একটি চেয়ারের গল্প
হাসান আলীম

প্রকাশক :
মো. ইকবাল হোসাইন
ইনভেলাপ পাবলিকেশন্স
ফোন : ০১৬৮৬৮৫০২৬৬

স্বত্ব : লেখক
প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ২০১৯
প্রচ্ছদ : সাইফ আলি
মুদ্রণ : হক প্রিন্টার্স, ফকিরাপুল, ঢাকা
মূল্য : ১২০ টাকা মাত্র

উ ৎ স র্গ :
মুহাম্মদ আবদুল হান্নান

মিন্টু রহমান
…………………………………………..

সূচিপত্র

খাটমল
গো-জীবন
শুয়োরের দল
কাহাফের কুকুর
মা-মাকড়শা
মাছিরা বোঝে
কাক
পিঁপড়েরা
মাছির স্বভাব
ল্যাংড়া মশার জন্য প্রার্থনা
শহীদ মিনার দেখে দেখে
ভোরের সূর্যের কথা
আনন্দ গোছল
হালখাতা
হিসেব নিকেশ
ঈদের ল্যান্ডস্কেপ
পতাকা দোলাও
একটি চেয়ারের গল্প
ফেরেস্তার গল্প
সিয়ামের সৌরভ
শুভ নববর্ষ
কাজী নজরুল ইসলাম
জাতির পিতা
বনমোরগের মত লাল চাঁদ
নাত-এ রসূল
বিপদজনক খেলা
সেলাই মেশিনের গল্প
নাফ নদীর ওপারে
চাঁদ রাত
ব্যজস্তুতি
খন্ড কবিতা
লোহার বেলুন
পৃথিবীর গল্প
রুমালের কথা
…………………………………………..
…………………………………………..

খাটমল

ছারপোকায় ভরে গেছে বিছানা বালিশ
লেপতোষক, সোফার গদি,
টেবিল চেয়ার, খাটপালঙ্ক, চৌকির কোনাকানছি।
চেয়ারে বসে পড়ার সুযোগ নেই
কামড়ে পশ্চাতদেশ লাল করে দেয়,
যেন নামতা ক্লাসের প-িত স্যারের
শপাংশপাং বেত্রাঘাত।

না, আমি কোন আঘাত খাইনি কোন স্যারের
কিংবা অন্য কোন মানবীর।
জোকের মতো দেহের লোহিত কণিকা শুষে
খাচ্ছে শুয়োরের দল;
ধরতে গেলে মারতে গেলে নিমিষে পালিয়ে যায়
খাটের চিপায়, ছেঁড়া তোষকের গভীর অরণ্যে,
খানাখন্দকে লুকিয়ে পড়ে
পতিতা পল্লীর যৌন শিল্পীবৃন্দ!

হে প্রভু, এখন কি করার আছে!
দারুণ বিরক্ত করছে ওরা আমাকে
সৃষ্টির বৃষ্টিতে ঝরছে অম্লরোদ।
শুধু কি আমার ঘরে?
স্ত্রীর চুলেও ঢুকে পড়েছে দুর্বৃত্ত খাটমল,
ঘরে ঘরে বিপণী বিতানে, সিনেমা হলে প্রার্থনা গৃহে
সর্বত্র দুর্দান্ত উড়শ পোকার অপ্রতিরোধ্য রাজত্ব।

কুনুতে নাজেলা পড়ে কতটুকু নিস্তার পাওয়া যাবে
পাপিষ্ঠ ওষ্ঠের উচ্চারণে?
বরং ডি.ডি.টি পাউডার দারকার।
গো-জীবন

ও পাড়ার প্রজনন কেন্দ্রের দুর্দান্ত ষাঁড়টি
ওংকার শব্দে জানান দিচ্ছে যৌবন শক্তির দুরন্ত দাপট,
দলে দলে গাভীরা গভীর আদরে পোয়াতি হচ্ছে;
ষাঁড়টি দারুণ সুখে আছে—
বিয়ে নেই শাদী নেই, নেই জাতপাত
অথবা আপন-পর,
সানন্দে সুরভী সংগমে সংসার পার করছে।

পাপ নেই পুণ্য নেই মালিকের
মর্জি মাফিক দেদার পাল দিচ্ছে,
এ পাড়া ও পাড়া দেশময় অনন্য জোছনায়।

কেবল নিমুস্ক বলদ গরুরা
হিসেবের বেড়াজালে কঠিন প্রাকারে কাটাচ্ছে খোজার জীবন।
…………………………………………..

শুয়োরের দল

মিরপুর বেড়িবাঁধ দিয়ে দেখি শত শত শুয়োরের দল
মনুষ্য বর্জ্য ভক্ষণ করে,
আবর্জনা গলিত পুরীষ পুঁজ খেয়েদেয়ে
পরিবেশ সুস্থ করছে।

মিউনিসিপালিটির পরিচ্ছন্ন কর্মীরা
এই উচ্ছিষ্ট ভাগাড়ে আসে না কখনও।

ঢাকা শহরের রাজপথ অলিগলি
বিপণী বিতান, প্রার্থনালয় সংসদ ভবন চত্বর
মাঝে মধ্যে অবৈধ বর্জ্য পদার্থে ভরে যায়।

হে প্রভু তোমার কাছে আকুল প্রার্থনা
আমাদের শহরে পাঠাও
নির্ভীক জনদরদী শুয়োরের দল,
ওরা চেটেপুটে খেয়ে দেয়ে
পরিষ্কার করে দেবে অদৃশ্য ময়লাগুলো।

পরিচ্ছন্ন কর্মীরা এখানে নিরাপদ নয়।
…………………………………………..

কাহাফের কুকুর

পালাও জঙ্গল থেকে
গভীর অরণ্যে চিতাবাঘ, গড্ডল, গন্ডার,
গোখরো সাপের দৌরাত্ম চলছে,
এখানে কি আছে বোকার মতন
অযথা সাহস দেখাবার?

