রুমটির প্রতি মুগ্ধের আগ্রহ ভীষণ। রুমটিতে কারও প্রবেশের অনুমতি নেই। অবসর পেলেই বাবা রুমটিতে সময় কাটান। এসময় বাবা কাউকেই রুমটিতে ঢুকতে দেন না। আজ মুগ্ধের সামনে একটা সুযোগ এসেছে। রুমটিতে প্রবেশের সুযোগ। আজ ১৬ই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। এইদিনে সকাল থেকে বাবা শহীদমিনার থাকেন। মুগ্ধ আগপিছ কিছু না ভেবেই রুমটিতে প্রবেশ করে।

কি আশ্চর্য! রুমে কোন আসবাবপত্র নেই। দেয়ালজুড়ে সাজানো বাবার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসমূহ। চারদিকে ক্রমাগত চখ বোলাতে লাগলো মুগ্ধ। পশ্চিম কোনের দেয়ালের মাঝ বরাবরে এসে মুগ্ধের চোখ স্থির হলো । ফ্রেমে বাঁধাই করা একটা সবুজ সোয়েটার। সোয়েটারে লাল লাল কিছু দাগ। মুগ্ধ বুঝতে পারলো এগুলো রক্তের ছোপ। যেন লাল সবুজের পতাকা। কিন্তু এই সোয়েটার বাবা এখানে ফ্রেমে বাঁধাই করে রেখেছেন কেন? মুগ্ধের মনে প্রশ্ন জাগলো। মুগ্ধ তখন ভাবনার জগতে পিঠে আলতো হাতের স্পর্শ পেল। তাকিয়ে দেখলো মা পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। মা রাগের স্বরে জানতে চাইলেন মুগ্ধ এ-রুমে কেন? এ-রুমে প্রবেশ করা বাবার নিষেধ এটা তো সবার জানা। মুগ্ধ মায়ের কথায় কান না দিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল- মা , বলো না ওই রক্তমাখা সোয়েটার কার? দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ভাবনায় পড়ে গেলেন মা। আনমনা হয়ে গেলেন। মুগ্ধের কথায় মায়ের টনক নড়ে। মুগ্ধ বলতে লাগল, বলো মা , ওই সোয়েটারটা কার? মা বললেন- তুমি তো জানো তোমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। যোদ্ধের সময় তোমার বাবার পায়ে একটি গুলি লাগে।

আজো তোমার বাবার পায়ে গুলির চিহ্ন রয়েছে। মুহূর্তেই বাবার খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে চলার দৃশ্য মুগ্ধের চোখের সামনে ভেসে উঠল। মুগ্ধের মনে দাগ কাটল।
মা বলতে লাগলেন-তোমার বাবা তখন নবম শ্রেণীর ছাত্র। তোমার বাবার খুব কাছের বন্ধু ছিলেন পাশের বাড়ির তোমার রফিক চাচ্চু।তোমার রফিক চাচ্চুর বাবা ছিলেন না। মা ছিলেন অন্ধ। চোখে দেখতে পেতেন না।
তোমার দাদুর আর্থিক অবস্থা খুব ভালো ছিলো। বেশ সচ্ছল ছিলেন তারা। মোটামুটি বলা যেতে পারে। তোমার দাদুর আদরের একমাত্র সন্তান ছিলেন তোমার বাবা। তোমার বাবার অনুরোধে তোমার রফিক চাচ্চু ও তার মায়ের দেখাশোনার তোমার দাদুই করতেন। সবুজ রঙ তোমার বাবার খুব প্রিয় ছিলো। তোমার দাদু তোমার বাবাকে এই সবুজ সোয়েটারটি কিনে দিয়েছিলেন। সোয়েটারটি তোমার রফিক চাচ্চুরও ভালো লেগে যায়। তাই তোমার বাবা প্রিয় বন্ধুকে সোয়েটারটা দিয়ে দেন।

দেশে যুদ্ধ শুরু হলো, তোমার বাবা ও তোমার রফিক চাচ্চু যুদ্ধে চলে যান। তোমার রফিক চাচ্চুর মা তাকে যেতে দিতে চাননি। তিনি মাকে কথা দিয়েছেন তিনি যুদ্ধ শেষে ঠিকই ফিরে আসবেন। বয়স হলেও তোমার দাদু শক্ত মনের ছিলেন। তোমার বাবাকে যুদ্ধে যেতে বাঁধা দেননি।
যুদ্ধে তাদের গ্রুপে ছিল এগারো জন। ট্রেনিং শেষে এগারো জনেই যুদ্ধে অংশ নেন। আমাদের পাশের বাড়ির রইছ মিয়া শান্তি কমিটিতে নাম লেখায়। আমাদের প্রাইমারি স্কুলে পাকিস্তানি মিলিটারি ক্যাম্প বসে। রইছ মিয়াকে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান বানানো হয়।
এই রাজাকার আজ বিশাল সম্পত্তির মালিক। রইছ মিয়া পাক বাহিনীকে আমাদের বাড়ি দেখিয়ে দেয়। তোমার দাদুকে হুমকি দেয় তোমার বাবাকে যুদ্ধ থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য।তোমার দাদু তখন কিছুই বলেন নি। এমন কি কিছুই জানান নি। খুব সাহসী তোমার দাদু।

