জনবিদ্রোহ ঠেকাতে চিরস্থায়ী জমিদারি বন্দোবস্ত

১৭৬৪ সালের বখশার যুদ্ধের পর ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৬৫ সালের ১২ আগস্ট বাদশাহ দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থকে বাঙলা-বিহার-উড়িষ্যার ‘দীউয়ান’ বা রাজস্ব অফিসারের নিযুক্তি আদায় করে। তারা ‘দ্বৈত শাসনে’র নামে বাঙলার আর্থিক শাসনের কর্তৃত্ব নেয়। সনদের শর্ত ভেঙে তারা ভূমিব্যবস্থা ও রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতি পরিবর্তন করে। খাজনার পরিমাণ রাতারাতি দ্বিগুন করে।
১৭৬৮ সালে বাঙলার দীউয়ানী দফতর কলকাতায় নেয়া হয়। তার পরই বাজারের ধান-চাল গুদামজাত করে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করা হয়। ফলে ১৭৭০ সনের জুন মাসের মধ্যে মোট জনসংখ্যার প্রতি ষোল জনে ছয় জন মারা যায়। ঘাস-পাতা খেয়ে সাবাড় করে ছেলে-মেয়ে বিক্রি ও মানুষ মানুষের গোশত খাওয়ার ঘটনা ঘটে।
পরবর্তি পনেরো বছরে দুর্ভিক্ষে অর্ধেক মানুষ সাবাড় হয়। কোম্পানির গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের (১৭৭২-১৭৮৫) হিসাবেই এ দুর্ভিক্ষে দেড় কোটি মানুষ প্রাণ হারায়। বিহার ও উত্তর বাঙলায় দুর্ভিক্ষ বেশি প্রকট হয়। ঢাকা নিয়াবতেরও কয়েকটি ‘পরগণা’ জনমানবশূন্য হয়ে পড়ে। ঢাকার লোকসংখ্যা শায়েস্তা খানের আমলের পাঁচ লাখ থেকে কোম্পানি আমলে এক লাখের নিচে নামে। কোম্পানি এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চল ‘বন্যজন্তু আকীর্ণ জঙ্গল’ ঘোষণা করে। এ সময়ও রিলিফের ব্যবস্থা না করে খাজনা আদায় বাড়ানো হতে থাকে।
মোগল সাম্রাজ্যের সবচে সমৃদ্ধ এই প্রদেশ ‘ভারতের শস্য ভান্ডার’ নামে পরিচিত ছিল। মুসলিম আমলে এ এলাকা কখনো দুর্ভিক্ষ দেখেনি। কিন্তু ইংরেজরা আধাযুগের মধ্যে বাঙলার প্রাচীন স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম সমাজের ভিত্তি ও কাঠামো ধ্বংশ করে। তার বিনিময়ে কোম্পানির কর্মচারী ও সহযোগীরা কলকাতায় বিত্ত-বৈভব তৈরি করে।
এই দুর্ভিক্ষের সময়ই ১৭৭২ সালে ‘দ্বৈত শাসন’ বাতিল হয়। ১৭৭৪ সালে সুপ্রীম কোর্ট উদ্বোধন করে কলকাতাকে উপনিবেশিকদের রাজধানী ঘোষণা করা হয়।
মীর যাফর দ্বিতীয়বার নওয়াব হন ১৭৬৩ সালে। সে বছর থেকেই গ্রাম-বাঙলায় জনবিদ্রোহ শুরু হয়। ১৭৬৯-১৭৭০ সালের মহা-মন্বন্তরের সময় থেকে ফকীর ও কৃষক বিদ্রোহ তীব্রতর হয়। ১৭৬৪ সালের বখশার যুদ্ধের পর থেকে মীর কাসিম পথে পথে ঘুরে নতুনভাবে সেনাবাহিনী গড়ার চেষ্টা করেন। শেষে ১৭৭৭ সালের ৬ জুন অপরিচিত পথচারীর মতো তিনি দিল্লীর আজমীরী দরোজার সামনে ইনতেকাল করেন।
তখন গ্রাম বাঙলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ফকীর বিদ্রোহের পাশাপাশি কৃষকদের বিভিন্ন বিদ্রোহের বিস্তার ঘটে। শমশের গাযীর (১৭৬৭-৬৮) নেতৃত্বে নোয়াখালী ও কুমিল্লায়, আবু তোরাবের (১৭৬৯) নেতৃত্বে সন্দীপে, ফকীর করম শাহের (১৭৭৫) নেতৃত্বে মোমেনশাহীর সুসংগ ও শেরপুরে, শের দৌলত খাঁ, রামু খাঁ ও জান বখশ খাঁর (১৭৭৬-৮৯) নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে জনবিদ্রোহ সংঘটিত হয়।
