জীবন-জীবিকার চাকা সচল রাখতে এবং আধুনিকতার পূর্ণ ছোঁয়া অবগাহনের নিমিত্তে দেশের বৃহদাংশ নগরজীবনে তিতু হচ্ছে। কিন্তু ইট-পাথরের শহরে কত কিছুই না ঘটে, যার সিংহভাগই অগোচরে রয়ে যায় আমাদের। শহর-জীবনের উপাখ্যানে এমন কতক গল্প অসামান্য দক্ষতায় লিখেছেন লেখক মোহাম্মদ অংকন। ‘এই শহরের দিনরাত্রি’ তাঁর শহর সিরিজের তৃতীয় বই। বরাবরের মতোই যেন পাঠকের প্রত্যাশা পূরণে সার্থক তিনি।

গলির চা বিক্রেতা থেকে শুরু করে কর্পোরেট অফিসের বস, প্রাকৃতিক দুর্যোগে নাজেহাল হয়ে মাথা গোজার তীব্র চেষ্টা, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রাণপণ প্রচেষ্টা, জঠরজ্বালা নিবারণের উপায় হিসেবে শরীরের মায়া ত্যাগ করা, বুকভরা স্বপ্ন পূরণে মজবুত চেহারার যুবকের শহরের বুকে পা রাখা এবং কুসঙ্গের পাল্লায় পড়ে সবশেষ ভগ্নহৃদয়ে উন্মাদের মতো দিনাতিপাত করা, এমন সব বিচিত্র কিছিমের ১২টি অসাধারণ গল্পর সমাহারে পরিপূর্ণ ‘এই শহরের দিনরাত্রি’।

প্রতিটি গল্পই যেন প্রতিনিয়তই নতুন মোড়কে জন্ম নিচ্ছে জাদুর শহরে। এই যেমন ‘লাগেজ’ গল্পের ছাব্বু চরিত্র, রাত-বিরাত পরিশ্রম করে গেলেও মন ভরে না গৃহকর্তীর। উল্টো সন্দেহের উদ্রেক হয় ছাব্বুর চালচলন নিয়ে। তবুও নীরবে সব সয়ে যায় সে। জঞ্জালমুক্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করে বেঁচে থাকার যে আশা অমল দা’র, সে আশা গুড়েবালিতে রূপ নেয় মোহন ভাইদের চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্যে। বুকফাটা কষ্ট বুকে চেপে কাঠফাটা রোদেও মানুষের দুয়ারে দুয়ারে সংবাদ বিলিয়ে যে অমল দা’র জীবন চলে শেষ বয়সে সে পথও ঘোর অন্ধকারে আচ্ছাদিত।

‘মানুষপঁচা গন্ধ’ শিরোনামের গল্পটা আপনাকে ভাবনার বিশাল রাজ্যে অবাধ বিচরণের অপার সুযোগ করে দেবে। নীলার এমন বীভৎস কাণ্ডের কোনো জবাব খুঁজে পায় না একই ফ্লাটে থাকা রেজা। কেনই-বা নীলা এমন গর্হিত কাজের দিকে পা বাড়ালো? নেপথ্যে প্রভাবকের ভূমিকায় কি আমাদের সমাজ? ‘অপরাধমোচন’ গল্পটা থেকে উপলব্ধির আছে বহু বিষয়। মন-মগজে স্ফটিকস্বচ্ছতা রাখা যে জরুরি তারই জানান দেয় গল্পটি। নগরজীবনে প্রেম-ভালোবাসাও যে সমান্তরালে চলে তারও যথেষ্ট ছাপ বিদ্যমান এ গল্পে। পবিত্র ভালোবাসার কাছে পরশ্রীকাতরতা কিংবা হিংসা সবই যে তুচ্ছ ‘পুরুষ কিংবা পাগল’ গল্প তারই কথা বলে। পৌলমি-সৌরভের একপেশে ভালোবাসা সৌরভ ছড়াতে ব্যর্থ হওয়ায় শেষমেষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়ার হুমকি প্রেমিকের। তবুও মন গলে না প্রেমিকা পৌলমির। শহরে যেন প্রকৃত ভালোবাসা মূল্যহীন।

‘অস্তিত্বের লড়াই’ আর ‘বিসর্জন’ গল্পদ্বয় মনে গভীর রেখাপাত করে। স্বামীর বেকারত্ব, খিটখিটে মেজাজ আর কুঁড়েমির কারণে আলোমতির হাফ ছেড়ে বাঁচার ফুরসত মেলে না। অধিকন্তু, কপালে জোটে সতীন বিড়ম্বনা। একরত্তি সুখের আশায় রাহিমাদের হণ্যে হয়ে ঘুরে বেড়ানোর অবসান ঘটে বড়ো সাহেবের সহায়তায়। কিন্তু ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ্বের বলি হয়ে নিজের সুবিশাল জমিতেই চিরশয়নে যেতে হবে জসিম ওয়াজেদের? এদিকে রাহিমা ভণিতার আশ্রয় নিয়ে মাজার গড়ে তুলবে অন্যের জমিতে? ভাবা যায়!

শহর-জীবনের ছোঁয়ায় সবই যে বদলে যায় তারই প্রমাণ মেলে শেষ গল্পদ্বয়ে। শহুরে রিকশাচালকও যে প্রতারণার বিস্তৃত জাল বুনতে পারে নিপুণ দক্ষতায় তা জানা ছিল না ভদ্র গোছের গ্রামীণ ছেলেটার। ‘পতিতা-জীবন’ গল্পটিতে ফুটে উঠেছে তাদের করুণাবস্থা। শেষ গল্পটা খুবই করুণ মনে হয়েছে। অপবিত্র প্রেমের সাগরে ডুব দিয়ে খাল কেটে কুমির ডেকে এনেছে তানজিদ নিজেই। তানজিদ ইরানির মতো প্রেম কাহিনির জয়জয়কার গোটা শহরজুড়েই। কিন্তু শেষতক ইরানি যখন ছেড়ে চলে যায়, তানজিদ তখন যন্ত্রণায় কুড়ে কুড়ে মরে, ধুক-ধুক বুকে ভাবতে থাকে কেনই-বা হাত ধরে ছিলাম ওর? নিরুত্তর তানজিদ উন্মাদ হয়ে যায়। আর এভাবেই হৃদয়ের স্বপ্নবৃক্ষ থেকে সকল পাতা ঝরে পড়ে ‘ইরানি’র ঝড়ে। বইটিতে কোনো দুর্বোধ্যতা নেই। সাবলীল ভাষায় মলাটবন্দী হয়েছে প্রতিটি গল্পই যা পাঠকের মনের ভেতরের জগতে আলোড়ন তুলতে সক্ষম।

এই শহরের দিনরাত্রি : মোহাম্মদ অংকন
প্রকাশনায় : বিসর্গ প্রকাশনী
প্রচ্ছদ : আল নোমান
প্রথম প্রকাশ : অমর একুশে বইমেলা-২০২১
মূল্য : ২০০ টাকা