খ্যাতির শীর্ষে আহমদ সাহেব। চারিদেকে তাকে এক নামে সবাই জানে। ইউটিউবের বদৌলতে তিনি এখন দেশবাসীর নিকট পরিচিত। দানবীর আহমদ সাহেব। দয়ার শরীর,গরীবের বন্ধু, বিপদের সহায়, অসহায়ের অবলম্বন। লোকে ডাকতো ছোট বেলায় আম্মাদ আলী। চার ক্লাস পর্যন্ত পড়েছেন কিন্তু সনদপত্র পাননি। শেষ পরীক্ষা না দিয়ে পাড়ার বন্ধুদের সাথে লুকিয়ে ট্রেনে চড়ে দুরে এক রিসোর্টে গিয়েছিলেন সুইমিং পুলে গোসল করতে। এখন পাবলিক প্লেসে সেসব কথা অকপটে স্বীকার করেন এবং এজন্য গর্বও করেন। এখন তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক। রমরমা ব্যবসা, ঠিকাদারী পেশা এখন তার একচেটিয়া। কি নাই তার এখন সেটাই বলা কঠিন। আলিশান দশতলা বাড়ি ভিতর বাইরে দামি টাইলস লাগানো তাকালে চোখ ধাঁ ধাঁ করে। আইএ ও বিএ পাশ বেকার যুবকদের তিনি বলেন তোমরা লেখা পড়া শিখে কি হয়েছো আর আমাকে দেখ মাত্র চার ক্লাস পর্যন্ত পড়ে কত কি করেছি। এখন আমি দান খয়রাত করে মানুষের সেবা করে সহজেই বেহেশত খরিদ করতে পারব। আমি একদিনে যত দানখয়রাত করি হাজি মোহাম্মাদ মুহসিনও এতটাকা একদিনে দান করেন নি। আহমদ আলীর বাড়ির পাশে রেল ষ্টেশন। শত শত বিঘা জমি ব্রিটিশরা হুকুম দখল করে নিয়েছিল রেলের উন্নয়ন কল্পে। ব্রিটিশরা বিদায়ের পর পাকিস্তানিরা সেই জমি কোনো কাজে লাগায় নি। স্বাধীনতার পর সেই সব জামি হয় ছাগল চড়ানোর মাঠ, নয়তো জলাশয়ে রূপান্তরিত হয়ে ব্যাঙের প্রজনন প্রকল্পে পরিণত হয়েছিল। আহমদ আলী ভাবলেন এসব জমি এভাবে পরে থাকলে কোনো উন্নয়ন হবে না। তাই নিকটস্ত রেল অফিসে যোগাযোগ করে সাথে দুই একজন পার্টনার নিয়ে জমিগুলি লীজ নেয় এবং সেখানে শত শত ঘর তুলে উচ্চমূল্যে দোকানঘর হিসেবে বিক্রি করে। যতটাকা বিনিয়োগ করেছিলেন, দোকানঘর হিসেবে বিক্রি করলেন তার দশগুন লাভ করেন। সেটেলমেন্ট অফিসের লোকজনের সাথে যোগসাজস করে অসংখ্য জমি জোর পূর্বক দখল করে বিক্রির ব্যবসা করে প্রচুর টাকা কামাই করেছেন। সরকারের রেলমন্ত্রির সাথে তার ভাল সম্পর্ক। বিভিন্ন উপলক্ষ্যে মেলা বসিয়ে সেখানে জুয়ার মাধ্যমে অজ¯্র টাকা কামাই করেন প্রতিবছর। থানা পুলিশ তার ব্যাপারে বেশ উদার। পুলিশ প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করে থাকে এজন্য যে, সেখান থেকে কিছু টাকা তো তাদের পকেটে যায়। তিনি প্রকাশ্যে গর্ব করে বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রি আমাকে খুব ¯েœহ করেন। তার সবচেয়ে লাভজনক পেশা হলো ঠিকাদারি ব্যবসা। শহরে এবং শহরের বাইরে সরকারি ঠিকাদারি কাজে তার একচেটিয়া আধিপত্ত্ব। স্থানীয় সরকার,স্বাস্থ্য,খাদ্য এবং সড়ক ও জনপদের কাজে তার জুরি মেলা ভার। টেন্ডার যার নামে উঠুক না কেন কাজ আহম্মদ আলী করবে। সকল অফিসের অফিসারগণ তার এত প্রিয় এবং তিনি এত বড় প্রভাবশালী যে তার কাজে কোন অফিসারই প্রশ্ন তুলবেন না। এহেন ছাড় পত্র পাওয়ার কারনে তার দ্বারা নির্মিত রাস্তা বছর না ঘুরতে চটা উঠতে শুরু করে। এ নিয়ে যে যত কথাই বলুক আর সাংবাদিক যে নিউজ করুক তাতে আহম্মদ আলীর কিছুই হয় না। ব্যাংকে তার শত শত কোটি টাকা। রোডে তার কয়েকটি বাস ও ট্রাক চলাচল করে। সে