১৭৮৩ সালে রংপুর-দিনাজপুরে নূরলদীনের নেতৃত্বে বিদ্রোহের কথা জানা যায়। এই বিদ্রোহের নায়ক ছিলেন মোগলদের উত্তরসূরী নূরউদ্দীন বাকেরজঙ্গ। তিনিই ইংরেজদের চোখ এড়াতে মজনু (পাগল) শাহ (বাদশাহ) ছদ্মনাম ব্যবহার করেন বলে কেউ কেউ মনে করেন। (‘মজনু শাহ’ নামে পাকিস্তান আমলে সিনেমা হয়, ‘নূরাল দীনের সারা বেলা’ নামে বাংলাদেশ আমলে নাটক হয়।) ১৭৮৬ সালে মজনু শাহ যুদ্ধে আহত হন। তিনি ১৭৮৭ সালের মার্চ বা মে মাসে ইনতেকাল করেন। এর পর চেরাগ আলী শাহ, ফেরাগুল শাহ, সুবহানী শাহ, করম শাহ, মাদার বখশ, জরিফ শাহ, রমযান শাহ, রওশন শাহসহ মজনু শাহর সাথিগণ লড়াই এগিয়ে নেন। এই সময় বলখী শাহ নামের আরেকজন ‘ফকীরে’র নেতৃত্বে বাকেরগঞ্জে কৃষক বিদ্রোহ (১৭৯২) সংঘটিত হয়।
গ্রাম বাঙলার প্রত্যন্ত এলাকায় ছড়িয়ে পড়া কৃষক-প্রাজাদের বিদ্রোহ সদ্য প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি রাজত্বের অস্তিত্বের জন্য হুমকি তৈরি করে। বহু এলাকায় জমিদারী কাচারি ও নীল কুঠিগুলি আক্রান্ত হয়। নায়েব-গোমস্তা ও কুঠিয়ালরা প্রণভয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। ইংরেজদের খাজনা আদায় ও ব্যবসায়ে সংকট তৈরি হয়।
জনবিদ্রোহ ও স্থায়ী ফাঁদ
ইংরেজরা জনবিদ্রোহ ঠেকাতে নানা পরিকল্পনা করে। তার অংশ হিসাবে কিছু অনুগত নিষ্ঠুর দেশীয় সহযোগীকে প্রথমে একসালা পরে দশসালা মেয়াদে জমিদার বানিয়ে গ্রামে গ্রামে ‘বরকন্দাজ’ হিসাবে নিযুক্ত করে। দশ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কর্ণওয়ালিস (১৭৮৬-১৭৯৭) ও জন শোরের ‘সংস্কার পরিকল্পনা’র ভিত্তিতে ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করা হয়। এর ফলে বাঙলার গ্রাম-সমাজের খোল-নৈচা পাল্টে যায়।
মুসলিম শাসন আমলে জমিদার ছিলেন খাজনা আদায়ের কর্মচারী। তারা ফৌজদারী ও দেওয়ানী মামলার নিষ্পত্তি করতেন। শাসন বিভাগেরও কিছু দায়িত্ব পালন করতেন। ফৌজদারগণ তাদের নিয়ন্ত্রণ করতেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই রীতি বজায় রাখতে আইনত বাধ্য ছিল। কিন্তু তারা সাবেকি জমিদারি ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি ধ্বংশ করে। তারা জমির ওপর কৃষক বা গ্রাম পঞ্চায়েতের অধিকার ছিনিয়ে নেয়। জমিদারকে পূর্ণস্বত্ব মালিক বানিয়ে কৃষক-প্রজাদের সকল অধিকার ও সুযোগ কেড়ে নেয়। জমিদাররা কৃষককে জমি থেকে উচ্ছেদের ক্ষমতা পায়।
