ভূমিকা: মেহের উল্লাহর আবির্ভাবের পটভূমি

আঠারো শতকের দ্বিতীয় ভাগে ১৭৫৭ সালে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র, চালাকি ও বিশ্বাসভঙ্গের মধ্য দিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মুসলিম শাসনের অবসান ঘটায়। সুবাহ বাঙলায় দখল কায়েমের পর এখানে তাদের লুটপাট ও শোষণে জনগণের অবর্ণনীয় দুখদুর্ভোগ দেখেই এডামস্মীথ বলেছেন: ‘দুনিয়ায় যত প্রকার শাসন হতে পারে তার মধ্যে সবচে নিকৃষ্ট হলো বনিক শাসন।’
ইংরেজ কোম্পানির দুশাসনের বিরুদ্ধে ১৭৬৩ সালে জনবিদ্রোহের নিশান উড়ান ফকীর মজনু শাহ। বিদ্রোহ দমনের জন্য আঠারো শতকে উপনিবেশিকরা ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করে জনগণের জমির মালিকানা কেড়ে নিয়ে একশ্রেণীর নিকৃষ্ট লুটেরা দস্যুকে ভূমিস্বত্ব দিয়ে জনগণের পিঠের ওপর পিরামিডের মতো স্থায়ীভাবে চাপিয়ে দেয়। ইংরেজ ও তাদের এই জমিদারদের জুলুম শোষণের বিরুদ্ধে ১৮০০ সাল পর্যন্ত পরিচালিত ফকীর ও কৃষক বিদ্রোহগুলিকে বাংলাদেশের জনগণের উপনিবেশ বিরোধী মুক্তিসংগ্রামের প্রথম পর্যায় বলা যায়।
১৭৯৯ সালে মাইসূরে টীপু সুলতান ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামে শহীদ হন। ঘাতক ওয়েলেসলীকে জমিদাররা কলকাতায় সংবর্ধনা দেয়। অন্য দিকে বাঙলার আলেমগণ সে বছরই এই জুলমের রাজত্বকে ‘দারুল হারব’ বা যুদ্ধকবলিত ঘোষণা করে উপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
বাঙলার মুসলিম সমাজে উনিশ শতকের সূচনা হয় এ পরিস্থিতির মধ্যে।
নওয়াব আলীওয়ার্দী খানের গড়া হুগলী মাদ্রাসার ছাত্র ফরিদপুরের হাজী শরীয়ত উল্লাহ (১৭৮১-১৮৪০) সে বছরই তার শিক্ষক মওলানা বাশারাত আলীর সাথে মক্কায় হিজরত করেন।
আঠারো বছর মক্কায় আর দুই বছর মিসরের আল আযহারে পড়াশুনা করে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়ন এবং মুসলিম বিশ্বের অবস্থা সম্পর্কে বিশদ ধারণা নিয়ে বাংলাদেশের মুসলমানদের করনীয় বিষয়ে পরিকল্পনা তৈরি করেন।
তিনি ১৮১৮ সালে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফিরে কলকাতায় না গিয়ে ফরিদপুরের মাদারীপুর মহকুমায় নিজ গ্রাম শামায়েলকে কেন্দ্র করে ফরজ প্রতিষ্ঠা, শিরক-বিদাত-কুসংস্কার- জুলুম-শোষণ দূর করা এবং জনগণের আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধার ও তাওবার কর্মসূচী বাস্তবায়নে নামেন।
শরীয়ত উল্লাহর আন্দোলনের প্রায় সমকালে দিল্লীকেন্দ্রিক জিহাদ আন্দোলনের নেতা সাইয়েদ আহমদ বেরেলভীর (১৭৮৬-১৮৩১) খলিফা সৈয়দ নিসার আলী তিতুমীর (১৭৮২-১৮৩১) বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে প্রায় ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হন।
শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (১৭০৩-১৭৬২) ও তাঁর ছেলে শাহ আবদুল আযীযের (১৭৪৬-১৮৪৩) চিন্তার দ্বারা প্রভাবিত জিহাদ আন্দোলনের বাংলাদেশী অংশের একটি ধারার বহু কর্মী বেরেলভীর সাথে সীমান্ত অভিযানে অংশ নেনেন। অনেকে নিজ এলাকা থেকে নানা ধরনের সাহায্য পাঠান। ১৮২৫ সালে বেরেলভীর পাঁচ-ছয় হাজার সাথির মধ্যে প্রায় বিশ ভাগ ছিলেন বাঙালি মুজাহিদ। ১৮৩১ সালের ৬ মে বালাকোট যুদ্ধের শতাধিক শহীদের মধ্যে অন্তত নয়জন আর আহতদের অন্তত চল্লিশ জন ছিলেন বাঙলার।
বেরেলভীর খলিফা তিতুমীর সীমান্ত অভিযানে না গিয়ে নিজ এলাকায় বিরাণ হওয়া একটি মসজিদ কেন্দ্র করে কাজ করেন।
এই এলাকা নবাবী আমলের শেষ দিকে মারাঠা-বর্গীদের দ্বারা লুন্ঠিত হয় আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও তাদের জমিদার-নীলকরদের শোষণ- নিষ্পেষণে এখানকার জনগণ বিপর্যস্ত ছিলেন। বিশেষ করে বর্ণহিন্দু জমিদারদের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের অধীনে মুসলমানদের আত্মপরিচয় বিলীন হত চলেছিল। মুসলিম পরিচয়ে নাম রাখার জন্য জমিদারকে আলাদা কর দিয়ে অনুমতি নিতে হতো। দাড়ি রাখার জন্যও ট্যাক্স ধরা হয়। কাঁচা বা পাকা মসজিদ তৈরির জন্যও জমিদারকে মোটা অংকের নজরানা দিতো হতো। গরু জবাই বা কোরবানীর নিষিদ্ধ ছিল। নিষেধ না মানলে ডান হাত কেটে নেয়া হতো। তহবন্দ বা লুঙ্গীর-এর বদলে ধুতি, সালামের বদলে আদাব-নমস্কার, নামের আগে শ্রী চালু করে সাংস্কৃতিক জীবন পদানত করা হয়েছিল।
মুসলিম সমাজের এই সংকট মোকাবেলায় তিতুমীর দ্বীনি ও সামাজিক জীবন পুনর্গঠন, বিরান মসজিদগুলির সংস্কার, আযান ও নামাজ চালু সহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেন। নামে ও পোশাকে আত্মপরিচয় কায়েমে মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করেন।
তখনকার দিনের এই জরুরী সংস্কার ছাড়াও তিতুমীর ‘লাঙ্গল যার জমি তার’, ‘মেহনত যার ফসল তার’ আওয়াজ জোরদার করে কৃষক-মজুর মেহনতি মানুষকে সাহসি ও ঐক্যবদ্ধ করেন।
কলকাতার অদূরে বারাসাতের নারকেলবেড়িয়ায় তার আন্দোলনের বিরুদ্ধে জমিদার-মহাজন ও ইংরেজ নীলকররা এক হয়।
তাদের মিলিত হামলার মোকাবেলায় তিতুমীর নারকেলবাড়িয়ায় ‘বাঁশের কেল্লা’ গড়ে নদিয়া ও চব্বিশ পরগনার কতক এলাকায় জমিদারদের কর্তৃত্ব খতম করেন। ১৮৩১ সালের ১৯ নবেম্বর ইংরেজদের অশ্বারোহী, পদাতিক ও গোলন্দাজ বাহিনীর সাথে অসম যুদ্ধে তিতুমীর আর তার বহু সাথি শহীদ হন।