কাহাফের কুকুরও হিজরত করেছিল
বিশ্বাসী যুবকদের সাথে,
কোহেকাফে লুকিয়েছিল হাজার বছর।
না হয় তুমিও ঘুমিয়ে থাকো শীতনিদ্রার কম্বলে,
কখনো অলক্ষে অগোচরে
চলে যাওয়া পালিয়ে যাওয়া নয়,
পরাজয় নয়।

ভুলের তাজ, শেরপা মানায় না তোমার মাথায়,
অযথা গর্বে অনড় থাকা ভাল নয়,
এখন গভীর রাত্র,
রাত্রে ঘুমিয়ে থাকাই স্বাস্থ্যকর,
ঘুমাও দূরে কোথাও,
একটু পরেই সূর্য উদিত হবে।

দম্ভ করো না এখনÑ
কাহাফের কুকুরের মত নিতান্ত বিশ্বাসী
অনুচর হয়ে যাও।
…………………………………………..

মা-মাকড়শা

শুধু দুগ্ধ নয়, নিজের শরীর মেলে দেয়,
দুগ্ধপোষ্য জন্তু কিংবা মনুষ্য মতন নয়,
নিজেকে খাবার হিসেবে বিলিয়ে দেয়।

সন্তানেরা ধীরে ধীরে তিলে তিলে
কুরে কুরে খায় মাতৃকা শরীর,
এভাবেই সে খেয়ে ফেলে
জন্মদাত্রী মমতাময়ী মাতাকে।

একটি মাকড়শা মায়ের অনন্য উপমা।
…………………………………………..

মাছিরা বোঝে

মাছবাজার, গুড়ের আড়ত, ফলের দোকানে নেই
মাছির মচ্ছপ, ভনভন, ঘিনঘিন উৎসব।
ফরমালিন রসায়নে বিষাক্ত হয়েছে সব কিছু।
মানুষ মানুষ নয়।
এই সব বিষরসে ক্ষয়ে যায় কিডনী, যকৃত
ফুসফুস হৃৎপি-।
মাছিরা বিষাক্ত রসায়ন গন্ধে উড়ে যায় দূরে
খাবারে বসে না আর,
মাছিরা এখন রসায়ন বোঝে
মানুষ বোঝে না।

সর্বত্র বিষাক্ত ফরমালিন—
মানুষেরা মাছির মতন উড়ে উড়ে চলে যাক
অভয় অরণ্যে।

কাক

কালবৈশাখীর ঝড়ে
ইলেকট্রিক তারে
ঝুলে আছে কাক, কৃষ্ণপদ্ম।

লক্ষ লক্ষ কাক ফেলানির মতো
ঝুলে আছে কাঁটাতারে,
স্বাধীনতাকামী বায়সকুল
অনবদ্য।

ঘরে ঘরে জ্বলছে রক্ত গোলাপ
অনন্য অতুল।
…………………………………………..

পিঁপড়েরা

সারিবদ্ধ পিঁপড়েরা সম্মুখে চলছে
সীসাঢালা প্রাচীরের মতো
কাতার বেঁধে;
শীতের খাদ্য সংগ্রহ করে
ওরা চলছে গোপন বাংকারে।

সম্মুখে সংগিন হাতে নেতা,
পিছে চলছে লক্ষ লক্ষ
অকুতোভয় সিপাহীবৃন্দ,
হাতির পায়ের নিচে মারা পড়ছে অনেকে
তবুও ভ্রক্ষেপহীন পিঁপড়েরা
চলছে জীবনযুদ্ধের ডাকে।

প্রিয়জনেরা দাঁড়িয়ে রয়েছে
অপেক্ষার দ্বারে
তাদের মুখে ফুলেল হাসি ফোটাতেই হবে
অন্ধকার ক্ষুধা দারিদ্র ঘোচাতে হবে।
…………………………………………..

মাছির স্বভাব

মাছিদের ভাল মন্দ ভেদ নেই।
নেই পাক ছাপ, পবিত্র পুষ্পের লোভ।

মাছিরা মনুষ্য মলে বসে,
ময়রার দোকানেও থরে থরে সাজানো গোছানো
আমৃতি জিলাপি রসগোল্লা রাজভোগ
তাবৎ মিষ্টান্নে শুঁড় বসিয়ে দেয়।

আমাশয়, ডায়রিয়া, বমনের পচা রসে
দুর্গন্ধে পায় আতর সুঘ্রাণ,
শুঁড়ে, পায়ে পাখায় মাখায় বিরোধাভাসের খোশবু।
…………………………………………..

ল্যাংড়া মশার জন্য প্রার্থনা

একটা মশা নেই কোথাও,
ড্রেন, নর্দমা, এঁদো পুকুর খাল-নাল
পরিস্কার, ধবধবে, টলমল ডালিম রসের
পানি বইছে সর্বত্র।
হাতির ঝিলে এখন ওয়াটারবাস,
নয়ন নন্দন বাহারি উদ্যান সড়ক,
সুরম্য নগর সাজছে বিয়ের বাসরে;
খলিফা হারুন-অর-রশিদের বাগদাদ শহর নেমে এসেছে
সোনার গাঁ হোটেলের পূর্বকোণে।

তবুও ভয়ের বাগডাসা, চিতাবাঘ তাড়া করে
না জানি কখন কে অদৃশ্য হয়ে যায়
বদজীনের আসরে।

পানিপড়া, ঝাড়ফুঁক, দোয়া তাবিজের
দৌলতে মানুষ কিছুটা তটস্থ;
বেখবর তালিকার কালো রুমাল ওড়ে
মস্তকে মস্তকে
প্রভু বাঁচাও মজলুম জনপদ।

শত ইব্রাহীম আগুনের কু-লীতে বসে
আবৃত্তি করছে ‘জাহান্নামের আগুনে বসিয়া
হাসি পুষ্পের হাসি’।

প্রভু, নমরুদের মাথার ঘিলুতে
এবার না হয় ঢুকিয়ে দাও একটা ল্যাংড়া মশা;
আমাদের শহর এখন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন
মশার বড় আকাল পড়ছে।
শহীদ মিনার দেখে দেখে

নবীনগরের নীল আকাশ ফুঁড়ে দাঁড়িয়ে
আছে শহীদ মিনার;
ত্রিভুজের শীর্ষকোণ,
মিনারে শিশির আর রোদ্রের মাখন লেগে থাকে
শিরিষ অশোক আর দারুবৃক্ষের মুগ্ধতা মেখে
প্রত্যুষে শহীদ মিনারের খোশবু মেখে ছড়িয়ে পড়ি
ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলে,

হে প্রভু আমার শির উঁচু করে দাও মিনারের মত
সপ্তাকাশ ভেদ করে আরও ঊর্ধ্বে আমি যেতে চাই
আমার মস্তকে তোমার আতর মেখে দাও।
…………………………………………..