ইংরেজদের বছরের রাজস্ব কোটা পুরন করে যথেচ্ছ খাজনা আদায়ের একচ্ছত্র এখতিয়ার আর অনায়াসলব্ধ আয়ে নিশ্চিন্ত জীবনের নিশ্চয়তা পায়। এভাবে ইংরেজরা তাদের অনুগত লুটেরা সহযোগী একটি সহযোগী শ্রেণীকে নিজেদের আত্মরক্ষার ঢাল হিসাবে নিযুক্ত করে। এই পাহারাদারীর বিনিময়ে উপনিবেশিকরা তাদের শাসন যুগের অনিশ্চিত প্রথম যুগের এই দিনগুলিতে অনুগত নতুন জমিদারদেরকে কৃষকদের পিঠের ওপর শোষণ নিপীড়নের বিশাল পিরামিডরূপে চেপে বসার সুযোগ দেয়। এর মাধ্যমে জনবিদ্রোহ দমনের ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়। নিজেদের বিশেষ ঝামেলা ছাড়াই বছরে নির্ধারিত হারে নিরাপদে ও নিশ্চিন্তে রাজস্ব প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়।
উনিশ শতকের পুরা সময় এবং বিশ শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত বাঙলার সমাজ জীবনের প্রায় সকল ঘটনা এই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারদেরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শুরু থেকেই মুসলমানদেরকে তাদের দুশমন ধরে অগ্রসর হয়। সে নীতি অনুসারে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় নতুন জমিদার শ্রেণীর জন্ম হয়। ধর্মীয় পরিচয়ে তারা হিন্দু। গোত্রীয় পরিচয়ে দেব, মিত্র, বসাক, সিংহ, শেঠ, মল্লিক, শীল, তিলি বা সাহা। পূর্ব পরিচয়ে অনেকে ছিল আগের জমিদারদের নায়েব-গোমস্তা।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালুর পর খৃস্টান পাদ্রীদের সুপারিশে মুসলমানদের অবশিষ্ট জমিদারী আর তাদের সামাজিক ও ধর্মীয় কাজের সহায়ক লাখেরাজ সম্পত্তিগুলি বেদখলের কৌশল নেয়। চব্বিশ ঘণ্টার নোটিসে সূর্যাস্তের আগে সকল আয়মা লাখেরাজ ও তৌজী লাখেরাজের দলিল-দস্তাবেজ ও সনদ-পাঞ্জা দাখিল করার আকস্মিক হুকুম জারি করে। শঠতা ও নিবর্তনমূলক ‘সূর্যাস্ত আইন’ দিয়ে এই সম্পত্তিগুলি খাস করে নেয়া হয়। এর পর পূর্বপরিকল্পিত উপায়ে অতি সত্বর সেগুলি বিশেষ অনুগত পছন্দের লোকদের মাঝে নিলামে বন্দোবস্ত দেয়া হয়।
হান্টার লিখেছেন: মুসলমানদের হাত থেকে সমস্ত ইজারা, জমিদারী, একে একে খসিয়ে নিয়ে নতুন হিন্দু জমিদার ও তালুকদার শ্রেণীর আমদানি করা হয়। যেসব হিন্দু কর আদায়কারী ঐ সময় পর্যন্ত নিচু পদের চাকরিতে নিযুক্ত ছিল, নয়া ব্যবস্থার বদৌলতে তারা জমিদার শ্রেণীতে উন্নীত হয়। (ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার : দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস; এম, আনিসুজ্জামান অনূদিত পৃষ্ঠা ১৪১)।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাঙলার সমাজ জীবনে নতুন রূপান্তর সৃষ্টি করে। এর ফলে বহু মুসলমান অবস্থাপন্ন পরিবার রাতারাতি পথে বসেন। নতুন জমিদাররা বছরে চার কোটি দুই লাখ টাকা কোম্পানিকে দিয়ে রায়তদের কাছ থেকে প্রথম বছরেই প্রায় তিনগুণ রাজস্ব আদায় করে। এর পর রাজস্ব আদায় ক্রমশ বাড়িয়ে চলে।
ইংরেজ খৃস্টান বনিক আর দেশীয় হিন্দু জমিদারদের রক্তাক্ত শাসন ও শোষণের ‘চিরস্থায়ী’ বন্দোবস্তের মরণাঘাতে জমির স্বত্বহারা শতকরা পঁচাত্তর ভাগের বেশি মুসলমান রায়ত রাতারাতা ইল্যান্ডের ভূমিদাস সার্ফদের থেকেও খারাপ অবস্থায় নেমে আসেন। খাজনার দাবি মিটাতে কৃষকরা জমি ও বাড়িঘর বন্ধক রেখে মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ঘরবাড়ি জমি-জিরাত হারান। উনিশ শতকের বাঙলার জমিদার-মহাজনদের আর্থিক শোষণ এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নিপীড়নে মুসলমান ও বর্ণহীন রায়ত-প্রজারা দ্রুত ধ্বংশের অন্ধকারে তলিয়ে যান।
