এ কী অবস্থা জনজীবনের! প্রাণের একটুও নিশ্চয়তা নেই? একের পর এক মানুষ খুন হচ্ছে, গুম হচ্ছে। এরই মাঝে চলছে আত্মহত্যা। জীবনের মূল্য আজ কতটুকু? কেও বলতে পারবে না। কারো মাথা ব্যথাইই নেই এ নিয়ে। ভাবখানা এমন “জীবন তো জীবনই এর আবার মূল্য কী? “
হ্যাঁ, জীবন জীবনই। এটি অমূল্য। এর কোনো মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। যাবে ও না কোনোদিন। মানুষ মরনশীল এটি ও ঠিক। সৃষ্টিকর্তাই সবার আয়ু নির্ধারন করে দিয়েছেন। হিসেবের খাতায়ও তাঁর হাতে।

তাই বলে কী সাবিহা আজ এ নির্মম মৃত্যুটাকে গ্রহণ করবে সাবলীলভাবে? নাকি জবাব চাইবে, এ মৃত্যুর জন্য দায়ী কে?

না, কোনো উত্তর নেই। এ মৃত্যুর জন্য আজ যারা দায়ী তারা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। এর দায়ভার বহন করার কেও নেই। এটি কেবল ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। যা, সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টি লগ্নেই নির্ধারণ করে রেখেছেন। এটুকু সান্ত্বনা ছাড়া আর কোনো ভাষা নেই আজ।

কত আর বয়স সাবিহার? বাইশ কি চব্বিশ? খেঁটে খাওয়া পরিবারের স্ত্রী। শ্বশুর, স্বামী আর সন্তান নিয়ে সুখের সংসার। পরিশ্রমী মেয়ে সাবিহা। কারো প্রতি কোনো অভিযোগ নেই। পলি মাটির ঘরটি সবসময় চকচক করে। একেবারে ওর মনের মতো। পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে সাবিহা একটু খুঁতখুঁতে। সবকিছু হওয়া চাই পারফেক্ট। মনের মাধুরী মিশিয়ে কখনও মাটির ঘরের দেয়ালে রঙ দিয়ে আঁকে নানান নকশা। প্রকৃতি যেন একেবারে জীবন্ত হয়ে ওঠে ওর হাতে।

স্বামী শহীদুল ও বেশ ভালো মানুষ। লাখ খানেক টাকা পুঁজি নিয়ে পানের ব্যবসায় নেমেছে। এরই মাঝে ঘর আলো করে এ সংসারে এসেছে একটি পুত্র সন্তান। নায়ক শাকিব খানকে শহীদুল খুব পছন্দ করে। সময় পেলে হলে গিয়ে সিনেমা দেখে। আর এ জন্যই প্রথম সন্তানের নাম রাখে শাকিব খান।

সেই শাকিব খান এখন পাঁচ বছরের। সাবিহা আবারো অন্তঃসত্ত্বা। আনন্দেই কেটে যাচ্ছিল ওদের স্বচ্ছলতার দিনগুলো। কিন্তু হঠাত করে মাথায় পড়লো বজ্রপাত। ছেয়ে গেল জীবনের আকাশ কালো মেঘে।

শহীদুল সেইদিন মাল আনার জন্য অন্য ব্যবসায়ীদের সাথে ট্রাকে করে রওয়ানা দেয়। ট্রাক যখন ছাড়ে তখন স্ত্রী সাবিহার সাথে মোবাইলজেও ফোনে কথা বলে। আর বলে, “চিন্তার কিছু নাই, আগামীকাল ভোর ছয়টার মইধ্যেই ফিরা আসবানে। “

টিনের ছাউনি ঘেরা মাটির ঘরে বসে সাবিহা আল্লাহকে ডাকতে থাকে। সবকিছু যেন ঠিকঠাক থাকে। অসময়ে কাক ডাকছে, সাবিহার ভেতরটা কেমন যেন ধড়্ফড়্ করছে। কোন অশনিসংকেত ওর জন্য অপেক্ষা করছে তা আল্লাহই জানেন। সাবিহা নামাজ শেষ করে কোরআন পাঠ করছে। দেশের পরিস্থিতি বর্তমানে খুবই খারাপ। সাবিহা জানে। তারপরও জীবনের জন্যইতো চলতে হবে। কতদিন ঘরে বসে থাকবে শহীদুল? জানে যে কোনো সময় যে কোনো দূর্ঘটনায় পড়তে পারে। মানুষের মৃত্যু আজ তো কোনো ঘটনা না। চলমান অবরোধ – হরতালের সহিংসতায় দেশ আজ জিম্মি।