ভোরের সূর্যের কথা

কাল ভোরে সূর্য উঠবে
যদিও এখন মেঘলা আকাশ গভীর
জল থৈ থৈ,
দেখবে আগামী দিনের ভোরটা
ফুরফুরে ফর্সা সকাল।

তুমি শুধু নীরবে নিভৃতে খতিয়ান দেখ
আর রোনাজারি কর।
আকাশে যে কার্বন মেঘ সে তো তোমারই অর্জন,
বৃক্ষের চাষবাস কর
সবুজের আবাহনে ভোরের শানাই বাজাও।

আনন্দ গোছল

অনেক আগে হয়তো এক দশক পেরিয়ে গেছে
কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে যাওয়া হয়নি—
একবার আসাদের সাথে গিয়েছিলাম,
লোনা জলে আমার ভীষণ ভয়,
আবেদুর রহমান আমাকে পাজাকোল করে
চুবিয়েছিল সাগরে।

আমার পাপ স্খলন হয়েছিল লোনাজলেÑ
চোখের তপ্ত অশ্রুর জল কিনা জানি না,
তবুও শুদ্ধ চিত্তে ফিরে ছিলাম গাঙচিলে।
বুলবুল সরোয়ার আজন্ম ইবনে বতুতা—
পৃথিবীর তাবৎ সমুদ্রে ও ফরজ গোসল সেরেছে,
শুকরিয়া আদায় করেছে নীলনদ, আরব সাগর
বঙ্গপসাগর, ভূমধ্যসাগর, শ্রীরঙ্গপট্টম মাদ্রাজ সমুদ্রে
আরো অজস্র সমুদ্র সঙ্গমে ফেরেস্তার মত
ধবধবে সাদা হয়েছে।

এখন সমুদ্র নেই—
পৃথিবীতে মরুভূমি কেবল বালুর দুর্মর সাগর
প্রখর রোদের চুম্বনে চামড়া পুড়ে যায়Ñ
রোজ কেয়ামত যেন এসে গেছে,
মানুষেরা সমুদ্র স্বপ্নে জলধি হতে চায় না,
দুহাত বাড়িয়ে দেয় না ঈগল ডানার মত
মানুষের ঊর্ধ্বাকাশে।
…………………………………………..

হালখাতা

দুয়ারে কড়া নাড়ছেন ফতেউল্লাহ শিরাজি
লাল মলাটের হালখাতা খুলে বসে আছেন রাজপুত্র নবাবজাদারা।
কখন প্রজারা আসেন খাজনা শোধের জন্য,
নবাবেরা নেই রাজপুত্রেরাও নেই,
তবুও খুলছে হালখাতা প্রতি বৈশাখে।
খাজনা নয় বাজনা নয়
বছরের শুরুতে বিশাল র্যালি
ভুতুমপেঁচা, বানর, গডজিলার মুখোশে মানুষ
ভুলে যায় পুরানো স্মৃতি, কষ্টের ফোঁটা ফোঁটা ঘাম
আনন্দ হুল্লোড়ে কেউ কেউ ভুলে যায় নিজের ঠিকানা।
…………………………………………..

হিসেব নিকেশ

হিসেবের খাতা ছিড়ে ফেল
কি লাভ হিসেব নিকেশ করে গভীর এ জঙ্গলে
তোমার লেখার আগে লেখা হয়ে গেছে—
বাতাসের প্রতিকণা অনুকণাবৃন্দ তার
কেন্দ্রমূলে প্রতি ঘূর্ণনে রেখেছে সে সবের নির্দেশনা।

পুরনা দিনের ভুলভাল ভুলকথা ভুলে যাও
ভুলের কপাট বন্ধ করে নতুনের আবাহনে
জমায়েত হও সত্য সুন্দরের প্রার্থনা সভায়।

প্রতিটি বৃক্ষের প্রতিটি পত্রের অনিন্দ উচ্ছাস
ফুল মঞ্জুরীর পরাগ রেণুর হাসি খুশি
তুমি গভীর দৃষ্টিতে দেখ
বুক ভরে ঘ্রাণ সুকে সুকে
তুমি বিনম্র সেজদায় মুখরিত হও।
…………………………………………..

ঈদের ল্যান্ডস্কেপ

ঈদের কবিতা লিখে কি হবে এখন?
কি হবে কাগজের ফুল সাজিয়ে?
গুম খুন ধর্ষিতার চিৎকার
মগজে মননে সেঁটে আছে।

কোরমা পোলাও গরুর রেজালা, কালিয়া কুপ্তা
ফিরনী পায়েশ প্রায়ই খাওয়া হয়—
ঈদের দিনে ও সবে এখন আর ভাল্লাগে না।

পথে প্রান্তরে লাশের স্তুপে শকুনের হুল্লোড়,
আবাল বৃদ্ধ বনিতার চিৎকার ধ্বনি যেন
ম্যাডোনা অথবা ভেনাসের দুর্লভ ল্যা-স্কেপ!

রাজা বাদশারা আতরের ঘ্রাণ মাখিয়ে দেয়
ধবধবে রুমালে, বাতাসে—
অন্ধ অজগর মরুর কিংখাবে স্যা-ফিস খেয়ে
অমর যৌবনে মেতে থাকে।
…………………………………………..

