনা সবকিছুই উনবিংশ শতকের সমাজ পরিবেশ ও আবেগ-অনুভূতিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। এ দিক দিয়ে যথার্থ অর্থেই তিনি উনবিংশ শতকের লেখক এবং নিঃসন্দেহে উনবিংশ শতকের শ্রেষ্ঠ মুসলিম গদ্য-শিল্পী, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। গদ্য রচনার দিক দিয়ে তাঁর সমকালে একমাত্র বঙ্কিমচন্দ্রের সাথেই তাঁর তুলনা চলে।