জমিদারদেরকে গ্রাম-বাঙলায় বিদ্রোহ দমনের দায়িত্ব দিয়ে উপনিবেশিকরা তাদের দখল বিস্তারে মনোযোগী হয়। মাইসূরের বাঘ ফতেহ আলী টিপু ১৭৯৮ সালে ইংরেজদের জন্য আতংক সৃষ্টি করেন। কলকাতার জমিদার গৌরচন্দ্র মল্লিক, নিমাইচরণ মল্লিক, গোপিমোহন ঠাকুর, কালিচরণ হালদার, রসিকলাল দত্ত, গোকুল চন্দ্র দত্তরা তখন ১৭৯৮ সালের ২৯ আগস্ট কলকাতায় সভা করে ইংরেজদেরকে সাহস ও সমর্থন যোগায়। ১৭৯৯ সালের ৪ মে টিপু সুলতানকে শহীদ করে ‘মাইসূর বিজয়ী’ ওয়েলেসলী (১৭৯৮-১৮০৫) কলকাতায় ফিরেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদাররা তখন তাকে মানপত্র দিয়ে সংবর্ধনা জানায়।
এই বেদনা ও অপমানের বছর ১৭৯৯ সালে বাঙলার আলেমগণ হিন্দুস্তানকে ‘দারুল হারব’ বা যুদ্ধ কবলিত ঘোষণা করেন। সে বছরই আলীওয়ার্দী খানের প্রতিষ্ঠিত হুগলী মাদরাসার ছাত্র ফরিদপুরের শরীয়তউল্লাহ তার শিক্ষক মওলানা বাশারাত আলীর সাথে মক্কায় হিজরত করেন।
দিল্লীর শাহ ওয়ালিউল্লাহর (১৭০৩-১৭৬২) ছেলে শাহ আবদুল আযীয দেহলভী (১৭৪৬-১৮৪৩) হিন্দুস্তানকে ১৮০৩ সালে ‘দারুল হারব’ ঘোষণা করেন। ১৭৯৯ ও ১৮০৩ সালের এ ফতোয়া উপমহাদেশের মুসলমানদের উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রামের নতুন ভিত্তিরূপে কাজ করে।
ফকীর ও কৃষক বিদ্রোহের ধারাবাহিকতায় মোমেনশাহী ও জাফরশাহী পরগণায় কৃষক বিদ্রোহ (১৮১২) দেখা দেয়। আঠারো বছর মক্কায় আর দুই বছর মিসরে আল আযহারে পড়াশুনা করে হাজী শরীয়ত উল্লাহ (১৭৮১-১৮৪০) ফরিদপুরের নিজ গ্রাম শামায়েল থেকে ১৮১৮ সালে ফরায়েজী আন্দোলন শুরু করেন। তার ইনতেকালের পর তার ছেলে মোহসিনউদ্দীন দুদুমিয়া (১৮১৮-১৮৬২) সে আন্দোলন (১৮১৮-৬২) এগিয়ে নেন।
শাহ আবদুল আযীযের ১৮০৩ সালে শাহ আবদুল আযীযের ‘দারুল হারব’ ফতোয়ার পর থেকেই তার ভাই শাহ রফিউদ্দীন, শাহ আবদুল কাদির ও শাহ আবদুল গণীর নেতৃত্বে ‘তরীকায়ে মুহাম্মদিয়া’ বা ‘জিহাদ আন্দোলন’ শুরু হয়। তরুণদের মধ্যে মাওলানা শাহ মুহাম্মদ ইসমাঈল, মাওলানা শাহ মুহাম্মদ ইসহাক ও সৈয়দ আহমদ বেরেলভীকে (১৭৮৬-১৮৩১) নিয়ে এই আন্দোলনের গণবাহিনী গঠিত হয়।
১৮২১ সাল থেকে সাইয়েদ আহমদ বেরেলভী এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তার খলিফা মওলানা মীর সাইয়েদ নিসার আলী তিতুমীর (জন্ম ২৭ জানুয়ারি ১৭৮২- শাহাদাত ১৯ নবেম্বর ১৮৩১) সীমান্ত জিহাদে না গিয়ে বাঙলার কৃষক-প্রজাদের পাশে দাঁড়িয়ে আন্দোলন করেন। ১৮৩১ সালের ৬ মে বেরেলভী বালাকোটে শহীদ হন। ১৯ নভেম্বর তিতুমীর নারকেলবেড়িয়ায় শহীদ হন।
এর পর মওলানা ইনায়েত আলী (১৭৯৮-১৮৫৮) বাঙলাসহ পূর্ব ভারতে তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া বা জিহাদ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