পতাকা দোলাও

আফসার নিজাম, মৃধা আলাউদ্দিন, সালেহ মাহমুদ
ওয়াহিদ আল হাসান এখন সহজে ভুলে যায় তেজকুনিপাড়া,
কুয়াশার চাদরে অথবা সোনালী রোদের নীলিমায়
অথবা ষোড়শী চাঁদের চোরাবালুতে যেন বা ডুবে গেছে।

ওরা এখন রুমাল নাড়িয়ে, পাপড়ি ছড়িয়ে কামিনি ফুলের
স্বপ্ন দেখে না।
বলে না ভাইয়া অবশ্যই আসবেন,
আড্ডার মাখন মাখিয়ে চিকেন স্যা-ুউইচ
ঠোঁটের লাক্ষায় ভিজিয়ে দেব, ভাববেন না।
এ কালের ওমর খৈয়াম রেদুমিক মিষ্টি হাসি
বিলিয়ে দেয় মুঠোফোনে।

জানি না কোথায় রয়েছেন তৌহিদুর রহমান?
উজ্জলের রেস্তরায় এখনো মৃদুচাঁদ গোলাম মোহাম্মদ।
অথচ সময়ের পদদ্বয়ে ডান্ডবেড়ী
ওখানে নিষিদ্ধ পল্লী!
ম. র. ম চলে গেছে মরমিয়া গান গেয়ে
কালশীর আম্রকাননে।

সোলায়মান আহসান, মুকুল চৌধুরী, বুলবুল সরোয়ার
আ. বি. হা., লোদী সেই কবে যে হয়ে গেছে
না ছোঁয়া বিমুঢ় নদী।
আফসার নিজাম এত সহজে ভুলে গেলে চলে?
তোমার নিশানে কালো রং মাখিয়ে দিয়েছো কেন?
রেহনুমা শরবতে তোমার তৃষ্ণা কি এখনো মেটেনি?
ছিঁড়ে ফেল শিকলের মহব্বত,
মুজিব প্রেমিক রসায়নের অধ্যাপক ড. মহব্বত আলী
রয়েছেন আমাদের সাথে।
আফসার নিজাম
আমরা সকলেই প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের মেধাবী ছাত্র
বিশ্ববিদ্যালয়, কাঁটাবন, সারোয়ার্দি উদ্যান, শাহবাগ
মধুর রেস্তরা, শহীদ মিনার সবকিছু আমাদের।
তোমার পতাকা দোলাও।
…………………………………………..

একটি চেয়ারের গল্প

নিজেদের স্কুল থেকে বাবা একদিন আমাকে
শ্রিনগর বাবুদের স্কুলে ভর্তি করে দিলেন।
দালানবাড়ি শান বাধানো ঘাটে, কুমার নদীর পাড়ে
সে কী আনন্দ মেলা জমতো টিফিন পিরিয়ডে!
মেয়েদের ছি বুড়ি খেলা দারুণ ভালো লাগত,
আমাদের খেলাও ছিল দুর্দান্ত—
হারুনার রশীদের দৌড়ে সে কী তেজ ছিল!
আমি কুলিয়ে উঠতে পারতাম না,
হাঁপাতে হাঁপাতে শানবাঁধা ঘাটে
আমি আর নিমাই জিড়িয়ে নিতাম,
গোপনে গোপনে দেখতাম অনেক কিছুই।

কেউ একজন সে দিন বলেছিল—
তোমার উডপেন্সিলে আঁকা হিবিজিবি মানচিত্র বড় বেমানান,
রাবারের ঘষায় উঠিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে—
একজন বলল, কাঁটাতার খুলে ফেল
চল মিলে যাই মিলনের মোহন মায়ায়,
আমি বলি, তা কি হয়?

মনে পড়ে অনেক কথাই—
বাবুদের বৈঠকখানায় বাবার জন্য
একটি নির্দিষ্ট চেয়ার ছিল;
তিনি গেলে সেখানেই বসতেন।
আর সব বনি আদম মাটিতে চাটাই বিছিয়ে
আরাম করে বসে যেতেন;
কেউ কেউ বাবুদের হুকো সাজিয়ে দিতেন,
পরমানন্দে অবাক তাকিয়ে দেখতেন
হুকোর ধোঁয়ার গোলাকার বৃত্ত কি করে
আকাশ ছুঁয়ে যায়।
হুকো টানার কড়াৎ কড়াৎ শব্দে
কেউ কেউ আরামে চোখ বুজে ঘুমিয়ে
যেতেন চটের পর।

বাবুদের অনেকেই এখন ওপারে,
তারা ফিরে আসলে আবার না হয়
হুকো সাজিয়ে দেবেন কেউ কেউ।

কিন্তু আমার বাবার চেয়ারটা কি ঠিক আছে বাবু?
…………………………………………..

ফেরেস্তার গল্প

হুসনি মোবারক তুমি চল্লিশ বছর পর মুত্র ত্যাগ করলে
এর পূর্বে তোমার বর্জ্য পদার্থ কর্পুরের মত মিশে যেত হাওয়ায়,
মোয়াম্মার গাদ্দাফি তোমার জলযোগ হলো ম্যানহোলে!
আইফেল টাওয়ার, হোয়াইট হাউস হো হো করে হেঁসে উঠলো।
এখন ফুসে উঠছে ক্রেমলিন—
বুর্জ খলিফায় যেন না ঢোকে মিয়া খলিফা।
অটোম্যান প্রাসাদের চূঁড়ায় জ্বলছে দ্বাদশী চাঁদের চোখ—
আর এদিকের নাফ নদী সহ¯্র ধর্ষিতার শরমের রক্তে
লাল হয়ে যাচ্ছে।

হে বঙ্গোপসাগর তুমি কতকাল
হিমছড়ি পদতলে চুমু খাবে?
বাটালী হিলের কিংবা জাফলংয়ের
সোনালী কপোতাগুলোর পাখা কে কেটে দিয়েছে?
অনেক ওয়াজ শুনেছি—
বায়তুল মুকাররম, শাপলা চত্বর, তোমার ফরাসে
আসমান থেকে নামে না কেন
রহমের ডানাওয়ালা মাছ?

যমুনা, হে পদ্মা তুমি কতকাল জলত্যাগ করে
লু হাওয়া ছড়াবে এ বঙ্গ দরিয়ায়!
কতকাল তুমি মুত্র ত্যাগ না করে
ফুরফুরে ফেরেস্তা হয়ে থাকবে?
…………………………………………..