সুবাদে তিনি আবার ট্রাক মালিক সমিতি ও বাস মালিক সমিতির সভাপতিও বটে। ইদানিং আহম্মদ সাহেব বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হয়ে সকলকে চমক লাগিয়ে দিচ্ছেন। প্রতিদিন টারমিনাল থেকে টাকার ব্যাগ আসে গভীর রাতে। মন্ত্রনালয় থেকে রুটলেবেল পর্যন্ত তাকে সকলেই সমীহ করে চলেন। যেকোনো উপলক্ষ্যে মেলা বা প্রদর্শনী এখন বাঙ্গালীর নিত্যদিনের কর্মঘন্ট। বিশেষ করে শহর এলাকায় উন্নয়ন মেলা এখন প্রশাসনের রুটিন কাজ। এসব মেলা বা প্রদর্শনী চলে একমাস বা অর্ধমাস ধরে। মেলার যাবতীয় কাজের দায়িত্ব, সরঞ্জাম সরবরাহের দায়িত্ব আহম্মদ সাহেবের। প্রশাসনও তার সার্ভিসে খুব খুশি। বিনিময়ে অলিখিতভাবে আহম্মদ সাহেব জুয়ার আসর বসাবে। এই জুয়ার আসরে প্রশাসন থেকে শুরু করে সর্বস্তরের জনগন অংশগ্রহন করে কেউ ফকির হয়ে, কেউ রাজা হয়ে বাড়ি ফিরে। প্রশাসন এই জুয়ার কথা জানতেই পারে না। সাংবাদিকগন প্রতিদিন এসে তাদের মাশোহারা নিয়ে যাবে। যারা মাশোহারা নেয় না তাদের পক্ষে মিডিয়ায় প্রচার করার মত বুকের পাটা আর থাকে না। কারণ এখানে প্রশাসনযন্ত্র জড়িত। মেলা শেষ হলেও জুয়ার আসর শেষ হতে আরও একমাস বা দুইমাস লাগে। সবশেষে টাকা ভাগ করে যার যার অংশ দিতে আহম্মদ সাহেব ভুল করেন না। ভারত থেকে চোরাই পথে যে অবৈধ মাল দেশে প্রবেশ করে তার উপর একটা ভাগ আহম্মদ সাহেবের উপর থাকে। এভাবে মোটা অংকের টাকা তার আত্মীয় স্বজনের মাধ্যমে দাদন ব্যবসায় লাগায়। এতে প্রচুর সুদের টাকা আসে তার একাউন্টে। মোটকথা টাকা আয়ের এমন কোনো পন্থা নাই যা আহম্মদ সাহেব ব্যবহার করেন না। আধুনিক কলা সাহিত্যের ভাষায় আহম্মদ সাহেব একজন মস্তবড় ডাকাত।
এবার আসি তার দেশের নাগরিকদের প্রতি তার দায়িত্ববোধের কথায়। তিনি খুব হৃদয়বান ব্যক্তি বলে খ্যাতি আছে এলাকায়। তিনি দুখীর দুখ এবং অসহায়ের কষ্ট ভাল বুঝেন। খুধার্তের খুধা তিনি সহ্য করতে পারেন না। তাই প্রতিদিন তিনি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চাল রান্না করে ভাত বিতরণ করে থাকেন। শত শত ভুখা খুধার্ত মানুষ এসে সে খাবার খেয়ে যায়। এলাকার গরীব ছেলে মেয়েদের পড়াশোনার খরচ তিনি বহন করেন। বই-পুস্তক, ব্যাগ, জুতা, পোষাক, খাতা, পেন্সিল ইত্যাদি কিনে দেন। খাতা ও ব্যাগে তার প্রচার মূলক মনোগ্রাম তিনি দিতে ভুল করেন নি। শহরের যেসব স্কুলে বেতন বেশি এবং অভিভাবকের কষ্ট হয় ছেলে মেয়েদের খরচ বহন করতে, সে সব স্কুলে তিনি নিজেই গিয়ে হাজির হন। প্রধান শিক্ষক ও কমিটির সঙ্গে বার্গেনিং করে তার সুপারিশ করা শিক্ষার্থীর জন্য বেতন ও স্কুলের খরচ কম নেয়ার জন্য চাপ প্রদান করে থাকেন। এলাকার গরীব ছেলেমেয়েদের জন্য শীতকালে গরম পোশাক কিনে দেন। বিস্কুট, চিরা, মুড়ি, চানাচুর, চাল, ডাল তো আছেই। এসব তিনি নিয়মিত বিতরণ করে থাকেন। মাদ্রাসা ও মসজিদে তিনি উদার হস্তে দান করেন। হঠাৎ করে দেখা যাবে স্কুলের ছেলেমেয়েদের টিফিনের সময় তিনি ব্যাগহাতে হাজির। টিফিন বিতরণ করবেন নিজ হাতে। শিক্ষার্থীরা টিফিন পেয়ে খুব খুশি। এলাকার ওয়াজ মাহফিলে তিনি মোটা অংকের চাাঁদা দেন। তার জন্য সময় বরাদ্দ থাকে, তিনি