এই সকল আন্দোলনের পথ বয়ে ১৮৫৭ সালে সারা ভারত জুড়ে জাতীয় বিপ্লব সংগঠিত হয়। সাইয়েদ আহমদ বেরেলভীর অনুসারী হাফিয কাসিম, জেনারেল বখত খান, মওলানা আহমদ উল্লাহ শাহ, মওলানা ফজলে হক খয়রাবাদী, হাজী ইমদাদউল্লাহ, দেওবন্দ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মওলানা কাসিম নানুতুভী, মওলানা রশীদ আহমদ গাংগোহী, মওলানা মোহাম্মদ মুনীরদের নেতৃত্বে নানা জায়গায় বিপ্লবের কেন্দ্র গড়ে ওঠে।
বিপ্লবের প্রথম শহীদ মওলানা আহমদউল্লাহ ১৮৫৭ সালের জানুয়ারি মাদ্রাজের বক্তৃতায় বলেন : ‘দেশবাসী! বিদেশী শাসন উৎখাতের জন্য সংঘবদ্ধ হোন। ন্যায় পদদলিত। দেশ লুন্ঠিত। আযাদী ও ন্যায়ের জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়ুন।’
সমসাময়িক জেমস আউটরামসহ পরবর্তি অনেক বিশ্লেষকের মতে, মুসলমান বিপ্লবীরা ছিলেন ১৮৫৭ সালের জাতীয় বিপ্লবের মূল শক্তি। বাঙলায় ফরায়েজীও জিহাদ আন্দোলনের মিলিত প্রভাব বিস্তৃত ছিল। ইংরেজ ও তাদের সমর্থকরা এই দু’টি আন্দোলনকে ‘ওয়াহাবী’ বলে প্রচার করে। জাতীয় বিপ্লবকেও তারা সিপাহি বিদ্রোহ হিসবে দেখায়।
এই বিপ্লবের সময় দুদু মিয়াকে গ্রেফতার করে জেলে পোড়া হয়। কারণ তার আহ্বানে পঞ্চাশ হাজার লোক যেকোন সময় বিপ্লবে সাড়া দিতে প্রস্তুত বলে মনে করা হয়।
১৮৫৭-এর জাতীয় বিপ্লব নানা কারণে ব্যর্থ হয়। বৃটিশ রাজ-প্রতিনিধি লর্ড ক্যানিং তখন বিপ্লবের জন্য সরাসরি মুসলমানদেরকে দায়ি করেন। তিনি তার অনেক পূর্বসূরীর মতোই মুসলমানদেরকে ‘রাণীর বিদ্রোহী প্রজা’ চিণ্হিত করে বলেন: ‘রাণীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাই কি মুসলমানানদের ধর্মের বিধান?’
বিপ্লবের পর ব্যাপক গণনির্যাতন শুরু হয়। বিদ্রোহের শাস্তি হিসাবে বেহিসাব মানুষকে ফাঁসি দেয়া হয়। কারাবাস ও যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরে পাঠানো হয়। দ্বীপান্তরবাসীর সংখ্যা ছিল দশ হাজারের বেশি। আলেম ও মুসলিম যুবকগণকে শাস্তির মূল নিশানা বানানো হয়। আন্দামান-বন্দী মওলানা ফজলে হক খয়রাবাদী কাফনের কাপড়ে লেখা তার বিবরণীতে বলেছেন: ‘আযাদীর লড়াইয়ে শরিক হওয়া প্রমাণ হলেই কোন হিন্দুকে আটক করা হতো; কিন্তু পালাতে পারেননি এমন মুসলমান রেহাই পাননি।’
এই নির্যাতনের মধ্যেও বাংলাদেশে জিহাদ ও ফরায়েজী আন্দোলন জারী ছিল। ১৮৬৬ সালে জিহাদী বিপ্লবীদের উদ্যোগে দেওবন্দ মাদরাসা কায়েম হয়। দুদু মিয়ার ছেলে গাজীউদ্দীন হায়দার ১৮৬২ সাল পর্যন্ত এবং আবদুল গফুর ওরফে নয়া মিয়া ১৮৬৪ সাল থেকে ১৮৮৩ সাল পর্যন্ত ফরায়েজী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৮৬৪ থেকে ১৮৭১ সাল পর্যন্ত পরিচালিত বিভিন্ন মামলার নথি থেকে দেখা যায়, তখনো বাঙলায় তাদের আন্দোলন জারি ছিল। ১৯০১ সালের জনসংখ্যা জরিপে বগুড়ায় উপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে ফরায়েজীদের সক্রিয়তার তথ্য পাওয়া যায়।