সিয়ামের সৌরভ

মাহে রমজানে সিয়ামের সৌরভ ছড়িয়ে পড়ছে সবখানে
ঘরে ঘরে মা বোনেরা ইফতারি তৈরিতে ব্যস্ত,
বাহারি শরবত, পেয়াজু, আলুর বড়া, বেগুনী, ঘুঘনী
হরেক রকম ফল ফলারীতে ট্রে সাজিয়ে রাখছে ডাইনিং টেবিলে।
কাজের ফাকে ফাকে কেউ বা তছবি তাহলীল করছেন।
ঘরে ঘরে পাড়া মহল্লা, হাট বাজার বিপণী বিতানে
বাহারী ইফতারির পশরা বসেছে।

পুরানো ঢাকা, মোগলটুলী, শাখারী বাজার,
বৌবাজার, মৌলভীবাজার, শাহবাগ, বেইলীরোডের নাটকপাড়া,
মসজিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে
রাস্তার দু পাড়ে চলছে বাহারি ইফতারির আয়োজন।
আস্ত মুরগীর মুসাল্লাম, খাসীর ভাজা রান, কাবাব, কালিয়া, কোপ্তা
আরো নানান বাহারি ইফতারি সাজিয়ে নবাব বাড়ির দেউড়ী থেকে ডাক উঠছে
বড় বাপের পোলায় খায়।

হোটেল রেস্তোরা, পার্ক, এভিনিউ, সংসদ ভবন,
সর্বত্র চলছে ইফতার পার্টির জাকজমক আয়োজন।
রোজাদার শুধু নয় সবাই বসেছে ইফতার মাহফিলে
সার্বজনীন আনন্দভোজে।

সবাই অপেক্ষা করছে
রোজার বয়ান শুনছে কখন আযান হবে
হাইয়া আলাল ফালাহ্।
শুরু হবে শরবত মুখে দেয়া
আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ইফতারতু…

এ কি মধুর দৃশ্য জ্যামঘন ঢাকার দৃশ্যপট পাল্টে যায়,
ইফতারির পূর্ব মুহূর্তে-শুনশান ফাঁকা, গাড়ীহীন রাজপথ
যেন এক গভীর হরতাল নেমেছে
কোন এক মহান নেতার আহ্বানে।

পৃথিবীর কিছু কিছু দেশে অন্নহীন দরিদ্রভূখার মিছিল
প্রলম্ব হচ্ছে,
হররোজ রোজা তাদের, দুমুঠো খাবার নেই—
তদুপরি ঘাতকের ছুরি, বন্দুকের গুলি
তাদের বক্ষ ঝাঝরা করে দিচ্ছে—
তারাও অপেক্ষা করছে পরম এক সিয়ামের
কখন আযান ফুকাবেÑ
আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম।
…………………………………………..

শুভ নববর্ষ

শুভ নববর্ষ শুভ নববর্ষ
শুভ হোক শুভ হোক
বেদনা বিমর্ষ ঢেকে
হোক হর্ষ
অবিমর্ষ,
প্রভাত আলোকলোক
হোক এ আনন্দলোক।
লোকায়ত এ বঙ্গ গঙ্গ
পদ্মা মেঘনা যমুনা কুমারলোক
আলোকিত হোক
চঞ্চল উচ্ছল উজ্জ্বল হোক।

কেন বিধ্বস্ত ধ্বস্ত ধর্ষ
রাঢ় পুণ্ড্র হরিকেল সমতট,
হিজল তমাল আম জাম বট
কেন উদ্ভট!

এ বৈশাখে কাল ঝড় শেষে
হোক উৎকর্ষ
শুভ নববর্ষ শুভ নববর্ষ।
শুভ হোক শুভ হোক
আমাদের এ আনন্দলোক
আলোকে আলোকে হোক
বিভূষিত।
হোক বিকশিত
বিশাখা শাখ হোক পুষ্পিত।
পাপ তাপ অভিশাপ
শাফ
হোক পাক ছাপ।
জঞ্জাল জটাজাল
ছিন্ন হোক;
পূণ্য হোক ধন্য হোক
এ অমরালোক।

শুভ নববর্ষ শুভ নববর্ষ
এসো সমবেত সকলে
করি হর্ষ
ঊষর ধুসর উপল বধ্যভূমি
করি কর্ষ
শুভ নববর্ষ শুভ নববর্ষ।
…………………………………………..

কাজী নজরুল ইসলাম

বিদ্রোহী কবি সাম্যের কবি
জাতীয় কবিও নজরুল,
তুমি ভালোবাসা প্রেম মোনালিসা
তুমি দিল দুলদুল।

বাংলার কবি ভারতের কবি
মানুষের কবি বিশ্ব মানবতার
তুমি হৃদয়ের তুমি মননের
তুমি কাব্যের পূত-অবতার।

তুমি দ্রোহ প্রেম হৃদয়ের হেম
মণি কাঞ্চন জহরত
নিপীড়িত জন সর্বহারার
চিরসাথী তুমি অনবরত।

বিদ্রোহী বীর উন্নত শির
তোমাকে অনেক অভিনন্দন,
মহাবিশ্বের বিস্ময় তুমি
তোমাকে দিলাম ফুল চন্দন।

তুমি কবিকূল শিরমণি প্রিয়
মহাবিশ্বের কবি
তুমি অনন্য তুলনা রহিত
আলোর আলো ও রবি।

বিদ্রোহী কবি প্রেমেরও কবি
কাজী নজরুল ইসলাম,
তুমি অদ্বিতীয়, চিরস্মরণীয়
তুমি জগতের তুল-কালাম।
…………………………………………..

জাতির পিতা

মহান নেতা মহান নায়ক
জাতির পিতা শেখ মুজিব,
লক্ষ কোটি বক্ষ মাঝে
জ্বলছ তুমি চিরঞ্জীব।

তোমার ডাকে সাড়া দিয়ে
লক্ষ কোটি জনতা,
মুক্তিযুদ্ধে বিজয় বেশে
আনলো কেড়ে স্বাধীনতা।

জাতির পিতা পরম মিতা
তোমার আমার অন্তরে,
স্বাধীনতার বীজ বুনেছে
অমিয় এক মন্তরে।

অমর কাব্য মহা কাব্য
সাতই মার্চের শ্রেষ্ঠ ভাষণ,
বিশ্বকবি বিশ্বনেতা
বিশ্বে তোমার শ্রেষ্ঠ আসন।

মহান নেতা বিদ্রোহী বীর
শেখ মুজিবুর রহমান
বঙ্গবন্ধু করুনা সিন্ধু
হৃদয়ে সবার বহমান।
…………………………………………..