তিতুমীরেরের শাহাদাতের ফরায়েজী আন্দোলনের বয়স প্রায় চৌদ্দ বছর। এই সময় শরীয়তউল্লাহও মজলুমদের পক্ষে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের কর্মসূচী ঘোষণা করেন। তেইশ বছরে ফরায়েজী আন্দোলনের ভিত্তি শক্তিশালী করে দিয়ে শরীয়তউল্লাহ ১৮৪০ সালে ইনতেকাল করেন।
তার পর তার ছেলে মোহসিনউদ্দীন দুদুমিয়া (১৮১৮-১৮৬২) পূর্ব বাঙলার ব্যাপক অংশের জনগণকে ফরায়েজী আন্দোলনের পতাকার নিচে সংগঠিত করেন। সমাজ সংস্কারের পাশাপাশি তিনি জমিদার-মহাজন নীলকরদের জুলুম-নির্যাতনের প্রতিকারের আন্দোলন জোরদার করেন। তিনি চিরস্থায়ী জমিদারী বন্দোবস্ত বাতিল করে কৃষকদের জমির মালিকানা ফেরত দিতে বলেন।
তিতুমীরের শাহাদাতের পর জিহাদ আন্দোলনের পূর্ব ভারতীয় নেতা মওলানা ইনায়েত আলী (১৭৯৮-১৮৫৮) বাংলাদেশের গ্রাম এলাকায় শরীয়ত উল্লাহর ফরায়েজী আন্দোলনের পাশাপাশি জিহাদ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
শরীয়ত উল্লাহর ইনতেকালের পর ইনায়েত আলী ও দুদুমিয়াদের সময়ে ১৮৫৭ সালের জাতীয় বিপ্লব সংঘটিত হয়। ফরায়েজী আন্দোলনের নেতা দুদুমিয়ার আহ্বানে যে কোন সময় বাঙলার আশি হাজার লোক জাতীয় বিপ্লবে প্রত্যক্ষ ভূমিকায় নামতে পারেন, এই আশংকায় এ সময় দুদুমিয়াকে গ্রেফতার করা হয়।
১৮৫৭ সালের জাতীয় বিপ্লব মুসলমান ও হিন্দুদের মিলিত অংশগ্রহণে সর্বভারতীয় রূপ নেয়। শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ যাফর এই মহাজাগরণের সাথে যুক্ত হন। বৃটিশ উপনিবেশিক শাসন আর তাদের সহযোগী কলকাতা কেন্দ্রিক জমিদার-মহাজন শ্রেণীটি চরম আতঙ্কে পড়ে। হিন্দু-মুসলমান মিলিত জাতীয় গণ বিপ্লব ব্যর্থ করতে ইংরেজদের কামান-গোলা-বন্দুকের সাথে এই সহযোগী শ্রেণীটির প্রচারযন্ত্রসহ সকল শক্তি ও কৌশল এক সাথে কাজ করে। বিপ্লবকে ‘মুসলিম শাসন পুনরুদ্ধারের চেষ্টা বলে হিন্দুদের বোঝানো হয়। এই জনগণের এই বিপ্লবকে নিছক ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ বলেও সত্য আড়াল করা হয়।
১৮৫৭ সালের জাতীয় বিপ্লব চলাকালেই কোম্পানির কাছ থেকে বৃটিশ সরকার উপনিবেশের শাসন কর্তৃত্ব নিজের হাতে তুলে নেয়। নানা কূটকৌশল দিয়ে বিপ্লব ঠেকায়; কিন্তু ভবিষ্যতের জনঐক্য নিয়ে চরম আতঙ্কে পড়ে। আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ তখন নানা জায়গায় আর্থিক সংকট ও বাজার হারানোর আশংকা দেখছিল।
এমনি ভয়ভীতির মধ্যে তারা কৌশল হিসাবে শুধু মুসলমানদেরকে ‘রাণীর বিদ্রোহী প্রজা’ ঘোষণা করে হিন্দুদেরকে আলাদা করার চেষ্টা করে। মুসলিম আলেম ও যুবকদের নির্মূলের অভিযান শুরু করে। ফাঁসি, দ্বীপান্তর, জেল-জুলুম মুসলমানদের দিনলিপি হয়ে ওঠে।