সব মিলিয়ে আজ সবার অনিশ্চিত ভবিষ্যত। সাবিহা প্রার্থনা করে ওর স্বামী যেন ভালোভাবে ভোরে ফিরে আসে।

সাবিহার স্বামী কথা রেখেছিল। পরেরদিনই ফিরে এসেছিল। তবে ভোরে নয় একটু বেলা করে।
শহীদুল সেইদিন ফিরে এসেছিল ওর বাড়িতে। একা নয়, পায়ে হেঁটেও নয়। এসেছিল অন্যের কাঁধে চড়ে লাশ হয়ে।

রাতে গন্তব্যে যাওয়ার পথেই রাস্তায় গন্ডগোল শুরু হয়। একটি পেট্রোল বোমা ওদের ট্রাকে কে বা কারা ছুঁড়ে দেয়। আর সাথে সাথে আটটি তাজা প্রাণ. ঝলসে যায়। হাসপাতালে নেয়ার সুযোগ হয়নি। কয়েক মিনিটের মধ্যে দগ্ধ প্রাণীগুলো নিষ্প্রাণ হয়ে যায়।

সাবিহা বেগম পেল নতুন পরিচয়। সাবিহা বেগম এখন সাবিহা বেওয়া। গ্রামে এটিই প্রচলিত। এই বয়সে বৈধব্য বেশ ধারণ করতে হলো। পাঁচ বছরের শাকিব কিছু বুঝতে পারলো কিনা কে জানে? ও যে হলো পিতৃহারা। আর অনাগত যে সন্তানটি আসছে, ওর কি হবে?

দিনমজুরে শ্বশুর কতটুকুই বা স্বচ্ছলতা দিতে পারবে ওদের? কান্নামিশ্রিত বুড়ো মানুষটি শুধু একই কথা বলে যাচ্ছেন, “পোয়াতি বউ থুইয়া হামার জুয়ান ব্যাটা মইরা গেল। অরকোর দেকার কেও নাই। “

সাবিহা হয়ে গেছে ভাষাহীন। ধূধূ করা চোখ যেন মরুভূমি। স্তব্ধ হয়ে গেছে সে। কি করবে এখন? জীবনের চলার পথ যে এখনও ঢের বাকি। এ ভঙ্গুর পথ একাকী কীভাবে পাড়ি দিবে? গ্রামের সবাই ভীড় করেছে সাবিহার ঝকঝকে মাটি দিয়ে লেপা উঠানে। গতকালই নতুন করে লেপেছে। আর মাঝখানে খাটিয়াতে শুয়ে আছে শহীদুল। এরই মাঝে সাংবাদিকদের আসা শুরু হয়েছে। ছবি তুলছে, কথা বলছে ছেলের সাথে, বুড়ো বাবার সাথে। নির্বাক সাবিহা তাকিয়ে দেখছে সবকিছু। চোখে ঝাপসা দেখছে। গ্রামের সব বয়সের মহিলারা ওকে ঘিরে আফসোস. করছে, কান্নাকাটি করছে। অগ্নিদগ্ধ শহীদুলের অসাড় দেহটিই শুধু কথা বলছে না। সাবিহা যেন শহীদুলের কন্ঠস্বরের অপেক্ষায় আছে। এই এখনি বলে উঠবে …
“বউ খাওন দে, ক্ষিদা লাগছে। “এই বলে গামছাটা ওর হাতে দিবে।

কিন্তু শহীদুল তো কথা আর বলবে না।
জীবন যুদ্ধে আজ সাবিহা পরাজিত।সাবিহারা অগ্নিদগ্ধ হয় বারবার। দীর্ঘশ্বাস আর নিভৃত অশ্রুধারা ছাড়া আর কোনোই সম্বল নেই। কত তুচ্ছ মানুষের জীবন! সরকার থেকে হয়তো কিছু অনুদান পাওয়া যাবে কিন্তু এতেই কি সব সমাধান হয়ে যাবে? সাবিহা কি ফিরে পাবে সেই কন্ঠ ….
“বউ খাওন দে ক্ষিদা লাগছে। “

(সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা এটি)