বনমোরগের মত লাল চাঁদ

এই চাঁদ নয় যেন সেই চেনা চাঁদ
যে চাঁদে বকুল ফোটে
রজনীগন্ধা আকুল রাত্র ঘ্রাণমুগ্ধ কলরব
সে চাঁদ কোথায় গেল?
কালোমেঘ নিশিন্দা বারান্দা বনে লুকালো বিষাদে!
শীতের বরফ নামে বেঘোর শ্রাবণে
কালো পর্দার আড়ালে ঘনহীম জমানো পাথর যেন
বনমোরগের মত লাল চাঁদ।

স্বৈরাচারী নচ্ছর গর্দভ এক
মূঢ় গণতন্ত্রে ডাণ্ডাবেড়ী দেয়
চাবুকে চাবুকে শপাং চন্দ্রপৃষ্ঠ ফেটে ঝরে
লালখুন রক্তজবা উত্তপ্ত কোরাস।
…………………………………………..

নাত-এ রসূল

১.
মুহাম্মদ নাম কণ্ঠেতে যার গুণগুণিয়ে ওঠে
তার কণ্ঠ সুধার ছন্দ নিয়ে কুল মাখলুক ছোটে।
তাঁর সে নামের সুরের রেশে
মুগ্ধ আকুল ভালোবেসে
নিখিল ধরার সব ফুলেরা খোশবু মুখে ফোটে।

রবি শশি গ্রহ তারা তাঁর আলোতে পাগল পারা
তার প্রেমে কি তাই কি তারা রূপের সাগর লোটে।
জাদু চোখের বনের হরিণ
কার মায়াতে হলি রঙিন
তুই কি নবীর চোখের মায়া মাখিস চোখের গোঠে।

২.
ফারাণের ফুল রাঙা তুলতুল করছে আকুল সারা জাঁহা
তারাণা দিল আশেকে নীল ডাকছে কুহু পিউ কাহা।
কাটবে আঁধার গিরি কান্তার
ফুটবে আলোর হীরা জাওহার,
মরুর বুকে দুলছে হাসিন বিশ্বজয়ী শাহান শাহা।

দূর বীজনের নূর দীদারের দাওসে নূরের রাজদরোজা
দিল দরদীর নীর নয়নের নূর-নূরানীর কুলকলিজা,
ইয়ানবী শেষ পয়গম্বর
রোশনীতে সাত নীলাম্বর
হেরেমের দ্বার হল জাহরার চাঁদ চকোরীর দিল রাহা।
…………………………………………..

বিপদজনক খেলা

হাতের তালুতে আগুন রাখাটা অত্যন্ত কঠিন
বরফ রাখাও যায় না বেশী সময়।
শেষ জমানায় কেন আগুনের টুকরো নিয়ে খেলবে?
এটা এক বিপদজনক খেলা—
পোষাবে কিভাবে হে?
আগুন জাহান্নামের আগুনে বসি
কেবল ইব্রাহিমেরা বেঁচে যেতে পারেন, অন্যরা নয়।
তোমরা ইব্রাহিম নও,
ইব্রাহিমের মতন হতে হলে
তোমাকে যে নবী হতে হবে!
তা কি কখনও সম্ভব?

তোমার যেটুকু ক্ষমতা আছে তাতেই
তৃপ্ত থাকো
পিপীলিকার মতন আকাশে ওড়ার
স্বপ্ন দেখো না এখন,
তোমার ধর্মটা জ্বলজ্বলে বহ্নি শিখা
এটা নিয়ে বিপদজনক খেলা
খেলো না এখন।

মৃতপ্রায় মৎসের মতন
বালুর চরায় ঠেকে থাকো
তিরতিরে জলধারা তোমার লবণ
ধরে রাখবে কিছুক্ষণ।
শেষ জমানায় হাতের তালুতে
আগুন রাখার দিব্যি দিতে পারে কতজন?

তুমি সাধারণ—
মহাপুরুষ নও, সামান্য নগন্য
প্রাণ—
কোনো রকম বেঁচে থাকাটা
এখন তোমার কাজ।
…………………………………………..

সেলাই মেশিনের গল্প

মধ্যাহ্ন শেষে স্ত্রীর আহ্বানে
তার শয়ন কক্ষে গেলাম।
সেলাই মেশিনের নীচে নগ্ন কাপড় চোপড়
মেলে ধরে আমাকে ডাকছে মেশিন চালাতে।

দক্ষ মাঝির মতন আমাকে মেশিন চালাতে হবে
লগি বৈঠা ফেলতে হবে—
মেশিনের হুইল ঘুরাতেই সুচি সঙ্গমে
সেলাই হচ্ছে সালোয়ার কামিজ।

বর্ণিল বাহারে মনের মেঘ মাখিয়ে
সেলাই করছি কতকাল!
মাঝে মধ্যে স্ত্রীর খিস্তি খেউড় শুনতে হয়:
-তোমাকে দিয়ে হবে না,
সুচারুভাবে চালাতে পারছ না মেশিন।

মেশিন চালাতে চালাতে বস্ত্রের ওপর
নির্মম অথচ শিল্প সুন্দরভাবে সুচির খোঁচায়
কখন যে স্ত্রীকে সেলাই করে ফেলেছি
ঘর্মাক্ত শরীরে…॥

নগ্ন সালোয়ার, কামিজ ঠিকই সেলাই করা হয়
কিন্তু স্ত্রীর আদিম মূর্তির মুগ্ধতায় বারাংবার
সেলাইয়ের জন্য মুখিয়ে থাকি—
না জানি কখন ডাক পড়ে
নতুন কাপড় চোপড় সেলাই করার জন্য।
মেশিন চালাতে।

মেশিনের ঘর্ঘর শব্দ
নতুন কাপড়ের গন্ধ
আমার নাকের মধ্যে এক অপার্থিব
সুখের পরশ বুলিয়ে দেয়—
…………………………………………..