গর্বকরে বলেন আমি আল্লাহর ওয়াস্তে টাকা খরব করি আল্লাহর বান্দাদের জন্য। এলাকার এমন কোন মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ নাই যেখানে আমি অধম ডোনেট করিনাই। আপনারা দোয়া করবেন আমি যেন আরও বেশি বেশি দান খয়রাত করে কবরে যেতে পারি। ওয়াজ মাহফিলে তিনি যুবকদের সৎ হয়ে চলার, নিয়মিত ধর্ম কর্ম করার উপদেশ দান করেন এবং মহিলাদের সম্মানের সাথে চলার উপদেশ দান করেন। তবে তিনি বোরকা নামক পর্দার ঘোর বিরোধী। তার বক্তব্য হল মহিলারা বোরকার মত অবরোধ পরলে কর্ম করবে কেমন করে? প্রতিদিন আমার বিভিন্ন কাজে শত শত মাহিলা কাজ করে তারা যদি বোরকা পরে তাহলে কাজ করবে কেমন করে? নিকটস্ত হাসপাতালে খোজ খবর রাখেন। গরীব রোগীর চিকিৎসায় তিনি অকাতরে টাকা খরচ করেন। তিনি স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীর অতিরিক্ত টিউশন ফির তীব্র বিরোধী। এমন কি তার বক্তব্য হল ৪ থেকে ৫ মিনিট রোগী দেখে একজন ডাক্তার কেন ১০০০টাকা ফি নিবেন? তিনি স্কুল কলেজে গিয়ে প্রতিষ্ঠান প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফি মওকুফ অথবা কিছু কমিয়ে নেন। এতে এলাকায় তার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। বিভিন্ন দিবস উপলক্ষ্যে রাস্তা বন্ধ করে কনসার্টের আয়োজন করে যুবক যুবতীদের মাতোয়ারা করে দিবেন। নির্বাচন করার তার খুব শখ। তার বক্তব্য হল আমি নির্বাচিত হলে এলাকার গরীব লোকদের এনজিওর সাপ্তাহীক কিস্তি দিয়ে দিব যেন তাদের আর কিস্তি নিয়ে সংসার চালাতে না হয়। গরীব দুখীর ঘরে ঘরে বাজার পৌছে দিব, বিভিন্ন পর্বনে গরীবের ঘরে ঘরে খাদ্য দ্রব্য ও প্রয়োজনীয় উপকরন নিজ দায়িত্বে পৌছে দিব। মোট কথা নির্বাচিত হলে তার এলাকায় ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর(রা) এর শাসন চালু করব। এলাকায় থানা থাকবে তবে পুলিশ থাকবে থানার ভিতরে। সকল প্রকার অপরাধ মূলক কর্মকান্ড বন্ধ করে দিবেন। বেকার যুবকের জন্য কর্মের ব্যবস্থা করবেন যেন বেকার জীবনের ঘানি টানতে না হয়। তার বক্তব্য হল সরকারি বহু খাস জায়গা পড়ে আছে সেগুলিতে ইন্ডাষ্ট্রি, মার্কেট করে দিলে বেকার যুবকেরা কর্ম করে খেতে পারবে। এজন্য সরকারি খাস জমি তিনি লিজ নিয়ে সেখানে ইন্ডাষ্ট্রি গড়ার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ করে কাগজ পত্র তৈরি করে নিয়ে সেখানে নামে মাত্র ইন্ডাষ্ট্রি প্রতিষ্ঠা করে সর্বাধিক জায়গা প্লট করে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা কামাই করেছেন। এ কাজে সহগোগিতা নিয়েছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের। তাদেরও তিনি কিছু সুবিধা দিয়েছেন। এসব জনহিতকর কাজ আহম্মেদ আলী কেন করে থাকেন? সে প্রশ্নের জবাব তিনি একদিন এক জনসভায় নিজেই দিলেন। বললেন,‘ আমি আগামী নির্বাচনে প্রধান মন্ত্রি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাই যদি আপনারা আমাকে ভোট দেন তাহলে হ্যাঁ বলে হাত উঁচু করে জবাব দিন। সকলেই হাত উঁচুকরে হ্যা জবাব দিল। আসলে চার ক্লাস পর্যন্ত পড়ার কারনে এমপি পদটিকে প্রধান মন্ত্রি পদ বলে ঠাওর করেছেন।