জাতীয় বিপ্লবের পর কয়েকটি বড় ঘটনা পরবর্তি ইতিহাসকে গভীর ও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে:
এক: ইংরেজ ও তাদের সহযোগীরা হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের পথে বৈরিতার দেয়াল তুলতে হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ জন্ম দিয়ে মুসলমানদেরকে প্রতিপক্ষ দাঁড় করায়।
দুই: বৃটিশ রাজনৈতিক দখলদারিত্ব স্থায়ী করতে ১৮৫৭ সালের পর থেকে খৃস্টানদের সাংস্কৃতিক বিজয়ের জন্য পূর্ব বাঙলার মুসলমানদের মাঝে খৃস্টান মিশনারী ততপরতা ব্যাপক করা হয়। খৃস্টধর্ম প্রচারের নামে তারা ইসলাম, নবী ও কুরআনের বিরুদ্ধে বেপরোয়াভাবে কুতসা ও বিভ্রান্তি প্রচারে নামে।
তিন: মুসলমানদের একশ বছরের লাগাতার আপোসহীন প্রত্যক্ষ সংগ্রামের পথ থেকে বের করে এনে তাদেরকে ‘ভিতর থেকে সংস্কার’-এর পথে পরিচালত হতে তখনকার মওলানা কেরামত আলী জৌনপুরীর (ইনতেকাল ১৮৭৩) সমর্থন নিয়ে একটি নতুন নেতৃত্বের ইদ্ভব ঘটে। সৈয়দ আহমদ খান (১৮১৭-৯৮),, নওয়াব আবদুল লতীফ (১৮২৮-৯৩) ও সৈয়দ আমীর আলী (১৮৪৯-১৯২৮) এই আন্দোলনে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন।
এমনি এক পটভূমিতে বিশাল গ্রাম-বাঙলায় জমিদার-মহাজনদের শোষন-লুণ্ঠন-সন্ত্রাস এবং খৃস্টান মিশনারীদের ব্যাপক ততপরতার মুখে নেতৃত্বহীন দিশাহারা কৃষক-মজদুর-তাঁতী-কলুদের বিপর্যস্ত সমাজে মুনশী মোহাম্মদ মেহের উল্লাহ (১৮৬১-১৯০৭) যশোরের প্রাচীন জনপদ বারোবাজারের কাছে ফরায়েজী নেতা দুদু মিয়ার ইনতেকালের এক বছর আগে ১৮৬১ সালের ২৬ ডিসেম্বর সোমবার জন্মগ্রহন করেন।
১৮৫৭ সালের জাতীয় বিপ্লব পরবর্তি মুসলিম সমাজের ঘোর দুর্যোগ মোকাবেলায় তিনি তার জীবনের সর্বস্ব কোরবানী করেন এবং মুসলিম জাগরণে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখেন। তাদের সেই উপনিবেশিক শাসনের শেষ ভাগে ১৮৭০ থেকে ১৯০৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মুসলমানদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পাটাতন নতুনভাবে তৈরি হতে শুরু করে। তখনকার এই বিশেষ মোড় পরিবর্তনে সমাজগতপ্রাণ মনীষী মুনশী মোহাম্মদ মেহেরউল্লাহর অবদান অগ্রগণ্য।
১৯০৫ সালে ঢাকা কেন্দ্রিক পূর্ব বাঙলা ও আসাম প্রদেশ গঠন এবং কলকাতার বিরোধিতার মুখে সেই প্রদেশ রক্ষার কর্মসূচীর অংশ হিসাবে ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগ কায়েম হয়। বাংলাদেশে মুসলিম জাগরণের সেই ঊষাকালে মুনশী মোহাম্মদ মেহের উল্লাহ ১৯০৭ সালের ৭ জুন শুক্রবার ইনতেকাল করেন।

(চলবে)