নাফ নদীর ওপারে

নাফ নদীর ওপারে
শাকান্নভোজী রাখান বৌদ্ধরা রোহিঙ্গা
হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছে।
কিশোরী, যুবতী, নারীদের উলঙ্গ করে
ধর্ষণে ধর্ষণে রক্তাক্ত করে দিচ্ছে যেন
প্যাগোডা, মন্দির, মসজিদের পবিত্র পতাকা!
সারে সারে নিরস্ত্র জনতা আবাল-বৃদ্ধ বণিতা
জড়ো করে বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করছে, বোমা মারছে,
পুড়িয়ে কাবাব করছে তরতাজা বনিআদম!
ওরা বলে নিরামিষভোজী?
কিন্তু এখন দেখছি রোহিঙ্গার পোড়া শরীর
ওদের প্রিয় খাবার!
ওরা হিংস্র ওরা দানব সন্ত্রাসী।
ওরা আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে পাকা ধানের ক্ষেতে,
পুড়িয়ে নিঃশেষ করছে ঘর, দোর, মসজিদ, মন্দির।
ধর্ষিত নারীর শরীর পুড়িয়ে ওরা উল্লাস করছে,
ওরা পিশাচ ঘৃণ্য শাইলক!
প্রাণ ভয়ে নৌকায় করে পালিয়ে আসা
অসহায় নারী শিশুদের আমরা পাড়ে উঠতে দিচ্ছি না,
আমরা কতিপয় অভব্য কুকুর ওদের
সাগরের নিরুদ্দিষ্ট পানিতে ভাসিয়ে দিচ্ছি,
ওরা নির্ঘাত মারা যাবে সলিল সমাধি হবে
অসংখ্য মানুষের। জাতিসংঘ, ওআইসি
যাবতীয় মানবাধিকার সংগঠনের কর্মীরা
দুঃখ প্রকাশের বিবৃতি প্রদান করে ঠোঁট চাটছে।
ঘাতক হার্মাদ মগদের রাখাইন বৌদ্ধদের
সন্ত্রাসী তা-ব থামিয়ে দিচ্ছে না।
আমরা কেউ কেউ মসজিদে তসবি জপে
নিশিথে নামাজ পড়ে স্রষ্টাকে খুশি করার অদ্ভুত ঘুষ দিচ্ছি!
অথচ স্রষ্টার কঠোর নির্দেশ, হে ঈমানদারেরা তোমরা কেনো
সংগ্রাম করছো না ঐ সব অসহায়
নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধদের জন্য?
যারা ফরিয়াদ করছে হে প্রভু
আমাদের এই জালিমের জনপদ থেকে
বের করে নাও
আমাদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেতা পাঠিয়ে দাও।
শুধু একজন মানুষ হত্যা করলে
সমস্ত মানুষ হত্যা করার সমান অপরাধ,
আমি বলছি একজন নারীকে ধর্ষণ করলেও
সমগ্র নারীকে ধর্ষণ করা হয়।
তাহলে হে ভব্য মানুষেরা তোমাদের কি মা বোন নেই?
নেই কোনো ভাই বন্ধু!

তোমরা শুধু মসজিদে গিয়ে খোদাকে
অযথা খুশি করার মহড়া করলে
তিনি তোমাদের প্রত্যাখ্যান করবেন।
গজবের লেলিহান শিখা মাটি ভেদ করে বের হবে।
মানব মুক্তির সংগ্রামে তোমরা এক্ষুণি মানুষ হয়ে যাও।
…………………………………………..

চাঁদ রাত

পৃথিবীতে যেন একটি মাত্র রাত
মাত্র একটি চাঁদ রাত
সকলের চোখে মুখে সেটে দিচ্ছে
নির্ঘুম আনন্দ জোছনা বৃষ্টি,
রোদ্রের উচ্ছল কলরব।

সারারাত জেগে থাকা আনন্দ ঝর্ণার নূপুর নিক্কণ
ভোর-বিভোর কুহক কুহূতান,
পৃথিবীর প্রথম জন্মের পর
যেন এই মাত্র দেখা দিল সেই প্রার্থিত ঈক্ষণ,
ভালোবাসাÑ
নিগুঢ় জলোধী গুরু গর্জন উচ্ছ্বাস।
একটি মাত্র চাঁদ রাতÑ
অনিন্দ আনন্দ ক্ষণ পরম পাওয়ার
অপূর্ব মুহূর্ত মধুর মদিরা পূতঃ নির্ঝরণ।

অধীর চিত্তের প্রগাঢ় প্রতীক্ষা শেষে
যেন এই মাত্র চাঁদ চুচুক সিঞ্চনে
সুবিশাল উর্ধ্বাকাশ থেকে
এসেছে পরম প্রেম চাতক তৃষিত পৃথিবীর পর।

পরম পাওয়ার স্নেহ শ্রাবণে ভরিয়ে দেবে যেন
নিঃসঙ্গ পৃথিবীÑ
বিরহ জর্জর এক সাধিকা পবিত্র চিত্তা রমণীর
নির্জল সরসী-ঘর।
…………………………………………..

ব্যাজস্তুতি

১.
তোমরা করলে লীলাখেলা
আমরা করলে পাপ,
কলিকালের ষন্ডচেলা
দিলাম অভিশাপ।

২.
মূত্রে ভেজা যোনীর ভেতর পুরুষাঙ্গের বীর্যপাত,
এমন গান্দা আধার থেকেই তোমার আমার সূত্রপাত।

৩.
গর্ব কিসের কিসের বড়াই
কিসের তোমার অহংকার
নাপাক তরল মৎস্য রেণুর
ভড়ং বেজায় চমৎকার।
…………………………………………..