তোমার রফিক চাচ্চুর মা রোজ ছেলে আসবে সেই অপেক্ষায় থাকতেন। ছেলে তাকে কথা দিয়ে গেছে। সন্তানের ফেরার আশায় তিনি গভীর রাত পর্যন্ত বাহিরে বারান্দায় বসে থাকতেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই তোমার রফিক চাচ্চুর মা মারা যান।
একদিন খুব সকালে তোমার বাবার গ্রুপের মুক্তিবাহিনীর উপর পাকবাহিনী আক্রমন করে। রইছ মিয়া রাজাকার মুক্তিবাহিনীর অবস্থান জানায় পাকিস্তানি মিলিটারিদের।
যুদ্ধ শুরু হয়। গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে মুক্তিবাহিনীরা এগিয়ে যায়। কৌশলে মিলিটারিরা চারদিক থেকে মুক্তিবাহিনীকে ঘিরে ফেলে। তবুও মুক্তিবাহিনী প্রাণপণ যুদ্ধ চালিয়ে যায়। চার পাঁচজন গুলিবিদ্ধ। তোমার রফিক চাচ্চুর বুকে গুলি লাগে। তখন তোমার রফিক চাচ্চুর গায়ে সবুজ এই সোয়েটারটা ছিলো। এই সেই রক্তের ছোপ।হন। সেই সময় তোমার বাবার পায়েও কয়েকটা গুলি লাগে। তোমার রফিক চাচ্চু এই সোয়েটারটা খুলে তোমার বাবার হাতে নেন, বলেন- বন্ধু তোমার প্রিয় সোয়েটারটা যত্নে রেখো। এটা সোয়েটার না লাল সবুজের পতাকা। আর কুলাঙ্গার রাজাকারদের কখনোই ক্ষমা করো না। এর বেশি কিছু বলতে পারেন নি। মুহূর্তেই প্রাণ হারান তিনি। একটানা প্রায় তিনঘণ্টা সম্মুখ যুদ্ধ শেষে মুক্তি সেদিন বিজয় লাভ করে।
কথাগুলো বলতে বলতে গা কাঁপছে মুগ্ধের মায়ের। মুগ্ধকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন মুগ্ধের মা। আবেগী কণ্ঠে বলেন- ১৯৭১ সালের এই দিনে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ শেষে আত্মসমর্পণ করেছিল পাক হানাদার বাহিনী। স্বাধীন হয় , মুক্তি পায় বাংলাদেশ।
তোমার বাবা যুদ্ধ থেকে ফিরে আসেন। একহাতে লাল সবুজের সোয়েটার অন্য হাতে এই সোয়েটার। আমি এই বাড়িতে আসার পর তোমার বাবার কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনেছি। শুনেছি বাঙালীর জয়ের ইতিহাস। তোমার বাবা প্রকৃত একজন দেশ প্রেমিক। দেশের স্বার্থে কখনোই কোনকিছুর কাছে আপোষ করেন নি। তাই তোমার সকল বন্ধুরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়লেও তোমাকে পড়াচ্ছেন না। দেশকে ভালবাসেন বলেই কোন দুঃখকে দুঃখ মনে করন না।
দুঃখ শুধু প্রকৃত স্বাধীনতা এখন পাননি বলে। রইছ আলীর মতো রাজাকাররা আজও দিব্যি ঘুরে বেড়ায়। লাল সবুজের মানচিত্রে ক্ষমতার স্বপ্ন দেখে। গড়ে তুলে নব্য রাজাকার।

মুগ্ধ মায়ের কথা শুনছিল অবাক হয়ে। নতুন প্রজন্ম আসলেই অনেক ইতিহাস জানে না। এমন সময় বাবা ঘরে প্রবেশ করেন। বাবাও সোয়াটারের দিকে তাকিয়ে আছেন। মুগ্ধ খেয়াল করল বাবা দাঁড়িয়ে আছেন পিছনে, তাকিয়ে আছেন সোয়েটারের দিকে, লাল সবুজের পতাকার দিকে। মুগ্ধ একবার বাবার দিকে আবার সোয়েটারের দিকে। যে সোয়েটারে বাবা খুঁজে পান লাল সবুজের মানচিত্র আর হারানো প্রিয় বন্ধুর রক্তাক্ত মুখ।