খন্ড কবিতা

১.
সন্ধ্যার আঁধারে মাখা নীলাভ আকাশ
সাপে কাটা নীল ধূসর সুন্দর ধবধবে বিছানা
কালো জিহ্বা লকলকে ফনা
জানালার শার্শি আর জং ধরা
রেলিঙের কার্ণিশে
মনের মুকুরে।

২.
ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্রের হুংকারে অথবা সিংহের গর্জনে
কেঁপে ওঠে বনভূমি সমুদ্র সৈকতÑ
সমুদ্র উচ্ছ্বাস এক চেতনার ডালে ডালে।

৩.
মুমূর্ষু মহিলা ক্ষীণকায়া, পাণ্ডুর
সূক্ষ্ম ঘোমটা পরা, কম্প্রমান হস্তপদ
অসুস্থ বুদ্ধির ক্ষীণ সঞ্চারে
প্রতিভাষ,
অন্ধকার পূবাকাশে মৃত নক্ষত্রের মত চাঁদ
ক্লান্তিহীন শুভ্র জড়পিন্ড…।

৪.
শুভ্র নীলাম্বর কাটছে সারি সারি চিমনী
কোমরে পাতলা কাপড় টুকরো পেচিয়ে চাঁদ
মাঝখানে অপূর্ব ভঙ্গিতে বেখাপ্পা ভেনাস
আর এই নিকানো উঠোনে শিশিরের
মুক্তার ওপর দিয়ে
বুনো চোখে তাকিয়ে রয়েছি
৫.
হলুদ কুয়াশাগুলো পিঠ ঘষে জানালার কাঁচে
সে হলুদ ধোয়া নাক ঘষে জানালার শিকে
তার ধারালো জিহ্বা লেহন করে
সন্ধ্যার কপাট,
সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে
হেমন্তের কোমল রাত্ররা
বাড়ীটার সীমানায়
কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে পড়ে।
…………………………………………..

লোহার বেলুন

টেবিলের ওপর ধাতব ট্রে, ট্রে জ্বলছে খর খরে আগুনেÑ
মুরগির মুছাল্লাম, দেবদারু বৃক্ষের কয়লা,
গলিত লোহার আর নিকেলের তরল দ্রবণ
ফোটাচ্ছে অনিন্দ ফুল।

হিলিয়াম উত্তাপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় জীবনের উদযান
অম্লযান, তারপর মেঘ বৃষ্টি অনুপ্রাণ
নক্ষত্র নিঃশ্বাসে পুড়ে যায়, গলে যায়
উড়ে বাষ্প হয়ে যায় লোহার বেলুন।
…………………………………………..

পৃথিবীর গল্প

সর্বংসহা পৃথিবীর কোমল ভূতল
যেন এক অবনীপুরের ধরণী ধরিত্রী
অরাত্রি জোসনায় যে আমাকে করেছে ধারণ,
আমি তার স্বচ্ছ তোয়া, জলধারা পান করে ধন্য হই
এই প্রিয় ধরাধামে অনন্ত প্রহর,
জানি না এ ধরা দিবে কি নয়নে ধরা
বিশ্বধামে মহাময় আপন ভুবন!

জানি না পৃথিবী আমার হয়েছে কি না
নাকি কোন ভিনগ্রহ—
নক্ষত্র গ্রাসে চলেছে নীরবে নীরবে!
জানি না অদ্ভুত সর্বংসহা
কতটুকু সয়ে যাবে;
নাকি ভুলে যাবে সবকিছু রাহুগ্রাসে!
…………………………………………..

রুমালের কথা

একখ- রুমাল ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিলাম
সে রুমাল উড়তে উড়তে হয়ে গেল
শ্বেতকবুতর,
কখনও কখনও স্বেতপুষ্প, রজনীগন্ধার
মঞ্জরী বিলাশ।
রুমাল তোমাকে খুব দরকার
ভেসে ভেসে তুমি আর যেও নাকো
সুদূরের টানে
তুমি এসো উড়ে উড়ে কবুতর পাখি থেকে
তুমি এসো দ্রুততম শ্বেতপুষ্প থেকে
হাতের মুঠোয়,
অনন্য অতুল অনবদ্য ফুলেল রুমাল।
…………………………………………..
…………………………………………..

লেখকের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বই

কাব্যগ্রন্থ
১. শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু (১৯৮৩)
২. নিঃসঙ্গ নিলয় (১৯৮৭)
৩. মৃগনীল জোছনা (১৯৯০)
৪. সবুজ গম্বুজের ঘ্রাণ (১৯৯১)
৫. তোমার উপমা (১৯৯৪)
৬. ডানাঅলা অট্টালিকা (১৯৯৭)
৭. যে নামে জগত আলো (১৯৯৮, ১৯৯৯)
৮. কাব্য মোজেজা (২০০০)
৯. কোথায় রাখি এ অলঙ্কার (২০০৩)
১০. দ্রাবিড় বাংলায় (২০০৫)
১১. হৃদয়ে রেখেছি যারে (২০০৫)
১২. কাব্যসমগ্র (২০০৮)
১৩. দাও সে সোনারগাঁও (২০০৯)
১৪. বৃষ্টিমুখর চোখ (২০০৯)
১৫. অদৃশ্য অনলে জ্বলে সোনার স্বদেশ (২০১০)
১৬. কিউব কবিতা ও অন্য চাঁদ (২০১৬)

ছড়া ও কিশোর কবিতা
১. পান্না সোনা মান্না (২০০৪)
২. কচি কাঁচার ছড়া (২০০৭)
৩. কিশোর কলি (২০০৭)
৪. অন্ধঘোড়া (২০১৩)
৫. লাল জোনাকি চাঁদ সোনা কি (২০১৬)
৬. ছোট্টপাখি চন্দনা (২০১৮)

গল্পগ্রন্থ
১. সোনার খাঁচা (১৯৯৭)
২. সত্যের গল্প (২০০৭)

বিজ্ঞান কল্পকাহিনী
১. টাইম জিনের তেলেসমাতি (২০০০)

প্রবন্ধগ্রন্থ
১. কাব্যচিন্তা (১৯৯৯)
২. নব্বই দশকের কবিতা : প্রত্যাশার নীলাকাশ (২০০২)
৩. কুসুমে বসবাস (২০০৩)
৪. আশির দশক জ্যোতি জোছনার কবিকণ্ঠ (২০০৩)
৫. ছন্দবিজ্ঞান ও অলঙ্কার (২০০৭, ২০১৮)
৬. ফররুখ আহমদের কাব্য প্রকৃতি ও শিল্পসম্ভার (২০০৯)
৭. নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার নন্দনতত্ত্ব (২০১৯)

নাটক
১. জ্বলছে হৃদয় (১৯৯৫)

সম্পাদনা
আশির দশকের নির্বাচিত কবিতা (২০০৯)